এখন সময়:সকাল ৬:১১- আজ: রবিবার-২১শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৬ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:সকাল ৬:১১- আজ: রবিবার
২১শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৬ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

আকাশরেখায় বিস্তীর্ণভাবে মিলে যাওয়া কাব্যসম্রাজ্ঞী : সিলভিয়া প্লাথ

রুদ্র সুশান্ত

“মৃত্যু মানে আলো নেভানো নয়, এটি কেবল প্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়া, কারণ ভোর হয়েছে।”

‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’

সিলভিয়া প্লাথ (Sylvia Plath) বিশ শতকের সবচেয়ে জনপ্রিয়, গতিশীল এবং প্রশংসিত কবিদের একজন। কিন্তু তিনি কেন যৌবনের প্রথম দিকেই নিজেকে বিসর্জন দিয়েছেন? আমেরিকার কাব্যসভায়, এমনকি আমেরিকার সমাজে, বিশ্বসাহিত্যে এই প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে। সিলভিয়া প্লাথের লেখা শেষ চিঠি যেহেতু তাঁর সাথে বিষাক্ত গ্যাসে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গিয়েছে সেহেতু সেই চিঠিতে কী লেখা ছিল সেটা কখনোই জানা যায়নি। সিলভিয়া প্লাথ কী বলে গিয়েছিলেন সেই চিঠিতে? মানসিক অসুস্থতা নাকি মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা নাকি হীনপ্রাপ্ত হওয়া নাকি জীবন ছিন্ন করা বা হৃদয়ের সম্পর্ক ভাঙে যাওয়া! সেই অর্থে এই কবির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা যায়নি। পরবর্তীতে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সিলভিয়া প্লাথের প্রেমিক এবং স্বামী টেড হিউজ সম্ভাব্য বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করেছেন, যেহেতু সিলভিয়া প্লাথের কাছ থেকে স্পষ্ট ও প্রকৃত কোন কারণ পাওয়া যায়নি সেহেতু মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। ফ্রান্সিস বেকন বলেছেন- “জন্ম হওয়া যতটা স্বাভাবিক মৃত্যু ততটাই স্বাভাবিক”। কিন্তু সিলভিয়া প্লাথের জন্মটা স্বাভাবিক হলেও মৃত্যুটা স্বাভাবিক ছিল না। সিলভিয়া প্লাথের স্বামীও একজন কবি ছিলেন। কবি হিউজ সিলভিয়া প্লাথের মৃত্যুর পরে অনেক সাক্ষাৎকারে তাদের সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তেমনি এক সাক্ষাৎকারে কবি হিউজ বলেছেন, সিলভিয়া প্লাথের মৃত্যুর আগে কবি হিউজ তাঁর জীবনে আবার ফিরে আসতে চেয়েছেন, তিনি বারবার সিলভিয়া প্লাথ এবং সন্তানদের সাথে দেখা করতে আসতেন। টেড হিউজ সুসান এলিস্টন নামের অন্য এক নারীর প্রেমে পড়েই তাঁদের বিয়েটা ভাঙনের দিকে নিয়ে যান। এই সময়টাতে সিলভিয়া প্লাথ অত্যন্ত হতাশাগ্রস্ত ছিলেন যেটা তাঁর লেখাগুলোতে বারবার উঠে এসেছে। আজন্ম আহত সিলভিয়া প্লাথের হৃদয়টা কোথাও একটু প্রেমপ্রীতি, মমতা-আদর, ভালোবাসা আর বিশ্বাসের পূর্ণ-আস্থা পায়নি। হিউজ সুসান এলিস্টন নামে অন্য এক নারীর সাথে সম্পর্ক জড়িয়ে গেলে সিলভিয়া প্লাথ সে সম্পর্কটা ভালোভাবে মেনে নিতে পারেননি। পরবর্তীতে অনেক সমালোচকদের মতে সিলভিয়া প্লাথের মৃত্যুর এটা একটা কারণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। জীবনকে উপভোগের চেয়ে মৃত্যুটাই তাঁর কাছে সহজ এবং উপভোগ্য উঠছিলো বহুগুণে। আর তাঁর লেখার প্রতিটা স্টেপ  ছিলো ভেঙ্গে যাওয়া মনের বিদীর্ণ বহিঃপ্রকাশ। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর একমাত্র উপন্যাস ‘The Bell Jar’ । এটা ছিলো মূলত তাঁর নিজের জীবনের ওপর ভিত্তি করেই লেখা একটা উপন্যাস। যা এক অনুভূতিপ্রবণ মেয়ের মানসিক দুর্বলতা ও হতাশার গল্প এঁকেছে।

 

নিউইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউতে, জয়েস ক্যারল ওটস সিলভিয়া প্লাথকে “ইংরেজি ভাষায় লেখা যুদ্ধোত্তর কবিদের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত এবং বিতর্কিত” হিসাবে বর্ণনা করেছেন। সিলভিয়া প্লাথ ২৭ অক্টোবর ১৯৩২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের বোস্টন শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মা অরেলিয়া শোবার প্লাথ (১৯০৬-১৯৯৪) ছিলেন অস্ট্রিয়ান অভিবাসীদের আমেরিকান বংশোদ্ভূত কন্যা, এবং তাঁর বাবা অটো প্লাথ (১৮৮৫-১৯৪০) ছিলেন গ্র্যাবো, জার্মানির বাসিন্দা। সিলভিয়া প্লাথ ছিলেন একজন আমেরিকান কবি।

 

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আমেরিকায় নারীদের অবস্থার প্রকৃত সম্প্রসারণ ঘটে তাঁর লেখার মাধ্যমে। ‘The Bell Jar’ উপন্যাসটিতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন সেই আত্মধ্বংসের বা আত্মবিস্ফোরণের  নানান অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে এই উপন্যাসে। তাঁর আত্মজৈবনিকমূলক উপন্যাস “দ্য বেল জার” ১৯৬৩ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসটি সিলভিয়া প্লাথ নামে প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশিত হয়েছিল “ভিক্টোরিয়া লুকাস” ছদ্মনামে। দৃঢ়ভাবে বিবেকের সদা জাগ্রত ভঙ্গির পরিবর্তনে আত্মচরিত ও অনেকটা স্মৃতিকথামূলক উপন্যাস এটি। এই উপন্যাসটি একজন প্রচন্ড আবেগপ্রবণ যুবতী মেয়ের মানসিক ভাঙ্গন এবং সেই ভাঙ্গন থেকে নিজে নিজে উত্তরণের কাহিনীর যুগপৎ বর্ণনা রয়েছে। সিলভিয়া প্লাথ আত্মবিশ্বাসহীনতার নোংরা উন্মাদনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে ১৯৫৩ সালে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, সেই সময় তাঁর মনের যে বিরূপ পরিবর্তন ঘটে এই উপন্যাসে সেই বর্ণনাও  রয়েছে।

সিলভিয়া প্লাথের পিতা অটো প্লাথ ছিলেন একজন কলেজের অধ্যাপক। তিনি জার্মানে অভিবাসী হিসেবে বাস করতেন। তাঁর মা ছিলেন অধ্যাপক পিতার ছাত্রী, অরেলিয়া শোবার। ১৯৩২ সালে যখন কবির জন্ম হয় তখন তাদের বাসায় ছিল সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায়। ১৯৪০ সালে অর্থাৎ কবির  বয়স যখন ৯ বছর তখন তাঁর  অধ্যাপক পিতা মারা যান। হঠাৎ পিতৃবিয়োগে তাদের জীবনে অনেক পরিবর্তন আসে। আর্থিক পরিস্থিতির কারণে সিলভিয়া প্লাথের পরিবারকে ওয়েলেসলি, ম্যাসাচুসেটসে চলে যেতে বাধ্য করেছিলো।  সিলভিয়া প্লাথ একজন আজন্ম অভিমানী এবং প্রগতিশীল কবি।  কবিতার মধ্যে তিনি অমরত্ব লাভ করলেও পৃথিবীর ধুলোমাখা জীবনে মৃত্যুকে এডেিয় যেতে পারেননি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- “কেউ বা মরে কথা বলে, আবার কেউ বা মরে কথা না বলে।” কিন্তু এই কবি কথা না বলে মরে যাননি তার আত্মজৈবনিকমূলক উপন্যাস ‘The Bell Jar’ এ মৃত্যুর পূর্ব সংকেত দিয়েই গেছেন। জীবন তাঁকে একের পর এক বিষন্ন ঘটনার সাক্ষী করেছে, ম্লান ও বিষাদপূর্ণ পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। জীবনের করুণ পরিস্থিতি তাঁকে বারবার নিষ্পেষিত করেছে। বেঁচে থাকার লডাইয়ের আত্মার ভেতর বারবার নিজের মৃত্যু নিজে আবিষ্কার করেছেন। বেঁচে থাকার নিদারুণ একঘেয়েমি এবং ক্লান্তি তাঁকে শ্রান্ত করে তুলেছিলো, জীবনের নানান অপ্রীতিকর ঘটনা তাঁকে বিষফোঁড়ার মতো যন্ত্রণা দিচ্ছিলো। জীবন মৃত্যুর অদ্ভুত দোলাচলে বারবার তিনি কবিতার কাছেই ফিরে এসেছেন কিন্তু বেদনার অঞ্জলি নিয়ে অর্জুনের তীরের মতো দ্রুত মৃত্যুর দিকে ছুটে গেছেন। এই পার্থিব জগতে স্বইচ্ছায় কবি অপার্থিব মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন। ‘The Bell Jar’ উপন্যাসে তিনি নিজেই লিখেছেন- “মৃত্যু খুব সুন্দর হতে হবে। নরম বাদামী মাটিতে শুয়ে থাকতে হবে, মাথার উপরে ঘাস নেড়ে নীরবতা শুনতে হবে। গতকাল নেই, আগামীকাল নেই। সময় ভুলে যেতে, জীবনকে ক্ষমা করতে, সময় থাকতে হবে। শান্তি।” কিন্তু কবির  মৃত্যু নরম-বাদামি-সুন্দর ছিলো কিনা সেটা বলা অত্যন্ত বাহুল্য।  ‘The Bell Jar’ উপন্যাসের জন্য বিখ্যাত একমাত্র  কবি, যে মৃত্যুর পর আমেরিকার অন্যতম সেরা সাহিত্য পুরস্কার পুলিৎজার (১৯৮১) পেয়েছিলেন। কবিতার দুর্দান্ত মেধা নিয়ে জন্মগ্রহণ করা এই কবি ছোটবেলা থেকেই কবিতা ছাপানোর জন্য অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। মাত্র আট বছর বয়সে পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা ছাপানো হয়। কবিতা লেখা, প্রকাশ করা শুধু নয়কবিতায় জীবনযাপন, কবিতা নিয়ে খ্যাতি-বিত্তের আকাঙ্ক্ষা ছিলো সিলভিয়া প্লাথের। তাঁর কবিতার মাঝে বিষন্নতার ঝাঁজ আছে, বিদ্রোহ আছে, প্রেমের নিষ্পলকতা আছে, নিঃসঙ্গতার আবেদন আছে, মনোহর শব্দচয়ন আছে। বিষাদ আর বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুকের ছড়াছড়ি লক্ষ করা যায় তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতায় অন্তর্দৃষ্টি দিলে আত্মহননের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়।

যে বছর কবি প্রথমবার মা হন, সে বছরই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘The Colossus’। তাঁর রচিত শিশুতোষ বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘‘The Bed Book’, ‘Mrs. Cherry’s Kitchen’, ’Collected Children’s Stories’ইত্যাদি। শিশুদের জন্য লেখা আরেকটি বই The It-doesn’t-Mater Suit যা কবি ১৯৫৯ সালে লিখেছিলেন বইটি কবির মৃত্যুর পরে ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৬৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পরে শেষ কবিতা সংকলন ‘Ariel’ নামে প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘Dadd’ এবং ‘Lady Lazarus’ এর মতো অসাধারণ কবিতাগুলো তাঁকে এনে দেয় জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মাননাগুলো। তাঁর কাব্যগ্রন্থ The Colossus’ প্রকাশের পর যথেষ্ট পর্যালোচনা হয়েছে আমেরিকান সাহিত্য সমাজে। এই কবিতাগুলো তাঁর জীবদ্দশায় যতটা না সমালোচিত হয়েছে তার চেয়ে অধিক সমালোচিত হয়েছে আত্মহত্যার পরে। এক শ্রেণীর পাঠকের মধ্যেই কবিতাগুলোর জন্য প্রচন্ড উদ্দীপনা ও উৎসাহ সৃষ্টি হয়, পাঠক এ কাব্যগ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে যৌবনোদীপ্ত সদ্য বিগত কবির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার বিবরণ ও জীবনের পরিণতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাঁর কবিতাগুলো পাঠকের মন ছুঁয়ে গেছে, ছুঁয়ে গেছে সমালোচকদের কলমের অগ্রভাগও। প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পরে কবি প্রচ- গতিতে লিখেছেন, শব্দের সুচিন্তিত গাঁথুনিতে তীব্র আত্ম-প্রকাশের কবিতা তৈরি করেছেন নিজের অভ্যন্তরে। তাঁর কবিতার পরতে পরতে স্বীকারোক্তিমূলক উৎকণ্ঠা, নিদারুণ ব্যাকুলতা, ভবিষ্যতের আশঙ্কা, বিভ্রান্তি এবং সংশয়, অবিশ্বাস ও অনিশ্চয়তা যা তাঁকে পীড়িত করেছিলো তা কবিতার অভ্যন্তরে দৈবজ্ঞানের মতো করে রাশি রাশি সাজিয়ে থরে থরে প্রকাশ করেছেন। এখন প্রশ্ন থেকে যায় (১৯৩২-১৯৬৩) অল্প সময়ের জীবদ্দশায় কবি মূলত কতগুলো কবিতা লিখেছেন? ১৯৮১ সালে ” The Collected Poems” নামে সিলভিয়া প্লাথের একটি কাব্য সংকলন প্রকাশিত হয়, সেই সংকলনে মোট ৪৪৫ টি কবিতা মলাটবদ্ধ করা হয়েছে। এখানে বলে রাখা ভালো কবি তার জীবদ্দশায় একটি কবিতা সংকলন প্রকাশ করেছিলেন যেটির নাম রেখেছিলেন তিনি “The Colossus and Other Poems”। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত “The Collected Poems”  কাব্য সংকলনে তাঁর লিখিত সকল কবিতার একত্রীকরণ করা হয়েছে। সুতরাং বলা যায় কবি ৪৪৫টি কবিতা লিখেছিলেন।

সিলভিয়া প্লাথ একজন প্রতিভাধর ছাত্রী ছিলেন। ছাত্র জীবনে তিনি  বহু পুরস্কার জিতেছিলেন এবং তাঁর কিশোর বয়সে জাতীয় পত্রিকায় গল্প ও কবিতা প্রকাশ করেছিলেন। এরপর থেকে তিনি লেখার কলম আর থামাননি। তিনি ১৯৫১ সালে একটি বৃত্তি নিয়ে স্মিথ কলেজে প্রবেশ করেন এবং ১৯৫২ সালে ম্যাডেমোইসেল ম্যাগাজিন ফিকশন প্রতিযোগিতার একজন বিজয়ী ছিলেন। কবি যথেষ্ট শৈল্পিক মনের ছিলেন, ব্যক্তিগত অনুভূতিকে তিনি কাগজে-কলমে প্রকাশ করতে পারতেন,  খুব অল্প সময়েই তিনি একাডেমিক এবং সামাজিক সাফল্য অর্জন করেছিলেন। এতো সফলতার ভেতরেও তার অভ্যন্তরে ব্যাপক বিষন্নতা কাজ করছিলো। কবি আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিলেন। ‘The Bell Jar’ উপন্যাসে তাঁর চরম হতাশার জায়গাগুলোকে উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। হয়তো এই জন্যই তিনি এই উপন্যাসে লিখেন “আমি ঈশ্বরের সাথে কথা বলি কিন্তু আকাশ শূন্য।”

