এখন সময়:রাত ৮:৪০- আজ: রবিবার-১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ৮:৪০- আজ: রবিবার
১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

শিশুতোষ ছড়া যেমন হবে!

রহিম উদ্দিন :

 

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ছড়া কিংবা পদ্যই যা বলি-না কেন, এটাই সাহিত্যের সবচেয়ে পুরনো শাখা! লেখ্যরূপে সাহিত্যের আবির্ভাব হবার আগে থেকেই কথ্যরূপে মানুষের মুখে মুখে ছড়া বা পদ্য রচিত হত। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন যেমন চর্যাপদ তেমনি ছড়া বা পদ্য যাই বলি-না কেন, তার আদি নিদর্শন বলতে গেলেও প্রথমে যা পায় তা হল, লুই পাদনাম এর পদ ” কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল/ চঞ্চল চীএ পইঠা কাল” নামক পদটি যা বাংলা ছন্দের রূপরেখা ও অন্ত্যমিল মেনে রচিত। এদিক থেকে বলতে গেলেই প্রথম যে বিষয়টি লক্ষ্য করা যায় সেটি হল, ছড়ার প্রাণ হল সাবলীল ছন্দ ও অন্ত্যমিল।  ছন্দ, লয়, তাল ও অন্ত্যমিলে গোলমাল থাকলে একটা লিখা আর যাইহোক ছড়া হতে পারে না। যদিও ছড়া কিংবা পদ্য সাহিত্যের প্রাচীন শাখা তবুও এ শাখাটি যথাযথ পরিচর্যা এবং খামখেয়ালিপনার জন্য তার সে পুরনো গৌরব ধরে রাখতে পারেনি। বর্তমানে যারা ছড়া লিখেন তাদের জন্যই ছড়া ও শিশুতোষ ছড়ার শৈলী এবং উপকরণ নিয়ে সামান্য আলোকপাত করেই লিখাটি শেষ করবো। প্রথমেই একটা চরম সত্যকে স্বীকার করে নিতে চাই, ছড়া, পদ্য কিংবা কবিতার সংজ্ঞা নিয়ে আমাদের সাহিত্যিক সমাজে আমৃত্যু ভিন্নতা ও মতভেদ থাকলেও এসবের বৈশিষ্ট্য,  শৈলী ও উপকরণ নিয়ে কোনোরূপ মতভেদ নেই।

কেবল তা নয়, ছড়ার প্রকারভেদ নিয়েও মাঝে-মাঝে দ্বিমত দেখা দেয়, তবুও আমি সেদিকেও যাচ্ছি না; কারণ আমি ছড়ার সংজ্ঞা ও প্রকারভেদের চেয়েও বর্তমানে ছড়ার উপাদান নিয়ে কথা বলা বেশি প্রয়োজন মনে করছি। কেননা,  বাংলা সাহিত্যের একজন ছাত্র হিসেবে, বর্তমানে পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত সমকালীন, ব্যঙ্গ কিংবা শিশুতোষ ছড়াগুলোর  দিকে তাকালে অন্তর ফেটে যায় যায় অবস্থা! সেখানে সব আছে, তবুও একটা শূন্যতা, হাহাকার বোধ ও অপূর্ণতা রয়ে যায়। এ হাহাকার-বোধ রোধ করার জন্য স্বীয় দায়বদ্ধতা থেকে শিশুতোষ ছড়ার উপর জোর দিয়ে এ আলোচনা শেষ করবো।  আমি শিশুতোষ ছড়া এ জন্য বেছে নিয়েছি, কারণ শিশুতোষ ছড়া শিশুদের জন্যই রচিত হয় এবং শিশুর বিকাশে বাংলা ছড়ার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা আমাদের শিক্ষাজীবনে প্রাথমিক স্তরে, মাধ্যমিক স্তরে, কিংবা উচ্চ শিক্ষার স্তরে কী শিখেছি, তা আমাদের মনে না থাকলেও,  স্কুলের আঙিনায় পা রাখার আগে যেসব ছড়া শিখেছি তা এখনো স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে।

 

শিশুতোষ ছড়ার প্রথম বৈশিষ্ট্য হতে হবে ছড়ার মধ্যে সাবলীল ছন্দের প্রয়োগ এবং লয় ও তালের সমন্বয় করা। কারণ, শিশু যা পড়বে, তা সে অর্থ বুঝে পড়বে না, বিষয় বুঝেও পড়বে না, সে পড়বে কেবল বড়োদের মুখে শুনতে শুনতে! উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে,

 

১.

হাট্টিমাটিম টিম

তারা মাঠে পারে ডিম

তাদের খাড়া দুটো শিং

তারা হাট্টিমাটিম টিম।

ছড়াকার রোকনুজ্জামান খান এর “হাট্টিমাটিম টিম” এ ছড়াটি বর্তমানে আমাদের শিশুদের কাছে এবং অভিভাবকদের কাছেও বাচ্চাদের শেখানোর জন্য প্রথম পছন্দের একটা ছড়া। ছড়াটি মূলত ৫২ লাইনের একটা ছড়া হলেও শেষ চারটি লাইনের এ অংশটিও একটা মৌলিক ছড়া হিসেবে পরিচিত ও পঠিত। বাস্তবতার নিরিখে বলতে গেলে বলতে হয়, হাট্টিমাটিম টিম নামে কোনো পাখি আমরা জীবনেও দেখিনি, অথচ এমন একটা কাল্পনিক পাখিকে অনায়াসে বাস্তব রূপ দিয়েছেন ছড়াকার। এর পেছনে মূল কারণ, ছড়ার সামগ্রিক বিষয়, সাবলীল ছন্দ ও শব্দ চয়ন।  যা পাঠে শিশুদের মুখের আড়ষ্টতা দূর হয়।

দ্বিতীয়ত, শিশুতোষ ছড়ার ছন্দ ও শব্দ চয়নের পাশাপাশি অন্ত্যমিলের বিষয়টি আরো বেশি লক্ষ্যণীয়।  ছড়ার ছন্দ ও শব্দের সহজবোধ্যতা থাকলেও যদি অন্ত্যমিল দুর্বল হয়, সেক্ষেত্রে ছড়া পাঠের মনোযোগ নষ্ট হয় এবং যে ছড়া পাঠ করে শিশুর উচ্চারণ জড়তা দূর হওয়ার কথা, সেখানে উল্টো তার স্বাভাবিক পাঠ থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। উদাহরণ হিসেবে নিচের ছড়াটি পড়ে দেখা যাক,

২.

আয় আয় হাঁস মুরগী

আয় ছুটে আয়

দুধ-ভাত হাত দিয়ে

খুকু মনি খেয়ে

খাবে যদি মজা করে

ওরে ছুটে আয়

দুধভাত ছিটিয়ে দেবে

আজকে সারা গাঁয়ে

মায়া করে কোলে নেবে

জলদি করে আয় রে

মিলেমিশে খেলবে খুকু

এই মিনতি পায়ে।

এ ছড়াটি নির্মাণ শৈলী ও শব্দচয়ন সহজ হলেও অন্ত্যমিল সমস্যার কারণে ছড়াটি প্রাণ হারিয়েছে একই সাথে ছন্দের যে গতিময়তা এবং পাঠের অনুভূতি তা সম্পূর্ণ রূপে নষ্ট করেছে। এখানে লক্ষ্য করুন,  যদি ‘ খেয়ে ‘ শব্দটা ‘ খায়’,  ‘ গাঁয়ে’ শব্দটা ‘ গাঁয়’,  ‘ আয় রে ‘ থেকে ‘ রে বাদ দিয়ে আয়’ এবং ‘ পায়ে ‘ শব্দটার পরিবর্তে ‘ পা’য়/ পায় ‘ লেখা হয়, তাহলে দেখুন ছড়াটির পাঠ কত সুমধুর ও সাবলীল হয়

তৃতীয়ত, প্রতিটি শিশুতোষ ছড়ার জন্য একটা শিক্ষণীয় ও শিশুতোষ বিষয় নির্ধারণ করেই ছড়া লিখতে হবে। শিশু বুঝে পড়বে না, বিষয় শিখবে না, কিন্তু পাঠান্তে তার সামনে একটা সুন্দর ও মজাদার দৃশ্যকল্পের  ছবি অবশ্যই ভেসে উঠতে হবে; এবং তার কাছে একটা কাল্পনিক জগত তৈরি হতে হবে। যদিও প্রথমেই বলেছি, শিশুরা বুঝে পড়বে না, তথাপি একজন ছড়াকার একটা ছড়ার মধ্যে দিয়ে শিশু মনে একটা বার্তা পৌঁছে দিবেন এবং তা হবে অল্প কয়েকটি লাইনের মাধ্যমে। শিশুরা

 

 

 

 

কখনোই বড়ো বড়ো ছড়া পড়তে বা মূখস্ত করতে অভ্যস্ত হবে না, এজন্য শিশুতোষ ছড়া ৪ থেকে ৬ লাইন, বড়োজোর ৮ লাইনের বেশি কখনোই হওয়া উচিত নয়। যদি বেশি হয়, তা আর শিশুতোষ ছড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে যায় বড়োদের জন্য রচিত ব্যঙ্গ ছড়া! যেমন, রোকনুজ্জামান খান এর ” হাট্টিমাটিম টিম ” এর শেষ চারটি লাইন শিশুতোষ ছড়া, আর যদি পুরোটার কথা একসাথে বলি সেটা হয়ে যায় বড়োদের জন্য রচিত রম্যছড়া! নিচের ছড়াগুলি পড়ি এবং এ বিষয়টি আত্মস্থ করার চেষ্টা করি।

৩.

আম পাতা জোড়া জোড়া

মারবো চাবুক চড়বো ঘোড়া।

ওরে বুবু সরে দাড়া

আসছে আমার পাগলা ঘোড়া।

পাগলা ঘোড়া খেপেছে

চাবুক ছুরে মেরেছে।

উহ বড্ড লেগেছে।

 

৪.

আয় রে আয় টিয়ে

নায়ে ভরা দিয়ে

না নিয়ে গেল বোয়াল মাছে।

তা দেখে দেখে ভোঁদর নাচে

ওরে ভোঁদর ফিরে চা।

খোকার নাচন দেখে যা

 

উপরিউক্ত ২ নং ছড়াটি ব্যতিত, বাকি ছড়াগুলো আমাদের খুবই পরিচিত, আর এসব ছড়াগুলোকেই আমি শিশুতোষ ছড়া বলে থাকি। আপনারা এসব ছড়াকে সমকালীন কিংবা ব্যঙ্গ ছড়াও কেউ কেউ বলতে পারেন, সে আপনাদেরই জ্ঞানের জোর। যেহেতু এসব ছড়া আমরা শৈশবে বড়োদের মুখে শুনে শুনে এবং একই সাথে আওড়াইতে আওড়াইতে শিখে থাকি, সেক্ষেত্রে শিশুতোষ ছড়া বলতে দোষের কিছু নয়। যদিও আমার বলা ভুল হতে পারে, সে ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে মার্জনীয়।  তবে, এটা নিশ্চিত যে, এসব ছড়া শিশুদের জন্যই রচিত হয়েছে, শিশুদের পাঠের উপযোগিতাই এসব ছড়ার অন্যতম প্রাণ।

এছাড়াও শিশুতোষ ছড়া রচনার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক এবং গ্রহণযোগ্য উপমা ব্যবহারের পাশাপাশি মিথ ও সহজ শব্দের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কেবল তা নয়, শিশুতোষ ছড়ার ক্ষেত্রে শব্দের বানান, এবং সার্থক বাক্যের যে তিনটি আদর্শ গুণাবলি আছে, সেসব বিষয়ও ছড়ায় নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে বলতে হয়, স্বার্থক অনুপ্রাস শিশুতোষ ছড়ার প্রাণ। ছড়ার মিথ এবং সহজ শব্দের উদাহরণ হিসেবে নিচের ছড়া দুটোর দিকে দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে।

 

৫.

আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে

ঢাক মৃদং ঝাঁঝর বাজে

বাজতে বাজতে চলল ঢুলি

ঢুলি গেল সেই কমলাপুলি

কমলাপুলির টিয়েটা

সুয্যিমামার বিয়েটা

আয় লবঙ্গ হাটে যাই

ঝালের নাড়ু কিনে খাই

ঝালের নাড়ু বড় বিষ

ফুল ফুটেছে ধানের শীষ।

 

৬.

খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এল দেশে

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে?

ধান ফুরল, পান ফুরল, খাজনার উপায় কী?

আর ক’টা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি।

ধনিয়া পিঁয়াজ গেছে পচে সর্ষে ক্ষেতে জল

খরা-বন্যায় শেষ করিল বর্ষার ফসল

ধানের গোলা, চালের ঝুড়ি সব শুধু খালি

ছিন্ন কাপড় জড়িয়ে গায়ে শত শত তালি।

 

ইদানীং পত্রিকার সাহিত্যপাতা এবং শিশুসাহিত্যের জন্য নির্ধারিত পাতাসমূহ খুললে, চক্ষুশূল উঠে, এখানে একই বিষয়ে একাধিক লিখা, একই লেখকের একই বিষয়ের উপর প্রতিবছর নতুন নতুন লিখা প্রকাশিত হয়; যা আৎকে উঠার মতো। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, ছড়াকার যে বিষয়ে ছড়া লিখেছেন মনে হয়, সে বিষয়টা তিনিও ঠিক মতো বুঝে না। অন্যথায়, একই বিষয়ের উপর তিনি কীভাবে প্রতিবছর নতুন নতুন ছড়া লিখেন! কিছু কিছু পত্রিকার পাতায় যা সবচেয়ে বেশি দেখি, তা হল, দুর্বল অন্ত্যমিল, উপমার অযোগ্যতা, সময়-জ্ঞানের অভাব, বানান বিভ্রাট, বিষয়ের অপূর্ণতা একাধিক বিষয়ের ঝামেলা, তারা বুঝে না, কোথায় কোন উপমা ব্যবহার হবে, কোন সময়ের বর্ণনা কোথায় দেওয়া যাবে আর কোথায় যাবে না।  পরিশেষে, ছড়াকারদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলবো,  সকাল-সন্ধ্যা অন্ত্যমিল ও ছন্দবদ্ধ শব্দ দিয়ে আগাড়-ভাগাড় বিষয়ে লিখলেই তা ছড়া হবে, পত্রিকায় কিংবা লিটল ম্যাগাজিনে ছাপাবে, কিন্তু স্থায়ী হবে না! সকালে লিখবেন, বিকালে পত্রিকায় ছাপাবে, পরের দিন ময়লার ভাগাড়ে নিক্ষেপ হবে। আপনি যদি প্রকৃত অর্থে শিশুতোষ ছড়া লিখতে চান, আপনাকে শিশুতোষ ছড়ার উপকরণগুলো কী কী জানতে হবে। শিশুতোষ ছড়ার অন্যতম উপকরণ হলো, পশু-পাখি ও প্রাণী,প্রকৃতি ও পরিবেশ, আত্মীয়-স্বজন ও সম্পর্ক,  সময় ও ঋতুজ্ঞান, ছন্দ ও  সহজতর শব্দমালা, অন্ত্যমিল এবং অনুপ্রাস, পরিপূর্ণ বিষয় ও দৃশ্যকল্প,  অতীত ও ইতিহাস এবং লোকজ মিথ।  এখন, আপনিই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সকাল-বিকাল অন্ত্যমিল ও ছন্দ দিয়ে ছড়া লিখে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করবেন নাকি পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নিবেন আজন্মকাল।

 

রহিম উদ্দিন, কবি ও প্রাবন্ধিক ,পটিয়া,  চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামী প্রবাদের প্রথম গ্রন্থ : রচয়িতা জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন

মহীবুল আজিজ জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন (১৮৫২-১৯২০), সংক্ষেপে জে ডি এন্ডার্সন আজ থেকে একশ’ সাতাশ বছর আগে চট্টগ্রামী প্রবাদের সর্বপ্রাথমিক গ্রন্থটি রচনা-সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিলেন। চট্টগ্রামী

দেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই (সম্পাদকীয়- জুন ২০২৪ সংখ্যা)

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্প্রতি আমাদের দেশসহ উপমহাদেশে যে তাপদাহ শুরু হয়েছে তা থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই