এখন সময়:সন্ধ্যা ৬:৪০- আজ: মঙ্গলবার-২৭শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৩ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

এখন সময়:সন্ধ্যা ৬:৪০- আজ: মঙ্গলবার
২৭শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৩ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

লালনের মৌল উপলব্ধির পাণ্ডুলেখ্য‘মানুষে খুঁজে পাবি প্রভুর ঠিকানা’

গৌতম কুমার রায়

 

কিছু টিকেছে লোকমুখে শ্রুত হয়ে। মুখেমুখে,কন্ঠে,তালে,সুরে-সুরে, সুর জড়িয়ে। আবার কিছু টিকে আছে সৃষ্টিত পুরুষের মৃত্যুর পর পত্রিকায় প্রকাশের প্রামাণ্যে হয়তো ঘুরে ফিরে স্বকীয় মৌলিকতা হারিয়ে। বাংলাদেশ হলো পৃথিবীর অতি প্রাচীন সৃষ্টিশীল লৌকিকতার অমিয় সাধনার পুরাতন সভ্যতার ধারক ভান্ডার। দেশের মধ্যে গাঙ্গেয় অববাহিকায় কুষ্টিয়া হলো সবচেয়ে বেশী উর্বর রসালো পললায়নে সমৃদ্ধশালী অঞ্চল। এখানকার মৌলিক উৎপাদনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলেন বিশ্ব ভান্ডারে বাঙালির সম্পদ। বাউল স্রষ্টা লালন সাঁই, সাধক বাউল গগন চন্দ্র দাম, স্বতন্ত্র বিবেচক বিচারপতি ড. রাধা বিনোদ পাল, ঐতিহাসিক কারবালার রূপসৃত বিষাদ সিন্ধুর লেখক মীর মশাররফ হোসেন, সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদারসহ অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিক এবং স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যাক্তিগণ আমাদের সংস্কৃতির আইকন উপজীব্য। কুষ্টিয়ার পলিমাটি, উর্বরভূমি,আলো-বাতাস,আবহাওয়া,প্রকৃতি-পরিবেশ এবং প্রতিবেশ,জীবন-সাধন,ভাষা, তাই এমন সৃষ্টির অন্যতম কারণ।

 

 

যুগে যুগে আমাদেরকে শাসন-শোষণ, ধর্ম, জাতি,ভাষা, অভিপ্রায়ণে আসা-যাওয়া, অবস্থানের জন্য গড়ে উঠেছে স্বতন্ত্র এক স্বকীয় ঐতিহ্যের অমিয় ধারা। সৃষ্টির সময়ে বাঙালির জীবন এবং যাপনকে কেন্দ্র করে আমাদের যে সমাজ গড়ে ওঠে, তা ছিল সভ্যতা ও উন্নয়নের বিবেচনায় অপেক্ষাকৃত অনুন্নত জীবন ব্যবস্থার জীবৎকাল। এই জীবন যাত্রায় সংযুক্ত হয়েছিল বাঙালির সংস্কৃতি,ধর্ম, আঁচার, সাহিত্য,জীবিকার মত উপাদান। এখানে গ্রোথিত আছে বহু গৌরব গাথা সৃষ্টিশীল ইতিহাসের স্বাক্ষ্য চিহ্ন। যার মধ্যে অনেকটাই ক্ষয়ে ক্ষয়ে বিলিন হয়ে গেছে। হয়তো কিছু বিকৃত হতে হতে। প্রাচীন কালে সৃষ্ট এ ঐতিহ্য সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের অভাব আবহে তা হারিয়েছে যেমন, আবার তা হাতিয়ে নিয়ে স্বত্ববানে যোগ হয়েছে চোর-বাটপার, প্রতারক তথাকথিত লেখকের নিজের সৃষ্টির বিকৃত তক্মা  জড়িয়ে।  এদেশে  লোক সাহিত্য  যখন বেশ আবেগময় ও হৃদয় গ্রাহী হয়ে ওঠে তখন দেশের কিছু গজিয়ে ওঠা বুদ্ধিজীবী সস্তা লেখক জনপ্রিয়তার আশায় আপামর বাঙালির প্রিয়তা  পাওয়ার স্বপ্নে গবেষণা শুরু করে দেন। এই গ্েষণায় তারা সাধারণ মানুষের  দুর্বল অনুভূতিকে পূঁজি করেন। তারা নতুন ও বিতর্কিত তত্ত্বকে সামনে এনে হাজির করেন। তারা সমাজের মানুষের সামনে গুণি মানুষের অসম্মান ও তাদেরকে বিতর্কিত করে নিজেদের মনবাসনাকে চরিতার্থ করে বাহবা নিতে উদ্যত হয়। তবে এই পরিগ্রহ প্রাপ্তির কফিনের শেষ অবস্থা তারা জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারেন নাই। সার্থকতাতো অনেক দূরে। তাদের গলদ্ধ অনাগ্রহ, বিদ্বেষ,তাচ্ছিল্য মনোভাব এক পর্যায় তাদেরকেই ঘিরে ধরে। গুণীরা উপস্থাপিত হন সম্মানের সাথে শিখড় পর্যয়ে। প্রত্যেক জাতির আপন সম্পদ হলো তার সাহিত্য এবং সংস্কৃতি। এটা তার নিজের সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়। জাতির চাল চলন, ভাষা, লোকায়ত ঋত্বিক ধারা হতে। এই ধারা বিবেচনায় সৃষ্টি হয় তাদের নিজস্ব সামাজিক, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, কৃষ্টি-কালচার, ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন। এখানে কাজ করে ঐ জাতির প্রবাদ-প্রবচন, কবিতা, ছড়া, উপন্যাস, পুঁথিঁ-পাঁচালি, গান, আনন্দ, বেদনা, নাটক, এমন কি বিশ্বাসের মত সৃষ্টিগত উপাদান। তবে যখন কোন জাতির মধ্য হতে কারো কারো মাধ্যমে লোকায়িত ধারার গুজব মতবাদ ব্যাবহারের আহাবান করা হয়,তখন বুঝতে হবে সে জাতির পরিধি ও পরিসর সীমাবদ্ধ, লোক মানুষের জীবন ও অভিযাত্রা থাকে কুসংস্কারে বদ্ধ। সে বিবেচনায় আমাদের মধ্যকালের পরিচয়টা ছিল এক অন্ধকারের উপজীব্য বটে। তার আগ-পর গীতা, মহাভারত, কীর্তন, পাঁচালি-পুঁথি, এরপর আসে আউলি ও বাউলি ধারা।

১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের উইলিয়াম থমসন দঞযব অঃযবহধবঁহ’ পত্রিকায় প্রথম ফোকলোর শব্দটা  ব্যবহার করেন। এক সময়ে ফোকলোর বলতে কেবল লোক সাহিত্যকে বোঝান হতো। তবে এই ভাবনার পরিবর্তন ঘটে বিশেষ করে ড. মযহারুল ইসলামের প্রাসাঙ্গিকতা থেকে। তার মতে, ‘ফোকলোর একটি মানবগোষ্ঠীর সৃষ্টি, যারা একই ভৌগোলিক পরিবেশে বাস করেন, যাদের জীবন ব্যবস্থা, ভাষা, জীবিকা, ঐতিহ্য একই সূত্রে সূত্রিত। ১২০১-১৮০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যকালিন সময়। এই সময়টা মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের সময়। এই সময়ে বাঙালিলোকে অংশগ্রহণমুলক জীবন কাব্য বিশেষ করে বৈষ্ণব-বাউল, শ্রী কৃষ্ণের নামকীর্তন, বৈষ্ণবীয় পদাবলী, সাহিত্যের অনুবাদ যুক্তিতা, মঙ্গলকাব্য, শক্তি পদাবলী, দো-ভাষী সাহিত্য, মসীয়া সাহিত্য প্রভৃতিতে খোঁজা হতো লোকজ উপাদান। বঙ্গাল জনপদে ‘বঙ্গ’ এর সাথে ‘আল’্ যুক্ত হয়ে বঙ্গাল বা বাঙাল-বঙালি-বাংলার উৎপত্তি। জন্ম ইতিহাসের সূত্র ধরে বাঙালি মানুষেরা প্রকৃতি ভাজন। প্রকৃতিকে আঁকড়েই বাঙালির জীবন। যখন প্রকৃতি তার রূপ বদল করে তখন আমাদের রূপ এবং মন বদলে মানষিকতার পরিবর্তন হয়। আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি তাই প্রকৃতির বারো মাসের বৈশিষ্ট্যে নিরূপিত। বিশেষ করে সনাতনী লোকাচার বার মাসে তের পার্বণের বিষয়টি তা স্মরণ করিয়ে দেয়।

জ্ঞানের  লুকায়িত  উৎসগুলোকে মুক্ত করে দিতে হয়। তা মানুষের শরীরের অংশে লুকিয়ে থাকে। চেষ্টায় ফিরে আসে প্রথমে প্রযুক্তিগত জ্ঞান, এরপর মিশ্রণ সম্মিলন ঘটিয়ে তৈরী হয় মানুষের দার্শনিক জ্ঞান। এই জ্ঞানের অবস্থান এবং অধিকার কেবল মানুষের। একজন মানুষের  সৃষ্টি, জীবন, বেঁচে থাকার প্রয়োজন যাই বলি না কেন এসবের জন্য যে আনুষাঙ্গিকতা  তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে তার চারপাশে। এই আনুষাঙ্গিক উপাদানই জ্ঞানালোক শক্তির উপাদান। এরপর সবে মিলে মানুষের হৃদয় কোনে জন্ম লাভ করে এক শক্তি, তা হলো বিশ্বাসশক্তি। এই শক্তির আবির্ভাব কখনও আসে ব্যাক্তি পর্যায় হতে, কখনও পরিবার হতে আবার কখনও তা আসে গোণ্ঠীগত ভাবে। এই বিশ্বাস আবার জন্ম নিতে পারে অবিশ্বাসের উপাদান হতেও। তখনই ঘটে সন্দেহ,মনোমালিন্যতা।

মূল পাণ্ডুলিপি কেন ?

 

 

 

পাণ্ডুলিপি কথাটা এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘মানু স্ক্রিপটাস’ হতে। এই পাণ্ডুলিপি বা পাণ্ডুলেখ্য’র অর্থ হলো, প্রথম লিখিত খসড়া কোনো কিছুর অপ্রকাশিত সংস্করণ যা প্রথম লিখিত হাতে লেখা কাগজ। লালন তাঁর দর্শন ও বাণী হৃদয়ের লোকায়িত চাহিদাকে খুব সহজ সরল ভাব দিয়ে, কথা এবং সুর জড়িয়ে মানুষের মাঝে হাজির করে গেছেন। যারা মনের চাহিদার অবশ্যম্ভাবি আকুতি যখন লালনের মুখে প্রকাশ্য পেয়েছে, যে জন্য সাঁইজীর মুখে তাদের কথার প্রতিফলন পেয়ে তারা লালনকে সাদরে গ্রহণও করেছেন। এখন লালন সাঁইজীর অনুপস্থিতি এবং মুখশ্রুত বাণীর মূল পাণ্ডুলেখ্য না থাকায় তার কথা এবং গানের শব্দ বিকৃতি করে উপস্থাপিত হতে হতে কথা ও গানের আদি কথা ও শব্দ হারিয়ে যেতে বসেছে। এগুলো যেমন রোধ করতে এবং সাঁইজীর কথা ও শব্দের যে ব্যবহার তা থেকে আঞ্চলিকতার সরূপ নির্ণয় করে, তাঁর জন্ম ও বসত ভিটার শেকড় সন্ধান করে মানুষের প্রকাশ্যে আনতে হবে। যেমন লালন গানে এখন প্রচলিত ‘‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’, জানা গেছে পান্ডুলেখ্য অনুযায়ী তা ছিল,‘ খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়।’ এমনি ভাবে ‘গুরুকার্য  মাথায় রেখে, কি করি রে কোথায় যাই, রাত পোহালে পাখি (হবে পেট্টি) বলে দেরে খাই দেরে খাই।’ এমন অনেক গানের শুদ্ধ শব্দ বেড়িয়ে আসবে।

লালনের গানগুলো আমাদের কাছে এসেছে তাঁর শিষ্যদের কাছ থেকে। আরও প্রমাণবদ্ধ হয়েছেন লালনের বন্ধু কুষ্টিয়ার কুমারখালীর সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের মাধ্যমে, এই হিতৈষী বন্ধু সমসময়ে লালনের অনেক গান তার গ্রামবার্তা পত্রিকায় প্রকাশ করে তা সংগ্রহে অনবদ্য ভূমিকা রেখে গেছেন। এ বিষয়ে আরও বলে গেছেন কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান,বিশিষ্ট আইনজীবি উকিল রাইচরণ দাস লালনকে দেখে, পাক্ষিক হিতকরী পত্রিকায় তাঁর চাক্ষুষ বর্ণনা লিখে। সাঁইজীর মুখশ্রূত বাণি ও দর্শন মতবাদ অন্যের লিখিত ও হৃদয়ে গ্রোথিত উপস্থাপিত হওয়ায় তাঁর গান ও মতবাদের ভান্ডার সম্পর্কে সংরক্ষণকারী ও তার সংখ্যা নিরূপনের বিষয়টি বেশ কষ্টসাধ্য। যে কারণে অনুমান,গুজবের ডালপালা ছড়িয়েছে অনেক দূর। এখনও তা বয়েই চলেছে। তবে শেষ কথা হলো তার সংখ্যা যাই থাক না কেন তার প্রচলিত বিষয়গুলোকে সংরক্ষণ করে লালনের সৃষ্টি সম্ভারকে নিয়ে সামনে এগোতে হবে। ছড়িয়ে দিতে হবে লালনের মানবতাবাদের মহান অসাম্প্রদায়িক ও মানবতার ব্রতকে।

 

দেশের প্রাচীন সুন্দর সৃষ্টি সাহিত্যের রত্ন ভান্ডার হলো সৃষ্টিশীল মানুষের স্বহস্তে লিখিত পাণ্ডুুলিপি বা পাণ্ডুলেখ্য। এক সময় যা সৃষ্টি হলেও অনেকের কাছ থেকে তা হয়তো হারিয়ে যায় বা বাধ্যগত হাত বদল হয় সময়ের পরিক্রমায়। নচেৎ নষ্ট হয়েছে। কিংবা চুরি হয়ে তা হাত বদল হয়েছে। সৃষ্টিত এসবের অনেক রত্ন কিছু কিছু বিভিন্ন কারণে সকলের প্রকাশ্যে এসেছে। আবার কিছু কিছু আসল সৃষ্টিকারকের বদলে নকলদের কব্জাবদ্ধ হয়েছে। কেবল হাত বদলের জন্য অন্য সংগ্রহকারী লেখক, গবেষকদের নামে প্রকাশ পেয়েছে। এতে এই অসাধু লেখক, গবেষকরা চুরি করে তা নির্লজ্জ প্রকাশ্যে এনে নিজ নামে তকমা লাগিয়ে হয়তো ভাবেন তারা হিরো বনে গেছেন।

মরমী সাধক লালন সাঁই ছিলেন এক জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষ, মানবতাবাদী মানুষ। তিনি ছিলেন মরমী কবি, আধ্যাত্মবাদী দার্শনিক, তিনি ছিলেন ঋদ্ধি সাধক, গীতিকার ও সুরকার। লালন সাঁই পান্ডিত্য ছড়িয়েছেন লোক-সাহিত্যের বাহালিপনা দিয়ে। তাঁর যত সৃষ্টি তার সবই মুখশ্রুত বাণীর। তিনি নিজে যখন যা বলতেন, তার শিষ্যগণ তা অন্তরে রপ্ত করে মুখে মুখে তা প্রচার করতেন। আবার তা কেউ কেউ লিখে রেখে সংরক্ষণ করতেন। লালনের দিব্যজ্ঞানে মুখশ্রুত হয়েছে সমাজের বিভেদ, অন্যায়-অনাচার, সাম্প্রদায়িকতার অভিশাপ, সবার চেয়ে মানুষ সত্য, মানুষের মাঝেই প্রভুর ঠিকানা, এমনসব অমিয় ও অমর বাণী। তিনি বলে গেছেন, মানব মুক্তির মহান মন্ত্র। প্রাচীন সময়ে আমাদের সমাজ ছিল ধর্মন্ধতা, কুসংস্কারের কুষ্ঠে,অন্যায় এবং অত্যাচারে নিমজ্জিত। সেই বেড়াজালকে ভেঙে মরমী লালন সাঁই কেবল শাস্ত্রিকতাকে বাদ দিয়ে সমাজের মানুষের মনে লৌকিক প্রথাকে জাগ্রত করতে কাজ করে গেছেন। তিনি সকল বিভেদকে বিনাশ করে এক পাটির উপর একতারায় সকলকে  মিলিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রূপায়িত করেছেন সব্বাইকে। জাত-পাত বিভেদ পরিত্যাজ্য,জ্ঞান-বিজ্ঞানের দর্শন প্রচার, কুসংস্কারকে তিনি ঘৃণা করেছেন। লৌকিক ধর্ম, লোক সঙ্গীতে জীবন মন্ত্রে আবগাহন করে গেছেন। তিনি লোকজ ঐতিহ্যের উপাদান দিয়ে লোক সাহিত্যের ধারাকে পুষ্টবান করে গেছেন। কোর-আন, পুরান, গীতা, বেদ, হাদিস এমন কি বাংলা, হিন্দি, উর্দু, ফার্সি, সংস্কৃতির মিলনে, ব্যাপক পরিমন্ডলে লৌকিক উপসর্গকে রূপায়িত করে গেছেন। সব প্রাণি যেমন এক আবার সব মানুষও এক ও অভিন্ন। শ্রী কৃষ্ণের সাথে লালনের কর্ম ভাবনার সখ্যতা পাওয়া যায়। মহামানব শ্রীকৃষ্ণ এই জগত সংসারের জনক। যার অমর বাণী মহিমান্বিত গীতায় ১৮টা অধ্যায়ে জীবন দর্শন বর্ণনা করে গেছেন। গীতার অনেক বাণী লালন দর্শনের উপজীব্য হয়েছে। বলা চলে কৃষ্ণ থেকে নিমাই বা গৌরাঙ্গ। দোল পূর্ণিমার দিনে নিমাই সন্ন্যাসীর জন্মদিন। আবার দোল পূর্ণিমা হলো রাধা-কৃষ্ণের দোল খাওয়ার দিন। যে দিন নবদ্বীপ হতে আবির্ভূত হলেন সন্ন্যাসী নিমাই। কৃষ্ণ থেকে নিমাই বা চৈতন্য দেব, মহির্ষিদের আকর্ষণে আবির্ভূত হলেন, পরে এলেন লালন সাঁইজী। এজন্য বলি লালনের গান জ্বলে, গানে মনের মধ্যে সুরের ঝঙ্কার সৃষ্টি করে, জীবনের উপলব্ধিকে লালিত করতে শক্তি ও ইচ্ছে যোগায়। লালনের গান হলো লৌকিক সনাতনীর মত মানুষের প্রকৃতি পাঠের উপজীব্য বহন করেছে চরম সত্য। সেভাবে লালন সাঁইজী এগিয়েছেন ধর্ম,বর্ণবাদের ছায়া পেরিয়ে প্রথমে বর্তমানবাদী, পরে গুরুবাদী, সার্বিকভাবে দেহতত্ত্ববাদে বিশ্বাসী এক মানুষ হিসেবে। সর্বপরি বলা যায়  লালন ছিলেন সাত্ত্বিক ও শুদ্ধ চিন্তার এক মহান সাধক।

মানুষের মধ্যে মানুষ বাস করে। সেই মানুষটা হলো আপন মানুষ। পরম পুরুষেরা মানুষের অন্তরে অধিষ্টিত হয়। তাকে খুঁজে নিতে সাধ্যকে সাধনে আনতে হয়। এজন্য দরকার ধ্যান ও জ্ঞানের আমোঘ টানের। তবে বাউলেরা বিশ্বাস করেন, এই আমোঘ টানে যেতে হলে মত এবং পথ খুঁজতে হবে গুরু ধরে। গুরুর নির্দেশিত পথে পরিক্রম করা গেলে পথের সন্ধানে যাওয়া যায়। বাউল মতে প্রাণির প্রতিটা দেহে বসে আছেন মহান দেবরাজ, যিনি গুরুর মহাগুরু রূপে।

বাউলদের সম্পদ বলতে, কেবল ঝাঁকড়া চুলের বাহার, চুড়ি-বালা,পুঁথির মালা, বিনা সেলাইয়ের আলখেল্লা,খড়ম,একতারা। বাউলেরা মানুষের কাছে যাবে,এক পাটিতে সবাই বসবে, একতারা বাজিয়ে মর্মস্পর্শী গান শোনাবে। জন্ম, কর্ম এবং জন্মান্তরের বাণী শোনাবে। যে বাণী লালনের হৃদয় নিসৃত ও মুখশ্রুত। এ বাণী মুক্তি এবং মানবতার বাণী। তাদের জন্য এই বাণী, যারা দিবা রাত্রি টাকার পরে টাকা, সম্পদের পরে সম্পদ, বাড়ির পরে বাড়ি, সোনার পরে সোনা খুঁজে ফেরেন তাদেরকে লোভ, ক্ষোভ এবং কু-পথ হতে  মানবতার সরল পথে ফেরানোর বাণী।

বাউলের দর্শনে আমাদের হৃদয় হলো বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সমান, যেন বিশাল সমুদ্রের মধ্যে ক্ষুদ্র ঝিনুকের মাঝে এতটুকু মুক্তোর সন্ধান পাওয়ার পূর্ণতা। অথচ সমুদ্রের নোনা জল ছাড়া কখনও মুক্তো আশা করা যায়না। ঐ জলেই তৈরী হয় মূল্যবান মুক্তো। মুক্তো খুঁজতে যেমন সমুদ্র প্রয়োজন আবার বিশ্ব ব্রহ্মান্ড খুঁজতে হৃদয় দরকার হয়। এটা মরমীর শাশ্বত বাণী। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে লালন সাঁইজীকে বরণ ও স্মরণ করতে আমরা বিশাল যে আয়োজন করি, বিশেষ করে জ্ঞানগর্ভ আলোচনার প্রান্তর খুলে। সেখানে ঋদ্ধবানেরা থাকলেও কখনও খুঁজে পাওয়া যায় না একতারা হাতে, আলখাল্লা পরা, খড়ম পায়ের কোন বাউলকে। আলোচনায় বাউল ছাড়া বাউলি উৎসব! যদি ফুল বিনে পুজো না হয়, তবে বাউল ছাড়া উৎসবের মর্ম উচ্চারিত বা হৃদঙ্গম হয় কিভাবে? বেদ অর্থ জ্ঞান। সাম বেদ হলো সংগীত বিষয়ক জ্ঞান। সাম বেদ ভারতবর্ষের তথা বাঙালির গান বটে। গানের ১০ টি ঠাট আছে। যা কিনা লালন সাঁইজী খুব ভালো বুঝতেন। ঠাটের বিন্যাস হৃদয়ে নিয়ে ভজন করা আবশ্যক। মনকে মনের মতো সাধনা না দিলে চেনা ধারাও অচেনা হয়ে যায়। লালনের কথায়,

‘আগে দৃশ্যমান মানুষ ভজ, পরে অদৃশ্য খোদারে খোঁজ।’

কিংবা

‘সময় থাকতে বাঁধাল বাঁধলি না \

জল শুকাবে মীন পালাবে

পস্তাবি-রে  ভাই মনা \”

পান্ডুলেখ্য এবং লালন-রবীন্দ্রনাথ

 

লালন সাঁইজী শিক্ষিত বিশ্ব পরিমণ্ডলে প্রথম উপস্থিত হন ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে। সেটা সম্ভব করেছিলেন স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিগুরু এ সময়ে বাউলসম্রাট ও তাঁর সৃষ্টি সম্ভার মনোলোকের গানগুলো পরিচয়ে আনেন এই বোদ্ধা জনদের কাছে। লালন সাঁইয়ের মুখশ্রুত বাণীকে পাণ্ডুলিপিতে আবদ্ধ করা শুরু হয় ১২৯৯ বঙ্গাব্দের ৯ কার্তিক হতে। যা শেষ হয় ১৩১২ বঙ্গাব্দে এসে। সাঁইজীর শিষ্য শীতল শাহ, ভোলাই শাহ, অধ্যাপক মনিরুদ্দীন শাহ,দয়াল শাহ,কদু শাহ,ভঙ্গুরী শাহ তাঁর মুখশ্রুত বাণী লিপিবদ্ধ করতে সাহায্য করে গেছেন। এক সময়ে কুষ্টিয়ার মুন্সেফ মতিলাল দাস আখড়া বাড়ি হতে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে লালনের মুখবাণীর লিখিত ৩৭১টি গানের পাণ্ডুুলিপির একটি খাতা সংগ্রহ করেন। তিনি তা কলকাতায় নিয়ে যান এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে তা প্রকাশিত হয়। লালনের বাণীশ্রূত পাণ্ডুলিপি সংগ্রাহকদের তালিকায় আরো যাদের নাম জানা যায় উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য,বসন্ত কুমার পাল, শামছুর রহমান, ফরিদপুরের আজগর হোসেন প্রমুখ। এভাবেই কোনো না কোনো হাত বদলের পালায় তার শেষ আশ্রয় হয়ে পরে কবি গুরুর হাতে। প্রসঙ্গক্রমে দুটো পাণ্ডুলিপি জমা পরে কলকাতার ঠাকুর বাড়ীতে। গত ৫ মার্চ-২০২৩ খ্রিস্টাব্দে মহামতি লালনের স্মরণোৎসবের দ্বিতীয় দিনে ভারতের পশ্চিমবাংলার বাউল গবেষক, শিক্ষাবিদ শক্তিনাথ ঝাঁ ঐ দুটি পাণ্ডুলিপির ছায়া বা ফটোকপি কুষ্টিয়ার এ সময়ের জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মোঃ সাইদুল ইসলামের হাতে হস্তান্তর করতে দেখেছি। মহামতি লালনের পাণ্ডুলিপি ছড়িয়ে যাওয়া এবং তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে রক্ষিত থাকার মৌলিক বিষয় নিয়ে ঐ সময় বাংলাদেশের জনপ্রিয় টেলিভিশন ‘যমুনা টিভি’র কুষ্টিয়া প্রতিনিধি রুহুল আমিন বাবু আমার এবং শক্তিনাথ ঝাঁ মহোদয়ের একটি স্বাক্ষাৎকার প্রচার করেন। প্রসঙ্গ বলছে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩২২ বঙ্গাব্দে, প্রবাসী পত্রিকার আশ্বিন হতে মাঘ সংখ্যার ‘হারমনিয়াম’ বিভাগে পাণ্ডুলিপি হতে ৮টি এবং লোক মারফত হতে সংগ্রহ ১২টি সমেৎ মোট ২০টি গান প্রকাশ করেন এবং লালন সাঁইকে এভাবে বিশ্ব দরবারে এনে হাজির করেন। এরপর কবিগুরু বিভিন্ন রচনা এবং বক্তৃতায় সাঁইজীকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে বিভিন্ন ভাবে উপস্থাপন করেন। অনেকের অভিমত শিলাইদহে কবিগুরু এবং মহামতি লালনের সাক্ষাৎ ঘটেছিল। কবিগুরু এই সময়ে লালনের দর্শন ও গান সংগ্রহ করেন বিভিন্ন বাউল সাধকদের মুখশ্রূতির মাধ্যমে। পাণ্ডুলিপি হস্তগত হওয়ার বেশ আগেই কবিগুরু শিলাইদহ ত্যাগ করেন বলে জানা যায়। তবে লালনের গানের অসংখ্য পাণ্ডুলিপির যে কয়টি কলকাতাতে কবিগুরুর কাছে ছিল আসলে এই কয়টি সংগ্রহই সাঁইজীর গানের পাণ্ডুলিপির আনুষ্ঠানিক এবং সুচারু সংগ্রহ।

মনোলোক বিশ্বাসের স্থানে আশ্রয় পাওয়ার পর, রবীন্দ্রনাথ নিজের কাছে বিশ্বাস অর্জনে লালন সাঁইজীকে অনেকে অনুসন্ধান করে গেছেন।

 

 

উৎসুক গবেষকেরা লালনের দর্শনের সাথে সমাজের প্রচলিত ধারার বিভিন্ন বিষয় হাতরিয়ে বেড়িয়েছেন। তাদের মধ্যে ড. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, ড. মতিলাল দাস, প্রফেসর মুহম্মদ মুনসুর উদ্দিন, ড. এস এম লুৎফর রহমান, প্রফেসর আবু তালিব, শাহ্ লতিফ আফি আনহু, ড. আনোয়ারুল করীম, ইতিহাসবিদ লেখক শ ম শওকত আলী, ড. আবুল আহসান চৌধুরী, ম মনিরুজ্জামান, সাম্প্রতিক সময়ে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের সাবেক অধ্যাপক উপাধ্যক্ষ জনাব আহসানুল কবির এবং কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর শিশির কুমার রায় প্রমুখ গবেষকগণ সাঁইজীর জীবন সাধনার নিবিড় অনুসন্ধানী তথ্য সকলের সামনে হাজির করে  চলেছেন সময়ের ধাপে ধাপে। লালন সঙ্গীতের সুর সাধনায় প্রচার ও প্রসারে অন্য যে দু’জন সার্থক অবদান রেখেছেন তারা হলেন ওস্তাদ মকছেদ আলী শাহ এবং লালন সম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীন।

লালন সাঁইজী সম্পর্কে ভাববার আগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরেক জন বাউল সাধকের সৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি শিলাইদহের ডাক হরকরা গগন চন্দ্র দাম। কবিগুরু তাঁর সৃষ্টিত বোধের জায়গা থেকে লালন, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন এবং গগণকে জাগ্রত করেছিলেন তাদের পূণ্যবান অবদানের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের কারণে। এছাড়া আরো অনেকে তাদের উপাস্য স্বীকৃতি পেয়েছিলেন কবিগুরুর বদৌলতে।

রবীন্দ্র সময়ের আগে লালন সাঁইজী সম্পর্কে যে গবেষণা হয়েছে তারমধ্যে তাঁরা উৎসুক অনুসন্ধান করেছেন কেবল সাঁইজীর ধর্ম, জাতপাত নিয়ে। বিষয়গুলো নিয়ে একে অপরের সাথে ছিলেন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে। সাঁইজীর জন্ম স্থান নিয়ে ছিলেন বিভক্তিতে। এমন কি তাঁকে নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের সহানুভূতি আর প্রশ্রয় পেতে মুসলমান হিসেবে তক্মা  লাগিয়ে উপস্থাপন করে গেছেন কোন কোন লেখক গবেষণালদ্ধ কোনো প্রমাণক ছাড়াই।

বিশ্বকবির লালন সাঁই এর গান সংগ্রহের শুরুটা ছিল সাঁইজীর মূখ থেকে গান শুনে শুনে। সাঁইজী মারা গেলে অন্য হাতে লিখিত তার গানের পাণ্ডুলিপি বিভিন্ন জনের হাতে বিভক্ত হয়ে যায়। লালনের শিষ্য মহিন শাহের কথায়, বিশেষ করে সাঁইজীর শিষ্য মনিরুদ্দিন শাহ ও ভোলাই শাহ এর কাছে থাকা এই পাণ্ডুলিপিগুলো ছড়িয়েছে বেশি। ঔপনিবেশিক শাসন-শোষনের কারণে বাঙালির ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি সার্বজনীনের পরিবর্তে পরিবর্তিত রুপ নিয়ে                ধাবিত হতে থাকে। সামাজিক স্তরগুলো ছিল হিন্দু ধর্মের ধনী এবং দরিদ্র শ্রেণীতে বিভক্ত। অভিজাত মানুষের কাছে বিভিন্ন কারণ-অকারণ কাঠামোতে বাধা ছিলো নিচু বা দরিদ্র শ্রেণীর মানুষেরা। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল জাত-পাতের অনাচার আর কুসংস্কার কর্মকান্ড। সারলৌকিক নিয়মের চেয়ে গোষ্ঠীগত, আবার চাপিয়ে দেওয়া  আচার অনুষ্ঠানের রীতিনীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হতো তাদের অনেকে। এই সামাজিক এবং ধর্মীয় দহন জ্বালার বেড়াজালকে ভেঙে আবদ্ধ মানুষকে জীবন এবং ইহকালের ও পরকালের চিন্তা ভাবনায় শক্তিবান করতে লালন এবং গগণের মোহমন্ত্র এবং সন্ন্যাস, বৈষ্ণব চিন্তা, মুর্শিদি ভাবনা, সহজীয়া ভাবধারা, সুফীবাদ যাঁতাকলের যন্ত্রণা থেকে মানুষকে রেহাই দিয়েছিল। যদিও এ সকল ভাবনায় মৌলত্ব জুগিয়েছিল প্রথমে কৃষ্ণ সৃষ্টিমিত ধারা, পরে চৈতন্য উদয় এর পরে যুক্ত হয় লালনের বাউল মতবাদ।

সংস্কারবাদী লালনকে নিয়ে বিতর্কবাদী গবেষকেরা এ দেশের শাসন-শোষণ, ধর্ম, ইতিহাস বলয়ে বিতর্ক সঙ্গবাদী। ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ জীবিত সময়কাল ১১৬ বছর। তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে যেমন জন্মেছিলেন, ঐ সময়েই তিনি মৃত্যুবরণও করেছেন। তার আগে বাঙালি সমাজে মিশ্রণ ঘটেছে বিকৃত সংস্কৃতির বিধৌত সঙ্গ। এর ফলে সমাজ, রাষ্ট্র কলুষিত হয়েছে জাত-পাত, ধর্মের নোংরামিতে। লালনকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রাসঙ্গিকতা তখনও গতিময় বিশ্লেষণ শুরু হয় নাই। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত ভাগ হলো দ্বি-জাতির তক্মায়। মানুষ দুটি ধারায় বিভাজিত হলো রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায়। হিন্দু এবং মুসলিম। এর ফলে ধর্মীয় ধারায় বিভক্ত হলো জনগণ, শিল্প-সাহিত্য,কবি-গায়ক, মাঠ-ঘাট, পশু-পাখি এমন কি জল-পানি. আলো-বাতাসও। যা হওয়া উচিৎ ছিল কেবল ভাষাগত বিভক্তিতে। জন্মে এবং ধর্মে সমন্বয়বাদী মানুষ লালন নিজে নিজের জন্মসূত্রে প্রাপ্য ধর্মের অংশগতকে প্রত্যাখ্যান করলেও পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী তাদের তত্ত্বের বিষাক্ত বায়ুর নৈঋতায় ঘিরে ধরতে লেলিয়ে দিলেন বিকৃত মানসিক লেখক, গবেষকদেরকে। লালনের জন্মগত স্থানের দ্বন্দ্ব, ধর্মের দ্বন্দ্ব, জাত-কুলের দ্বন্দ্ব, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে দ্বন্দ্ব, উগ্র ধর্মান্ধদের সাথে বাউল ধারাণাদের দ্বন্দ্ব। এসব করতে গিয়ে লেখকেরা তাদের জ্ঞানের দৈন্যতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন বিভক্তি দিয়ে। নিজেদেরকে এক আবদ্ধ খোঁয়াড়ের বন্দিদশায় বাসস্থানের স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ। লালন গবেষক (!) মুহম্মদ আবু তালিব তার রচিত ‘লালন পরিচিত’ বইটিতে লালন সাঁইজীর ধর্মীয় আবরণে মুসলিম এবং জন্মস্থানের সনদে ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হরিশপুরের খুনকার বংশটি লাগিয়ে দেন। লালন সাঁইজী কোনো ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন না। এসব বিষয়ে তিনি ছিলেন কৌশলী ও আড়ালি। তবে তার এমন কারণে মন ছিল সবসময়ই উদার এবং সারলিক। মুসলমানদের সাথে লালনের আহার ও ব্যবহার থাকায় অনেকে তাকে মুসলমান মনে করতেন। বৈষ্ণব ধর্মের মত পোষণ করতেন বলে অনেক হিন্দুরা তাকে বৈষ্ণব বলে মনে করতেন। তিনি আর যা হোন না কেন ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে হিতকরী সম্পাদকীয় এবং এর পর ম মনিরুজ্জামানসহ অন্যান্য গবেষক এ বিষয়ে একমত যে মহামতি লালনের জন্ম কুমারখালীর চাপড়ার ভাড়ারা গ্রামে এবং তিনি হিন্দু কায়স্থের ঘরে জন্মেছিলেন। এরপর এদেশের কিছু লেখক, গবেষক কোন তথ্যের গভীরে তলিয়ে না দেখে সস্তা বাহবার প্রত্যাশায় কবিগুরুর কাছে পাণ্ডুলিপি এবং সাঁইজীকে নিয়ে অহেতুক তথ্য এবং প্রকারান্তে কটুক্তি করে গেছেন। আর যা হোক লালন সমাজহারা হয়েছিলেন ঠিকই, তবে তিনি নতুন ধারায় মহান এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

১২৯৭ বঙ্গাব্দ। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ‘হিতকরী’ পত্রিকায় একটি সম্পাদকীয় লেখেন কুষ্টিয়ার মহর্ষি উকিল রাইচরণ দাসমহাশয়। তিনি তাঁর লেখায় বর্ণনা করে গেছেন যে, তিনি মহামতি লালনকে স্ব চোখে দেখেছিলেন এবং তার দর্শন ও আলাপচারিতায় রাইচরণ দাস বড়ই প্রীত লাভ করেছিলেন। লালন প্রচলিত ধারার লেখাপড়া জানতেন না। তবে স্বশিক্ষায় তার পাণ্ডিত্যর জুড়ি মেলে না। লেখকের কথায়, রাতে অসংখ্য গান শুনিয়া তার মনে হলো  লালন অতিশয় পণ্ডিত।

বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারার মাঝে দুটো বিষয় ঘুরে ফিরে  আসে। তা হলো আমাদের সমাজে গুজব এবং গজব দুটো ষিষয় ব্যাপক প্রচরিত এবং প্রসারিত। এতসবের মধ্যে কুষ্টিয়ার জন্য সমাদৃত খবর হলো, এই মাটি সাহিত্য সংস্কৃতির প্রদীপ সল্তের আলোয় আলোকিত। সে আলোয় আলোর ছড়া ছড়িয়েছেন, বিশ্ববরেণ্য কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মরমী সাধক মহাত্মা লালন সাঁই। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার নন্দনপুরুষ কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন, নিক্তি নিরপেক্ষ বিচারপতি ড. রাধা বিনোদ পালসহ  আরো অনেক শ্রেষ্ঠদর্শী  মননশীল ঋদ্ধজন।

এই সকল ঋদ্ধ পুরুষেরা তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে জাতি ও সমাজকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন অনেক দূর। তবে স্বভাবের গুজব আর গজবের কোপানল তাদেরকেও পিছ ছাড়েনি। সে বিবেচনায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ধর্মীয় ব্যাকরণে, রাজনৈতিক কারণে এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার রসায়নে জড়িয়ে হালে অপরিপক্ক লালন গবেষকদের তথাকথিত দু’চার জন সাঁইজীর পাণ্ডুলিপি হাতড়িয়ে নেবার তক্মা জড়িয়ে দিতে কুন্ঠিত হন নি কেবল সহজ বাহবা পাওয়ার আশায়। বাস্তব কথা হলো বহু হাতে ছড়িয়ে যাওয়া লালনের পাণ্ডুলিপিগুলোকে একত্রিত করে নিজের কাছে সংরক্ষণ রেখে তারমধ্যে কিছু মরমী সাধনার গানক তৎসময়ে পত্রিকায় প্রকাশ করে প্রকারান্তে লালনকে সাহিত্য ও সুধী সমাজের সামনে উপস্থাপন করে দিয়েছিলেন কবিগুরু।

 

 

গৌতম কুমার রায় : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

মুসলিম সম্পাদিত ও প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র : শিখা

ইসরাইল খান ভূমিকা: উনিশ শতকের রেনেসাঁস হিন্দুসমাজেই বদ্ধ ছিল। ওর মর্মবাণী সমাজঅভ্যন্তরে প্রবাহিত করেছিলো যেসকল সাময়িকপত্র তা ছিল হিন্দুসমাজপতিগণের। মুসলিম- পত্রপত্রিকার উদাহরণ কেবলই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। উল্লেখ

নাটোরের সাহিত্য সম্মেলনে রত্নগর্ভা হাজেরা খাতুন পদক ২০২৫ প্রদান ও গুণীজন সংবর্ধনা

\ আন্দরকিল্লা ডেক্স \ নাটোর ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার হাজেরা ফাউন্ডেশন সাহিত্য সম্মেলন শুভ উদ্বোধন করেন। সম্মেলনে প্রতি

আন্দরকিল্লা’র উদ্যোগে তিন কবির জন্মদিন উদযাপন

মন ও প্রাণের অনাবিল আনন্দ আমেজে শীতার্ত সন্ধ্যেয় হৃদয়ের উষ্ণতায় উচ্ছল উচ্ছ্বাসে আন্দরকিল্লার ২৮ বছর পদার্পণ, ইংরেজি নববর্ষ ২০২৬, এবং তিন কবির জন্মদিন উদযাপন অনুষ্ঠিত

প্রজেক্ট ক্লাউড হাউস

রোখসানা ইয়াসমিন মণি ডা. অভ্র সেনগুপ্ত, একজন প্রথিতযশা জ্যোতির্বিজ্ঞানী। ল্যাবের কাঁচের দেওয়ালের ওপারে ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। আজ সকালটা মেঘাচ্ছন্ন, ঠিক তার মনের মতো।