এখন সময়:রাত ৪:৩২- আজ: বৃহস্পতিবার-১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

এখন সময়:রাত ৪:৩২- আজ: বৃহস্পতিবার
১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

হাইমে সাবিনেস, তাঁর সৈনিক পিতার মৃত্যু ও একটি মর্মস্পর্শী দীর্ঘ কবিতার ইতিবৃত্ত

আলম খোরশেদ

 

মেহিকো তথা গোটা লাতিন আমেরিকার অন্যতম প্রধান, বহুলপঠিত ও জননন্দিত কবি হাইমে সাবিনেস (১৯২৬-১৯৯৯)। তাঁর কলম থেকেই একদা উৎসারিত হয়েছিল সমগ্র স্প্যানিশ সাহিত্যের সম্ভবত দীর্ঘতম একক কবিতাটি, যার শিরোনাম Algo Sobre la Muerte del Mayor Sabines বা বাংলাতে আমার অনুবাদে মেজর সাবিনেসের মৃত্যুবিষয়ে একটা-কিছু। এখানে মেজর সাবিনেস হচ্ছেন কবি হাইমে সাবিনেসের পিতা, যাঁর বেদনাবহুল মৃত্যুকে ঘিরেই রচিত হয়েছির সাবিনেসের এই হৃদয়নিংড়ানো মহাকাব্যিক কবিতাটি। কবিতার শিরোনামে ব্যবহৃত মেজর অভিধাটি সম্ভবত দুই অর্থেই ব্যবহার করেছিলেন তিনি: প্রথমত আক্ষরিকভাবে পরিবারের জ্যেষ্ঠ সাবিনেস তথা তাঁর জন্মদাতা অর্থে এবং দ্বিতীয়ত তাঁর পিতার সামরিক পরিচয়টুকু প্রকাশের লক্ষ্যে। কেননা তাঁর পিতা হুলিও সাবিনেস মেহিকোর সশস্ত্র বিপ্লবে সরাসরি, সামরিকভাবেই অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং একপর্যায়ে তাঁর সহযোদ্ধাদের কাছে মেজর সাবিনেস হিসাবেই আদৃত ছিলেন। সাবিনেসের জীবনে তাঁর পিতার বিপুল প্রভাবের কথা তিনি নিজেই লিখে গেছেন বিভিন্ন আত্মজৈবনিক রচনায়, বিশেষ করে তাঁর পাঠাভ্যাস ও শিল্পরুচি গড়ে তোলার পেছনে মেজর সাবিনেসের প্রত্যক্ষ ভূমিকার জন্য ঋণস্বীকার ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কখনও কার্পণ্য করেননি তিনি।

১৯৬১ সালের মাঝামাঝি নাগাদ তাঁর এমন প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় পিতার শরীরে আচমকা ক্যান্সার ধরা পড়লে তিনি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েন; ক্রমে গভীর বেদনা ও বিষণ্নতায় ডুবে যান। তাঁর সেই অসহনীয় মানসিক অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই তিনি একসময় এই কবিতাটি লিখতে শুরু করেন। এবং একপ্রকার ঘোরের মধ্যে তিনি তা লিখে যেতে থাকেন, যেনবা তাঁর কবিতার এই বুকফাটা হাহাকার আর আহাজারির শক্তিতেই তিনি তাঁর প্রাণপ্রিয় পিতার মৃত্যুকে ঠেকিয়ে দেবেন। কিন্তু তা তো আর হবার নয়। অতঃপর কবিতা হেরে যায় কর্কটরোগের কাছে; মেহিকো বিপ্লবের বীরসেনানী, শিল্প ও সাহিত্যের একনিষ্ঠ অনুরাগী মেজর সাবিনেস তাঁর রক্তাক্ত ফুসফুস ভরে শেষবারের মতো শ্বাস নিতে সক্ষম হন অক্টোবরের ৩০ তারিখ। তারপর সব অন্ধকার আর শূন্যতা। আর সেই সীমাহীন শূন্যতায় সমাহিতের মতো সাবিনেস, বাবাকে নিয়ে শুরু করা সেই কবিতাটির কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করেন। ঘোরগ্রস্তের মতো লিখে চলেন পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তি। অটোমেটিক রাইটিং বলে যদি কিছু থেকে থাকে তবে এই কবিতাটিই হতে পারে তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এতে তিনি কবিতার কোনো নিয়মকানুন, রীতিপ্রথা, ভাষা ও ব্যাকরণ, কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করেন না; শব্দ কিংবা ছন্দ নিয়ে কোনোপ্রকার সংস্কার কিংবা ছুৎমার্গ তাঁর কাছে প্রশ্রয় পায় না, তিনি অপ্রতিরোধ্য এক শক্তিশালী ও স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে লিখে শেষ করেন তাঁর এই মহাকাব্যিক রচনাটি। সতেরোটি স্তবকে রচিত কবিতাটির মোট পঙ্ক্তিসংখ্যা তখন ৩৪৯। ততদিনে ডিসেম্বর মাস সমাগত এবং এর মাঝখানে, ২৭শে নভেম্বরে ছিল তাঁর পিতার জন্মদিন, যার সংরক্ত উল্লেখ আমরা দেখতে পাব কবিতাটির ষোলোতম স্তবকে।

সাবিনেস ভেবেছিলেন এর মাধ্যমে তাঁর একধরনের ক্যাথারসিস তথা আবেগ ও শোকের মোক্ষণ ঘটবে, তিনি ফিরে যাবেন তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তিনি যত চেষ্টাই করুন না কেন, পিতার মৃত্যুর কথা তিনি ভুলতেই পারছেন না। তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করেও সেই নাছোড় মৃত্যুভাবনা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারছেন না। যতই তিনি অপরাপর বিষয়ে লিখতে চেষ্টা করেন ততই যেন মৃত্যু এসে ভর করে তাঁর কলমের ডগায় এবং সেইসব কবিতা তাঁর ঠিক মনঃপুতও হয় না। এইভাবে তিনতিনটি বছর কেটে যায়, তিনি সৃজনশীল কিছুই প্রায় লিখতে সক্ষম হন না। এরকম সময় তাঁর এক চিত্রকর বন্ধু আলবের্তো হিরোনেইয়া তাঁকে পরামর্শ দেন পিতার মৃত্যুকে জোর করে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা না করে আরও বেশি করে তার মুখোমুখি হতে। এবং তিনি তাঁকে স্প্যানিশ সাহিত্যের স্বর্ণযুগে রচিত মৃত্যুবিষয়ক একটি ক্লাসিক গ্রন্থ উপহার দেন এবং সেটি পাঠে উৎসাহিত করেন। এর কিছুদিন পর সাবিনেস তাঁর সত্তার ভেতরে স্মৃতি, শোক, শ্রদ্ধা ও ভালবাসার তুমুল তোলপাড় টের পান এবং আবারও লেখনী নিয়ে বসেন আরও একবার তাঁর পিতার মৃত্যুর মুখোমুখি হবেন বলে। এই যাত্রায় তিনি একটানা পাঁচটি স্তবকে বিন্যস্ত আরও একশত তেইশটি পঙ্ক্তি রচনা করেন এবং তাঁর এই ব্যক্তিগত, বেদনামথিত মহাকাব্যের ইতি টানেন। সবমিলিয়ে চারশত বাহাত্তর পঙ্ক্তির এই বিশাল, ব্যক্তিগত শোকগাথার নাম দেন তিনি সামথিং এবাউট দ্য ডেথ অভ মেজর সাবিনেস বা মেজর সাবিনেসের মৃত্যুবিষয়ে একটা-কিছু, কেননা তিনি এটিকে কবিতার চেয়েও অনেক বেশি তাঁর ব্যক্তিগত শোকমোচনের শব্দপ্রয়াস হিসাবেই দেখছিলেন, তাই এ-রচনার এক জায়গায় স্পষ্ট করে উল্লেখও করেছিলেন যে, ”এগুলোকে কেউ কবিতা বললে ঈশ্বরের অভিশাপ লাগবে।”

১৯৭৩ সালে এই কবিতাটি প্রথমবারের মতো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় Algo Sobre la Muerte del Mayor Sabines এই শিরোনামেই। এখানে কবিতাটি সম্পর্কে পাঠকদের কিছুটা ধারণা দেওয়ার জন্য আমার করা বঙ্গানুবাদে, প্রথম পর্বের প্রথম স্তবকটি, দ্বিতীয় পর্বের পঞ্চম তথা শেষ স্তবকখানি এবং মাঝখান থেকে একটি সনেটজাতীয় রচনা উদ্ধৃত হল, এই বিবেচনায় যে, সাবিনেস তাঁর গোটা কবিজীবনে যে সাতটিমাত্র সনেট রচনা করেছিলেন তার পাঁচটিই রচিত হয়েছিল এই কবিতার জন্য। আগ্রহী পাঠকেরা পূর্ণাঙ্গ কবিতাটি মূল স্প্যানিশে কিংবা ইংরেজি অনুবাদে আন্তর্জালের অবারিত পরিসরে সহজেই পড়ে নিতে পারেন। হাইমে সাবিনেসের এই অমর কবিতাখানি অদ্যাবদি বিশ্বজুড়ে নানাভাষায় পঠিত, প্রশংসিত, অনূদিত, শ্রুত ও আলোচিত হয়ে চলেছে। এর বাংলা অনুবাদটি পাওয়া যাবে লেখকের নৈঃশব্দ্যের নামগান: লাতিন আমেরিকার কবিতা শীর্ষক গ্রন্থে।

মেজর সাবিনেসের মৃত্যুবিষয়ে কিছু-একটা

প্রথম পর্ব

১.

আমাকে জিরাতে দাও,

হৃৎপিণ্ডের পেশীগুলো শিথিল করে

আমার আত্মাকে তন্দ্রাচ্ছন্ন হতে দাও,

যেন আমি কথা বলতে পারি,

যেন আমি সেই দিনগুলোকে মনে করতে পারি,

 

জীবনের দীর্ঘতম দিনগুলো।

আমরা বেদনা কাটিয়ে উঠছি কেবল,

ফলত দুর্বল ও নড়বড়ে,

রাতের কাঁচা ঘুম থেকে দুতিনবার করে জেগে উঠে

দেখতে গিয়েছি আপনার নিঃশ্বাস পড়ছে কিনা।

লোকজন আর আওয়াজে ভরা এই দুঃস্বপ্নের মাঝে

আমাদের জেগে উঠতে হয়, আরও বেশি জাগ্রত থাকার জন্য।

 

আপনি সেই অজেয় কাণ্ড, আমরা যার শাখা প্রশাখা,

কুঠারের আঘাত বুঝি সেকারণেই এমন নাড়িয়ে দিয়েছে আমাদের।

আপনার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে আমরা

মৃত্যু ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারি না,

আপনাকে তো শক্তি আর আনন্দের মূর্তি ছাড়া আর কোনো রূপে দেখিনি আমরা।

আমরা জানি না কেন আচমকা একটি

আতঙ্কের ঘণ্টা বিরামহীন বেজে চলেছে,

ঈশ্বরের মুখ থেকে খসে যাওয়া একটি তলোয়ার

ধীরে, খুব ধীরে পড়ছে তো পড়ছেই।

আর এই তো আমরা, ভয়ে কম্পমান,

আমাদের চেপে-রাখা কান্নায় দম বন্ধ হয়ে আসছে,

ভয় আমাদের গলা চেপে ধরেছে।

আমরা হাঁটতে শুরু করি, এবং কখনোই তা বন্ধ করি না,

মধ্যরাতের পর সেই নিঃশব্দ ক্লিনিকের বারান্দায়

পায়চারি করতে থাকি,

যেখানে একজন নার্স বসে থাকে, ডাকের অপেক্ষায় কোনো দেবদূতী যেন।

আপনার মৃত্যুর অপেক্ষার অর্থ নিজেও ধীরে মৃত্যুতে পতিত হওয়া,

মৃত্যুর নল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায়

বিন্দু বিন্দু করে মরে যাওয়া।

 

আপনার অনিদ্রার মুহূর্তগুলো ছাড়া ঘণ্টা কখনও এতটা দীর্ঘ ছিল না,

আপনার গোঙানিতে পূর্ণ টানেলের চেয়ে

আর কোনো টানেল আতঙ্ক ও অবমাননায় এতটা পুরু ছিল না,

আপনার গোবেচারা, ক্ষতবিক্ষত শরীর।

 

১৩.

মহাশয়, পিতা ও ভ্রাতা, দয়া করে শুনুন,

বন্ধু হে আমার, আত্মার সখা কোমল ও শক্তিধর,

হে বৃদ্ধ, আপনার বিধ্বস্ত দেহকে পুনরুজ্জীবিত করুন;

ফিরিয়ে আনুন মৃত্যুগুহা থেকে আপনার কায়া তরুবর।

 

নদীর মতো শক্তিমান, আপনার হৃদয়কে জাগান

আপনার ভুরু নিরুদ্বিগ্ন, আমি প্রেমে পড়েছিলাম যা দেখে,

আপনার বাহুমূল, ঠান্ডায় দাঁড়ানো বৃক্ষের মতন সটান,

আপনার সম্পূর্ণ দেহকে ফিরিয়ে আনুন মৃত্যুগুহা থেকে।

 

আমি ভালবাসি আপনার রুপালি চুল, সরু চিবুক,

আপনার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মুখ, আপনার খোলা চাহনি,

সুগঠিত, সুনিশ্চিত, আপনার প্রশস্ত বুক।

 

আমি করাঘাতে ভেঙ্গে ফেলব দরজা আপনার,

মনে হচ্ছে, বুঝি আমি নিজেই মারা যাচ্ছি,

জাগুন, দয়া করে জেগে উঠুন, পিতা আমার।

 

 

 

দ্বিতীয় পর্ব

৫.

আমার মা একা, তাঁর বার্ধক্যে অবনত,

ব্যথা কিংবা করুণা কোনোটাই অনুভব করছেন না,

আপনার জীবন ও মৃত্যু উভয়ে আহত।

 

এই-ই আপনি পেছনে রেখে গেছেন। তাঁর সুউচ্চ আবেগ,

তাঁর অব্যাহত আগ্রহ, তাঁর স্নিগ্ধ নিষ্ঠা।

কাঠের স্তূপের পাশে দাঁড়ানো ফলগাছ,

তার নতজানু স্বপ্ন আপনাকে জাগাতে চায়।

এই-ই আপনি পেছনে রেখে গেছেন। যা আপনি চাননি তবু রেখে গেছেন।

 

বাতাস বয়ে গেছে। অরক্ষিত কূপ, ও বিনষ্ট মূল

এই সবই কেবল বাকি রয়েছে এ-বাড়ির।

আর কাঁদার কোনো অর্থ নেই। কেউ যদি

ঈশ্বরের দেওয়ালে আঘাত করে, অথবা

মাথার চুল টেনে তোলে,

অথবা জামা ছিঁড়ে ফেলে

কেউ শুনবে না, কেউ দেখবে না।

কেউই, কিছুই আর ফিরে আসে না।

জীবনের সোনালি ধুলোরাশি ফেরে না কখনও।

 

আলম খোরশেদ, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও গবেষক

বাঙালির ভাষার অধিকার হরণ- রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক মৃত্যু

হোসাইন আনোয়ার আজ থেকে ৭৯ বছর আগের কথা। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ভারতবর্ষের সর্বশেষ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যটেন তার রোয়েদাদ ঘোষণা করেন, এই ঘোষণার পর

‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’ জননী রঞ্জিতা বড়ুয়াকে নিবেদিত সন্তান সত্যজিৎ বড়ুয়ার ‘সুরাঞ্জলি’

মা সুগৃহিনী শ্রমতী রঞ্জিতা বড়ুয়ার ৮৩ তম জন্মদিনকে উপলক্ষ করে ৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে গানে গানে সুরের

আন্দরকিল্লা’য় সুকুমার স্মরণ সন্ধ্যা

বিপুল বড়ুয়া   সুকুমার বড়ুয়া আমাদের ছড়াসাহিত্যের একজন প্রবাদপ্রতীম পুরুষ। নানা আঙ্গিক, বিষয়বস্তু, ধরণ-ধারণে, বৈচিত্রে অনুধ্যানে তিনি অসংখ্য ছড়া লিখে আমাদের ছড়া অঙ্গনে বহুমাত্রিকভাবে খ্যাত

জলে জঙ্গলে (পর্ব তিন)

মাসুদ আনোয়ার একে একে মুসল্লিরা বেরিয়ে আসছে মসজিদ থেকে। আমি দাঁড়িয়ে আছি স্থানুর মতো। প্রত্যেক মুসল্লির মুখের দিকে তীক্ষ্ম নজর বুলাচ্ছি। কাপ্তাই বড় মসজিদের ইমাম