তীব্রভাবে আত্মজীবনীমূলক সিলভিয়া প্ল্যাথের কবিতাগুলি ব্যক্তিগত জীবনের মানসিক যন্ত্রণার উপলব্ধি, নিজের অভ্যন্তরে বেড়ে ওঠা যাতনা,কষ্ট ও ক্লেশের যে মর্মবেদনা এবং পীড়া সেখান থেকে ব্যথার রস নিয়ে কবিতার ভিতর বুনেছেন। ইংরেজ কবি টেড হিউজের সাথে তাঁর বিয়ে এবং বিয়ে পরবর্তী সমস্যা, তাঁর পিতামাতার সাথে অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব এবং নিজের সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির উৎস খুঁজেছেন।  সিলভিয়া প্লাথ যেই রাতে আত্মহত্যা করেন সেই রাতে তাঁর স্বামী টেড হিউজ অন্য একজন প্রেমিকা সুসান এলিস্টনকে সেই ঘরে রাত কাটাচ্ছেন যেখানে কবি বিবাহিত জীবনের প্রথম দিকের দিনগুলো কাটিয়েছিলেন। যৌবনের ফেলে আসা দিনগুলোর আত্মস্মরণ, বিগত আত্মস্মৃতি তাঁকে বারবার খুঁড়ে খাচ্ছিলো। কবির মৃত্যুর পরে অনেক সমালোচক ধারণা করছেন যে এই বিষয়টা কবি ভালোভাবে মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু কবির মৃত্যুর পরে টেড হিউজ বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন তিনি সিলভিয়া প্লাথের কাছে বারবার ফিরে আসতে চেয়েছেন। আজন্ম অভিমানী কবি হিউজকে এভাবে মেনে নিতে পারেনি। স্বামীর এইরকম আচরণ কবির আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত করেছিলো। রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষার সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে হয়তো টেড হিউজ তাঁর প্রথম প্রেমিকা সিলভিয়া প্লাথকে বলতে চেয়েছিলেন- “ভুল ভেঙে গেলে ডাক দিও, আমি মৃত্যুর আলিঙ্গন ফেলে আত্মমগ্ন আগুন ললাটের সৌম্যতায় তোমার লিখে দেবো একখানা প্রিয় নাম ভালোবাসা”। কিন্তু ভালবাসার সকল উপকরণ জলাঞ্জলি দিয়ে আমেরিকান এই তীব্র মেধাবী কবি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। সুসান এলিস্টন যে নারীর সাথে কবিপতি প্রেমের বিতর্কিত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন সেটাকে  উপেক্ষা করে কবি নিজের স্বামীকে আবার আপন করে টেনে নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এই অভিমান থেকেই হয়তো কবি সিলভিয়া প্লাথ লিখেছিলেন- “আমি ভালোবাসি না; আমি নিজেকে ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসি না। এটা স্বীকার করাটাই বরং মর্মান্তিক ব্যাপার। আমার মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কিছুই আমার নেই। আমার কাছে প্রচ- ভালোবাসা, বাস্তবিক ভালোবাসা নেই।”  উৎস- সিলভিয়া প্লাথের জার্নাল। (১৯৯৮ সালে ক্যান্সারে টেড হিউজের মৃত্যুর পর সিলভিয়া প্লাথের জার্নালগুলির একটি নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিলো, দ্য আনব্রিজড জার্নালস অফ সিলভিয়া প্লাথ নামে ১৯৫০-১৯৬২)

১৯৫৬ সালে সিলভিয়া প্লাথ ইংরেজ কবি টেড হিউজকে বিয়ে করেন। তাদের দুটি সন্তান ছিলো। টেড হিউজ সুসান এলিস্টনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে ১৯৬২ সাল থেকে কবি ও হিউজ আলাদা থাকতে শুরু করেন।

জীবনের কাছে হেরে গিয়ে ১৯৬৩ সালের ১১ ই ফেব্রুয়ারি সিলভিয়া প্লাথ বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগ করে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তিনি একজন আপাদমস্তক কবি, তাঁর মন সন্তানদের জন্য অত্যন্ত স্নেহবৎসল ছিলো, আত্মহত্যার পূর্বে তিনি সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবেছেন। তাঁর শিশু সন্তানদের ঘরে যেনো কোনোভাবেই এই বিষাক্ত গ্যাস প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য তিনি দরজার ফাঁক দিয়ে কাপড় গুঁজে দিয়েছিলেন, যাতে বিষাক্ত গ্যাস কোনোভাবেই তাঁর বাচ্চা সন্তানদের কাছে পৌঁছাতে না পারে। যেই বিষাক্ত গ্যাস তাঁর জীবন কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কি শুধু বিষাক্ত গ্যাস তাঁকে পৃথিবী থেকে বিদায় জানিয়েছিলো! এই আশ্চর্য প্রশ্ন থেকেই যায়। দিনের পর দিন নিদারুণ নিঃসঙ্গতায় কাটানো একজন কবি পৃথিবীকে কোন বার্তা দিয়ে আত্মহনের পথ বেছে নিয়েছেন? বেঁচে থাকতেও তাঁর অনুভূতিগুলো, দেহের নিউরনগুলো ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছিলো। যাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন সে যখন অন্য রমণীর কাছে চলে গেছে তখন তাঁর মানসিক দৈন্যতার যে বিবরণ তিনি লেখায় দিয়েছেন তাতেই বুঝা যায়- তিনি মূলত মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তাই দ্য বেল জার উপন্যাসে আত্মচিৎকার করে বলেছেন- “আমাকে বাঁচতে দাও, ভালোবাসো এবং ভালো বাক্যে ভালোভাবে বলতে দাও।” বিষাক্ত গ্যাসে পুড়ে মারা যাওয়ার আগে কবি যে চিঠিটা লিখেছিলেন সেটা কখনোই পাওয়া যায়নি। চিঠিটা তাঁর সাথেই পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিলো। এই মেধাবী কবির জীবন অকস্মাৎ থেমে যাওয়া এবং উদীয়মান সম্ভাবনার ইতি টানার দায় মূলত কার ওপর বর্তায়? সেই বিতর্ক অতো সহজে শেষ হবার নয়। এই অনিন্দ্য সুন্দর ও মনোহর, রূপসী ইংরেজি সাহিত্যের এই নক্ষত্রকে জীবনের চেয়ে বেশি শান্তি দিয়েছিলো  মৃত্যু। মৃত্যুই হয়তো জীবনের চেয়ে বেশি প্রশান্তি প্রদান করেছিল তাঁকে। সমরেশ মজুমদারের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে হয়- “মৃত্যু কী সহজ, কী নিঃশব্দে আসে অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে যায়”। কবি তাঁর সৃষ্টির মাঝে যে অমরত্ব লাভ করেছেন সেটাই তাঁকে দীর্ঘজীবী করেছে। তাঁর লেখার মধ্যে স্বীকারোক্তিমূলক যে বিস্ফোরণ রয়েছে তাতেই তিনি পরবর্তী অনেক কবিদের পথপ্রদর্শক স্বরূপ আত্মসন্ধানের উপায় নিরূপণ করেছেন। প্রকৃতি ও প্রেম দারুণ মেধাবী এই কবিকে সঠিক সঙ্গ দিতে পারেনি।

 

 

রুদ্র সুশান্ত, কবি ও প্রাবন্ধিক

প্রাচীন বাংলার নাগরিক জীবনে শিল্প ও সৌকর্য

ড. আবু নোমান এখন প্রাচীন বাংলার যে স্থাপত্যগুলো পাওয়া সম্ভব সেগুলোকে প্রত্মতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ বললেও বলা যেতে পারে। স্থাপনা সমাজের সভ্যতার একটি অন্যতম নিদর্শন বা উপাদান।

বৈষম্যমূলক কোটা প্রথায় মেধাবীরা বঞ্চিত হবে (সম্পাদকীয়- জুলাই ২০২৪)

সরকারী চাকরীতে কোটা প্রথা কোন ভালো বা গ্রহণযোগ্য প্রথা হতে পারেনা। এতে প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হয়। প্রশাসনে মেধাবীর চেয়ে অমেধাবীর আধিক্য বেশী বলে রাষ্ট্রীয় কাজে

আহমদ ছফা বনাম হুমায়ূন আহমেদ

মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ তখন আহমদ ছফার পিছন পিছন ঘুরতেন। লেখক হুমায়ূন আহমেদ-কে প্রতিষ্ঠার পিছনে যে আহমদ ছফার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, সে কথা