এখন সময়:রাত ৯:২৮- আজ: রবিবার-১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ৯:২৮- আজ: রবিবার
১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

দুপুর রঙের বৃষ্টি

রাজকুমার শেখ
আজ খুব ভোরে বের হয়েছেন আসগর আলি। রাতে তেমন আর ঘুম আসে না। রাতে হালকা খান। তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যেতে চান না। বসে বসে জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখেন। তারারা সেই কোন কাল হতে জ্বলে আছে। তা কেউ বলতে পারে না। এখন চোখের জ্যোতি কমে এসেছে। ঠিকঠাক আর সব কিছু ঠাহর করতে পারেন না। তবু মনের জোরে ঘুরে বেড়ান। কী যেন একটা হারিয়ে ফেলেছেন তাই খুঁজে বেড়ান। এ শহরে তাকে অনেকে চেনেন। সালাম বিনিময় হয়। কথা হয়। চকে মাঝে মাঝে যান। মালেকা চা করে দেয়। চায়ের নেশাটা আছে বলেই মালেকার কাছে যান। বসে বসে কোনো কোনো দিন দু তিন পেয়ালি চা খাওয়া হয়ে যায়। এমনি করেই আসগর আলির দিন কেটে যায়। আজ ভোরের আবেশটা খুব ভালো। কেমন একটা ঘোর লাগা ভোর। এখনো শহর জাগেনি। একটা পেঁচা ভাঙা পাঁচিলের উপর বসে। আসগর আলির সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। কী ধারালো ঠোঁট। এখনো শিকারের জন্য ওৎ পেতে বসে আছে। এখনো এ শহরে কতই না শিকার হয়। পেঁচা শিকার ধরে। এক সময় মানুষ শিকার করতো। কত ফন্দি। কত চতুর মানুষ। রাতের গভীরে চলতো নবাবের বিরুদ্ধে আলোচনা। কেমন করে সিরাজদৌলাকে বাংলার মসনদ থেকে সরানো যায়। সে সব আলোচনার কথা হয়তো ইতিহাসে নেই। কিন্তু এ শহর জানে সব বেঈমানিদের। আসগর আলি এখনো মেনে নিতে পারেন না। সেই কোন যুগ আগে বাংলার নবাবী আলো মুছে গেছে। কেউ নেই। পড়ে আছে তামাদি ইতিহাস। যার কোনো ঠিকানা নেই। কেউ আর মনে রাখে না। সব বদলে গেছে। আসগর আলি কিন্তু সব মনে রেখেছেন। উনি ভুলতে পারেন না কিছু। কেমন যেন মাথার ভেতর এসে ভিড় করে ভাবনা। সিরাজ দৌলা এখনো যেন তাঁর ঘোড়া নিয়ে টগবগিয়ে ছুটে যান রাতের অন্ধকারে। এ সব শব্দ তাকে ঘুমোতে দেয় না। পলাশী এখনো কাঁদে। যে মাটিতে একজন সাচ্চা নবাবের রক্ত মিশেছে। সে মাটি তো কাঁদবেই। ভাবেন আসগর আলি।
এখনো পেঁচাটা বসে। ও কি সেই নবাবি যুগ থেকে বসে? ও কি দেখেছে সিরাজকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছিল? ও কি তাঁর রক্তের গন্ধ পেয়েছিল? সেদিন গোটা শহর কেঁদেছিল। আমিনার চোখের জলে ভেসে গেছিল গোটা শহর। এ সব তো ইতিহাসে লেখা নেই। ইতিহাস কি সত্যি কথা বলে? আসগর আলি এ সব মেনে নিতে পারেন না। তিনি ইতিহাস ছিঁড়ে ফেলতে চান। ভেতর ভেতর ঘেমে ওঠেন। কেমন এক ক্লান্তি অনুভব করেন। একটু সময় নেন। তারপর আবার হাঁটতে থাকেন। এখনো কি রাত থাকবে? কি জানি উনি এত ভোরে কেন বেরিয়েছেন? আসগর আলি নিজেও জানেন না। সময় গড়িয়ে যায়। একটু একটু করে এগিয়ে চলেন। পায়ে পাথর ঠেকে। একটু ব্যথা অনুভব করেন। এ ভোরে কেমন আঁধার মেশানো। পুব পরিষ্কার না হলে সব দেখা যাবে না। তিনি হাঁটতে হাঁটতে চলে আসেন ইমামবাড়ার কাছে। এখানে আসতেই আবার সেই ঘোড়া ছোটানোর শব্দ। আসগর আলি কান করে শোনেন। শব্দটা ঠিক কোন দিক থেকে আসছে। একটু সময় নেন। তারপর তিনি ইমামবাড়ার কাছে এগিয়ে যান। দেওয়ালে কান রাখেন। শব্দটা ভেতর থেকেই আসছে। যে শব্দ এর আগেও শুনেছেন। হঠাৎই গাটা কেমন শিরশির করে ওঠে। আশেপাশে মানুষের কোনো সাড়া নেই। তিনি একটু ভয় পেয়ে যান। এখানে কেন এমন শব্দ হচ্ছে? তবে কি কেউ ভেতরে আছে? তিনি ভেবে পান না। এদিক ওদিক চেয়ে দেখেন। কেউ নেই। শ‚ন্য রাস্তা। ভোরের আবেশে জড়িয়ে আছে পাখি। এখনো তারা ডাকছে না। আসগর আলি কেমন হয়ে যান। তিনি একটু সরে আসেন। বুকটা ঢিপঢিপ করছে। এখানে কি কোনো রুহ্ ঘুরে বেড়ায়? নবাব সিরাজ দৌলা কি এখনো ছুটছে? তাঁর যুদ্ধ শুধু ইংরেজদের সঙ্গে ছিল না। যুদ্ধ ছিল তার চারপাশের মানুষের সাথে। যারা ওঁকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল তারাই তো কৌশলে সিরাজদৌলাকে শেষ করলো। ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না কখনো।
আসগর আলি ভাবেন কথাটা। আবার তিনি হাঁটতে থাকেন। মালেকার চায়ের দোকান এখনো খোলেনি। বকরি গলি শ‚ন্য। কেউ জেগে নেই। একা আসগর আলি ঘুরে বেড়ান। তাঁর ভালোবাসার শহর। এখানে ইতিহাসের গন্ধ। গভীর রাতে ঘোড়ার টগবগানো শব্দ। এ শব্দ কি আর কেউ শুনতে পায়? না তিনি একাই শোনেন? না তিনি ভুল শোনেন? আসগর আলি সাহেবের সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। তবে কে যায় অত রাতে? দেখাও যায় না। দেখা হলে ঘোড়া থামিয়ে কথা বলবেন। তিনি মনে মনে ভাবেন। এমন সময় একটা পেঁচা ডেকে পালালো হাজারদুয়ারীর মাথার ওপর দিয়ে। আসগর আলি চমকে যান। আজ কি সব হচ্ছে উনার সাথে? তিনি ভেবে পান না। কত রাতেই বা তিনি জেগেছেন? তিনি রাত ঠাহর করতে পারেননি। আজকাল তিনি সব বুঝে উঠতে পারেন না। সময় লাগে। চোখ দুটোও কমজোর হয়েছে। এখন কেমন একটা শীত অনুভব করেন মনে মনে। সব কথা মনে থাকে না। বাড়িতে মাঝে মাঝে বকা খেতে হয়। জরিনাবানু বলেন, তুমি কী গো! কথা মনে রাখতে পারো না? কী আনতে বলেছিলাম আর কী এনেছো দোকান থেকে? আর পারি না। এখন কি আমাকে যেতে হবে?
আঃ! তুমি যাবা কেনে? আমি যাবো। সব কি আর মনে রাখা যায়! বয়স হয়েছে। ভুল তো হবেই।
তাই বলে দুটো জিনিস মনে রাখতে পারো না?
আসগর আলি হাসেন এ কথা শুনে। জরিনাবানু আপন কাজে মন দেন।
এমন সময় আসগর আলি সাহেবের চায়ের নেশা লেগে যায়। মালেকা দোকান না খোলা পর্যন্ত চা মিলবে না। চায়ের জন্য মনটা কেমন যেন করছে। এমন সময় চক মসজিদে ফজরের আজান দেয়। ভোরের ঘুম ভাঙছে। মানুষজন দেখা যাচ্ছে। যে য়ার কামে বের হয়। এবার মালেকা আসবে দোকান খুলতে। আসগর আলি নামাজ পড়ার জন্য এগিয়ে যান মসজিদ।

নামাজ শেষ করে সোজা চলে আসেন মালেকার চায়ের দোকান। উষ্ণ চায়ের গন্ধ নাকে এসে লাগে। চা পাতার গন্ধ এ সকাল ভরে যায়। মালেকার চায়ের সুনাম আছে। বহু মানুষ ওর চা খাবার জন্য আসে। দোকানে সব সময় ভীড় লেগেই থাকে। আসগর আলি এক কোণে গিয়ে বসেন। এখন তেমন ভিড় নেই। মালেকার সঙ্গে চোখাচোখি হলো। মালেকা হাসে। খুব মিষ্টি মেয়েটা। রূপ যেমন তেমন গুণ। কথা যেন সাজিয়ে বলে। বাহারি চুল। আসগর আলি তারিফ করেন মাঝেমধ্যে। মালেকা তারিফ শুনে হাসে। মুখে কিছু বলে না। আসগর আলি সাহেব রসিক আছেন। মালেকা সে কথা জানে। কত কিসিমের মানুষ আছে। মালেকা সে সব কথা গায়ে মাখে না। ওর কাজ করে যায়। মানুষ তো আর শুধু ওর চা খায় না। ওকেও চোখ দিয়ে যেন চাটে। বড়োই ঘিনঘিন করে আসগর আলির মন। তিনি এ সব মেনে নিতে পারেন না। তবু চুপ করে বসে চা খান। বোঝেন সবই। মেয়েমানুষকে সম্মান করা উচিত। সংসারের গড়ে ওঠার ম‚লে সেই মেয়ে মানুষ। মালেকার কোনো উপায় নেই। সংসারের হাল তাকে সামলাতে হয়। অনেক রাত অবধি দোকান খোলা রাখতে হয়। বেচাকেনা বেশ ভালোই হয়। শীতে একটু বেশি বেচাকেনা হয়। কেননা বাইরে থেকে অনেক টুরিস্ট আসে। এ মোড়ে একমাত্র মালেকার দোকান ছাড়া কারো দোকান নেই। ওই সময় নাওয়াখাওয়া হয় না মালেকার। বহু দ‚র থেকে আসে সব বেড়াতে। আসগর আলি ওই সময় আসেন কম। চা চেয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয়। মালেকা সময় মতো দিতে পারে না। আসগর আলি ওই সময় নাগিনাবাগ গিয়ে চা খেয়ে আসে। নাগিনাবাগে তেমন লোকের যাতায়াত নেই। বেশ ফাঁকা। নাগিনাবাগের পাশ দিয়ে রেললাইন চলে গেছে। মাঝে মাঝে মাটি কাঁপিয়ে রেল গাড়ি চলে যায়। দোকান নড়ে ওঠে। যেন আলামত শুরু হয়ে যায়। আসগর আলি সাহেবের বুকটা কেমন ঢিপঢিপ করে ওঠে। চা হাত থেকে ছলকে পড়ে যায়। গরম চায়ে ছ্যাঁকা লাগে। মাথাটা কেমন যেন করে। চা খাওয়া আর শেষ হয়না। ওঠে চলে আসেন। হাঁটতে হাঁটতে চলে আসেন বাজারের দিকে। পুরনো বাজার। এখানে সবই পাওয়া যায়। এক সময় এখানে খুব রমরমা ছিল। এখন সব চুপচাপ। সেই নবাবি গন্ধ আর নেই। এখানে সব রকমের জিনিস পাওয়া যেত। নবাবদের অন্দর মহলে এই বাজার থেকে আনাজপাতি যেত। অবশ্য বাইরে থেকেও সাজপোশাক খরিদ হতো। সে সব অনেক কথা। নবাবি ঘরানার ব্যাপার স্যাপার আলাদা। আসগর আলি সে সব ভাবতে চান না। তাঁর মতো সামান্য মানুষ হয়ে ভাবতে চান না। এখানে তাঁর মতো সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে। টাঙা বা অন্য কাজে লিপ্ত ছিল। সে সব চল ওঠে যাওয়ায় তারা আজ বিপদের মুখে। সংসার চলে না। কাজ নেই। অথচ নবাবী আমলে থেকে সাধারণ মানুষের কাজ ছিল। কিছু না কিছু করতো। এখন অনেক সমস্যা। যা আগামীতে মিটবে বলে আশা করা যায় না। আসগর আলি কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যান। তাঁরও সংসার তেমন ভাবে আর চলে না। বেঁচে আছেন কোনো রকমে। টাঙা গাড়িটা দেখলেই মনটা হু হু করে ওঠে। এখন ভেঙে গেছে। শ্যাওলা জমে বৃষ্টি লেগে। তিনি আর দেখেন না। মনটা খারাপ হয় বলে। কত রোজগার করেছে। দুহাতে ভরে উঠতো টাকা। কেমন একটা নেশা পেয়ে গেছিল রোজগার করার। ভালো খেত। ভালো পরতো। এখানে কত সুখ ছিল। সে সব চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে গেল। এখন আর হিসাব মিলে না। ওঁর বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আপনা থেকে। মালেকা চা বসিয়েছে। আসগর আলি এক পা এক পা করে এসে বসে বেঞ্চিতে। চা ফোটার গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে গেছে। মালেকা এক মনে কাজ করছে। আর একটু পরেই ভিড় হবে দোকানে। কেটলিতে জল গরম হচ্ছে। মালেকা কাপগুলো গরম জল দিয়ে ধুয়ে নিল। ওর বেশ পোক্ত হাত। চা হতেই এক কাপ গরম চা এনে রাখলো আসগর আলি সাহেবের সামনে। এখন বেশ আমেজ করে চুমুক দেবে। চা থেকে উষ্ণতা ওঠে আসছে। ম ম করছে চায়ের গন্ধ। এখন কেউ নেই। ফাঁকা দোকান। এমন সময় হঠাৎ মালেকা বলে, ভাই, কাল রাতে একটা ঘটনা ঘটেছে। বকরি গলির দুলালও নাকি কাল ইমামবাড়ার ভেতর কে যেন ঘোড়া নিয়ে ছুটছে! সে শব্দও শুনেছে। আমি অবশ্য বিশ্বাস করিনি। এখন কে আছে যে ঘোড়া ছুটিয়ে যাবে? নবাব আর আছে নাকি? দুলালের কথা কেউ বিশ্বাস করেনি। ও একটা গাঁজা খোর।
এ কথা শুনে আসগর আলি চমকে ওঠেন। আজ ভোরেই তো সে শব্দ উনি শুনেছেন। হঠাৎ উনি চা খাওয়া থামিয়ে জিজ্ঞেস করে, মালেকা, দুলালকে একবার কথা বলা যাবে?
এখন ওকে পাবেন না। ও বিকেলে এখানে আসে। ও আমবাগান আগলাতে যায়।
ওকে একটু বলো আমি কথা বলবো।
ঠিক আছে।
মালেকা কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়। কেমন একটা হিম জড়ানো সকাল। পুবে স‚র্য উঁকি মারছে। আসগর আলি আর বসে থাকেন না। চায়ের পয়সা মিটিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। গাড়ি চলাচল করছে। একটা গাড়ি ভর্তি ট্রাকার চলে গেল ওঁর পাশ দিয়ে হুঁশশ করে। নবাবের গোশা খানার পাশ দিয়ে সোজা চলে যাবে জিয়াগঞ্জ। আসগর আলি একটা জায়গার নাম রেখেছেন, নবাবের গোশা খানা। এর একটা কাহিনি আছে। সে তার যৌবনের কাহিনি। সে দিনের কথা মনে পড়লেই কেমন যেন তিনি হয়ে যান। না সে সব আর মনে করতে চান না। তামাদি হয়ে গেছে সব। না সে সব কথা তিনি আর ভাববেন না। এগিয়ে চলেন বাড়ির দিকে। পুবের স‚র্য উঠছে একটু একটু করে।

চট্টগ্রামী প্রবাদের প্রথম গ্রন্থ : রচয়িতা জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন

মহীবুল আজিজ জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন (১৮৫২-১৯২০), সংক্ষেপে জে ডি এন্ডার্সন আজ থেকে একশ’ সাতাশ বছর আগে চট্টগ্রামী প্রবাদের সর্বপ্রাথমিক গ্রন্থটি রচনা-সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিলেন। চট্টগ্রামী

দেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই (সম্পাদকীয়- জুন ২০২৪ সংখ্যা)

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্প্রতি আমাদের দেশসহ উপমহাদেশে যে তাপদাহ শুরু হয়েছে তা থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই