সুজন বড়ুয়া
আকমল হোসেন বেলকনিতে ইজি চেয়ারে বসে আছেন। সত্তর-ঊর্ধ্ব বয়স তার। বাড়িতে শুয়ে-বসে সময় কাটে এখন। একসময় দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন; ছিলেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সম্মুখ মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার পর জীবন শুরু করেছিলেন দাপটের সঙ্গে। সরকারি চাকরি নিয়েছিলেন সেনাকল্যাণ সংস্থায়। পঁচাত্তর সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর ওপর ভীষণ ক্ষিপ্ত হন তিনি। নিজের প্রতি ধিক্কার ছুড়ে দিয়ে বলেন, এই বিশ্বাসঘাতক বাহিনীর কল্যাণের জন্য প্রাণপাত করে আর কী হবে! সঙ্গে সঙ্গে চাকরিটা ছেড়ে দিলেন সাত পাঁচ না ভেবে। অবশ্য খুব বড় চাকরি করতেন না তিনি। ছিলেন স্টোরকিপার। জীবনে পড়াশোনার সুযোগ তেমন পাননি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র ছিলেন। অভাবের সংসার, বিপর্যস্ত দেশ। স্বাধীনতার পর কোনোমতে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে চাকরিতে ঢুকে পড়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের হতাশায় সেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুরু করেন ঠিকাদারি ব্যবসা। প্রথমদিকে সরকারি অফিসে অফিসে
স্টেশনারিজ সাপ্লাই দিতেন। দিনে দিনে নিজের সততা ও কর্মনিষ্ঠা দিয়ে ব্যবসাটা বড়ো করেছিলেন। তবে জীবনে খুব বেশি কিছু করতে পারেননি তিনি। অল্পতেই তুষ্ট মানুষ। দুই সন্তানকে মোটামুটি লেখাপড়া শিখিয়েছেন। ধানমন্ডির কাছে ঝিগাতলায় এক টুকরো জায়গা কিনে কোনোমতে করেছিলেন ছোট্ট এই দোতলা বাড়িটা।
সেই তারুণ্যদীপ্ত জীবন-সংগ্রামের কথা ভাবলে এখন কেমন অবাক লাগে। কত আনন্দ-বেদনা, কত উত্থান-পতন! দেশের কত রদবদল দেখলেন! শেষপর্যন্ত গত কয় বছরে সেই দেশ একটু উন্নতির পথে হাঁটছে। দেশ অগ্রগতির ধারায় থাকলেই ভালো লাগে। দেশের সুখ, সমৃদ্ধি, শান্ত পরিবেশই তো কাম্য হওয়া উচিত সবার। কিন্তু শান্ত থাকতে থাকতেই অশান্ত হয়ে ওঠে আবার। সেই সাড়ে সাত কোটি থেকে এখন সতেরো কোটি মানুষের দেশ। দাবি-দাওয়া আন্দোলনের যেন শেষ নেই। একটার পর একটা লেগেই আছে। এখন আবার শুরু হয়েছে কোটা বিরোধী আন্দোলন। এবার যেন আন্দোলনটা অন্যরকম। দাবি-দাওয়া বিক্ষোভে জঙ্গিপনার ভাব। তলে তলে চলছে নাশকতা ও ধ্বংসযজ্ঞ। এর সমাধান যে কোথায় কে জানে! ভাবতে ভাবতে অনমনা হয়ে বাড়ির গেটের দিকে তাকিয়েছিলেন আকমল সাহেব। দেখতে পেলেন ব্যস্ত সমস্ত হয়ে বাড়িতে ঢুকছে রূপম।
রূপম আকমল সাহেবের নাতি, মেয়ের বড়ো ছেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ে। মেয়ের ছোটো ছেলে অনুপম এইচএসসি পরীক্ষার্থী। দুই নাতিসহ মেয়ে নাজিয়া এখন আকমল সাহেবের সঙ্গে এই বাড়িতেই থাকে। মেয়ের জামাতা ছিল ইঞ্জিনিয়ার। মধ্যপ্রাচ্যে থাকত। বছর চার আগে ওখানেই হঠাৎ এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। সেই থেকে আকমল সাহেব মেয়েকে স্থায়ীভাবে নিয়ে এসেছেন নিজের বাড়িতে। এখানে থেকেই দুই নাতি পড়াশোনা করছে। দুই নাতি ও মেয়ে ছাড়া এই বাড়িতে আর আছেন আকমল সাহেবের স্ত্রী রাহেলা খাতুন। একমাত্র পুত্র আমেরিকা প্রবাসী। কালে ভদ্রে দেশে আসে। নিরিবিলি পরিবার। বাড়ির দোতলায় নিজেরা থাকেন আর নিচ তলাটা ভাড়া দেওয়া।
সিঁড়ি বেয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে রূপমের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল আকমল সাহেবের। নাতিকে ঘেমে নেয়ে আসতে দেখে বলেন, কী নানাভাই, এত তাড়াহুড়া কেন?
— আন্দোলন, নানা আন্দোলনে আছি।
—আন্দোলন!
—হ্যাঁ, বুকের মধ্যে ভীষণ ঝড় / বুক পেতেছি গুলি কর।
— আন্দোলন, ঝড়, গুলি— এসব কী বলো নানাভাই। এত ক্ষুব্ধ কেন?— বলতে বলতে আকমল সাহেব রূপমের সামনে এসে দাঁড়ান।
— কেন নানা, আন্দোলন চলছে আপনি জানেন না? কোটা বিরোধী আন্দোলন।
— ওহ, কোটা আন্দোলন, তা তো পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশনে প্রতিদিনই দেখছি। কিন্তু এই আন্দোলনে তোমার কী আসে যায় নানাভাই? হঠাৎ এমন কী হলো! তুমি তো এসবের মধ্যে ছিলে না। এখন এসবেও যোগ দাও নাকি?
— অবশ্যই, ভার্সিটিতে পড়ে আন্দোলন-বিক্ষোভে যোগ না দিয়ে উপায় আছে নাকি নানা?
—উপায় নেই বুঝলাম। তুমি এখন বড়ো হয়েছ, আন্দোলন-সংগ্রাম করবে। কিন্তু তোমরা যে সবাই নিজেদের রাজাকার পরিচয় দিতে শুরু করেছ, ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ বলছ। এ কি খুব গৌরবের পরিচয়?
—এটা তো প্রধানমন্ত্রীর উপহার নানা। উনিই তো বলেছেন, ‘কোটা মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা পাবে না তো, রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে?’ এর মানে কী, এর মানে সব ছাত্র রাজাকারের নাতিপুতি।
— কী বলো নানাভাই! এর মানে অবশ্যই তা নয়। তোমরা ভুল বুঝেছ অথবা তোমাদের ভুল বোঝানো হয়েছে। তিনি তা বলেননি। সরকার তো কোটা বাতিলের পক্ষেই আছে। প্রধানমন্ত্রী তো আশ্বাস দিয়েছেন। এই আন্দোলন নিয়ে তোমাদের এত কঠোর হওয়ার কারণ কোনো তো দেখি না ভাই, ধৈর্য রাখো। তবে তুমি কি একবারও ভেবে দেখেছ নানাভাই, এই কোটা প্রথা থাকলে আখেরে তোমারই লাভ হতো। আমার মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা তুমি পেতে।
— ও না,— রূপম মৃদু হেসে বলে, নানা, ওই লাভ আর চাই না আমি। সবাই যেটা ভালো চোখে দেখে না সেটা ভোগ করা নিশ্চয় সম্মানের নয়। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস আমাদের কাছে ভাঁওতা ছাড়া আর কিছু নয়। আবার শাসক দলের সাধারণ সম্পাদক-মন্ত্রী বললেন আন্দোলন দমন করার জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট। পুলিশ বাহিনী কেন এত মারমুখী ভূমিকায়? রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আবু
সাঈদকে কেন গুলি করে মারল?
— শোনো ভাই, সরকারের ভুল থাকতে পারে। তাই বলে কোটা বাতিলের জন্য এত সহিংসতা! এত ভাঙচুর, এত জ্বালাও পোড়াও কেন? মেট্রোরেলের স্টেশন পোড়ানো, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারের টোলপ্লাজা পোড়ানো, এত এত সরকারি স্থাপনায় আগুন! আমার কাছে এই লক্ষণ কিন্তু ভালো মনে হচ্ছে না। এর পেছনে নিশ্চয় গূঢ় উদ্দেশ্য আছে। তোমরা কুহকে পড়ে যাচ্ছ না তো! শোনো, তুমি এই আন্দোলন থেকে দূরে থাকো নানাভাই।
রূপম কথা না বাড়িয়ে চলে গেল ভেতরের ঘরে। আকমল সাহেব অস্থির হয়ে ওঠেন এবার। দেশে কী হচ্ছে এসব! কোটা আন্দোলনের আড়ালে অন্য চক্র নিশ্চয় সক্রিয় আছে। বিরোধী দল-সহ একাত্তরে পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী তলে তলে জল ঘোলা করছে। তাদের মদত না থাকলে আন্দোলন এত জোরালো ও সহিংস হওয়ার কথা না। এসব রাজনৈতিক চাল বুঝতে না পেরে জড়িয়ে পড়েছে নিষ্পাপ সাধারণ ছাত্ররা। সরকারই-বা ছাত্রদের কোটা আন্দোলনকে এত হালকাভাবে নিল কেন? ফাঁকতালে অছাত্র-জনতাও সুযোগ নিচ্ছে এখন। কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলন রূপ নিচ্ছে গণ-আন্দোলনে। বলা হচ্ছে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। সরকারি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আন্দোলনকারীরা দাঁড়িয়েছে মুখোমুখি অবস্থানে। আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। মৃত্যুসংখ্যা একশ’ ছাড়িয়ে গেছে। শুধু ছাত্র-জনতা নয় পুলিশ সদস্যও আছে এর মধ্যে। গ্রেফতার হয়েছে এক হাজারের বেশি। সরকার নিরুপায় হয়ে রাতে দিনে সীমিত সময়ের জন্য দেশব্যাপী কারফিউ দিয়ে সেনা মোতায়েন করতে বাধ্য হয়েছে। আন্দোলন থামানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কোটা বাতিলের সরকারি পরিপত্র বিষয়ে আপিল শুনানির দিন এগিয়ে এনেছে। তারপর সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের বিধান রেখে মাত্র ৭ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও অন্যান্যের জন্য কোটা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ৫৬ শতাংশ। এসবের পরও ছাত্ররা অনমোনীয়। তারা এখন কোটা থেকে সরে গিয়ে ছাত্র-জনতা হত্যার বিচার চায়। কিন্তু এত হত্যাকাণ্ড কে ঘাটাল? এর পেছনে আন্দোলনকারীদের হাত নেই! সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য আন্দোলনের আড়ালে জঙ্গিগোষ্ঠী এই ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটায়নি তা কে বলবে? এখন ছাত্ররা বলছে তাদের আন্দোলন সকল প্রকার বৈষম্যের বিরুদ্ধে। সরকারকে বলছে ফ্যাসিস্ট সরকার। কী আশ্চর্য! ছাত্র-জনতার কোনো দায় নেই! ধ্বংসেই সবার আনন্দ! ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে সর্বাত্মক আন্দোলন। এর আড়ালে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ইন্ধন স্পষ্ট। ধ্বংসাত্মক ও নাশকতার জন্য সরকার বিশেষভাবে সন্দেহ করছে জামায়াত-শিবির চক্রকে। তাই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ কারার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কিন্তু এই বিভেদের শেষ কোথায়!
আকমল সাহেব ক্ষুণ্ন মনে পা বাড়ান নিজের ঘরের দিকে। বিছানায় গা এলিয়ে খবরের কাগজটা তুলে ধরেন চোখের সামনে। আলতোভাবে চোখ বুলাতে থাকেন প্রথম পাতায়। পাতার প্রধান অংশ জুড়েই কোটা আন্দোলনের খবর আর ছবি। বেশির ভাগই আন্দোলনকারী আর পুলিশ-সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ, সহিংসতা, ভয়াবহতার সচিত্র বিবরণ। আন্দোলনকারীরা পালন করছে ‘মার্চ ফর জাস্টিজ’ বা ন্যায়বিচারের জন্য পদযাত্রা কর্মসূচি। তাদের দাবি সারাদেশে ছাত্র-জনতা-শিশুসহ গণহত্যা, গণগ্রেফতার, হামলা, গুম-খুনের প্রতিবাদ এবং জাতিসংঘ কর্তৃক তদন্তপূর্বক বিচার। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ ২৩ জেলায়ও গতকাল বিক্ষোভ হয়েছে। এ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীর পাশাপাশি কোথাও কোথাও অংশ নেন শিক্ষক ও আইনজীবীরাও। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আক্রান্ত জায়গায় জায়গায়। তবু তারা আছে সতর্ক অবস্থানে। ঢাকা শহরের প্রবেশ পথগুলো অবরোধ করে রেখেছে সরকারি বাহিনী। এইটুকু পড়তে পড়তে আকমল সাহেব থমকে গেলেন। প্রধানমন্ত্রী আগেই আন্তর্জাতিক তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দিয়ে রেখেছেন। তারপরও এত আন্দোলন-বিক্ষোভের কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না আকমল সাহেব। খবরের কাগজ পড়তে ইচ্ছে হলো না আর। খাটের ওপর বসে থাকেন চুপচাপ।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর বিছানায় একটু গা-টানা দেওয়ার অভ্যেস আকমল সাহেবের। আজও শুয়েছেন। কিন্তু সহজাত স্বস্তি-আয়েশ আজ আচ্ছন্ন করছে না শরীরটাকে। কেমন এক অজানা উদ্বেগ এক হতে দিচ্ছে না চোখের দুই পাতা; হালকা তন্দ্রাও আসছে না। এ-পাশ ও-পাশ করতে করতে বিছানা থেকে উঠে টিভি ছাড়েন তিনি। টিভি-র বিশেষ সংবাদ—ছাত্র-শিক্ষক ও নাগরিক সমাজ পালন করছে ‘দ্রোহযাত্রা’ কর্মসূচি। বিকেলে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে জড়ো হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এই সমাবেশেই উঠেছে এক দফা দাবি— সরকারের পদত্যাগ। ঢাকায় গণমিছিল আর সংঘর্ষে দুই জন ছাত্রসহ সারাদেশে এ পর্যন্ত মোট নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে দুইশ’। এদিকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন শিক্ষার্থীদের জন্য গণভবনের দরজা খোলা। যে-কোনো সময় আলোচনার জন্য তিনি প্রস্তুত।
টেলিভিশনের খবর শুনতে শুনতে আরো বিমর্ষ হয়ে গেলেন আকমল সাহেব। সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে যেন। সামনে কোনো আলোর দিশা দেখতে পাচ্ছেন না তিনি। বড়ো অসহায় লাগছে। মনে মনে বললেন, আল্লাহ, তুমি আমাদের রক্ষা করো।
এমন সময় ঘরে উঁকি দিল ছোটো নাতি অনুপম। বলল, নানা, আমার এইচএসসি পরীক্ষার কোনো খবর আছে?
—নারে ভাই, ভালো কোনো খবর দেখি না তো। আয়, পাশে বস। আমার কিছু ভালো লাগছে না। রূপম কোথায় রে?
—ঘরে নেই তো ভাইয়া। শাহবাগ, কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার ওদিকে গেছে হয়তো।
— ওকে এত করে বোঝালাম, তাও শুনল না!
—নানা, এখন তো সবাই ওইমুখী। জানেন, আমার এক ক্লাসমেট,
এইচএসসি পরীক্ষার্থী, গতকাল বিক্ষোভ মিছিলে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যালে আছে। বাঁচবে কিন জানি না।
— বলো কী! তুমি কিন্তু ওসব ঝামেলায় যেও না নানাভাই। এখনো তোমার কয়েকটা পরীক্ষা বাকি, পড়াশোনার মধ্যে থাকো, যে-কোনো সময় তোমার বাকি পরীক্ষাগুলোর ডেট দেবে।
— সে আর কতদিন পরে হবে কে জানে!— বিরক্তি ও হতাশা মেশানো গলা অনুপমের। বলতে বলতে সে চলে গেল নিজের ঘরে।
আবার বিষণ্নতা গ্রাস করে বসে আকমল সাহেবকে। ছাত্র-জনতা আর পুলিশ সেনাবহিনী সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ভাঙচুর-নাশকতা এ ছাড়া টেলিভিশনে কোনো খবর নেই। অসহ্য! চেয়ার ছেড়ে ঘরে পায়চারি করতে শুরু করেন আকমল সাহেব।
আরো একদিন কেটে গেল। অবস্থার কোনো রদবদল নেই। রাত বারোটা থেকে কারফিউ বলবৎ থাকার পর সকাল ছটা থেকে শিথিল করা হয়েছে। শহরজুড়ে থমথমে ভাব। যতই বেলা বাড়ছে আজ শহর যেন জেগে উঠছে অন্য রূপে। চারদিকে হৈহল্লা শোরগোল বাড়ছে। কোথা থেকে যেন সব চাপা পড়া কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।
আকমল সাহেবের স্ত্রী রাহেলা বেগম নাশতার টেবিলে খাবার দিতে দিতে নিজের মনে বলেন, দেশে যে আবার কী শুরু হলো কী জানি!
আকমল সাহেব গম্ভীর গলায় বলেন, নাতিদের ডাকো, রূপম, অনুপম ওরা কই?
—আপনি খেতে বসেন আব্বা। রূপম নেই। সে সকালেই দুইখান শুকনো পাউরুটি চিবাতে চিবাতে কোথায় যেন বেরিয়ে গেছে। বলল, কাজ আছে। আর অনুপম আসছে। আপনি শুরু করেন। — প্লেটে রুটি-সবজি এগিয়ে দিয়ে বলল মেয়ে নাজিয়া।
রূপম খুব ভোরে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে শুনে আকমল সাহেব অবাক হলেন না। ভেতরে ভেতরে কিন্তু বিরক্ত। তবু সহজ গলায় বলেন, শোন, নাজিয়া, তোর ছেলে রূপম কোথায় যায়, কী করে খোঁজ-খবর কিছু রাখিস? সে তো এই ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তাকে সেদিন এত করে বোঝাবার চেষ্টা করলাম সে আমার কথার গুরুত্বই দিল না!
নাজিয়া চপুচাপ। দাঁড়িয়ে আছে নিরীহ ভঙ্গিতে। আকমল সাহেব সবজি মিশিয়ে এক টুকরো রুটি মুখে দেন। অন্যদিনের মতো খাওয়ায় রুচি নেই আজ। খাওয়ার ইচ্ছেটাই যেন মরে গেছে তার। কোনোমতে একটি রুটি খেয়ে চায়ের কাপটা নিয়ে তিনি চলে এলেন টিভির সামনে। খবরের কাগজটাও টেনে নিলেন কাছে।
আজও যথারীতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বিক্ষোভের খবর ও ছবিতে কাগজ ভরা। উদ্বেগজনক সব খবর। আজও ছাত্রদের কমপ্লিট শো-ডাউন কর্মসূচি বলবৎ আছে। অন্যদিকে ঢাকার প্রবেশ পথগুলো অবরোধ করে রেখেছে সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। চরম সাংঘর্ষিক অবস্থা। টিভি চ্যানেলগুলোতে চলছে এই অবস্থার আনুপূর্বিক চলতি বিবরণ। যতই সময় গড়াচ্ছে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। মারমুখী ছাত্র জনতার সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। আবার আকাশে ঘন ঘন চক্কর দিচ্ছে হেলিকপ্টার। শোনা যাচ্ছে রাজধানী ও বিভিন্ন জেলা শহরের নানা জায়গায় ব্যাপক সংঘর্ষ ও হতাহতের খবর। সাভার-আশুলিয়া-গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্প কারখানায়ও চলছে হামলা ও অগ্নি সন্ত্রাস। সবকিছু যেন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে ক্রমে। ভাবতে ভাবতে হাঁসফাঁস করে ওঠেন আকমল সাহেব। অস্থির পায়চারি করতে থাকেন ঘরে ঘরে।
দুপুরের দিকে হঠাৎ টিভি স্ক্রোলে ব্রেকিং নিউজ দেখতে পেলেন— বেলা দুই ঘটিকায় সেনাধ্যক্ষ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। খবরটি দেখেই চমকে ওঠেন আকমল সাহেব। হঠাৎ সেনাধ্যক্ষ ভাষণ দেবেন কেন? ভেতরে এমন কী ঘটল যে দেশের সেনাবাহিনীর প্রধানকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে হবে! বুকে তোলপাড় শুরু হলো আকমল সাহেবের। অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকেন টিভির সামনে। একে একে তার সঙ্গে এসে যোগ দেয় পরিবারের অন্য সদস্যরা, ছোটো নাতি অনুপম, মেয়ে নাজিয়া ও স্ত্রী রাহেলা বেগম। সবার চোখে-মুখে গভীর উদ্বেগ।
কিন্তু দুইটা গড়িয়ে তিনটা হলো। তারপরও টিভির পর্দায় দেখা গেলা না সেনাধ্যক্ষকে।
এরই মধ্যে অনুপম তার মোবাইলে ফেসবুক ঘাটতে ঘাটতে বলল, নানা, খবর তো মনে হয় খারাপ। ফেসবুকে কেউ কেউ বলছে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন।
আকমল সাহেব অবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, কী অলুক্ষুণে কথা! তোমাদের ওই যন্ত্রটা গুজবের জাহাজ। বন্ধ করো ওটা।—মুখে ধমকের সুরে এই কথা বললেন বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কেমন অধীর হয়ে উঠলেন তিনি। হতাশা গ্রাস করছে যেন তার সমস্ত অস্তিত্বকে।
ফেসবুকের কথাটা কি সত্যি? মনের সন্দেহ দূর করার জন্য টিভি রিমোট হাতে নিয়ে দ্রুত চ্যানেল ঘোরাতে থাকেন আকমল সাহেব । হঠাৎ চ্যানলগুলোর তোড়জোড় বেড়ে গেছে যেন। ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে টাটকা টাটকা খবর দিচ্ছে রিপোর্টাররা। চারদিকে হুড়োহুড়ি শোরগোল। দুএকটি চ্যানেল বলছে ছাত্র-জনতার কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে তারা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে। মিছিলে সমাবেশে উল্লাসে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছে ছাত্র-জনতা। সবাই যেন ছুটছে গণভবন অভিমুখে। যতই চ্যানেল ঘোরান ততই হৃৎকম্প বাড়তে থাকে আকমল সাহেবের। তবে কি সব আশা ভরসা শেষ! ষড়যন্ত্রকারীদের জয় হতে যাচ্ছে!
এমন সময় টিভি পর্দায় আবির্ভূত হলেন সেনাধ্যক্ষ। গম্ভীর মুখে ভাষণ শুরু করেন তিনি। “প্রিয় দেশবাসী, আপনারা ধৈর্য ধারণ করুন, শান্ত থাকুন। দেশ একটি মহাক্রান্তিকালে উপনীত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং আমি সব দায়িত্ব নিয়েছি। কিছুক্ষণ আগে আমি সর্বদলীয় নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছি। শিঘ্রই একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে। আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির পরামর্শ চাইব। সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আমি বলব, আপনারা দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করুন। দেশবাসীকে আবারো অনুরোধ করছি, আপনারার ধৈর্য ধারণ করুন এবং শান্ত থাকুন। খোদা হাফেজ।”
সেনাধ্যক্ষের ভাষণ শুনতে শুনতে একেবারে বিমর্ষ হয়ে গেলেন আকমল সাহেব। একী হলো! নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। এভাবে ছাত্রদের আন্দোলনে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী একটি সরকারের পতন ঘটল! আবার সেই অভিশপ্ত আগস্ট মাস। সম্মুখভাগে আবারও সেনাবাহিনী! নেপথ্যে আবারও নিশ্চয় স্বাধীনতা বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল চক্র! আবারও ঘোট পাকিয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আর একাত্তরে পরাজিত পাকিস্তান! এমন ভাবনার দোলাচলে দুলতে দুলতে গভীর হাতাশায় ডুবে যেতে থাকেন আকমল সাহেব।
ছাত্র-জনতার উল্লাস-ধ্বনিতে টিভি চ্যানেলগুলো মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরোদমে। এক চ্যানেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক সমন্বয়ক সদর্পে বলছেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়েছে, খুনি হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। আমরা নতুন করে আবার স্বাধীন হলাম।
আকমল সাহেব যন্ত্রচালিতের মতো রিমোটে চাপ দিয়ে দিয়ে চ্যানেল পাল্টাতে থাকেন। এখন সব চ্যানেলে একই দৃশ্য। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় গণভবন অভিমুখে নেমেছে ছাত্র-জনতার বাঁধ ভাঙা ঢল। অরক্ষিত গণভবন। সদর দরজায় কোনো নিরাপত্তা-দ্বাররক্ষী নেই। জন-সাধারণ ভেতরে ঢুকে পড়ছে অবাধে। অবিশ্বাস্য এ দৃশ্য! টিভির পর্দা থেকে চোখ ফেরানো যায় না। ঘটছে অভানীয় সব ঘটনা!
এমন সময় বেজে ওঠে অনুপমের মোবাইল ফোন। অনুপম উঠে চলে গেল ভেতরের ঘরে।
টেলিভিশনের পর্দায় চলছে চমকপ্রদ সব খবর আর দৃশ্যপটের সমারোহ। স্ত্রী রাহেলা বেগম, কন্যা জাকিয়া-সহ আকমল সাহেব বসে রইলেন টিভির সামনে। হতভম্ভ অবস্থা তার।
অনুপম আবার ঘরে উঁকি দিয়ে বলে, মা, দরজা বন্ধ করো, আমার বন্ধুরা সব বাইরে। আমিও জনতার বিজয় দেখতে যাচ্ছি।— কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সদর দরজা পেরিয়ে বাইরে চলে গেল অনুপম।
এরই মধ্যে আকমল সাহেব টেলিভিশনে দেখতে পেলেন এবার অকল্পনীয় সব দৃশ্যপট। উগ্র জনতা গণভবনে ঢুকেই শুরু করেছে এলোপাথাড়ি ভাঙচুর। তারপর শুরু হলো লুটপাট। চেয়ার টেবিল কম্পিউটার ল্যাপটপ বিছানা বালিশ শাড়ি গয়না অন্তর্বাস ফ্রিজের মাছ থেকে ক্ষেতের শাক-সবজি-কচু পর্যন্ত যার যা ইচ্ছে টেনে নিয়ে চলে যাচ্ছে বাইরে। দুই দিন আগে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন শিক্ষার্থীদের জন্য গণভবনের দরজা খোলা। সত্যি সত্যি গণভবনের দরজা খোলা রেখেই চলে গেছেন প্রধানমন্ত্রী! যেখানে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন চলছে লুঠপাটের মহোৎসব!
আরেকটি চ্যানেলে দেখানো হচ্ছে দলে দলে লোক ঢুকে পড়ছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে। ওখানেও শুরু হয়েছে নির্বিচারে ভাঙচুর জ্বালাও পোড়াও। জনগণের উন্মত্ত উল্লাস। যেন বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি চিহ্ন সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারলেই তাদের আনন্দ আর শান্তি। স্মৃতি জাদুঘরের কক্ষগুলোতে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে আগুনের লেলিহান শিখা। আকমল সাহেবের মনে হলো এ আগুনের আঁচ যেন লাগছে তার গায়ে, যেন নিজেই পুড়ে যাচ্ছেন তিনি।
এই টিভি চ্যানেল থেকে সরে এসে চোখ রাখেন অন্য একটি চ্যানেলে। এখানে দেখানো হচ্ছে আরো মর্মন্তত্মুদ একটি দৃশ্য। একদল লোক গুড়িয়ে দিচ্ছে বঙ্গবন্ধুর সুদৃঢ় এক ভাস্কর্য। কয়েকজন খন্তা-শাবল কুড়াল দিয়ে আঘাত করছে ভাস্কর্যের বেদির গোড়ায়। আর কয়েকজন ভূপাতিত করার জন্য গলায় দড়ি বেঁধে সজোরে টানছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটিকে। কী নিমর্ম!
আকমল সাহেব দ্রুত সরে গিয়ে ঢোকেন আরেকটি চ্যানেলে। এখানে আরো চরম লজ্জা ও অপমানজনক দৃশ্য। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের মাথায় প্রস্রাব করছে একজন আর কয়েকজন পায়ের জুতো খুলে ছুড়ে মারছে ভাস্কর্যের গায়ে।
হায়, কী চরম বর্বরতা! নিজেকে আর সামলে রাখতে পারেন না আকমল সাহেব। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন হঠাৎ। শেষ পর্যন্ত এ দৃশ্যও দেখতে হলো আমাকে! এর আগে কেন মৃত্যু হলো না আমার? আল্লাহ, কেন তুমি বাঁচিয়ে রাখলে আমাকে?
কাঁদতে কাঁদতে খানিক পর বিলাপ করে ওঠেন আকমল সাহেব, হে স্বাধীনতার মহানায়ক, পিতা, এজন্যই দেশ স্বাধীন করেছিলেন আপনি! এজন্যই জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করেছিলেন আজীবন! একাত্তর সালে এজন্যই আপনার ডাকে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম আমরা! পিতা, আপনার কোনো মর্যাদাই রক্ষা করতে পারিনি আমরা। আমরা এমন অধম অকৃতজ্ঞ জাতি! ক্ষমা করুন, আমাদের ক্ষমা করুন পিতা ।
এই মনস্তাপের মধ্যে পরবর্তী খবর কানে এলো আকমল সাহেবের। একটি টিভি চ্যানেল বলছে, হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির আক্রমণ, জেলায় জেলায় সংখ্যালঘু পাড়া-মহল্লায় হামলা। ব্যাপক সংঘর্ষ ও লুটপাট। গুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাস্কর্যও। যতই সময় গড়ায় ততই বুক ভাঙা সব খবর আসতে থাকে চারদিক থেকে। সন্ধ্যা হতে হতে আকমল সাহেব মনে মনে ভাবেন, আর বাকি থাকল কী! বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, রবীন্দ্রনাথ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এসবই যেন ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তু এখন। এর নামই কি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন! না, এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে চিরতরে নির্বাসনে পাঠাবার পাঁয়তারা। হায় নতুন বাংলাদেশ! হায় নতুন স্বাধীনতা!
—আব্বা, আপনি এমন করছেন কেন? আপনি এত চাপ নেবেন না। হঠাৎ আপনার শরীর খারাপ হবে। আপনি একা কী করবেন? দেশ কি আপনার একার?—বলতে বলতে পেছন থেকে কাঁধে হাত রেখে আকমল সাহেবকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে মেয়ে জাকিয়া।
আকমল সাহেব শোকার্ত গলায় বলেন, মানছি দেশ আমার একার নয়। কিন্তু এই দেশ দেখার জন্য তো আমরা মুক্তিযুদ্ধ করি নাই মা। জাতির পিতার সম্মান রক্ষা করতে পারলাম না, চোখের সামনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূ-লুণ্ঠিত হচ্ছে, এই মর্মযাতনা কোথায় রাখি বল মা! এ-দুঃখ কাকে বোঝাই!
— আপনি এত অস্থির হবেন না। শান্ত হোন।— বলতে বলতে স্ত্রী রাহেলা বেগম দুধের কাপ এগিয়ে দেন।— এই দুধটুকু খেয়ে নেন।
এমন সময় জাকিয়ার মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। ফোন রিসিভ করে কানে দিতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো একটি উদ্বেগময় কণ্ঠ, আন্টি, আমি অনুপমের ক্লাসমেট হৃদয় বলছি। খুব খারাপ একটি খবর। আমরা জনতার বিজয় দেখতে বেরিয়ে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে ঢুকে পড়েছিলাম। সেখানে গোলযোগের মধ্যে অনুপমের শরীর অনেকখানি আগুনে পুড়ে গেছে। ওকে ঢাকা মেডিক্যালের ইমার্জেন্সি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে।
বলতে বলতেই কেটে গেল ফোনের লাইন। জাকিয়া আর্তনাদ করে বলে উঠল, আব্বা, একি সর্বনাশা খবর, অনুপম নাকি আগুনে পুড়ে গেছে। ওকে ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হয়েছে। ওর বন্ধু হৃদয় ফোন করে খবরটা দিল। আমাদের একি সর্বনাশ হলো আব্বা।
আকমল সাহেব শুরু থেকে এরকমই কিছু আশঙ্কা করছিলেন। তাই এত সাবধান হতে বলেছিলেন নাতিদের। শেষ পর্যন্ত সেই বিপদই ঘটল। হায়, আল্লাহ।
কিছুক্ষণের মধ্যে মেয়ে জাকিয়াকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যালের ইমার্জেন্সি বিভাগে পৌঁছে গেলেন আকমল সাহেব। ডাক্তার বললেন, অপেক্ষা করুন, এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না।
রাত নয়টা পেরিয়ে গেল। ভাইয়ের দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঢাকা মেডিক্যালে হাজির হলো রূপম। বড়ো নাতিকে কাছে পেয়ে রাগে দুঃখে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন আকমল সাহেব, নানাভাই, তোমাদের বুকের ঝড় কি থেমেছে? নাকি সেই ঝড় আগুনে পরিণত হয়েছে! সেই আগুন থেকে তোমার নিজের ভাইও রক্ষা পেল না শেষপর্যন্ত। কেন এত সাবধান করেছিলাম, এবার বোঝো, নানাভাই, এবার মজা বোঝো। না জানি, আরো কতকিছু দেখতে হবে আমাদের! তবে মনে রেখো, ঝড় আবার উঠবে নতুন করে। কুহকের মায়া কাটতে বেশিদিন লাগে না ভাই। বিপ্লব প্রতিবিপ্লবেরই জন্ম দেয়। আর সে বিপ্লব হবে এমন ধ্বংসের জন্য নয়, সৃষ্টির জন্য। হয়তো সেটারও অগ্রসেনানী হবে তোমরাই। তখন বুঝবে সৃষ্টি করা কত কঠিন। তখন হয়তো তোমরাই আবার বোঝার চেষ্টা করবে একাত্তরের মর্মগাথা। বাংলার ইতিহাসের বাতিঘর কিন্তু সেই উনিশশো একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধু। এসবকে বাদ দিয়ে বাংলার ইতিহাস লিখতে পারবে না কোনো মহাজন। তোমরাও পারবে না। সেখানেই আবার ফিরে আসতে হবে তোমাদের। জানি না, ততদিন আমরা বেঁচে থাকব কিনা!
সুজন বড়ুয়া : সৃজনশীল সাহিত্য রচয়িতা




