দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
ওর জেঠুর সাথে মেঘনীলের সম্পর্কটা অসাধারণ। এই ধরনের আত্মীক সম্পর্ক সাধারণত চোখে পড়ে না। নিজের বাবা-মায়ের সাথে যতটা না — তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। জেঠুকে না দিয়ে মেঘনীল নিজে কিছু খায় না। জেঠুকে না নিয়ে মেঘনীল কোথাও বেড়াতে যায় না। কোথাও বেড়াতে যাওয়ার প্রশ্ন উঠলে — আগেই জিজ্ঞাসা করে –জেঠু কি যাবে ? জেঠু গেলে সে যায়। না গেলে যায় না। মেঘনীলের পায়ে ব্যথা হলে সবার আগে জেঠুকে দেখাবে। কোনো সুখবর পেলে জেঠুকে আগে এসে বলবে। কষ্টের ঘ্রাণ নিয়ে এলে জেঠুর সাথে শেয়ার করবে। অসুখ হলে ডাক্তারের কাছে জেঠুকে নিয়েই যেতে হবে। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিলে জেঠুকে সাথে থাকতে হবে। ওষুধ দিলে জেঠুর কাছে জিজ্ঞাসা করে তারপর ওষুধ খাবে। মেঘনীলের স্বপ্নে-জাগরণে, ভালোয়- মন্দয়, অন্তরে-বাহিরে শুধু জেঠু। বলা চলে মেঘনীল জেঠুগত প্রাণ। জেঠুর অসুবিধা হবে এমন কোনো কাজ সে কখনো করে না। জেঠুর ভালোলাগার নিশ্চয়তা বিধান করে সে।
আর জেঠুও ঠিক তাই। মেঘনীল তার ভাই এর ছেলে। কিন্তু সম্পর্কের আচার-আচরণে মনে হয় তার নিজের ছেলে। যত আল্লাদ আবদার সব জেঠু পূরণ করে। খেলনা ড্রোন থেকে শুরু করে প্রতিবছর কালীপুজোর বাজি কেনা, পুজোর পোশাক কেনা, ব্যাডমিন্টনের ব্যাট কেনা, হাজার উপকরণ– ভুরি ভুরি উদাহরণ দেয়া যাবে। অতীতে বর্তমানে সব সময় হচ্ছে। মেঘনীল আর ওর জেঠুর ভালোবাসার ঝুড়ি ভরতি। দুইজনের ভালোবাসার তালিকা দীর্ঘ। জেঠু আর মেঘনীল একসঙ্গে একই ফ্লাটে থাকে। ইতোমধ্যে ওই দুইজনের সম্পর্ক বাহিরে চাউর হয়ে আছে। মেঘনীল জেঠুকে ছাড়া থাকতে পারেনা। জেঠুও পারে না।
মেঘনীল যার মনে প্রাণে একমাত্র জেঠু ভাবনা –সেদিন একটা সমস্যায় পড়ে গেল। ওরা তিনতলায় থাকে। দোতালায় থাকেন এক ভদ্রলোক কামরুল সাহেব। উনি পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। খুব চমৎকার সম্পর্ক ওদের দুই পরিবারে। কামরুল সাহেব একটা অফিশিয়াল ট্রেনিংয়ের জন্য ভারতের কেরালায় থেকে এসেছেন এক মাস। ট্রেনিং থেকে ফেরার পথে নিজ পরিবার এবং ওই বিল্ডিংয়ে বসবাসরত সবার জন্য কিছু না কিছু গিফট নিয়ে এসেছেন। কামরুল সাহেব বাসায় ফেরার দুইদিন পরে বিল্ডিং এর অন্যান্য পরিবারের জন্য আনা উপহার সামগ্রী দিতে উদ্যত হলেন। আমাদের পরিবারকে দেয়ার জন্য মেঘনীলের ডাক পড়ল। মেঘনীল গেল। কিছুক্ষণ পরে হাতের মুঠো ভরতি করে ফিরে এলো। লাল নীল সবুজ নানা রঙের কাগজে মোড়ানো অনেকগুলো চকলেট। সাথে দুটো সাবান। খুশিতে মেঘনীল ডগমগ। কারণ চকলেট তার ভীষণ প্রিয়। ক্যাডবেরি, কিটক্যাট তার পছন্দের। এখানে সব ব্র্যান্ডেরই আছে। এইগুলি নিয়ে হাসিমুখে ঘরে ঢুকলো। ঢুকেই সোজা জেঠুর কাছে। জেঠুকে যে আগে দেখাতে হবে! সবার আগে তাই জেঠুর প্রশংসাপত্র নেয়া দরকার। নিলোও। তারপর তার বড়মা, নিজের মা, তার বাবা সবার কাছে ফেরিওয়ালার মতো বুকে খুশি আর চকলেট সাবান নিয়ে দেখিয়ে এলো। সবাই খুব ভালো বললো।
চকলেটগুলো ও সাবান দুটো নিয়ে এবার একটু নিভৃতে চলে গেল মেঘনীল। গুনে গুনে দেখলো কয়টা চকলেট। কোন্ কোন্ ব্রান্ড আছে। দুই একটা নিয়ে নাকের কাছে শুঁকেও দেখলো। একা একা চকলেটগুলো দেখে অন্যরকম আনন্দে আপ্লূত হলো সে। সাবান দুটোও তার ভীষণ ভালো লাগলো। গন্ধটা কী চমৎকার ! সব মিলিয়ে একার জগতে সে গিফটগুলো উপভোগ করল খানিকক্ষণ।
এখন চকলেট তো খেতে হবে। লোভ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে । দৌড়ে চলে এলো জেঠুর কাছে। জেঠুকে একটা খাইয়ে দিয়ে তারপর মুখে পুরলো নিজেরটা। পরবর্তীতে অন্যদের দিলো। মোটামুটি চকলেটের একটা হিল্লে হয়ে গেল। কিন্তু সাবান নিয়ে ছোট্ট একটা সমস্যা হলো। সাবান সবাই নাকে শুঁকে বলেছে — ঘ্রাণটা চমৎকার। দুটো সাবানই ভালো। কিন্তু কোনটা কাকে দেবে। দুটো সাবানের দুই রকম গন্ধ। একটা কিছু চিন্তা করে দুটো সাবানের মধ্যে ওর বাবা-মার বাথরুমে একটা রাখল। অপরটা ওর জেঠুর বাথরুমে। মোটামুটি সমাধান একটা হয়ে গেল। একটা গোটা সাবান তো সাত আট দিন গায় মাখা যায়। দুদিন পর মেঘনীল ভাবছে ওর বাবা মার বাথরুমে যে সাবানটা রেখেছিল ওটা জেঠুকে দিলেই ভালো হতো। জেঠু যদি মনে মনে আবার ওই সাবানটা মাখতে চায়। জেঠুর সাবানটা কি খারাপ হয়ে গেল! যদি মনে মনে দুটো সাবানই মাখতে চায়! ভাবনা নানা রকম — নানা মাত্রায় এগোতে থাকে। তবে অন্যদের নিয়ে ওর একটুও মাথা ব্যথা নেই। আরো একদিন কেটে গেল। বস্তুত সাবান নিজেরা জানে না তাদের নিয়ে মেঘনীল এত ভাবনা ভেবে চলেছে।
চতুর্থ দিন জেঠু দুপুরে স্নানের জন্য বাথরুমে ঢুকলো। ঐদিন ছিল মেঘনীলের স্কুল ছুটির দিন। জেঠু বাথরুমের দরজা বন্ধ করে সাবানের কেচের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই দেখে — আগের সাবানটা নেই। আগেরটা ছিল নীল রঙের গ্লিসারিন সমৃদ্ধ সাবান। কী হলো সাবানটা ? বাথরুমে দাঁড়িয়ে ভাবছিল জেঠু। যাই হোক যেটা হাতের কাছে পেয়েছে –ওটা সাদা রঙের দেখতে কিন্তু গন্ধটা অসাধারণ। এতো মনোমুগ্ধকর যে গায়ে মাখলে গা থেকে তার গন্ধ ফুরোবে বলে মনে হয় না। জেঠু যথারীতি ঐ সাবানটা গায়ে মেখে স্নান শেষ করে বাইরে চলে এলো। এখন সাবানের নিয়ন্ত্রক যে তাকে প্রশ্ন করতেই হয়। মেঘনীলের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে — আগের সাবানটা কি হলো পাপ্পা ?
মেঘনীলকে সবাই পাপ্পা বলেই ডাকে।
— আমি অদলবদল করে রেখেছি। আমাদের বাথরুমেরটা তোমাদের বাথরুমে দিয়েছি আর তোমাদের বাথরুমেরটা আমাদের বাথরুমে নিয়ে এসেছি।
এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন। মেঘনীল দুই বাথরুমেই স্নান করে যখন যেখানে ইচ্ছে হয়।
— তা এটা করেছিস্ কেন? আমি ওকে জিজ্ঞাসা করি। তখন ও লাজুক হাসি হেসে জবাব দেয় –তোমার যদি আমাদের বাথরুমের সাবানটা মাখতে ইচ্ছে হয় তাহলে তুমি কীভাবে মাখবে। তাই বদলে দিয়েছি।
বাসার সকলের সামনে দাঁড়িয়ে এসব কথা হচ্ছিল। সকলের মুখে তখন মুচকি হাসি। ওর মা এবার জবাব দিলো — যাক্ তোর জেঠুর কারণে আমরা সবাই দুটো সাবানের স্বাদ নিতে পারলাম।
হ্যাঁ, দুই বাথরুমের একটা সমতাও সৃষ্টি হলো। কোন বৈষম্য রইলো না।
মেঘনীলের এই সাবান ভাগের বিষয়টা আরো একবার প্রমাণ করলো সে জেঠুকে সত্যি কতটা ভালবাসে !
দিলীপ কির্ত্তুনিয়া, কবি ও গল্পকার




