রোখসানা ইয়াসমিন মণি
ডা. অভ্র সেনগুপ্ত, একজন প্রথিতযশা জ্যোতির্বিজ্ঞানী। ল্যাবের কাঁচের দেওয়ালের ওপারে ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। আজ সকালটা মেঘাচ্ছন্ন, ঠিক তার মনের মতো। গত দশ বছর ধরে এই ল্যাবই তার মন্দির, ধ্যান কেন্দ্র। এখানে কাচের দেয়াল ভেদ করে আসা নরম আলোয় গবেষণা সরঞ্জামগুলো যেন এক রহস্যময় দ্যুতি ছড়ায়। কিন্তু ইদানীং সেই শান্তিটুকুও কেড়ে নিয়েছে তার স্ত্রীর তীক্ষ্ম বাক্যবাণ। অনিতা, সুন্দরী ও সুগৃহিণী স্ত্রী। সে মনে করে অভ্র ল্যাবকেই বিয়ে করেছে,তাকে নয়। অনিতার চোখে টেলিস্কোপ আর কম্পিউটার স্ক্রিনই এখন অভ্রর সহধর্মিণী,সে নয়।আজ সকালেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।
“অভ্র! আর কতক্ষণ লাগবে তোমার? ব্রেকফাস্ট ঠান্ডা হয়ে গেল যে!” অনিতার কণ্ঠস্বর কিঞ্চিৎ উচ্চ, যা অভ্রর মস্তিষ্কের নিউরনগুলোকে একযোগে উত্তেজিত করে তোলে। ল্যাবের নীরবতা ভেঙে অনিতার এই ডাক অভ্রর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত করে।
অভ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে। হাতে একটি গাণিতিক সমীকরণ, যা মহাবিশ্বের এক নতুন রহস্য উন্মোচনের দ্বারপ্রান্তে। সে নিউটনের সূত্রকে কাজে লাগিয়ে একটি নতুন মহাকর্ষীয় মডেল তৈরির চেষ্টা করছে, যা ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির ধাঁধা মেটাতে সক্ষম। কিন্তু অনিতার ডাক তাকে বাস্তবের রূঢ় পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনে। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি যেন এক লহমায় তুচ্ছ হয়ে যায়।
“আসছি, অনিতা। আর একটু…””আর একটু মানে কী? তোমার ওই ‘আর একটু’ করতে করতে আমার জীবনটাই শেষ হয়ে গেল! সারাদিন ল্যাবে বসে থাকো, আমি যে তোমার পাশে আছি, সেটা মনে থাকে
না?” অনিতার কণ্ঠস্বরে ক্ষোভ স্পষ্ট। সে ল্যাবের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। চোখে হতাশার গভীর ছায়া। “কালও তোমার জন্মদিনটা আমরা একসাথে কাটাতে পারলাম না, কারণ তোমার প্রজেক্টের ‘ডেডলাইন’ ছিল। প্রতি বছর একই নাটক! তুমি কি জানো, আমাদের শেষ কবে একসাথে রাতের খাবার খাওয়া হয়েছে?”
অভ্র জানে। অনিতা ভুল কিছু বলছে না। ওরা দুজনেই একসময় একে অপরের পরিপূরক ছিলো। ওদের প্রথম দেখা হয় একটি বিজ্ঞান সেমিনারে। অনিতা ছিলো আর্কিটেকচার নিয়ে গবেষণারত। দুজনের স্বপ্ন ছিলো এক। দুজনেই চাইতো নিজেদের কাজে একে অপরের পাশে থাকতে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ওদের সম্পর্কের সমীকরণ বদলে গেছে। অভ্রর কাছে ওর গবেষণা প্রথম, অনিতার কাছে সংসার। অনিতা প্রেগন্যান্ট হয়ে যাবার পর সংসারী হয়ে ওঠে। কত ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট থাকার পরও কোথাও চাকরি করেনি।অভ্র প্রায় বলতো, অনিতা, তুমি এভাবে বসে থেকো না।কিছু একটা করো। সংসার থেকে একসময় মন উঠে যাবে।আমি সারাদিন ল্যাবে থাকি।তোমাকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারি না।চাকরি করলে সময় কেটে যাবে। কিন্তু অনিতা শোনেনি।ছোট দানিয়ূবের মুখের দিকে চেয়ে মুচকি হেসে বলেছিল,সে দেখা যাবে ।এখন আমার ছোট্ট সোনামণিকে আদর করতে দাও। এভাবে সময় কেটে যায়। দানিয়ূবও বড় হয় একটু একটু করে। আর অনিতারও বয়স বেড়ে চলে। চাকরি করা হয়ে ওঠেনি।
অভ্র টেবিলে এলো। ব্রেকফাস্টে শুরু হলো নিত্যদিনের কথোপকথন। অভ্রর প্লেটে গরম পরোটা আর অমলেট। মুখে রুচি নেই। মন বিগড়ে আছে অনিতার জ্বালাতনে।
“অফিসে ছুটি নেবে না? কতদিন হয়ে গেল আমরা কোথাও যাইনি। গত গ্রীষ্মে প্ল্যান করেছিলাম সুইজারল্যান্ড যাব,” অনিতা চামচে মাখন ঘোরাতে ঘোরাতে বলে। কণ্ঠে অনুরোধের চেয়ে অভিযোগ বেশি।
“এই মুহূর্তে আমার ছুটি নেওয়ার মতো অবস্থা নেই। একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের মাঝখানে আছি। তুমি তো জানো, এই প্রজেক্টের ওপর আমার কেরিয়ার নির্ভর করছে,” অভ্র প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলে। সে এবং তার গবেষণা জীবনের চরমতম সময়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“প্রজেক্ট! প্রজেক্ট! তোমার জীবনটাই একটা প্রজেক্ট হয়ে গেছে। আমার কথা কি একবারও মনে পড়ে না? তোমার ল্যাবই এখন সব। আমাদের বিয়ে, ভবিষ্যৎ, সন্তান সবকিছু তোমার কাছে ওই আকাশের তারার মতোই দূরবর্তী আর অধরা হয়ে গেছে। অনিতা টেবিলের ওপর চামচটা রেখে উঠে দাঁড়ায়।চোখ অশ্রুসজল।
অভ্র কিছু বলল না। সে জানে, কোনো যুক্তিই এখন অনিতাকে বোঝাতে পারবে না। ওদের সম্পর্কের এই টানাপোড়েন তাকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। উদ্ভাবনী মন যেন এক অদৃশ্য শেকলে বাঁধা পড়ে গেছে। প্রতি মুহূর্তে দড়ি টানাটানির খেলায় অংশ নিচ্ছে। একদিকে বিজ্ঞান, অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবন। অনুভব করে,মন ও মস্তিষ্ক দুই দিকে সমানভাবে টান খেতে খেতে ভেঙে পড়ছে।
দিনের পর দিন এই গঞ্জনা শুনতে শুনতে অভ্রর মনে হতে থাকে, এই শহর, এই বাড়ি, এই ল্যাব ু সবকিছু যেন তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। মন এক নির্জন আশ্রয় খোঁজে। যেখানে কোনো কোলাহল থাকবে না, কোনো অভিযোগ থাকবে না, থাকবে শুধু গবেষণা আর সীমাহীন আকাশ। এই গঞ্জনার বৃষ্টি থেকে সে মুক্তি চায়।
“বনবাসে যাবো,” হঠাৎই তার মনে হলো। “কিন্তু সেখানেও কি শান্তি পাবো? অনিতা তো আমাকে ঠিকই খুঁজে বের করে ফেলবে। সে প্রতিটা পদক্ষেপ অনুসরণ করবে।” তার মন কল্পনার জগতে বিচরণ করতে থাকো। যদি এমন কোনো জায়গা থাকতো, যেখানে কেউ তাকে খুঁজে পাবে না। যেখানে শুধু সে আর তার স্বপ্নগুলো থাকবে। মেঘের দেশে? বরফের স্তরে? একটা ঘর? একটা ভাসমান গবেষণাগার, যা পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেকে দূরে? সে ভাবে এটাই উত্তম জায়গা।পৃথিবীর সব জায়গা ওর জন্য অনিরাপদ।
এই চিন্তা তাকে এক নতুন পথের দিশা দেখায়। পাগলের মতো হলেও, অভ্রর কাছে এটাই ছিল একমাত্র মুক্তির পথ। সে কফি কাপটা একপাশে ঠেলে ল্যাবের দিকে দৌড়ায়। মস্তিষ্কে তখন নতুন সমীকরণ। নতুন প্রজেক্টের জন্ম হয়েছে। এবার আর মহাবিশ্বের রহস্য নয়, নিজের রহস্যের সমাধান। ল্যাবে ঢুকে হাসি মুখে দরজা বন্ধ করে দেয়। মুখে এক ধরনের উন্মাদনা। সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে,এই নতুন অ্যাডভেঞ্চার তাকে সমস্ত মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেবে।
অভ্র ডায়েরিতে টুকে রাখে নতুন প্রজেক্টের নাম, “প্রজেক্ট ক্লাউড হাউজ”। মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরন এখন এই একটি লক্ষ্যের দিকে ধাবিত। প্রথম ধাপ ছিল এমন একটি নির্জন বনের সন্ধান, যা পৃথিবীর মানচিত্রে রহস্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। যেখানে সাধারণ মানুষের আনাগোনা কম। মস্তিষ্কে তখনই ভেসে উঠে রোমানিয়ার ট্রান্সসিলভানিয়ার সেই কুখ্যাত বনের নাম, যার কথা সে একসময় মহাকাশ গবেষণার ওপর লেখা একটি বিরল জার্নালে পড়েছিল ু ‘হুইয়া বাছিউ।’ সেই বন, যেখানে সময় থমকে যায়। মানুষ গেলে আর ফেরে না। এটি কেবল একটি বন নয়, যেন প্রকৃতির এক রহস্যময় ল্যাবরেটরি।
ওর মনে হলো, এর থেকে ভালো জায়গা আর হতে পারে না। যদি সত্যিই সেই বনের এমন অদ্ভুত ক্ষমতা থাকে, তাহলে অনিতাও তাকে খুঁজে পাবে না। দ্রুত ল্যাবের অ্যাডভান্সড কম্পিউটার টার্মিনালে বসে ইন্টারনেট ঘাটতে শুরু করে। ‘হুইয়া বাছিউ’ বনের ছবিগুলো সামনে ভেসে উঠে। গাছের অদ্ভুত আকৃতি, যেন শতবর্ষী কোনো জাদুকরের হাতের বাঁকানো আঙুল। ডালপালাগুলো অস্বাভাবিকভাবে প্যাঁচানো, আর চারপাশের এক ভুতুড়ে পরিবেশ। এই বন যেন নিজেই তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ভেতরে লুকিয়ে থাকা রহস্য উন্মোচনের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে।
সে বনের ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু, এবং স্থানীয় লোকগাথা সম্পর্কে বিশদ তথ্য সংগ্রহ করতে থাকে। জানা গেল, এই বন ট্রান্সসিলভানিয়ার বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল নামে পরিচিত। স্থানীয় মানুষেরা বিশ্বাস করে, এখানে প্রবেশ করলে সময়ের ধারণাই বদলে যায়। মানুষ এখানে এসে অদ্ভুত মানসিক উদ্বেগে ভোগে, নিজেদের অদৃশ্য চোখে দেখা হচ্ছে বলে মনে করে, যা এক ধরনের মানসিক প্যারানয়া সৃষ্টি করে। ১৯৬৮ সালে এমিল বার্নিয়া নামক একজন ব্যক্তি এখানে ইউএফও দেখার দাবি করেছিলেন, যা তার ফটোগ্রাফির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।ইউএফও হলো এমন একটি বস্তু যা আকাশে দেখা যায়, কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী বা তদন্তকারীরা এটি কী তা সনাক্ত করতে পারে না। এটি অনেকটা উড়ন্ত সসারের মতো যা ভিনগ্রহ থেকে পৃথিবীর স্যাটেলাইটে ঢুকে পড়ে।
অভ্র খুঁটিয়ে দেখল, সেই ছবিতে ইউএফও’র উপস্থিতি কতটা বাস্তবসম্মত। এমনকি এই বনে মেষপালকদের মেষশাবকসহ উধাও হয়ে যাওয়ার গল্পও প্রচলিত আছে। যা অভ্রর কাছে নিছক লোকগাথা না হয়ে কোনো প্রাকৃতিক বা বৈজ্ঞানিক বিচ্যুতির ইঙ্গিত মনে হলো।
এই সমস্ত তথ্য অভ্রকে আরও বেশি উৎসাহিত করে তোলে। সে একজন বিজ্ঞানী। রহস্য ওর রক্তে মিশে আছে। এই বন শুধু তাকে একাকীত্বের আশ্রয় দেবে না, গবেষণার জন্যও নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। সে দেখলো, এই বনে অস্বাভাবিক তেজস্ক্রিয় বিকিরণ, মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ, ইনফ্রারেড বিকিরণ, চুম্বকীয় ও তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের বিচ্যুতি লক্ষ্য করা যায়। এই সমস্ত কিছুই তার বৈজ্ঞানিক কৌতূহলকে আরও বাড়িয়ে তোলে। মনে মনে হিসেব কষে, এই অস্বাভাবিক ক্ষেত্রগুলো ব্যবহার করে ক্লাউড হাউজ প্রজেক্ট থেকে কীভাবে সুবিধা নেওয়া যায়। বিশেষ করে বনের মাঝখানে সেই জায়গাটি, যেখানে কখনো কোনো ঘাস বা উদ্ভিদ জন্মায় না, যা তাকে ভাবিয়ে তোলে। বিজ্ঞানীরা সেখানকার মাটি পরীক্ষা করেও কোনো ক্ষতিকর পদার্থের উপস্থিতি খুঁজে পায়নি। অভ্র ভাবলো, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো অজানা প্রাকৃতিক বা ভিনগ্রহী শক্তি কাজ করছে, যা আবিষ্কার করা কর্তব্য। এই বন এখন তার কাছে নতুন ইউনিভার্স, যার কেন্দ্রে সে গবেষণা শুরু করতে চলেছে।
সন্ধ্যা নামছিল। অভ্র ল্যাব থেকে বেরিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিলো। ওর মনে তখন নতুন আশা, নতুন উদ্দীপনা। অনিতার নিত্যদিনের গঞ্জনা আজ যেন কানে লাগছে না। মস্তিষ্কে এখন শুধু ‘হুইয়া বাছিউ’ আর মেঘের দেশের বরফ ঘর। মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছে এই মহাযাত্রার জন্য, যা তার জীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। বাড়িতে ফিরে দেখে অনিতা যথারীতি তার জন্য অপেক্ষা করছে। মুখে ক্লান্তি এবং চাপা ক্ষোভের ছাপ।
“কোথায় ছিলে এতক্ষণ? ফোন ধরো না কেন? আমি তোমাকে দশবার ফোন করেছি। তুমি কি জানো, আমার কত চিন্তা হয়?” অনিতার কণ্ঠে আজও অভিযোগ, তবে এবার উদ্বেগের মোড়কে।
“একটু কাজ করছিলাম, অনিতা। খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পেলাম। কিছু বিরল ডেটা নিয়ে বিশ্লেষণ করছিলাম,” অভ্র শান্তভাবে বললো। চোখে এক ধরনের গোপন উত্তেজনা। অনিতার দিকে হাসিমুখে তাকালো, যা অনিতার কাছে বেশ অস্বাভাবিক ঠেকলো।
“হ্যাঁ, তোমার কাজই তো সব। আমার কথা তো মনে থাকে না। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি বোধহয় তোমার জীবনে একটা অপ্রয়োজনীয় বস্তু,” অনিতা মুখ ফিরিয়ে নিলো। চোখে জল চিকচিক করে উঠলো।
অভ্র হাসলো। এই হাসি অনিতার কাছে হয়তো এক ধরনের তাচ্ছিল্য বা উপেক্ষা মনে হলো। কিন্তু অভ্র জানে,এই হাসি মুক্তির হাসি, তার আবিষ্কারের হাসি। সে মনে মনে ঠিক করে ফেলে, আগামী সপ্তাহেই যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করবে এবং দ্রুতই এই গঞ্জনার জগৎ থেকে দূরে চলে যাবে।
পরের কয়েকটা দিন অভ্র লুকিয়ে লুকিয়ে প্রজেক্টের কাজ করতে লাগলো।ল্যাবের ভেতরের গোপন কক্ষটিতে একাকী সময় কাটায়। বিশেষ ধরনের প্যারাসুট ডিজাইন করে যা শুধু মেঘের স্তর ভেদ করে যেতে সক্ষম নয়, এটি ছোট টার্বাইন ইঞ্জিন দ্বারা চালিত হবে, যা তাকে উল্লম্বভাবে উপরে উঠতে সাহায্য করবে। খাবারের জন্য নভোচারীরা মহাকাশে যে বিশেষ উচ্চ পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ কম্প্রেসড খাবার খায় দুই বছরের জন্য সে সংগ্রহ করতে থাকে। এই খাবারগুলো ওজনে হালকা এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাকে শক্তি জোগাবে। এরপর বিশেষভাবে তৈরি করলো গরম পোশাক, যা মেঘের দেশের তীব্র ঠান্ডায় তাকে রক্ষা করবে। পোশাকটিতে থাকবে অভ্যন্তরীণ হিটিং ব্যবস্থা, যা সোলার পাওয়ারে চলবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সে একটি ছোট, ব্যাটারিচালিত ইলেকট্রিক সিঁড়ি তৈরি করেছে, যা ভাঁজ করে রাখা যায় এবং বনের সবচেয়ে উঁচু গাছে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। এই সিঁড়ির ব্যাটারিতে সোলার চার্জিংয়ের ব্যবস্থা করেছে।
অনিতা অবশ্য অভ্রর এই গোপন কার্যকলাপ সম্পর্কে কিছুই জানলো না। সে লক্ষ্য করলো, অভ্র ইদানীং একটু বেশিই হাসে, এবং ল্যাবে আগের চেয়েও বেশি সময় কাটায় এবং যতটুকু সময় পায় অনিতাকে ঘেঁষে থাকতে চেষ্টা করে। অনিতা মনে মনে ভাবে হয়তো অভ্র ভুল বুঝতে পারছে,এজন্য সে তার দিকে একটু বেশি মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করছে। অনিতা বুঝতে পারেনি, এই অভিনয়ের সুযোগ নিয়েই অভ্র তার জীবনের সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে বুঝতেই পারেনি, অভ্র ‘মেঘের দেশে বরফ ঘর’ বানানোর স্বপ্নে বিভোর, আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সংসারকে পেছনে ফেলে যেতে প্রস্তুত। অভ্র ডায়েরিতে শেষবারের মতো লিখে “মুক্তি! আমি আসছি, ‘হুইয়া বাছিউ।’
শেষ পর্যন্ত সেই দিনটি এল। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত দুটো। ডাঃ অভ্র সেনগুপ্ত সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেললো। ল্যাবে এখন নীরবতা, কিন্তু হৃদয়ে বাজছে মুক্তির গান। আজ রাতে সে ‘হুইয়া বাছিউ’ বনের উদ্দেশে রওয়ানা দেবে। ‘প্রজেক্ট ক্লাউড হাউজ’-এর প্রথম ধাপ শুরু হবে।
নিঃশব্দে শোবার ঘরে গেলো। অনিতা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। দানিয়ূব মায়ের পেছন দিক করে শুয়ে আছে। অভ্রর ইচ্ছে হলো দানিয়ূবকে বুকে টেনে নিয়ে আদর করে। কিন্তু ছেলে জেগে যাবে এজন্য দূর থেকে ফ্লায়িং কিস ছড়িয়ে দিয়ে বলল,বাবা আমি তোমাকে ভালবাসি।তোমার মা খুব ভালো। তোমাকে আগলে রেখেছে।কিন্তু আমি নিরুপায় । এই ল্যাবে গবেষণা ছাড়া আমি আর কোন কাজ ভাল পারিনি।তোমাদের সময় দিতে পারি না এর অর্থ এই নয় আমি তোমাদের ভালবাসি না। তোমার মা যদি কিছু সহনশীল হতো তাহলে আমাকে আকাশবাসে যেতে হতো না। মানুষ দুঃখে বনবাসে যায়।আমি যাচ্ছি আকাশবাসে। জানি, এই পৃথিবীর যেই প্রান্তে থাকি না কেন তোমার মা আমাকে খুঁজে নেবে।কিন্তু বাবা,আমার প্রজেক্ট শেষ করতে হবে।তোমার মা যেনো আমার অনুপস্থিতিতে আরো ধীর স্থির হতে পারে সেজন্যও এই যাত্রা আমার।তোমার মা বুঝুক একজন বিজ্ঞানীর স্ত্রী হলে তাকে কী করতে হয়।তার ও দায়িত্ব আছে স্বামীর পাশে থেকে সহযোগিতা করা। আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। তোমার মাকে সময় দিতে পারি না ঠিকই, কিন্তু এর অর্থ এই নয় আমি তাকে অবহেলা করি।আমি বিজ্ঞানী বাবা।আবিষ্কার আমার নেশা। এই জিনিস তোমার মা বুঝতে চায় না।আমি কোন সাধারণ স্বামীদের মতো নই।একদিন বড় হবে তুমি।তখন ল্যাবে বসে তোমাকে সব বুঝিয়ে বলব।আজ আমি যাচ্ছি।তোমার প্রতি কোমল ভালবাসা রেখেই বিদায় নিচ্ছি।এরপর অভ্র অনিতার দিকে তাকালো। ঘুমন্ত মুখটা শান্ত, নিষ্পাপ। এই মুখটাই দিনের বেলায় ক্ষোভে আর অভিযোগে ভরে ওঠে। অভ্রর মনে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি। একদিকে এই গঞ্জনার জীবন থেকে মুক্তি, অন্যদিকে প্রিয় মানুষটিকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য তীব্র অপরাধবোধ। সে জানে, অনিতা কতটা কষ্ট পাবে,যখন সে আবিষ্কার করবে যে অভ্র তাকে না জানিয়ে চিরতরে চলে গেছে। এই কাজ স্বার্থপরের মতো। কিন্তু এই গবেষণা, এই মুক্তি ু এই মুহূর্তে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে। “ক্ষমা কোরো, অনিতা,” সে ফিসফিস করে বলে, “আমার কাজ আমাকে ডাকছে, যা এই পৃথিবীর কোনো সম্পর্ক দিয়ে বাঁধা সম্ভব নয়।”
একটি ছোট, কিন্তু ভারী ব্যাগ কাঁধে নিয়ে অভ্র নিঃশব্দে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। গাড়িতে আগে থেকেই সমস্ত সরঞ্জাম সুকৌশলে লোড করা ছিল। গাড়ি চললো, রোমানিয়ার দিকে, ক্লাজনাপকা শহরের উদ্দেশে। দীর্ঘ যাত্রা। কিন্তু অভ্রর মনে ক্লান্তি নেই, আছে শুধু এক দুর্নিবার আকর্ষণ। গাড়ির হেডলাইটের আলো যেন ভবিষ্যতের পথ দেখাচ্ছে।
দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার পর ভোরবেলায় সে ‘ হুইয়া বাছিউ বনের কাছে পৌঁছাল’। চারপাশের পরিবেশ সত্যিই এক অদ্ভুত আবহাওয়া সৃষ্টি করেছে। সকালের আলো তখনও ফোটেনি, চারদিকে ধূসর কুয়াশা।। গা ছমছম করা অন্ধকার। গাছের প্যাঁচানো ডালপালা যেন শত শত বিকৃত হাতের মতো তাকে স্বাগত জানাচ্ছে।আবার একই সাথে সতর্কও করছে। এখানে কোনো মানুষ নেই, জনবসতি নেই। শুধু বন আর বনের রহস্য। যা বিজ্ঞান ও লোকবিশ্বাসের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। এই বনে কোথায় কী ভয়ঙ্কর প্রাণী আছে অভ্রর অজানা।
গাড়ি একটি নির্জন জায়গায় পার্ক করে দিল। যত দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে বিপদ আসার আগেই। তারপর তার সরঞ্জামপত্র ু ব্যাটারিচালিত সিঁড়ি, কম্প্রেসড ফুড, বিশেষ পোশাক এবং প্যারাসুটের যন্ত্রাংশ ু নিয়ে বনের গভীরে প্রবেশ করতে লাগল। হাতে একটি জিপিএস ডিভাইস, যা তাকে বনের সবচেয়ে উঁচু, চিহ্নিত ওক গাছটির দিকে পথ দেখাচ্ছে। যত গভীরে যাচ্ছে, ততই বনের পরিবেশ আরও রহস্যময় হয়ে উঠছে। গাছের ডালপালা আরও ঘন, আরও জট পাকানো। আব-ছায়ার এক অদ্ভুত খেলা চলছে চারদিকে, যা মনে বিভ্রম সৃষ্টি করে। অভ্র এক ধরনের অস্বস্তি অনুভব করছে।যেন তার চারপাশের চৌম্বক ক্ষেত্র স্বাভাবিক নয়। মনে হচ্ছে কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে প্রতিনিয়ত চোখে চোখে রাখছে, যেমনটা স্থানীয়রা বলে থাকে। বিশেষ সেন্সরগুলো অস্বাভাবিক ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডের উপস্থিতি দেখাচ্ছে। বনের মাঝখানে ঘাসবিহীন জায়গা দেখে থমকে দাঁড়ায়। প্রায় বৃত্তাকার সেই স্থানটি সত্যিই অদ্ভুত। এখানকার নীরবতা সাধারণ নীরবতা নয়, যেন মাটি নিজেই কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছে। এখানে এসে ওর হৃদস্পন্দন আরও দ্রুত হয়ে উঠলো। সে তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপক যন্ত্র বের করলো। যন্ত্রটি উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় বিকিরণ দেখাচ্ছে, যা তার পূর্বের ডেটা বিশ্লেষণকে সমর্থন করে। এই জায়গাটি গবেষণার জন্য এক গুপ্তধন। কারণ এখানে মহাজাগতিক সিগনাল রিসিভ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
দীর্ঘ পথ হেঁটে সে বনের সবচেয়ে উঁচু, সুবিশাল ওক গাছের কাছে পৌঁছলো। গাছটি প্রায় পঞ্চাশ মিটার উঁচু, যার চূড়া আকাশ ছুঁয়ে আছে। অভ্র ভাঁজ করা ব্যাটারিচালিত ইলেকট্রিক সিঁড়িটা বের করে। সিঁড়িটা গাছের গুঁড়ির সাথে সাবধানে স্থাপন করে দেয়। গ্লাভস পরে ধীরে ধীরে উপরে ওঠে। উঠতে উঠতে চারপাশের দৃশ্য দেখতে থাকে। বনটা পায়ের নিচে বিশাল সবুজ গালিচার মতো দেখাচ্ছে। আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে। সূর্যোদয়ের রক্তিম আভা মেঘেদের গায়ে এসে লাগছে। এই উচ্চতায় পৌঁছানো ছিল এক কঠিন কাজ, কিন্তু অভ্রর মন ছিল দৃঢ়।
যখন সে গাছের চূড়ায় পৌঁছালো, তখন সূর্য প্রায় সম্পূর্ণ উঠে গেছে। অভ্র শ্বাস নিতে লাগল। এই উচ্চতায় বাতাস অনেক শীতল, কিন্তু বিশেষ তাপ-নিরোধক গরম পোশাক তাকে উষ্ণ রাখছে। এখন মেঘের স্তরের কাছাকাছি। এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। উল্লম্ব উড্ডয়ন প্যারাসুট-এর যন্ত্রাংশগুলো সাবধানে একত্রিত করলো। এটি একটি ছোট টার্বো-প্রপেলার চালিত ডিভাইস, যা প্যারাসুটের ক্যানোপিকে উপরের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। সে তার কাঁধে থাকা ছোট ব্যাগ থেকে একটি ছোট স্প্রে বোতল বের করল। এটি ছিল একটি বিশেষ ধরনের রাসায়নিক স্প্রে, যার নাম দিয়েছে “আইস-ক্রিস্টাল কনভার্টার”। এর কাজ হলো মেঘের সূক্ষ্ম জলীয় বাষ্প কণাকে দ্রুত বরফ ক্রিস্টালে পরিণত করা এবং মেঘের স্তরকে একটি শক্ত, স্থায়ী বরফের মালভূমিতে রূপান্তরিত করা এবং সেখান থেকে অক্সিজেন সংগ্রহ করে বিশেষ টিউব রিসেপ্টরে জমা রাখা।।অক্সিজেনের অভাব হলে যেন মুখে মাস্ক লাগিয়ে টিউবের সাথে নল লাগিয়ে শ্বাস নিতে পারে।
সে বনের দিকে শেষবারের মতো তাকালো। এই বন তার অতীতকে পেছনে ফেলে যাওয়ার প্রতীক। তারপর এক লম্বা শ্বাস নিয়ে গাছের ডাল থেকে ঝাঁপ দিলো।
অভ্র নিচে নয়, উপরের দিকে ঝাঁপ দিল। টার্বো-প্রপেলারের তীব্র শব্দে বনের নীরবতা ভেঙে গেল।সে প্যারাসুটের ইঞ্জিন চালু করে। যন্ত্রটি গর্জন করে উঠলে প্যারাসুটটি ধীরে ধীরে মেঘের স্তরের দিকে উড়তে শুরু করে।
চারপাশে শুধু মেঘ আর মেঘ। নরম, সাদা তুলোর মতো মেঘের ভেলায় সে ভেসে চলেছে। মনে এক অদ্ভুত শান্তি। এতদিনের সমস্ত গঞ্জনা, সমস্ত চাপ যেন এক মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল। সে এখন মুক্ত, স্বাধীন, পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেকে বহুদূরে।
নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছে হাতের স্প্রে বোতল বের করে। “মেঘ, তোমরা আর বৃষ্টি হয়ে ঝরবে না,” সে মনে মনে বললো আর স্প্রে করতে শুরু করলো। আইস-ক্রিস্টাল কনভার্টার স্প্রে মেঘের কণাদের জমিয়ে বরফে পরিণত করতে লাগলো। ধীরে ধীরে মেঘের মধ্যে শক্ত বরফের স্তর তৈরি হতে থাকে যা সহজে গলবে না। এই স্তরটি হবে তার ‘প্রজেক্ট ক্লাউড হাউস’ এর ভিত্তি।এখান থেকেই অক্সিজেন তৈরির বিশেষ রিসেপ্টর টিউব সংযোগ করে শ্বাস নেয়ার জন্য।
অভ্র হাসি মুখে মেঘের দেশে বরফ ঘর তৈরির কাজ শুরু করে দেয়। সে জানে, এই ঘরটি গবেষণার এক নতুন অধ্যায় শুরু করবে।
মেঘের স্তর এখন অভ্রর পায়ের নিচে এক বিশাল, সাদা বরফের মালভূমির মতো। আইস-ক্রিস্টাল কনভার্টার এর প্রভাবে সৃষ্ট কৃত্রিম মালভূমি এতটাই বিশাল যে এর উপর সহজেই একটি ঘর তৈরি করা সম্ভব। স্থানটি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন, শান্ত এবং গবেষণার জন্য আদর্শ। অভ্র ব্যাগ থেকে আরও কিছু সরঞ্জাম বের করে। ছোট আকারের সোলার প্যানেল, যা বরফের উপর স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। হালকা ওজনের কিন্তু মজবুত টাইটানিয়াম অ্যালুমিনিয়াম সংকর ধাতুর কাঠামো তৈরির সরঞ্জাম, এবং বরফ কাটার বিশেষ যন্ত্র, যা উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে বরফ কাটতে পারে।
প্রথমেই সে বরফ কাটার যন্ত্র দিয়ে বরফের মধ্যে প্রায় ২৫০ বর্গফুট জায়গা জুড়ে একটি বর্গাকার ভিত্তি তৈরি করে নেয়। এই ভিত্তি কাঠামোটি বরফের ওপর থাকা নিশ্চিত করবে এবং স্থিতিশীল থাকবে। তারপর সেই ভিত্তির উপর দ্রুত হালকা অ্যালুমিনিয়ামের ফ্রেম দিয়ে সে বাড়ির কাঠামো তৈরি করতে থাকে। বজ্রপাত বা মেঘের ঝড় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কাঠামোটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যা মেঘের উচ্চ গতি এবং তীব্র বাতাস সহ্য করতে পারে। বাড়ির দেওয়াল বিশেষ ধরনের স্বচ্ছ পলিকার্বনেট প্লাস্টিকের, যা অত্যন্ত তাপ-নিরোধক। এতে বাইরের দিগন্ত বিস্তৃত মেঘের দৃশ্য দেখা যাবে, কিন্তু ভেতরের উষ্ণতা বজায় থাকবে। সে একটি বিশেষ ‘এয়ার-লক’ পদ্ধতি তৈরি করে প্রবেশদ্বারে, যাতে ঘরের ভেতরের চাপ ও উষ্ণতা বাইরে বেরিয়ে না যায়।
কাজটি ছিল সময়সাপেক্ষ, কিন্তু অভ্র সমস্ত মনোযোগ ও দক্ষতা দিয়ে করে যাচ্ছিলো। এখন সে সম্পূর্ণরূপে নিজের জগতে মগ্ন। সূর্য থেকে প্রাপ্ত সৌরশক্তি ব্যবহার করে যন্ত্রগুলো চালাচ্ছে।দিন-রাতের কোনো হিসেব নেই, শুধু কাজ আর কাজ। প্রায় চার দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে বরফ ঘরের বাইরের কাঠামোটা তৈরি হয়ে গেল। এটি দেখতে অনেকটা কাচের গোলকের মতো, যা মেঘের ওপর ভাসছে।
এরপর সে ঘরের ভেতরে মনোযোগ দিলো। বরফের ঘরের কেন্দ্রে একটি ছোট গবেষণাগার তৈরি করলো। হাতে থাকা সর্বশেষ প্রযুক্তির টেলিস্কোপটি ঘরের শীর্ষে স্থাপন করে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। কম্পিউটার, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ডেটা স্টোরেজ ডিভাইস, এবং পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের জন্য বিশেষ স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার দিয়ে ল্যাব সুসজ্জিত হলো। এখানে বসেই মহাবিশ্বের রহস্য আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে, কোনো প্রকার বায়ুমণ্ডলীয় বা আলোক দূষণ ছাড়াই। সে গবেষণাগারের নাম দিলো, ‘দ্য আইস অর্বিটাল ল্যাব।’
রান্নাঘরও তৈরি হলো। নভোচারীরা যেসব খাবার খায়ু কম্প্রেসড প্রোটিন বার, পানিশূন্য সবজি ও ফলের কিট গুছিয়ে রাখলো। একটি ছোট স্লিপিং ব্যাগ এবং কিছু ব্যক্তিগত জিনিসপত্র দিয়ে শোবার ঘর তৈরি হলো। ঘরের ভেতরে কৃত্রিমভাবে আলো ও উষ্ণতা তৈরি করা হলো, যা সোলার প্যানেল থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুৎ দ্বারা চালিত। একটি হাইড্রোপনিক কিট-ও স্থাপন করলো যাতে জরুরি প্রয়োজনে কিছু তাজা সবজি ফলানো যায়।
মেঘের দেশের এই বরফ ঘরটি ছিল অভ্রর স্বপ্ন, তার স্বাধীনতার প্রতীক। এখান থেকে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে মহাবিশ্বের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করে। ক্লাজনাপকা শহরের ছোট ছোট বাড়িগুলো পায়ের নিচে বিন্দুর মতো দেখায়। নিচের জঙ্গল, হুইয়া বাছিউ, দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন এক রহস্যময় সবুজ ধাঁধা। অনিতা হয়তো এখন তাকে পাগলের মতো খুঁজে ফিরছে।তার নিখোঁজ হওয়ার খবর হয়তো ইতোমধ্যেই সংবাদ শিরোনামে। অভ্রর কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু নিজেকে বোঝালো, এই আত্মত্যাগ জীবনের বৃহত্তর উদ্দেশ্য পূরণের জন্য, মানবজাতির জন্য এ এক নতুন জ্ঞান অন্বেষণের মহাসুযোগ।
কয়েক সপ্তাহ ধরে অভ্র রুটিন মেনে চলে। ডেটা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং মহাবিশ্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচন। সে মহাজাগতিক বিকিরণ নিয়ে পরীক্ষা চালাচছে। একদিন সকালে, ল্যাবে মহাবিশ্বের নতুন নক্ষত্রপুঞ্জের ডেটা বিশ্লেষণ করছিলো। হঠাৎ কম্পিউটারে স্থাপিত বিশেষ রিসিভারে একটি অপ্রত্যাশিত এবং অত্যন্ত শক্তিশালী সিগনাল ধরা পড়ে। সিগনালটি পৃথিবীর নিচের দিক থেকে আসছে।সরাসরি ‘হুইয়া বাছিউ ‘বন থেকে। অভ্র বিস্মিত হেেলা। মনে পড়ে বনের মাঝখানের সেই ঘাসবিহীন জায়গাটি, যেখানে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় বিকিরণ এবং চৌম্বকীয় বিচ্যুতি ছিল।
সে দ্রুত সিগনালটি বিশ্লেষণ করতে লাগলো। এটি কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক বিকিরণ নয়। এটি ছিল একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি, বুদ্ধিমান সিগনাল যা অত্যন্ত জটিল গাণিতিক প্যাটার্নে পুনরাবৃত্তি হচ্ছিল। অভ্রর চোখগুলো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। এটা কি সেই ইউএফও’র সিগনাল, যার কথা এমিল বার্নিয়া বলেছিলেন? এটি এমন একটি উড়ন্ত বস্তু বা বায়বীয় ঘটনা, যা এর প্রত্যক্ষদর্শী বা তদন্তকারী সংস্থা দ্বারা তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত বা ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয় না। আকাশে দৃশ্যমান যেকোনো অচেনা বা অজানা বস্তু বা আলোকেই প্রাথমিকভাবে ইউএফও বলা হয় যা এমিল বার্ণিয়া উল্লেখ করে গেছেন। এটা কি প্রমাণ করে যে ওই বনের নিচে কোনো ভিনগ্রহী সভ্যতার উপস্থিতি আছে? বুকের ভেতর ধুক ধুক করতে থাকে। সে টেলিস্কোপটি দ্রুত বনের দিকে ঘুরিয়ে দেয় এবং নিচে নজর রাখে। কিন্তু মেঘের কারণে নিচের সবকিছুই অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সিগনালটির উৎস আরও ভালোভাবে জানার চেষ্টা করতে থাকে এবং সিগনালের পুনরাবৃত্তির ফ্রিকোয়েন্সি মডুলেশন বিশ্লেষণ করে। সে বুঝতে পারে, এই সিগনালটি সম্ভবত কোনো ট্রান্সমিটার থেকে আসছে যা পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রকে ব্যবহার করছে।
এই আবিষ্কার অভ্রর গবেষণাকে এক নতুন দিকে ঘুরিয়ে দিল। সে একাকিত্বের আশ্রয় খুঁজতে এসে মহাবিশ্বের নতুন রহস্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। মেঘের দেশের বরফ ঘর এখন শুধু একটি ঘর নয়, এটি এক অ্যাডভান্সড ল্যাব, যা মহাজাগতিক সিগনাল রিসিভ করতে এবং বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। সে বুঝতে পারে ‘হুইয়া বাছিউ’ বন আসলে মহাজাগতিক যোগাযোগের একটি প্রাকৃতিক কেন্দ্র।
এই আবিষ্কার তাকে অনিতার কথা, তার অতীতের সমস্ত গঞ্জনা ভুলিয়ে দিল। সে অনিতাকে গঞ্জনার জন্য ধন্যবাদ দিল। অনিতা যদি তাকে ভর্ৎসনা না করতো তবে কি সে আকাশবাসী হতো? তার মনে হলো এই আত্মত্যাগ সার্থক। সে হয়তো মহাবিশ্বের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করতে চলেছে। তার মুক্তির পথ তাকে এক অপ্রত্যাশিত অ্যাডভেঞ্চারের দিকে নিয়ে এসেছে।
মাস পেরিয়ে বছর ঘুরতে থাকলো। ডা. অভ্র সেনগুপ্ত মেঘের দেশের বরফ ঘরে কাটিয়ে দিয়েছে প্রায় দুই বছর। এই দুই বছরে মহাবিশ্বের এমন সব রহস্য উন্মোচন করেছে, যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলীয় কোলাহল এবং আলোক দূষণের কারণে কোনো গবেষণাগার থেকে সম্ভব হতো না। ‘হুইয়া বাছিউ’ বন থেকে আসা সেই বুদ্ধিমান মহাজাগতিক সিগনাল তাকে আরও গভীরে যেতে সাহায্য করেছে। এখন নিশ্চিত, এই সিগনাল কোনো বুদ্ধিমান, উন্নত ভিনগ্রহী সভ্যতার সুদূর বার্তা।
সে বই লিখতে শুরু করে, যার নাম “দ্য ক্লাউড ল্যাবরেটরি অ্যান্ড দ্য হুইয়া বাছিউ কসমিক গেটওয়ে”। গবেষণার ফলাফলগুলো সে যত্ন করে এনক্রিপ্টেড কম্পিউটারে সংরক্ষণ করে। তার মনে এখন আর সেই গঞ্জনা বা অভিযোগের রেশ নেই। সে এখন একজন সম্পূর্ণ নতুন মানুষ। দুই বছরের একাকিত্ব, নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ এবং জ্ঞানের আলো মনকে শান্ত, স্থির ও আলোকিত করেছে।
কিন্তু জ্ঞানের চরম শিখরে পৌঁছেও মন মাঝে মাঝে শূন্যতা অনুভব করে। বরফ ঘরের দেওয়ালের ওপারে যখন সূর্য ওঠে, তখন মনে অনিতা আর দানিয়ূবের মুখটা ভেসে ওঠে। ওরা এখন কেমন আছে? ওরা কি তার জন্য অপেক্ষা করছে? নাকি অভ্রকে মৃত ভেবে জীবন মেনে নিয়েছে? অভ্রর মনে এক ধরনের তীব্র অপরাধবোধ কাজ করে। আবিষ্কারের নেশায় অনিতাকে হয়তো খুব বেশি কষ্ট দিয়েছে, যার মূল্য কোনো আবিষ্কার দিয়েই শোধ করা যায় না। মানুষের সম্পর্কের সমীকরণ যে কোনো গাণিতিক সমীকরণের চেয়েও জটিল, তা সে এই একাকিত্বে এসে উপলব্ধি করেছে।
এক সন্ধ্যায়, অভ্র বরফ ঘরের জানালার পাশে বই নিয়ে বসে আছে। বাইরে মেঘের আনাগোনা। চাঁদের আলো মেঘের গায়ে এক অপার্থিব সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। নিচে, বহুদূরে, হুইয়া বাছিউ বন যেন নীরব প্রহরী। মনে হলো, এত বড় মহাবিশ্বে সে একা নয়, কিন্তু তার মানবসত্তা সঙ্গীদের খুঁজছে। ভাবে, এই একাকীত্ব কি সত্যিই প্রয়োজনীয় ছিল? নাকি সে কেবল পালাতে চেয়েছিলো?
মনে পড়ে অনিতার হাসি, দানিয়ূবের ছুটাছুটি, ছোট ছোট আঙুলগুলোর নড়াচড়া, সংসারের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো। ঝগড়া, মান-অভিমান, ভালোবাসার খুনসুটি। মনে পড়ে, অনিতা তার কাজের প্রতি তীব্র আগ্রহের সাথে অভ্রর একটু মনোযোগের জন্য অপেক্ষা করতো। কাছে পেতে চাইতো।সবকিছুই আজ তার কাছে অমূল্য সম্পদ মনে হলো। সে বুঝতে পারে, যত বড় আবিষ্কার করুক না কেন, মানব সম্পর্ককে এড়িয়ে পুরোপুরি সুখী হওয়া যায় না। গবেষণার পূর্ণতা তখনই আসে, যখন প্রিয়জনের সাথে জ্ঞান ভাগ করে নেয়া যায়।
পরদিন সকালে অভ্র একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিলো। ফিরে যাবে। তার আবিষ্কারের সমস্ত তথ্য নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে যাবে। হয়তো অনিতা তাকে ক্ষমা করবে না, হয়তো তাদের সম্পর্ক আর জোড়া লাগবে না, হয়তো পরিবার থেকে বিতাড়িত হবে। কিন্তু সে তার ভুল স্বীকার করবে। অনিতার কাছে ক্ষমা চাইবে এবং গবেষণার সত্যতা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরবে। এই আবিষ্কার গোপন রাখা সম্ভব নয়।
অভ্র বরফ ঘর গুছাতে শুরু করে। সমস্ত সরঞ্জাম, গবেষণার ডেটা বিশেষ এনক্রিপ্টেড ডাটা কিট-এ ভরে নেয়। বরফ ঘরের সোলার প্যানেলগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল, যাতে একটি নির্দিষ্ট সিগনাল দিলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। সেই সিগনালটি দিলো। এরপর আইস-ক্রিস্টাল কনভার্টার স্প্রেটির প্রভাব নিষ্ক্রিয় করার জন্য একটি ডি-কম্পোজিং স্প্রে ব্যবহার করে, যাতে বরফের স্তর দ্রুত জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে মেঘে পরিণত হতে পারে। তার ক্লাউড হাউজ ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে থাকে, যা তার একাকিত্বের প্রতীক ছিল।
সে প্যারাসুট আবার প্রস্তুত করে। এবার এর ইঞ্জিন নিচের দিকে উল্লম্ব অবতরণ-এর জন্য সেট করা হলো। সে বরফ ঘরটিকে শেষবারের মতো দেখে নিলো। এই ঘর তাকে অনেক কিছু দিয়েছে ু শান্তি, জ্ঞান, আর জীবনের এক নতুন উপলব্ধি। এই ঘর ছিল মুক্তির মন্দির, তার বিজ্ঞান সাধনার ক্ষেত্র।
ঝাঁপ দেওয়ার আগে সে ল্যাবের কম্পিউটারে একটি দীর্ঘ বার্তা লিখলো। বার্তাটি ছিল সেই ভিনগ্রহী সভ্যতার উদ্দেশ্যে, যাদের সিগনাল সে ধরতে পেরেছে।
“অজানা বন্ধুরা, আমি তোমাদের বার্তা গ্রহণ করেছি এবং তার গাণিতিক ভিত্তি বুঝতে পেরেছি। আমি এখন পৃথিবীতে ফিরে যাচ্ছি মানবজাতির কাছে এই সত্য তুলে ধরতে। আশা করি, একদিন আমরা বৈজ্ঞানিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে তোমাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হব। তোমাদের বার্তা আমার জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে। ধন্যবাদ।”
বার্তায় সে নিজের কিছু প্রাথমিক ডেটাও জুড়ে দিলো।
তারপর মেঘের দেশ থেকে পৃথিবীর দিকে ঝাঁপ দিলো। টার্বো-প্রপেলারের শব্দ এবার নিচে নামার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এবার আর ভয়ের অনুভূতি নেই, আছে শুধু এক নতুন আশা ু অনিতা এবং সত্যের মুখোমুখি হওয়ার আশা। সমস্ত আবিষ্কার সাথে, যা তাকে পৃথিবীতে এক নতুন জীবন শুরু করতে সাহস যোগাচ্ছে।
অভ্র ধীরে ধীরে প্যারাসুট এবং টার্বো-প্রপেলার ইঞ্জিন ব্যবহার করে ‘হুইয়া বাছিউ’ বনের দিকে নেমে আসে। তার অবতরণ ছিল নিখুঁত। প্যারাসুট তাকে সাবধানে বনের মাঝখানে, সেই ঘাসবিহীন রহস্যময় স্থানটির কাছাকাছি নামিয়ে দিল। ভাঁজ করা ইলেকট্রিক সিঁড়িটা ব্যবহার করে গাছের গুঁড়ি থেকে নেমে আসে। হৃদয়ে এখন আর সেই ভয়ের বা অস্থিরতার রেশ নেই, আছে এক অনির্বচনীয় শান্তি।
বনের পরিবেশ আগের মতোই রহস্যময়, কিন্তু অভ্রর কাছে এখন এর অর্থ ভিন্ন। সে এখন জানে, এই বন শুধু লোকগাথা আর ভৌতিক গল্পে ঘেরা নয়। এটি আসলে মহাজাগতিক যোগাযোগের এক অনন্য কেন্দ্র, পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে লুকিয়ে থাকা এক কসমিক গেটওয়ে। পায়ের নিচে থাকা মাটির প্রতিটি কণা এখন তার কাছে জ্ঞানের উৎস। সে দ্রুত সরঞ্জামগুলো গুছিয়ে নেয়। বিশেষ করে এনক্রিপ্টেড ডেটা কিটটি সাবধানে নিজের কাছে রাখে।
সে গাড়ি পার্ক করা জায়গায় ফিরে আসে। গাড়ি শুকনো পাতা আর ডালপালায় ঢাকা যেমন রেখে গিয়েছিল।এই গাড়ি যেন দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সে রোমানিয়া থেকে বাড়ির দিকে রওনা দিলো। দীর্ঘ পথ। কিন্তু মনে নতুন উদ্দেশ্য, যা তাকে তাড়িত করছে। মহাজাগতিক আবিষ্কারের কথা পৃথিবীর মানুষকে জানাতে চায় বিশেষ করে সেই বুদ্ধিমান সিগনালের বার্তা। সে জানে, এই তথ্য প্রকাশ হলে বিশ্বে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
কয়েকদিনের দীর্ঘ, ক্লান্তিকর যাত্রা শেষে পরিচিত শহরে, তার বাড়িতে পৌঁছালো। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর। অভ্র নিঃশব্দে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। মন ধুক ধুক করছে। দুই বছর ধরে কোনো খবর না দেওয়া, কোনো যোগাযোগ না রাখা ু এই অপরাধে অনিতা তাকে কীভাবে গ্রহণ করবে?সে কি রেগে যাবে, নাকি ভেঙে পড়বে? কলিং বেল টিপতেই বাড়ির একজন অপরিচিত মেয়ে দরোজা খুলে দিল।অভ্র ঢুকতেই মেয়েটি বাধা দেয়।অভ্র বলে, অনিতাকে ডেকে দিতে।মেয়েটি বলে, তিনি ঘুমুচ্ছেন।অভ্র মেয়েটিকে মৃদু ধাক্বা দিয়ে বলে তাহলে আমিই যাচ্ছি ভেতরে। অভ্র
অনিতার পাশে গিয়ে বসে। ঘুমন্ত মুখটা দেখে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠে। কত সরল, কত ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল এই মুখের ভাঁজে, যা সে অবহেলা করেছে। সে অনিতার হাতে হাত রাখে। স্পর্শে অনিতা নড়েচড়ে উঠে।
ধীরে ধীরে অনিতা চোখ খুলে। অভ্রকে দেখে চোখগুলো বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। বিশ্বাস করতে পারছে না অভ্র পাশে বসে আছে। চোখে প্রথমে অবিশ্বাস, তারপর এক তীব্র আনন্দ এবং শেষে অভিযোগের মিশ্রণ।
“অভ্র! তুমি… তুমি ফিরে এসেছো!” অনিতার কণ্ঠস্বর কাঁপছে। সে উঠে বসে প্রায় চিৎকার করে উঠে।এতদিন কোথায় ছিলে? তোমাকে কোথায় না খুঁজেছি।
আমি তোমার নিখোঁজ হওয়ার রিপোর্ট করেছিলাম।
কিন্তু আমার মন বলতো তুমি বেঁচে আছো। এই কথা বলেই অনিতা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।
“হ্যাঁ, অনিতা। আমি ফিরে এসেছি। আমি জীবিত।কণ্ঠে অনুশোচনা স্পষ্ট।
অনিতা মুহূর্তের দ্বিধা কাটিয়ে অভ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। চোখে বাঁধভাঙা জল। আবার বলে, বলো,”কোথায় ছিলে তুমি? সবাই ভেবেছিল, হয়তো আর বেঁচে নেই বা নিঁখোজ হয়ে গেছ.” অনিতা কাঁদতেই থাকে।
অভ্র, অনিতাকে সান্ত্বনা দেয়। দুই বছরের একাকিত্বের গল্প, মেঘের দেশের বরফ ঘরের কথা বলে। মহাজাগতিক সিগনাল রিসিভ করার আবিষ্কারের কথা জানায়। অনিতা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিল না ু মেঘের দেশে ঘর! কিন্তু অভ্রর চোখে নতুন জ্যোতি, গভীর সত্যতা দেখে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়। অনিতা বুঝতে পারে, অভ্র নিছকই পালিয়ে যায়নি, সে এক মহান আবিষ্কারের সন্ধানে ছিলো যা অনিতা কখনোই বুঝতে চেষ্টা করেনি একজন বিজ্ঞানীর বউ হয়েও।
“তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে, অনিতা? আমি তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছি। আমার গবেষণা আর তোমার ভালোবাসার মধ্যে আমি ভারসাম্য রাখতে পারিনি,” অভ্র অনুতপ্ত কণ্ঠে বলে।
অনিতা অভ্রর দিকে তাকিয়ে চোখের জল মুছে। “আমি জানি, তুমি তোমার কাজের জন্য কতটা প্যাশনেট। আমি হয়তো বুঝতে পারিনি, তোমার কাজ শুধু তোমার নয়, তা পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আমি তোমাকে অনেক অভিযোগ করেছি, তার জন্যও ক্ষমা চাই।”
দুজনের মধ্যে দীর্ঘ কথোপকথন হয়, যা দুই বছরের দূরত্ব এবং ক্ষোভকে ধুয়ে মুছে দেয়। অভ্র বোঝায়, এই গবেষণা মানবজাতির জন্য প্রথম ভিনগ্রহী যোগাযোগের দ্বার উন্মোচন করতে পারে। অনিতা বুঝতে পারে, অভ্রর উদ্দেশ্য মহৎ এবং তার কাজ কখনোই ব্যক্তিগত নয়। সে সিদ্ধান্ত নেয়, এখন থেকে অভ্রর প্রতিটি আবিষ্কারের পাশে থাকবে।
অনিতা ফোন হাতে নেয়।মাকে ফোন করে দানিয়ূবকে নিয়ে আসতে।অভ্র ফিরে এসেছে।সে তার সন্তানকে দেখতে চায়।দানিয়ূবের নানু বেড়াতে এলে যাবার সময় গোঁ ধরে নানুর সাথে যাবে।অনিতাও নিষেধ করেনি, মায়ের সাথে দানিয়ূবকে দিয়ে দেয়।অনিতা ওঠে।অভ্রর পছন্দের খাবার তৈরী করতে হবে।এই দুই বছরে অভ্র অনেক শুকিয়ে গেছে। সে কাজের মেয়েকে নিয়ে কিচেনে যায়। যে মেয়ে অভ্রকে চিনতে না পেরে ঘরে ঢুকতে বাধ দিয়েছিল।
কিছুদিনের ভেতর অভ্র গবেষণার ফলাফল বিশ্বের বিজ্ঞানী এবং সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে উপস্থাপন করে। তার ডেটা এবং প্রমাণ ছিল অকাট্য। এই আবিষ্কার বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে।’ হুইয়া বাছিউ’ বন পরিণত হয় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহাজাগতিক গবেষণাকেন্দ্রে। বিজ্ঞানীরা সেখানে গবেষণা শুরু করেন। অভ্র জ্ঞানের গভীরতার কারণে তাদের নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা পান। সে এখন একজন বিজ্ঞানী নয়, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারক।এই আবিষ্কার তাকে এনে দিয়েছে নোবেল পুরস্কার এবং মহাবিশ্বের এক কোণে স্থান।
অভ্র আর অনিতার সম্পর্কও নতুন করে শুরু হলো। অনিতা, অভ্রর গবেষণাকে সমর্থন করতে থাকে। অভ্রর গবেষণাকেন্দ্রের পরিবেশকে শান্ত ও সুসংগঠিত রাখতে সাহায্য করে। অভ্রও গবেষণার পাশাপাশি অনিতাকে সময় দিতে শুরু করে। সে বুঝতে পারে, প্রেম এবং বিজ্ঞান দুটোই জীবনে সমান গুরুত্বপূর্ণ।ওদের সংসার এখন অভিযোগের বৃষ্টিতে ভিজে না, বরং ভালোবাসার মেঘে ভেসে বেড়ায়, যা স্থিতিশীলতা এবং শান্তির প্রতীক।
মেঘের দেশের বরফ ঘর অভ্রর জীবনের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এটি শুধু একাকিত্বের আশ্রয় ছিল না, ছিল আবিষ্কারের ক্ষেত্র, তার মুক্তির পথ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই পথ তাকে ফিরিয়ে এনেছে ভালোবাসার কাছে, এক নতুন উপলব্ধি ও গভীর বন্ধনের কাছে।
রোখসানা ইয়াসমিন মণি : কথাসাহিত্যিক




