এখন সময়:সকাল ৭:১৯- আজ: রবিবার-২১শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৬ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:সকাল ৭:১৯- আজ: রবিবার
২১শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৬ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

ভাঙা হাতে কমলকুমার

ফাহমিনা নূর

 

শুধু হাত নয় আমার পাঠ প্রস্তুতিও ভাঙা-ভাঙা; তবুও সাহস করে হাতে নিলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত কমলকুমার মজুমদার গল্প সমগ্র।

মোট ঊনত্রিশটি ছোট গল্প আছে, সূচিতে যদিও আটাশটির উল্লেখ আছে। আরও আছে তিনটি গল্পের খসড়া। সম্পাদক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এই দাবী করেন নি যে কমলকুমার মজুমদারের সব গল্পই বইটিতে সংকলিত হয়েছে বরং সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে এই গল্পগুলোর বাইরেও কমলকুমার মজুমদারের লেখা গল্প থাকতে পারে।  প্রথম ধাক্কায় আমি প্রথম চারটি গল্প পড়লাম। ‘লাল জুতো’, ‘মধু’, ‘জল’ ও ‘তেইশ’। ভূমিকাতে সম্পাদক সুনীল গল্পগুলো দু’বার করে পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সহজ বোধগম্যতার জন্য এই পরামর্শ। একটা গল্প পড়া শেষ হওয়ার পর আবার পড়ার আগ্রহ সব সময় না-ও থাকতে পারে। আমি  বরং পড়ার সময় কোনো অংশ অবোধ্য ঠেকলে পুনরায় পড়েছি।  তাতে গল্পের ফ্লো নষ্ট হয় তাতে সন্দেহ নেই তবে কমলকুমারকে পড়া হয়। সুনীল বলেছেন কমলকুমার নিজস্ব ভাষা সৃষ্টি করেছেন। আমার মনে হলো কমলকুমার নিজের তৈরি করা ভাষা নিয়েও খেলেছেন। ক্রিয়াপদকে ক্রিয়াপদের জায়গায়, বিশেষণকে বিশেষণের জায়গায় রাখেননি। গল্পভেদে সেই প্যাটার্নও বদলেছেন। তাঁর বাক্যে অকর্মক ক্রিয়ার উপস্থিতি বোধগম্যতাকে করেছে দুর্লভ। সমাধান, প্রতিটি বাক্যই সমান অভিনিবেশর সাথে পাঠ। একটি বাক্যের বোধগম্যতার চাবি তিনি রেখে দিয়েছেন অন্যকোনো বাক্যে। পাঠকের সাথে এমন রগড় আর কোন লেখক করেছেন! অথবা ঠিক রগড়ও নয়, এটাই তাঁর স্টাইল। তিনি স্টাইলিশ লেখক বটে!

‘লাল জুতো’ গল্পটি অভিনব,  তাঁর কোন গল্প অভিনব নয়! এটি এমন এক স্বাপ্নিক কিশোরের গল্প, যার গল্প পড়লে মনে পড়তে পারে, ” ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে”। ‘জল’, জল- ডাকাতের গল্প, পেশায় সে ডাকাত নয়, অবস্থার ফেরে ডাকাতি করে। পাপ, বাপতো বাপ্, মা’কেও ছাড়ে না। তার অনুশোচনা তাকে শোনায়, ” ফজল হয় ভাল লোক, কেননা খোদা তার উপর দয়া রাখেন।”

প্রকৃতি ও আদিবাসীদের নিয়ে আমাদের যত ফ্যান্টাসি ততটা দায়বোধ নেই এদের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে। তবে জেনে রাখা ভালো অভাব ও অস্তিত্বের সংকটে প্রকৃতি যেমন বিরূপ হতে জানে তেমনি আদিবাসীরাও ত্যাগ করতে পারে তাদের সরল বৈশিষ্ট্য। একটু ধাক্কা দিলো ‘ তেইশ’ গল্পটি। জমিদারের নায়েবের দ্বারা জমি, ভিটে হারিয়ে সর্বহারা হয়ে আলম যখন প্রতিরোধ (আলমের ভাষায় ক্ষ্যাপা হওয়া) গড়তে চায় তখন সে আবিষ্কার করে সে একা।

” ‘একা’ কথাটা এই ব্যপদেশে বড্ড পীড়াদায়ক, ‘ একা’ কথাটা স্বাভাবিক ভাবে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে সবিশেষ জড়িত। সত্যই তারা বড় একা, তারা কত লোক.. আলিজান, সে, নিধু, বলরাম, পাঁচু.. এত লোক তবু তারা একা, কেন? ”

সর্বহারা আলমের এই প্রশ্ন ‘ কন্ট্রোল্ড  ডেমোক্রেসি’র আওতায় আবদ্ধ  পাঠককেও ভাবিয়েছে রাষ্ট্রে ঘটিত সকল অনিয়ম, অবিচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে গেলে কেন তারাও এক একজন একা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। নাগরিক সমাজেরতো এমন হওয়ার কথা নয়!

 

‘মল্লিকা বাহার’ গল্পটি প্রকাশিত হয় তিয়াত্তর বছর আগে চতুরঙ্গে। ভাষা পূর্বের গল্পগুলোর তুলনায় সাবলীল, ফিরে ফিরে পড়তে হয়নি। কিন্তু গল্পের শেষে টুইস্ট দেখে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। ধর্মের আগে মানবিক বোধের জয়ী হওয়ার গল্প ‘মতিলাল পাদরী’ একটি অসাধারণ সংযোজন। অন্যদিকে বাস্তবতার কাছে হার মানা মানবিকতার গল্প ‘তাহাদের কথা’ কমলকুমারের আরেকটি অসাধারণ কীর্তি। পিতার জন্য শিশুপুত্র জ্যোতির অন্তরে লালিত স্নেহের আবেগ পাঠকের হৃদয়কে যখন আর্দ্র করে তখন পাঠক জানতে পারে স্নেহ কখনো কখনো ঊর্ধ্বগামী হয়। উল্লেখ্য যে এই গল্প অবলম্বনে নির্মিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমাটি আমার আগেই দেখা।

একজন শিখ সৈনিক, যুদ্ধে বোমায় আধেক বিধ্বস্ত এক দালানের ভেতর অকস্মাৎই মুখোমুখি হয় এক পরমা সুন্দরীর যে সম্ভবত কোমায়। এই নারীর মুখোমুখি হতে গিয়ে এই সৈনিক মূলত নিজেরই মুখোমুখি হয়। চারপাশের আবহ, চাপ, আশঙ্কার সাথে ঢেউ খেলে ওঠানামা করে তার মনস্তত্ত্ব। এ এমন এক গল্প যেখানে যুদ্ধকে পেছনে রেখে সক্রিয় হয়েছে যুদ্ধ দ্বারা এক যোদ্ধার ভেতর সৃষ্ট অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা ও হ্যালুসিনেশনের এক অদ্ভূত মিশ্রণ। অসাধারণ এই প্লটে লেখা গল্পটি হলো ‘ফৌজ-ই- বন্দুক’।

অভাব অনটনের সংসারের এক করুণ আখ্যান ‘ নিম অন্নপূর্ণা ‘। অভাবের গল্প অনেকই লেখা হয়েছে কিন্তু কমলকুমারের মত করে এভাবে কে আর লিখতে পেরেছেন। যা কিছু সংসারে থাকে যা দেখার সাহস আমরা করতে পারি না,  সেসব ধূসর জায়গাতেই যেন প্রদীপ মেলে ধরেন কমলকুমার। শুরুতে কিছুটা শ্লথগতি সম্পন্ন হলেও ‘কয়েদখানা ‘ চিত্ত টানলো। বিশেষ করে লেডি ম্যাকবেথের মতো অত্যাচারী জমিদারের মানসিক যন্ত্রণা পাঠকের জন্য স্বস্তির।

‘রুক্সিনীকুমার’ বুঝতে আমার ঝামেলা হয়েছে। এক তরুণ বিপ্লবী স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত। ফিউজিটিভের জীবন,  এক কুষ্ঠরোগীর প্রেমে পড়ে (পড়ে কি না তা-ও বুঝি নাই) তারপর নিজেও রোগাক্রান্ত হয়। এরপর রাস্তায়  গুলি খেয়ে মারা যায়। এই গল্প আমার ভালো লাগেনি তেমন।

গল্পের বিষয় বৈচিত্র্যে যে কমলকুমার অনন্য তারই সাক্ষ্য বহন করে ‘ লুপ্ত পূজাবিধি ‘গল্পটি। কনভেন্টের শিক্ষার্থী, উচ্চবিত্তের এক পরিবার থেকে আসা বালিকার ডেমো ক্লাসে ব্যবহৃত এক পুতুল চুরির গল্প। নিছক খেয়ালের বশে তুলে নেয়াকে কি চুরি বলা যায়? বিশেষ করে কিছু পরেই যার প্রতি সকল আগ্রহ হারিয়ে যায়! চুরিই যদি না হবে তবে সেটি কী? খেলা? গল্পটি প্রকাশিত হয় কৃত্তিবাসে, ১৯৭২ সালে,  জানু-মার্চ সংখ্যায়।

নিমন্ত্রণ খেতে গিয়ে অতিভোজনে অসুস্থ হয়ে পড়া এক ব্রাহ্মণ ও তাঁর বিব্রত পুত্রের গল্প ‘ খেলার বিচার’।  এই সুপুত্র আবার সদ্যই নিম্ন মাধ্যমিকে প্রথম হয়েছে। ওজনে ভারী এক মন-চেতনা সে পেয়েছে তার মায়ের কাছ থেকে। তাই আত্মাভিমানটুকুও কড়কড়ে। সাথে আছে মমতার ডিপো ছোট একটি বোন, প্রয়োজনে কষে বকতে যে ছাড়ে না। বশে, রসে ভরপুর এই গল্প শ্রাদ্ধের নেমতন্নের পঞ্চ ব্যঞ্জনের মতই অতি সুস্বাদু। শেষাংশটুকু তদীয় খাসা।

‘খেলার দৃশ্যাবলী’ ও ‘ অনিত্যের দায়ভাগ’ গল্প দুটিকে যুগলবন্দী হয়তো বলা যায়। এরূপ ভাবনার একটি হেতু দু’টি গল্পেই গল্পকার গল্পের ছলে মূলত দর্শন দর্শালেন। ভাষাগত বিচারে সম অভিব্যক্তির প্রকাশ এরূপ ভাবনার পশ্চাতে ঘটিত অপর কারণ। গল্প দু’টি সহজবোধ্য নয়। কমলকুমার নিজেই বলেছেন, পাঠকের কাজ অলস ও অনায়াস পাঠে সীমাবদ্ধ নয়। ঈশ্বর প্রদত্ত মেধা ও ঘটের বুদ্ধি পাঠককে ব্যবহার করতে হবে। যা’হোক, প্রথম গল্পটির পটভূমি এক কয়েদখানা ও পরবর্তীতে এক বিচারালয় যেখানে কতিপয় কয়েদীকে কোনো বিশেষ উপলক্ষ্যে মুক্তি দেবার নিমিত্তে তাদের বিচারকার্যের রিভিউ চলে। যেখানে  এমন এক নারী কয়েদি আছেন আত্মরক্ষার নিমিত্তে যাঁর হাতে কতিপয় হত্যা সংঘটিত হয়। পরবর্তী গল্পটি এক বালক হোস্টেলে প্রেমঘটিত বিষয়কে অবলম্বন করে ডালপালা মেলেছে অন্য কোথাও। উভয় গল্পের ক্ষেত্রে লক্ষনীয় বিষয় এই যে, উভয় ক্ষেত্রে ঘটনার চাইতে অধিকতর গুরুত্ব পেয়েছে এতদ বিষয়ে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যাখ্যা।

মৃতার উদ্দেশ্যে গাওয়া সমবেত সংগীতের আবহে শুরু হয় গল্প ‘বাগান দৈববাণী’। অকস্মাৎ, বহুদিন ধরে অকেজো হয়ে থাকা ঘড়িতে অ্যালার্ম বেজে উঠলে গল্পের মোড় ঘুরে যায়। ‘মিস্টিরিয়াসলি’ অকস্মাৎ বেজে ওঠা অ্যালার্মের রহস্যভেদের পরিবর্তে বাগাড়ম্বররত এক সবজান্তা দাবি করে বসে এক্ষণে ‘মিস্টেরিয়াস’ শব্দের প্রবক্তা সে।  আছেতো আমাদের চারপাশে এমন ব্যক্তি, নিজেকে জাহিরের নেশায় মত্ত মানুষ, আশেপাশের মানুষের উপেক্ষাকে উপেক্ষা করেই ‘ আমি আমি আমি’ করতে থাকা মানুষ তো বিরল নয় ( সমারসেটের  গৎ. কহড়ি অষষ মনে পড়ে গেলো)। গল্পের মূল বিষয় সম্ভবত সেসব আত্মম্ভরিকতা নয়। বরঞ্চ মনে হতে পারে মৃত ঘড়িতে হঠাৎ বেজে ওঠা অ্যালার্ম বুঝি সংকেত দিল সদ্য মৃতার দেহঘড়ি পুনরায় সচল হলো কি না তা-ই একবার নিরীক্ষণের। গল্প বটে, এমনই এক গল্প যা পাঠ করতে করতে পাঠক গল্পের সঠিক দিশায় আছে কি না তা ভেবেই কূল পায় না।

মদ্যপ (হয়তো সিজোফ্রেনিকও) এক ম্যাজেশিয়ানের অন্ধকার ভীতির গল্প ‘কঙ্কাল এলইজি’। যে অন্ধকারের উৎস কঙ্কাল শায়িত এক ট্রাঙ্ক হতে নির্গত জলস্তম্ভের মত ধোঁয়া। যে অন্ধকার নিয়ে আসে নদীগর্ভের বিষণœতা। তীব্র আতঙ্কে বাক্ শক্তিহীন যাদুকরকে নিয়ে লেখা এই গল্পে আছে একটিই দৃশ্য। আর এই একটি দৃশ্যের ভেতর কমলকুমারের কলমকে বাহন করে স্মৃতি বয়ে আনে আরো আরো দৃশ্য। এই গল্প এক ঘোর অন্ধকার ও তার কাছে পরাস্ত যাদুকরের গল্প। এই অন্ধকার বিলস্থিত সর্পের ন্যায় ক্রুদ্ধ। মানব মনের একটা দুর্বিষহ অবস্থা আতঙ্ক, এ অবস্থাকে শব্দের ধুম্রজালে ঘিরে ঘিরে বাগে এনে পাঠকের পাতে তুলে দিলেন কমলকুমার। ‘কঙ্কাল এলইজি’ একটি অসাধারণ গল্প।

কর্পোরেট জগৎ, তার কায়দা-কানুন, সহবৎকে বিষয় করে লেখা গল্প ‘ দ্বাদশ মৃত্তিকা’। যেখানে ‘ নিজের সহিত নিজের  চেহারার আশাতীত অদ্বিতীয়তা’ পরিলক্ষিত হয়। কোনো চরিত্রেরই নাম উচ্চারিত  না হওয়া এই গল্প সম্ভবত নিরীক্ষাধর্মী। তদপরিবর্তে একেকটি চরিত্রকে একেকটি বর্ণ দ্বারা চিহ্নিত করা হলো। উর্ধ্বতন কর্তাকে খুশি রাখার জন্য অধস্তনের প্রাণান্ত চেষ্টা গল্পটিকে আজও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।

“অতি গভীর মনের কথা কহিতে, চোখ নিজেই অক্ষরে পরিণত হয়।” এমন চমৎকার একটি বাক্য দিয়ে ‘পিঙ্গলাবৎ’ গল্পের শুরু। এই গল্প বোধের গল্প, অস্তিত্ব সংকটে ভোগা এক তরুণীর বোধ। আত্মবিশ্বাস ফিরে এলে পিঙ্গলাবৎ চোখে সেই বোধের ভাষা পড়া যায়।

‘খেলার আরম্ভ’, পুজিবাদ এমন এক মায়িক জগৎ যেখানে সবই বিকোয়, স্বপ্ন, সাধ, শ্রম, মেধা এমন কি সুখ -দুঃখ। এই মায়িক জগতে এমন কি বিপ্লবও হতে পারে সাজানো খেলা, খেলার ক্রীড়নক হিসেবে থাকে মানুষেরই বোনা রাজনীতির জাল। মানুষ সবই বোঝে তবু এই জাল ছিঁড়ে বেরুতে পারে না। কোথাও হয়তো দানাবেঁধে ওঠে নক্সালবাড়ি আন্দোলন। এই গল্পের বিষয় পুঁজিবাদের আদ্যোপান্ত উদঘাটন নয়। বরঞ্চ এ গল্প এমন এক স্কুল বালকের গল্প যে অশ্লীলতার দায়ে এক মাসের ডিটেনশনে আছে। যার চারপাশে ঘিরে আছে ঘোর অন্ধকার, যেখানে কেউ কাউকে দেখতে পায় না। এখানে কেবল আততায়ীরা চক্ষুষ্মান। সমাজের নানা অসঙ্গতি নিয়ে মাইমশো করা এই বালক অদ্ভুত মন্ত্রবলে অন্ধকার ছড়িয়ে দেয় কক্ষজুড়ে। মায়ের প্রতি পুষে রাখা ঘৃণা সে ছড়িয়ে দেয় তাবৎ নারীর উদ্দেশ্যে।

গল্পের শিরোনাম, ‘বাগান কেয়ারি’। অরণ্যরাজি উজাড় করে নগর পত্তন হচ্ছে কোথাও। একটা কনস্ট্রাকশন সাইটে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায় আদিবাসী শ্রমিক। এক বৃদ্ধা শ্রমিকের উপর দায়িত্ব বর্তায় এই যুবককে বাঁচিয়ে তোলার। ঘুরে ঘুরে নৃত্য করে আর মন্ত্র আওড়ায় সে। যোগ দেয় আরও তিন নারী শ্রমিক। বৃদ্ধা ঘোষণা দেয়, পাখি উড়ে গেছে। পর পর তিন রমনীর স্পর্শেও যে জেগে ওঠে না সে মৃত, সে মৃত, সে মৃত। কমলকুমার মজুমদারের গল্প কোনদিকে মোড় নেবে বলা মুশকিল।  দেখা গেলো আহাজারি করা ঠিকাদারের কাছে মৃতের চাইতে মৃত্যু বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ক্ষতিপূরণের ল্যাঠা চুকাতে হয়। তাই জোর গলায় চলে মৃত্যুকে অস্বীকার। ওদিকে কর্পোরেট টেবিলে জমে ওঠে মৃত্যু বিষয়ক তাত্ত্বিক আলোচনা। কমলকুমারের পর্যবেক্ষণে চমৎকার একটি গল্প, দুর্র্ধষ তার বয়ান। এটি এমন একটি গল্প যেখানে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে না। সাপ সামনেই থাকে কোট-টাই-স্যুট পরে। আদিবাসী সহজ সরল মানুষদের পাহাড় থেকে অরণ্য থেকে বের করে এনে শ্রমিকরূপে নগরায়নে সম্পৃক্ত করা হয় এমন জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে যে জীবন থেকে জীবন চুরি হয়ে যায়।

পরবর্তী গল্পের শিরোনাম ‘ আর চোখে জল’। ‘আর চোখে জল’ সমাজে, রাষ্ট্রে শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান- গরিমায়, অর্থ-বিত্তে যাঁরা উঁচু অবস্থানে আছেন অর্থাৎ যারা এলিট তাদের কথা বলে। তাদের জীবনাচরণ, শিল্প – সংস্কৃতি, রুচি, শখ, চিন্তা-চেতনা ( বিবিধ বিষয়ে) ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে। সেসব তুমুল আলোচনার কোথায় যে গল্প লুকিয়ে আছে তা এই অধম পাঠক উদ্ধার করতে সক্ষম হয় নি। পাঠ শেষে নিজেকে বড়ই অবোধ বোধ হলো।

স্বামী-স্ত্রী, আর তাদের ঘরে সন্তান সহ আটপৌরে সংসার। সেই সংসার অলক্ষ্যে দেখে প্রতিবেশি যুবক। সে যে দেখে তা-ও লক্ষ করা হয়। ঘটনা এটুকু কিন্তু তার ব্যাখ্যা হতে পারে নানাবিধ। গল্প ‘বাগান পরিধি’।

বৃটিশদের হতে মুক্ত স্বাধীন দেশেই দানা বাঁধে অসন্তোষ। হয় আন্দোলন,  হয় আন্দোলন প্রতিহতের চেষ্টা। আছে খুনখারাবি। তথাপি বলা যায় অনেকটা নৈর্ব্যক্তিকভাবে লেখা হয়েছে গল্প ‘কালই আততায়ী’।

‘জাস্টিস’ গল্পটি সহজ (তুলনামূলক) গদ্যভাষায় লেখা। এতটাই সহজ যে তা আদৌ কমলকুমারের কি না তা নিয়ে সংশয় জাগে। সংশয় তিরোহিত হয় গল্পের বিষয়বস্তু অনুধাবন করে।

সহজ ভাষায় লেখা আরেকটি গল্প ‘প্রেম’। শেষ হয়েছে অদ্ভুতভাবে। গাধার টুপি খেদ করে মানুষ পরে বসে থাকে ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছেয়। হায় প্রেম, হায় গাধার টুপি।

রেলে দেখা, এক প্রিন্সেস ও এক কম্যুনিস্ট বিপ্লবী। প্রথমে ঠোকাঠুকি তারপর আলাপ এরপর সখ্যতা। আবার প্রেমও? ওভার ডোজ হয়ে যায় না! বিপ্লবী জানতো ঝুঁকি আছে, রাজকুমারী জানতো নতুন বন্ধুর পরিচয় ফাঁস হলে গ্রেপ্তার এড়ানো যাবে না। তবু তা-ই হলো। যা অনিবার্য তাকে কে কবে ঠেকাতে পেরেছে!  গল্পের শিরোনাম ‘ প্রিন্সেস’।

‘বাবু’ গল্পটি আবারও কমলকুমারের বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে বৈচিত্রকে স্পষ্ট করে তুলেছে। গল্পটি মুগ্ধ করলো।

 

ইনোসেন্স দিয়ে যে গল্পটি শুরু হয়েছিলো তা শেষ পর্যন্ত জটিলতর হয়ে উঠলো। বলছি বইয়ের শেষ গল্পটি সম্পর্কে, শিরোনাম ‘আমোদ বোষ্টমী’। গল্পটি সুন্দর, ভাষা সহজ ও প্রাঞ্জল। এটি প্রকাশিত হয়েছে ১৯৮৮ সালে।

বইটিতে সুনীল গল্পগুলোকে প্রকাশের কাল ক্রমানুসারে সাজিয়েছেন। দেখা গেলো, কমলকুমার মজুমদারের গদ্যভাষা কাল ক্রমে কঠিন হতে সহজিয়ার দিকে ধাবিত হয়েছে। আমি বুঝলাম ‘সহজ’ হলো ম্যাচিউরিটি।

কমলকুমারের তাঁর নির্দিষ্ট ভাষা রীতি মানলেও অলঙ্করণে সব সময় একই রকম থাকেন নি। তাঁর অনেক দূর ঘুরে ঘুরে কথা বলার যে স্টাইল তিনি অনেক গল্পে (বিশেষ করে প্রথম দিককার) ব্যবহার করেছেন তা তাঁর গল্পকে অনেক কথা না বলেও বাঙময় করেছে। স্বাদ বিচারে তাঁর সেসব লেখা ইনস্ট্যান্ট নুডলস নয় বরং এরাবিয়ান মাহলাবিয়া বলা যায়। যখন খাচ্ছি বুঝে উঠতে পারছি না, খাওয়া শেষে মুখে স্বাদটা লেগে রইলো। অথবা আমলকির মতো। যখন খেলেন তখন একরকম, খাওয়া শেষে পানি খান স্বাদ ছড়ালো অন্যভাবে।

কমলকুমার মজুমদারের গল্পের বিষয়গুলো আমাকে চমকিত করেছে ভাষার চেয়ে বেশি। ভাষার নীল জমিনে সেগুলো যেন একেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।

পুনশ্চ:

অনেক গল্পের শুরুতে স্মরণ করার মাধ্যমে কমলকুমার মজুমদার এই মর্মে সাক্ষ্য দেন যে তিনি রামকৃষ্ণের অতিশয় ভক্ত।

বইয়ের শেষের দিকে কমলকুমারের তিনটি অসমাপ্ত গল্পের (কিংবা একই গল্পের তিনটি পর্ব) খসড়া জুড়ে দেয়া হয়েছে। লক্ষ্যণীয় যে তিনটি খসড়াতেই তিনি প্রায় একই রকম ভূমিকাকে কিছু এদিক ওদিক তারতম্যে তিনভাবে লেখার প্রয়াস নিয়েছেন।  এ থেকে তাঁর লেখালেখির প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা বা পদ্ধতি সম্পর্ক একটা ক্ষীণ আভাস পাওয়া যায়।

 

 

ফাহমিনা নূর, শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার

প্রাচীন বাংলার নাগরিক জীবনে শিল্প ও সৌকর্য

ড. আবু নোমান এখন প্রাচীন বাংলার যে স্থাপত্যগুলো পাওয়া সম্ভব সেগুলোকে প্রত্মতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ বললেও বলা যেতে পারে। স্থাপনা সমাজের সভ্যতার একটি অন্যতম নিদর্শন বা উপাদান।

বৈষম্যমূলক কোটা প্রথায় মেধাবীরা বঞ্চিত হবে (সম্পাদকীয়- জুলাই ২০২৪)

সরকারী চাকরীতে কোটা প্রথা কোন ভালো বা গ্রহণযোগ্য প্রথা হতে পারেনা। এতে প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হয়। প্রশাসনে মেধাবীর চেয়ে অমেধাবীর আধিক্য বেশী বলে রাষ্ট্রীয় কাজে

আহমদ ছফা বনাম হুমায়ূন আহমেদ

মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ তখন আহমদ ছফার পিছন পিছন ঘুরতেন। লেখক হুমায়ূন আহমেদ-কে প্রতিষ্ঠার পিছনে যে আহমদ ছফার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, সে কথা