এখন সময়:রাত ১২:০০- আজ: বৃহস্পতিবার-১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

এখন সময়:রাত ১২:০০- আজ: বৃহস্পতিবার
১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

আবরজনার কারখানা

রোখসানা ইয়াসমিন মণি :

আমাকে থানায় নেয়ার পর বাসায় কী হয়েছে জানা যায়নি। বলতে গেলে জানতে দেয়া হয়নি। কত বলেছি পুলিশ অফিসারকে একটি কল করার অনুমতি দিন। মা টেনশন করবে। শুনলোই না! বাবার টেনশন হবে না। কারণ, টেনশন করার মত মস্তিষ্কের সেন্সর বাবা হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে সবার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। মা ওই দৃশ্য দেখে কাঁদেন। আমি থানায়। বাবা হাসপাতালে। মা একা কী করে বাবাকে সামলাচ্ছেন কে জানে? আমি সোহম আহমেদ। মা বাবার একমাত্র ছেলে। ইউনিভার্সিটি শেষ করে বেকার যুবক। চাকুরির ইন্টারভিউ দিয়ে দিয়ে শরীরের ক্যালরি খরচ করছি। কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। আবার ক্যালরি ভরাট করতে প্রচ- ক্ষুধা নিয়ে গপাগপ যা পাই খেয়ে উদরপূর্তি করি। আগে খাওয়াদাওয়ায় যথেষ্ট বাছবিচার ছিলো। এখন আলাইবালাই নেই। বেকার যুবকের আবার পছন্দ-অপছন্দ! এর ওপর টানাটানির সংসার। মা- বাবার আশা ছিলো পাস করে আমার চাকুরি হবে। তখন অভাব থাকবে না।সব মা বাবার যেমন আশা থাকে ছেলে বড় হবে। বড় হয়ে ভালো একটা চাকুরী পাবে। মা বাবাকে দেখবে।তেমন আশা আমার বাবা ময়েরও ছিলো। সংসারে একটি ছেলে মানে  বিশাল ভাগ্যের ব্যাপার।

খাইয়ে দাইয়ে পেট ফুলিয়ে লেখাপড়া শিখিয়ে ওই ছেলেটির যখন চাকুরী হয় না তখন মা – বাবার ঘ্যানর ঘ্যানর শুরু হয়ে যায়।এরচে হাতি পোষা ভালো। হাতি মরলেও লাখ টাকা,বাঁচলেও লাখ টাকা। মেয়ে হলে আরো ভালো। যে টাকায় ছেলে খাইয়ে পড়িয়ে বড় করেছি তার কম টাকায় মেয়ে বিয়ে দিতে পারতাম। মেয়ে গোপনে শশুর বাড়ি থেকে টাকা পাঠাত। কি লাভ ছেলে পেলেপুষে? ছেলে পেলেপুষে যে লাভ নেই

তা মা- বাবা বোঝেন এমন সময়ে যখন কিছু করার থাকে না। তো এসব কথা আমি প্রতিদিন শুনি। শুনতে শুনতে গা সওয়া হয়ে এলে বাথরুমে ঢুকে গোসল করি।এরপর কিচেনে ঢুকে যা পাই তাই গিলি। এরকম করেই চলছিলো। একদিন মা বলেন, শুয়ে বসে না থেকে কাজ কর। একা তো পারি না আর! কী কাজ জানতে চাইলে মা বলেন, চোখ কানা তোর? ঘরে কাজ দেখোস না? বাথরুমটা ডল। প্রতিদিন ডলে ধুয়ে পরিস্কার করবি। খাস যেমন হাগোসও তেমন। ধুইতে পারিস না? মায়ের কথায় সেদিন জ্বালা ধরে যায়। ডলতে শুরু করলাম বাথরুম। জীবনের জ্বালা,যন্ত্রণা,প্রবঞ্চনা, ক্ষোভ হতাশা নিয়ে হারপিক ঢেলে বাথরুম পরিস্কার করে চলেছি।মায়ের কাছে অকোজো হয়ে যাওয়া আমি পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে ডুবে গেলাম। কোথা হতে একগাদা ঘৃণা এসে আমাকে খুবলে খাচ্ছে বুঝতে পারছি না। আমার কাজ দেখে মা খুব খুশি হন।আমার ভেতর জ্বালা। মায়ের খুশি দেখে সারাঘর পরিস্কার করলাম।মা আরো খুশি। এবার থেকে মায়ের কাপড়- চোপড়, আমার, বাবার কাপড়চোপড় ধুয়ে সাফ করতে লাগলাম। এমনকি বিছানা চাদর ও। প্রতিদিন ধুয়ে মুছে বাসা ধবধবে করে ফেললাম। ভালোই লাগছে। ঘর দরোজা ঝকঝক তকতক করছে। অবস্থা এমন হয়েছে ঘরে ছোট একটুকরা কাগজ দেখলেও চেঁচিয়ে উঠি। এতদিন পর চেঁচানোর একটু সুযোগ পেয়েছি।না হলে মায়ের চেঁচানোতে জীবন জটিল হয়ে উঠছিলো। বেশ চলছে। কাজ করছি, বাইরে বেরুচ্ছি। বাবার হোটেলে খাচ্ছি। তুমুল বৃষ্টির পর একদিন বাইরে বের হলাম। একি! রাস্তায় এত ময়লা, নোংরা কাগজে সয়লাব।কারো দিকে তাকালাম না। সোজা গিয়ে ওসব কুড়িয়ে ফেলে দিলাম।নাহ,ময়লা সাফ হচ্ছে না। ঝাড়ু দিয়ে সাফ করতে লাগলাম রাস্তাঘাটের ময়লা। কয়েকদিনের মধ্যে শহরের রাস্তা চেনাই যায় না। মসৃন হয়ে যায়। আমার এসব কাজ দেখে সবাই আমাকে পাগল ভাবতে শুরু করে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছেলেরা মজা দেখে।কিছু টোকাই আছে আমাকে দেখলেই নানানরকম খাবার খেয়ে রাস্তায় প্যাকেট ফেলে দেয়। বলে,কীরে ক্লিনার, কী দেখিস? নে পরিস্কার কর। কত করতে পারিস দেখি। ওরা এসব করে আর হো হো করে হাসে।পরিস্কার করতে করতে আমি সামনে এগোই। ওয়াক থু! এসব কি? পঁচা গন্ধ আসে নর্দমা থেকে।নাহ,এমন নর্দমা শহরে রাখা যায় না। পরিবেশ শেষ। আমি এসব ভাবছিলাম। ভাবতে ভাবতেই চলে এলাম পলিথিনের দোকানে। টেইলরের কাছে গিয়ে পলিথিন দিয়ে সারা শরীর সিলিয়ে নেমে পড়ি ড্রেনে। আমার এই কাজ দেখে কয়েকজন পথচারী দাঁড়ায়। ভাবে আমি সিটিকর্পোরেশনের লোক। এদের মধ্যে একজন বলে, এই তুই সোহম না? আমার নাম কেউ বলছে শুনে গলা উঁচিয়ে তাকাই। দেখতে চেষ্টা করি কে আমার নাম ধরে ডাকছে। এই সোহম তুই ড্রেনে? কী করছিস?

মতি তুই? কীরে কই যাস?

যাচ্ছি তো বাজারে।তুই ড্রেনে কী করছিস?

ময়লা আবর্জনা পরিস্কার করছি।

তোর মাথা গেছেরে সোহম! একদম গেছে।

সোহম ওদিকে না তাকিয়ে ময়লা থকথকে জলে বালতি ডুবিয়ে দেয়।লোহার বেলচা দিয়ে ময়লা তুলে সেই বালতি ভরে ওপরে শুকনো জায়গায় ঢেলে দেয়। ওয়াক থু! ময়লার গন্ধ পেয়ে মতিসহ আরো অন্যরা দেয় দৌড়। সবাই চলে যায়। আরো কত লোক আসে। এসব কাজ দেখে আমাকে ইয়ার্কি মারে।ঠাট্টা করে।আমার গায়ে অনেকে থুতুও মারে।সবার একই কথা,লোকটা পাগলনি? এই পোলার বাড়ি কই? মাথায় ছিট আছেনি কোনো?এদের মধ্যে দু একজন এগিয়ে আসে।নাকে আঙুল ঠেসে বলে,ওই পোলা ফুডানি করো ময়লায় নাইম্যা? সিটি করপোরেশনের লোক নাই? তুমি ক্যান হেগো কাম করো।কতজনের কত কথা শুনি। আমি কারো কথার জবাব দিই না। আনমনে ময়লা টেনে উপরে তুলি আর স্তুপ করি।আমি একা।কেউ নেই আমার পাশে। ময়লার বালতি এগিয়ে যায়।সাথে আমিও। পেছনে স্তূপীকৃত ময়লার ভাগাড় জমিয়ে সামনে এগোই।মাথায় ঘুরপাক খায় আমাকে আরো ময়লা পরিস্কার করতে হবে। আরো আরো আরো। ঘর,বাথরুম,কিচেন,কাপড়চোপড়, রাস্তা,ড্রেন কোথাও একটুও ময়লা থাকতে পারবে না। চারদিক পরিচ্ছন্ন রাখা চাই।আশ্চর্য

হই, আমার একটুও খারাপ বা ঘৃণা লাগছে না এই ময়লা পরিস্কার করতে।কেনো ঘৃনা করবে? এগুলো যে পৃথিবীরই জিনিস। হয়তো অব্যবহৃত।ব্যবহৃত নয় বলে পঁচে গন্ধ ছড়াচ্ছে। ব্যবহারেরগুলো মানুষের কাছে আদর পাচ্ছে।এই তো তফাৎ আর কি! মানুষ নিজেই আস্ত ময়লার এক ভাগাড়। সে নিজেই মলমূত্রের ঢিবি পেটের ভেতর বহন করে চলেছে। চামড়ার ভেতর ঢেকে থাকে বলে দেখে না। পেট থেকে বের হলেই ওয়াক ওয়াক শুরু করে।ওয়াক ওয়াকের কী আছে? এগুলো আমাদের খাদ্যইতো।অপ্রয়োজনীয় খাদ্য গু হয়ে গেছে।প্রয়োজনীয়গুলো শরীরে কাজে লাগছে।সোহম ভেবে পায় না মানুষ এত খচ্চর কেনো? ময়লার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে প্রস্তুত কিন্তু একটু ময়লা সরিয়ে রাস্তাঘাট পরিস্কার করতে রাজি না। মানুষ ভাবলে ভাবুকগে। আমি ভাবি না এসব। ময়লা স্তুপ করতে করতে একসময় দেখি সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি উপস্থিত। ওরা নেমে যায় আমার সাথে। আমার সাথে হাত লাগায় ময়লার পর ময়লা তুলতে থাকে ড্রেন থেকে। ওপরে ময়লার স্তুপ গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। চারিদিকে মানুষ আর মানুষ। ওরা আমাকে ঘিরে থাকে। আমি ময়লা তুলি নাকে হাত দিয়ে দেখে। কেউ ছবি তোলে।ফেসবুকে পোস্ট দেয়। হোয়াটসঅ্যাপ, ম্যাসেঞ্জার,ইমো,টুইটারে ভিডিও ছবি শেয়ার করে। কয়েকজন দেখে দৌড়ে আসে।আমার সাথে কথা বলতে চায়। আমি বিরক্ত হই। খুব বিরক্ত হই। কারো সাথে কথা বলি না। নজর থাকে বালতিতে আর ওপরে।কয়েকজন মিডিয়াকর্মী আসে। মাছির ঝাঁকের মতো।এসেই ক্যামেরা লাইট ওপেন করে নানাকিছু জিজ্ঞেস করে। খুব আগ্রহ জানতে চায় আমি কেনো এই ময়লার ড্রেনে পড়ে আছি?এদের জ্বালায় অস্থির হয়ে একসময় মাথা ওপরে তুলি। আমার মাথা ওপরে তুলতে দেখে কয়েকজন বলে,এই চুপ,চুপ। কেউ কথা বলবে না। এখন লাইভ হবে। ছেলেটি কথা বলবে। ওকে কেউ বিরক্ত করো না।আমি আসলেই বিরক্ত হই।ওদের বলি, কেনো আপনারা আমার কাজে বিঘœ ঘটাচ্ছেন? তার চেয়ে এটা ভালো হয় না,এখানে আমরা যতজন আছি সবাই এই কাজে হাত মিলাই। সবাই মিলে যদি ময়লা পরিস্কার করি তাহলে কি দুর্গন্ধ ছড়ায় চারিদিকে?ওই সাংবাদিকেরা,ক্যামেরা বন্ধ করেন। পারলে ড্রেনে নামেন। ময়লা পরিস্কারে হাত লাগাই। যেটা আমি একা করছি সেটা আপনারা সহ করলে এই শহর পরিস্কার হতে দশদিন সময় লাগবে। আর আমাকে ভিডিও করার কী আছে? কাজটা কার? আমাদের না? আমাদের ভেতর কত পঁচন ধরেছে। না হলে যে কাজ সবার সে কাজ একজন করছে দেখে সব বাহবা তাকে দিয়ে মিডিয়ায় দেখানো হচ্ছে।কত পঁচে গেছি আমরা। যে কাজটা সবার কর্তব্য সে কাজ আমি একা করছি দেখে সবার ভেতর কী হুলুস্থুল! আসলে আমরা কাজ করাটাই ভুলে গেছি। সব ফাঁকিবাজের দল। যান এখান থেকে মিয়ারা? আমার কাজে বিঘœ ঘটাবেন না। কই যাবেন যান? আর না গেলে ময়লার বালতি আপনাদের ক্যামেরায় ছুঁড়বো।

সাংবাদিকেরা অপ্রস্তুত হয়ে যায়।যে যার মতো ভাগে।

এরপরও কিছু লোক থেকে যায়।ওরা আমাকে দেখে। যেনো কোনো আশ্চর্য কাজ করে ফেলছি আমি। থেকে থেকে কেউ বলে ভাই এবার থামেন।অনেক হয়েছে। ময়লায় এভাবে পড়ে থাকলে মারা যাবেন।দিনতো শেষ হয়নি।আগামিকাল আসবেন। আমি একসময় কাজ থামাই।ক্লান্তি ভর করে শরীরে।  বাসায় আসি। এসেই শুনি মায়ের চিৎকার। কই থাকোস সারাদিন হ্যাঁ? এত বড় ধামড়া পোলা। বাবারেও কিছু হেল্প করতে পারিস নাকি? কি পারিস না? আমি কোন কথা বলি না।শরীরে ক্লান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন দুপুরে ঘুম ভাঙ্গে।সারা শরীর ব্যথা হয়ে আছে। আগের দিন একটানা উপুড় হয়ে সোজা হয়ে কাজ করার ফল। বিষাক্ত হয়ে আছে শরীর। পাশের রুমে মায়ের উদগ্রীব গলা শুনতে পাই,ওহ কী না কি হয়েছে? মায়ের এমন উৎকণ্ঠিত কণ্ঠ শুনে বুকে মোচড় দিয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে মায়ের কাছে দোড়াই। দেখি বাবা বুক হাতের নিচে চেপে ধরে আছেন।আমি বাবাকে জাপটে ধরে বলি, বাবা কী হয়েছে? ও বাবা কী হয়েছে তোমার? তুমি এমন করছো কেনো? বাবা গোঙাচ্ছেন।কিছুই বলতে পারেন না।মা আল্লাহকে ডাকছেন।আমাকে বললেন,সোহমরে! তোর বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে চল।অবস্থা ভালো না।তাড়াতাড়ি কর বাবা! আমি সার্ট গায়ে জড়িয়ে বাবাকে পাঁজাকোলে নিয়ে দিলাম দৌড়।মা আমার পিছু পিছু ছুটছেন।রাস্তার ওপর এসে ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে মা আর বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলাম।বাবাকে অক্সিজেন দেয়া হয়েছে।সারারাত অক্সিজেনের নিচে থেকে পরীক্ষার জন্য ডাক্তাররা মাস্ক খুলে নিলেন।বাবার ওইসময় মুখখোলা দেখে জিজ্ঞেস করলাম,বাবা কেমন লাগছে এখন তোমার?  বাবা আমাকে জীর্ণ হাত দিয়ে চেপে ধরেন।ন্যাতা ন্যাতা গলায় বলেন,ওদের টাকা দিবি না।আমার কাছে পঞ্চাশহাজার টাকা চেয়েছে ঘুষ। আমি কোথা থেকে দেবো এত টাকা? আমার পেনশনের জন্য ছয়মাস থেকে ঘুরাচ্ছে।আজ না কাল, কাল না পরশু করতে করতে ছয়মাস আমি শিক্ষা অফিসে দৌড়াচ্ছি। আমার টাকা,আমার পেনশন এগুলো তুলতেই টাকা দিতে হবে আমাকে।এত টাকা আমি কই পাবো বল? বাবা কথা বলার সময় গাল বেঁকে যাচ্ছিলো।কথা জড়িয়ে আসায় সব কথা বুঝেও উঠতে পারি নাই।যতটুকু বুঝেছি পেনশনের জন্য আজ ছয়মাস বাবা হয়রানির শিকার হয়েছেন। ওদের জন্য আমার বাবা আজ বিছানায়।হাসপাতালে। রাত এগারোটায় বাবা স্ট্রোক করেন। চিরদিনের জন্য জবান বন্ধ হয়ে যায় বাবার।শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন।কবে সুস্থ হবেন ডাক্তাররা

 

 

কিছুই বলতে পারছেন না।সারারাত উৎকণ্ঠা ভয় হতাশায় কাটে।মায়ের ভীত মুখ দেখে চমকে উঠি।বাবাতো গেছেন,মায়ের যদি কিছু হয় আমি কোথায় দাঁড়াবো।সকালের অপেক্ষা করি।

হাসপাতালে বাবার আনুষঙ্গিক কাজ সেরে শিক্ষা অফিসের উদ্দেশ্যে যাই। ওখানে একাউন্টসে গিয়ে বাবার কাগজপত্র দেখাই। পেনশন হচ্ছে না কেনো জানতে চাই। কেউ মাথা তুলছে না দেখে হুঙ্কার ছাড়ি।আমার হুঙ্কারে কাজ হয়।অফিসের পিয়ন পর্যন্ত দৌড়ে আসে।কী ব্যাপার কী ব্যাপার!

আমার বাবার পেনশন হলো না কেনো? আজ ছয়মাস ধরে আমার বাবা এইসব ফাইলপত্র নিয়ে এই অফিসে ঘুরছেন। একজন বেঁটে মতো সে  সিনিয়র একাউন্টেন্ট নাম মফিজুর রহমান। আমাকে প্রশ্ন করে, আপনার বাবা কই?

তিনি অসুস্থ।

অসুস্থ হলে পেনশন নেবেন কেমনে?

সুস্থ যখন ছিলো তখন দিলেন না কেনো?

এবার লোকটি আমতা আমতা করে। চুলে হাত বুলিয়ে বলে,কেনো, তিনি কিছু বলেননি?

বলেছেন।পঞ্চাশহাজার টাকা চাচ্ছেন।

তো!,এই তো সব জানেন।এরপরও জিজ্ঞেস করাটা কি ঠিক?

মানে? টাকা আমার বাবার।পেনশনও আমার বাবার।আমার বাবার টাকা তুলতে আপনাদের টাকা দিতে হবে? কেনো দিতে হবে, জানতে চাই।

এতো জানা ভালো না বুঝলেন? টাকা কি আমরা খাই? যেখান থেকে পেনশন আসে ওখানে টাকা দিতে হয়, বুঝলেন?

তাই নাকি?

তাহলে ওখানকার ঠিকানা দেন আমি জিজ্ঞেস করবো কেনো তারা টাকা নেবেন? আমার বাবা শিক্ষকতা করেছেন এটা যেমন তাঁর কাজ ছিলো তদ্রূপ আমার বাবার পেনশন দেয়া এই কাজটাও আপনাদের। আপনার কাজের জন্য আপনি বেতন পাচ্ছেন।তাহলে ঘুষ চাচ্ছেন কেনো?

মফিজুর রহমান চেতে ওঠেন।চিৎকার করে বলেন,এই মিয়া বাইর হন অফিস থেকে। যতসব আবর্জনা। অফিসের পরিবেশ নষ্ট করেন। যান, আপনার বাবারে পাঠান।কথা হের লগে হবে।

আমি রেগে বলি,আমি আবর্জনা? এই ব্যাটা আমি আবর্জনা?আমি বাবার পেনশনের ফাইল টেবিলের ওপর জোরে আছাড় মেরে বলি, হায়রে, এতদিন আমি কী পরিস্কার করলাম?আসল আবর্জনা দেখি এখানে? এই ভদ্র লেবাসধারীরা যে কলম আর কাগজের পাতায় পাতায় আবর্জনার ঢিবি দিয়েছে এগুলো কেনো এতদিন পরিস্কার করিনি? কেনো কেনো? আমার মেজাজ ঠিক ছিলো না। সোজা বাসায় চলে আসি। বাবার কাগজপত্র রেখে দৌড়ালাম কাশেম কাকার কাছে। কাশেম কাকা এলাকার শ্রমিক লিডার। কন্টাক্টে যারা কাজ করে লোক লাগলে তিনি সরবরাহ করেন।গেলাম কাকার কাছে।

কাকা, পাঁচজন লোক দেন।

কি করবি?

একা আর পারি না।কিছু ময়লা সাফ করতে অইবো। ভয় নাই, আপনি পারহেড টাকা যেটা নেন আমি দেমু। ওগোরেও দিমু খাটনির টাকা। এখন আর্জেন্ট লোক চাই। কাকা আমার দৌড় দেখে কোমরে গামছা পেঁচিয়ে বলেন,কইরে, লেবু,আইজ্জা, মানিক্বা, কসাই, কালু? গেরেজ ফালা। আমগো সোহমের লগে যা। কোথায় যানি ময়লা ফেলবো। এট্টু হাত লাগা।দুই ঘন্টার কাম বাজানেরা। পয়সা পাবি। ওইহান থেইকা আইসা গেরেজে আইবি।এইটা তোগো উপড়ি কামাই। আমারে দেওন লাগবো না। পোলাডা আইচে। জরুরী।

যেই কথা সেই কাজ। বালতি বারোটি, লোহার বেলচা আর পলিথিন পায়ে বেঁধে শিক্ষা অফিসে দৌড়াই। অফিসের পাশে ময়লার ড্রেন। নেমে পড়ি ছয়জন মানুষ। বারোটি বালতিতে ময়লা ভরে পলিথিন খুলে উঠে আসি ওপরে। কি করতে হবে ওদের বলে রেখেছি। অফিসের যে রুমে তর্ক হয়েছে সেখানে ঢুকে সমস্ত ফাইল উল্টে,নথিপত্রের বান্ডেল সব ফ্লোরে ফেলে এগুলোর ওপর বারোটি বালতির ময়লা ঢেলে দিই। হাতে লোহার বেলচা। ওগুলো দিয়ে ঘেঁটে দিচ্ছি সমস্ত কাগজ। ওদের বললাম তোরা দৌড়া। আমি বাকি কাজ সেরে আসছি। ওরা দৌড়ায়। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই হতভম্ব। কী হলো সব? প্রয়োজনীয় সব কাগজ ময়লার ভাগাড়ে ভিজে ত্যানা ত্যানা হয়ে গেছে। মফিজুর রহমান তেড়ে আসে।আমি ওর কলার চেপে ধরে বলি,খবরদার, চোখ রাঙাবি না। সোজা ময়লার ভাগারে ফেলে দেবো। আমি কে জানিস? সারাদিন এসব ময়লার ভেতর থাকা লোক। আমি শহর পরিচ্ছন্ন করছি আবর্জনায় সাঁতার কেটে। আরে শালারা! আমি এই অফিসে না এলে তো বুঝতামই না,আসল আবর্জনা এখানে। পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা দেখি আবর্জনায় ঠেঁসে আছে। আমি এসব আবর্জনা পরিস্কার না করে এতদিন কিসব বালছাল পরিস্কার করেছি!শালারা! আবর্জনা দিয়েই আবর্জনা ঢেকে দিতে হয়। কীভাবে দিতে হয় দেখলি?

পুলিশ আসে। শিক্ষা অফিসের পাশেই মডেল থানা। কেউ হয়তো ফোন করে। আমাকে এ্যারেস্ট করে নিয়ে যায়। আমি থানায় বসে আছি। শুনতে পাচ্ছি আমাকে চালান করে দেবে। আমার সাথে কারা ছিলো জানতে চায়। আমি নাম বলিনি। বলবোও না। কারণ,ওরা আমার পেয়িং লেবার ছিলো। ওরা আমার আজ্ঞাবহ। পুলিশ এসব মানতে চায় না। কনস্টেবল গোছের তিনজন এসে বলে ওদের অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি দেবো।কিছু ছাড়েন।

কি ছাড়বো?

এই তো মালপানি। এট্টু বেশি করে দিলে আপনার চার্জশীট হালকা কইরা দিমু।

এবার বলি পুলিশদের, এখানেও দেখি আবর্জনায় ভরা। হায়রে কত পরিস্কার করমু আমি? যেইহানে যাই ওইহানে দেখি ময়লার ঢিবি। ওই মিয়ারা আমারে চালানের আগে একটু ছাইড়া দেন তো। যাওনের আগে থানাটা এট্টু পরিষ্কার কইরা দিয়া যাই…….।

 

রোখসানা ইয়াসমিন মণি, গল্পকার

বাজেটের সংস্কৃতি, সংস্কৃতির বাজেট

আলম খোরশেদ আর কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষিত হবে। আর অমনি শুরু হয়ে যাবে সবখানে বাজেট নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা। প-িতেরা, তথা অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার,

যৌক্তিক দাবি সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৩৫ বছর

দেশে চাকরির বাজার কত প্রকট বা দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কত তা নিরূপণ করতে গবেষণার প্রয়োজন নেই। সরকারি চাকরি বা বিসিএস ক্যাডারে আবেদনকারীর সংখ্যা দেখলেই

সংবর্ধনার জবাবে কবি মিনার মনসুর বঙ্গবন্ধু শব্দটি যখন নিষিদ্ধ ছিল তখনই আমি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করেছি

রুহু রুহেল সময়ের সাহসী উচ্চারণ খুব কম সংখ্যক মানুষই করতে পারেন। প্রতিবাদী মানসিকতা সবার থাকে না; থাকলেও সেখানে  সংখ্যা স্বল্পই। এই স্বল্পসংখ্যক মানুষের মাঝে  সৌম্যদীপ্র