এখন সময়:রাত ৮:৩৪- আজ: রবিবার-১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ৮:৩৪- আজ: রবিবার
১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

আহমদ মমতাজ : নিষ্ঠাবান চট্টল গবেষক

শাকিল আহমদ :

এক.

মমতাজ ভাই প্রয়াত এবং তাঁর স্মরণে এতো সহসাই লিখতে হবে; এমনটি ভাবতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। তবে আমার ব্যক্তি কষ্টের চাইতেও ক্ষতিটা বেশী হয়ে গেলো চট্টগ্রামের তথা বাঙলা ভাষা-সাহিত্য-ইতিহাস-ঐতিহ্যের। কারণ এসব বিষয় নিয়ে শ্রমলব্ধ কাজ করার মানুষ দিন দিন সংকুচিতই হচ্ছে। হয়তো নিকট ভবিষ্যতে খুঁজেই পাওয়া যাবে না। কারণ আমরা ক্রমে ক্রমে একটি বৈষয়িক-যন্ত্র নির্ভর সমাজ ব্যবস্থার দিকেই অগ্রসর হচ্ছি; যে সমাজব্যবস্থাতে মানুষের মগজ এবং চোখ মুঠো ফোন আর ক্ষুদে বার্তার মধ্যে আটকা পরে আছে। আমাদের মন-মগজ-চোখ স্কিনের মধ্যে আটকা পরে যাওয়া মানেই শিকড় থেকে ক্রমাগত হালকা হয়ে যাওয়া। শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানেই তো ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে দূরে কোথাও চলে যাওয়া। উদ্বেগের কথা হচ্ছে; শিকড় সন্ধানি মানুষের সংখ্যা দিন দিন যেভাবে কমছে; সেভাবে মোটেও তৈরি হচ্ছে না। তাহলে নিকট ভবিষ্যতে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছি? তাও ভাববার সময় বয়ে যাচ্ছে বৈ কি।

করোনা মহামারি পুরোবিশ্বটাকে বিপর্যস্ত করেছে; তা থেকে আমরাও পরিত্রাণ পাইনি। কিন্তু আমাদের শিল্প-সাহিত্যের আঙ্গিনাটাকে মনে হয় বেশী তছনছ করে দিয়ে গেছে। বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণেই চোখ রাখলে শিহরে ওঠার মতো বিষয়টি লক্ষণীয়। কোভিড-১৯ এই অঙ্গন থেকে উল্লেখযোগ্য অনেকেরই প্রাণ কেড়ে দিয়েছে। বাংলা একাডেমির এই শূন্যতা কবে নাগাদ পূর্ণ হবে! কিম্বা আদৌ কী পূর্ণ হবে? যদিও বিজ্ঞান ও প্রকৃতি মনে করে কোনো শূন্যস্থানই অপূর্ণ থাকে না; তথাপি বলবোÑএকজন আনিসুজ্জামান-রফিকুল ইসলাম-শামসুজ্জামান খান-হাবিবুল্লা সিরাজী-আহমদ মমতাজ কিংবা বাংলা কথাসাহিত্যের একজন হাসান আজিজুল হকের মতো ব্যক্তি তৈরি হতে এই সমাজে কত সময় লাগবে? আসলে এরা সমাজে যত্রতত্র জন্মায় না; শতাব্দীতে দু’একজন জন্মায় মাত্র।

মমতাজ ভাই কর্মসূত্রে ঢাকা অবস্থান করলেও মন কিন্তু পড়ে থাকতো চট্টগ্রামেই। কারণ তাঁর গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্রটি ছিল চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের হারানো ধারা কিংবা চাপা পড়তে যাচ্ছে এমনতর বিষয়গুলোকে জাগিয়ে তোলার এক নিরন্তর প্রচেষ্টা তাঁর পুরো কর্মের মাঝে লক্ষণীয়। চট্টগ্রামের সন্তান ছাড়াও বিশেষ করে চট্টগ্রাম কলেজ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অধ্যয়নের সময় থেকেই তাঁর মধ্যে এই চেতনাটি তৈরি হতে থাকে এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই ভাবনা মাথায় নিয়েই তাঁকে মর্তালোক ছাড়তে হলো।

করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দিন কয়েক আগেও তিনি অনেকটা অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজে মগ্ন ছিলেন বাসায়। আমার সাথে ফোনে অনেকক্ষণ আলাপ করলেন ‘আবহমান চট্টগ্রাম’ প্রকাশিতব্য পা-ুলিপিটি নিয়ে। চট্টগ্রামের লেখক-শিল্পীদের নিয়ে শ্রমলব্ধ কাজটি প্রায় চূড়ান্ত করে অল্প কিছুদিনের মধ্যে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার ধারণা পোষণ করে বললেনÑএর দ্বিতীয় খ-ের কাজও অচিরেই শুরু করবেন। তৈরি হওয়া প্রথম খ-ে রয়েছে পঞ্চাশঊর্ধ্ব চট্টগ্রামের লেখক-শিল্পীদের সৃষ্টিকর্ম ও জীবন নিয়ে আলোচনা। পরবর্তী খ-ে থাকবে পঞ্চাশের নিচে যারা চট্টগ্রামে সৃজনশীল কাজ করছেন, তাঁদের নিয়ে। কিন্তু বিধিবাম তিনি ‘আবহমান চট্টগ্রাম’ বইটি চোখে দেখে যেতে পারেননি। অথচ এই গ্রন্থের কাজ সম্পন্ন করতে অনেকটা সময় ধরে তাঁকে কি-না শ্রম দিতে হয়েছে। ঢাকা থেকে এ কাজের জন্য সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছাড়াও ছুটে আসতে হতো চট্টগ্রামে। আমি কয়েকজন লেখকের জীবনী সমেত বই পুস্তক ও পাঠিয়ে ছিলাম। এসব পেয়ে তিনি ঢাকা থেকে ফোনে জানালেন প্রাপ্ত বইয়ের মধ্যে ‘কালান্তর সাহিত্যে ফটিকছড়ির’ এক বিস্তৃত অধ্যায় এই মূল্যবান বইটি তাঁর সংগ্রহে আছে; তবে লেখক সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না।

বইটি কিভাবে সংগ্রহ করলো জানতে চাইলে বল্লেন-কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম গেলে বহদ্দারহাটের মোড়ে ফুটপাত ধরে হাটার সময় চোখে পরে ফুটপাতে সাজিয়ে রাখা পুরানো বইয়ের সারিতে শোভা পাচ্ছে চৌধুরী আহমদ ছফা রচিত বইটি। নেঁড়ে চেরে মনে হলো অনেক অজানা ও লুপ্ত প্রায় তথ্য এতে সন্নিবেশিত আছে বিধায় কিনে নিলাম। কিন্তু বইয়ে লেখকের কোনো পরিচিত ছাপা নেই।

আমি সবিনয়ে বললাম, চৌধুরী আহমদ ছফা স্বয়ং আমার পিতা; তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জিও আমি সাথে পাঠিয়েছি। শুনে যার পর নেই তিনি যুগপৎ উচ্ছ্বসিত ও আনন্দিত হয়ে আমাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন। বিষয়টি নিয়ে নিষ্ঠাবান গবেষক আহমদ মমতাজ সম্পর্কে আমরা ধারণা পোষণ করতে পারি; একজন শিকারী শকুনের দৃষ্টির মতো তিনিও জীবনচলার প্রতিটি পদক্ষেপে তীক্ষè দৃষ্টি রাখতেন তাঁর গবেষণার আকড় তথ্য সন্ধানে। তিনি শুধু নগর কেন্দ্রিক তাঁর গবেষণাকে সীমাবদ্ধ না রেখে উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে গিয়ে আকড় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। প্রথমে তাঁর জন্মভিটা মীরসরাইর পশ্চিম অলিনগর গ্রাম থেকে এই অনুসন্ধানি শ্রমলব্ধ গবেষণার যাত্রা শুরু করেন। এ ধারায় তাঁর প্রথম গ্রন্থও ছিল ‘মীরসরাইর ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি (২০০৪)। মীরসরাইর অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্যকে জানবার জন্য সামগ্রিকভাবে এটি একটি প্রকৃষ্ট গবেষণা গ্রন্থ বটে।

আহমদ মমতাজ জীবৎকালে (১৯৬০-২০২১) তাঁর যেসব গবেষণা কর্মের স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তাতে চোখ রাখলে সহজেই প্রতিয়মান হবে; চট্টগ্রামকে নিয়ে তাঁর গবেষণার পরিধি কতটা ব্যাপক। মূলত গত শতকের মধ্য আশি থেকে তিনি চট্টগ্রামকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি, লুপ্তপ্রায় জীবনাচার, ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামসহ হেন কোন বিষয়

 

 

 

নেই তাঁর গবেষণার সীমারেখায় আসেনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন দশকের গবেষণালব্ধ সৃষ্টিকর্মগুলোকে তিনি গত দুই দশক  ধরে, অর্থাৎ একুশ শতকের শূন্য দশক ও প্রথম দশক থেকে গ্রন্থভুক্ত করার প্রচেষ্টায় ব্রতি হন।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত ও প্রকাশিতব্য গবেষণা গ্রন্থসমূহের একটি ধারাবাহিক তালিকা তুলে ধরাও প্রাসঙ্গিক মনে করছি। ১. মীরসরাইর ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি (২০০৪), ২. চট্টগ্রামের সুফী সাধক, প্রথম খ- (২০০৪), ৩. চট্টগ্রামের সুফী সাধক দ্বিতীয় খ- (২০০৫), ৪. খ্যাপা খুঁজে ফেরে (২০০৬), ৫. শতবর্ষে চট্টগ্রাম সমিতি (২০১১), ৬. চট্টল মনীষী (২০১৩), ৭. শমসের গাজী (২০১৩), ৮. বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী (২০১৫), ৯. মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস চট্টগ্রাম জেলা (২০১৬), ১০. বাংলাদেশ কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধী (২০১৮), ১১. মুক্তিযুদ্ধে বীরগাথা (২০১৮), ১২. চট্টগ্রামের লোকজ সংস্কৃতি (২০২০), ১৩. বাহান্নর ভাষা সংগ্রামী (২০২০), ১৪. পলাশি থেকে ঢাকা (২০২০), ১৫. শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু (২০২০), ১৬. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ : চট্টগ্রাম জেলা (২০২১), ১৭. ভাষা আন্দোলনে চট্টগ্রাম (২০২১), ১৮. ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম (২০২১), ১৯. চট্টগ্রামের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলা (২০২১), ২০. আবহমান চট্টগ্রাম (২০২২) ইত্যাকার গ্রন্থাবলি ছাড়াও এখনো কয়েকটি গ্রন্থের প্রকাশনা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন আহমদ মমতাজ-এর সহধর্মিণী ও লেখিকা রাইহান নাসরিন। উল্লেখ্য এখানে অনেক গ্রন্থের সাথেও স্ত্রী রাইহান নাসরিনের যৌথ কাজ রয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন সাময়িকী, দৈনিক-সাপ্তাহিক পত্রিকা ও দেশি-বিদেশি জার্নালে তাঁর কয়েকশত মৌলিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে; এদের মধ্যে অনেক মূল্যবান লেখা এখনো গ্রন্থভুক্ত হয়নি। উল্লেখিত গ্রন্থ তালিকা দেখে প্রতিয়মান হয় যে, মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নিজেকে কি পরিমাণ গবেষণা কর্মে লিপ্ত রেখেছিলেন। বাংলা একাডেমির চাকুরির ফাঁকে ফাঁকে তাঁর এই বিশাল শ্রমলব্ধ কর্মযজ্ঞ দেখে আমাদের বিস্ময় জাগে।

দুই.

প্রকৃত কাজের মানুষ-গবেষণার মানুষ আহমদ মমতাজ ভাইয়ের সাথে আমারও কিঞ্চিৎ কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে। এতে তাঁর কর্মদক্ষতা, নিষ্ঠা এবং কাজের বিন্যাসের কৌশলও আমাকে যুগপৎ অবগত ও মুগ্ধ করেছে। চট্টগ্রাম কলেজ বাংলা বিভাগ প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী পুনর্মিলনী-২০১৬ এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ‘বাঙলা উৎসব’ প্রকাশনা।

এই প্রকাশনার সম্পাদনা পরিষদে ছিলেন-ড. শিরিন আখতার (বর্তমান ভিসি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়), আহমদ মমতাজ, শাকিল আহমদ, ড. আহমেদ মাওলা, চৌধুরী শাহজাহান, মোহাম্মদ আবদুস সালাম। প্রকাশনার এই কাজটি গুণগত ও দৃষ্টিনন্দনভাবে শেষ করার ক্ষেত্রে আহমদ মমতাজ ভাইয়ের ভূমিকা ছিলো মনে রাখার মতো। তিনি তখন ঢাকায় অবস্থান করলেও সেখান থেকে আমাদের (বিশেষ করে আমি ও অধ্যাপক সালামের) সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতো। যে কাজগুলো পরিষদ তাঁকে দিয়েছিলেন শত ব্যস্ততার মাঝেও যথাসময়ে সম্পন্ন করা এবং প্রকাশনাটি দৃষ্টিনন্দনও শুদ্ধভাবে প্রকাশের ক্ষেত্রে তীক্ষè নজর রাখেন।

‘বাঙলা উৎসব-১৬’ প্রকাশনার উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল-আহমদ মমতাজের রচনা-‘ চট্টগ্রাম কলেজের বাংলা বিভাগ ঃ শতবর্ষের পরিক্রমা’। ছয়ত্রিশ পৃষ্ঠার তথ্যমূলক ইতিহাসনির্ভর রচনাটিতে শুধুমাত্র বাংলা বিভাগ নয়; সমগ্র চট্টগ্রাম কলেজেরই এক আদ্যপান্ত ইতিহাসের সন্ধান মেলে। এই প্রবন্ধটির সাথে যুক্ত তাঁর সংগৃহীত প্রাচীন ছবিগুলোও ছিল সময়ের কাছে অনেক মূল্যবান। ১৯৬৩ সালে বাংলা অনার্স প্রথম ব্যাচের শেষ পর্বের ছবি যেমন আছে; তেমনি রয়েছে শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যক্ষ আবদার রশীদ ও নাট্যকার অধ্যাপক মমতাজউদ্দীন আহমদ-এর সাথে বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দের সেই সত্তরের দশকের ছবি এবং ম.আ. আওয়াল সম্পাদিত দুর্লব ‘বাংলা সংসদ পত্রিকা’ ছবিসহ বাংলা বিভাগের বিশেষ সময়ের মূল্যবান ছবিও।

তিন

আহমদ মমতাজ ভাইয়ের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে আমি মনে করি একটি অন্যতম কাজ ‘ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম’ (প্রকাশকাল-২০২১) গ্রন্থটি। বইটির শিরোনাম দেখে ধারণা জন্মাতে পারে, এটি একটি বহুল চর্চিত বিষয়। কিন্তু বইটির ভিতরে প্রবেশ করে পাঠনিতে থাকলে পাঠক মাত্রই বোধদয় হবে যে, গ্রন্থে বিষয়ের প্রচলিত ধারা থেকে অনেক তথ্যই সন্নিবেশিত হয়েছে যা ইতিপূর্বের গ্রন্থসমূহে অনেকটা অনালোচিতই রয়ে গেছে। এর মধ্যে অন্যতম কয়েকটি বিষয়ের মধ্যে একটি হলো ‘মাস্টারদা সূর্যসেন, চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ ও তৎকালীন মুসলিম সমাজ’। ৪২ পৃষ্ঠার এই নিবন্ধটিতে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে বিদ্রোহে হিন্দুদের সাথে স্থানীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সমাজেরও বিরাট ভূমিকা ছিল। অথচ এ বিষয়ক অনেক গ্রন্থ রচিত হলেও মুসলমানদের এই তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকার কথা প্রায় ইতিহাসের অন্তরালেই রয়ে গেছে। তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ইতিহাসের এই অংশটিকে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছেন এই গ্রন্থে শ্রমলব্ধ গবেষক আহমদ মমতাজ। তিনি ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনা থেকে চট্টগ্রামের যুব বিদ্রোহের বীজ রোপিত হয় উল্লেখ করে বলেন, “১৮৫৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সম্রাটের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সিপাই বিদ্রোহের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। এর প্রায় দু’মাস পর ১৮ই নভেম্বর চট্টগ্রামের সিপাহীরা বিদ্রোহ করে। পরদিন সিপাইরা চট্টগ্রাম ত্যাগ করে ও ত্রিপুরা হয়ে বৃহত্তর আসামের করিমগঞ্জ-কাছাড়া অঞ্চলে পৌঁছে যায়। ইংরেজ সেনাদের ক্রমাগত আক্রমণে বিপর্যস্ত-পর্যুদস্ত চার শতাধিক সিপাইর মতো দলনেতা হাবিলদার রজব আলী খাঁ, তাঁর বীরঙ্গনা স্ত্রী ও শিশু পুত্রের জীবনেও নেমে আসে নির্মম পরিণতি-মৃত্যু। আসামের বরাক উপত্যাকায় প্রচলিত লোকগান ও জনশ্রুতিতে শহিদ সিপাইদের আত্মত্যাগ জনমনে আজও ভাস্বর” (মুখবন্ধ-ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম)।

এই যুব বিদ্রোহে মুসলমানদের অংশগ্রহণের ইতিহাস জানতে হলে আলোচ্য গ্রন্থের শরণাপন্ন হতে হবে অবশ্যই। ‘মাস্টারদা সূর্যসেন, চট্টগ্রামের যুব বিদ্রোহ ও তৎকালীন মুসলিম সমাজ’ নিবন্ধটির উপশিরোনামগুলোতে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে। উপশিরোনামগুলো যথাক্রমেÑচূড়ান্ত হামলা ও সমসাময়িক ঘটনাবলি, বিপ্লবীদলের মুসলিম সম্পৃক্ততা, মুসলমানদের ভূমিকা ছিল প্রত্যক্ষ, কল্পনা দত্ত, অসংকোচে স্বীকার করেছেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী ঘটনা এবং উপসংহার ইত্যাদিতে চট্টগ্রামের যুব বিদ্রোহে মুসলমানদের নানাভাবে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণের বিষয়টি তথ্য-উপাত্ত সহকারে গবেষক আহমদ মমতাজ-বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন; যা ইতিপূর্বে  অন্য কোন গ্রন্থে সেভাবে ওঠে আসেনি। উপসংহারে তিনি উল্লেখ করেনÑ“ চট্টগ্রাম বিদ্রোহের পর কেটে গেছে নব্বই বছর। এই দীর্ঘ সময়ে মুসলমানদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা নিয়ে প্রচ্ছন্ন কোনো ধারণা তৈরি হয়েছে বলা যাবে না। বরং রচিত হয়েছে ধুম্রজাল। বলা হয়ে থাকেÑএ বিদ্রোহ ছিল সূর্যসেনসহ উগ্রপন্থী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের দ্বারা পরিচালিত এবং যারা ছিলেন উগ্র সাম্প্রদায়িক মানসিকতাসম্পন্ন। ব্যাপক ধারণা রয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজ এ কার্যক্রম সমর্থন করেনি, এমনকি সচেতনভাবে দূরে থেকেছে।

প্রকৃতপক্ষে মুসলমানেরা তরুণ-যুবকেরা চট্টগ্রাম বিদ্রোহের প্রাথমিক প্রস্তুতি পর্ব থেকে সম্পৃক্ত ছিলেন। সর্বশেষে সূর্যসেন গ্রেপ্তারের পর চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন। এ সময় বিপ্লবীরা তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। চট্টগ্রাম জেলার এক মুসলমান-সেপাই সেই উদ্ধার অভিযানে জড়িত ছিল। কিন্তু সেই উদ্ধার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। সেই অভিযুক্ত সিপাইর নামও পরিচয় জানা যায় না, জানা যায় না তাঁর ভাগ্যে কী ঘটেছিল” (পৃষ্ঠা ৯৬-৯৭)’।

মুসলমান সম্পৃক্ততার এরকম খ- খ- অসংখ্য তথ্য সন্নিবেশিত করা হয়েছে এসব উপশিরোনামগুলোতে। শুধু মুসলিম পুরুষ নয়; মুসলিম নারীও বিপ্লবী দলের সাথে ছিলেন এ সাক্ষ্য দেন বিপ্লবী শরবিন্দু দস্তিদার। হাবিবুল্লাহ বাহার সক্রিয়ভাবে বিপ্লবে-আন্দোলনে অংশ নেননি বটে, তবুও অর্থ আর বুদ্ধি দিয়ে তিনি বহুদিন বিপ্লব আন্দোলনকে মূল্যবান সাহায্য করেছিলেন। এসব মূল্যবান তথ্য সংযুক্ত করে আহমদ মমতাজ এই ঐতিহাসিক গ্রন্থটিকে বহু গুণে সমৃদ্ধ করেছেন। বইটির অন্যসব প্রবন্ধের মধ্যে রয়েছে- চট্টগ্রাম জেলা পরিচিতি, মহাবিদ্রোহে চট্টগ্রাম ঃ প্রেক্ষাপট ও পরিণতি, বীরের দেশে বীর কন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দার, যুব বিদ্রোহের সূর্যসাথী বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। শেষ উক্ত নিবন্ধে লেখক বিপ্লবী বিনোদ বিহারীর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করে অনেক অজানা তথ্য সন্বিবেশন করেন; এমনকি একশত তিন বছর বয়সে ২০০৮ সালে বিনোদ বিহারী চৌধুরীকে নিয়ে আহমদ মমতাজও তাঁর সহধর্মিণী রাইহান নাসরিন সেই ঐতিহাসিক জালালাবাদ পাহাড়ে পর্যন্ত গমন করেন। স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন আজ থেকে প্রায় শত বছর আগে সেই জালালাবাদ পাহাড়ের কোন স্থানে বৃটিশ সৈন্যদের সাথে সূর্যসেনের বিপ্লবীদের যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল এবং চট্টগ্রামের অনেক বিপ্লবী তরুণ প্রাণ দিয়েছিল। বিনোদ বিহারীর প্রান্ত বেলায় আহমদ মমতাজের নেওয়া এই সাক্ষাৎকার থেকে যুব বিদ্রোহের অনেক নাজানা তথ্য ওঠে আসে বিধায় ‘ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম’ বইটি একটি আকড় গ্রন্থ হিসেবেও বিবেচিত হবে।

প্রচ্ছদ শিল্পী উত্তম সেনের দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদে চট্টগ্রামের আবির প্রকাশন থেকে প্রকাশক মুহম্মদ নুরুল আবসার কর্তৃক যতœ সহকারে প্রকাশিত এই মূল্যবান গ্রন্থটি কিন্তু শ্রমলব্ধ গবেষক আহমদ মমতাজ নিজ চোখে দেখে যেতে পারেননি। অথচ এই গ্রন্থের ভূমিকাও তিনি লিখে গেছেন ২১ শে মার্চ ২০২১ সালে। গ্রন্থটি পাঠে অধিক পাঠক উপকৃত হলে পরে লেখকের শ্রম সার্থক হবে এবং তিনি বেঁচে থাকবেন পাঠকের অন্তরে।নিষ্ঠাবান চট্টল গবেষক আহমদ মমতাজ পরিপক্ষ জীবনের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেছেন ইতিহাস-ঐতিহ্যের গবেষণা কাজে। তাঁর শ্রমলব্ধ অনেক কাজ আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধারণ করেছে, ঋদ্ধ করেছে সত্য; কিন্তু জীবৎকালে তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক সম্মানে ভূষিত হওয়ার আগেই অসময়ে চলে গেলেন। অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য তিনি এই কাজ করেননি। তথাপি বলবো এতে সমাজ ও রাষ্ট্রের নিজ নিজ দায়িত্ব তো রয়েছেই। তাই আমি বলবো-মৃত্যুর পরে হলেও কাজের মূল্যায়ন স্বরূপ উপযুক্ত সম্মান দেওয়া হউক। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম সমিতি ঢাকা তাঁর ‘আবহমান চট্টগ্রাম’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বইটি প্রকাশ করে একটি মহৎ কাজের কাজ করেছে। আহমদ মমতাজ জীবৎকালে চট্টগ্রাম সমিতির অন্যতম একজন হয়ে রচনা করেছেনÑ‘শতবর্ষে চট্টগ্রাম সমিতি’ (২০১১) এবং ‘চট্টল শিখা’ স্মরণিকাটিরও একটি ঐতিহাসিক সংখ্যা সম্পাদনা করেছেন।

ঘাতক করোনা যদি এতো অসময়ে তাঁর জীবন কেড়ে না নিতো, তাহলে তিনি এই সমাজের জন্য মূল্যবান আরো অনেক কিছুই দিয়ে যেতে পারতেন। আমরা তাঁর প্রকাশনা দেখে লক্ষ করেছি করোনা চলাকালীন ২০২০ সাল থেকে তাঁর গবেষণা কাজের গতিটা কত বেগবান ছিল। তাঁর সহধর্মিণী রাইহান নাসরিনকে সাথে নিয়ে গত কয়েক বছর থেকে তিনি নানা গবেষণা তথ্য অনুসন্ধানে দেখেছি শহর থেকে গ্রামে গ্রামে কতইনা ছুটে চলেছেন। তাঁর রেখে যাওয়া অবশিষ্ট মূল্যবান কাজগুলো এখন তাঁর সহধর্মিণী লেখক রাইহান নাসরিন বাস্তবে রূপ দিতে বদ্ধপরিকর; কিন্তু তাঁকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে সমাজপতি ও রাষ্ট্রকে।

 

শাকিল আহমদ, প্রাবন্ধিক

চট্টগ্রামী প্রবাদের প্রথম গ্রন্থ : রচয়িতা জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন

মহীবুল আজিজ জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন (১৮৫২-১৯২০), সংক্ষেপে জে ডি এন্ডার্সন আজ থেকে একশ’ সাতাশ বছর আগে চট্টগ্রামী প্রবাদের সর্বপ্রাথমিক গ্রন্থটি রচনা-সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিলেন। চট্টগ্রামী

দেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই (সম্পাদকীয়- জুন ২০২৪ সংখ্যা)

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্প্রতি আমাদের দেশসহ উপমহাদেশে যে তাপদাহ শুরু হয়েছে তা থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই