বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত প্রভাতে বাংলার ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ মাতৃভাষার মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন। যে সকালে রাষ্ট্রীয় বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষা প্রথমবার ইতিহাসের রক্তলিপিতে নিজেকে ঘোষণা করেছিল, সে দিনটি আর কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে থাকেনি। নীরব পাথরের শরীরে যে দিন প্রথম রক্তের উচ্চারণ খোদিত হয়েছিল- “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি”- সেই দিনটি হয়ে উঠেছিল একটি ভাষার জন্মক্ষণ, একটি ভাষাসমৃদ্ধ জাতির আত্মবোধের প্রাক্—প্রতিষ্ঠা। অমর একুশে ফেব্রুয়ারি তাই কোনো শোকানুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মাতৃভাষার আত্মবলিদানের মাধ্যমে ইতিহাসে প্রবেশ করা এক অনন্য আত্মপরিচয়গত মুহূর্ত।
‘আন্দরকিল্লা’র বর্ষ: ২৮ । ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সংখ্যার প্রচ্ছদ অবলোকন করলে প্রথমেই দৃষ্টিগোচর হয় শহীদ মিনারের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ- যেটি ঊর্ধ্বমুখী, দ্বিখণ্ডিত, অথচ অবিচল। এই অস্তিত্বমূলক মিনার কেবল একটি স্থাপত্য নয়; এই স্থাপনা শহীদদের এক বিমূর্ত শৈল্পিক রূপ, যেখানে স্তম্ভ কংক্রিটের সীমা অতিক্রম করে সময়ের বিবেকসম্পৃক্ত উজ্জ্বল সাক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। পেছনের ভাঙাচোরা রঙিন জ্যামিতি যেন ভাষার ক্ষতবিক্ষত ইতিহাস, পাকিস্তানি উপনিবেশিক জোরজবরদস্তি ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের বহুস্তরীয় সংকেত। আর নিচে সারিবদ্ধ যেসব মুখাবয়ব- সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর, জব্বার, এঁরা নিছক নামমাত্র নয়; এগুলো হচ্ছে ভাষা আন্দোলনে শহীদদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত পাঁচটি অনন্ত স্বরধ্বনি, যেগুলো আজও ইতিহাসের কণ্ঠে কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত। একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক তাৎপর্য এইখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে যে, অমর একুশে ফেব্রুয়ারি হচ্ছে উপমহাদেশের প্রথম রাজনৈতিক সংগ্রাম যেখানে ভাষা নিজেই হয়ে উঠেছিল মূল প্রতিরোধের জ্বলন্ত অস্তিত্ব। ভূখণ্ড, ক্ষমতা কিংবা অর্থনীতি নয়- মায়ের মুখের ভাষাকে রাষ্ট্রের মুখের ভাষা করার অনড় উচ্চারণই ছিল এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। এই সংগ্রামী উচ্চারণ ছিল এক গভীর সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ, যা ভাষাকে প্রশাসনিক কাঠামোর গণ্ডি ছাড়িয়ে নৈতিক—রাজনৈতিক অধিকারের স্তরে উন্নীত করেছিল। ভাষা তখন আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম থাকেনি; ভাষা হয়ে উঠেছিল অস্তিত্বের প্রমাণ, আত্মপরিচয়ের ধারক এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক দায়বোধের প্রবাহ।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে যেদিন এই একুশে ফেব্রুয়ারিকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তখন থেকেই এই অমর একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস বিশ্বসভ্যতার পরিসরে উত্তীর্ণ হয়েছে। ইউনেস্কোর ঘোষণায় একুশে ফেব্রুয়ারি আর কেবল বাঙালি ভাষাগোষ্ঠীর নয়; এই দিবস এখন পৃথিবীর প্রতিটি ভাষিক সংখ্যালঘু, প্রতিটি বিলুপ্তপ্রায় ভাষা—আত্মস্বরের জন্য এক নৈতিক আশ্রয়। পৃথিবীর মানচিত্রে যে ভাষাগুলো প্রায় নিঃশব্দে মারা যাচ্ছে, যে ভাষাগুলোর কণ্ঠে জমে থাকা জীবন ক্রমে নীরব হয়ে আসছে, একুশের চেতনা তাদের জন্য এক শোকবার্তা নয়, বরং তাদের জন্য প্রতিবাদী স্লোগান এবং অবিচ্ছেদ্য অধিকার।প্রচ্ছদে সৃজিত এই শিল্প আমাদের উপলব্ধি করায়, ভাষা কখনো একরৈখিক নয়। ভাষা ভাঙে, বদলায়, রক্তে রঞ্জিত হয়, আবার নতুন ব্যাকরণে ফিরে আসে। একুশে ফেব্রুয়ারি হচ্ছে সেই পুনর্গঠনের দিন, যেদিন ভাষা নিজেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিল ১৯৫২ সালের রক্তে রঞ্জিত আত্মত্যাগে। সাহিত্যে, কবিতায়, প্রবন্ধে, এমনকি ভাষার শ্বাস—প্রশ্বাসেও একুশ আজ এক অবিনশ্বর প্রতীক। একুশে ফেব্রুয়ারি স্মৃতিস্তম্ভে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো নীরব স্থাপনা নয়; এই সৌধস্থল হচ্ছে রক্ত, ভাষা ও প্রতিরোধের চলমান ইতিহাস। অমর একুশে চেতনা হচ্ছে সারাবিশ্বের প্রতিদিনের ভাষা ব্যবহারের নৈতিক পরীক্ষাক্ষণ এবং দিগন্ত উদ্ভাসিত দুর্জয় অনুপ্রেরণা।




