ইকবাল তাজওলী
কলেজ থেকে ফিরছি।
সাধারণত আমি ট্রেনেই ফিরি। কী করব? বাড়ি বেশ দূরেও না, আবার একদম কাছেও না। যোগদান করেছি এই মাস ছয়েক হয়। যোগদান করব কিনা ভাবছিলাম। আর এই ভাবনা- ভাবনিতে পড়ে দেখি মাথায় কিছু গোলমাল হচ্ছে ! চালকে ডাল বলছি! আর ডালকে চাল!
দ্রুত সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হয়ে গেলাম। ভদ্রলোক আমার পূর্ব পরিচিত। কত রকম কারণে তাঁকে যে দেখিয়েছি তার কোন ইয়ত্তা নেই! ওঁকে দেখাতে গিয়ে আশেপাশের অন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের রোগীরা যে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকায়নি তা কিন্তু বলব না। মনে করেছে এই পাগল ভাই যায়! আসলে আমাদের সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন কারণে- অকারণে! কত প্রবলেম সলভ্ হয়ে যায়।
কিন্তু, আমাদের দেখানোর টাকা কোথায় ? এখনও আমরা, আমার যদি ভুল না হয় নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি। যদিও আমাদের ভ্রমণ পিপাসা বেড়ে গেছে। আজ জাফলং যাচ্ছি তো কাল সাজেক, পরশু তেঁতুলিয়া! কিন্তু উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত না হলে, আর আচার- আচরণ না বদলালে ওই অ্যান্টিবায়োটিকও ফার্মেসি থেকে সংগ্রহ করতে হবে ডাক্তার না দেখিয়ে!
আগে কি আমাদের সাদা পাথর, পানথুমাই, লালাখাল আর সাজেক ছিল না? ছিল। সবই ছিল । কিন্তু আমাদের পেটে তখন ভাত ছিল না। এটাই হচ্ছে কথা।
ও! কলেজ থেকে ফিরছি শুরু করলাম, আর এখন অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে কথাবার্তা শুরু করে দিয়েছি ! শিক্ষক হলে এই-ই হয়! বকতে বকতে ধান বানতে শিবের গীতে চলে যাই!
ট্রেন ভ্রমণে আনন্দ আছে। প্রকৃতি দেখতে দেখতে অগ্রসর হওয়া যায়। তাই আমি কোনো ভ্রমণে বই-টই নিই না। জানালা দিয়ে প্রকৃতি দেখাই শেষ হয় না। এক স্টেশনে তো ২০ বছরের অধিক সময় ধরে জানালা দিয়ে বাংলার মুখ আমি দেখেছি। তাই আর পৃথিবীর মুখ খুঁজতে যাইনি।
হাইওয়ে চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় এখন ট্রেনে প্যাসেঞ্জার বেড়ে গেছে। তাই বৃহস্পতিবারের টিকিট রোববারে সংগ্রহ করেছি।
‘এটি তো আমার সিট । এই ১৫নম্বর। উইন্ডো।’
জিন্স- টি সার্ট পরিহিত ভদ্রলোকটি উঠে গেলেন।
ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। এমনিতে মিনিট ত্রিশেক লেট করে এসেছে। পাঁচ মিনিট দাঁড়ায়। আজ ক্রসিংয়ের জন্যে মিনিট পঞ্চাশেক দাঁড়িয়েছে!
নীল মণি পালকে বসিয়ে এসেছি। বলেছি,‘ঠিক পাঁচটার সময় ওঠবেন।’ নীল মণি সিনসিয়ার। উনি থাকবেন। আর বলতে হবে না। জানি, ঠিক পাঁচটার সময় ফোন দিয়ে বলবেন,‘স্যার, চলে যাচ্ছি।’ এই রকম টিচার হচ্ছে সমাজের সম্পদ। এরা সকলের কল্যাণ চায়।
ট্রেন এগিয়ে চলছে। এই ইন্টারসিটি ট্রেনগুলো সিলেট বিভাগে ঢুকে নাকি লোকাল হয়ে যায়! কী জানি হলে হতেও পারে। দীর্ঘদিন ট্রেনে লং জার্নি করিনি। কাজেই, হালহকিকত জানি না। তবে ট্রেনগুলো স্বীয় প্রবাদ বাক্য ধরে রেখেছে সযত্নে! ‘৯ টার গাড়ি কয়টায় যায়, বাইসাব ?’
নোয়াপাড়ায় বিরতিতে একটু স্টেশনের দিকে দৃষ্টি ফেরালাম।
এখন প্রকৃতিতে হেমন্ত কাল চলছে। সূর্য তার যুদ্ধংদেহী মনোভাবে আর নেই! মনে হয় আপোষে এসেছে! হয়ত অগ্রহায়নের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করেছে! আমি কিন্তু আর বড় দিনে নেই। আমি এখন ছোটো! তাই তেজও আমার ছোটো!
স্টেশন লাগোয়া চরাচরে ফিঙের বড় ওড়াউড়ি দেখলাম । হয়ত এখানে কোথাও বাসা আছে । একটি বিড়ালকে তো দৌড়ে নিয়ে গেল! আরেকটি ছাগলের উপর চড়ে ধান্দা খুঁজছে! আর শালিক তিনটি বৈদ্যুতিক তারের উপর বসে কী আলাপে মশগুল রয়েছে তা তারাই জানে! যাক, এই প্রথম এক ঝাঁক টিয়াকে ধানখেতের উপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখলাম ।
প্ল্যাটফর্মে এক ভদ্রমহিলার দিকে চোখ আটকে গেল । কোথাও যেন দেখেছি এই মহিলাকে! কোথাও যেন! এই কমপার্টমেন্টেই তো আসছেন । খুঁজতে খুঁজতে ২২ নম্বরে এলেন । কিন্তু স্মৃতির নিউরন আমার সময় মতো জাগ্রত হলো না!
আমি আবার স্ট্রিটফুড লাভার ! হাঁটতে হাঁটতে স্থান-কাল-পাত্রের উর্ধ্বে উঠে খাই দাই। খেতে গেলে কোথায় খাচ্ছি ভাবাভাবিতে নেই আমি। শুনেছি শিবরাম চকোত্তি মশাই খেতে খেতে তাঁর বানানো ভাগ্নে- ভাগনিদের নিয়ে নিজের পেট মোটা করেননি! তাঁকে অনুসরণকারী ওই পুলিশ ইন্সপেক্টরের পেট মোটা করে ফেলেছিলেন! না ওঁকে অনুসরণ করছি না। কোথায় শিবরাম চকোত্তি আর কোথায় আমি গঙ্গারাম তেলি!
ডিম একটি খেয়ে অপেক্ষায় আছি চা খাব। ‘এই চানাচুর, চানাচুর ’ বলে চানাচুরওয়ালা চলে যাচ্ছে। ‘এই দাঁড়াও। লাগাও। ঝাল দিও সঙ্গে নাগা।’ মিনিট পনেরো পরে চা নিয়ে বসলাম। আমি আবার দুধ চা খাই। লাল চা আমার সঙ্গে যায় না। বাড়িতে- কলেজে দুধ চা চলছে। আমার অধ্যস্তনরাও আমার সঙ্গে দুধ চা খাচ্ছেন। সঙ্গে বিস্কিট। রসমালাইও খাই। আপন ঘোষের রসমালাই যে খেয়েছে সে আর কুমিল্লামুৃখী হবে না। ওর এটা সিগনেচার আইটেম।
যা-ই হোক, দেখি ভদ্রমহিলা আমার দিকে তাকাচ্ছেন। এই আবার তাকালেন ! কী জানি হয়ত চিনেছেন, হয়ত বা না। চিনলেও মহিলারা সহজে কথা বলবেন না এটাই স্বাভাবিক। কি আমি কথা বলব সম্মুখে গিয়ে? না, গতবারের মতো লজ্জা পাওয়ার দরকার নেই। গতবার একজন বলেছিল,‘কি মহিলাদের সঙ্গে কথা বলতে আরাম লাগে?’ বাবা আমি আরামে- ব্যায়ারামে নেই। আত্মমর্যাদা আছে আমার।
‘এই বরিশালি আমড়াওয়ালা?’
আমড়া চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছি আর গান শুনছি। আমার পাশের ভদ্রলোকটি খুব লো সাউন্ড দিয়ে গান শুনছেন। ‘নয়নো সরসী কেন ভরেছে জলে…।’
আহা! কিশোর কুমার! বেঁচে থাকতে ওঁর গলা আমি না দিই অন্যকেউ হিরে- জহরত দিয়ে মুড়ে দিত। এরকম ভার্সেটাইল জিনিয়াস লোক আর আসবে না। আমাদের কী দুর্ভাগ্য !
বসে বসে গান শুনছি। আর কী করব। বয়স তো বাড়ছে। তারুণ্যের সেই সময়ে ট্রেনের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত চষে বেড়িয়েছি যে কতবার! তা গুণে গুণে বলতে হবে। কত বন্ধুবান্ধব, বড়ভাইদের দেখা পেতাম। হাই- হ্যালো করতাম। সময় সবকিছুকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
যা-ই একটু ওয়াশরুমে। ঘণ্টা চারেক হয়ে গেছে। এবার ক্রসিং বরমচালে! এখানে জৈন্তিকা আন্তঃনগর দাঁড়ায় না। কতক্ষণ যে দাঁড়াবে সেই জানে! হিজড়াদের হাততালি শোনা যাচ্ছে। এই এলো হিজড়া। ‘দাদা, ১০ টাকা দেন। ও দাদা।’ দিলাম ১০ টাকা। এদের প্রতি আমি সহানুভূতিশীল। কেউ তো এদের কাজ দেয় না! কী করে খাবে এরা? বাঁচতে তো হবে। জন্ম তো ইচ্ছে করে নেয়নি। কিংবা খোদাতায়ালার কাছে প্রার্থনাও করেনি যে,‘আল্লা আমারে হিজড়া বানাও। কামকাজ না করে খাব।’
২২ নম্বরের কাছে গিয়ে একটু ঢু মারতেই,‘এই ইকবাল ভাই, কেমন আছেন?’
আমি চমকে গেলাম। সম্বোধনেই তো বোঝা যা”্ছে ভদ্রমহিলা আমাকে ভালোভাবে চেনেন। কিন্তু আমার স্মৃতিতে নেই!
বললাম,‘কে আপনি?
‘আমি পল্লবের বোন।’
‘পল্লব? কোন পল্লব?’
কথা শেষ করার আগে উত্তর ধেয়ে এলো।
‘সিলেট পলিটেকনিকের পল্লব। এবার চিনেছেন?
চোখে জল চলে এসেছে আমার। টিস্যু থাকায় রক্ষা পেলাম।
‘তুমি , তুমি কি তিতির?’
‘না, আমি দিদির ছোটো স্বাতী।’
এবার টিস্যু নিতেই হলো। কোনো সিনক্রিয়েট হলো না।
ছোট্ট একটি ঘটনা আমাদেরকে সেই সময়ে অনেক দূরে সরে দিয়েছিল!
তখন আমার বয়সই বা কত? নাইনে পড়ি। কেবল ১৪ প্লাস হয়েছে। মনে রঙ লেগেছিল এইট থেকে। তখন ওদের বাসায় খুব যেতাম পল্লবের সঙ্গে। পল্লব না থাকলেও যেতাম। তিতির আর স্বাতী রয়েছে। মাসিমা কী আদরই না করতেন! তিতির, স্বাতীর সঙ্গে কখনও দাবা, কখনও বা ক্যারমবোর্ড খেলতাম। আর শীত এলে লাইট জ্বালিয়ে ওদের বাসার সম্মুখে ব্যাডমিন্টন খেলতাম। আমি আর স্বাতী একদিকে, আর তিতির ও পল্লব অন্যদিকে । স্বাতীর সঙ্গেই বেশি খেলতাম। স্বাতী তখন এইটে। আমি স্বাতীতে মজে গেলাম।
তারপর একদিন চিরকুট লিখলাম।
‘জীবনো আধারে পেয়েছি তোমারে, চিরদিন কাছে থেকো বন্ধু। ওগো বন্ধু ।’
উত্তর ধেয়ে এলো।
‘তুমি সাত সাগরের ওপার হতে আমায় ডেকেছো.
আর মন ভ্রমরের কাজল পাখায় ছবি এঁকেছো।’
আবার লিখলাম।
‘আমি ময়ূর পঙ্খি নাও ভিড়িয়ে তোমায় দেখেছি.
আর প্রবাল দ¦ীপের পান্না ভেবে চেয়ে থেকেছি।’
এভাবেই চলছিল।
মাসিমা মনে হয় বুঝতেন। কিন্তু কিছু বলতেন না। শুনেছি ওঁর মা কনভার্টেড হিন্দু। কিন্ত ওর ঠাম্মা সহ্য করলেন না। লংকাকাণ্ড বাঁধিয়ে দিলেন।
আমাদের আসা- যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।
আমাদের বাসার সঙ্গে ওদের বাসার সম্পর্ক ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।
এখন আর কেউ কাকে দেখলে কথা বলি না। আর স্বাতীও এখানে নেই। ওকে ওর মাসির বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
তারপর কদিন বাদে দেখলাম ওরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে ঢাকায় চলে যাচ্ছে।
‘কি দাঁড়িয়ে কথা বলবেন?’
আমি ওয়াশরুম থেকে এসে সোজা আমার সিটে চলে এলাম। ততক্ষণে ট্রেন কুলাউড়ায় চলে এসেছে। ওর পাশের সিটের মহিলা নেমে যাচ্ছেন।
আমি আর নিজের সিটে থাকলাম না।
চলে এলাম স্বাতীর কাছে।
‘তুমি কি আমায় চিনতে পারনি?’
‘না, সবকিছু বদলে গেছে। লম্বা চুলের সেই তুমি বয়কাট হয়ে গেছো। আর কিছুটা মোটা হয়েছে।’
‘আর?’
‘শাঁখা-পলা নেই।’
স্বাতী কোনো উত্তর করল না। কিংবা আবেগ এসে যাবে বিধায় কথা আর বলল না।
বলল,‘একদিন বাসায় আসো। আমি সিলেটেই থাকি। চাকরি একটা করি। একদিন আসো। কথা হবে ।’
আমি ওর নম্বর নিয়ে আমার উইন্ডোর পাশে চলে এলাম।
তারপর আর মাস দুয়েক কোনো কথা হলো না। থাকি আমি হবিগঞ্জে, আর ও সিলেটে। কথা তো হওয়ার সুযোগ নেই মোবাইল ছাড়া। কথা হয় কীভাবে? দেখা হয় কীভাবে? তাছাড়া আমার ব্যস্ততা।
একদিন শনিবারে দেখা হয়ে গেল সিটি সেন্টারে। ও বেরুচ্ছে আর আমি ঢুকছি।
বলল,‘কেমন আছ, ইকবাল ভাই?’
বললাম,‘ভালো। তুমি?’
‘এই একরকম। টক-ঝাল-মিষ্টি।’ বলে হেসে দিল ।
‘চল কোথাও গিয়ে বসি। চা-কফি খাই।’
‘আরে আমার এই তো পূর্ব জিন্দাবাজারে বাসা। এসো। যাই ।’
কী আর করা। ওর সঙ্গে ওর বাসায় গেলাম। পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের দোতলায় ও থাকে।
দেখি মাসিমা! ‘মাসিমা ভালো’ বলে আমি কদমবুচি করলাম। পরিচয় দিলাম। তিনি কেঁদে দিলেন ।
বললেন,‘বাবা, এতদিন পর! কোথায় হতে আসিছো।’
আমি বিস্তারিত বললাম।
বললেন,‘বাবা- মা কি আছেন?’
‘না, মাসিমা। আমি হতভাগা । কেউ নেই ।’
‘কেউ নেই মানে?’
‘বাবা তো অনেক আগে মারা গেছেন। আর মা বছর পাঁচেক হয় ইহজগত ত্যাগ করেছেন ।’
‘তুমার দুই ভাই?’
বড় ভাই হার্ট অ্যাটাকে। আর ভাইয়া প্লেন ক্রাশে ।’
ততক্ষণে কাপড়চোপড় বদলিয়ে স্বাতী এসে হাজির। দেখলাম হাতে ওর মালাই চা আর স্লাইস্ড কেক।
ওর ড্রইংরুম বড় মনোরম। বামুন কন্যার রুচি আছে দেখছি।
আমরা কুশল বিনিময় শুরু করলাম।
ঘণ্টা খানিক ওর ওখানে ছিলাম। তারপর আবার মাসিমাকে কদমবুচি করে বেরিয়ে এলাম। মাসিমা আশীর্বাদ করলেন। ‘বেঁচে থাকো বাবা। আরও বড় হও।’
সেদিন আমাকে বিক্রমপুরের স্বাতী গাঙ্গুলি অনেক কথাই বলেছিল। ওর মুখ থেকে যা শুনেছি তাই হুবহু আপনাদের জন্যে উপস্থাপন করছি।
‘আমাকে তো পাঠিয়ে দেয়া হলো ঠাম্মার আদেশে। ঠাম্মা তাঁর মেয়ের কাছে আমাকে পাঠালেন না। বললেন,‘ওই তো নাচগান করে। স্বাতী মণি লেই পাইয়া যেইবো। হেরে পাডা হের মাসির কাছে। ওই হানে থাকুক ।’
আমাকে মাসির বাড়ি পাঠানো হলো।
মাস খানিক খুব খারাপ লেগেছিল। বাবা-মা – ভাইবোন সব ছেড়েছুড়ে এসেছি। ভালো তো লাগবে না।
শেষমেশ, মেনে নিলাম।
স্কুলেও ভর্তি হয়ে গেলাম। বাড়ির কাছেই স্কুল। সেখানেই আমাকে ভর্তি করে দেয়া হলো।
মাস দুমাসে মা আসতেন। বাবাও আসতেন। পল্লবও সময় ও সুযোগ পেলে বাবা- মায়ের সঙ্গে চলে আসত।
অল্প কয়েকদিনের মধ্যে বান্ধবীও জুটে গেল। বান্ধবী মনিরার সঙ্গে এখনও যোগাযোগ আছে ।
বিপদ ঘটল এক বছরের মধ্যে। মাসতুতো ভাই বিজন পেছনে লেগে গেল। ওর জন্যে বাড়িঘরে কোথাও শান্তি মেলে না। গায়ে হাত দেয়। পারলে অন্য কিছু করতে অগ্রসর হয়। একদিন সুযোগ বুঝে ও ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে দিল। আমি কিছু বলি না। বললে আর ঠাম্মার কানে গেলে বলবে,‘তোর দোষ। তুই হেরে আশকারা দিসোত।’ তাই অনেক কিছু মেনে নিলাম।
একদিন টের পেলাম আমি প্র্যাগনেন্ট। কী করব? বিজনদাকে বললাম।
বলল,‘গর্ভপাত করে নাও। ভালো হবে।’
পরে অনেক ভেবেচিন্তে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে কাজটি শেষ করলাম।
তখন আমি একাদশ শ্রেণিতে পড়ি। এইচএসসি আর দেয়া হয়নি। হয়ত বাবা- মা জেনে গিয়েছিলেন, তাই ঘটা করে আরেক গাঙ্গুলির সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল। বর আমার ইংরেজির প্রভাষক ছিল মানিকগঞ্জের একটি সরকারি কলেজে।
ভালোই চলছিল সংসার। সব সময় আনন্দধারা বয়ে চলত। কিন্তু অভাগী যেদিকে যায় সাগরও নাকি শুকিয়ে যায়। একদিন সে মোটরসাইকেলে বাড়ি যাওয়ার পথে ব্রেক ফেল করে ভবলীলা সাঙ্গ করে ফেলে।
তখন আমি আবার পড়াশোনা শুরু করে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছি। আমার বর আমাকে পড়িয়েছে।
কী করব? বাবা- মায়ের সংসারে ফিরে এলাম।
দিদি তখন ওর বরের কাছে। আর পল্লব মেডিকেল ফোর্থ ইয়ারে।
দিদি বলল,‘আয় চলে আয় আমার কাছে। তোর কলেজ যখন আমার বাড়ির পাশে।’
সকলের আহবানে দিদির বাড়ি গিয়ে উঠলাম একদিন ।
এখন আমি আগের সেই স্বাতী গাঙ্গুলি না। এখন আমি প্রতিবাদ করতে জানি। প্রয়োজনে কোর্টে গিয়ে মামলা করতেও জানি। ওই দেখো টিকটিকি ঠিক ঠিক বলছে ।
প্রথম দর্শনে জামাই বাবুকে ভালো লাগল না। মাস চারেক সুন্দরভাবে কাটল। বোন আমার গৃহিণী। তাই কলেজ যাওয়ার আগে এবং পরেও বোনকে সহযোগিতা করি। বোনও খুশি।
শারদীয় পুজোর দশমীর পরের দিনের পরের দিন জামাই বাবু বললেন,‘এই কী করিস? এই দিকে আয়।’ বলে কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরলেন।
বললেন,‘আহা স্বাতী কী সুখ!’
এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে জুতো খুলে দেখালাম।
তারপর আর থাকলাম না। ওই দিনই বোনের বাড়ি ছেড়ে নিজ বাড়িতে ফিরে এলাম। পল্লব গিয়ে পরে আমার সবকিছু নিয়ে এলো।
অনার্স করলাম। মাস্টার্সও করলাম অ্যাকাউন্টিংয়ে।
ন্যাড়া কিন্তু বেলতলায় একবার যায়। কিন্তু আমি একবার না, আরেকবার গেলাম।
সুমন পাল আমাকে নিয়ে গেল ছাঁদনাতলায়।
প্রথম প্রথম সকলে একযোগে বিয়ের বিরোধিতা করেছিল। বামুন কন্যার এই ছিরিষ্টি ছাড়া কাজ! তাও আবার কুলীন ব্রাক্ষ্মণ!
সেই সময়ে আমি কাউকে তোয়াক্কা করিনি। সোজা কোর্টে উঠে সুমন পালের সঙ্গে বিয়ে রেজিস্ট্রি করে এসেছি।
তারপর তো সকলে মিলে ছাঁদনাতলায় নিয়ে গেল।
সুমন আর স্বাতী গাঙ্গুলির সংসার জীবন বেশ আনন্দেই কাটছিল। গুণে গুণে ১২ বছর কাটানোর পর অশান্তি ধেয়ে এলো।
কী করব? আমাদের তো কোনো সন্তান নেই। ডাক্তারের কাছে আমি যাই। ডাক্তার বলেন,‘আপনার বরকে নিয়ে আসুন। আপনার বর ছাড়া হবে না।’
সে রাজি হয় না। বাহানার আশ্রয় নেয়।
শেষমেশ, আমার গায়ে হাত তোলা শুরু করল। একদিন, দুইদিন হলে হয়ত মেনে নিতাম, কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই সে এই কাজটি করতে লাগল।
এখন তো সেইদিন নেই। আপনি গায়ে হাত তুলবেন, আর আমি বগল বাজাব!
কোর্টের মাধ্যমে সেপারেট হয়ে গেলাম।
মাস ছয়েক পর একদিন ও এসেছিল। আমি পাত্তাই দিইনি।
তারপর থেকে এই তো চলছে। চাকরি আছে, আমিও আছি।
আর বিয়ের পিঁড়িতে বসিনি। মা আর পল্লব বেশ জোর করেছিল একবার। আমি এইসব তখন ধর্তব্যের মধ্যে আনিনি।
কী লাভ সংসারধর্মে জড়িয়ে ? দুবার তো জড়িয়ে ছিলাম। দুবারই সংসার করা হলো না। ভাগ্যে আমার এই সব নেই।
আমি ইকবাল ভাগ্যে বিশ্বাসী।
আর এক রকম তো ভালোই আছি। প্রাইভেট একটি ব্যাংকের এভিপি পদে কর্মরত আছি। আমার আর কী চাই? বছর চারেক চাকরি আছে। ভাগ্যে থাকলে আরও উপরে যেতে পারি।
‘সবার ভাগ্যে সবকিছু জোটে না।’ এই আপ্তবাক্যে আমি বিশ্বাসী ।
কলেজে যাই। আসি। ফের যাই। ফের আসি। কিন্তু স্বাতী গাঙ্গুলির সঙ্গে আর যোগাযোগ হয় না। হয়ত সে ব্যস্ত সময় পার করছে। যেভাবে আমি ব্যস্ত আছি।
মাঝেমধ্যে ভাবি, কেন কৈশোরে চিরকুট লিখতে গিয়েছিলাম ওকে। তাহলে তো ওকে বাসা ছেড়ে যেতে হতো না। আর এই জীবন যাপন করত হতো না।
আসলে স্বাতী গাঙ্গুলির এই পরিণতির জন্যে আমিই দায়ী।
আমিই দায়ী।
আমি ।
ইকবাল তাজওলী : গল্পকার




