এখন সময়:রাত ৪:২৯- আজ: বৃহস্পতিবার-১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

এখন সময়:রাত ৪:২৯- আজ: বৃহস্পতিবার
১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

বাংলা সাহিত্যে  একুশ

এস ডি সুব্রত

মানুষ জন্মের পরপরই যে ভাষায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে সে ভাষা কেড়ে নেয়া যায় না। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণের সে মুখের ভাষা বাংলা ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল উর্দু ভাষা।কিন্তু পারেনি। সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে অবশেষে রক্তের বিনিময়ে বাঙালি ছিনিয়ে এনেছিল মায়ের ভাষা বাংলা ভাষাকে। একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তস্নাত ঘটনাই  উৎসাহ জুগিয়েছে ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রণ্ট নির্বাচন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০-এর নির্বাচনে অভূতপূর্ব  বিজয় অর্জনে। একুশের চেতনা উদ্বুদ্ধ  হয়ে লাখো মুক্তিসেনা  ১৯৭১-এর মুক্তিসংগ্রামে অংশ নিয়েছিল। ভাষা আন্দোলন তথা একুশের সিঁড়ি বেয়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। পেয়েছি লাল-সবুজ পতাকা, আপন ভূখণ্ড  বাংলাদেশ। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরদের আত্মত্যাগ অর্জিত হয়েছে বাংলা ভাষা। ভাষা আন্দোলন আমাদের বাংলা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিকে করেছে নানাভাবে সমৃদ্ধ। অমর একুশের রক্তস্নাত ঘটনাবলীকে শব্দের গাঁথুনিতে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন কবি লেখক ও সাহিত্যিকরা। ভাষা আন্দোলন আলোড়িত করেছিল  সমসাময়িক কবি-সাহিত্যিকদের। এমনকি পরবর্তী প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছে দারুনভাবে। কবিরা এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। তবে  ভাষা আন্দোলনের অনেক আগেই বাংলা কাব্য গেয়েছে তার নিজস্ব ভাষার জয়গান। মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিমের ‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই মধ্যযুগেই আবদুল হাকিম মাতৃভাষার প্রতি প্রতি গভীর মমতা

অনুভব করছিলেন এবং বাল ভাষাকে যারা ভালবাসে না তাদের কে দেশ ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তাঁর বঙ্গবাণী কবিতায়।

‘যেসব বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী

সেসব কার জন্ম নির্ণয় ন জানি’।

অতুলপ্রসাদ সেনের  বলিষ্ঠ উচ্চারণ—-‘মোদের গরব মোদের আশা/আমরি বাংলা ভাষা’ যেন মাতৃভাষার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার অকৃত্রিম নিদর্শন।

একুশ বাংলা সাহিত্যকে  সমৃদ্ধ করেছে নানাভাবে। ভাষার জন্য যে জাতি প্রাণ দিয়েছে, তার ইতিহাস বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি পরতে পরতে লেখা আছে। মায়ের মুখের ভাষা রক্ষায় বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্তে পিচঢালা কালো রাজপথ রঞ্জিত করেছিল। তাদের এ আত্মত্যাগের ফসল আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। দেশ, দেশের মানুষ বা মাতৃভাষার জন্য এ আত্মত্যাগ পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের ইতিহাসে নেই। তাই একুশ জড়িয়ে আছে আমাদের সামগ্রিক ও জাতীয় চেতনায় সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন কবি-লেখকগণ তাদের সাহিত্যের মুখ্য উপকরণ হিসেবে একুশকে গ্রহণ করেছেন।

একুশ সম্পর্কে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন- ‘মাতা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি প্রত্যেক জাতির কাছে পরম শ্রদ্ধার বিষয়।’ একুশ ও আমাদের সাহিত্য : একুশের প্রভাবে বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখা-প্রশাখাই সমদ্ধ হয়েছে। একুশ নিয়ে রাত হয়েছে অসংখ্য কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক। এছাড়াও একুশকে অবলম্বন করে রচিত হয়েছে চলচ্চিত্র। কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ একুশকে কেন্দ্র করে লিখেছেন—” স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তােমার বন্ধু ভয় কী।/আমরা খাড়া রয়েছি তো চার কোটি পরিবার। ”

একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সিকান্দার আবু জাফর তার সংগ্রাম চলবেই কবিতায় লিখেছেন—

‘জনতার সংগ্রাম চলবেই।/আমাদের সংগ্রাম চলবেই। ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায়  কবি শামসুর রাহমান একুশের চেতনা ফুটিয়ে তুলেছেন। কবি লিখেছেন—

“স্বাধীনতা তুমি/শহিদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা”। একুশ নিয়ে  চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ এবং ‘ Let there be Light’।  ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তমাখা  ঘটনার সংবাদ চট্টগ্রামে বসে শোনার পরপরই কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীর  তাৎক্ষণিক রচনা করেন দীর্ঘ কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। ৮২ লাইনের দীর্ঘ ওই কবিতায় তিনি বর্বরোচিত এ ঘটনার হোতাদের ফাঁসির দাবি তুলেছেন— ‘সেই চল্লিশটি রত্ন যেখানে প্রাণ দিয়েছে/আমরা সেখানে কাঁদতে আসিনি।/যারা গুলি ভরতি রাইফেল নিয়ে এসেছিল ওখানে/ যারা এসেছিল নির্দয়ভাবে হত্যা করার আদেশ নিয়ে/আমরা তাদের কাছে ভাষার জন্য আবেদন জানাতেও আসিনি আজ।/আমরা এসেছি খুনি জালিমের ফাঁসির আদেশ নিয়ে’।

২১ ফেব্রুয়ারির এই আত্মত্যাগের স্মৃতি রক্ষার্থে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা মিলে ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে শহীদের রক্তে রঞ্জিত হওয়ার স্থানে নির্মাণ করেন সাড়ে ১০ ফুট উচ্চতা ও ছয় ফুট প্রস্থের বেদি, যার নাম দেওয়া হয় ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’। ২৬ ফেব্রুয়ারি স্তম্ভটি গুঁড়িয়ে দেয় পুলিশ। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ লেখেন তার অমর কবিতা ‘স্মৃতিস্তম্ভ’।  তার কলমে ফুটে ওঠেছে এভাবে —-

ইটের মিনার ভেঙেছে, ভাঙুক, একটি মিনার গড়েছি আমরা

চার কোটি পরিবার

বেহুলার সুরে, রাঙা হৃদয়ের বর্ণ লেখায়।

পলাশ আর

রামধনুকের গভীর চোখের তারায় তারায়

দ্বীপ হয়ে ভাসে যাদের জীবন, যুগে যুগে সেই

শহীদের নাম

এঁকেছি প্রেমের ফেনিল শিলায়, তোমাদের নামে।

১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয় হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় ভাষা আন্দোলনভিত্তিক প্রথম সাহিত্য সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’। হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, ফজলে লোহানী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আনিস চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আবদুল গণি হাজারি, জামাল উদ্দিন, আতাউর রহমান এ ১১ জনের কবিতা স্থান পায় সংকলনটিতে। ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ প্রকাশের আগে ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বরে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় একুশের প্রথম কবিতা সংকলন ‘ওরা প্রাণ দিলো’। সাতজন কবির কবিতা স্থান পায় সংকলনটিতে। বিমল চন্দ্র ঘোষের ‘শহীদ বাংলা’, সৈয়দ আবুল হুদার ‘জন্মভূমি’, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ‘ঢাকার ডাক’, মর্তুজা বশীরের ‘পারবে না’, নিত্য বসুর ‘জননী গো’, তানিয়া বেগমের ‘বন্ধুর খোঁজে’ এবং প্রমথ নন্দীর ‘প্রিয় বন্ধু আমার’ কবিতা নিয়ে প্রণীত হয় সংকলনটি। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘কোনো এক মাকে’ কবিতার পঙ্ক্তিগুলো  এরকম ……

‘মাগো, ওরা বলে/সবার কথা কেড়ে নেবে।/তোমার কোলে শুয়ে/গল্প শুনতে দেবে না।/বলো মা তাই কি হয়? ‘ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত আরও কিছু আলোচিত কবিতার  মধ্যে জসীমউদ্দীনের ‘যারা জান দিল’, শামসুর রাহমানের ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, আল মাহমুদের ‘একুশের কবিতা’, মহাদেব সাহার ‘একুশের গান’ উল্লেখযোগ্য। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ একুশের প্রভাতফেরির গান  মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে ।  রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রথম গল্প লিখিত হয় ১৯৫০ সালে গল্পকার ও ভাষাসৈনিক শাহেদ আলী রচিত ‘মন ও ময়দান’।

সরদার জয়েন উদ্দীনের ‘খরস্রোত’, নূরউল আলমের ‘এ কালের রূপকথা’, জহির রায়হানের ‘সূর্য গ্রহণ’, ‘একুশের গল্প’, সেলিনা হোসেনের ‘দ্বীপান্বিতা’ রাবেয়া খাতুনের ‘প্রথম বধ্যভূমি’, শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘এমনি করেই গড়ে উঠবে’ ভাষা আন্দোলন উপজীব্য উল্লেখযোগ্য গল্প । ১৯৮৪ সালে রশীদ হায়দারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘একুশের গল্প’ নামের সংকলন। ১৯৯৯ সালে বাংলা একাডেমি হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, রশীদ হায়দার ও মোবারক হোসেনের সম্পাদনায় প্রকাশ করে ‘একুশের গল্প’ নামে আরেকটি সংকলন গ্রন্থ।

জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ একুশের প্রথম উপন্যাস। মাত্র তিন দিন দুই রাতের ব্যাপ্তি নিয়ে রচিত উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাস সেলিনা হোসেনের ‘যাপিত জীবন’, ‘নিরন্তন ঘণ্টাধ্বনি’, শওকত ওসমানের ‘আর্তনাদ’, মোহাম্মদ আবদুল আওয়ালের ‘আলো আমার আলো’।

অল্প পরিসরে হলেও বাংলা নাটকেও ভাষা আন্দোলনের প্রভাব রয়েছে। একুশ নিয়ে প্রথম নাটক লেখেন অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী। তাঁর রচিত ‘কবর’ বাংলা নাট্যসাহিত্যে অনন্য স্থান দখল করে রেখেছে। ভাষা আন্দোলন জাতীয় জীবনে একটি বিশেষ স্মরণীয়  যা যুগ যুগ ধরে বাঙালি জাতিকে প্রেরণা দান করবে। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির সংস্কৃতি ও সাহিত্যে চেতনার ফসল হিসেবে বিরাজ করছে। মায়ের মুখের ভাষা রক্ষার্থে যে সংগ্রাম হয়েছিল, যত রক্ত ঝরেছিল তা  বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রকে করেছে সমৃদ্ধ। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস একদিকে যেমন আনন্দের তেমনি অন্যদিকে বেদনার।

 

এস ডি সুব্রত, প্রাবন্ধিক

বাঙালির ভাষার অধিকার হরণ- রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক মৃত্যু

হোসাইন আনোয়ার আজ থেকে ৭৯ বছর আগের কথা। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ভারতবর্ষের সর্বশেষ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যটেন তার রোয়েদাদ ঘোষণা করেন, এই ঘোষণার পর

‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’ জননী রঞ্জিতা বড়ুয়াকে নিবেদিত সন্তান সত্যজিৎ বড়ুয়ার ‘সুরাঞ্জলি’

মা সুগৃহিনী শ্রমতী রঞ্জিতা বড়ুয়ার ৮৩ তম জন্মদিনকে উপলক্ষ করে ৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে গানে গানে সুরের

আন্দরকিল্লা’য় সুকুমার স্মরণ সন্ধ্যা

বিপুল বড়ুয়া   সুকুমার বড়ুয়া আমাদের ছড়াসাহিত্যের একজন প্রবাদপ্রতীম পুরুষ। নানা আঙ্গিক, বিষয়বস্তু, ধরণ-ধারণে, বৈচিত্রে অনুধ্যানে তিনি অসংখ্য ছড়া লিখে আমাদের ছড়া অঙ্গনে বহুমাত্রিকভাবে খ্যাত

জলে জঙ্গলে (পর্ব তিন)

মাসুদ আনোয়ার একে একে মুসল্লিরা বেরিয়ে আসছে মসজিদ থেকে। আমি দাঁড়িয়ে আছি স্থানুর মতো। প্রত্যেক মুসল্লির মুখের দিকে তীক্ষ্ম নজর বুলাচ্ছি। কাপ্তাই বড় মসজিদের ইমাম