মাসুদ আনোয়ার
একে একে মুসল্লিরা বেরিয়ে আসছে মসজিদ থেকে। আমি দাঁড়িয়ে আছি স্থানুর মতো। প্রত্যেক মুসল্লির মুখের দিকে তীক্ষ্ম নজর বুলাচ্ছি। কাপ্তাই বড় মসজিদের ইমাম গোলাম মাওলার চেহারা স্মরণ করছি। ঘোর কালো রঙের লোকটা, মাথায় সাদা রঙের পাগড়ি প্যাঁচানো। গাল ভরা দাঁড়িতে, জোড়া ভুরু। কম আলোর বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে মসজিদের বাইরে। আবছা আঁধারে লোকগুলোকে ঠিক মতো ঠাহর করা যাচ্ছে না। যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে প্রত্যেকটা লোককেই একরকম দেখা যায়।
লোকগুলোও এক নজর তাকাচ্ছে আমার দিকে। পরক্ষণেই আগ্রহ হারিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কেউই একবার কাছে এসে জানতে চাইছে না, আমি কে, এখানে কী চাইছি।
হতাশ হচ্ছি না। জানি, গোলাম মাওলা মসজিদের ইমাম, একেবারে সবার শেষেই বেরোবেন। ইমাম যখন, পরহেজগার মানুষ। দু’রাকাত নামাজ তো বেশিই পড়বেন।
বেরোতে থাকা মুসল্লির সংখ্যা কমে এসেছে। এখন কিছুক্ষণ পরপর একজন দু’জন করে বেরোচ্ছে। গোলাম মাওলা এখনো বেরোচ্ছেন না। একটু একটু উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে শুরু করেছি। শীতের সন্ধে। ভেতরে একটা মোটামুটি গরম গেঞ্জি আর তার ওপরে শার্ট। উত্তুরে বাতাস বইছে। জেঁকে বসতে শুরু করেছে পাহাড়ী শীত। চোখের সামনে ভেসে উঠছে একটা ঘর, খাট আর গরম লেপ বা কম্বল। সেটা জানি পাওয়া যাবে। তবে তার আগে পেতে হবে গোলাম মাওলাকে। কিন্তু তাঁকে যদি না পাই, তাহলে…ভাবতেই পারছি না।
উদ্বেগটা আস্তে আস্তে ভয়ের দিকে মোড় নিচ্ছে। গোলাম মাওলার সাথে দেখা হয়েছিল বছর তিনেক আগে। তখন শুনেছিলাম, উনি বড় মসজিদের ইমাম। এর মধ্যে আর দেখা সাক্ষাৎ হয়নি, কোনো খোঁজখবরও নেইনি। আচ্ছা, এমন যদি হয়, উনি আর বড় মসজিদের ইমাম নন, অন্য কোনো মসজিদে চলে গেছেন, তাহলে কী হবে?
ভাবতেই পারছি না।
চারদিকে তাকালাম ভীত চোখে। রাস্তায় লাইটপোস্টের ঘোলাটে আলো। সে আলোতে মনে হচ্ছে, এই সন্ধ্যারাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে এলাকাটা। ছোট ছোট বাড়ি-ঘরের মতো, বুঝতে পারছি না এসব আসলে কী? নিশ্চয় মানুষের ঘর-বাড়ি। কারা থাকে এখানে? টিম টিম করে জ্বলছে বিজলী বাতি। ভয় পাচ্ছি, তবে ভালোও লাগছে। জীবনে এই দ্বিতীয়বারের মতো বৈদ্যুতিক বাতি দেখা।
মসজিদ থেকে এখন মুসল্লি বেরোচ্ছে না আর। সম্ভবত আর কেউ নেই। হতাশা আর দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়তে যাচ্ছি, ঠিক এসময় আরেকজন বেরোল। বিড় বিড় করে সুরেলা গলায় কিছু বলছে। দোয়া-দরুদ পড়ছে মনে হয়। লোকটা কাছে এলে ইমাম সাহেবের কথা জিজ্ঞেস করব ভাবছি। কিন্তু গলা শুকিয়ে আসছে। মুখ দিয়ে কথা বেরোবে কিনা কে জানে? তোতলা তো। দুশ্চিন্তা, ক্রোধ, নার্ভাসনেস—এসব ক্ষেত্রে মুখ দিয়ে কথা বেরোতে চায় না। এই মুহূর্তে আমি নার্ভাসনেসে ভুগছি।
মনে মনে ‘ভ্-ভ্-ভ্’ মানে ভাইয়া বলার চেষ্টা করছি, এসময় লোকটা সামনে এসে দাঁড়াল। একনজর তাকিয়ে আমার মুখটা দেখে নিয়ে বলল, ‘ছোটভাই, আপনি কাকে চান?’
আচমকা সব সঙ্কোচ কেটে গেল। মুখ খুলে গেল অনায়াসে। সালাম দিয়ে বললাম, ‘ভাই, আমি ইমাম সাহেবের কাছে এসেছি। উনি আমার আত্মীয়, মামাতো বোনের জামাই।’
হাসি অনেক দেখেছি, কিন্তু কাপ্তাইয়ের ভেতর বাজারে মসজিদের সামনে রাস্তার ঘোলাটে আলোর মধ্যে দাঁড়ানো লোকটার ওই হাসির মতো অমন আন্তরিক ও উৎফুল্ল হাসি খুব বেশি দেখেছি বলে মনে করতে পারি না। বিজলী বাতির মতো উজ্জ্বল হাসির ছটা ছড়িয়ে লোকটা যে দিক থেকে এসেছে, সেদিকে রওনা হলো। আমি বুকের ভেতর পাখির পালকের মতো হালকা বোধ করতে শুরু করলাম। দুশ্চিন্তা কেটে গিয়ে…..হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তেই ডাকলাম, ‘ভাইয়া…’
লোকটা জায়গায় দাঁড়িয়ে গিয়ে আমার দিকে ফিরল। তখনো মুখে সে হাসিটা লেগে আছে। ‘বলেন, ছোটভাই।’
‘আচ্ছা, ইমাম সাহেবের বাড়ি কি সন্দ্বীপ?’ আমি একটু নিশ্চিত হতে চাইলাম।
‘না তো!’ হাসি ম্লান হয়ে গেল লোকটার। ধীরে ধীরে হেঁটে এল আমার কাছে। ‘ওনার বাড়ি তো মরিয়ম নগর। আপনি কোন মসজিদের ইমাম সাহেবের কথা বলছেন?’
‘জী, কাপ্তাই বড় মসজিদের ইমাম।’
‘কাপ্তাই বড় মসজিদের ইমাম! আচ্ছা, ওনার নাম বলেন তো?’
‘গোলাম মাওলা। বাড়ি সন্দ্বীপ…’ আবার হতাশায় মিইয়ে এল গলা। ‘আমি শুনেছি, উনি কাপ্তাই বড় মসজিদে…’
‘দাঁড়ান দাঁড়ান। কী নাম বললেন? গোলাম মাওলা? কালো করে লোকটা? বেশি কালো?’
মিলে যাচ্ছে! আবার পরাণে পানি আসতে শুরু করল আমার। ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বেশি কালো….উনি আমার…..’
আবার সে আগের অনাবিল হাসির আভাস দেখা গেল লোকটার মুখে। ‘আরে ওটা বলবেন না? চিনি ওনাকে। উনি আমার সাথীভাই। আমরা এক পীরসাহেব হুজুরের মুরিদ। কিন্তু উনি তো বড় মসজিদের না, সুইডিস্ট মসজিদের ইমাম।’
‘সুইডিস্ট মসজিদ! ওটা কোথায়?’
‘বাইরে। মানে রিসিপশন গেটের বাইরে।’
‘আমি চিনি না।’
আতঙ্কে হাত-পা কুঁকড়ে আসতে চাইছে। এই প্রবল শীতের রাতে এই বিশাল কাপ্তাই শহরে আমি কোথায় খুঁজে পাব সুইডিস্ট মসজিদ!
‘এখান থেকে টেক্সিতে যাওয়া যাবে।’ লোকটা যেন বুঝতে পারল আমার মনের ভাব। ‘দুই টাকা নেবে।’
‘দুই টাকা! আমার কাছে আছে মাত্র এক টাকা। তাইলে বাকি এক টাকা কোথায় পাই?’ আমি বলতে চাইনি। কিন্তু কথাগুলো যেন নিজের উদ্যোগে বেরিয়ে গেল মুখ থেকে।
লোকটা এক মুহূর্ত তাকাল। তারপর ফের হাসল তার সে অনাবিল হাসিটা।
ওর গায়ে একটা গরম কোট। মাথা ঢাকা সাদা পাগড়িতে। গলায় মাফলার। কাপ্তাইয়ের পাহাড়ী শীতের মোকাবিলা করার যথাসম্ভব আয়োজন। কোটের ভেতরে একটা হাত ঢোকাল। খানিকক্ষণ হাতড়ে বের করে আনল একটা টাকা। হাসিমুখেই বলল, ‘ছোটভাই, আপনি আমার পীরভাইয়ের বড়কুটুম। আপনাকে তো আর পানিতে পড়তে দিতে পারি না। নিন, আরেক টাকা আমি দিচ্ছি। টেক্সিঅলাকে বলবেন, সুইডিস্ট মসজিদের ইমাম সাহেবের বাসার সামনে নামিয়ে দেয়ার জন্যে। নিন…’
হতাশা ও অনিশ্চয়তাবোধ এতটা চরমে পৌঁছেছিল যে, ভদ্রতা করে হলেও ‘না’ বলার অবস্থা ছিল না। টাকাটা নিলাম। একবার ভাবলাম, ধন্যবাদ দিই। তাও মুখ দিয়ে বেরোল না।
একটা টেক্সি যাচ্ছিল পাশ দিয়ে। হাত উঁচিয়ে থামাল ওটাকে লোকটা। তারপর বলে দিল আমাকে নিয়ে সুইডিস্ট মসজিদের সামনে নামিয়ে দিতে। বলল, ‘টেক্সি থেকে নেমে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে ইমাম সাহেবের বাসা। যান ছোটভাই, আল্লাহ হাফেজ। গোলাম মাওলা সাহেবকে আমার সালাম দেবেন। আমার নাম ছিদ্দিক, মোহাম্মদ ছিদ্দিক উল্লাহ। নাম বললেই উনি চিনবেন।’
সুইডিস্ট মসজিদের সামনে নেমে একজনকে জিজ্ঞেস করতে গোলাম মাওলার বাসা দেখিয়ে দিল। নক করলাম, সাথে সাথে খুলে গেল দরজা, যেন কেউ একজন দাঁড়িয়েছিল দরজার ঠিক সামনেই। আমার মামাতো বোন, শাজু বু’। আমাকে দেখেই দু’চোখ কপালে উঠে গেল। ‘কীরে দুলু? তুই? তুই কোত্থেকে এলি রে? বাসা চিনলি কেমনে? আয় আয়, ভেতরে আয়।’
এই হলো শাজু বু’। ছোটবেলা থেকেই এই মহিলাকে দেখে আসছি এমনি আন্তরিক। আমার নানাবাড়িতে মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে শান্তশিষ্ট আর ভদ্র। আগে একবার বিয়ে হয়েছিল বাড়ির কাছের এক ছেলের সাথে। কিন্তু শয়তান লোকটা এমন ভালো মেয়েটাকে চিনতে পারেনি। অনেক কষ্ট দিত শুনেছি। আমরা তখন ছোট। বড় হয়ে জেনেছি এসব কথা। গোলাম মাওলার সাথে বিয়ে হওয়ার কথাও আমার মনে নেই। শাজু বু’র চেয়ে বয়সে অনেক বড় লোকটা। তারও দ্বিতীয় বিয়ে। দুই ছেলে রেখে মারা গিয়েছিল তার বউ।
শাজু বু’র উষ্ণ অভ্যর্থনার জবাব দিলাম হাসিমুখে। পায়ে হাত দিয়ে একটা সালামও করে ফেললাম। বললাম, ‘দুলাভাই কোথায়?’
শাজু বু’ বলল, ‘তোর দুলাভাই মসজিদে। নামাজ পড়াতে গেছে। তুই হাত-মুখ ধোও। ভাত খাবি। ক্ষিধে পেয়েছে তো?’
ক্ষিধে অবশ্য পেয়েছে বটে। তবে সেটা নিয়ে এখন আর মাথা ঘামাচ্ছি না। সন্ধে থেকে যে চরম অনিশ্চয়তায় সময় কাটছিল, এখন তা কেটে যেতেই ভীষণ ফুরফুরে লাগছে। শাজু বু’র সব চেয়ে ছোটটাকে গাল টিপে দিয়ে বললাম, ‘কেমন আছিস রে ব্যাটা?’
ব্যাটার বয়স মাত্র বছর দেড়েক। উপভোগ করতে পারল না আদরটা। ভ্যাঁ করে গাল ছেড়ে দিয়ে প্রবল প্রতিবাদ জানাল।
শাজু বু’ মেয়েলী আলাপ জুড়ে দিল। কে কেমন আছে না আছে, এসব জবাব দিতে হলো বিশদ ভাবে।
শাজু বু’কে নিয়ে আমার এক গভীর স্মৃতি আছে। আমার শৈশবের অনেক কষ্টের সে স্মৃতি। সে স্মৃতি শাজু বু’র আছে কি না জানি না। তবে যদি কখনো শৈশবের ফেলে আসা সে বাগানটায় বেড়াতে যাই, কষ্টের সে স্মৃতিটাও এসে ছুঁয়ে দেয় আমাকে।
স্মৃতির আয়নায় অনেক ধুলো জমে গেছে। ফুঁ দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হয় মাঝে মধ্যে। তবুও অনেক কিছু অস্পষ্ট, অপ্রতিভাত। কিন্তু একটা কিশোরী মেয়ের কোলে একটা কান্নারত শিশুকে আমি কিছুতেই ভুলতে পারি না। মেয়েটা বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিলের দিকে চলে যাচ্ছে। বুকের সাথে জড়িয়ে ধরা বাচ্চাটার পিঠের ওপর একহাতে চাপড় দিতে দিতে বলছে, ‘কাঁদে না দুলু, কাঁদে না ভাই…কাঁদে না…. কাঁদে না….’
বাচ্চাটা কিছুতেই থামছে না। এক নাগাড়ে কাঁদছে গলা ছেড়ে। ও ওর মায়ের কাছে যেতে চায়। মায়ের কোলে বসতে চায়। কিন্তু তাকে জোর করে মায়ের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ওর মাও কিছু বলছে না। একটা লালশাড়ি পরে মাথায় বিরাট ঘোমটা টেনে বসে আছে। তার হাতে মেহেদী, পায়ে আলতা। চার পাশে অনেক মহিলা।
কিন্তু এই স্মৃতিটাকে আমি ভুলে থাকতে চাই। আমার সতেরো বছরের জীবনে সবচেয়ে নির্মম স্মৃতি এটা। পাঁচ বছরের ওই শিশুকে আমি মাঝে মাঝে বুঝতে চাই। জানতে চাই, ওর পৃথিবীটা কতোটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল তখন। কিন্তু মানুষের অনেক অপারগতার মধ্যে সম্ভবত এটাও একটি যে, ও যেমন সাত বছরে দাঁড়িয়ে সত্তুরের প্রজ্ঞাকে ছুঁতে পারে না, তেমনি সত্তুর বছর বয়সে গিয়ে সাত বছরের আবেগকেও অনুভব করতে পারে না।
ঘন্টা খানেক পরে গোলাম মাওলা এলেন। খুব লম্বা করে একটা সালাম দিলাম দুলাভাইকে, ‘আসসালামু আলাইকুম………….’
তার চেয়ে লম্বা করে সালামের জবাব দিলেন তিনি, ‘ওয়ালাইকুমুসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহে ওয়া বারাকাতুহু…..’ অভ্যর্থনা জানালেন, ‘আরে দুলাল মিয়া যে! তুমি কই থিকা? কখন আইলা?’
দুলাভাইয়ের সাথে একত্রে বসে ভাত খেলাম। শালা-দুলাভাই হালকা পাতলা ঠাট্টা-মশকরাও হলো। তার অনুরোধে ফুলকপি দিয়ে রাঁধা মাছের তরকারি দিয়ে দু’মুঠো ভাত বেশিও খেতে হলো।
মাসুদ আনোয়ার, গল্পকার




