এখন সময়:রাত ১২:০৪- আজ: বৃহস্পতিবার-১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

এখন সময়:রাত ১২:০৪- আজ: বৃহস্পতিবার
১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

মুজিব মৌলিক : মুহম্মদ নূরুল হুদার মৌলিক চিন্তাপ্রসূত

শাকিল আহমদ: 

মুহম্মদ নূরুল হুদা (১৯৪৯) কবিতার ক্ষেত্রে যেমন সীমারেখাকে ভেঙে ভেঙে ক্রমাগত নতুন সীমা রেখা সৃষ্টিতে প্রয়াসী, ঠিক তেমনিভাবে মননশীল সাহিত্য প্রবন্ধের ক্ষেত্রেও চিন্তায়-চেতনায়, বিষয়বস্তু নির্বাচনে এবং শব্দ ও উপমা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড়াবড়ই অত্যন্ত সজাগ ও সুচারু দৃষ্টিসম্পন্ন। তাঁর চিন্তাশীল প্রবন্ধ বিশেষ করে ব্যক্তিসত্তার বিচার ও মূল্যায়ন এবং সাহিত্য বিশ্লেষণ মূলক গ্রন্থগুলো থেকে আমরা আহরণ করতে পারি নতুন তথ্য-উপাত্ত। নতুন রস ও স্বাদ আর নবতর দৃষ্টিভঙ্গি। কবিতার মতো প্রবন্ধ সাহিত্যেও বাক্য গঠন ও বেছে বেছে শব্দচয়ন করে গদ্যকে নির্মাণ করেন কাব্যিক আবহে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা রচিত ‘মুজিব মৌরিক’ (মার্চ-২০২৩) প্রবন্ধ গ্রন্থটির শিরোনাম দেখেই পাঠকের মনে চিন্তার দোলা লাগে। গ্রন্থটির ভেতরে প্রবেশ করতে তাড়িত করে। পাঠশেষে এক ধরণের মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করে।

১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে থেকে ২০২৩ অবধি অর্থাৎ প্রায় অর্ধশত শতাব্দীকাল ধরে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গ্রন্থিত হয়েছে হাজার বই। এক্ষেত্রে মনন সমৃদ্ধ গ্রন্থের সংখ্যাও নেহাৎ কম নয়। এর পেছনে অবশ্য সৃজনশীল মানুষের আবেগ-ভালোবাসা কাজ করেছে। তবে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সুচিন্তিত ধারাবাহিক গবেষণা, তাঁর কর্ম ও জীবন থেকে উৎসারিত আদর্শ, চিন্তা-চেতনাকে ধারণ করে সে হিসেবে কম সংখ্যক গ্রন্থই সুচিবদ্ধ হয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের মেধাবী সুক্ষ্ম চিন্তক সমাজকে আরো শ্রমলব্ধ ভূমিকা রাখতে হবে। ‘মুজিব মৌলিক’ গ্রন্থের লেখক মুহম্মদ নূরুল হুদা প্রণীত গ্রন্থে বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের প্রাণভোমরা শেখ মুজিব সম্পর্কে পাঠক-মনকে নতুন করে আলোড়িত করে, বিবেককে জাগ্রত করে।

 

গ্রন্থটির ‘মুজিব মৌলিক’ প্রথম প্রবন্ধটিকে মুহম্মদ নূরুল হুদার চিন্তা প্রসূত বিশ্লেষনী মূল্যায়নটির কিয়দংশ তুলে ধরা যাকÑ

‘‘…নিজের এই বোধও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া তাঁকে একই সঙ্গে তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও প্রয়োগবিদে রূপান্তরিত করেছে। তিনি প্লেটো-অ্যারিস্টটল কথিত সেই কিংফিলসফার বা ফিলসফার-কিং, যিনি তাঁর নিজের তত্ত্ব নিজেই বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছিলেন। এই নিয়েই তার মুজিবীয় রাষ্ট্র দর্শন। এটি তাঁর বোধ থেকে উৎসারিত হয়ে বাংলাদেশ সংবিধানে চার মৌল নীতি রূপে প্রতিফলিত জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। প্রতিটি নীতির ক্ষেত্রে তাঁর নিজের ব্যতিক্রমী উপলব্ধি, ব্যাখ্যা ও সমন্বয়-সূত্র শনাক্তযোগ্য। তিনি ব্যক্তি, পরিবার, গোত্র, জাতি ও মানবজাতির মধ্যে হিতকার সম্পর্ক ও সুবন্টনে অঙ্গীকৃত। গণতন্ত্র তার কাছে ক্ষমতারোহনের অস্ত্র কেবল নয়, বরং গণমানুষের কল্যাণমন্ত্র। সমাজতন্ত্র প্রধানত সামাজিক ন্যায় বিচার ও সম্পদের সুষম বণ্টন। ধর্মনিপেক্ষতা, সব ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহবস্থান, কোনভাবেই ধর্মহীনতা নয়। তাঁর সংগ্রামেরও দুই প্রধান পর্ব: গণতান্ত্রিক মুক্তিযুদ্ধ ও প্রয়োজনে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। এভাবেই তিনি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নৈয়ায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এক মৌলিক মানুষ। ব্যক্তি, জাত ও মানবজাতি তাঁর বোধে মঙ্গল নিক্তিতে সুবিন্যস্ত। তাঁর পরিচয় বাঙালি, মানুষ, বঙ্গবন্ধু, বিশ্ববন্ধু ও মানববন্ধু। সব মিলিয়ে তিনি এক সচেতন মৌলিক চিন্তক। তাই তিনি অনন্য। তাই তিনি মুজিব মৌলিক” (পৃষ্ঠা-১৪)। মুজিব মৌলিকের নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা এর চাইতে অন্য কিছু হতে পারেনা।

‘মুজিব মৌলিক’ গ্রন্থে অন্তর্ভূক্ত আছে ১২টি প্রবন্ধ। পর্যায়ক্রমে প্রবন্ধগুলির শিরোনাম নি¤œরূপ: মুজিব মৌলিক, নজরুল ও বঙ্গবন্ধু উক্তি ও উপলব্ধির অভিব্যক্তি, নজরুলের ‘জয় বাংলা’, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মানবিক মূল্যবোধ, আমার দেখা নয়াচীন : বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র দর্শনের উৎসসূত্র, জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ ও তার ¯্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ মুজিব থেকে শেখ হাসিনা: জয় ও বিস্ময়, পনেরোই আগস্ট: শোক থেকে শক্তি, বাঙালির সব শিশু তোমার রাসেল, শেখ হাসিনার মানবিকতা, নান্দনিকতা ও শান্তিসাধনা, সংশপ্তক শেখ হাসিনা, স্বাধীকার থেকে সাংবিধানিক নান্দনিকতা, এছাড়াও যোজনাংশ: কবিতায় রয়েছে মুহম্মদ নূরুল হুদা রচিত তিনটি কবিতা: মুজিব মানবিক, তুমিই শিশু তুমিই পিতা, অনন্ত মুজিব জন্ম।

 

এই তিনটি সম্পূরক কবিতা যেন বারটি গদ্যের সার সংক্ষেপ। একজন পাঠক অবলিলায় ঢুকে যার গদ্যের ভূবন থেকে পদ্যের ভেতর এবং সেখানেও খুঁজে পাবে একজন সতন্ত্র মুজিবকে। ‘অনন্ত মুজিব জন্ম’ শেষ কবিতাটির প্রথম আট লাইন উচ্চারণেও পাঠকের উপলব্ধি জাগবে নি:সন্দেহেÑ

“মুহূর্তে মুহূর্তে তুমি জন্ম নাও তোমার ভিতর

মুহূর্তে মুহূর্তে তুমি জন্ম নাও আমার ভিতর

মুহূর্তে অনন্ত জন্ম,এই মাটি অমরা বাসর;

বাঙালি মুজিব জাতি, চিরবাংলা মুজিবের ঘর।

 

কে বলে তোমার জন্ম এই বঙ্গে শুধু শতবর্ষ আগে?

কে বলে তোমার জন্ম থেমে গেছে ঘাতক মৃত্যুতে?

তুমি আছো স্বর্গে-মর্ত্যে উদয়াস্ত অভ্র অনুরাগে,

পলে পলে পল্লবিত, সর্বভূতে, সব ফলন্ত ঋতুতে।’’

(অনন্ত মুজিব জন্ম, পৃষ্ঠা-১৪৪)

 

চিন্তক মুহম্মদ নূরুল হুদা রচিত এই গ্রন্থের সবচাইতে দীর্ঘ সুক্ষ্ম বিশ্লেষণমূলক, সংবেদনশীল ও তুল্যমূল্যে অসাধারণ প্রবন্ধটির নাম ‘নজরুল ও বঙ্গবন্ধু উক্তি ও উপলব্ধির অভিব্যক্তি’। এই প্রবন্ধটি পাঠে আমাদের বোধদয় ঘটে নূরুল হুদার গবেষণার বিশ্লেষণী ক্ষমতা কতটা গভীরতর যুগপৎভাবে মুজিব ও নজরুলকে বেষ্টন করে। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে নজরুল ও বঙ্গবন্ধু মুসলমান সমাজের অন্যতম প্রতিভাধর পুরুষ এবং উভয়েই ছিলেন অসাম্প্রাদায়িক চেতনার এক লৌহ মানব। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের এই দুই প্রাণভোমরা সম্পর্কে গবেষক নূরুল হুদার নিবন্ধে বলা আছেÑ দু’জনই মৌলিক কবিÑএকজন কবিতার অন্যজন রাজনীতির। নজরুল এবং বঙ্গবন্ধুর মধ্যে অনেক মিল-অমিলের সেতুবন্ধন নিয়ে তুলনামূলক আলোচনার ব্যাপ্তি ঘটে মূলত (আনুষ্ঠানিকভাবে) ১৯৯৭ সালে। নজরুল জন্ম শতবর্ষ উদযাপনের বছর দুুয়েক আগে এর আলোচনার ফল স্বরূপ ১৯৯৭ সালে নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে সম্পাদিত ‘নজরুল ও বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক সংকলন। ২০০৮ সালে এটি পরিবর্ধিত আকারে ‘বিদ্রেহী কবি ও বঙ্গবন্ধু’ নামে নতুন সংস্করণে প্রকাশিত হয় এতে নজরুল ও বঙ্গবন্ধুসহ ২৪ জন লেখকের রচনা প্রকাশিত হয়। গবেষক নূরুল হুদা মনে করেন এই দুই প্রমিত বাঙালির তুলনামূলক পরিবীক্ষনে এটি একটি সূচকগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নজরুল-বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু যেন এক সুতোই বাঁধা। দু’জনই একই সত্তা থেকে উৎসারিতÑ

“বাংলার জয়’ আর ‘জয় বাংলা”। তাঁদের এই অবিচ্ছেদ্য বন্ধনকে শেষ পর্যন্ত নূরুল হুদা তুলে ধরেন এভাবেইÑ“বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার বহু পূর্বেই বিদ্রোহী কবি চেতনারহিত হয়েছিল। সে ১৯৪২ সালের কথা। তারও প্রায় ত্রিশ বছর পরে ১৯৭২ সালের ২৪শে মে তিনি তার কাক্সিক্ষত স্বাধীন বাংলায় পদার্পণ করেছিলেন। আজ তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবি। স্বাধীন বাংলায় তাঁর এই আগমনে যিনি মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অর্থাৎ বাংলাদেশের জাতীয় কবিকে স্বাধীন বাংলায় নিয়ে আসার উদ্যোগ যে মূলত জাতির জনকের এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু জাতির জনকের ট্র্যজিক তিরোধানের পর স্বার্থন্বেষী মহল ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টায় লিপ্ত থেকে এই তথ্যকে লোকচক্ষুর আড়ালে রেখে দিয়েছে।” (পৃষ্টা-২৬)।

নজরুল সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়নÑ

“শুধু বিদ্রোহ ও সংগ্রামের ক্ষেত্রেই নয়, শান্তি ও প্রেমের নিকুঞ্জেও কবি বাংলার অমৃতকণ্ঠ বুলবুল। দুঃখের বিষয়, বাংলা ভাষার এই বিস্ময়কর প্রতিভার অবদান সম্বন্ধে তেমন কোনো আলোচনাই হলো না” (পৃষ্ঠা-৩৯)। বস্তুত সেদিন বঙ্গবন্ধু নজরুলের অবদান এবং অবহেলা এ দুটোকে অনুধাবন উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন গভীরভাবে।

 

নজরুলের সবচেয়ে বিস্ময়কর অবস্থান হলোÑতিনি রবীন্দ্রবলয়ে অবসস্থান করেও সৃষ্টিশীলতায় স্বাতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার জয়গান করেছেন। যা রবীন্দ্রনাথের বোধে নাড়া দিয়েছিল অনেকটা পরিণত বয়সে একেবারে জীবন স্বায়াহ্নে এসে আবুল ফজলকে লিখা ১৯৪০ সালের এক চিঠিতে। আবুল ফজলের চিঠির প্রতি উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখেনÑ ‘‘আপনার চৌচির’ গল্পটি আমার দৃষ্টিকে ক্লিষ্ট করেও পড়েছি। আমার পক্ষে এ গল্প বিশেষ উৎসক্যজনক। আধুনিক মুসলমান সমাজের সমস্যা ঐ সমাজের অন্তরের দিক থেকে জাগতে হলে সাহিত্যের পথ দিয়েই জানতে হবে। এর প্রয়োজন আমি বিশেষ করেই অনুভব করি। আপনাদের মতো লেখকদের হাত থেকে এই অভাব যথেষ্টভাবে পূর্ণ হতে থাকবে এই আশা করে রইলুম। চাঁদের এক পৃষ্ঠায় আলো পড়ে না, সে আমাদের অগোচরে। তেমনি দুর্দৈবক্রমে বাংলাদেশের আধখানা সাহিত্যের আলো যদি না পড়ে তাহলে আমরা বাংলাদেশকে চিনতে পারবো না। না পারলে তার সঙ্গে ব্যবহারের ভুল ঘটতেই থাকবে। কিন্তু এই পরিচয় স্থাপন ব্যাপারে কোন একটা জিদ বশত ভাষার প্রতি যদি নির্মমতা করেন তাহলে উল্টো ফল হবে…” (আবুল ফজল, ১৩৮২, পৃ. ১৩৮)। আর চৌচির সম্পর্কে নজরুলের মূল্যবান মন্তব্যটি গ্রন্থের ভূমিকাতেই উল্লেখ করা আছে।Ñ“আবুল ফজল একমাত্র মুসলমান বাঙালী। যাকে বর্তমান বাংলার শক্তিশালী গল্প লিখিয়াদের মধ্যে সম আসনে দেওয়া যায়। [….] এই তরুণ শিল্পীর মাঝে যে বিপুল সম্ভাবনা স্বপ্ন দেখেছি ‘চৌচির’র তারই অগ্রদূত।”

আমরা অনুধাবন করতে পারি অসাম্প্রদায়িক চেতনা নজরুলের সাথে রবীন্দ্রনাথও প্রকাশ করেছেন অন্তরের গভীরতা থেকে আবুল ফজলের লিখা চিঠির প্রতিউত্তরে। কিন্তু নজরুল অত্যন্ত সচেতন ভাবে উভয় সংস্কৃতিকে তাঁর সাহিত্যে প্রয়োগ দেখিয়েছেন। আর এই অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ও স্বাধিকার স্বপ্নে উদ্ভাসিত হয়ে একজন খোকা থেকে মুজিবরূপে জাতির পিতা ও বিশ্ব নেতায় পরিণত হয়।

জন্মগতভাবেই নজরুলের আবির্ভাব ঘটে এক পরাধীন ভারতবর্ষে। জীবন সংগ্রামের ভেতর থেকেই তিনি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর কবিতা ও গানেই স্বাধীনতার স্বপ্নের বীজ রূপিত ছিল Ñ‘‘নমঃ নমঃ নমো বাংলাদেশ মম/চির মনোরম চির মধুর।” অর্থাৎ নজরুল থেকে যে স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে বাঙালির সেই জাতিসত্তার বাস্তব রূপ ভাষা ও একাত্তরের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল। এক্ষেত্রে নজরুল এবং বঙ্গবন্ধু দুজনের মৌলিকত্বই স্বাধীন এক জাতী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা ছিল। এখানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তুলনামূলক আলোচনার অনন্য এক নিদর্শন গবেষক মুহম্মদ নূরুল হুদার বিশ্লেষণমূলক দীর্ঘ নিবন্ধ “নজরুল ও বঙ্গবন্ধু ভক্তি ও উপলব্ধীর অভিব্যক্তি”। বাঙালির দুই প্রাণ পুরুষ মৌলিক বঙ্গবন্ধু এবং মৌলিক নজরুল সম্পর্কে বিস্তারিত তুলনামূলক চিন্তাপ্রসূত বিশ্লেষণ রয়েছে নূরুল হুদার নিবন্ধে যা পাঠকের বোধকে আন্দোলিত করবে।

 

গবেষক নূরুল হুদার যৌক্তিক চিন্তাশক্তি থেকে উৎসারিত নজরুল ও বঙ্গবন্ধু দুই বৈশ্বিক উৎস থেকে ওঠে আসা বিশ্বপুরুষের উত্তর প্রজন্ম। দুজনেরই বংশ লতিকা পাশাপাশি সন্বিবেশনের মধ্য দিয়েই তিনি ‘নজরুল ও বঙ্গবন্ধু উক্তি ও উপলব্ধির অভিব্যক্তি’ শিরোনামের তূলনামূলক আলোচনাটি শেষ করেন। লেখকের শেষাংশের অংশ বিশেষÑ“সবশেষে বলতে চাই, নজরুল ও বঙ্গবন্ধু দুজনেই দুই বৈশ্বিক উৎস থেকে আসা সর্বমানবের মঙ্গলকামী দুই বিশ্বপুরুষের উত্তর প্রজন্ম। নজরুলের অষ্টম আদিপুরুষ সৈয়দ মহম্মদ ইসলাম এবং বঙ্গবন্ধুর অষ্টম আদি পুরুষ হজরত শেখ আউয়াল (র.), দুজনেই কামেল দরবেশ। বাংলার মাটি, জল, প্রকৃতি ও সংষ্কৃতির বৈচিত্র্যকে ধারন করেই সমুত্থিত তাঁদের ঐক্যসত্তা। এই বাংলার জলেস্থলে সর্বভূ-তে লালিত ও পরিপুষ্ট তাঁরা দুই বিশ্ববাঙালি। তাঁরা বাংলায় জন্ম নিয়েও বিশ্বভূমিপুত্র। তাই তাঁদের দৃষ্টি ও সৃষ্টিতে সখ্য। আমরা তাঁদেরই উত্তরসাধক” (পৃষ্ঠা-৫১)।

নজরুলের ‘জয় বাংলা’ নামক মুহম্মদ নূরুল হুদার তৃতীয় প্রবন্ধে তিনি ‘বাঙালি’ অভিধাটি খুঁজতে গিয়ে ‘বাংলা সাহিত্যের আদী নিদর্শন (সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী) চর্যাপদ ধরেই হেঁটে আসেন। চর্যাপদেই প্রথম বাঙালি শব্দের সন্ধান আমরা পাই সেই আদী কবি ভুসুকু পাদানামের বৌদ্ধ দোঁহাতেÑ

“আজি ভুসুকু বাঙালী ভইলী” (ভুসুকু পাদানাম, পদ-৪৯)। এর পর মধ্যযুগের আর এক কবি শ্রীধর দাসের জবানিতেও উচ্চারিত হলো তাঁর মাতৃভাষার নাম ‘বাংলা’। সপ্তদশ শতকের আর এক দেশপ্রেমিক কবি আবদুল হাকিম তো দেত্যহীনভাবে লিখলেনÑ

 

“যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”

 

ভাষা ভিত্তিক এই জাতিসত্তা মূলত ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, গোষ্ঠীকে অতিক্রম করে ক্রমে ক্রমে সার্বজনীনভাবে রূপ পেতে থাকে। বাংলা ভাষার ক্রম বিকাশের সাথে সাথে বাংলা ভাষাভাষী শাসক গোষ্ঠীর মধ্যেও যে জাতিসত্তার বিকাশ ঘটতে থাকে তা ইতিহাসের নানা আলোকে প্রতিয়মান হয়।

বাংলা ভাষার ক্রম বিবর্তনের ও বিস্তারের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতিসত্তার মৌলিক রূপ বিস্তার লাভ করে এবং নজরুল ও বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই পূর্ণতা পায়। তারই এক বিশদ ব্যাখ্যা নজরুলের ‘জয় বাংলা’ প্রবন্ধটি।

 

শক্তিমানদের এক মহত্মম দিক হচ্ছে ক্ষমা; এটি কোনো দুর্বলের অনুকম্পা হতে পারেনা কখনো। বঙ্গবন্ধুকে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পেছনে এই ক্ষমারও এক উল্লেখযোগ্য দিক রয়েছে। ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মানবিক মূল্যবোধ’ নিবন্ধটিতে লেখক শেঝ মুবিজের সেই আবাল্য শৈশব থেকে জেগে ওঠা মানবিকতার এক সুক্ষ্ম ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন নৈয়ায়িক ভাবে। মানবিক বিষয়টি নানা মাত্রায় পাঠকের কাছে খোলাসা করে তুলবার নিরন্তর চেষ্টা এই নিবন্ধে লেখকের রয়েছে।

মানবিক ও মানব মুক্তির অগ্রদূত শেখ মুজিবুর রহমানের সমগ্র জীবনাচরণকেই চিন্তক নূরুল হুদা তাঁর চিন্তা-বিশেষন, ভাষার মাধুর্য ও শব্দ প্রয়োগের সুনিপুন বিন্যাসে উপস্থাপন করেন এভাবেÑ

“কৈশোরেই তিনি শুরু করেছিলেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, যৌবনে ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে; আর পরিণত বয়সে অবমুক্তির পথ ধরে জাতিমুক্তির পক্ষে। তারই উত্তুঙ্গ অভিব্যক্তি একাত্তরের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা, যা সর্বকালের মানবমুক্তির এক চিরায়ত দলিল। “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এখানে আমাদের শব্দটি কালিক বিচারে ‘বাঙালি’ বোঝালেও তার ব্যাপক অর্থ দেশে দেশে যুগে যুগে মুক্তিকামী মানবগোষ্ঠী। ফলে এই মুক্তির ঘোষনা তার সর্বমানবিক মূল্যবোধ থেকেই এসেছে। একারণে হানাদার পাকিস্তানী সেনাদের ‘ভাই’ সম্বোধন করে তাদেরকে শান্তিপূর্ণভাবে ‘ব্যারাকে’ থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাহলে তাদেরকে কেউ কিছু বলবে না। পূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের ভেতরেও তিনি এভাবেব সাধারণ সৈনিক থেকে শুরু করে সেনানায়ক রাষ্ট্রনেতার প্রতি সদাচারী সম্বোধন জ্ঞাপন করেছেন। কেননা বাঙালির কিংবদন্তিপ্রতিম শান্তি সাধনা বঙ্গবন্ধুর মজ্জাগত। এটি জাতিবাঙালি ও জাতিপিতার ঐতিহ্যবাহী মানবিক মূল্যবোধ” (পৃ.-৭০)। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মানবিক মূল্যবোধের দিকটি স্বকীয়ভাবে সতন্ত্রভাবে পাঠকের সামনে সুনিপুনভাবে এক বাক্যে উন্মোচনের প্রচেষ্টা লেখকের এই প্রবন্ধে বিদ্যমান।

 

নবীন বয়সে একজন তরুণ রাজনীতিকের চীন ভ্রমণের মধ্য দিয়ে দেশের প্রতি মৌলিক চিন্তার উদ্রেক ঘটেছে তরুণ শেখ মুজিবের মনোজগতে। প্রত্যক্ষ চীন দর্শনের মধ্যে তার গভীর দেশপ্রেমেরও বিস্তার ঘটে মৌলিকভাবে। আর এসব বিষয়কে তুলে ধরেন নিবন্ধকার সুনিপুনভাবে “আমার দেখা নয়াচীন বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রদর্শনের উৎসসূত্র” প্রবন্ধটিতে যা পাঠকের মনে তরুণ বঙ্গবন্ধুর প্রতিভার প্রতি নতুনভাবে রেখাপাত ঘটে। তাঁর আরো পরিণত বয়সের রাজনীতিতে এই নয়াচীন ভ্রমণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় ও চিন্তায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। তিনি শুধু নয়াচীন ভ্রমণের সৌন্দর্যম-িত রূপান্তরিত চীনকে দেখে বিমোহিত হননি; এতে তাঁর স্বদেশের উন্নয়ন কল্পনার তৃতীয় চোখও খুলে গিয়েছিল। নয়াচীন পরিভ্রমণে নিজ দেশের প্রতি শেখ মুজিবের যে নতুন চিন্তার উদ্রেক হয়েছিল, সেই চিন্তাকে মনে-মগজে ধারণ করে তিনি ক্রমান্বয়ে বাঙালি, মানুষ,বঙ্গবন্ধু, বিশ্ববন্ধু ও মানববন্ধুর পথে হাঁটতে হাঁটতে এক মৌলিক চিন্তক তথা মুজিব মৌলিক রূপে ধরা দিয়েছে; আর এটাই গ্রন্থের অধিকাংশ প্রবন্ধে গ্রন্থকার তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়েছিন। লেখকের এই প্রয়াসভঙ্গির মধ্যেও ছিল ভিন্নতা তথা মৌলিকতা।

‘‘শেখ মুজিব থেকে শেখ হাসিনা : জয় ও বিস্ময়’’ প্রবন্ধে লেখক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পতাকাকে সমুন্নত রেখে যেই জয়যাত্রা শুরু করেছিলেন তা স্তব্ধ করতে পারেনি ৭৫-এর ১৫ আগস্ট; তাঁর এক ধারাবাহিক মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছেন। নিবন্ধের অংশ বিশেষ তুলে ধরা যায়Ñ

“তিন হাজার বছরের বেশি সময় ধরে অভিন্ন ভাষিক- সাংস্কৃতিক ভূখন্ডে বেড়ে ওঠা একটি জাতিগোষ্ঠীকে তিনি জাতিসত্তার ও সার্বভৌমত্বের জয় এনে দিলেন। এই জয় বাঙালির প্রথম সর্বব্যাপী জয় ও বিমুগ্ধ বিস্ময়। তারপর মাত্র সাড়ে তিন বছরের রাষ্ট্র পরিচালনার অতি সীমিত সময়ে তিনি সেই বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্রকে বিশ্বের বুকে ‘সোনার বাংলা’ নামক স্বপ্নপ্রতীকে একটি অগ্রসর উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করার পরিকল্পনাও প্রনোদনা দিলেন। (….) বাংলার সকল গণমানুষকে গণযোদ্ধায় পরিণত করে সেই আশির শুরু থেকে তাঁর (শেখ হাসিনার) যে সামষ্টিক মুক্তিযুদ্ধ ও নৈয়ায়িক গণযুক্ত, তারই পরিণতি একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের শুরুতেই তথাকথিত ব্যর্থ রাষ্ট্রের অভিধা থেকে অব্যহতি। অতঃপর ২০২১ সালের মধ্যেই তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে” (পৃ. ৯২-৯৩)।

বঙ্গবন্ধুর মৌলিক অনেক বিষয়কে চিন্তক নূরুল হুদা তাঁর এই গ্রন্থের অপরাপর প্রবন্ধ সমূহে শুধু ধরিয়ে দেননি; বিশ্লেষণ-ব্যাখ্যাও করেছেন অনেক ক্ষেত্রে যৌক্তিকভাবে যা হয়তো আগে অনেকের চিন্তায় সেভাবে ধরা দেয়নি। যেমন গ্রন্থের শুরুতেই তিনি অল্প কথায় তাৎপর্যপূর্ণ শব্দের গাঁথুনিতে মুজিব মৌলিক সম্পর্কে বলেনÑ

“বিংশ শতাব্দীর তেমন এক তুমুল জ্ঞানবীক্ষণ ও বিদ্যামিশ্রণের যুগে স্বজ্ঞা, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়েওঠা এক মৌলিক মানুষের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।”

কবিতার ক্ষেত্রে যেমন  মুহম্মদ নূরুল হুদা সতন্ত্র অবস্থান তৈরী করে নিয়েছেন, তেমনী মননশীল সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তাঁর অবস্থান ব্যতিক্রমী। সাহিত্যের ঋদ্ধ সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ মুহম্মদ নূরুল হুদার প্রবন্ধ সাহিত্যের বিচার করতে গিয়ে ‘গহন উন্মুক্ত কিন্তু যুক্তিশীল’ প্রবন্ধে বলেছেন: ‘শিকরবদ্ধ বলেই মুহম্মদ নূরুল হুদা কোনো কোনো সমসাময়িক প্রাবন্ধিকের মতো কালাপাহাড়ি উক্তির চমকে জনচিত্ত আকর্ষণ করার চেষ্টা করেননি। নিজস্ব যুক্তির পারস্পর্যেই তিনি স্থাপন করেছেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা অন্য কোন লোকের বিচার।’ মান্নান সৈয়দের এহ্যান ব্যাখ্যার সিকি শতাব্দ পর এসে আজ যখন ‘মুজিব মৌলিক’ গ্রন্থের পাঠ নিতে যাই তখন মনে হয় এখন তিনি আরো এককাঠি ওপরে অবস্থান করছেন।

কক্সবাজারের পোকখালি গ্রামে বেড়ে ওঠা মুহম্মদ নূরুল হুদা মনে করেনÑ তিনি যদি শিক্ষার আলো, সভ্যতার ছোঁয়া না পেতেন তাহলে হয়তো তাঁর চার পাশের আলোহীন মানবসন্তানের মতো হয়ে উঠতেন নুনের দালাল, জলদাস, কাঠমিস্ত্রি কিংবা মুদি দোকানদার। কিন্তু শিক্ষা আর সভ্যতার আলোয় তিনি হয়ে ওঠেন জাতিসত্তা, তামাটে জাতি ও দরিয়ানগরের কবির পাশাপাশি মননসমৃদ্ধ একক মৌলিক গদ্যকার হিসেবে। এ ধারায় তাঁর আর এক ঋদ্ধ সংযোজন ‘মুুজিব মৌলিক’।

 

শাকিল আহমদ, প্রাবন্ধিক

বাজেটের সংস্কৃতি, সংস্কৃতির বাজেট

আলম খোরশেদ আর কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষিত হবে। আর অমনি শুরু হয়ে যাবে সবখানে বাজেট নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা। প-িতেরা, তথা অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার,

যৌক্তিক দাবি সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৩৫ বছর

দেশে চাকরির বাজার কত প্রকট বা দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কত তা নিরূপণ করতে গবেষণার প্রয়োজন নেই। সরকারি চাকরি বা বিসিএস ক্যাডারে আবেদনকারীর সংখ্যা দেখলেই

সংবর্ধনার জবাবে কবি মিনার মনসুর বঙ্গবন্ধু শব্দটি যখন নিষিদ্ধ ছিল তখনই আমি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করেছি

রুহু রুহেল সময়ের সাহসী উচ্চারণ খুব কম সংখ্যক মানুষই করতে পারেন। প্রতিবাদী মানসিকতা সবার থাকে না; থাকলেও সেখানে  সংখ্যা স্বল্পই। এই স্বল্পসংখ্যক মানুষের মাঝে  সৌম্যদীপ্র