সনজীব বড়ুয়া
সুকুমার বড়ুয়া বাংলা ছড়া সাহিত্যের এক অনন্য শিল্পী। ছড়াকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অপরিসীম। প্রায় সাতষট্টি বছরের সাহিত্য জীবনে ছড়াতেই ছিল তাঁর নিমজ্জন। ১৯৩৮ সালে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বিনাজুরি গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবা সর্বানন্দ বড়ুয়া, মা কিরণবালা। তাঁর জন্মের সময়টা বাংলার বড় অভাবের কাল। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের সময় সুকুমার বড়ুয়ার পিতা নিরুদ্দেশ হয়ে যান। অকুল পাথারে পড়ে সংসার। নিজের বাড়ি ছেড়ে দিদির বাড়িতে আশ্রয়। তাঁর নিজের ভাষ্যে জানা যায় তিনি পড়েছেন আড়াই ক্লাস পর্যন্ত। বিদ্যায়তনিক শিক্ষার দৌঁড় এইটুকুই। তবে তাঁর জীবনের শিক্ষা অপার।
কিশোরকাল থেকেই তাঁর কর্মজীবনের শুরু। ১৯৫০ সালের জুন মাসে তিনি চট্টগ্রাম শহরে দক্ষিণ নালাপাড়ার এক বাসায় শিশুকে সঙ্গ দেয়ার কাজ পান। বেতন তিন টাকা। গৃহকর্মীর স্নেহেই কাটে তাঁর কয়েক বছর। এরপর ভৈরব বাজারে রান্নার কাজ। বেতন পাঁচ টাকা।
বেঁচে থাকার জন্য তাঁকে অবলম্বন করতে হয়েছে বিচিত্র পেশা। পোহাতে হয়েছে সীমাহীন কষ্ট। না, এজন্যে তাঁর তেমন আক্ষেপ ছিল না। কারণ তিনি জানতেন— জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা।
সুকুমার বড়ুয়ার লেখালেখির শুরু ১৯৫৮ সালে। সে বছর জুলাই মাসে দৈনিক সংবাদের খেলাঘর-এর পাতায় ছাপা হয় তাঁর প্রথম ছড়া ‘বৃষ্টি নেমে আয়’। বাবা নিরুদ্দেশ, ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরে মা মারা যাওয়ার পর তিনি ঢাকা চলে আসেন।
১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগে নিম্মপদস্থ কর্মচারীর চাকরি পান। শুরু হয় তাঁর জীবনের নবতর অধ্যায়। পরবর্তীতে পুষ্টি ভবনের স্টোরকিপার হিসেবেই তিনি কর্মজীবন শেষ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি বিয়ে করেন। তাঁর তিন কন্যা এক পুত্র। দারিদ্র্যের কারণে নিজে লেখাপড়া করতে পারেননি, কিন্তু স্বল্প বেতনের চাকরি করেও সন্তানদের দিয়েছেন উচ্চ শিক্ষা।
ষাটের দশকে পত্র-পত্রিকায় ছড়া লিখে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম ছড়াগ্রন্থ ‘পাগলা ঘোড়া’। তাঁর প্রথম গ্রন্থটি সাড়া জাগায়। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তধারা থেকে ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘ভিজে বেড়াল’ এবং ১৯৭৯ সালে ‘চন্দনা রঞ্জনার ছড়া’। তারপর সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া-রথ চলতে থাকে অবিরাম।
পরবর্তীতে প্রকাশিত হয় তাঁর আরো পনেরটি ছড়াগ্রন্থ।
ছড়াসাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য সুকুমার বড়ুয়া ১৯৭৭ সালে লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। এছাড়া তিনি পেয়েছেন বাংলাদেশশিশু একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য সম্মাননা, জনকণ্ঠ প্রতিভা সম্মাননা, আলাওল শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ আরো অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। বলা যায়, পুরস্কার তাঁকে খুঁজে নিয়েছে বারবার। ২০১৭ সালে তিনি লাভ করেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’।
সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ার বিষয় বৈচিত্র্যে ভরপুর। শিশুতোষ ছড়ার পাশাপাশি তিনি লিখেছেন সমাজমনস্ক ছড়া। ভাষার লড়াই, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সমাজের নানা বিবর্তন সবই ধারণ করেছে তাঁর ছড়া।
শিশু মনের ইচ্ছে তাঁর ছড়ায় ফুটে উঠেছে এভাবে—
‘এমন যদি হতো
ইচ্ছে হলে আমি হতাম
প্রজাপতির মতো
নানা রঙের ফুলের পরে
বসে যেতাম চুপটি করে
খেয়াল মতো নানান ফুলের
সুবাস নিতাম কত।’ (এমন যদি হতো)
শিশুতোষ ছড়ার আরেকটি উদাহরণ—
‘এ্যাত্তোটুকুন হাতীটার
অত্তো বড়ো দাঁত
শাক খায় না
মাছ খায় না
খায় না গরম ভাত।
দাঁতের ব্যথায়
হাতী মশায়
হচ্ছে কুপোকাত’— (হাতির দাঁতের ছড়া)
ছন্দ আর অন্ত্যমিল ছিল তাঁর হাতের তালুতে। অনুপ্রাসেও যে তিনি কী পরিমাণ দক্ষ তার প্রমাণ ‘অনুপ্রাস’ শিরোনামের ছড়ায় মেলে—
‘রোস্তম আলির দোস্ত ছিল
পোস্তগোলার ওস্তাগার
সস্তা দামের গোস্ত নিতে
বস্তা খোঁজে মোস্তফার।’
আঞ্চলিক শব্দও কী অপূর্ব দক্ষতায় ব্যবহার করেছেন তিনি, তার প্রমাণ ‘খাইছে’—
‘খাইছে রে খাইছে
কইমাছ কইথনে কই নিয়া আইছে।’
তাঁর অন্ত্যমিল আমাদের মুগ্ধ করেছে বারবার।
যেমন—‘হৈ হৈ কাণ্ড রৈ রৈ ব্যাপার
কেউ ধরে মেলট্রেন কেউ হয় খেয়াপার।
কিংবা ‘জমিদার বাহাদুর চড়েছেন পালকি
কেউ করে পেন্নাম কেউ সেলামাল্কি’
সমাজ ও জীবনবোধের অসাধারণ বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করি সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ায়। তাঁর বহুল পঠিত ‘ঠিক আছে’ ছড়ায় নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে—
‘রেশমের পচা চাল
টলটলে বাসি ডাল
থালাটাও ভাঙাচোরা
বাটিটাও লিক আছে
খেতে বসে জানালেন—
ঠিক আছে, ঠিক আছে।’
তাঁর ‘হাইজ্যাকার’ ছড়ায় ফুঠে উঠেছে অসামান্য মানবিক আবেদন—
‘হাইজ্যাকার রে হাইজ্যাকার
কার ছেলে তুই ভাই যে কার!
যেথায় সেথায় দিস হানা
কোথাও যেতে নেই মানা
আংটি ঘড়ি কানের রিং
সব করে নে হাইজ্যাকিং
আমার শুধু একটি দাবি
পেটের ক্ষুধাও নিয়ে যাবি
দুর্গতি নে রাশি রাশি
নিস না শুধু মুখের হাসি।’
সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ার সংখ্যা হাজার খানেকের কম নয়। তাই উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরার মতো ছড়াও যে অসংখ্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সঙ্গত কারণেই সংযত হতে হল।
প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়লো ১৯৭৭ সালে ঢাকায় সুকুমার বড়ুয়ার সঙ্গে দেখা করার কথা। আমি, অজয় দাশগুপ্ত এবং বিশ্বজিৎ চৌধুরী গিয়েছিলাম দেখা করতে তাঁর মেসবাড়িতে। তখনো তাঁর পরিবার চট্টগ্রামে গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। সেদিন ট্রাঙ্ক থেকে বের করে তাঁর তৃতীয় ছড়াগ্রন্থ ‘চন্দনা রঞ্জনার ছড়া’র পাণ্ডুলিপি দেখিয়েছিলেন আমাদের। সে সময় আমরা চট্টগ্রামের ছড়াকাররা রাইমার্স নামে একটি সংগঠন করেছিলাম। এখান থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল ‘ছড়াকার’ নামে মুখপত্র। আমার দায়িত্ব ছিল ‘ছড়াকার’ এর জন্য সুকুমারদা’র একটা সাক্ষাৎকার নেয়ার। নিয়েছিলাম ছোট একটা সাক্ষাৎকার।
সেই সাক্ষাৎকারে লিখেছিলাম— সুকুমার রায় যদি হন বাংলা ছড়া সাহিত্যের রাজা, তাহলে সুকুমার বড়ুয়া হলেন রাজকুমার।
সময় গড়িয়েছে, সুকুমার বড়ুয়া নিজেকে নিজেই অতিক্রম করে এগিয়ে গেছেন পূর্ণতার দিকে। তাঁর সমসাময়িক ও অনুজ ছড়াকাররা এবং তাঁর বিশাল অনুরাগীর দল সুকুমার বড়ুয়ার মাথায় পরিয়েছেন মুকুট। সে মুকুট সম্রাটের। আর এভাবেই ছড়ার রাজকুমার হয়ে উঠলেন ছড়াসম্রাট। সেই ছড়াসম্রাট আমাদের ছেড়ে অনন্তের পথে চলে গেছেন গত ২ জানুয়ারি ২০২৬। জন্মদিনের মাত্র তিনদিন আগে। তাঁকে আমার অশেষ শ্রদ্ধা। সম্রাট নেই তবে আছে তাঁর সাম্রাজ্য। সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর সৃষ্টির অপার সম্ভার।
সনজীব বড়ুয়া
ছড়াকার ও নাট্যজন




