এখন সময়:সন্ধ্যা ৬:৩৭- আজ: মঙ্গলবার-২৭শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৩ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

এখন সময়:সন্ধ্যা ৬:৩৭- আজ: মঙ্গলবার
২৭শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৩ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

চিত্রশিল্পী নিপা গোমেজের শিল্পালেখ্য: চর্চিত শিল্প ঐতিহ্যের উজ্জ্বল উত্তরাধিকার

শিশির মল্লিক

 

শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ব্যতীত একটি সমাজের বিকাশ অসম্ভব। সংস্কৃতি হচ্ছে পুরো মানবগোষ্ঠীর সামগ্রিক কার্যক্রমের বিষয়। সংস্কৃতি কেবল নাচ গান সংগীত নাটক চিত্রকলা ভাস্কর্য শুধু নয়, পুরো মানব প্রজাতির সামগ্রিক উৎপাদন পদ্ধতির ধরন এবং এর সাংগঠনিক অবস্থা অর্থাৎ বন্টন ব্যবস্থা, সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, দর্শন ও আধ্যাত্মিক জীবনসমেত এর বিস্তৃতি। আরো সংক্ষেপ করে বলা যায়, সভ্যতা হলো তাই যা সংস্কৃতি বৈ কিছু নয়। সভ্যতা একটি প্রকৃতি বিরুদ্ধ মানুষের সহায়ক, এবং মানবের আরামপ্রদ জীবন ও নিরাপত্তাজনিত কারণে সৃষ্ট। ফলে নির্দিষ্ট ভূ-প্রকৃতি অনুযায়ী মানব গোষ্ঠীর সমবেত উৎপাদন চর্চায়ই প্রতিটি জাতিসত্তাকে ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেয় এবং আলাদা করে।

আমরা সমূদ্র উপকূলীয় বদ্বীপীয় এক জনগোষ্ঠী, সমুদ্র উপকূলীয় নদীবিধৌত একটি অঞ্চলের অধিবাসী। যেখানে পাহাড়-সমতল হাওর-বাঁওর প্রকৃতি নিয়েই আমাদের এক বৈচিত্র্যিক জীবন রয়েছে। এদেশের বেশির ভাগ মানুষ কৃষি ও মৎসশিকারে ব্যস্ত জীবনযাপন করে এসেছে। তাদের জীবিকার প্রধান উপকরণই হচ্ছে কৃষি ও মৎস্য শিকার। কৃষির সাথে গৃহপালিত প্রাণীর লালন-পালনও আরেকটি

 

গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশ। ফলে আমাদের এখানে যে পারিবারিক ও সামাজিক জীবন গড়ে ওঠে তার সুদীর্ঘ একটি ক্রম রয়েছে। এই জীবনযাপনকে ঘিরে যে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক এবং মনস্তাত্ত্বিক জগৎ গড়ে উঠেছে, আনন্দ-বিনোদনের যে বিস্তৃত চর্চা আমরা দেখি, তা বেশ সমৃদ্ধই আমরা বলবো। দেখা গেছে এ দেশের মানুষ শুধু কৃষি উদ্ভাবনই করেনি, কৃষি উদ্ভাবনের সাথে তার আনন্দ-বেদনা শোক দুঃখ স্বপ্ন সবকিছুই তারা কল্পনায় বিস্তৃত করেছে। সঙ্গীত কবিতা মহাকাব্য জারি সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, বাউল বিভিন্ন বৈচিত্র্যমূলক গানের শাখা-প্রশাখার মধ্য দিয়েই এসব চর্চিত হয়েছে।

বিশেষ করে বৃটিশ শাসন ও আধিপত্যের কারণে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও শিল্পধারার সাথে এদেশের মানুষের পরিচিতি ও যোগ ঘটেছে। সেই ধারার প্রাতিষ্ঠানিক চর্চারও প্রায় দ্বিশতক পার হতে চললো। ফলে এই সময়কালের ভেতর ইউরোপীয় শিল্পচর্চার যে ধারাসমূহ চর্চিত হয়েছে; তার পাঠ ও চর্চা এখানেও প্রত্যক্ষ করি। রোমান্টিকতা আধুনিকতা উত্তরাধুনিকতাবাদী ধারার শিল্পচর্চা ব্যাপকভাবে চর্চিত হয়েছে হয়ে চলেছে বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে। তথ্যপ্রযুক্তি উন্নতির সাথে সাথে তা আরো ব্যাপকতা লাভ করে চলেছে।

পাশাপাশি আরেকটি ধারা, যেটি এখানকার জনগোষ্ঠীর উপজীব্য এবং তাদের জন্য সহজবোধ্য। সে শিল্পচর্চারও একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সেসব চর্চা স্থানীয়ভাবে মানুষ চর্চা করেছে। লোকশিল্পীরাই ছিলেন এর প্রধান বাহক। তারা গৃহসজ্জা পটচিত্র বিভিন্ন অনুষ্ঠান পার্বণাদির সাজ-সজ্জার মাধ্যমে সুদীর্ঘকাল ধরে করে এসেছে। কুটির শিল্পের নানা প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সৃষ্টিতেও যে নান্দনিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে তাও তাদের স্বচিন্তা ও সৃজনশীলতায় সৃষ্ট। তার যে নান্দনিক দিক সেটি একান্তই আমাদের।

সেই ধারাবাহিকতায় আমরা এদেশে সামাজিক বাস্তবতাধর্মী সুকুমারশিল্পের চর্চাও দেখতে পাই। বলতে গেলে এ ধারাবাহিকতার যিনি আধুনিক শিল্পধারার প্রবর্তক যিনি ইউরোপীয় শিল্পধারায় প্রশিক্ষিত এবং এ দেশের চারুশিল্পের আধুনিক চর্চার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে গেছেন তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন আমাদের সবার প্রিয় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। যিনি দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন এই ভারতীয় জনগোষ্ঠী কেবল রাজচিত্র কিংবা পৌরাণিক চিত্রই অঙ্কন করেন না, তারা জলজ্যান্ত সামাজিক সমস্যা এবং বাস্তবতার ছবিও বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেন। যার প্রভাবে সে সময় পঞ্চাশের দশকে ক্যালকাটা গ্রুপ নামে একটি শিল্প গোষ্ঠীর জন্ম লাভ করেছিলো। যারা পরবর্তীতে পত্রপল্লবে পল্লবিত হয়ে অভিভক্ত বাংলার চিত্রকলাকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বহু বিশ্বখ্যাত শিল্পী তৈরি হয়েছিলো এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়। তার পেছনেও শিল্পী জয়নুল আবেদিনের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন শিল্পচর্চা এদেশের মানুষের মাঝে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন সহজবোদ্ধভাবে। সহজবোদ্ধভাবে শুধু নয়, এ দেশের মানুষের যে সামাজিক জীবন, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং উৎপাদনক্ষম জীবন সংগ্রাম এ সবকিছুকেই তিনি তাঁর চিত্রে স্থান দিয়েছিলেন। প্রাণ-প্রকৃতিকে তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে এনেছিলেন। কারণ পশ্চাৎপদ কলোনিয়াল একটি সমাজে এদেশের মানুষ শিক্ষদীক্ষায় অনেক পিছিয়ে ছিলো। তাই তাঁর প্রচেষ্ট ছিলো এদেশের মানুষকে প্রথমে তাঁর চিত্র সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার। কারণ জনগণ যখন তাঁর কোনো ছবিতে তাদের উপস্থিতি দেখতে পায়, তখন সেটিকে যেভাবে আগ্রহ বা কৌতূহলের সাথে গ্রহণ করে অন্যকোনো বিমূর্ত বা প্রকাশবাদী ধারার শিল্পকে সেভাবে নিতে পারে না। তাই জয়নুল আবেদিনের প্রচেষ্টা আমরা মনে করি, অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং দেশের মানুষের প্রতি তাঁর যে প্রতিশ্রুতি এবং এগিয়ে নেওয়ার জন্য তাঁর যে তাগিদ— এটি অবিস্মরণীয়। তাঁর পর পর অন্য যাঁরা এই ধারার চর্চাকে এগিয়ে নিয়েছেন তাঁদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা হলেন শিল্পগুরু শফিউদ্দিন আহমেদ, পটুয়া কামরুল হাসান, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী, নভেরা আহমেদ, হামিদুর রহমান, পরবর্তীতে হাশেম খান, রফিকুন নবী, তারও পরে সমর মজুমদার, আশরাফ আহমদ, জামাল আহমদসহ অনেকেই এই ধারাকে আরো এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।

অতএব আমাদের শিল্পচর্চার মধ্যে পাশ্চাত্য প্রভাবিত প্রকাশবাদী ধারা এবং দেশীয় সমাজ বাস্তবতা নির্ভর মূর্ত শিল্পচর্চা দুটোই বেশ বলিষ্ঠভাবে চর্চিত হয়ে চলেছে। দুটো ধারারই ব্যাপ্তি বেশ।

শিল্পী নিপা গোমেজের ছবি যখন আমি প্রথম দেখি এবং পাঠ করি, আমি অত্যন্ত আনন্দিত হই এজন্যে যে, তার অঙ্কনশৈলীতে রংয়ের উপস্থাপন একজন দর্শককে প্রথমেই আমোদিত করে তোলে। এটি একটি সক্ষমতা যে, দর্শককে আনন্দ দান করতে পারে, যা শিল্পী নিপার কাজে রয়েছে। ছবিতে রং একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একটি রংয়ের প্রয়োগ মানসজগৎকে, মানসজগতের বিভিন্ন অভিব্যক্তিকে খুব চমৎকারভাবে তুলে আনতে পারে; কোনো অবয়বহীনতা ছাড়া কোনো

 

অবজেক্টিভ উপস্থিতি ছাড়াই রংয়ের এই প্রকাশ ক্ষমতা রয়েছে। যা শিল্পী নিপা তাঁর চিত্ররচনায় প্রধান উপকরণ হিসেবে নিয়েছেন। এদিক থেকে শিল্পী নিপা পাশ্চাত্য প্রকাশবাদী শিল্পধারার চর্চাতেই বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন সেটা দর্শক মাত্রেই বুঝতে পারবেন।

তবে উজ্জ্বল রংকে উপস্থাপন খুব সহজ কাজ নয়। তার জন্য যে পরিশীলন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, চর্চা ও দক্ষতা দরকার তা যথেষ্ট থাকা চাই যেটি শিল্পী নিপার মধ্যে রয়েছে। তিনি অত্যন্ত ভারসাম্যের সাথে রংকে উপস্থাপনে কৌশলী হয়ে উঠছেন বলা যায়। তিনি এতো উষ্ণ রং যেমন লাল গোলাপি কমলা হলুদ নীল গাঢ়কালো, সাদার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিস্ফুটন বা বিন্দুর মতো করে ব্যবহার করছেন। আবার একই রংয়ের বিভিন্ন শেডও প্রকাশ করেন। এককথায় বিভিন্ন মাল্টি কালারে তিনি চিত্র রচনা করছেন। মাধ্যম হিসেবে তিনি কাগজ ও অ্যাক্রিলিক রংকে ব্যবহার করেছেন। অ্যাক্রিলিককে তিনি জলরংয়ের আবিলতা ছড়ান তার ক্যানভাসে। লাইন ও রেখার উপস্থাপন করেছেন। ছবিতে তার প্রাণ-প্রকৃতির উপদান থাকলেও মানুষই কখনো কখনো প্রধান হয়ে উঠে আসে। মানুষকে ঘিরে অন্যান্য প্রাণজ সত্তার উপস্থিতিও ছবিতে লক্ষণীয়। যেটি সমাজ ভাবনার অভিব্যক্তিই বলা চলে। চিত্রকলাকে তিনি বাস্তবের প্রতিরূপ হিসেবে প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে না এনে মনস্তাত্ত্বিক এবং দর্শনগত উপলব্ধির মধ্যে হাঁটতে চেয়েছেন।

আমরা যখন কোনো ছবিতে দেখি অজস্র চোখের বিন্যাস, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অজস্র ডটের বিন্যাস। আবার যখন দেখি বৃক্ষপল্লবে পল্লবিত হচ্ছে তার মাঝেও চোখ, খোলা চোখ তখন দর্শকের দৃষ্টিতে শিল্পীর একটি উপলব্ধি বা ধারণা দর্শকের দৃষ্টি বা বোধকে নাড়া দেয়, ভাবতে বাধ্য করে। তার আরো ভালো দিক বলবো সেটি হলো রং এবং রেখার যে বিন্যাস তার মাঝে তিনি রংকে প্রধান্যে রেখে রেখাকে দ্বিতীয় উপদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন সরাসরি গাঢ় কালো রেখার ব্যবহার না করে বিভিন্ন রংয়ে রেখাকে ব্যবহার করেছেন। রেখাকে পটভূমি বিন্যাসেও অন্যতম একটি উপাদান হিসেবেও কাজে লাগিয়েছেন। কোনো টেক্সার তৈরির জন্য রং ব্যতীত অন্য উপাদানের সহায়তা নেন নি। যদিও এখনকার শিল্পীদের অনেকেই হরহামেশাই টেক্সার তৈরিতে বিভিন্ন উপাদানের প্রয়োগ করে থাকেন।

সরাসরি কিছু কাজের বিষয়ে আলোকপাত না করলেই নয়। তন্মধ্যে কয়েকটি কাজ বেশ ভাব বিষয় ও উপস্থাপনে দর্শকে ছুঁয়ে যাবে। যেমন— ১. কালোর দ্যুতি (ইষধপশ ষরমযঃ) পুরো ক্যানভাসজুড়ে বিভিন্ন রংয়ের উপস্থিতি মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে আসা কালো রংয়ের দ্যুতি। ছবিটি এতো রংয়ের ভেতর কালোর তীব্রতা দৃষ্টিকটু লাগেনি একেবারেই। বরং বেশ সাবলীলতায় একটি অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছে। কালোর ভেতর থেকে শুধুমাত্র একটি কৃত্রিম ভাল্বের মুখাবয়ব বের হয়ে আসছে, যা দর্শকের মাঝে বিচিত্র অনুভূতি জাগাবে। এই একটি মাত্র অবয়বই ছবিটিকে অর্থপূর্ণতা দিয়েছে।

২. আত্মগীতের ব্যঞ্জনা The consonants of the autobiography এ ছবিতে দেখি মানুষ ও প্রাণীর উপস্থিতি। মাঝখানে শিংওয়ালা দৈত্যাকৃতির প্রাণী একপাশে দুটি মানবাকৃতি অন্যপাশে টিকটিকি তার ওপর ফড়িং, মানুষের চোখ, নিচে ফুল এবং গুইসাপের মতো প্রাণীর অবয়ব। লাল নীল গোলাপি কমলা সবুজ কালো রংয়ে সুন্দর একটি ব্যালেন্সড কম্পোজিশন। পটভূমি নির্মাণে বিভিন্ন তুলির রেখা ও ডট ও আলংকরিক উপাদানে ছবির নান্দনিকতার বিষয়ে বেশ যত্নশীলতা পরিলক্ষিত হয় এ কাজটিতে। ছবিটির ভাবব্যাঞ্জনায় মূর্তঅবজেক্টিভের ভেতর দিয়ে বিচিত্রভাবের সঞ্চারণা করে।

৩. অস্পৃশ্য অনুভূমি : এটি ভূদৃশের ইঙ্গিত দেয়। ইঙ্গিত দেয় এজন্যে বলছি যে এখানে সরাসরি গাছপালা ঘরবাড়ি বা প্রচলিত দৃশ্য তিনি আঁকেন নি। একজন দক্ষ শিল্পীর মতো সারফেসকে রং ও তুলির সফট স্ট্রোকের মাধ্যমে একটি চমৎকার আবহ সৃষ্টি করেছেন। মাল্টি কালার থাকলেও একটা পেলবতা এবং নরম কোমল ভাব ফুটিয়ে তুলেছেন। এটিও খুব সুন্দর একটি কাজ।

৪. পৌরাণিক আখ্যান : এ ছবিতে সৃষ্টিসম্পর্কিত ভাবনার গভীর অভিনিবেশ পরিলক্ষিত হয়। ছবিটির কেন্দ্রজুড়ে কয়েকটি মাতৃত্বের অবয়ব লক্ষনীয় শুধু তাই নয়, এখানে তুলনামূলক প্রতিভাস দেখতে পাই। দুটো অবয়বের ভেতর মানবশিশু অন্য একটির ভেতর বৃক্ষের অঙ্কুরোদগম লক্ষণীয়। শিল্পী বিশেষ একটি অভিপ্রায়ের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন— যা দর্শককে ভাবাবেই। এভাবেই শিল্পী ও দর্শকের মাঝে ভাবনার মেলবন্ধন ঘটানোর প্রয়াস রয়েছে তার বেশির ভাগ কাজে। খুবই সাদামাটা সারফেসের মাধ্যমে রং ও রেখায় এ কাজটি তিনি চিত্রিত করেছেন।

আবার আমরা শিল্পী নিপার সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার চিত্রও লক্ষ করি সেটি’২৪ এর জুলাই আন্দোলনকে উপজীব্য করেই। সেটি হলো— ৫. জুলাই আখ্যান – তরুণ প্রজন্মের ওপর রাষ্ট্রশক্তির বলপ্রয়োগ ও দমন এবং নিষ্ঠুরতাকে যেন এ ছবির মাধ্যমে তিনি ডকুমেন্টশন করে রাখতে চেয়েছেন। অত্যন্ত দক্ষতায় তুলে এনেছেন তিনি এ ঐতিহাসিক ঘটনাটিকে। তিনি রংয়ের অর্থবহতার ব্যাপারে বেশ সচেতন সেটা বোঝা যায় যখন ছবির বিষয়বস্তুর সাথে রংয়ের প্রয়োগ দেখে। পুরো ছবিতে লালের প্রাধান্য রেখে কমলা সবুজ কালোর মাধ্যমে জুলাইয়ের রক্তাক্ত ও বিপ্লবাত্মক বৈশিষ্ট্য, সবুজ দেশমাত্রিকা, ভালোবাসা বা মমত¦ ও প্রতিক্রিয়াকে চিত্রায়িত করেছেন। এতো গেলো রং। রংএর বাইরে যেসব অবজেক্ট তিনি তুলে আনেন তা হলো— খণ্ডিত হাত মৃত শায়িত মূর্তি যেগুলো আহত রক্তাক্ত আবার হিংস্র দাঁতাল প্রাণীর অস্তিত্ব বিষয়কে উপলব্ধি করতে সহায়তা করে। আবার মাঝখানে লালের মাঝে লেখা ‘শোন ধর্ম আর দেশকে মিলাতে যেও না’ তার একটু নিচে ৩৬ জুলাই লেখা আরো স্পষ্ট করেছে ছবিটি দেখে খুব সহজেই জুলাইকে বুঝবে দর্শক মাত্রেই। রং ফর্ম টেক্সার ব্রাশ স্ট্রোকিং রংয়ের মেশ ঘটানো সব মিলিয়ে এটি একটি নান্দনিক সৃষ্টি বলতে হবে।

শিল্পী নিপা তার আর্ট জার্নির মাধ্যমে আমাদের জানান দিচ্ছে আমরা শুধু একজন সুদক্ষ চিত্রশিল্পী হিসেবে নয় একজন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির শিল্পসত্তাকে পেতে যাচ্ছি।

শিল্পী নিপা গোমেজের বেড়ে ওঠা ঢাকার খুবই নিকটে নবাবগঞ্জে। এখানে শহর ও গ্রামের মিশ্র একটি পরিবেশের মাঝে বেড়ে উঠা তার। সে সময়ে এতোটা নাগরিকতার বিকাশ ঘটেনি। ফলে গ্রামীন জীবনের প্রভাব বেশ উপভোগ করেছেন তিনি। তাঁর নিজের সম্পর্কে তিনি যেভাবে বলেন, ‘পুকুরে সাঁতার কাটা মাঠের ঘুড়ি উড়ানো গাছে ওঠা টুক্কি ডাণ্ডা, গোল্লাছুট দাড়িয়াবান্ধা খেলা, বর্ষার সময় নৌকা চালানো এভাবে আমার শৈশব কেটেছে। ঢাকায় এসে কলেজে পড়েছি। তারপর বাবা-মা বিয়ে দিয়ে দিয়েছে আমার দশ বৎসর একটা গ্যাপ। তারপর আবার আমি চারুকলার পড়াটা শুরু করি। এটা আমার জন্য একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। অনেক চড়াই উতরাই পার করে আমার এই শিল্প সাধনার পথ তৈরি হয়েছে।’

সমাজজীবনের সম্পর্কেও ভেতর ঢুকে পড়া এবং তার দায় নেওয়া একজন মানুষকে হঠাৎ করে বড় করে দেয়। শিল্পী নিপার বিবাহিত জীবন এবং দশ বছর পাড়ি দিয়ে আবার চিত্রকলায় পড়াশোনা ও চর্চা তারই প্রমাণ বৈকি! প্রকৃতি সমাজজীবনের সাথে ঘনিষ্ঠতা একজন শিল্পীকে যে বিচিত্রমুখীন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে তা শিল্পী নিপার সৃজনশীল কর্মকে ঋদ্ধ করবে বলে আমার মনে হয়। আমরা তার কাজে সেই ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছি। শিল্পী নিপা চারুকলায় পাঠ নিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা) থেকে। বহু গ্রুপ আর্ট এক্সিবিশনে তাঁর অংশগ্রহণ রয়েছে। বর্তমানে তিনি কাশফুল আর্ট স্কুলের পরিচালক ও শিল্পশিক্ষক হিসেবে উইলিয়াম কেরি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে কর্মরত আছেন।

সবশেষে নিপার জন্য বলা এই যে, একজন শিল্পীর অভিনিবেশ দর্শকের দৃষ্টি এড়ায় না। আড়াল করার কোন সুযোগ থাকে না। চিত্রকলা একটি দৃশ্যগত শিল্প বা ভিজ্যুয়াল আর্ট। তাই এই শিল্পে শিল্পীর কোনো অবহেলা কিংবা অমনোযোগিতা অস্থিরতা কিছুই দর্শকের দৃষ্টি এড়ায় না। ছবিতে একজন শিল্পী কতোটা মনোযোগি কতোটা যত্নশীল এবং প্রতিশ্রুতিশীল সেটি শিল্পীর তুলির আঁচড় এবং কম্পোজিশনে বুঝা যায়। এ বিষয়টি আমি মনে করি, শিল্পীকে খেয়াল রাখতে হয়। প্রতিটি কাজ প্রতিটি শিল্পতেই যেন যত্ন থাকে। শিল্পে অন্য শাখায় যেমন কবিতা বা গল্প উপন্যাস রচয়িতারা যেমন বারবার কাটছাঁট করেন, বারবার সংশোধন করেন তারপর সমৃদ্ধ করেন লেখাকে। তেমনি চিত্রশিল্পীকে তাঁর চিত্র বারবার পাঠ করতে হয়, আঁকার সাথে সাথে প্রচুর সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হয়, সংশোধন করতে হয়। নিজেই নিজের বিচারক হয়ে উঠতে হয়। শিল্পী নিপা গোমেজ আমাদের শিল্প ঐতিহ্যের উজ্জ্বল উত্তরাধিকার হয়ে উঠুক সেটাই আমাদের সকলের প্রত্যাশা।

 

 

শিশির মল্লিক : চিত্রশিল্পী ও কবি

মুসলিম সম্পাদিত ও প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র : শিখা

ইসরাইল খান ভূমিকা: উনিশ শতকের রেনেসাঁস হিন্দুসমাজেই বদ্ধ ছিল। ওর মর্মবাণী সমাজঅভ্যন্তরে প্রবাহিত করেছিলো যেসকল সাময়িকপত্র তা ছিল হিন্দুসমাজপতিগণের। মুসলিম- পত্রপত্রিকার উদাহরণ কেবলই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। উল্লেখ

নাটোরের সাহিত্য সম্মেলনে রত্নগর্ভা হাজেরা খাতুন পদক ২০২৫ প্রদান ও গুণীজন সংবর্ধনা

\ আন্দরকিল্লা ডেক্স \ নাটোর ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার হাজেরা ফাউন্ডেশন সাহিত্য সম্মেলন শুভ উদ্বোধন করেন। সম্মেলনে প্রতি

আন্দরকিল্লা’র উদ্যোগে তিন কবির জন্মদিন উদযাপন

মন ও প্রাণের অনাবিল আনন্দ আমেজে শীতার্ত সন্ধ্যেয় হৃদয়ের উষ্ণতায় উচ্ছল উচ্ছ্বাসে আন্দরকিল্লার ২৮ বছর পদার্পণ, ইংরেজি নববর্ষ ২০২৬, এবং তিন কবির জন্মদিন উদযাপন অনুষ্ঠিত

প্রজেক্ট ক্লাউড হাউস

রোখসানা ইয়াসমিন মণি ডা. অভ্র সেনগুপ্ত, একজন প্রথিতযশা জ্যোতির্বিজ্ঞানী। ল্যাবের কাঁচের দেওয়ালের ওপারে ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। আজ সকালটা মেঘাচ্ছন্ন, ঠিক তার মনের মতো।