এখন সময়:রাত ১০:৪০- আজ: রবিবার-১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ১০:৪০- আজ: রবিবার
১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

বৈদেশিক মুদ্রা ও বিষধর সাপ

রোকন রেজা

নিয়ামত আলি একটু এলোমেলোই হাঁটছিল। হেরিংবন রাস্তা থেকে নেমে মেঠোপথ ধরেছে সে। সন্ধ্যের আগে আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। পথের দু’ধারে ছোট ছোট ঝোপ-ঝাড়ে ভেজা পাতার গন্ধ। সেখানে ঝিঁ ঝিঁ পোকা শব্দ করে ডেকে যাচ্ছে অবিরাম। ডান পা’টা যখন আচমকা দেহের মাঝ বরাবর এসে পড়ল, ফণা তুলে দাঁড়িয়ে গেল সাপটা নিয়ামত আলির একেবারে সামনে। মাঝারি সাইজের ভয়ংকর বিষধর গোখরা।

নিয়ামত আলির হার্ট শক্ত। তাছাড়া সে হালকা নেশাগ্রস্ত। আল্লাহ মাবুদ যদি তার মৃত্যু সাপের দংশনে লিখে থাকে তাহলে তার কিছুই করার নেই। তার হাতে মোবাইলের হালকা আলোর টর্চ। সে কোথাও এটা শুনেছিল যে সাপের চোখ বরাবর আলো ফেললে সে ধাঁধায় পড়ে যায়।

নিয়ামত আলি দেখল কথা সত্য। তার সামনে ফণা তোলা সাপটিও ধাঁধায় পড়ে গিয়েছে। সাপটি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আলোর দিকে। নিয়ামত আলি আলো ধরে রেখেছে সাপের চোখ বরাবর।

সাপটি যখন নিয়ামত আলির সামনে স্থবির হয়ে ছিল দূর থেকে দেখতে পেয়েছিল কাসেদ। সে খুব দ্রুত পাশের সবজি খেতের বেড়া থেকে বাঁশের একটা কাবারি বের করে সজোরে আঘাত করল ফণা তোলা সাপের মাথায়। সাপটা ছিটকে পড়ল প্রায় দশ হাত দূরে। কাসেদ কাছে গিয়ে টর্চ মেরে দেখল ঝকঝকে সাপের মসৃণ দেহের মৃদু মৃদু নড়াচড়া। আরও দু’ঘা বসিয়ে দিল মাজা বরাবর। তারপর কাসেদ মরা সাপটা কাবারির মাথায় নিয়ে ছুড়ে ফেলল দূরের ভাগাড়ে।

নিয়ামত আলি এতক্ষণ মূর্তির মতো স্থবির হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভয় কেটে যাওয়ায় একটা বড় দম নিয়ে সে বলল, খুব বাঁচা বেঁচে গেলাম! তুমি না থাকলে কী যে হতো কাসেদ!

নিয়ামত আলি তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াল। কাসেদের হাতের কাবারির দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে উদাস গলায় বলল, খোদার লীলা কে বুঝতে পারে!

কাসেদ বলল, আপনি কি একা একা যেতে পারবেন? না…

না, না পারব। নিয়ামত আলি তাড়াতাড়ি বলল।

কাসেদ বলল, পচা’র বৌ’র গ্যাস বেড়েছিল। পচা বার বার মোবাইল করছিল। কী করি! এই রাত্তিরে আর না এসেও পারলাম না। একটু থেমে কাসেদ আবার বলল, আচ্ছা যাই চাচা। আপনি সাবধানে যাবেন।

একথা বলেও কাসেদ গেল না। সে তার টর্চের আলো ধরে রাখল নিয়ামত আলির পথের ওপর। নিয়ামত আলির বাড়ির দূরত্ব টর্চের আলোর মধ্যেই। নিয়ামত আলি যখন তার বাড়ির দরজার কাছে পৌছে গেল কাসেদ টর্চ নেভাল।

বাড়ি ফিরে নিয়ামত আলি দেখল চারিদিকে ঘন অন্ধকার। মোবাইলের আলোয় সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠল সে। ঘরের শিকল খুলে ভেতরে ঢুকল। আলো জ¦ালাল। আলো জ¦ালানোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রানু দরজায় এসে দাঁড়াল। ঝাঁঝাল কন্ঠে  বলল, কোথায় গিয়েছিলে আজ?

জাহাপুর। বক্স সাহী’র বাড়ি। এজন্যই দেরি হয়ে গেল। সঙ্গের লোকজন আসতে দিলো না। নিয়ামত আলি কৈয়িফত দেয়ার মতো করে কথাগুলো বলল।

নিয়ামত আলি মাঝে মাঝেই এ রকম করে। বাড়ির আশেপাশেই বাউল গানের কোনো আসরে সে আছে। অথচ সে আসবে ভোরবেলা। দেখতে দেখতে রানুর গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। রানু জানে বাউল গানের প্রতি তার বাপের দূর্নিবার আকর্ষণ। গানের কথা শুনলে যত দূরেই হোক সে যাবেই।

নিয়ামত আলি পাঞ্জাবিটা খুলল। পাঞ্জাবি খুলে কাঠের আলনায় রাখতে রাখতে বলল, ভাত-তরকারি কি কিছু আছে মা? সেই ওই রাত্তিরে খেয়েছি।

নিয়ামত আলির চেহারার মধ্যে ক্লান্তি ছিল, হয়তো বা কথার মধ্যে খানিকটা মায়াও ছিল, রানুর রাগ অনেকটাই নেমে গেল। সে বলল, দাঁড়াও দেখছি। বলেই সে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

নিয়ামত আলি ফ্যানটা ছেড়ে দিয়ে বিছানায় একটুখানি বসল। তারপর উঠে কলপাড়ের দিকে গেল। টিউবওয়েলের পানি দিয়ে ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে নিল। ঘড়ঘড় করে কুলি করল কয়েকবার। ঘরে এসে গামছায় হাত-মুখ মুছতে মুছতেই খাবার নিয়ে এলো রানু। নিয়ামত আলি দেরি না করে খেতে বসে গেল। সাপ সংক্রান্ত পথের এই দুর্ঘটনার কথা রানুকে সে কিছুই বলল না।

রানুর স্বামী মকবুল তিন বছর হলো মালেশিয়া। মকবুল যখন মালেশিয়া যায় তখন রানুর মেয়ে ঐশীর বয়স নয় মাস। মাসে মাসে খরচের টাকা পাঠাচ্ছে মকবুল। বাকি টাকা পাঠাচ্ছে বাপের অ্যাকাউন্টে আরামপুরে। ওই টাকা দিয়ে রানুর শ^শুর আরামপুরে পাকা বাড়ি বানাচ্ছে। বাড়ির কাজও প্রায় শেষের দিকে। বাড়ির কাজ শেষ হলেই মকবুল দেশে আসবে।

বাইরে তখন ঠা ঠা রোদ্দুর। বাতাসে গরমের হলকা। চেম্বারের ভেতরে রানু যখন ঢুকল দেহের মধ্যে কোমল শীতলতা নেমে এল তার। কাসেদের সামনের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসল সে। বোরকার নেকাব তুলে টেবিলে রাখা টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু বের করে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, ওর বাপ আসবে ১৫ তারিখের ফ্লাইটে। কী করবা করো।

রানুকে দেখেই কাসেদের মনটা আনন্দে নাচছিল। হঠাৎ এই কথাতে দপ করে নিভে গেল সে। ভুরু কুঁচকে আতঙ্কিত কন্ঠে কাসেদ বলল, ১৫ তারিখ নিশ্চিত?

রানু বলল, নিশ্চিত।

কাসেদ নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে গা এলিয়ে বসে পড়ল। মাথার মধ্যে কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তার। মুখে সহসা কথা আসছে না। মাংসপেশি শক্ত হয়ে যাচ্ছে। অনেকটা সময় গুম হয়ে বসে থাকল কাসেদ। এই সময় রোগী-পত্র তেমন থাকে না। কাসেদ সামনের পেপারওয়েটটি নাড়তে নাড়তে বিরক্তিমাখা কন্ঠে বলল, তুমি এখন বাড়ি যাও। বলেই একটা দীর্ঘশ^াস ছাড়ল সে।

রানু চেয়ার থেকে নড়ল না। অনেকক্ষণ বসেই থাকল দু’জন নীরবে। তারপর রানু মেয়ের জন্য কাশির সিরাপ নিল। বাপের জন্য গ্যাসের ওষুধ নিল। কাসেদ ওষুধগুলো পলিথিনে ভরতে ভরতে বলল, তোমার বাপ আজ রাতে থাকবে?

জানি না। রানু বলল।

যদি না থাকে ফোন দিয়ো। কাসেদ বলল।

তবুও রানু উঠল না। কাসেদ খসখসে গলায় আবারও বলল, বাড়ি যাও। এখনই ওষুধের গাড়ি আসবে।

রানু বোরকার নেকাব লাগাতে লাগাতে বলল, তোমার সেই ওষুধটা আমি কিন্তু খাইনি। ফেলে দিয়েছি।

কাসেদের মাথার মধ্যে চড়াৎ করে চক্কর দিয়ে উঠল। মাগি বলে কী! একটু থেমে ধাতস্থ হয়ে নিয়ে কাসেদ বলল, এখন বাড়ি যাও। ফোনে কথা বলব।

কাসেদের ওষুধের দোকানটা বাজারের শেষ মাথায় হলেও বেচা-বিক্রি ভালো। কাসেদের ব্যবহার অতি মোলায়েম। তাছাড়া সে প্রাথমিক চিকিৎসাও দিয়ে থাকে। হঠাৎ একদিন নিয়ামত আলির রক্তবমি শুরু হলে রানু ছুটে এসেছিল কাসেদের কাছে। কাসেদ তাদের গ্রামের লোক। গ্রামের ডাক্তার। কাসেদ বিলম্ব না করে ছুটে গিয়েছিল নিয়ামত আলির বাড়ি। সেই থেকেই টুকটাক আসা-যাওয়া। সেই থেকেই শুরু।

কাসেদের এক ছেলে ক্লাস থ্রিতে পড়ে আর কাসেদের বউ এখন সাড়ে চার মাসের পোয়াতি।

রাত ১১ টা ২৫ মিনিটে কাসেদকে ফোন দিল রানু। কাসেদের কাছে রাত-বিরাতে এ রকম ফোন হরহামেশাই আসে। কিছুই মনে করে না তার বউ। গ্রামের ডাক্তার কাসেদ। গ্রামের মানুষের একমাত্র ভরসা কাসেদ। কেউ কেউ মাঝরাতে এসেও তার দরজায় ডাকাডাকি করে। তাতে সে মোটেও বিরক্ত হয় না। কেবলই ঘুমানোর আয়োজন করছিল সে। বিছানা থেকে উঠে ব্যাগ-পত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ল কাসেদ।

নিয়ামত আলি খাওয়া-দাওয়া শেষ করে শুয়ে পড়লে রানু তার ঘরে এসে মারাতœক দ্বন্দ্বে পড়ে গেল। একপাতা ঘুমের ওষুধ তার কাছে মজুত আছে। কাসেদকে সে সেটা দেখিয়েছেও। কাসেদের চেহারা দেখে বোঝা গিয়েছে সে ভয় পেয়েছে। সে অনেক বুঝিয়েছে রানুকে।

রানু অনেক ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিল ঘুমের ওষুধগুলো সে খাবে। ঘুমন্ত মেয়েটার দিকে শেষবার তাকাল সে।  নিষ্পাপ মুখটাই কী অসাধারণ মায়া ছড়িয়ে আছে। বুকটা ফেটে যেতে লাগল রানুর। দু’চোখ ফেটে কান্না আসতে লাগল তার। এই মেয়েকে সে কিছুতেই সৎ মায়ের হাতে দিয়ে যেতে পারবে না। কাসেদ বলেছিল সে রানুকে বিয়ে করবে। শহরে নিয়ে গিয়ে আলাদা সংসার করবে। এই গহিন কালো রাতে কাসেদকে পৃথিবীর সবচাইতে নিকৃষ্ট মানুষ বলে মনে হতে লাগল।

ওষুধের পাতাটা হাতে নিয়ে কত কী ভাবতে লাগল রানু। মৃত্যুর পর যদি তার দেহ পোস্টমর্টেম হয় তাহলে সে যে আড়াই মাসের অন্তঃসত্ত্বা, জেনে যাবে মানুষ। কী হবে তখন! মরার পর আরও বেশি কালিমা লেপ্টে যাবে তার অপবিত্র দেহে, নিয়ামত আলির মুখে আর ঐশীর সুন্দর ভবিষ্যতে।

ওষুধটা হাতে নিয়ে কতক্ষণ রানু বসেছিল কেউ তা বলতে পারবে না। তারপর একসময় সে মোহগ্রস্তের মতো টেবিলটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ড্রয়ার টেনে কাসেদের দেয়া ওষুধটা বের করে পানি দিয়ে ঢকঢক করে গিলে নিল সে।

কাসেদ আজ রাতে ওষুধটা আবারও রানুকে দিয়ে ফেরার পথে নিয়ামত আলির পথ আটকানো গোখরো সাপটা মেরেছিল।

 

 

রোকন রেজা, গল্পকার

চট্টগ্রামী প্রবাদের প্রথম গ্রন্থ : রচয়িতা জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন

মহীবুল আজিজ জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন (১৮৫২-১৯২০), সংক্ষেপে জে ডি এন্ডার্সন আজ থেকে একশ’ সাতাশ বছর আগে চট্টগ্রামী প্রবাদের সর্বপ্রাথমিক গ্রন্থটি রচনা-সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিলেন। চট্টগ্রামী

দেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই (সম্পাদকীয়- জুন ২০২৪ সংখ্যা)

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্প্রতি আমাদের দেশসহ উপমহাদেশে যে তাপদাহ শুরু হয়েছে তা থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই