আরফান হাবিব
ইতিহাস, সব কিছু ভেঙে নিচ্ছে, প্রতিবন্ধকতা, অধিকার, দাবি, বিধিনিষেধ, শর্ত, দানব, নিরাপত্তা-দেয়াল, অভ্যন্তরীণ বিষয়, দেবতা, মানুষকে মুক্ত করার সংগ্রাম এবং প্রগতিশীল চিন্তার দাসত্ব ও অবিনাশী শক্তি প্রভৃতি কথামালা। ‘রোম একদিনে নির্মিত হয়নি।’ আর ‘তিল তিল করে তৈরি হয়েছে তিলোত্তমা নগরী কলকাতা।’ সভ্যতার নির্মাতা মানুষের ইতিহাস তো সামান্য কোনো ঘটনা নয়। বহু বছরের চিন্তা আর শ্রমে গড়ে উঠেছে বিরাট-বিপুল মানব-সভ্যতা। এই ইতিহাস মানুষের বিবর্তনের ইতিহাস। সারভাইভ করার জন্য মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে সারাক্ষণ সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হয়েছে। সংগ্রামের ভেতর দিয়ে, নানান বিপর্যয় ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে সাফল্যের পথে। আদিম মানুষকে টিকতে হয়েছে বন্য জন্তু-জানোয়ারের সাথে সংগ্রাম করে। আগুনের আবিষ্কার, ঝরণাধারার মিষ্টি পানির আবিষ্কার বন্য মানুষকে কীভাবে বাঁচার পথে অনুপ্রাণিত করলো, গোত্র-প্রধান নির্বাচন ও তাঁর নির্দেশ মেনে চলার অভ্যাস গড়ার মধ্য দিয়ে বন্য মানুষ কীভাবে সভ্য হয়ে উঠলো, নারীর অধিকার এবং নারী-পুরুষের প্রেমভাবনা বিষয়ে আদিম মানুষের ভাবনাই বা কেমন ছিল, দেবতার প্রতি আস্থা এবং পাপ-পুণ্য বোধই-বা তারা কীভাবে লালন করতো, সে সব বিষয়ে রয়েছে সভ্যতার বহুতর দাগ। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিচরণ, তাদের মুক্তিচেতনা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, ত্যাগ ও নেতৃত্বের বিকাশধারার ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জীবনধারা। পাহাড়ি সমাজে মানবতাবাদী আদর্শ, চিন্তার স্বাধীনতা এবং সময়ের প্রয়োজনে নেতৃত্বের পরিবর্তন ও মানবিকতার বিবর্তনের যে জয়গান রচিত হয়েছে যুগে যুগে, তা আমাদের চলমান সামাজিক পদ্ধতিতে এক দারুণ শিক্ষণীয় ব্যাপার।

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের নারীদের পোশাক-সংস্কৃতিতে “পিনন হাদি” এক অনন্য ঐতিহ্যের নাম। এটি কেবল একটি পোশাক নয়, বরং একটি জাতিগোষ্ঠীর পরিচয়, ইতিহাস ও নান্দনিকতার প্রতীক। যুগে যুগে পোশাক মানুষের জীবনধারার পরিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করেছে। শাড়ির বিবর্তন যেমন একখণ্ড কাপড় থেকে রুচিশীল বস্ত্রে রূপ নিয়েছে, তেমনি পিনন হাদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয়ে আজ আধুনিক ফ্যাশনের অংশ হয়ে উঠেছে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এই মেলবন্ধন পিনন হাদিকে দিয়েছে এক নতুন প্রাণ, নতুন অর্থবোধ এবং বিশ্বমুখী আবেদন।
পিনন হাদির ঐতিহ্য ও প্রাচীন ব্যবহার
পিনন হাদি প্রাচীনকাল থেকেই পাহাড়ি নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক। “পিনন” বলতে বোঝানো হয় কোমর থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পরিধেয় কাপড়, আর “হাদি” হলো শরীরের ঊর্ধ্বাংশে জড়ানো পোশাক। দুটি মিলিয়েই গড়ে ওঠে সম্পূর্ণ পোশাক “পিনন হাদি”। প্রাথমিকভাবে এটি ছিল একখণ্ড কাপড়ের তৈরি সরল পোশাক, যা নারীরা বুকের চারপাশে জড়িয়ে পরতেন। এতে ব্লাউজের আলাদা প্রয়োজন হতো না। তখন এটি ছিল কেবল দৈনন্দিন ব্যবহার্য পোশাক, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি রূপ নেয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীকে। পার্বত্য নারীরা তাদের জীবনযাপন, প্রকৃতি ও বিশ্বাসের রঙ-রূপ এ পোশাকে ফুটিয়ে তুলতেন। কোমর তাঁতে বোনা প্রতিটি পিনন হাদি যেন একেকটি গল্প বলে-ভালোবাসা, প্রকৃতি, পাহাড়, উৎসব ও নারীর সৃজনশীলতার।

বুননপ্রক্রিয়া ও কারুশিল্পের স্বকীয়তা
পিনন হাদি তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। এটি তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁতে, যা হাতে পরিচালিত হয়। তাঁতি নারী কোমরের সঙ্গে তাঁতের এক প্রান্ত বেঁধে পা ও হাতের সমন্বয়ে কাপড় বোনেন। প্রতিটি নকশা ও রঙ বেছে নেওয়া হয় নির্দিষ্ট ভাবনা ও সংস্কৃতি অনুযায়ী। বুননের সূক্ষ¥তা ও রঙের সামঞ্জস্য এই পোশাককে করে তোলে শিল্পসম্মত ও টেকসই। একটি পিনন হাদি তৈরি করতে লাগে প্রচুর শ্রম, সময় ও দক্ষতা। বুনন যত সূক্ষ¥ হয়, কাপড়ের মান তত উন্নত হয়, আর দামও তত বেশি হয়। একটি ভালো মানের পিনন হাদি তৈরি করতে প্রায় এক মাস সময় লাগে। এটি কেবল একটি বস্ত্র নয়, বরং পাহাড়ি নারীর পরিশ্রম, ধৈর্য ও শিল্পরুচির জীবন্ত প্রতীক।

ফ্যাশনে আধুনিকতার সংযোজন
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাইরের সংস্কৃতি ও নগর জীবনের প্রভাবে পিনন হাদিতেও এসেছে কিছু পরিবর্তন। আগে এটি ব্লাউজবিহীন পোশাক ছিল, এখন আলাদা ব্লাউজ যুক্ত হয়েছে। এতে পোশাকটির সৌন্দর্য যেমন বেড়েছে, তেমনি পরিধানে এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে আধুনিক ডিজাইনাররা পিনন হাদিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে শুরু করেছেন। ফলে এটি শুধু ঐতিহ্যবাহী পোশাক নয়, বরং বিয়ের ও উৎসবের বিলাসবহুল পোশাক হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। আজ পিনন হাদি হয়ে উঠেছে একাধারে ফ্যাশন স্টেটমেন্ট ও সাংস্কৃতিক গর্বের প্রতীক। বর্তমানে একটি সাধারণ পিনন হাদি সেট বিক্রি হয় প্রায় ৪ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকায়, আর বিয়ের কনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি পোশাকের দাম হতে পারে ৬৫ হাজার টাকারও বেশি।
ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যের প্রসার
রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি অঞ্চলের সাপ্তাহিক বাজারগুলোতে এখনো হাতে বোনা পিনন হাদি বিক্রি হয়। প্রতি রবি ও বুধবার রাঙামাটির বাজারে গেলে দেখা যায় রঙিন পিননের সারি, যেখানে প্রতিটি কাপড় যেন একেকটি সংস্কৃতির ক্যানভাস। তবে স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে এখন পিনন হাদি জায়গা করে নিয়েছে দেশের বাইরেও। অনলাইন বিক্রয় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহজলভ্যতার ফলে এটি শহুরে নারীদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অনেক ডিজাইনার এটিকে শাড়ি, কামিজ বা গাউন ডিজাইনে ব্যবহার করছেন, যাতে ঐতিহ্যবাহী প্যাটার্ন আধুনিক পোশাকে মিশে যাচ্ছে সহজাতভাবে। এই পরিবর্তন দেখায় যে, একটি সংস্কৃতি সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, কিন্তু তার মূল চেতনাকে হারায় না। পিনন হাদি তার জীবন্ত উদাহরণ-যেখানে ঐতিহ্য ও নান্দনিকতার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে নতুন ধারা।

ফ্যাশন ও সংস্কৃতিতে পিনন হাদির তাৎপর্য
পিনন হাদি আজ কেবল পোশাক নয়, এটি হয়ে উঠেছে সংস্কৃতির পরিচয়বাহী প্রতীক। এর মাধ্যমে একদিকে পাহাড়ি নারীদের শিল্পরুচি ও নৈপুণ্য প্রকাশ পায়, অন্যদিকে তাদের স্বকীয় সাংস্কৃতিক অবস্থানও প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে অনেক তরুণী তাদের বিয়ে, গায়েহলুদ বা উৎসবে পিনন হাদি পরিধান করেন গর্বের সঙ্গে। এটি তাদের কাছে শুধুমাত্র ফ্যাশন নয়, বরং শিকড়ের সঙ্গে সংযোগের এক মাধ্যম। ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও আধুনিকতার এই সংমিশ্রণই পিনন হাদিকে দিয়েছে নতুন জীবন, নতুন অর্থ। এই পোশাকের মধ্য দিয়ে আদিবাসী কারুশিল্প কেবল সংরক্ষিতই হয়নি, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার উৎস। পিনন হাদি আজ বাংলাদেশের ফ্যাশন ইতিহাসে এক উজ্জ্বল উদাহরণ, যেখানে পাহাড়ের ঐতিহ্য মিশে গেছে বিশ্বায়নের ঢেউয়ের সঙ্গে।
এবং আলাম
পিনন হাদির বুননে ব্যবহৃত “আলাম” হলো এক ধরনের নকশা বা অলংকরণ, যা কাপড়ের সৌন্দর্য ও স্বকীয়তা নির্ধারণ করে। এটি মূলত তাঁতের মাধ্যমে বোনা রঙিন মোটিফ বা প্যাটার্ন, যা প্রতিটি উপজাতির সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও নান্দনিক বোধের প্রতিফলন। একেক সম্প্রদায়ের আলাম একেক রকম-কোথাও তা ফুল-পাতার নকশা, কোথাও জ্যামিতিক রেখা, আবার কোথাও প্রকৃতি, প্রাণী বা দৈনন্দিন জীবনের চিত্র থেকে অনুপ্রাণিত। আলামের রঙ, বিন্যাস ও ধরন দেখে বোঝা যায়, পোশাকটি কোন জাতিগোষ্ঠীর এবং তাদের কারুশিল্পের ধরন কেমন। তাই আলাম শুধু পিনন হাদির অলংকার নয়, বরং এটি আদিবাসী নারীর পরিচয় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত প্রতীক।
কবিতায় পিনন হাদি
চাকমা কবিতায় পিনন হাদি চমৎকার অনুষঙ্গ হয়ে উপস্থাপিত হয়। আধুনিক চাকমা কবি ফেলাজেয়া চাকমা (জন্ম:১৯৪৪) তাঁর ‘জুম্মবী পরাণী মর’ কবিতায় পিনন হাদি নিয়ে লিখেছেন –
চুলানত গুজা ফুল ধরমর গোরি পিন্-
পরানর হাওঝর ঝিঙাফুল চাবুগীর নুয়া পিনোনান,
হাঝি হাঝি দোলেদোলে বান্ তুই রাঙা খাদিয়ান।
সেনদ্যায় কং তরে, তুই হবে ধনপুদী মর,-হোম মুই তর রাধামন।
তারপরে রেতুয়া গেলে পত্র হলে-
দেবে তুই বেল উধের, জুমজঘা সুদাফুল হাঝং হাঝং-
মনে হব ফিরি এচ্যে হারাযিয়া তরমর-
পুরানর সুদিনর নানা কধা নানা সুখ নানা রঙধঙ।
বাংলা অনুবাদ-
চুলে আজ গুঁজো ফুল,
পরবো আজ নতুন পিনোন, বুকে বাঁধো রাঙা-খাদি-
আমি আজ হই তবে রাধামন, তুমি হবে ধনপুদী।
তারপরে রাত গেলে ভোর হলে
পূর্বাকাশে দেখা দেবে নতুন সর্যূ
রাশি রাশি তুলা-ফুলে শিশিরে শিশিরে-
ভরে যাবে জুমের অঞ্চল,
মনে হবে ফিরে এলো ঐ বুঝি আমাদের সুখের সময়।
শেষ কথা
পিনন হাদি সময়ের সঙ্গে পাল্টে যাওয়া এক পোশাকের গল্প। এটি যেমন নারীর শ্রম, শিল্প, ও সৃজনশীলতার প্রতীক, তেমনি তার সংস্কৃতির ধারকও। প্রাচীন ঐতিহ্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই পোশাক আধুনিক ডিজাইনের ছোঁয়ায় এখন ফ্যাশনের মঞ্চে নতুনভাবে জ্বলে উঠেছে। এই বিবর্তন শুধু পোশাকের নয়, বরং একটি সমাজের আত্মপরিচয়ের পুনঃউদ্ভাবন। পিনন হাদি প্রমাণ করেছে-ঐতিহ্য কোনো স্থবির ধারণা নয়; বরং সময়ের সঙ্গে তা বিকশিত হয়, বদলে যায়, তবু হারায় না তার শিকড়। আজ পিনন হাদি শুধুমাত্র পাহাড়ি নারীর পোশাক নয়, এটি বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক গর্বিত প্রতীক-যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলেছে সৌন্দর্য ও আত্মপরিচয়ের সেতুবন্ধনে।
আরফান হাবিব : প্রাবন্ধিক ও গবেষক




