মাসুদুল হক
প্রকৃতির সাথে মানুষের গভীর সম্পর্ক, তাদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি এবং আচার-অনুষ্ঠান প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত একে অপরের পরিপূরক। বাংলা সাহিত্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক আল মাহমুদ, যিনি তার ছোটগল্পের মাধ্যমে বাংলার গ্রামীণ জীবন, লোকঐতিহ্য ও লোকাচারের নানা দিক চিত্রিত করেছেন। তাঁর রচনায় গ্রামের জীবন, মানুষ এবং তাদের চিন্তা-ভাবনা, বিশ্বাস, রীতিনীতি, প্রথা-প্রবৃত্তি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এই প্রবন্ধে আল মাহমুদের ছোটগল্পে লোকঐতিহ্য ও লোকাচারের ভূমিকা প্রসঙ্গে আলোকপাত করা হলো।
আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান গল্পকার এবং কবি। তাঁর লেখার মধ্যে গ্রামীণ জীবন, লোকঐতিহ্য ও বাংলার সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ ও শ্রদ্ধা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ছোটগল্পগুলোতে লোকসমাজের ক্ষুদ্রতম বিষয়ের বিশ্লেষণ থেকে বৃহত্তম তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রক্ষেপণ রয়েছে। তাঁর রচনায় সমাজের নানা স্তরের মানুষের জীবনের চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, তাদের বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান, প্রথা, লোককথা প্রভৃতি বিষয় তুলে ধরেছেন।
প্রসঙ্গত লোকঐতিহ্য বলতে আমরা সাধারণত সেই ঐতিহ্যকেই বুঝি যা গ্রাম্য সমাজে পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে প্রাপ্ত হয়ে বর্তমান পর্যন্ত বজায় রয়েছে। এটি ভাষা, সংগীত, নৃত্য, কৃষ্টি, বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান ও পোশাক-পরিচ্ছদসহ নানা দিককে অন্তর্ভুক্ত করে।
লোকাচার হলো সেই রীতিনীতি ও প্রথাসমূহ যা একটি সমাজ বা গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে বহুকাল ধরে চলে আসছে।বাংলাদেশের মতো কৃষি-প্রধান দেশে লোকঐতিহ্য এবং লোকাচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল মাহমুদ তাঁর গল্পে এই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। তার গল্পের মধ্যে মানুষের জীবনযাত্রার পাশাপাশি, বিভিন্ন আচার-প্রথা, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস, পারিবারিক সম্পর্ক, এবং সামাজিক বাধ্যবাধকতার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে।
আল মাহমুদের ছোটগল্পগুলোর মধ্যে লোকঐতিহ্য ও লোকাচার নানাভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। বিশেষত, তাঁর গল্পগুলোর মধ্যে গ্রামীণ জীবন, সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান এবং লোকমানুষের মানসিকতার মূর্ত প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। তিনি মানুষকে একটি সমাজের পূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন, যেখানে প্রতিটি মানুষের নিজস্ব ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও আচরণ রয়েছে। তাঁর “খনন” গল্পটি লক্ষ করা যাক।
তাঁর গল্প “খনন” বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, শ্রমজীবী মানুষের অভিজ্ঞতা ও লোকসংস্কৃতির প্রাণবন্ত চিত্র তুলে ধরে। তিনি গল্পটির মাধ্যমে কেবল একটি ড্রেজিং প্রকল্পের বাস্তবতা তুলে ধরেননি, বরং সেই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মানবিক সম্পর্ক, রসিকতা, ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় রূপকে উপস্থাপন করেছেন। এই গল্পের চরিত্ররা যে ভাষায় কথা বলে তা খাঁটি গ্রামীণ, স্থানীয় উপভাষার ঘ্রাণযুক্ত। যেমন:
‘এই হারামজাদা চুপ কর। লাথি মেরে পানিতে ফেলে দেবো, শালা উল্লুক কাঁহাকা।’
এই ধরনের সংলাপ শুধু গল্পকে প্রাণবন্ত করে না, বরং লোকভাষার স্বকীয়তা বজায় রাখে। এতে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার স্বাভাবিক ঢঙ, গালমন্দের মধ্যেও বন্ধুত্বপূর্ণ রসিকতা—সবই লোকজ ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ফুটে ওঠে। গল্পের শুরুতেই বলা হয়—
‘মাখায় ঝালের চোটে মাছের চর্বি বালিকাদা একাকার হয়ে গিয়ে এক অদ্ভুত ধরনের স্বাদের সৃষ্টি হয়।’
এই বর্ণনা বাংলাদেশের লোকজ রান্নার স্বাদ ও গন্ধের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে। গল্পে খাদ্যের প্রতি ড্রেজারে কর্মরতদের ভালোবাসা, নির্দিষ্ট রান্নার ধরন—এসব লোকরন্ধন ঐতিহ্যের প্রতিফলন।
ড্রেজিং কাজের ধারা, রাতভর কাজ করা, সময় ভাগ করে দায়িত্ব পালনের যে চিত্র আঁকা হয়েছে তা শ্রমজীবী সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি:
‘রাত দশটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত ড্রেজার মাস্টার। সকাল, দুপুর, রাতের মধ্যভাগে আমাকে পানির জোয়ার ভাটার রিডিং নিয়ে সুখানে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে জানাতে হবে।’
এখানে শ্রমের কাঠিন্য, সুনির্দিষ্ট নিয়ম এবং একে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সম্পর্ক প্রথাগত পেশাভিত্তিক সমাজব্যবস্থারই অংশ। মন্তাজ ও সুখানির রসিকতা, ড্রেজার মাস্টারের সংযত আচরণ সব মিলিয়ে কর্মজীবী সমাজে গড়ে ওঠা পারস্পরিক নির্ভরতা ও সম্পর্কের রূপ দেখা যায়। যেমন:
‘বেহেস্ত চাই না। সুখানি হতে চাই।’
এই সংলাপে ধর্মীয় ধারণাকে ঠাট্টা করেও বাস্তব জীবনের চাহিদা ও ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে—যা লোকমানসের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য।
গল্পে উৎসব বা আয়েশের কথা সরাসরি না থাকলেও কাজের ফাঁকে ফাঁকে সুখানির নবীনগর বাজারে রাত কাটানো, গল্প, হাসিঠাট্টা, চা খাওয়ার মাধ্যমে একটি প্রান্তিক উৎসবমুখরতা তৈরি হয়, যা লোকজ সংস্কৃতিরই রূপ।এই গল্পে লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কেবল পটভূমি নয়, বরং গল্পের প্রাণ। গল্পের চরিত্রেরা জীবন্ত, তাদের ভাষা দেশজ এবং তাদের সম্পর্ক প্রথাগত সমাজ ও সংস্কৃতির ধারক। খাদ্য, ভাষা, রসিকতা, কাজের ধরণ—সব মিলিয়ে তিনি একটি জীবন্ত লোকজ জগৎ নির্মাণ করেছেন।
আল মাহমুদের গল্প “জলবেশ্যা” তে যে সব লোকসংস্কৃতির অনুষঙ্গ ব্যবহার করা হয়েছে, তা গল্পের অন্তর্নিহিত সমাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে ফুটিয়ে তোলে। গল্পটির মধ্যে লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যা বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন এবং তার সংস্কৃতির একটি বাস্তব চিত্র তৈরি করে।গল্পের প্রধান চরিত্রের অবস্থান নদী বা জলাশয়ের কাছে, যেখানে জলবেশ্যা তার দিনযাপন করে। নদী এবং জলাশয় বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানে পানি বা নদীর উপাদানটি লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত।
গল্পে স্থানীয় লোকশিল্প, আচার-প্রথা এবং বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটেছে। জলবেশ্যার জীবনযাপন এবং তার পরিচয়, সংস্কৃতির বিভিন্ন দিকের প্রতীকী প্রকাশ। এ ধরনের চরিত্ররা সাধারণত লোকগাঁথা, পুরাণ বা কাহিনির মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে।
জলবেশ্যা, একজন সামাজিকভাবে নিম্নস্তরের নারী চরিত্র, যা বাংলাদেশের কিছু গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার ও ভ্রান্ত বিশ্বাসকে চিহ্নিত করে। এই ধরনের চরিত্রের মাধ্যমে সমাজের অসমতা, পুরুষশাসিত সমাজ, এবং নারীর প্রতি অবিচারকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা লোকসংস্কৃতির বাস্তবিক প্রতিফলন।
“জলবেশ্যা” গল্পে কিছু সাংস্কৃতিক মিথ বা লোকগাথার ছায়া পড়েছে।
জলবেশ্যা যে ধরনের জীবনযাপন করে, তা এক ধরনের লোকগাথা বা পুরাণের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরনের চরিত্রগুলো গল্পে এক ধরনের কাহিনির মাধ্যমে প্রাচীন বিশ্বাস, লোককাহিনি এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে উপস্থিত হয়।এইভাবে, আল মাহমুদের “জলবেশ্যা” গল্পে ব্যবহৃত লোকসংস্কৃতির অনুষঙ্গ আমাদের দেশের সামাজিক বাস্তবতা, জীবনধারা, এবং ঐতিহ্যকে বুঝতে সাহায্য করে।
আল মাহমুদের “পানকৌড়ির রক্ত” গল্পে লোকসংস্কৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যেখানে প্রধানত বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান ও সামাজিক সম্পর্কের বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই গল্পটি সাধারণ মানুষের জীবনের অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম, তাদের প্রথাগত চিন্তাধারা এবং সংস্কৃতির প্রতি তাদের নিষ্ঠা ও আস্থাকে প্রকাশ করেছে। গল্পের মাধ্যমে আল মাহমুদ আমাদের প্রথাগত গ্রামীণ সমাজের যে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং সম্পর্ক তুলে ধরেছেন, তা মূলত ঐতিহ্য, ধর্ম, সামাজিক রীতি-নীতি, এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে। গল্পের চরিত্ররা তাদের জীবনযাপন এবং সংস্কৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও একাত্মতা অনুভব করেন, যা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কর্মের মধ্যে প্রতিফলিত হয়।
গল্পে গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, তাদের সংগ্রাম, আচার-প্রথা এবং বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো উঠে আসে। যেমন পানকৌড়ির রক্তের ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতির ওপর বিশ্বাস, স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে মানুষের সম্পর্ক ইত্যাদি। এর মাধ্যমে আল মাহমুদ লোকসংস্কৃতির গভীরতা এবং এর প্রভাবকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন, যা গল্পটিকে এক ধরনের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ প্রদান করে। এছাড়া, “পানকৌড়ির রক্ত” গল্পটি গ্রামীণ সমাজের পিতৃতান্ত্রিক প্রথা, নারীর অবস্থান এবং তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সজাগ থাকার আহ্বানও দেয়। লোকসংস্কৃতির একটি মৌলিক দিক হিসেবে এখানে সামাজিক মূল্যবোধ এবং নির্দিষ্ট রীতিনীতি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ পাওয়া যায়।মোটের ওপর, আল মাহমুদ তার গল্পের মাধ্যমে বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি গভীর অন্বেষণ করেছেন, যেখানে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের চিন্তা-ভাবনা, তাদের ঐতিহ্য, আচার এবং সম্পর্কের মূল্য তুলে ধরেছেন।
আল মাহমুদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প “কালো নৌকা”।
এই গল্পে লোকসংস্কৃতি উঠে এসেছে বিভিন্ন দিক থেকে, যা প্রেক্ষাপট এবং চরিত্রের আচরণ, বিশ্বাস ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির মাধ্যমে ফুটে ওঠে।
“কালী” চরিত্রটি একটি ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে উপস্থিত। কালীকে সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়, যা গভীর সমুদ্রের প্রতি মানুষের আধ্যাত্মিক টান এবং বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে। সাধারণত, কালী দেবীকে পূজা করা হয় কিন্তু এখানে কালী চরিত্রের আচরণ, বিশেষত তার নগ্নতা এবং স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করা, এই ধর্মীয় চিত্রের ভিন্ন রূপকে উপস্থাপন করে। তাকে সাগরের দিকে ছুটে যেতে দেখা, সামাজিকভাবে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার এবং তার অস্বাভাবিক আচরণের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সমাজের প্রতি তার সম্পর্কের দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠে।
“রাসু” এবং তার পরিবারের চরিত্র স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে। জেলে জীবনের দৈনন্দিন সংগ্রাম, অর্থ উপার্জন এবং মাছ ধরার কাজের উপর দৃষ্টি দিয়ে এই গল্পটি লোকসংস্কৃতির একটি দিককে তুলে ধরে। সমুদ্রের সাথে মানুষের সম্পর্ক, সেখানে কাজ করা, এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিশ্বাসের অংশ হিসেবে “মাল্লাদের গালগল্প” শোনা যায়, যা জেলে সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার অংশ।
কালী চরিত্রের অবস্থা এবং তার আচরণ, যেমন তার নগ্নতা ও দিগম্বরী হয়ে চলাফেরা, সামাজিক সংস্কৃতি ও নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করে। জেলে পাড়ার নারীরা তার প্রতি লজ্জার দৃষ্টিতে তাকায়, কিন্তু একই সঙ্গে তার প্রতি এক ধরনের কৌতূহলও তৈরি হয়। কালী চরিত্রের আচরণে স্থানীয় সমাজের নারী-পুরুষের আচরণ এবং নারীকে নিয়ে সামাজিক পুরুষশাসিত মনোভাব ফুটে ওঠে।কালীকে নিয়ে পাড়ার লোকদের গসিপ করা, যে কেউ বলছে কালী কোনো গয়নায় চেপে এসেছে, এটি গ্রামের সামাজিক আচরণ এবং গুঞ্জনকেই তুলে ধরে। মানুষের মধ্যে কৌতূহল, দুঃখ, এবং অপরাধবোধের মিশ্রণ এইভাবে প্রকাশ পায়, যা সাধারণ গ্রামীণ সমাজে প্রায়ই দেখা যায়।
কালী চরিত্রের মানসিক অবস্থা এবং তার নিঃসঙ্গতা, বিশেষত সাগরের দিকে ছুটে যাওয়ার প্রবণতা, তার মানসিক অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। এই সংগ্রামটি লোকসংস্কৃতির একটি দিক হতে পারে, যেখানে মানুষ মাঝে মাঝে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে নিজের সত্তা খুঁজে পেতে বিভিন্নভাবে আধ্যাত্মিক মুক্তির চেষ্টা করে।এই গল্পের মাধ্যমে লোকসংস্কৃতির অনেক দিক যেমন সামাজিক সম্পর্ক, বিশ্বাস, পুরাণ, এবং মানসিকতা ফুটে ওঠে, যা চরিত্রের আচরণ এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
আল মাহমুদের ছোটগল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজের নানা স্তরের লোকঐতিহ্য ও লোকাচারের গুরুত্ব সঙ্গতভাবে প্রকাশ পায়। তার গল্পগুলো পাঠকদের মনে মানুষের অবিস্মরণীয় জীবনধারা এবং সংস্কৃতির প্রতি একটি গভীর শ্রদ্ধা সৃষ্টি করে। লোকঐতিহ্য ও লোকাচার শুধু ইতিহাস বা স্মৃতি নয়, এটি মানুষের মনোভাব, বিশ্বাস এবং চেতনার প্রতিফলন। গ্রামীণ সমাজে যেখানে পারিবারিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় রীতি-নীতির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম, সেখানে
আল মাহমুদের লেখায় সে সময়ের ঐতিহ্য এবং রীতির প্রতি নিবেদিত মানসিকতা লক্ষ্য করা যায়। এই ঐতিহ্যগুলি সমাজের স্বাভাবিক গতিতে চলতে সহায়তা করত, এবং মানুষের সম্পর্ক, ভালোবাসা, বিশ্বাসের ভিত্তি ছিল। বিশেষ করে, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং পরিবারের ঐতিহ্যগ্রহণের মাধ্যমে একটি লোকসভ্যতা গড়ে উঠেছিল যা শতাব্দীপ্রাচীন।
আল মাহমুদের ছোটগল্পে লোক ঐতিহ্য ও লোকাচারের প্রতিফলন অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে দেখা যায়। তিনি গ্রামীণ সমাজের বাস্তবতা, ঐতিহ্য এবং লোকচর্চার নিখুঁত চিত্র তুলে ধরে সেই সমাজের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর গল্পে সমাজের নানা স্তরের মানুষের জীবনযাত্রা, আচার-অনুষ্ঠান, প্রথা-প্রবৃত্তি, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির গভীর অনুপ্রবেশ রয়েছে। আল মাহমুদ তাঁর গল্পের মাধ্যমে পাঠকদের জন্য একটি ঐতিহ্যবাহী সমাজের জীবন্ত চিত্র হাজির করেছেন, যা শুধুমাত্র একটি সাহিত্যিক কীর্তি নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ সমাজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অমূল্য দলিল।
মাসুদুল হক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক




