এখন সময়:রাত ৮:১৯- আজ: রবিবার-১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ৮:১৯- আজ: রবিবার
১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

শিল্প সাহিত্যে বঙ্গবন্ধু : এক অনন্য সাহিত্যজগৎ

আ.ম.ম.মামুন :

‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি

প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে উঠে রণিÑবাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।’

অংশুমান রায়ের গাওয়া আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনি তোলা এ গান শুধু কোটি বাঙালির হৃদয়ে দোলা দেয়নি, তাকে শুধু উজ্জীবিত করেনি, পাশাপাশি এ গানের কথায় মুজিবের মহানায়ক হয়ে ওঠার কাহিনিও ব্যক্ত হয়েছে। একজন মানুষ যখন নিজের স্বার্থকে দেশের জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে এক করে নিতে সক্ষম হন, যে মানুষ গণমানুষের মর্মমূল স্পর্শ করেন, কোটি মানুষের আবেগ, অনুভূতি, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, তার আশা-আকাক্সক্ষাকে নিজের ভেতর ধারণ করার সক্ষমতা অর্জন করেন, তখনই তিনি মহনায়কে পরিণত হন। বিভূষিত হন জাতীয় বীরে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তেমনই একজন মহানায়ক। বাঙালি জাতির মুক্তির অপরাজেয় দূত ও দিশারী। ইতিহাসের এই ‘রাখাল রাজা’ ইতিহাসের পাশাপাশি সাহিত্যের শুভ্র পাতায়ও যে উজ্জ্বল উদাহরণ হবেন, শিল্প সৃষ্টির মূল প্রেরণা হবেন, আধার হবেন, কবিতার সমৃদ্ধ শব্দ হবেন, প্রাণবন্ত পঙক্তি হবেন তাতে আশ্চর্য হবার কী আছে?

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন। আমাদের আত্মপরিচয়ের স্মারক। মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব একসূত্রে গাঁথা। আরও স্পষ্ট করে বললে, বলা যায় বাঙালি, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু যেন মিলেমিশে একাকার, একাত্ম। মুক্তিযুদ্ধ ব্যতীত শেখ মুজিব আর শেখ মুজিব ব্যতীত মুক্তিযুদ্ধের কথা ভাবাই যায় না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। এক মুজিবই বহুধা বিভক্ত জাতিকে সংগ্রামের মন্ত্রে স্বাধীনতার স্বপ্নে মুক্তির মোহে এক করেছিলেন। ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, এক মুজিবের নামেই মুক্তিযুদ্ধ নামক মহাকাব্যটি রচিত হয়েছিলো। এই অবিচ্ছেদ্য মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবকে নিয়ে কত শত গ্রন্থ, কত বিচিত্র সাহিত্য রচিত হয়েছে তার হিসেব দেয়া মুশকিল। একজন ব্যক্তিকে নিয়ে যে একটি ব্যতিক্রম সাহিত্যজগৎ তৈরি হতে পারেÑ বঙ্গবন্ধু তার বিরল উদাহরণ।

শত সহস্র ছড়া, কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ নিবন্ধন, নাটক, চলচ্চিত্র ও চিত্রকলা তাঁকে কেন্দ্র করে বিপুল আগ্রহে আবর্তিত হয়েছে। বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনে এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে পরিমাণ লেখালেখি হয়েছে, হচ্ছে বিশ্বের আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেনি। বিপুলায়তনের বিচারে তাঁর সাথে কেবল লেনিনের তুলনা করা হয়ে থাকে। তাৎক্ষণিকভাবে হয়তো এটি বড় কোনো বিষয় নয়। কিন্তু সমসাময়িক বিশ্বের অন্যান্য নেতাকে নিয়ে রচিত লেখাগুলোকে যদি বিবেচনায় রাখি, তাহলে দেখবোÑ‘বিষয়ে, উপস্থপনায়, মাহাত্ম্যে, আবেগ প্রকাশের প্রাবল্যে, আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানে, ঐতিহ্যও জাতীয় চেতনায় উজ্জীবিত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত এই বিপুল আয়তন সাহিত্যকর্ম স্বত:স্ফূর্ত সমৃদ্ধ।’ স্বাধীনতা উত্তর বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত প্রথম বাংলা সম্মিলনে বঙ্গবন্ধু শিল্পসাহিত্যের বিষয়বস্তু সম্পর্কে চমৎকার বক্তব্য রেখেছিলেন। রাজনীতিতে তিনি যে আদর্শের জন্য লড়াই করেছেন সাহিত্যেও তিনি তার প্রতিফলন দেখতে চেয়েছেন। তাঁর মতে শিল্প সাহিত্যে দেশের দু:খী মানুষের কথা ফুটিয়ে তুলতে হবে। মানুষের কল্যাণে শিল্প সাহিত্যকে কাজে লাগাতে হবে। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতির যে শাখা প্রশাখা বিস্তার করেছে লেখনির মাধ্যমে তার মুখোশ খুলে দিতে হবে। বঙ্গবন্ধু রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা ও আমার দেখা নয়া চীন, তাঁর লেখা এই তিন গ্রন্থে তাঁর উপর্যুক্ত কথাগুলোর প্রমাণ মেলে।

ঠিক কখন শেখ মুজিব প্রথম মুদ্রিত হন সাহিত্যের শুভ্র পাতায়? উত্তর পেতে হলে আমাদের সময়ের সড়ক ধরে যেতে হবে অতীতে-একেবারে পঞ্চাশের দশকে। শেখ মুজিব তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। হঠাৎ করে চীন ভ্রমণের সুযোগ এলো। ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে তৎকালীন পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের কনিষ্ঠতম সদস্য হিসেবে তিনি চীন সফর করেন। একই সম্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক মনোজ বসু। একই হোটেলে থাকার সুবাদে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা শেখ মুজিব ও মনোজ বসুর অন্তরঙ্গ আলাপচারিতা উঠে আসে তার ‘চীন দেখে এলাম’ (১৯৫৩) ভ্রমণ গ্রন্থে।

এই প্রথম তিনি উঠে এলেনÑ‘তার আদি ও অকৃত্রিম চরিত্রসমেত সাহিত্যের কারুভাষ্যে।’ তারপর শেখ মুজিব মুদ্রিত হন খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস রচিত ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ (১৯৫৭) গ্রন্থে। তারপর বঙ্গবন্ধু স্বনামে উঠে আসেন ব্যঙ্গ বিদ্রƒপাত্মক কবিতা সংকলন ‘ধোলাই কাব্য’ গ্রন্থে। পাকিস্তানপন্থী কবিরা ছদ্মনামে তাঁকে আক্রমণ করেনÑ

‘মুখেই বটে শ্যাক সায়েব

ছল ফিকিরে ভরেন জেব,

অন্যকে তাই বলেন চোর

দেশের দশের খোঁড়েন গোর।’ (শ্যাক সায়েব)

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রচুর লোকছড়া, লোক গান রচিত হয় গত শতকের পঞ্চাশ-ষাট দশকে। বিশেষ করে বাঙালির ‘ম্যাগনা কার্টা’ খ্যাত ছয় দফাকে কেন্দ্র করে প্রচুর লোকগান মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। বঙ্গবন্ধু তখনো কিংবদন্তি হয়ে ওঠেননি। ষাট দশকের শেষের দিকে রচিত নির্মলেন্দু গুণের দীর্ঘ কবিতা হুলিয়া’র (প্রেমাংশুর রক্ত চাই) একাশিতম বাক্যে আমাদের চোখ আটকে যায়Ñ‘শেখ মুজিব কি ভুল করেছেন?’ প্রশ্নবোধক এ বাক্যে। খুব সম্ভব এই প্রথম তিনি মুদ্রিত হলেন কবিতার সমৃদ্ধ শব্দে।

১৯৭০ সালে নির্বাচনি প্রচারণায় সারা দেশের ইথারে ভেসে বেড়ানোÑ‘মুজিব বাইয়া যাওরে/ নির্যাতিত দেশের মাঝে/ জনগণের নাওরে/ মুজিব বাইয়া যাওরে।’Ñ গানটি শুধু আওয়ামী লীগকে নির্বাচনি বৈতরণী পার করেনি, বাংলা সংগীতে যুক্ত করেছে নতুন পালক। তারপর মুক্তিযুদ্ধ পর্ব। বঙ্গবন্ধু দেশে নেই। পাকিস্তানে বন্দি। কিন্তু বাঙালি জাতির আশা আকাক্সক্ষার প্রতীকে পরিণত হওয়া বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘এপার-ওপার’ দুই বাংলার প্রথম সারির কবি সাহিত্যিকরা দুহাতে কবিতা গান ছড়া লিখতে লাগলেন। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার অনন্য ভূমিকা উঠে আসে কবিতায়। কবি জসীমউদ্দীন লিখেনÑ

মুজিবর রহমান

ওই নাম যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি-উগারী গান। (বঙ্গবন্ধু)

১৯৭১ সালে কবি মযহারুল ইসলাম ‘একটি সূর্যের হাত’, হাবীবুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধু তুমি আছ বলে’ কবিতায় যুদ্ধচলাকালীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে অনিঃশেষ অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সশস্ত্র সংগ্রাম শেষে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বঙ্গবন্ধুকে ‘খাঁটি আর্যবংশসম্ভুত শিল্পী’ উল্লেখ করে একটি অসাধারণ প্রতীকধর্মী কবিতা লিখেছেনÑআবু হেনা মোস্তফা কামাল। ‘খাঁটি আর্যবংশসম্ভুত শিল্পীর কঠোর তত্ত্বাবধানে ত্রিশ লক্ষ কারিগর দীর্ঘ ন’টি মাস দিনরাত পরিশ্রম করে বানিয়েছেন এই ছবি।

(ছবি, আপন যৌবন বৈরী)

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের (১০ জানু. ১৯৭২) স্মরণীয় মুহূর্তকে ধারণ করে কবি কাজী রোজী লিখেছেনÑ‘১৯৭১; আবু বকর সিদ্দিক লিখেছেন ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ফেরা’ কামাল চৌধুরী লিখলেন-‘১০ জানুয়ারি ১৯৭২’

‘তিনি ফিরে আসলেন, ধ্বংসস্তূপের ভেতর ফুটে উঠলো কৃষ্ণচূড়া

মুকুলিত হলে অপেক্ষার শিমুল

শোক থেকে জেগে উঠল স্বপ্ন : রক্তে বাজল দারুণ দামামা’

সিকান্দার আবু জাফর লিখেছেন ‘ফিরে আসছেন শেখ মুজিব’, জাহিদুল হক লিখলেন ‘আপনি ফিরে আসবেন কবে’। দেশের আরও বহু কবি বঙ্গবন্ধুর বীরোচিত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং পরবর্তী দেশ পুনর্গঠন নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন।

কাল বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা সাহিত্যকর্মকে স্পষ্টতই দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পূর্ববর্তী সাহিত্যকর্ম যার কিছ নমুনা আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি। দ্বিতীয়ত: ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট পরবর্তী সাহিত্যকর্ম। বিষয় নির্বাচন, উপস্থাপনার ঔজ্জ্বল্য, বর্ণনার বর্ণবহুলতায়, আবেগের তীব্রতায়, প্রত্যক্ষতায় এবং সর্বোপরি গভীর তাৎপর্যে এ পর্বের রচনাগুলো অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং পাঠকমাত্রেই অভিনিবেশ দাবি করে। চেতনার রঙে রাঙিয়ে তোলা এ মুজিব অমর, অজর, চিরঞ্জীব। ‘সাহিত্যের শুভ্র কাফনে’ মোড়া শেখ মুজিব।

একথা সবার জানা যে, ১৯৭৫ পরবর্তী প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু লেখা সহজ ছিলো না। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় বেতার টেলিভিশন যেখানে তিনি অপসারিত, সভা সমিতি সেমিনার সিম্পোজিয়ামে নিষিদ্ধ নাম সেখানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি ছিল দুরূহ একটি কাজ।

সেই অসহনীয়, নিস্তব্ধ গুমোট পরিস্থিতিতে অনেকটা ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন কবি সাহিত্যিকরা।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর প্রথম কবিতাটি লিখেন বঙ্গবন্ধুর বাল্যবন্ধু মৌলভী শেখ আবদুল হালিম এবং তা আরবিতে। বঙ্গবন্ধুর মরদেহ কাফনে মুড়িয়ে সমাধিস্থ করার পর মনোবেদনা থেকে লেখা এই কবিতার বাংলা অনুবাদও তিনি করেন। কয়েকটি বাক্যÑ

………

আমি তোমার মধ্যে তিনটি গুণের সমাবেশ দেখেছিÑ

ক্ষমা, দয়া ও দানশীলতা…

সেহেতু অত্যাচারীরা তোমাকে হত্যা করেছে।’

(সূত্র : শহীদ বঙ্গবন্ধু উপর রচিত প্রথম আরবি কবিতাÑমাওলানা এম এ রহিম।)

আগস্ট ট্র্যাজেডি নিয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় কবিতা লেখা হয় উর্দুতে যথাক্রমে বাংলাদেশের উর্দু ভাষী কবি নওশাদ নূরী (১৯২৬-২০০০) নজম টুঙ্গিপাড়া, উত্থান-উৎস, ও বেলুচিস্থানের কবি মীর সুলতান নাসির (১৯১৪-১৯৮৩)। চতুর্থ কবিতাটি লেখেন সাংবাদিক কবি সন্তোষ গুপ্ত-‘রক্তাক্ত প্রচ্ছদের কাহিনি।’ তবে সর্বাধিক প্রচারিত, উচ্চারিত হয় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সর্বাধিক কবিতা লেখা কবি নির্মলেন্দু গুণেরÑআজ আমি কারো রক্ত চাইতে আসিনি।’

সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি

রেসকোর্স পার হয়ে যেতে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ

গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি

আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।’

তারপর যেন কবিতা লেখার জোয়ার এলোÑ বাঁধ ভাঙা জোয়ার। ১৯৭৭ সালে কবি কামাল চৌধুরীর ‘জাতীয়তাময় জন্মমৃত্যু’ ও ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত মিনার মনসুর ও দিলওয়ার চৌধুরীর সম্পাদিত শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’Ñসাহসী এই দুই প্রকাশনা যেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখার সকল প্রতিবন্ধকতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলো।

কী গভীর মমতায় একে একে ‘সুফিয়া কামালের ডাকিছে তোমারে’, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর ‘কোন ছবিগুলি’ শামসুর রাহমান ‘ইলেকট্রার গান’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমি সাক্ষী’, সানাউল হকের ‘লোকান্তরের প্রতি আত্মদান’ হাসান হাফিজুর রহমানের ‘বীর নেই’, আছে শহিদ’, দিলওয়ারের ‘বিতর্কিত এই গ্রন্থে’, বেলাল চৌধুরীর ‘রক্তনামা চরমপত্র’, মহাদেব সাহার ‘আমি কি বলতে পেরেছিলাম, আল মাহমুদের ‘নিশিডাক’, শহীদ কাদরীর ‘হন্তারকের প্রতি’, রফিক আজাদের ‘এর সিঁড়ি’ হেলাল হাফিজের ‘নাম ভূমিকায়’, আসাদ চৌধুরীর ‘দিয়ে ছিলে সকল আকাশ’, মুহাম্মদ নুরুল হুদার ‘জিসাস মুজিব’ নাসির আহমদের ‘গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশ’ আবিদ আনোয়ারের ‘প্রতিরোধ’, ত্রিদিব দস্তিদারের ‘জনকের প্রতি’ মোহাম্মদ রফিকের ‘ব্যাঘ্র বিষয়ক কবিতা’Ñনামের তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে, তবে ফুরাবে। অর্থাৎ প্রবীণ থেকে একেবারে নবীণ কবিযশোপ্রার্থী পর্যন্ত এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে-দুলাইন কবিতা লিখেন নি। এই সব শত সহস্র কবি ও কবিতার নাম আগামীর কোনো পরিশ্রমী নিষ্ঠাবান কোনো গবেষক নিশ্চয়ই তুলে আনবেন।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শুধু বাংলাদেশে নয় ওপার বাংলাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কবিরা কবিতা রচনা করেছেন। আগ্রহী পাঠকদের জন্য সেইসব কবির কয়েকজনের নাম তুলে ধরছি।

‘যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান/ ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবর রহমান’Ñবিখ্যাত এই পঙক্তির কবি অন্নদা শংকর রায় ছাড়াও-বনফুল, বুদ্ধদেব বসু, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রাজলক্ষ্মী দেবী, মনীশ ঘটক, অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত, বিমল চন্দ্র ঘোষ, দীনেশ দাশ, দক্ষিণারঞ্জন বসু, করুণারঞ্জন ভট্টাচার্য, অমিয় মুখোপাধ্যায়, ধীরেন্দ্র কুমার দত্ত, দেবেশ রায়, অমিত বসু, গোলাম রসুল, অমিতাভ দাশগুপ্ত, তরুণ স্যানাল, গৌরী ঘটক, তারাপদ রায়, মনীন্দ্র রায়, অমিতাভ চৌধুরী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

বাংলা সাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ শাখা ছড়া। গ্রামীণ লোক জীবনের নানা অনুষঙ্গ ছন্দময় হয়ে মুদ্রিত হয় ছড়ার পঙক্তিতে। সাধারণত ছড়ায় নির্দোষ শিশুতোষ আনন্দ প্রকাশই প্রধান হয়ে ধরা দেয়। কিন্তু আধুনিক যুগ যন্ত্রণায় জীবন ও জটিল হয়ে উঠেছে। আর এই জটিল জীবন ধারণ করতে গিয়ে ছড়া আজ কেবল ‘নন সেন্স ভার্স’ বা নিছক আনন্দলাভ নয়Ñছড়া বর্তমানে শোষণ বঞ্চনা নিপীড়ন, অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক নানা অসংগতির বিরুদ্ধে সোচ্চার, মুক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেখবোÑরাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর উত্থান, বিকাশ, নির্মম হত্যাকা-, হত্যাকা- পরবর্তী প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, খুনীদের শাস্তি দাবি, ঘৃণা প্রকাশ-সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে অন্যরকম এক ‘ছড়ার জগৎ’ গড়ে উঠেছে। কিছু নমুনাÑ

স্বাধীনতা পূর্ববর্তী আন্দোলন সংগ্রামের উত্তাল দিনগুলোতে শেখ মুজিবকে নিয়ে একটি খুবই জনপ্রিয় ছড়াÑ

‘ইলিশ মাছের / তিরিশ কাঁটা

বোয়াল মাছের দাঁড়ি,

টিক্কা খান / ভিক্ষা করে

শেখ মুজিবের বাড়ি।’

১৯৭০ এর নির্বাচনের পর ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য করে একটি ছড়াÑ

বাঙালিদের রক্তখামু

দেখমু জীব;

ঠিক তখনই গর্জে ওঠেন

শেখ মুজিব।

কিংবা-‘এক ফুঁয়েতে টিক্কা ফতে/ কল্কে হলো খালি/ ইয়াহিয়ার আশার ভাতে/ মুজিব দিলেন বালি।’

উত্তাল দিনগুলো এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি নিয়ে এ রকম হাজার ছড়ার উদাহরণ দেয়া যাবে। এতে নির্মম আগস্ট ট্র্যাজেডির পর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে করুণ কোমল সংক্ষুব্ধ, বিক্ষুব্ধ, প্রতিবাদী ছড়া লেখার বাঁধ ভাঙা জোয়ার আসে। প্রবীণ নবীন এক সাথে সম্মিলিত হন। ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন লেখেন বেশ কয়েকটি-ছড়া।

এক এক্কে এক

শেখ মুজিবের নামের আগে

জাতির পিতা ল্যাখ…।

কিংবা-মূল ইতিহাস এই,

এই ইতিহাস ইরেজ করার কোনোই উপায় নেই।

অন বিহাফ অব শেখ মুজিবর আমি মেজর জিয়া

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ’ কিয়া-।

সৈয়দ শামসুল হক লেখেন-‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা/ টুঙ্গীপাড়া যাই;/ টুঙ্গিপাড়ার মাটির মতো/ মাটি যে আর নাই।’

ফরিদুর রহমান বাবুলের লেখা-

বংশীবাদক বঙ্গবন্ধু হারিয়ে গেছে ঠিক

সঞ্জীবনী বাঁশীর সে সুর বাজছে চতুর্দিক।

ঠিক তাই। পঁচাত্তরে নির্মম হত্যার শিকার বঙ্গবন্ধু চিরঞ্জীব হয়ে আছেন বাঙালির চিন্তা চেতনায়। সাহিত্যের সৃজনশীল পৃষ্ঠায়, পাতায়।

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, ‘একাত্তরের দত্যি,’ জাকারিয়া চৌধুরী সম্পাদিত ‘মৃত্যুঞ্জয়ী শেখ মুজিব, আহসান মালেক সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধের ছড়া, চন্দন চৌধুরীর (সম্প.) মুক্তিযুদ্ধের ছড়া, আবু হাসান শাহরিয়ার, সৈয়দ আল ফারুক এবং লুৎফর রহমান রিটন সম্পাদিত ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ রহীম শাহ সম্পাদিত বঙ্গবন্ধুর ছড়া এ্যালবাম, এমরান চৌধুরী সম্পাদিত ‘মুক্তির ছড়া’ ও বঙ্গবন্ধু নিবেদিত ছড়াকবিতা, মালেক মাহমুদ (সম্পা.) এর শতবর্ষে শত ছড়া শেক মুজিবের ছড়া’ প্রভৃতি সম্পাদিত গ্রন্থে কয়েক শত কবি ও ছড়াকার বঙ্গবন্ধুকে বিষয় করে ছড়া লিখেছেন। এর বাইরে রয়েছে প্রবীন নবীণ লেখকদের একক ছড়াগ্রন্থ। সবার নাম উল্লেখ করা এই নাতি দীর্ঘ লেখায় সম্ভব নয়। আগামীর কোনো কর্মিষ্ট গবেষক নিশ্চয়ই তা তুলে আনবেন, সমৃদ্ধ করবেন আমাদের সাহিত্যাঙ্গন।

কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, ছাড়াও বাংলা ছোটগল্পেও নানাভাবে বঙ্গবন্ধু মুদ্রিত হয়েছেন। তবে জীবিত মুজিবের চাইতে ‘নিহত মুজিব’ গভীর তাৎপর্যম-িত হয়ে অঙ্কিত হয়েছেন গল্পে, উপন্যাসে। আবদুর গাফ্ফার চৌধুরী সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের প্রথম গল্প সংকলন ‘বাংলাদেশ কথা কয়’Ñতে ষোলটি গল্পের মধ্যে তিনটিতে বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ এসেছে। আবদুল হাফিজের ‘লাল পল্টন’ সুব্রত বড়–য়ার ‘বুলি তোমাকে লিখছি’ এবং ফজলুল হকের ‘চরিত্র’।

তবে বিশদভাবে নানামাত্রায় বঙ্গবন্ধু মুদ্রিত হয়েছেন আগস্ট ট্র্যাজেডি পরবর্তী গল্পে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ওপর ছোট গল্পে প্রথম শৈল্পিক প্রতিবাদ করেন সাহিত্যিক আবুল ফজল তার ‘মৃতের আত্মহত্যা’ গল্পের মাধ্যমে ১৯৭৬ সালে। উক্ত গল্পে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশিত হয়। এ গল্প লেখার অপরাধে লেখক আবুল ফজলকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান লেখককে উপদেষ্টার পদ থেকে সরিয়ে দেন। ‘মৃতের আত্মহত্যা’ ছাড়াও তিনি একই বিষয়ে ‘নিহত ঘুম’, ‘ইতিহাসের কণ্ঠস্বর’ ও কান্না’ নামে তিনটি গল্প লেখেন। সৈয়দ ইকবাল তাঁর ‘একদিন বঙ্গবন্ধু ও মায়ের কাছে যাওয়া’ গল্প দুটিতেও ভয়াবহ আগস্ট ট্যাজেডিকে তুলে ধরেছেন। আবু ইসহাকের ‘মৃত্যু সংবাদ’ গল্পটিও গভীর ব্যঞ্জনা নিয়ে রাচিত। শারীরিক মৃত্যু ছাড়াও যে মানুষের মানসিক মৃত্যু হতে পারে এবং সেটি যদি হয় ‘নীতি নৈতিকতা ও আত্মবিক্রিত হবার মাধ্যমে সেটিই দেখিয়েছেন হত্যাকা-ে ষড়যন্ত্রকারী ও সুবিধাভোগী আফতাব চরিত্রের মাধ্যমে। এছাড়াও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য গল্প রচনা করেছেন বাংলাদেশের নবীন-প্রবীণ প্রায় শতাধিক গল্পকার। আখতার হুসেন সম্পাদিত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা গল্প (১৯৯২) ও ‘জনকের মুখ’ (২০১৫) গ্রন্থদ্বয়ে নবীন-প্রবীণ প্রায় পঞ্চাশজন গল্পকারের গল্প প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া হাসনাত আব্দুল হাই ও সিরাজুল ইসলাম মুনির সম্পাদিত ‘বঙ্গবন্ধুঃশতবর্ষে শতগল্প’ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে প্রবীণ লেখক আবুল ফজল থেকে নবীন কুমার অরিন্দম বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এক বইতে মলাটবন্দি হয়েছেন। আগ্রহী পাঠকের কথা ভেবে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা উল্লেখযোগ্য কিছু গল্পের নাম উল্লেখ করছি।

শওকত ওসমানের ‘দুই সখী, রাহাত খানের ‘দীর্ঘ অশ্রুপাত’, বিপ্রদাশ বড়–য়ার ‘ফিরে তাকাতেই দেখি, সেলিনা হোসেনের ‘ক্রোধ’, হুমায়ুন আজাদের ‘যাদুকরের মৃত্যু’, অমল সাহার ‘দিব্যপুরুষ’, শিহাব সরকারের ‘হায়নার রাত’ মনি হায়দারের ‘শেখ মুজিবের রক্ত’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘নেয়ামতকে নিয়ে গল্প নয়’, রেজাউর রহমানের ‘উল্কাপাত’, সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের

 

 

‘সেই ছায়া’, মোসাদ্দেক আহমেদের ‘অযান্ত্রিক’, জাকির তালুকদারের পিতৃ পরিচয়, আনিসুল হক এর ‘আমি মাথা নিচু করি না’ ও রাজীব নূর এর ‘যখন কান্নায়ও আড়াল তুলতে হয়’Ñ এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বহু গল্প রয়েছে, যেখানে প্রাসঙ্গিকভাবে বঙ্গবন্ধুর কথা মুদ্রিত হয়েছে।

কবিতা ও ছোটগল্পের তুলনায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম উপন্যাস রচিত হয়েছে এবং সেটি উপন্যাসের বৃহৎ আয়তনের কারণেই। তবুও বঙ্গবন্ধু নিয়ে পঞ্চাশটির বেশি উপন্যাস রচিত হয়েছে।

সুনীল গঙ্গোপ্যাায়ের ‘পূর্ব-পশ্চিম’, শওকত আলীর ‘যাত্রা’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘দূরত্ব’ ও বৃষ্টি ও সাহসীগণ’, সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, শওকত ওসমানের ‘জননী’, মাহবুব তালুকদারের ‘বধ্যভূমি’, রশীদ হায়দারের ‘খাঁচা’ আল মাহমুদের ‘কাবিলের বোন’ এবং মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ সহ আরও কয়েকটি উপন্যাসে বঙ্গবন্ধুর চিত্রিত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ আলোচনায়।

সৈয়দ শামসুল হকের ‘দুধের গেলাশে নীলমাছি’ উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু ও তার হত্যাকা- মুদ্রিত হয়েছে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায়। সেলিনা হোসেনের ‘আগস্টের একরাত’ উপন্যাসে লেখক বঙ্গবন্ধুর সাহসী জীবনাচারের সাথে বীরোচিত মৃত্যুকে তুলে ধরেছেন। হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল’ (২০১৩) সাময়িকীতে প্রকাশিত হবার সাথে সাথে লেখকের-খ-িত দৃষ্টিভঙ্গি, একচোখা ইতিহাস বর্ণনা ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ছায়াপাত নিয়ে তুমুল বিতর্ক উঠে। ড. আনিসুজ্জামান বইয়ের ভূমিকাতে উল্লেখ করেনÑ “হুমায়ূনের ব্যক্তিগত পটভূমি এই উপন্যাসের চরিত্র ও ঘটনার উপস্থাপনে তাকে প্রভাবান্বিত করেছে।”

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আনিসুল হকের ছয় খ-ে সমাপ্ত উপন্যাস ধারা ‘যারা ভোর এনেছিলো’ (২০১২), ‘উষার দুয়ারে’ (২০১৩), ‘আলো আঁধারের যাত্রী’ (২০১৮), ‘এই পথে আলো জ্বেলে’ (২০১৯), ‘এখানে থেমো না’ (২০২০) ও রক্তে আঁকা ভোর’ (২০২১)-বাংলা উপন্যাসের ধারায় একটি অনন্য সংযোজন। উপন্যাসের সময়কাল ১৯২০-১৯৭২ পর্যন্ত।

উপরিউক্ত উপন্যাস ধারায় মুখ্য চরিত্রগুলো ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। এর পাশাপাশি কল্পনাশ্রিত ব্যঙ্গমা ব্যঙ্গমির অভিনব উপস্থিতি এবং অতীত ও ভবিষ্যত বলে দেবার ক্ষমত পাঠককে বাড়তি আনন্দ দিয়েছে।

আনিসুল হক এই মহাকাব্যিক উপন্যাসকে ঐতিহাসিক তথ্যের বর্ণনায় ভারি করে তোলেন নি। বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য চরিত্র রক্ত মাংসের মানুষে পরিণত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এটি উপন্যাসই, ইতিহাস নয়।

শেখ সাদীর ‘১৫ আগস্টের ১০০ মিনিট’ (২০১৬) ‘ডকু ড্রামাধর্মী’ উপন্যাস-যেখানে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের পূর্বাপর তথ্য উপাত্য দিয়ে সাজানো হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আরও বেশ কিছু উপন্যাস রচিত হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলোÑ মুনতাসির মামুনের ‘জয়বাংলা’, আবদুল মান্নান সরকারের ‘জনক’, মোস্তফা কামালের ‘অগ্নিকন্যা’, ‘অগ্নিপুরুষ’, ‘অগ্নিমানুষ’, মোহিত কামালের ‘উড়াল বালক’, আউয়াল চৌধুরীর ‘সেই কালো রাত’, ‘হুমায়ুন মালিকের ‘মুজিবপুরান’, মাসরুল আরিফিনের ‘আগস্ট আবছায়া, মোস্তফা মীরের ‘এই হলো শেখ মুজিবের দেশ’, শামস সাইদের ‘ধানমন্ডি ৩২ নম্বর’।

উপর্যুক্ত উপন্যাসগুলোতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরের ঘটনাবলি বেশি আলোচিত হয়েছে। জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে মৃত বঙ্গবন্ধুই অধিক জাগ্রত।Ñএই চেতনাই মূর্ত হয়ে উঠেছে। বঙ্গবন্ধুর জীবনাচার, জন্মভিটা, ঐতিহাসিক ৩২ নং বাড়ি, এবং মর্মান্তিক হত্যাকা-, হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা, প্রতিবাদ, প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি তুলে ধরা হয়েছে শৈল্পিক কৌশলে, অভিনব আঙ্গিকে।

এ প্রসঙ্গে গবেষক অধ্যাপক মিল্টন বিশ্বাস লিখেছেনÑ‘উপন্যাসের কাহিনিতে কেউ কেউ স্মৃতির জানালা খুলে বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন, কেউবা নিরাসক্ত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করেছেন, কেউ আবার গবেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রচুর তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছেন। ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত ও ব্যক্তি মানুষের আকাক্সক্ষা সবকিছুই একত্রিত হয়েছে আখ্যানে। উপরন্তু কারো কারো লেখায় নির্মোহ পর্যালোচনা রয়েছে; করেছেন ইতিহাসের পুনর্পাঠ।’

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে রচিত নাটক আমাদের নাট্য সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ১৯৭১ সালে মমতাজউদ্দীন আহমদ রচিতÑ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’, ‘এবারের সংগ্রাম’ ও ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এই ত্রয়ী নাটকে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে বঙ্গবন্ধু মুদ্রিত হয়েছেন প্রতীকীভাবে।

সাঈদ আহমদের ‘শেষ নবাব’ (১৯৮৯) নাটকে নাট্যকার সিরাজদ্দৌলার সাহস ও দেশপ্রেমের সাথে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রকে একাকার করে দিয়েছেন শৈল্পিক দক্ষতার সাথে। কেননা আগস্টে ট্র্যাজেডির পর শিল্প সাহিত্যেও বঙ্গবন্ধুর নাম প্রকাশ্যে উচ্চারণ করা কঠিন ছিলো। সৈয়দ শামসুল হকও তাঁর ‘গণনায়ক’ (২০১৬) অনুবাদধর্মী এই নাটকে জুলিয়াস সিজার ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-কে ‘অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এবং কাব্যময়তার সূতায় এক করে গেঁথেছেন। আবদুল গাফফার চৌধুরী “পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ (২০০৯) নাটকে প্রায় সোয়া দু’শত বছর পূর্বের ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পতন ও হত্যার সঙ্গে কাল্পনিক ও কাকতালীয় আবহে ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের সামঞ্জস্য তুলে ধরার প্রয়াস দেখিয়েছেন।’

এছাড়া উৎপল দত্তের ‘জয়বাংলা’, নিরাপদ ম-লের ‘মুক্তিফৌজ’, ছবি বন্দোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গবন্ধুর ডাক’, শামসুদ্দিন আহমেদের ‘বাংলাদেশের শেখ মুজিব’, খান শওকতের ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’, প্রভৃতি নাটকে বঙ্গবন্ধু উঠে এসেছেন।

আজ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কত সংখ্যক বই রচিত হয়েছে তার সঠিক হিসেব দেয়া অসম্ভব। কেননা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বই দেশে ও বিদেশে প্রকাশিত হচ্ছে। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ড. আবু মোহাম্মদ দেলোয়ারের ‘বঙ্গবন্ধু বিষয়ক গ্রন্থপঞ্জি’ বইতে বঙ্গবন্ধু বিষয়ক বইয়ের সংখ্যা ১০০০ ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ গ্রন্থ তালিকা প্রকাশ করেছে সেখানে বঙ্গবন্ধু বিষয়ক বইয়ের সংখ্যা ৯ শতাধিক। সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত মৌলিক বইয়ের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আরও নতুন নতুন বই প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে, আগামীতেও হবে।

জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধু তাঁর শক্তি সাহস, দেশপ্রেম, নেতৃত্ব গুণ মহানুভবতা, বিচক্ষণতা দিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। তাঁর অনাকাক্সিক্ষত নির্মম হত্যাকা-ে মানুষ যেমনি শোকে মুহ্যমান হয়েছে, তেমনি দেশে বিদেশে বিবেকবান মানবতাবাদী কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ, প্রতিবাদ ও দ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। তারই শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে। ১৯৫৩ সালে মনোজ বসুর ‘চীন দেখে এলাম’ গ্রন্থে শুরু হয়ে আজ গোটা দেশ ছাড়িয়ে ভারত, পাকিস্তান, চীন, জাপান, ইতালি, জার্মানী ও সুইডেনসহ পৃথিবীর আরও বহু দেশে তাকে নিয়ে অসংখ্য বই প্রকাশিত হচ্ছে। প্রবন্ধে, কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে ও চিত্রকলায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত বিপুলায়তন শিল্পকর্ম বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য মাত্রার সাহিত্যজগৎ তৈরি করেছে।

 

সহায়ক গ্রন্থ

১. আখতার হুসেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গল্প, অনুপম প্রকাশনী, ১৯৯২।

২. সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, সাহিত্যের শুভ্র কাফনে বঙ্গবন্ধু, অনিন্দ্য প্রকাশন, ১৯৯৩।

৩. আখতার হুসেন, জনকের মুখ, কথাপ্রকাশ, ২০১৫।

৪. সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, শিল্প সাহিত্যে শেখ মুজিব, স্বরব্যঞ্জন, ২০১৮।

৫. হাসনাত আবদুল হাই ও সিরাজুল ইসলাম মুনির সম্পাদিত, বঙ্গবন্ধু : শতবর্ষে শত গল্প, আগামী প্রকাশী ২০২০।

৬. মিল্টন বিশ্বাস, উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু, বাংলা একাডেমি ২০২১।

৭. ইমন সালাউদ্দিন, সাহিত্যে বঙ্গবন্ধু, তাম্রলিপি, ২০২২।

 

 

আ.ম.ম.মামুন, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ

চট্টগ্রামী প্রবাদের প্রথম গ্রন্থ : রচয়িতা জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন

মহীবুল আজিজ জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন (১৮৫২-১৯২০), সংক্ষেপে জে ডি এন্ডার্সন আজ থেকে একশ’ সাতাশ বছর আগে চট্টগ্রামী প্রবাদের সর্বপ্রাথমিক গ্রন্থটি রচনা-সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিলেন। চট্টগ্রামী

দেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই (সম্পাদকীয়- জুন ২০২৪ সংখ্যা)

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্প্রতি আমাদের দেশসহ উপমহাদেশে যে তাপদাহ শুরু হয়েছে তা থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই