রতন ভট্টাচার্য
চট্টগ্রাম শহরে হুলস্থূল পড়ে গেছে। এক গ্রাম্য ছেলেটি, যাকে চেনে না শহরে কেউই, কুমিল্লা বোর্ড থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে। তখন চট্টগ্রামের সব স্কুলই কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে। ছেলেটি ধর্মপুর নামক এক প্রত্যন্তত্ম গ্রাম থেকে এসেছে। নদীর পাড়ে জেলে পরিবার, কিন্তু সে বইয়ের নেশায় বুঁদ। কাঁচা ঘর, মাটির উঠোন, গরিব সংসার কিন্তু ছেলেটি যেন এক অদ্ভুত আলোক জন্ম। নাম তার অভিজিৎ। ফল প্রকাশের দিন চট্টগ্রাম শহরে হৈচৈ পড়ে যায় “ধর্মপুরের ছেলেটি বোর্ডে প্রথম!” সংবাদপত্রে ছবি ছাপা হয়। চট্টগ্রাম কলেজে তাকে ভর্তি হতে বলা হয় “এমন মেধা নষ্ট করা যাবে না।”
অভিজিৎ তখনও জানে না, শহরের জীবনে পা রাখলে কী কী বদলে যায়। গ্রাম থেকে শহর, নদী থেকে পিচঢালা রাস্তা, মাটির গন্ধ থেকে পেট্রোলের ধোঁয়া সব যেন এক নতুন অভিজ্ঞতা। কিন্তু এক জায়গায় সে একই রয়ে যায় বই, অধ্যয়ন, আর একরাশ স্বপ্ন। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে সে ভর্তি হয় হিউম্যানিটিজ বিভাগে, কিন্তু বিজ্ঞানেও তার দখল দেখে শিক্ষকরা অবাক। সাহিত্য, দর্শন, পদার্থবিদ্যা সব তার কাছে এক সমান আগ্রহের ক্ষেত্র। কলেজে এসে প্রথম যে মেয়েটির সঙ্গে তার দেখা হয়, সে হলো সুচরিতা।সুচরিতা এক আধুনিক মেয়ে। বাবা ডাক্তার, মা কলেজের অধ্যাপিকা। ছোটবেলা থেকে শহরে মানুষ। কিন্তু মেয়ে একেবারেই অহংকারী নয়। একদিন লাইব্রেরিতে দেখা, তারপর আলোচনা। রবীন্দ্রনাথ থেকে রেণু, ফয়েড থেকে নিউটন কথায় কথায় সময় গলে যায়।
অভিজিৎ বুঝতে পারে, এই মেয়েটির চোখে এমন এক আলো আছে যা বইয়ে পাওয়া যায় না। আর সুচরিতাও অবাক হয় ছেলেটির বিনয়,
গভীর মনন আর সরলতায়। প্রেমটা যেন অজান্তেই গড়ে ওঠে বৃষ্টির দিনে কলেজের বারান্দায়, লালচে সূর্যাস্তে কলেজ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে।
তবু অভিজিৎ জানে, তার স্বপ্ন অনেক দূর যায়। সে চায় গবেষণা করতে, নিজের নাম একদিন বিশ্বের পণ্ডিতদের তালিকায় দেখতে। আর একদিন আসে ডাক হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বৃত্তি পেল। দেশ ছেড়ে যেতে হবে বহু বছরের জন্য।
সুচরিতার বাবা অভিজিৎকে বিয়ে দিতে রাজী ছিল না। ওদের জেলে পরিবারে মেয়ে বিয়ে দিতে সায় নেই। সুচরিতা বলেছিল ও জাত মানে না। যেদিন নিজের পায়ে দাঁড়াবে অভিজিৎকেই ও বিয়ে করবে। বিদায়ের দিন সুচরিতা চুপ করে থাকে। কেবল বলে, “তুমি ফিরবে তো?” অভিজিৎ হেসে বলে, “জীবন যদি সুযোগ দেয়।”আর সেই কথাটিই হয় হয়তো শেষ কথা।
বিদেশে গিয়ে নতুন পৃথিবী। হার্ভার্ডের গবেষণাগার, ল্যাবরেটরি, বই, আলো, বরফ সবকিছু অভিজিৎকে নতুন করে গড়ে তোলে। মাঝে মাঝে সে সুচরিতাকে চিঠি লেখে। কিন্তু ক্রমে চিঠির উত্তর কমে আসে। তারপর একদিন বন্ধ হয়ে যায়।
অভিজিৎ ততদিনে গবেষণায় নিমগ্ন। সেখানে এক ছাত্রী লিসা। সেও তার মতোই একাকী, চিন্তাশীল। দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব, তারপর প্রেম, তারপর সংসার। চাকরির সুযোগ পায়, সন্তান হয় ড্যানিয়েল। বছর পেরোয়, বয়স গড়ায়। লিসাকে চার বছর আগে হারিয়েছে কোভিডের ভয়ংকরতায়। সুচরিতাকে মনে ছিল না। এখন ছেলের বিয়ে বাংলাগেশের মেয়ের সঙ্গে দেবে বলে ঠিক হয়েছে। ছেলের ইচ্ছে পিতৃভূমিকে সে হারাতে দেবে না। চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার মেয়ে। বাবা ডাক্তার। মা অধ্যাপিকা। অভিজিতের অনেক দিন পর অতীতের অনেক কিছু মনে পড়ল। সুচরিতাকেও। চল্লিশ বছর পর।
অভিজিৎ এখন অবসরপ্রাপ্ত। লিসা প্রয়াত, ছেলে বিবাহযোগ্য। হঠাৎ একদিন ড্যানিয়েল বলে, “ড্যাড, আমি বাংলাদেশে যেতে চাই। আমার শিকড়ের জায়গাটা দেখতে।” বাবা। তোমার জন্য একটা মেয়ে দেখতে বলেছি ওথানে। দেখি শেষ অবধি বিয়েটা তোমার কোথায় গিয়ে হয়। জন্ম মৃত্যু, বিয়ে – তিন বিধাতা নিয়ে ড্যানিয়েল চুপ করে থাকে। অনেক দিন পর হৃদয় কেঁপে ওঠে। ফেসবুকে বাংলাদেশের মেয়েটার সঙ্গে যোগাযোগ। খুব বুদ্ধিমতী। কানাডার টারেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ পেয়েছে। বাবাকে চমকে দেবে। মাধুরীকে পছন্দ হবেই বাবার।
বিমানে ড্যানিয়েলকে খুব খুশি দেখে অভিজিতের ভালো লাগে। আমেরিকান হয়েও বাবা মায়ের দেশ নিয়ে কি অদ্ভুত টান ওর। অভিজিৎ একদিন সুচরিতাকে ফেলে বিদেশে চলে গিয়েছিল। এখন লিসা নেই। চার বছর ধরে একা দিন কাটাতে কাটাতে ক্লান্ত। তাই ছেলের বিয়ে দেওয়ার এত আগ্রহ।
বিমান চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নামতেই যেন অভিজিৎ নিজের যৌবনের গন্ধ পায়। নেই সেই ছোট শহরের নির্জনতা, নেই কামরাঙা গাছের ছায়া, নেই ইলিশের বাজারের ডাক। তার বদলে আকাশচুম্বী মল, কফি শপ, আন্দরকিল্লার চারপাশে হেলমেট পরা তরুণ-তরুণী। ড্যানিয়েলও কোথায় কোথায় ঘুরছে। অভিজিৎও হাঁটতে হাঁটতে পুরনো কলেজে যায়। কলেজ, পাহাড় এখনো আছে, তবে ছেলেমেয়েদের কোলাহলে চেনা যায় না। এক ছায়াময় বিকেলে হঠাৎ আন্দরকিল্লার মলে একটি মুখ চোখে পড়ে চুলে পাক ধরেছে, মুখে ক্লান্তির রেখা, কিন্তু দৃষ্টিতে সেই পুরনো মায়া। অভিজিৎ থমকে দাঁড়ায়।“সুচরিতা?”মহিলা তাকায়, কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, “অভিজিৎ?” চোখে জল এসে যায় দুজনেরই। সময় থেমে থাকে কিছুক্ষণের জন্য। তারপর কথা ফুটে ওঠে ধীরে ধীরে “তুমি তো দেশে ফেরোনি আর।” “পারিনি জীবন এক অদ্ভুত ঘূর্ণি, সুচরিতা।”“জানি। আমিও বিবাহ করেছি, শিক্ষকতা করেছি, এক মেয়ে আছে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। স্বামী এখন আর নেই।
দুজনে নীরব। অভিজিৎ মৃদু হেসে বলে, “আমারও স্ত্রী মারা গিয়েছে। একটি ছেলে আছে। এবার তার জন্য পাত্রী দেখতে এসেছি।” দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর সুচরিতা বলে, “আজকাল সবকিছু বদলে গেছে। ছেলেমেয়েরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয়।” অভিজিৎ সম্মত হয়, “হ্যাঁ, তবে কিছু জিনিস বদলায় না কিছু অনুভূতি, কিছু চোখের ভাষা।” সন্ধ্যাবেলায় সুচরিতা তাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানায়। অভিজিৎ ও ড্যানিয়েল সেখানে যায়। বাড়িটি পুরনো, কিন্তু সাজানো, দেওয়ালে বইয়ের তাক, পিয়ানোর পাশে পুরনো ফটোফ্রেমে একটি যুবক-যুবতীর ছবি কলেজের দিনগুলোর।
ড্যানিয়েল তখন ব্যস্ত সুচরিতার মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে এক প্রাণবন্ত, বুদ্ধিমতী মেয়ে, নাম মাধুরী। দুজনেই সাহিত্য ভালোবাসে, ইতিহাস পড়ে, কথা থামতেই চায় না। সুচরিতা মৃদু হাসে, অভিজিৎ তাকিয়ে থাকে নিঃশব্দে। কি যেন একটা বলতে পারছে না অভিজিৎ। তুই এমন গল্প করছিস মনে হচ্ছে মাধুরীকে অনেক দিন থেকে জানিস?
ড্যানিয়েল হাসে। অভিজিৎ বলে, ড্যানি তোর দেখা সেই মেয়েটিকে আজ দেখতে যাব। হোটেলে বিরাট ভোজ দিয়েছে সুচরিতা। এতদিন পর দেখা। খাওয়া শেষে সুচরিতা অভিজ্ৎিকে চমকে দিয়ে বলে, “তুমি জানো না অভিজিৎ. তোমার ছেলে যাকে পাত্রী হিসেবে দেখছে, সে মাধুরী, আমার মেয়ে।”
অভিজিৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। যেন সময় বৃত্তাকারে ফিরে এসেছে।
“তোমার মেয়ে?”
“হ্যাঁ। আর দেখো, ইতিহাস কী অদ্ভুতভাবে পুনরাবৃত্ত হয়। চল্লিশ বছর আগে আমরা যেটা বাঁচতে পারিনি, হয়তো আমাদের সন্তানরা পারবে।”
অভিজিৎ চুপ করে থাকে। জানালার বাইরে চাঁদ উঠেছে, নরম আলোয় মুখ ভেসে যাচ্ছে দুজনের।সুচরিতা ধীরে বলে, “মাধুরীর বাবা ওর বিয়ে বিদেশে দেওয়ার স্বপ্ন দেখত। আজ ও বেঁচে থাকলে সব চেয়ে বেশি খুশি হত। “অভিজিৎ চুপ করে থাকে। সময় সব বদলায়, কিন্তু সুচরিতার কিছুই বদলায়নি। সেই হাসি, সেই অনর্গল কথা বলা। অভিজিৎ এখনও কি সুচরিতাকে ভালোবাসে। সত্যি প্রেমের কোনো মেয়াদ থাকে না। সুচরিতার কথার উত্তরে অভিজিৎ বলে, “ঠিক বলেছো, বাবারা এরকম স্বপ্ন দেখে সন্তানদের নিয়ে। হয়তো এটাই জীবনের চিরন্তন বিজ্ঞান।”
মাধুরী অভিজিৎকে আঙ্কেল বলবে না। কাকু ডাকলে অভিজিৎ খুশিও হয়।
পরের দিন ড্যানিয়েল বলে, “ড্যাড, আমি ও মাধুরী একে অপরকে দুবছর ধরে পছন্দ করি। ফেসবুকে নিয়মিত যোগাযোগ আমাদের। ওর কানাডা যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার খবর আমাকে সবার আগে জানিয়েছিল। তোমাকে বলিনি আগে। “অভিজিৎ হেসে বলে, দুষ্টু ছেলে। বাবার থেকে লুকিয়ে প্রেম। মাধুরী বলে,” তুমি রাগ করেছ কাকু?”
“না মা তোমাকে দেখার পর আর রাগ নেই। বুক ভরা আশীর্বাদ রইল।”
এক সপ্তাহ পরে রেজিস্ট্রি বিয়ের আয়োজন হয়। মাধুরীর বাবা মারা গিয়েছিল কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে গিয়ে। মেয়ের বিয়ে নিয়ে কত হৈচৈ করত। খুব ভালোবাসত মেয়েকে। অবশ্য আন্দরকিল্লাতে হৈচৈ পড়ে গিয়েছে। বিদেশফেরত পণ্ডিতের ছেলে বিয়ে করছে স্থানীয় অধ্যাপিকার মেয়ে। মাধুরীর মিষ্টি ব্যবহার আর সমাজসেবামূলক কাজের জন্য সবাই খুব ভালোবাসে।
ওদের বিয়ের দিন সুচরিতা ও অভিজিৎ পাশাপাশি বসে থাকে কেউ কথা বলে না, কিন্তু চোখে বোঝাপড়ার এক গভীর স্রোত।
রেজিস্ট্রি অফিসে মাধুরী ও ড্যানিয়েল সিঁদুর পরার মুহূর্তে হাত ধরাধরি করে তাকায় এক মুহূর্তে যেন সময়ের ফাঁকে মিলেমিশে যায় দুই যুগ।
অভিজিৎ মনে মনে ভাবে চল্লিশ বছর আগে যে প্রেম অসমাপ্ত ছিল, তা আজ পূর্ণ হলো অন্য আকারে, অন্য জীবনে।
এটাই হয়তো জীবনের অনন্ত পরিণতি। রাতের শেষে, যখন সবাই চলে যায়, সুচরিতা ও অভিজিৎ নিঃশব্দে বারান্দায় দাঁড়ায়। চাঁদ এখনো আকাশে। দূরে সমুদ্রের ঢেউ শোনা যায়।
সুচরিতা বলে, “অভিজিৎ, তুমি আবার হার্ভার্ডে ফিরবে?”অভিজিৎ বলে, “না, এবার আমি ফিরব গ্রামে। যেখানে কামরাঙা গাছ ছিল।
ড্যানিয়েল আর মাধুরী আগেই ফিরে গিয়েছে নিউইয়র্কে। অভিজিৎ থেকে গিয়েছিল কদিন বাংলাদেশে। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একা হয়ে গিয়েছিল। ড্যানিয়েলের বিয়ে দিয়ে অভিজিৎ মুক্ত। কদিন বাংলাদেশ ঘুরবে। দুজনেই চুপ থাকে। বাতাসে মৃদু ইলিশের গন্ধ, ঢেউয়ের শব্দ, আর সেই পুরনো দিনের স্মৃতি। চল্লিশ বছর পর সবকিছু বদলে গেছে, কিন্তু কিছু ভালোবাসা সময়কেও হার মানায়।
ড. রতন ভট্টাচার্য, ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধিভুক্ত অধ্যাপক ও সাংবাদিক




