এখন সময়:রাত ৮:২৬- আজ: রবিবার-১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ৮:২৬- আজ: রবিবার
১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

প্রসঙ্গ: রুচির সমতায়ন

মুজিব রাহমান:

‘আপ রুচি খানা, পর রুচি পরনা’ এ-প্রবাদ জনরুচি সম্পর্কে আমাদেরকে একটা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। সমাজ মানুষ-সৃষ্ট। নানান অর্জন ও অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে তৈরি হয় একজন মানুষের রুচি-পছন্দ-ভালো লাগার বোধ।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর কণিকা কাব্যের ‘গৃহভেদ’ শীর্ষক কবিতায় মানুষের রুচি বিষয়ে আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক যে কালজয়ী বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তা আজকের দিনেও পুনর্পাঠের দাবি রাখে। কবি লিখেছেন:

 

আম্র কহে, একদিন, হে মাকাল ভাই,

আছিনু বনের মধ্যে সমান সবাই;

মানুষ লইয়া এল আপনার রুচি-

মূল্যভেদ শুরু হল, সাম্য গেল ঘুচি।।

 

ইবসেনের ধারাবাহিকতায় বার্নার্ড শ এবং পরবর্তীতে অ্যামেরিকান নাট্যকার আর্থার মিলার সাধারণ মানুষের মানবিকবোধ ও মর্যাদাকে রাজারাজড়ার মর্যাদার সমান পঙ্ক্তিভুক্ত করে উপস্থাপন করেছেন।

কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন রাজা-প্রজা নির্বিশেষে সকলেই মানুষ এবং এটিই মূলগতভাবে মানবধর্মের, মানব সংস্কৃতির

শেষ কথা। যদিও  ংড়পরধষ উধৎরিহরংস সৃষ্ট সমাজে ংড়সব ধৎব সড়ৎব বয়ঁধষ ঃযধহ ড়ঃযবৎং-এবং ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ আমাদের সমাজেরই এক অলঙ্ঘনীয় ভবিতব্য। মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা র‌্যাডিকেল হিউম্যানিজমের গোড়ার কথা। অথচ আমাদের ভাবনাচিন্তার গোড়ায় গলদ। আমরা শ্রেণিবিভক্ত সমাজের বিভাজিত সাংস্কৃতিক আবহের ধারণাকে আমলে নিতে চাই না। ঙহব ংরুব ভরঃং ধষষ –  সমতায়নের এমন কথা উদ্ভট ও হাস্যকর।  অথচ এ-কথাই হয়ে দাঁড়িয়েছে সুবিধাবাদীজনের আপ্তবাক্য। কাজেই  উচ্চবর্গীয় ও নিম্নবর্গীয় সংস্কৃতির ধারণাকে সমতায়নের লেন্সে দেখতে চাওয়ার যে একদেশদর্শী প্রবণতা তা জীবন ও সংস্কৃতির বহুত্ববাদী দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রায়োগিক সত্য হচ্ছে, সমাজের বিভিন্ন তলে রুচির ফারাক ভেদে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রকে আমরা ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে জনপ্রিয় হতে দেখি। একই কথা নানান আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় নানা তলের মানুষের জন্য নানাভাবে প্রযোজ্য। একজন ব্যক্তি মানুষের রুচি তো তার সময়ে বিরাজমান বাস্তবতার-ই উপজাত। নির্মিত। রুচির মার্জিতি পরিবেশ-প্রতিবেশ নিরপেক্ষ নয়।

অন্যদিকে, যে কোনো আরোপিত সমরূপতা যে দর্শন-বীক্ষণের জন্ম দেয় তা বাস্তবতাকে প্রতারিত করতে পারে। সংস্কৃতিমান যে কাউকে মানব অস্তিত্বের, যাপিত জীবনের নানা তলের ভেদরেখার দুপাশের অনুপুঙ্খ খবর রাখতে হয়। জানতে হয়।

 

যৌক্তিকভাবেই মানুষের স্বাধীন সত্তার জয়গানে মুখরিত মানবতন্ত্রীজন। এ কথায় দ্বিমত করার অবকাশ নেই যে, রুচির সমতায়ন অসম্ভব।

যা সম্ভব তা হচ্ছে রুচির সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্যে কাজ করা। সমাজ ও সংস্কৃতির জন্যে মঙ্গল ও কল্যাণকর কাজে নিরত থাকাই সংস্কৃতিমান সকলের আশু দায়িত্ব। এ-কথা নূতন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যে কোনো সাংস্কৃতিক চর্চা মানবিকতায় উন্নত মানুষ তৈরি করার ব্রত বহন করে। বাদানুবাদের কদর্য সংস্কৃতি নয় – যুক্তিতর্কের সুস্থ-স্বাভাবিক সংস্কৃতির ভেতর দিয়েই নির্মিত হয় একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের ভারসাম্যপূর্ণ মন ও মানস।

সামগ্রিকভাবে জ্ঞান ও শিল্প যখন পণ্য এবং ভিন্ন ভিন্ন পকেটের জন্যে যখন ভিন্ন ভিন্ন প্যাকেজ এবং স্লোগান যখন ডব ঢ়ৎড়ারফব ভড়ৎ ধষষ ঢ়ড়পশবঃং – এমন একটি সময়ে খাঁটি শিল্প, বাজারি শিল্প, উঁচু সংস্কৃতি, অভাজন সংস্কৃতি ইত্যাদি বিভাজন প্রকট হবে এই তো স্বাভাবিক। আবার এই সময়ে যখন ‘ফিকশন’ ক্রমাগত ‘রিয়েল’-এ পরিণত তখন বিভাজনের ফাঁক প্রতি মুহূর্তে যুগপৎ বাড়ছে ও কমছে। এই বিপরীতের সমন্বয় বা মীমাংসা যে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে সম্ভব বলে ধারণা করা হয় তা এখনো ইউটোপিয়, সুদূরের স্বপ্ন। ভারতের সংবিধানের প্রধান প্রণেতা ড. বি আর আম্বেদকার-এর লেখা থেকে উদ্ধৃত করা যায়:

চড়ষরঃরপধষ ফবসড়পৎধপু পধহহড়ঃ ষধংঃ ঁহষবংং ঃযবৎব ষরবং ধঃ ঃযব নধংব…ংড়পরধষ ফবসড়পৎধপু. ডযধঃ ফড়বং ংড়পরধষ ফবসড়পৎধপু সবধহ? ওঃ সবধহং ধ ধিু ড়ভ ষরভব ঃযধঃ ৎবপড়মহরুবং ষরনবৎঃু, বয়ঁধষরঃু, ধহফ ভৎধঃবৎহরঃু ধং ঃযব ঢ়ৎরহপরঢ়ষবং ড়ভ ষরভব.

এ-সবের অনুপস্থিতিতে বিভাজনই নিয়তি। বিভাজনই দ্রুত জায়মান। আর এ বিভাজন যে বিভাজিত সামাজিক সাংস্কৃতিক আর্থ-রাজনৈতিক আবহ গড়ে তোলে তাতে অস্তিত্ব সতত বিচলিত থাকবে, অস্থির ও মানবতা পরিপন্থী থাকবে তাতে বিস্মিত হবার কিছু নেই।

 

সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের যৌক্তিক শক্তিমত্তা অস্বীকার করার জো নেই। কিন্তু আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে এ-কথা বোঝা খানিকটা কঠিন হয়ে পড়ে যে একটি প্রভাবশালী সুশীল সমাজ কি গণতন্ত্রজাত না গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। ধনী দেশ গরিব দেশ ভেদে কতো কিছুরই না পার্থক্য ঘটে। আন্তঃসম্পর্কের বিশ্বস্ততার শক্তিমত্তা গরিব দেশের মানুষের তুলনায় ধনী দেশের মানুষের বেশি এমন কথাও সমাজবিজ্ঞানীরা অনেকবারই বলেছেন। তাহলে কি আমাদের গরিবিয়ানা আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বিশ্বস্ততাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে? এ-সব প্রশ্নের উত্তর নিহিত আছে জিজ্ঞাসার ভেতরে, গভীরতর গবেষণার ভেতরে। সাংস্কৃতিক চর্চা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ হাত ধরাধরি করে চলছে কিনা সেটিও একটি সুস্থ সমাজ পরিমাপের উল্লেখযোগ্য ব্যারোমিটার। সন্দেহ নেই,  সমাজে গণতান্ত্রিক আচরণের চর্চা রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক চর্চার ও প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। এজন্যেই হয়তো বলা হয় প্রতিটি সিঁড়িতে পা রেখে উপরে ওঠা উচিত ডিঙিয়ে উঠলে পড়ে যাবার সম্ভাবনা বেশি। অরুন্ধতী রায় তাঁর ঞযবৎব রং ঋরৎব রহ ঃযব উঁপঃং, ঃযব ঝুংঃবস রং ঋধরষরহম প্রবন্ধের উপসংহারে লিখেছেন:

 

ডযধঃ বি হববফ ধৎব ঢ়বড়ঢ়ষব যিড় ধৎব ঢ়ৎবঢ়ধৎবফ ঃড় নব ঁহঢ়ড়ঢ়ঁষধৎ. ডযড় ধৎব ঢ়ৎবঢ়ধৎবফ ঃড় ঢ়ঁঃ ঃযবসংবষাবং রহ ফধহমবৎ. ডযড় ধৎব ঢ়ৎবঢ়ধৎবফ ঃড় ঃবষষ ঃযব ঃৎঁঃয. ইৎধাব লড়ঁৎহধষরংঃ পধহ ফড় ঃযধঃ, ধহফ ঃযবু যধাব. ইৎধাব ষধুিবৎং পধহ ফড় ঃযধঃ, ধহফ ঃযবু যধাব. অহফ ধৎঃরংঃং – নবধঁঃরভঁষ, নৎরষষরধহঃ, নৎধাব ৎিরঃবৎং, ঢ়ড়বঃং, সঁংরপরধহং, ঢ়ধরহঃবৎং, ধহফ ভরষসসধশবৎং পধহ ফড় ঃযধঃ. ঞযধঃ নবধঁঃু রং ড়হ ড়ঁৎ ংরফব. অষষ ড়ভ রঃ.

ডব যধাব ড়িৎশ ঃড় ফড়. অহফ ধ ড়িৎষফ ঃড় রিহ.

 

ফসল উৎপাদনের জন্যে জমির উপরিমৃত্তিকা বা ঃড়ঢ়ংড়রষ-এর গঠনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত মানুষমাত্রই জানেন কতটা দীর্ঘ সময় লাগে এ-স্তরটি তৈরি হতে। ঠিক তেমনি সামাজিক-মানুষের রুচিও গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে দীর্ঘ সময় ধরে। রুচির ব্যাকরণ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন,

‘যুক্তির একটা ব্যাকরণ আছে, অভিধান আছে, কিন্তু আমাদের রুচির অর্থাৎ সৌন্দর্যজ্ঞানের আজ পর্যন্ত একটা ব্যাকরণ তৈয়ারি হইল না।’

কাজেই সমাজ-ব্যাকরণের বেড়ের ভেতর থাকা ব্যক্তি মানুষের স্বাতন্ত্র্য সমাজ কমই শ্রদ্ধা করে। ব্যক্তিকে এ কারণে রুচিমান ও সংস্কৃতিমান হতে হয়। গ্রহণ-বর্জনের পছন্দ-অপছন্দের স্বাধীনতা প্রত্যেক ব্যক্তির রুচির উপর নির্ভর করে। রুচি বা সুরুচি যেমন একজন কে  অনুপ্রাণিত করে, কাজে উদ্বুদ্ধ করে  তেমনি একজনকে নানা সংযুক্তি থেকে দূরে রাখার, এবং নিবারণ করার কাজটিও করে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-

‘তোমার রুচি যদি তোমাকে নিবারণ না করে, তবে কাহার পিতৃপুরুষের সাধ্য তোমাকে নিবারণ করিয়া রাখে।’

এ-কারণে রুচি সমাজ নিরপেক্ষ নয়। সমাজ-সাপেক্ষ। সামাজিক ও মিশুক মানুষ দেশভেদ, কালভেদ মেনে নিলেও ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য বা একান্ত নিজস্ব মূল্যবোধকে মেনে নেয়ার বেলায় আজও অনীহ ও অনিচ্ছুক। আধুনিক সমাজে ব্যক্তির সামগ্রিক সংযোগ ইত্যাদি বিবেচনা নেয়ার পরও তার ব্যক্তিক পছন্দের স্বাধীনতা, রুচির স্বাধীনতা ইত্যাদি সমাজ-রাষ্ট্রকে সুরক্ষা দিতে হয়। রুচির প্রশ্নে, পছন্দ চয়নে ক্ষাত্রশক্তির প্রাবল্য কোনো সমাজেই সভ্যতার কোনো নিদর্শন নয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানতেন, রুচির তর্কের সহজ কোনো মীমাংসা নেই। এ প্রসঙ্গে তাঁর উচ্চারণ স্মরণ না করে উপায় নেই:

‘রুচির তর্কের, শেষকালে প্রায় বাহুবলে আসিয়াই মীমাংসা হয়।’

 

মুজিব রাহমান, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ

সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর

চট্টগ্রামী প্রবাদের প্রথম গ্রন্থ : রচয়িতা জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন

মহীবুল আজিজ জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন (১৮৫২-১৯২০), সংক্ষেপে জে ডি এন্ডার্সন আজ থেকে একশ’ সাতাশ বছর আগে চট্টগ্রামী প্রবাদের সর্বপ্রাথমিক গ্রন্থটি রচনা-সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিলেন। চট্টগ্রামী

দেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই (সম্পাদকীয়- জুন ২০২৪ সংখ্যা)

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্প্রতি আমাদের দেশসহ উপমহাদেশে যে তাপদাহ শুরু হয়েছে তা থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই