এখন সময়:রাত ৮:২৪- আজ: রবিবার-১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ৮:২৪- আজ: রবিবার
১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের সমগ্রতা

মোহীত উল আলম

মান্না দে’র একটি বিখ্যাত গান গেছে এভাবে, “কাগজে লিখ নাম, সে নাম মুছে যাবে, হৃদয়ে লিখ নাম, সে নাম রয়ে যাবে।” গানটির চরণটিতে ভালোবাসার অমর হয়ে থাকার আকাঙক্ষা আছে। শেক্সপিয়ারের রচনায় এই অমরত্বের আকাঙক্ষা দু’ভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর মোট ১৫৪টি সনেটের প্রথমদিকের সনেটগুলিতে তিনি তাঁর বন্ধুকে অনুরোধ করছেন যে তিনি যেন সহসা বিয়ে করেন। বিয়ে করলে বাচ্চা আসবে, বাচ্চারা তাঁর অপূর্ব মুখশ্রী উত্তরাধিকারসূত্রে পাবে, এবং সেভাবেই তিনি অমরত্ব লাভ করতে পারবেন। এটি হলো জৈবিকভাবে অমরত্ব লাভ করার পথ। কিন্তু তাঁর বিখ্যাত সনেট ১৮, এবং ৬৫ সংখ্যক সনেটে তিনি অমরত্বের ধারণা বিস্তৃত করেছেন এভাবে যে, দুনিয়ার সকল কিছু লয়প্রাপ্ত হয়। প্রকৃতি সততই পরিবর্তনশীল, শীত, গ্রীষ্ম, শরৎ, বসন্ত মিলে প্রকৃতিতে পরিবর্তনের খেলা চলছে নিরন্তর, তেমনি পাথর ক্ষয়ে যাবে, নদীর ¯্রােত বদলে যাবে, কিন্তু যতদিন মানুষ বাঁচবে এবং চোখে দেখবে, ততদিন তাঁর কবিতার মাধ্যমে তাঁর বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা টিকে থাকবে, এবং সে ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষ তাঁর বন্ধু সম্পর্কে জানতে পারবে, এবং এই কাব্যিক উপস্থিতির মাধ্যমে তাঁর বন্ধু অমরত্ব লাভ করবে: ‘দ্যাট ইন ব্ল্যাক ইন্ক মাই লাভ মে স্টিল শাইন ব্রাইট’। একটু বলে রাখি, শেক্সপিয়ারের সময় ইউরোপের দেশগুলোতে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে পুরুষ মানুষ এবং পুরুষ মানুষের বন্ধুত্ব বেশ নিবিড় হতে পারত, শারীরিকভাবে পরস্পরের কাছাকাছি যাবার ব্যাপারটাও খানিকটা স্বীকৃত ব্যবহার ছিল। শেক্সপিয়ারের সমগ্রতা হলো তিনি যেমন কল্পনার ডানায় চেপে অত্যুৎস্পর্শী স্তরে নাটকের দর্শকদের নিয়ে যেতে পারতেন, তেমনি একেবারে ভূমি-সংলগ্ন বাস্তবতায় টেনে নামাতে পারতেন। কল্পনার ব্যবহারের এই ক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করে আ মিডসামার নাইটস ড্রিম-এর অন্যতম চরিত্র ডিউক থিসিউস অনেকটা তির্যক ভঙ্গিতে বলছেন, কবিরা যা ইচ্ছা তা তৈরি করতে পারে। যেখানে কোন কিছু ছিল না, সেখানে পর্বত, সেখানে ইমারত গড়ে তুলতে পারে, তাদের উর্বর কল্পনাশক্তির পক্ষে সব সম্ভব: ’এ্যান্ড এ্যাজ ইমাজিনেশন বডিজ ফর্থ’। অন্য আরেকটি নাটক কিং লিয়ার-এ অন্ধ হয়ে যাওয়া পিতা গ্লস্টারের সঙ্গে আচম্বিৎ দেখা হয় তাঁর পুত্র এডগারের সঙ্গে। পিতা পুত্রের মধ্যে সৎপুত্র এডমান্ডের ষড়যন্ত্রের ফলে বিরোধ তৈরি হয়েছিল, ফলে এডগার পলাতক ছিল। এদিকে এডমান্ডের ষড়যন্ত্রের কারণে তার নিজের পিতা গ্লস্টারের চোখ দুটো খুব নির্মমভাবে উপড়ে নিয়েছিল লিয়ারের মেঝ মেয়ে রিগানের স্বামী ডিউক কর্নওয়াল, এবং গ্লস্টারকে তাঁর নিজের প্রদেশ থেকে বিতাড়িত করে দেয়। তাই গ্লস্টার এখন আশ্রয়হীনভাবে ঘুরছিলেন এবং এডগারের কাছে আত্মহত্যা করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। গ্লস্টার পুত্রকে চিনতে পারেন না, কারণ একেতো তাঁর চক্ষু উপড়ে ফেলানো, আর এডগার তার কণ্ঠস্বর বদলে ফেলেছে, যাতে পিতা তাকে চিনতে না পারেন। এডগার যে কোন কারণে নিজের পরিচয় পিতার কাছে উন্মোচন না করে বলে যে গ্লস্টার এখন ডোভার উপকূলের চূড়ায় আছেন, এবং তিনি একটি লাফ দিলেই বহু নীচে সমুদ্রে পড়ে ভবলীলা সাঙ্গ করতে পারবেন। গ্লস্টার লাফ দিলেন, এবং পড়লেন আসলে ঐ সমতল ভূমিতেই। কিন্তু তখন এডগার তার নিজের কন্ঠস্বর এবার একজন জেলের কণ্ঠস্বরের রূপ ধরে বললেন, আরে আপনি কে, এত উঁচু থেকে পড়লেন, যেখানে আকাশে উড্ডয়নরত চিলকে পর্যন্তু বিন্দুবৎ মনে হচ্ছিল, আপনি এত উঁচু থেকে পড়লেন, অথচ দিব্যি বেঁচে রইলেন, আমার সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে পারছেন। এটি এক পরম বিস্ময়ের ব্যাপার: ‘দাই লাইফ ইজ আ মির‌্যাকল। স্পিক ইয়েট এগেইন।’

ব্যাপারটা কী? ব্যাপারটা হলো শেক্সপিয়ার এডগারের মাধ্যমে এমন ্একটি কল্পলোক তৈরি করলেন যে গ্লস্টার বিশ্বাস করলেন যে তিনি খুব উঁচু একটি পাহাড় থেকে লাফ দিয়েও বেঁচে আছেন। আবার ভূমি-সংলগ্ন যে বাস্তবতার কথা বলেছিলাম, সেটি আসছে দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস নাটকে। বাসানিওর খুব টাকার দরকার তার প্রেয়সী পোর্শিয়ার প্রেমপ্রার্থী হতে। বন্ধু এ্যান্টোনিওর কাছে সে টাকা ধার চায়। এ্যান্টোনিও জিজ্ঞেস করে কেন টাকা লাগছে তোমার। বাসানিও বলে, “ইন বেলমন্ট ইজ আ লেডি রিচলি লেফট।” বেলমন্ট দ্বীপে খুব ধনাঢ্য একজন নারী আছেন অবিবাহিতা। এ্যান্টোনিও সওদাগর মানুষ। বলে, আমার কাছে এখনতো টাকা নেই, আমার সবগুলো জাহাজ পণ্য নিয়ে পৃথিবীর নানান বন্দরে আটকে আছে, সেগুলি ফেরত আসলে মালামাল বিক্রি করে তোমাকে টাকা দিতে পারব। তুমি এর মধ্যে অন্য কারও কাছ থেকে আমার নাম পুঁজি করে টাকা ধার নিতে পার কিনা দেখ। বাসানিও যায় ইহুদী শায়লকের কাছে, যার ব্যবসা ছিল সুদে টাকা ধার দেওয়া। শায়লক বলে, তোমাকে যে টাকা ধার দেব, শোধ দেবে কীভাবে? বাসানিও বলে, আমার বন্ধু এ্যান্টোনিও আমার পক্ষে টাকা শোধ করবে। তার জাহাজগুলি এখনও ফেরেনি, ফিরলেই তিন মাসের মধ্যে টাকা ফেরত দিয়ে দেব। তখন শায়লক বলে, তিন মাসের মধ্যে এই তিন হাজার ডাকাট (টাকা) যে ফেরত দেবে, কিংবা জাহাজগুলি যে ফেরত আসতে পারবে তার নিশ্চয়তা কী? জাহাজ মাত্রই কাঠের পাটাতনে তৈরি, নাবিক মাত্রই মানুষ, স্থলে যেমন ইঁদুর আছে, সমুদ্রেও আছে, জাহাজটিকে ইঁদুরে কাটতে পারে, বা জাহাজ জলদস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে, বা সমুদ্রঝড়ে নিপতিত হতে পারে, কিংবা শিলা পর্বতের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে এটির তলদেশ ফুটো হয়ে যেতে পারে, কাজেই খ্রিস্টান এ্যান্টোনিওকে সাক্ষী মানতে গেলে তার (শায়লক) আরও কঠিন শর্তের দরকার । সে শর্তটা কী? সেটা হলো, এ্যান্টোনিও যদি তিন মাসের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে অপারগ হয় তা হলে শায়লক তার শরীরের যে কোনো জায়গা থেকে এক পাউন্ড মাংস খুবলে নিতে পারবে এইরকম একটা আইনসঙ্গত চুক্তি করতে হবে। এখানে শায়লকের ধূর্ততার তলায় যে বাস্তবতার জ্ঞানের পরিচিতি পাই সেটি কম মুখ্য নয়।

ছদ্মবেশের মাধ্যমে লিঙ্গান্তর, অর্থাৎ পুরুষ নারীর বেশ নেয়া, বা নারী পুরুষের বেশ নেয়া খ্রিস্টান ধর্মীয় দিক থেকে নিষিদ্ধ ছিল, যেটা নিয়ে রেনেসাঁর প্রাক্কালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প-িতের মধ্যে বিতর্কও চলেছিল। কিন্তু এলিজাবেথীয় যুগে ইংরেজি সাহিত্য স্বর্ণ যুগে প্রবেশ করলে, মঞ্চাভিনয় হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক আনন্দের প্রধান উপকরণ। কিন্তু মহিলা চরিত্রে অভিনয় করতে সচরাচর নারী অভিনেত্রী পাওয়া যেত না। নারী মঞ্চে অভিনয় করা তখন আইনত নিষিদ্ধ ছিল না, কিন্তু প্রথাগতভাবে নারীরা পাবলিক নাট্যমঞ্চে অভিনয় করত না। নাট্যদলগুলোকে তখন যে সব বালক অভিনেতার তখনও কণ্ঠ ভাঙেনি, অর্থাৎ যে সব বালকদের তখনও নারী কণ্ঠের মতো কোমল কন্ঠ রয়ে গেছে, এইসব অভিনয়ক্ষমতাসম্পন্ন বালকদেরকে নারী-চরিত্রে অভিনয় করার জন্য বেছে নেওয়া হতো। শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত সব নারী চরিত্র যেমন ক্লিওপেট্রা, ওফেলিয়া, ডেসডিমোনা, হার্মিয়া, রোজালিন্ড, মিরান্ডা সবাই পাবলিক থিয়েটার গ্লোব মঞ্চে অভিনয় করার সময় ছিল ছেলে। শেক্সপিয়ারের সমসাময়িক নাট্যকারেরা এই ছদ্মবেশ পদ্ধতিকে কাহিনি উপস্থাপনের কেবল একটি মঞ্চ-কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু শেক্সপিয়ার এই কৌশলটিকে শুধু একটি বাহ্যিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার না করে এটির গুরুত্ব কাহিনির সঙ্গে মিশিয়ে দেন, তখন ব্যাপারটা দাঁড়ালো এই যে পুরুষ যখন নারীর চরিত্রে অভিনয় করে তখন তার মনস্তাত্ত্বিক জগতে কীরূপ ক্রিয়া-প্রক্রিয়া হয় সেটিও শেক্সপিয়ার দেখাতে উদ্যোগী হন। আমরা এ্যাজ ইউ লাইক ইট নাটকের রোজালিন্ডের মনোভাব এখানে উল্লেখ করতে পারি। নাটকটির প্রথম দিককার অভিনয়ের সময় রোজালিন্ডরূপী চরিত্রটিতে অভিনয় করেছিল নিশ্চিত একজন বালক-অভিনেতা। তারপর সে রোজালিন্ডের চরিত্রে অভিনয় করতে নারীর বেশ নেয়। আবার কাহিনির প্রয়োজনে যখন সে গানিমিডের নাম গ্রহণ করে পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করে, তখন প্রকৃত বালক অভিনেতাটি আবার পুরুষ হয়ে পড়ে। আবার যখন রোজালিন্ড গানিমিডরূপে তার প্রেমিক অরল্যান্ডোর কাছে বলে যে প্রেমে দীক্ষা নিতে চাইলে গানিমিড রোজালিন্ডের চরিত্র পরিগ্রহ করে তাকে শেখাবে কীভাবে প্রেম বিনিময় করতে হয়। অর্থাৎ, প্রকৃত মঞ্চাভিনেতা বালকটি প্রথমে নারীর রূপ, তারপর পুরুষের রূপ, তারপর আবার নারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে মোট চারবার লিঙ্গ-পরিচিতি বদলায়। কিন্তু শেক্সপিয়ার ব্যাপারটি এখানে ছেড়ে দেন না। তিনি বরঞ্চ লিঙ্গান্তরের পর্যায়ে যে মনস্তাত্ত্বিক রসায়ন কাজ করে সেটি বিধৃত করতে মনোযোগী হন। তাই, তার বোন সিলিয়া যখন রোজালিন্ডকে অরল্যান্ডোর নাম প্রকাশ করতে গিয়েও দুষ্টুমি করে উহ্য রাখে, তখন রোজালিন্ড সরোষে বলে যে সিলিয়া কি মনে করে নাকি যে সে বাইরে পুরুষের ছদ্মবেশ নিয়েছে বলে তার ভিতরের নারীসত্তাকে বিসর্জন দিয়েছে: ’ডাস্ট দাউ থিংক দো আই এ্যাম ক্যাপারিজনড লাইক আ ম্যান আই হ্যাভ আ ডাবলেট এ্যান্ড হৌজ ইন মাই ডিসপোজিশন?’ অর্থাৎ নারীরা যেমন প্রেমের সময় আবেগতভাবে কাতর থাকে, রোজালিন্ড পুরুষের ছদ্মবেশ ধারণ করলেও সেইতো নারীই!

রোজালিন্ডরূপী বালক-অভিনেতাটি যে দক্ষ একজন অভিনেতা ছিল সেটি নিশ্চিত, এবং বালক-অভিনেতা দলগুলি এক পর্যায়ে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল যে তা’তে বড়দের নাট্যদলগুলো নিজেদের ব্যবসা নিয়ে শংকিত হয়ে ওঠে। হ্যামলেট নাটকে এই শংকার একটি চিত্র পাই। এলসিনোর প্রাসাদে একটি ভ্রমণরত বড় নাট্যদল এসে পৌঁছায়। হ্যামলেট তার মেকী বন্ধু রোজেনক্রান্টসকে জিজ্ঞেস করেন, এরা শহর ছেড়ে প্রত্যন্ত এলাকায় এসেছে কেন? রোজেনক্রান্টস উত্তরে বলে যে কিছু ছোট পাখি (‘লিটল আয়াসিস”) তাদের অভিনয় গুণ দিয়ে বড় পাখিদেরকে ডেরা ছাড়া করেছে। তখন হ্যামলেট কটাক্ষ করে বলছেন যে তারা তো তাহলে তাদের ভবিষ্যতের বিরুদ্ধেই কাজ করছে, কেননা একদিন এ ক্ষুদে অভিনেতারাতো বড়দের দলে ঢুকবে। তা হলে?

তবে শেক্সপিয়ারের সমগ্র রচনায় সবচেয়ে ব্যাকুল হয়ে যে চিন্তাটি প্রোথিত আছে, সেটি হলো রাজ্যশাসন। রাজ্যশাসন শুধু যে প্রারম্ভিক আধুনিক ইউরোপে বা রেনেসাঁ যুগে শেক্সপিয়ারের একার চিন্তা ছিল তা নয় এটি ম্যাকিয়াভেলি, এরাসমাস, স্যার টমাস এলিয়ট, ফান্সিস বেকন প্রায় সবারই চিন্তার কেন্দ্রে ছিল। কারণ রেনেসাঁ যুগে ইউরোপ মধ্যযুগের ধর্মীয় প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে ব্যক্তিমানুষের মানসিক স্বাধীনতা ও বিকাশের ওপর বিশেষ নজর দিতে শুরু করে। রাজ্যশাসনও ধর্মীয়প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে ক্রমশ মানুষের জীবনধর্মী একটি চর্চার দিকে এগুতে থাকে, যেখানে রাজ্যশাসনের মূল কর্তা রাজা বা নৃপতির চরিত্রের দিকে বিশেষ মনোযোগ ধাবিত হয়। শেক্সপিয়ারের পূর্বসূরি এলিয়ট “দ্য গভর্নর” নামক একটি পুস্তকে রাজ্যশাসকের চরিত্রের ওপর নৈতিকতামূলক একটি বক্তব্য রাখেন, যেটিরই অনুসরণে শেক্সপিয়ারের জীবিতকালে দ্বিতীয় নৃপতি রাজা জেইমস ১ম (যিনি ছিলেন স্কটল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জেইমস, একই ব্যক্তি) ১৫৯৯ সালে ব্যাসিলিকন ডরন গ্রন্থটি লেখেন যেটিতে তাঁর ছেলে যুবরাজ হেনরিকে উদ্দেশ করে বলেন যে রাজ্য হলো ভগবানের প্রদত্ত একটি বর, তাই ঐশ্বরিক প্রভার আলোকে রাজ্যশাসন করতে হবে। জেইমসের এই ধারণাটি হলো যে রাজা মর্ত্যের মানুষ হলেও ঈশ্বর তার গুণাবলী রাজার ওপর বর্তে দেয়, ফলে মর্ত্যরে রাজা হলো দ্বৈতসত্তার অধিকারী, যিনি একাধারে মানুষ এবং আবার ঐশ্বরিক গুণপ্রাপ্ত। রাজার ডিভাইন মোনার্কি বা ঐশ্বরিক সত্তা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন আর্নেস্ট ক্যান্টোরিজ তাঁর  ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত রাজার দ্বৈতসত্তা বা “দ্য কিংস টু বডিজ” গ্রন্থে, যেখানে তিনি বলেন যে মধ্যযুগ থেকে শুরু করে প্রারম্ভিক আধুনিক যুগ পর্যন্ত যে পোক্ত ধারণাটি প্রচার পেয়েছিল সেটি হলো রাজার যেটি কালিক বা কায়িক সত্তা, বা বডি ন্যাচার‌্যাল সেটির লয়, ক্ষয় আছে, বা সেটি মৃত্যুর দিক থেকে রাজাকে অন্য দশজন মানুষের সঙ্গে আলাদা করে দেখে না, কিন্তু যেটি তার রাষ্ট্রীয় সত্তা বা বডি পলিটিক, সেখানে তার লয় নেই। কিন্তু ক্যান্টোরিজ এই মন্তব্যও করেন যে ইউরোপের রাজন্যবর্গ এই তত্ত্বটিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখে, এবং প্রচার করে যে রাজার সত্তা হলো পবিত্র, এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অর্থ হচ্ছে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, যা হবে কার্ডিনাল সিন বা অমোচনীয় পাপ। রাজা জেইমস রাজার দৈবসত্তার ধারণায় স্থির বিশ্বাসী ছিলেন, এবং সেভাবেই তিনি তাঁর গ্রন্থগুলো লেখেন। অন্য দিকে শেক্সপিয়ারের জীবিতকালে তাঁর প্রথম নৃপতি রানি এলিজাবেথ ছিলেন খুব চতুর প্রকৃতির। তিনি রাজার ঐশ্বরিক সত্তার ধারণাটি সর্বত্র প্রচার করার জন্য নিয়ম করে দেন যে প্রতি রবিবার চার্চে প্রার্থনার সাথে সাথে একটি সারমন বিশপেরা সমবেত প্রার্থনাকারীদের উদ্দেশ্যে পড়বেন, যে সারমনটি হলো, “রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীদের জন্য কী শাস্তির বিধান রেখেছেন ঈশ্বর” তার বিবৃতি: ‘দ্য হোমিলি এগেইনস্ট ডিসঅবিডিয়েন্স অ্যান্ড উইলফুল রেবেলিয়ন’।

রাজার এই প্রচলিত ধর্মীয় সংজ্ঞা যখন প্রকৃতই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবার রাস্তা তৈরি হতে থাকে তখন শেক্সপিয়ার তাঁর নাটকগুলোতে এই বিষয়টি নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনায় নামলেন। তাঁর প্রথম দিককার নাটক রাজা জন-এ বাস্টার্ড বা ফিলিপ ফ্যালকনব্রিজের মুখ দিয়ে বলছেন যে রাজার প্রকৃতি, যেটি ম্যাকিয়াভেলিও বলে গেছেন, যে রাজারাও সাধারণ মানুষের মতোই বস্তুকেন্দ্রিক স্বার্থ নিয়ে বিচরণ করে। বাস্টার্ড এই বস্তুকেন্দ্রিকতার নাম দেন কমোডিটি, যে শব্দটি বর্তমান যুগেও বস্তুবাদিক চিন্তার প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সে জন্য রাজার মুকুট, শিরস্ত্রান, সিংহাসন এবং রাজদন্ড এগুলি রাজার মাহাত্ম্য প্রদর্শনকারী উপকরণ হলেও, এগুলির বস্তুতান্ত্রিক নির্দেশ যেমন ক্ষমতা, ভূমি, প্রভাব, প্রভাববলয় এবং আর্থিকতার প্রতি রাজারা উদাসীন থাকেন না।

শেক্সপিয়ারের সামগ্রিক জীবনদর্শনের মধ্যে যেটি স্পষ্ট সেটি হলো তিনি মানবচরিত্রের নিগূঢ় দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করবেন, কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যু নাট্যায়িত করবেন, কিন্তু আঙুল দেখিয়ে বলা যাবে না যে শেক্সপিয়ার জীবনের কোনো সূত্রকে একমাত্রিক বা সার্বভৌম মনে করতেন, কিংবা মনে করতেন বিকল্পবিহীন। তিনি বিশ্লেষণ করবেন চুলচেরা, কিন্তু সিদ্ধান্তটি দর্শক বা পাঠকের। যেমন বাস্টার্ডের ধারণা অনুযায়ী যদি রাজা কেবলই কপট হোন, তা হলে কি ভালো চরিত্রের রাজা বলে কিছু থাকবে না? ম্যাকিয়াভেলি মনে করতেন, এন্ডস জাস্টিফাই দ্য মিনস, বা লক্ষ্য অর্জন করতে পারাটাই লক্ষ্য, কোন পন্থায় সেটা হলো সেটি বড় প্রশ্ন নয়। সেজন্য তিনি বলেছিলেন, রাজার একটি বাহ্যিক জনজীবন থাকবে, যার সঙ্গে তার অন্তরজীবনের কোন সম্পর্ক নেই। যেমন তিনি যদি বাইরে সামাজিক জীবনে দক্ষ রাজা হোন, ব্যক্তিগত জীবনে তার জীবন কদাকার হলেও কিছু এসে যাবে না। সে জন্য তিনি অনেকটা প্রবচণের মতো করে বলেছিলেন, একজন সৎ কিন্তু অদক্ষ রাজার চেয়ে একজন অসৎ কিন্তু দক্ষ রাজা সমাজের জন্য ভালো। কিন্তু রাজাদের চরিত্র চিত্রায়নে আমরা দেখি শেক্সপিয়ার এই মত গ্রহণ করেন নি, তিনি বরঞ্চ জোর দিয়েছেন যে রাজাকে শুধু রাষ্ট্রীয় জীবনে সৎ হলে চলবে না, তাকে ব্যক্তিগত জীবনেও সৎ হতে হবে। (তবে ম্যাকিয়াভেলির যে সব ধারণার কথা ওপরে বললাম, সেগুলি ইংরেজ অনুবাদকেরা তাঁদের ইচ্ছেমতো মূল ধারণার আলোকে ভ্রষ্ট করে নিজেদের পক্ষপাতমূলক মতাদর্শটি প্রচার করেছেন। সে জন্য তাঁর প্রতিপাদ্য গ্রন্থ দ্য প্রিন্স বা এল প্রিন্সিপি মূল ভাষায় এত সরাসরিভাবে এই ধরনের কথাগুলি বলেননি, বলেছেন একটি ব্যাপক প্রেক্ষাপটের আলোকে।)

যা হোক, রাজার দ্বৈতসত্তার ধারণাটির নাট্যায়নের জন্য শেক্সপিয়ারের উদ্দিষ্ট নাটকটির নাম হচ্ছে রাজা ২য় রিচার্ড। রিচার্ড রাজার ঐশ্বরিক সত্তার ধারণায় এত বেশি পরিমাণে বিশ্বাস করতেন যে যখন তাঁর বিরুদ্ধে তাঁর চাচাতো ভাই বোলিংব্রুক বা ভবিষ্যতের রাজা চতুর্থ হেনরির বিদ্রোহ তাঁর ক্ষমতা থেকে বিচ্যুতির কারণ হয়ে দাঁড়ালো তখনও তিনি ভাবছেন যে ঈশ্বর তাঁকে রক্ষা করবেন। কিন্তু ঈশ্বর তাঁকে রক্ষা করেন নি, যার ফলে শেক্সপিয়ার এই সমীকরণে পৌঁছালেন যে শুধু ডিভাইন মোনার্কি বা ঐশ্বরিক রাজতন্ত্র রাজাকে রক্ষা করতে পারবে না, যদি রাজা রাজ্য শাসনের মৌলবিষয়গুলোর দিকে নজর না দেন। কিন্তু এই কথাটি স্বীকার করেও শেক্সপিয়ার ২য় রাজা রিচার্ড-এ একটি বিষম মোচড় দিলেন, আর সেটি হলো রাজা রিচার্ড পরাজিত রাজা হলেও তিনি হয়ে গেলেন নাটকটির হিরো, কারণ শেক্সপিয়ার তাঁর রাজ্য হারানোর ঘটনাটির সঙ্গে রাজা রিচার্ডের গভীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এত চমৎকার সংবেদনশীলতা দিয়ে রিচার্ডের উক্তির পর উক্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশ করলেন যে বোলিংব্রুক রাজ্যবিজয়ী হলেও রিচার্ডের চরিত্রের দার্ঢ্যরে কাছে বোলিংব্রুক নেহায়তই একজন সাধারণ স্বার্থবাদী চরিত্র হিসেবে প্রকাশ পায়। অর্থাৎ, যুক্তি দিয়ে আমরা বোলিংব্রুকের ক্ষমতার প্রতি লোভটি বুঝতে পারি, কিন্তু হৃদয় দিয়ে রিচার্ডের রাজ্য হারানোর বেদনাটি উপলব্ধি করতে পারি। যেমন এ্যান্টোনি এ্যান্ড ক্লিওপেট্রা নাটকে আমরা অক্টেভিয়াস সিজারের বিজয়ের কারণটা যুক্তি দিয়ে অনুধাবন করতে পারি, কিন্তু এ্যান্টোনি ও ক্লিওপেট্রার পতনটি হৃদয় দিয়ে অনুভব করি।

শেক্সপিয়ার তাঁর পরবর্তী অনেকগুলো নাটকে, যেমন রাজা ৩য় রিচার্ড, হ্যামলেট, কিং লিয়ার, ম্যাকবেথ ও এ্যাজ ইউ লাইক ইট ও তাঁর শেষ নাটক বলে কথিত দ্য টেম্পেস্ট নাটকে, তিনি বোলিংব্রুকের ন্যায় যাঁরা বৈধ রাজা রিচার্ড ২য়কে উৎখাত করার মতো কাজ করেছেন যেমন হ্যামলেট নাটকে ক্লডিয়াস যিনি তাঁর ভ্রাতা সিনিয়র হ্যামলেটকে হত্যা করে রাজা হয়েছেন, বা ম্যাকবেথ নাটকে ম্যাকবেথ তাঁর বৈধ রাজা ডানকানকে খুন করে রাজা হয়েছেন, বা এ্যাজ ইউ লাইক ইট এবং দ্য টেম্পেস্ট নাটকে বড় ভাই ডিউক সিনিয়রকে তাঁর ছোট ভাই ফ্রেডারিক কিংবা প্রসপেরোকে তাঁর ছোট ভাই এ্যান্টোনিও ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করে রাজা বা ডিউক হন তখন এই ইউজারাপর বা অবৈধ সিংহাসন দখলকারীদের প্রত্যেককেই শেক্সপিয়ারের নাটকগুলোতে শেষ পর্যন্ত চরম যন্ত্রণা, পরাজয় ও মৃত্যু স্বীকার করে নিতে হয়।

শেক্সপিয়ারের খল চরিত্রগুলোর মধ্যে জুলিয়াস সিজার নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ব্রুটাসের কথা উল্লেখ করতে হয়। তাঁর পক্ষে রাজা ৩য় রিচার্ডের মতো খলনায়ক হবার উপায় ছিল না। কেননা, ৩য় রিচার্ড যেমন বলেছিলেন, সিংহাসনটি পাবার জন্য আমার বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে ঐটির যে দূরত্ব সেটি আমি তরবারি দিয়ে মাঝখানের লোকগুলোকে হত্যা করে কমিয়ে ফেলব: ‘টরমেন্ট মাইসেল্ফ টু ক্যাচ দ্য ইংলিশ ক্রাউন / অর হিউ মাই ওয়ে আউট উইথ আ ব্লাডি এক্স।’ কিন্তু ব্রুটাসের মধ্যে সেরকমের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ ছিল না সিজারকে হত্যা করার প্রচেষ্টা হাতে নেবার পর। তিনি সিজারকে রোমান প্রজাতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করতেন। ভেবেছিলেন সিজার যখন এতই জনপ্রিয় তখন তিনি স¤্রাট হলে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। সে ভয়ে তিনি সিজারকে হত্যা করতে ষড়যন্ত্র করেন। তাঁর ষড়যন্ত্রের সহযোগী ক্যাসিয়াস, কাসকা, মেটুলাস সিম্বার প্রমুখ সিনেটরকে বারবার সাবধান করে দেন, খবরদার, মনে রাখবা, আমরা সিজারকে কোনো ব্যক্তিগত অভিলাষ থেকে হত্যা করছি না, আমরা তাঁকে রোমান প্রজাতন্ত্রের শত্রু হিসেবে বলী দিচ্ছি: ‘উই শ্যাল বি কলড পার্জার্রস, নট মার্ডারার্স’। ব্রুটাস যেমন হত্যাকা- ও বলী দেবার মধ্যে একটি সূক্ষ¥ ব্যবধান করলেন যে হত্যাকান্ড হচ্ছে যেটা খুনিরা করে আর বলীদান হচ্ছে পাপ মোচনার্থে বা সংশোধনার্থে ধর্মীয়ভাবে প্রাণি উৎসর্গ করা। ব্রুটাসের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মধ্যে এই গড়মিলটা ধরা পড়ে নি যে হত্যাকা- বলুন আর বলীদান বলুন প্রাণটাতো গেল জুলিয়াস সিজারের। ওথেলো ব্রুটাসের মতোই ভুল ভাবলেন যে ডেসডিমোনাকে পাপাচারিণী বলে হত্যা করলে সেটি বলীদান নয় হত্যাকা-ই হবে। যা হোক, এই উচ্চ পর্যায়ের চিন্তা-ভাবনা করার জন্যই ব্রুটাসকে তাই শেক্সপিয়ারের অন্যান্য খলনায়কদের সঙ্গে একই কাতারে ফেলা যায় না।

শেক্সপিয়ারের মহানায়কদের মধ্যে ম্যাকবেথ একটি বিপরীতধর্মী চরিত্র। সে হিরো, কিন্তু সে ভিলেনও। সে হ্যামলেট-এর ক্লডিয়াসের মতো রাজা হত্যাকারী, ভ্রাতৃহত্যাকারী, এবং নরহত্যাকারী,  কিন্তু যেখানে ক্লডিয়াস নিতান্তই ভিলেন, সেখানে ম্যাকবেথ ভিলেন থেকে হিরোতে পরিণত হয় তার অপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার জন্য। হ্যামলেট যেমন বিখ্যাত তার মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার জন্য, তেমনি ম্যাকবেথও। দুই চরিত্রই তাঁদের গভীর মনযন্ত্রণা নানান বিখ্যাত স্বগতোক্তির মধ্যে বলে গেছেন। হ্যামলেট যেমন বিখ্যাত তাঁর ‘টু বি অর নট টু বি’ স্বগতোক্তির জন্য, তেমনি ম্যাকবেথ বিখ্যাত তঁঁাঁর ‘ট ুমরো, টু মরো, টু মরো’ স্বগতোক্তির জন্য। এমনও বলা হয় যে ম্যাকবেথকে পুরোপুরি ম্যাকিয়াভেলির খলনায়ক হিসেবে চরিত্রায়ন না করে শেক্সপিয়ার তাঁর মধ্যে তাঁর সময়কার বিখ্যাত মানবতাবাদী দার্শনিক রিচার্ড হুকারের মানবতন্ত্র মিশিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে ম্যাকবেথ হয়ে পড়ল ভিলেন-হিরো বা হিরো-ভিলেন।

আরেকটা কথা বলতে হয়। ইংল্যান্ডের রাজারাজন্যের ইতিহাস পরিবার ও বংশভিত্তিক। যেমন বৈধ রাজা ২য় রিচার্ডকে যে বোলিংব্রুক অপসারণপূর্বক পরে হত্যা করেন সে বোলিংব্রুক ছিলেন রিচার্ডের ৫ম চাচা ডিউক জন অব গন্টের বড় ছেলে। অর্থাৎ চাচাতো ভাই-ভাইয়ের বিরুদ্ধে নামলো। তাই রাজ্য দখল যে বরাবরই একটি পারিবারিক বা বংশীয় ব্যাপার ইতিহাসের এই প্রকরণটি শেক্সপিয়ার তাঁর ট্র্যাজেডি ও কমেডিতেও অনুসরণ করেন। যেমন হ্যামলেটের পিতাকে হত্যা করেন তাঁরই আপন ভাই ক্লডিয়াস। রাজা লিয়ার সিংহাসন থেকে বিতাড়িত হন তাঁরই আপন বড় দুই মেয়ের দ্বারা। ম্যাকবেথ যাঁকে খুন করে স্কটল্যান্ডের রাজা হন সে  রাজা ডানকান ছিলেন ম্যাকবেথের আপন খালাতো ভাই। কমেডিগুলোর মধ্যে এ্যাজ ইউ লাইক ইট-এ ডিউক সিনিয়র তাঁর আপন ছোট ভাই ফ্রেডারিক কর্তৃক বিতাড়িত হন, আর দ্য টেম্পেস্ট নাটকে প্রসপেরো তাঁর আপন ছোট ভাই এ্যান্টোনিওর দ্বারা বিতাড়িত হন। আর, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বলছি, আমাদের অঞ্চলে নবাব সিরাজউদ্দৌলা তাঁর নিকট আত্মীয়স্বজনের ষড়যন্ত্রের কাছে পরাজিত হন এবং জীবনটি হারান।

আরেকটি কথা বলে আলোচনাটি  শেষ করব। শেক্সপিয়ারের রচনায় খ্রিস্টিয়ানিটির একটি বড় স্তম্ভ দয়া বা মার্সি বিরাট একটা জায়গা দখল করে রেখেছে। যেখানে বিচার এবং দয়া একটি মুখোমুখি সাংঘর্ষিক অবস্থানে এসেছে সেখানে তিনি মতবাদ দিয়েছেন যে বিচারের কাঠিন্যকে দয়া দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে। দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস নাটকে শায়লককে যখন পোর্শিয়া এ্যান্টোনিওর প্রতি অনুকম্পা দেখাতে বলে, তখন তার বিখ্যাত উক্তিতে দয়াকে তুলনা করা হয়েছে বৃষ্টিপাতের সঙ্গে: ‘দ্য কোয়ালিটি অব মার্সি ইজ নট স্ট্রেইনড, / ইট ড্রপেথ অ্যাজ দ্য জেন্টল রেইন ফ্রম হেভেন / আপন দ্য প্লেইস বিনিদ।’ বৃষ্টি যেমন সব জায়গায় সমানুপাতে পড়ে, তেমনি দয়াও হচ্ছে শর্তবিহীন। অর্থাৎ, দয়া দেখাতে হবে কোনরকম পূর্ব শর্ত ছাড়া। যেমন মেজার ফর মেজার নাটকে ইসাবেলা অনুকম্পা দেখায় এই কথা জানার পরও যে এ্যাঞ্জেলো তার ভ্রাতা ক্লডিওর হত্যাকারী। কিন্তু যখন ইসাবেলা এ্যাঞ্জোলোকে ক্ষমা করে দেয়, তখন ডিউক ভিশেনসিওর নির্দেশে বেঁচে থাকা ক্লডিওকে ভগ্নীর কাছে উপস্থিত করা হয়।

শেক্সপিয়ার তাঁর রচনাবলীর সমগ্রতায় জগৎ ও জীবনকে ধরে রেখেছেন একটি মহাব্যাপ্ত পরিসরের মধ্যে। অষ্টাদশ শতাব্দীর অন্যতম ইংরেজ মনীষী ও প্রাবন্ধিক স্যামুয়েল জনসন বলেছেন, জীবনের যে কোন বিষয়, হোক না রাজনীতি, অর্থনীতি, হোক না ভূগোল, হোক না ইতিহাস বা ধর্ম বা নারী-পুরুষ সম্পর্ক বা অন্য কোন বিষয়, এ সব বিষয়ে জানতে গেলে শেক্সপিয়ার পাঠ করতেই হবে। আমিও জনসনের এই উক্তির জোরালো সমর্থক।

 

মোহীত উল আলম, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক

চট্টগ্রামী প্রবাদের প্রথম গ্রন্থ : রচয়িতা জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন

মহীবুল আজিজ জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন (১৮৫২-১৯২০), সংক্ষেপে জে ডি এন্ডার্সন আজ থেকে একশ’ সাতাশ বছর আগে চট্টগ্রামী প্রবাদের সর্বপ্রাথমিক গ্রন্থটি রচনা-সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিলেন। চট্টগ্রামী

দেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই (সম্পাদকীয়- জুন ২০২৪ সংখ্যা)

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্প্রতি আমাদের দেশসহ উপমহাদেশে যে তাপদাহ শুরু হয়েছে তা থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই