এখন সময়:সকাল ৭:২৬- আজ: শনিবার-৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৪শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

এখন সময়:সকাল ৭:২৬- আজ: শনিবার
৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৪শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

পিস্তল খান

মুস্তফা কামাল আখতার :

গনগনে কয়লার মটকা থেকে তান্দুরি রুটি নামাতে ব্যস্ত পিস্তল খান। বামহাতে লম্বা খুন্তি, ডানহাতে ভারি লোহার চোখালো শিকে গেঁথে মটকার গভীর হতে ফোলা ফোলা তান্দুরি রুটিগুলো নামিয়ে আনছে। কয়লার গনগনে আগুনের ছাঁটে ওর মুখটাকে ধকধকে দেখায়।

পিস্তল খানের খুপড়ি দোকানে সকাল-বিকাল তান্দুরির চাহিদা খুব, গাঙপাড়ে আর কোনো দোকানে তান্দুরি হয় না। গাঙের যাত্রী পারাপার ঘাটে নেমেই সওয়ারিরা এককাপ মালাই চা’য়ে এ গরমাগরম রুটি চুবিয়ে খায়।

দোকানে সর্বসাকুল্যে পাঁচছয়জন বসতে পারে। গাঙের বেড়িবাঁধে ছনেছাওয়া দোচালা খুপড়ি, নড়বড়ে। তান্দুরি রুটির দোকান ও পিস্তল খানের নাম জানে না এ তল্লাটে তেমন কেউ নেই! রশিদ নামটা ঢাকা পড়ে গেছে পিস্তল খান নামের আড়ালে, সে নামের আছে এক ইতিহাস, সগর্বে রশিদ-ই সবাইকে তার নামের কাহিনি শোনায়।

হতদরিদ্র পরিবারের রশিদকে বালক বয়সেই করাচী নিয়ে গুজরানওয়ালার এক পাঠানের বাসায় রেখে এসেছিল এক জ্ঞাতি ভাই, অন্তত খেয়ে পরে বাঁচবে। ক্রমান্বয়ে কাজের ছেলে থেকে ওদের ধাবার তান্দুরি রোটির কারিগরে পরিণত হয় সে। কয়েক বছর শুধু মাহিনা ছাড়া পেটে-রুটিই মিলতো, মালিকের দয়ায় মাহিনা মঞ্জুর হয়, দেশে টাকা পাঠায়। কিন্তু অভাবের দেশ পরিবারের কাছে, নিজ মুল্লকে আসতে মন চায় না! করাচীর মাছ বাজারে বাঙালি লোকজন অনেক, দেশের ও আত্মীয়স্বজনের খবরাখবর পায়। দেশের পরিস্থিতি খারাপ, শেখ সাহেব নাকি পাকিস্তানে বিরুদ্ধে কাজ করছে, পাকিস্তান ভাঙতে চাইছে, তিনি ভোটে জিতলেই পাকিস্তান শেষ! লোকে বলাবলি করে, রশিদের এসব মাথায় ঢোকে না।

সে ধাবায় রুটি বানাতেই ব্যস্ত থাকে। আলো ঝলমল ধাবায় কতগুলো ঢোলা সালোয়ার কোর্তা কাবলিজুতো হইচই করছে, এরকম নিত্যই হয়, বখাটে পোলাপান, ভটভটি দু’চাকার ভেসপা নিয়ে হাঙ্গামা বাঁধিয়ে এরা আনন্দ পায়, কথায় কথায় বন্দুক-পিস্তল বার করে, গোলাগুলি খুনোখুনি গা সওয়া ব্যাপার করাচীতে। ওদিকে তাকায় না রশিদ। আজ তারা রশিদের দিকেই এগিয়ে এল:

– ভ্যাহঞ্চোদ, স্সালে রোটিমে ক্যায়া ডালা রে তু?

রুটিতে কোনো পোকা বা তেমন কিছু পেয়েই ক্ষেপেছে ওরা। রশিদ বলে ‘আমি তো শুধু তান্দুরি থেকে রুটি নামাই, এ দোষ খামির যে মাখে তার’ বোঝাতে চায় তাদের, ‘যা তোমাদের বলার ধাবাওয়ালাকে বল’ আর এতেই আরো ক্ষেপে যায় বখাটেগুলো। কপাল খারাপ, তার গায়ে হাত তুলে ফেলে তারা!

Ñক্যায়া বে, মুহাজির কা বাচ্চা, হামলোগ কো উল্লো সমঝা ক্যায়া, তু তনখা নেহি ল্যাতা, বাতা… বাতা…

হাতের চার আঙ্গুলে পিতলের চোখা-আঙটি দিয়ে তার মাথায় পরপর আঘাত করছে। ভোঁতা ব্যথায় ককিয়ে উঠল! ঘুরে দাঁড়াল-

– ম্যায় মুহাজির নেহি হুঁ, হাম মাগরেবি পাকিস্তানি হুঁ, বাঙালি…

কথা শেষ হয় না তার…

– আবে স্সালা, ইয়ে তো মালাউন নিকলা… স্সালাকো মোসলিম বানানে হোগা…

বলেই তার পাজামা টেনে নামায়, প্রতিবাদী হয় রশিদ, ধাক্কা দিয় সরিয়ে দেয় দুজনকে, চারিদিকে লোকজন গোল হয়ে তামাশা দেখা শুরু করে। নিবৃত্ত করতে আগায় না কেউ! পাঞ্চ-কিক দিয়ে বল খেলার আনন্দে মেতে ওঠে ওরা।

– বোল বে মালাউন, জ্যায় মা বোল…

রশিদ পেশীকোষে আহত বাঘের বল আসে, পাশের কোর্তাওয়ালার সেলোয়ারে গোঁজা পিস্তলের বাটটা সে দেখেছে, হ্যাঁচাকা টানে পিস্তলটা নিয়েই পরপর দুটো গুলি চালাল, পাজামা টানা ছেলেটা ধ্বামকরে পড়ে গেল, পিস্তল ওপরে তুলে হুশিয়ার করে রশিদ ‘খবরদার, সামনে আসলে আওরভি গোলি মার দেঙে। সে রাতেই পালাল রশিদ, প্রথমে করাচীর এক ভাইয়ের কাছে দুই মাস, কোর্তাওয়ালা মারা গেছে, মার্ডার কেস, পুলিশ খুঁজছে তাকে। আর থাকা ঠিক হবে না, পরামর্শ দেয় ভাইবেরাদর। রশিদ করাচী-পোর্ট হয়ে, আঠার বছরের প্রবাস জীবনের ইতি টানে। সেই থেকে সে পিস্তল খান।

দেশে এসেই বিয়ে করল রশিদ। একটা মেয়ে শিশুর জন্মদিতে আতুরঘরেই বউটা মরে গেল। মেয়েটা যেন অবিকল মা। মেয়ের মুখে দানাপানি দিতে মার ভূমিকা নিল সে, এর মধ্যেই দেশ উত্তাল জয় বাংলা, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন দেশে অভাব! রোটি বানানোর জানা কাজটি নিয়ে সে গাঙপারের বেড়িবাঁধে জীবন সংগ্রামে নামে, প্রথমে আটারুটি চা, খাস্তাবেলা বিস্কিট, খোলা বাঁধে গাছ তলায়, সে গাছতলায় আজ দোচালা ‘পিস্তল খানে’র চা-রুটির দোকান। নিরন্তর বয়ে চলা গাঙ, তার আয়-উপার্জণের অবলম্বন। এ জায়গায় তার একযুগের কাছাকাছি অবস্থান।

মেয়েটা লাউয়ের ডগার মতে বেড়ে উঠছে, বাপের সাথে সারাদিন দোকানের কাজে হাত লাগায়। গাঙ থেকে কলসে কলসে ধোয়ামোছার পানি ভর্তি করে, চাপাকল থেকে খাওয়ার পানি। দোকানের গ্রাহকদের চা তান্দুরি এগিয়ে দেয়, বাবার সাথে রুটির খামি মাখে। মেয়ে বড় হচ্ছে, পিস্তল খানের উদ্বেগ বাড়ে, সোমত্ত মেয়ে, গ্রামের মানুষের চোখের ভাষা বুঝতে পারে! বাবাকে খোলাখুলি জানায় একটা চারপকেট সাফারি তার দিকে চেয়ে থাকে, আবডালে ইশারা-ঈঙ্গিত করে। চিঠি গুঁজে দেয় হাতে! বাবা না থাকলে দোকানে সে এসে বসে থাকে। পিস্তল খান চেনে ছেলেটাকে। বখাটে তরুণ, গ্রামেরই। পলিটিকস করে। রুটি-বেলুন নিয়া মিছিল করে। নেতাগো মত সাফারি ঢোলা পেন্ট পরে।

বিষয়টা মুরুব্বিগোছের দুয়েক জনকে জানায় সে। তারা পরামর্শ দেয় ‘মিয়া, মাইয়ারে দোকানে আনছ ক্যা? বাড়িত রাখো; পোলাপাইন ত নজর দিবই, ও পোলারে খ্যাপাইও না, হের ম্যালা দাপট, তোমারেও বাঁধছাড়া করবার পারে!’

:বাড়িতে মাইয়াটা একলা ক্যামনে রাখি, কন; আর মাইয়া সাহায্য না করলে আমার দোকান চলব ক্যামনে! আমি পোলার বাপেরে নালিশ দিমু।

– বাড়াবাড়িতে যাইও না মিয়া, শেষম্যাশ আম ছালা দুই যাইবো কইলাম।

গভীর সঙ্কটে পড়ে পিস্তল খান।

ছেলেটার বাড়াবাড়ি মাত্রা ছাড়াল, কলতলায় পানি নিতে গেলে মেয়েকে পথ আগলে দাড়ায়, ভালবাসা জানায়। বাপ-মেয়ের আতঙ্ক বাড়ে। প্রকাশ্য দাপটে দোকানে সারাক্ষণ আড্ডা দিয়ে টেবিল বাজায়!

– ভাতিজা, এমুন করলে আমার দোকানে সমস্যা হয়। সরাসরি বলে সে, ‘চা খাওন হইলে যাও।’

– চাচা, শুধু কী চা খাইতে আসি, বুঝতে পারেন না!

– না, বাবা কিছু বুঝতে ত পারলাম না, কী কও?

– আমার বাপ’রে প্রস্তাব নিয়া পাঠামু, আপনার মেয়েরে শাদি করবার চাই। পোলাটার বেয়াদপিতে রাগে মাথায় রক্ত জমা হয় তার!

– এই ওঠ, ওঠ কইলাম, শুয়োরবাচ্চা, তোর বাপে কাছে যামু আজ।

– মাথা ঠা-া কর, বাঁধের ওপর দোকানদারী ছুটাই দিবো নে। এইটা সরকারি জায়গা! মাইয়ারে তোমার চৌদ্দগুষ্টি মিল্লা আমার কাছে বিয়া দিবা!

চুলার লাকড়ি হাতে নেয় সে, খ্যাক খ্যাক করে হেসে ছেলে লাকড়িটা ধরে চুলায় রাখে-

– আপনে আমার শ্বশুর হইবেন, জামাইয়ে গায়ে হাত মানায় না! ঠা-া হন।

ঘটনাটা ছেলের বাপকে জানায় পিস্তল খান। বাপ মনযোগ দিয়ে শোনে, ‘পোলারে শাসন করতে পারি না, হে বড় জিদি, কারো কথা হুনে না; কী যে করি, ত যাও মিয়া দেখমু নে।’ এ আশ্বাস নিয়েই ফেরত আসে। এর পর এক সপ্তাহ ছেলেটা দোকানে এল না! বাপ-মেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে।

রাত ন’টার মধ্যেই গাঙের ঘাট নির্জন হয়ে পড়ে, গ্রামের দোকানে কোনো চা পিয়াসী থাকে না, সারাদিনের কাপ-পেয়ালা কেটলি ঘঁষেমেজে সাফ করে মেয়েটা। আগামী দিনে ময়দার খামির মেখে রাখতে হয়, গাঙ থেকে পানি এনে তবেই বাপ-মেয়ের ছুটি। কাজ শেষ হতে রাত বাড়ে গাঙ পাড়ে, ব্যাঙ, ঝিঝিপোকারা তান তোলে-

– যা, মা দুই কলস পানি আন, তারপর বাড়ি যামু গা! মেয়ে কুলসুম অ্যালমুনিয়মের কলসটা নিয়ে ঘাঁটের দিকে যায়, ক্যাশ বাকস থেকে দিনে বিক্রির টাকাগুলো জামার পকেটে রেখে জামাটা পরে নেয় সে। পানি আনা হলেই আজকের মত শেষ…

 

তীক্ষè চিৎকারে গাঙপাড়ে রাতের পোকামাকড়ের কলতান বন্ধ হয়ে গেল! চিৎকারটা মেয়ে কুলসুমের, ঘাঁটের দিক থেকে

– বাজান… বাঁচাও…!

মুহূর্তে সব গুলিয়ে যায় পিস্তল খানের। রুটি তোলার চোখা শিকটা নিয়ে ঘাটের দিকে দৌড় লাগায় ঘাঁটে দুজন লোক কুলসুমকে টানাহেঁচড়া করছে সাম্পানে তোলার জন্য; সাফারিকে চিললো সে, ভারি চোখা লোহার শিকটা শক্ত হাতে বুক বরাবর ধরে বিদ্যুৎ বেগে উড়ে যায়। বুড়োকে আসতে দেখেই সাফারি সঙ্গীকে বলে ‘তুই তোল মাগীরে, ওরে গান্ধা কইরা ছাড়ুম!’

বুইড়ারে দুইডা থাপ্পড়ে শিক্ষা দিয়া সাম্পানে উঠতেছি।’

বুড়াকে ধরার নাগালে আসতেই বামহাতটা গলাচেপে ধরে ডানহাতে থাপ্পড় তোলে সাফারি, তার আগেই বুকের বামপাশে বুলেটের মত শক্তকিছু সাঁ করে গভীরে গেঁথে যায়, চোখে আন্ধার লাগে, চিত হয়ে পড়ে কাদার মধ্যে। পড়া আওয়াজে বাকি লোকটা থতমত খেয়ে কুলসুমকে ছেড়ে দিয়ে একলাফে সাম্পানে উঠে লগি ঠেলে…

দৌড়ে বাপের বুকে আশ্রয় নেয় কুলসুম। হাঁফাচ্ছে হাফরের মতো, জড়িয়ে ধরে বাবাকে। বাবা মেয়ের মিলিত কান্নার জলে একাকার হয় গাঙপাড়। সে কতক্ষণÍ দুজনের কেউ বুঝতে পারে না! অনেকক্ষণ কেটে যায় এভাবে,

– বাবা লোকটা ত লড়ে না, মরে গেল নাকি? কুলসুম জানতে চায়।

– মরক, এ বদমাইশগুলানের বাইচ্চা থাকনের কী কাম!

– মরে গেলে থানা-দারগা-পুলিশ হইব, তুমি পালাও বাজান!

– নারে মা, পাইক্কাগোরে গুলি মারি জন্মভূমিতে আইছি, এখন নিজ দেশ থেইক কই পলামু; আসুক দারোগা পুলিশ, সত্য কমু।

রাত গড়ায় আরো গভীরে। বাপমেয়ে বসে থাকে ঘাটের কাদায়। স্তব্ধ চরাচর। গাঙের পানিতে জোয়ারের আলামত…

 

 

মুস্তফা কামাল আখতার, গল্পকার

 

মুসলিম সম্পাদিত ও প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র : শিখা

ইসরাইল খান ভূমিকা: উনিশ শতকের রেনেসাঁস হিন্দুসমাজেই বদ্ধ ছিল। ওর মর্মবাণী সমাজঅভ্যন্তরে প্রবাহিত করেছিলো যেসকল সাময়িকপত্র তা ছিল হিন্দুসমাজপতিগণের। মুসলিম- পত্রপত্রিকার উদাহরণ কেবলই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। উল্লেখ

নাটোরের সাহিত্য সম্মেলনে রত্নগর্ভা হাজেরা খাতুন পদক ২০২৫ প্রদান ও গুণীজন সংবর্ধনা

\ আন্দরকিল্লা ডেক্স \ নাটোর ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার হাজেরা ফাউন্ডেশন সাহিত্য সম্মেলন শুভ উদ্বোধন করেন। সম্মেলনে প্রতি

আন্দরকিল্লা’র উদ্যোগে তিন কবির জন্মদিন উদযাপন

মন ও প্রাণের অনাবিল আনন্দ আমেজে শীতার্ত সন্ধ্যেয় হৃদয়ের উষ্ণতায় উচ্ছল উচ্ছ্বাসে আন্দরকিল্লার ২৮ বছর পদার্পণ, ইংরেজি নববর্ষ ২০২৬, এবং তিন কবির জন্মদিন উদযাপন অনুষ্ঠিত

প্রজেক্ট ক্লাউড হাউস

রোখসানা ইয়াসমিন মণি ডা. অভ্র সেনগুপ্ত, একজন প্রথিতযশা জ্যোতির্বিজ্ঞানী। ল্যাবের কাঁচের দেওয়ালের ওপারে ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। আজ সকালটা মেঘাচ্ছন্ন, ঠিক তার মনের মতো।