মুখবন্ধ
কেবলই ভুল হয়ে যায় মূলত সনেটের আদলে চল্লিশটি পরিচ্ছেদে লেখা একটিই কবিতা। কেউ যদি এগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে পড়তে চান, অনেক স্থানেই অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। ফলে কবিতার রস আস্বাদন কিংবা ভাবার্থ উদ্ঘাটনে তাকে খানিকটা বেগ পেতে হবে। যেহেতু একটিই কবিতা, পাঠককে তাই কিছুটা ধৈর্য নিয়েই ধারাবাহিকভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পৌঁছানোর অনুরোধ করি। এত ছোট একটি লেখা শেষ করতেই বা কী এমন সময় লাগবে!
কবিতার চরণগুলো তুলনামূলক একটু লম্বা— অক্ষরবৃত্তে বাইশ মাত্রায় লেখা। যদিও বাংলা-সাহিত্যে বাইশ মাত্রার চরণে অনেক বিখ্যাত কবিতারও সন্ধান মেলে। চরণগুলোকে আট-আট-ছয় মাত্রার পর্বে বিন্যস্ত করেছি। অক্ষরবৃত্তে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ‘ও’ এবং ‘ৎ’ মাত্রার মর্যাদা পায় না। এই কবিতায় উক্ত বর্ণ দুটি সকল ক্ষেত্রে নির্বিশেষে মাত্রার মর্যাদা পেয়েছে। আশা করি তাতে ছন্দ-প্রকরণের এমন কিছু ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না।
পাঠক তৃপ্ত হলে ব্যাকরণে কী আর যায় আসে !
১.
এই তো হাতেই ছিল ছোট সাদা চিরুনিটা একটু আগেই,
মুহূর্তে গিয়েছি ভুলে কোথায় রেখেছি তারে, মনে নেই আর।
হঠাৎ হঠাৎ করে ভুলে গেলে রাগ এসে অন্তরে জাগেই;
প্রয়োজনে যদি কিছু তখনি খুঁজে না পাই, ভালো লাগে কার ?
আমার তো কোনোদিন এমন হয়নি আগে; হঠাৎ যে কেন
এতবড় ভুলোমনা হয়ে গেছি কোন ফাঁকে, পাই নাই টের।
তবে কি অনিচ্ছেতেও বয়সের ডালপালা বেড়ে গেছে ? যেন
সে ডালে-ডালে অসংখ্য মনে রাখার কত না দায় আছে ঢের।
আগেও ভুলেছি কত, ভুলেছি ক্লাসের পড়া, পিতার শাসন;
বাজারের তালিকাটা ভুলে গেছি বহুবার, পড়ে নাই মনে।
ছেলেবেলার সেসব ভুলে যাওয়ার কী যে থাকত কারণ,
জানা ছিল সকলের; হয়তো বা শুধায়নি তাই কোনো জনে।
আজ এই জীবনের শেষ বেলা এসে দেখি, যত সব ভুল
আমার শান্ত জীবনে জড়ো হয়ে ছড়িয়েছে অশান্তির মূল।
০৯/০৫/২০২৫, ফরিদপুর
২.
এত ছোট ছোট ভুলে যদি দিনরাত থাকি যন্ত্রণা-কাতর,
যারা বড় বড় ভুল করে চলে সারাক্ষণ স্বেচ্ছায় অবাধে,
তারা কেন কখনই অনুতাপে পুড়ছে না নিজের ভিতর ?
এতসব পাপ তারা কেন বইছে সহাস্যে নিজেরই কাঁধে ?
লোভ কি এতই অন্ধ ? স্বার্থের জাল কি তবে এতই জটিল ?
পাপের আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে যায় যদি, তবুও দেখে না
পাপী নিজের মুক্তির অবারিত প্রসারিত পথের শামিল
অনুশোচনার অশ্রু দিয়ে ধোয়া সেই পথ; ও পথে হাঁটে না !
যে অন্তরে পাপ এসে বেঁধেছে কৌশলে তার ছলনা-আবাস,
পাপ বুঝি তারে আর ছাড়ে না সহজে পিছু, নইলে কেন বা
কিসের মোহে সে জন ভুলে থাকে অবিরাম পুণ্যের সুবাস ?
পাপ কি মধুর মতো ? স্বাদ পেলে বারবার চায় লোভী জিহ্বা।
কত জ্ঞানী কত পথ দেখায়েছে যুগে যুগে, তবু পাপ হতে
কত জনে ফেরে নাই, ডুবেছে স্বেচ্ছায় তারা অন্ধ-চোরা-স্রোতে।
০২/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৩.
পাপের সে চোরা-স্রোতে গুটি পায়ে যাচ্ছে তারা অতীতের বাঁকে,
অতীতের পাপ-সুখে আজও তাদের দিন আনন্দে বিভোর।
বিধাতার ঈশারায় পাপের মাশুল যদি কারো বাকি থাকে,
বোঝে না সে উদারতা; কেবল পুণ্য-পথের এটে দেয় দোর।
পাপ কি এমন পথ ? যেই পথে একবার হেঁটে গেলে কেউ,
ফিরে আসা সুকঠিন ? পাপী কি কঠিন ছেড়ে সহজের খোঁজে
আবারও পাপ-পথে হেঁটে চলে অবিরাম, নদী কূলে ঢেউ
যেমন থামে না কভু ? যেন কোনো ছবি আঁকা শিল্পীর কাগজে ?
ভুল সে যেমন হোক, যদি সে ভুলের ক্ষমা কেহ নাহি যাচে,
অনায়াসে বিধাতার উদারতা গুণে যদি ক্ষমা পায় তারা,
সে কেবল বিধাতার ইচ্ছের প্রতিফলন; মানুষের কাছে
ঠিক-ভুলের বিচার মেনে চলে মানুষের আইনের ধারা।
অনুতাপহীন পাপী কোন যুক্তির বলে সে পেতে পারে ক্ষমা ?
মানুষের ইতিহাসে ছোট-বড় সব ভুল রয়ে যায় জমা।
১০/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৪.
সহজ মানুষগুলো ভুল করে ভুলগুলো ভুলে যায় সব।
পাপীরা সহজ নয়; পাপের আঁধার পথে নিঁপুণ কৌশলে
ফাঁদে ফেলে আটকায় সহজ মানুষগুলো— গোপন নীরব।
প্রশান্ত সারল্যে ভরা মানুষেরা ভুলে যায় ছলনার ছলে।
পাপের ধর্ম তো এই; আগুনের মতো সে যে দিকে দিকে ছোটে।
এক অন্তর হতে সে বহু অন্তরের খোঁজে মত্ত অবিরাম।
একবার পাপ এসে যদি কোনো হৃদয়ের কোমলতা লোটে,
শুধু অনুশোচনার অগ্নিতে পুড়েই পায় প্রশান্ত বিশ্রাম।
যে পাপী অনুতাপের ধার ঘেঁষে হাঁটেই না, উচ্চ অহঙ্কারে
যে বারবার নিজের পাপের পাহাড়ে বসে খলখল হাসে,
অযাচিত করুণার অযৌক্তিক ক্ষমা সে কি বিধাতার দ্বারে
পেতে পারে কোনোকালে ? অধর্মের বেড়াজালে ধর্মচিন্তা নাশে।
পাপহীন কেহ নাই; তাই বলে পাপ করে উচ্চ গর্ব-শির !
যুগে যুগে ঘৃণা-ভরা ধিক্কারে ভরেছে ডালা এমন পাপীর।
১১/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৫.
এমন পাপীরা তবু নিজেদের ভুল পথ ছাড়ে নাই আজো;
এখানে ওখানে তারা আজো পাপের সাফাই গাইছে সজোরে।
অতীত-ভোলা মানুষ, তুমি পাপীর খেয়ালে নানা রঙে সাজো;
মনে পড়ে যাবে সব একদিন কোনো এক আলোকিত ভোরে।
ততদিনে হয়তো বা দেরি হয়ে যাবে খুব; দেখবে তোমার
সাধের ভিটে ও মাটি, বহু যত্নের বাগান, লুটে নিয়ে গেছে
হানাদার পাপীদলে। তখন পরাণ জুড়ে ব্যথা বেশুমার
নিত্য ঢেউ খেলে যাবে; দেখবে লুটেরা সব দুয়ার এটেছে।
অপহৃত ধন যদি ফিরে পেতে চাই কেউ, নয় তো সহজ;
লুটেরার দেয়াল কি গরীবের খড়ে-ছনে বাঁধা সস্তা কিছু ?
লুটের স্বভাব যার, তারে ঠেকাতে তোমার ছিল না গরজ;
এইবেলা আত্মভোলা সরল ক্লান্ত মানুষ ছোটো কার পিছু ?
যে পাপী স্বেচ্ছায় আজ পৈশাচিক সে পথের হয়েছে পথিক;
দল বেধে মুখ ফুটে বারবার বল তারে, ধিক, তোরে ধিক।
১১/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৬.
সরল মানুষগুলো ইতিহাস ভুলে যায়; তাদের কি দোষ ?
পাপীরা ভুলিয়ে দেয়; জ্ঞানীদল বসে বসে কী করে তখন ?
জ্ঞানীদল সেই ফাঁকে ভাগ হয় দুই ভাগে; জ্ঞানের সন্তোষ
উপভোগে এক দল করে ফেলে জ্ঞানপাপে আত্মসমর্পন।
জ্ঞানী আর জ্ঞানপাপী, সেয়ানে-সেয়ানে সব বাধায় লড়াই,
সাধারণ যারা আছে, তারা যাবে কার কাছে? কে ভালো, কে মন্দ ?
কার কাছে গিয়ে সব অনিশ্চিত আগামীর পেরোবে চড়াই ?
কোথা গেলে মিটে যাবে দিনের আলোর মতো আঁধারের দ্বন্দ্ব ?
সত্য আর মিথ্যা নিয়ে চলুক তুমুল তর্ক সারা দিনরাত;
যুক্তির আঘাত লেগে ভেঙে যাক মিথ্যেগুলো একে একে সব।
অথচ দেখতে পাই কেউ কেউ জেনে-বুঝে বাড়িয়েছে হাত;
কেবল স্বার্থের টানে মিথ্যে পাপ ভালোবেসে করে সে গৌরব।
আলো-আঁধারির ফাঁদে ডুবে যায় সাধারণে; হাসে জ্ঞানপাপী।
সে হাসির পাপ আজ কোন বাটখারা দিয়ে বল তারে মাপি ?
১১/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৭.
মাপামাপির ঝামেলা কে আর করতে চায় ? ওরা সাধারণ;
দিনভর খাটাখাটি শেষ হলে সবে মিলে চায় যে বিশ্রাম।
শরীরের ঘাম ফেলে পেতে চায় একটুকু নিশ্চিন্ত জীবন;
পাপীর কূট-কৌশলে ফুরায় সব সুন্দর জীবনের দাম।
পাপীর ভুল কি ভুল ? কেন নয় ! যদি তারা অজান্তে ঘটায় ?
সে পাপের দায় হতে মিলুক সহজ মুক্তি; কোনো ক্ষোভ নেই।
জ্ঞানপাপী যেইজন, কেবল তার বেলায় রয়ে যাক দায়;
হোক না শাস্তি তাদের মানুষের নিজেদের তৈরি আইনেই।
কেউ যদি ভুল করে পরে শুধরাতে চায়, সে জন মহৎ;
বিধাতা ও মানুষের দরবারে তারে যেন মুক্তির সম্মান
আলোকিত করে রাখে। অপমান-জ্বালা হতে সমস্ত জগৎ
তারে যেন দূরে রাখে; বিচারক তারে যেন করে পরিত্রাণ।
অনিচ্ছায় অপকর্মে ডুবে গেলে সকলেই দোষ দেবে ঠিক;
তবুও ক্ষমায় রাখে সময়ে সে শুধরায়ে ফিরে পেলে দিক।
১২/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৮.
আর যারা পুরাতন ভুল পথ ধরে ধরে আরও সম্মুখে
এগোয় অহঙ্কারের দম্ভ পদক্ষেপ ফেলে, নেই পরিতাপ;
ক্ষমাহীন নিষ্করুণ শাস্তির যন্ত্রণা-ভার হানুক সে বুকে;
আঘাতে আঘাতে তারে বুঝাও কী পরিমানে জমে ছিল পাপ।
পাপের শাস্তি আর পুণ্য করে পুরস্কার যদি নাহি জোটে,
কিছু লোকে আজীবন পাপের সহজ পথে হেঁটে হেঁটে যাবে।
পুণ্যের কঠিন পথে যে কাঙ্ক্ষিত প্রশান্তির স্নিগ্ধ ফুল ফোটে,
সে খবর সাধারণে কিভাবে কোথায় গিয়ে কার কাছে পাবে ?
এখানেই জ্ঞানপাপী দুই চোখে ঠুলি বাঁধে সরল নরের;
সহজ ভুলের পথে যে-তুচ্ছ আনন্দ আছে, সেইটুকু সাধে।
জ্ঞানীর উচিৎ দেখা ইতিহাসের পাতায় ঘৃণ্য খবরের
যে উদাহরণ আছে, সেখানে কী করে পাপ চুপিসারে বাঁধে।
যদিও পাপের পথ সহজ আনন্দময়, তবু তারে চেনা
যথেষ্ট জটিল বটে; জ্বলে-পুড়ে শোধ হয় সে পথের দেনা।
১২/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৯.
অবাক হয়ে কেবল ভাবি আমি বারবার, কী সূক্ষ্ম কৌশলে
কারা যেন এখনও পুরাতন পাপগুলো নতুনের মতো
সাজিয়ে তুলছে সব; ভালোবাসা-অভিনয়ে টেনে নেয় কোলে
অচেতন মানুষেরে, যারা আজ ভুলে গেছে অতীতের ক্ষত।
সচেতন যারা আছে, তারাও কেন বা আজ এমন নিশ্চুপ ?
তবে কি কোথাও কেউ গোপনে রাঙায় তার রক্তলাল চোখ ?
ডাঙায় কি বাঘ আছে ? পানিতে কুমিরগুলো দিয়ে আছে ডুব ?
ইতিহাস জানে যারা, তারা দেখে ধূর্ত এক শেয়ালের শোক।
সামনের শুকনেরা হয়তো কিছুটা বোকা; পিছনে শেয়াল
চুপিচুপি পিছু নেয়— সাবধানে পা বাড়ায়; সুযোগ পেলেই
যত্নের পাখির ছানা লুটে নিয়ে নিমিষেই পেরোবে দেয়াল;
রাতের আঁধার ঘোরে তোমার দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলেই।
জেগে থাকো পালা করে; সব যদি একসাথে ঘুমাও বেঘোরে,
তোমার সাধের ধন কোন ফাঁকে চুরি করে নিয়ে যাবে চোরে।
১২/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
১০.
চোর তো আগেও ছিল, এখনও আছে তারা; কেবল চুরির
কৌশল বদল করে রয়েছে রাজার হালে। দেখে মনে হয়
পাপ-চিন্তা কোনোদিন মাথায় আনেনি তারা; এমনই পীর।
এমনই যুধিষ্ঠির সেজে মানুষের মন করে ফেলে জয়।
পাপের কত যে রূপ, কত শত পথ ধরে রোজ আসে যায়;
এক রূপ ফাঁস হলে মুহূর্তে সে বদলায় চোখের পলকে।
যদি হও বেখেয়াল, থাকবে না হাতে আর ধরার উপায়।
টেনে নিয়ে আচমকা সময়-সুযোগ বুঝে নামাবে নরকে।
লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা, যেমন ইন্দ্রের হাতি— পাপেরও আছে
তেমন বাহন এক; দুষ্টের মস্তিষ্কে বসে যাতায়াত তার।
পাপীর শেষ গমন দোজখের অগ্নিঘর, যদি না সে যাচে
শর্তহীন অনুকম্পা, আর যদি বা না পায় ক্ষমা বিধাতার।
পাপীরা চায় আঁধার, ঘোলা জল, দ্বিধাদ্বন্দ্ব। পরিষ্কার আলো,
ইতিহাস সাক্ষী আছে, পাপীদের কখনই লাগে নাই ভালো।
১৩/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
১১.
আঁধার ফুরিয়ে এলে পাপী সব পীর সাজে দিনের আলোকে।
আলো-আঁধারির ধাঁধা আবার কখন নামে সেই অপেক্ষাতে
সতর্ক সময় কাটে; পাখির ছানারা যেন শেয়ালের শোকে
বিপদের কথা ভুলে বেখেয়ালে বসে থাকে অন্ধকার রাতে।
মনের ভিতরে হাসি, মুখে তবু শোক-ছায়া ধূর্ত শেয়ালের;
পুরাতন গলিপথে আবারও হাঁটছে সে। পাখির ছানারা
অসাবধান হলেই ঢুকে যাবে শেয়ালের লোলুপ মুখের
ধাঁরাল দাঁতের নিচে; ইতিহাসের মা-পাখি জানে সেই ধারা।
তবু কেন আমাদের কেবলই ভুল হয় ? ধূর্ত শেয়ালেরা
বারবার ফিরে আসে আমাদের বেখেয়াল সময়ের ফাঁকে।
একবার খুঁজে পেলে মধু-ভরা সে মৌচাকে বন্য ভাল্লুকেরা
আসবেই জানা কথা; লোভী জিহ্বা বারবার সেই পথে ডাকে।
সরল মানুষগুলো জ্ঞানপাপীর মদদে খেসারত দেয়;
পাপীরা সবাই মিলে সারল্যের মুনাফাটা ভাগ করে নেয়।
১৩/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
১২.
হয়েছ খেলার গুটি, নও তুমি খেলোয়াড়; তোমারে চালায়
দূরে বসে আর কেউ। অন্ধ তুমি, বন্ধ চোখে দেখতে পার না,
কোথা হতে কোন হাতে নড়ে ওঠো নিমিষেই কার ইশারায়।
কে তোমারে লুটে খায়, ইতিহাস-অচেতন, নেই সে ধারণা।
পুরাতন দিনগুলো প্রয়োজনহীন নয়; প্রতিটি দিনের
পরতে পরতে লেখা রয়েছে অভিজ্ঞতার অসংখ্য কাহিনী।
খেলোয়াড় প্রাণপণে মুছে দিতে চায় সেই স্মৃতি অতীতের;
ইতিহাস যে মোছে না, ভুলে গেছে আজ তা কি পাপীর বাহিনী ?
ভোলে নাই, ভোলে নাই— ওরা তাই সবে মিলে নতুন নাটক
মঞ্চে সাজিয়ে তুলছে আলো-আঁধারির রঙে করতালি দিয়ে।
পুরোনো দিনের সেই পাপে-ভরা স্মৃতি নিয়ে পুরোনো ঘটক,
আবার এসেছে বুঝি শোনোতে মিথ্যের গান ইনিয়ে-বিনিয়ে ?
আর কতকাল ধরে পরের খেলার গুটি হয়ে রবে তুমি ?
তুমি কি দাস কারও ? এ তোমার বাড়ি-ঘর, তোমারই ভূমি।
১৪/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
১৩.
তোমার সে ঘর-বাড়ি কে দখল করে খায়, তোমার অজান্তে ?
তুমিই যে দায়ী আছ, কেউ তা বলেনি আগে। সে ভুলের দায়
কার পরে জোর করে চাপাতে চাইছ তুমি ? পার কি মানতে,
তোমারও দোষ ছিল ? ভুল ছিল অবিরত নিজের খাতায় ?
মানুষ আটকে গেলে, কেবল পরের দোষ খুঁজে ফেরে নিত্য;
কোথায় যে চোরাবালি, একবারও দেখে না তা হিসেব করে।
লোভে পড়ে টোপ গিলে তারপরে যন্ত্রণায় ফেটে যায় চিত্ত;
তখন পাপীর দল বড়শির ছিপ ধরে টান দেয় জোরে।
জলের মাছেরা সব শুকনো ডাঙার পরে ভালো থাকে কবে ?
বোকা বোকা লোকগুলো ভুল করে টোপ গিলে ছটফট করে;
তারা তবু অনুতাপে বারবার পুড়ে যায় ব্যথা-অনুভবে।
নেই সে অনুশোচনা ছিপ-ধরা পাপীদের নিষ্ঠুর অন্তরে।
ক্ষণিকের মোহে যদি চিরকালের যন্ত্রণা নিতে চাও কাঁধে,
তোমারে ঠেকায় কে বা, কার সাধ্য আছে বল, বারবার বাঁধে ?
১৪/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
১৪.
এখানে জ্ঞানীরা এসে সুযুক্তির আলো ফেলে পথের উপরে;
তারা সব দল বেধে একে একে মেলে ধরে হিসেবের খাতা।
জ্ঞানপাপী তখন কি অলস উদাস হয়ে থাকে চুপ করে ?
আলোর পথের পরে আঁধারের ছায়া ফেলে মেলে ধরে ছাতা।
এই যে নিয়ত দ্বন্দ্ব, এর কি সমাপ্তি আছে ? আছে সমাধান ?
পণ্ডিতের হয়তো বা নেই কোনো অসুবিধা; তারা সব জানে।
ওদের তর্কের ভিড়ে সাধারণ ও মূর্খের হাঁসফাঁস প্রাণ;
যখন যা শোনে তারা, জ্ঞানীর অমর বাণী নির্দ্বিধায় মানে।
জ্ঞানী আর জ্ঞানপাপী, এমন বিভেদ মনে থাকে না তাদের;
এমন বিভেদ তারা বোঝেও না কোনোদিন, সহজ সরল।
জোছনার আলো সে কি সূর্যেরই অনুদান ? চাঁদের নিজের ?
এসব জানে না তারা। জানে না কে লুটে খায় ক্ষেতের ফসল।
কী যে দ্বিধার পাথারে খাবি খায় দিনরাত; কী যে সে যন্ত্রণা !
সাধারণ মানুষেরা এ পাথারে কোথা পাবে বাঁচার মন্ত্রণা ?
১৫/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
১৫.
তোমার বসত-ভূমি, অথচ পাওনি তুমি নিশ্চিন্ত আবাস।
নিজের ঘরের দোরে বসে থাকো হাত পেতে; অনুমতি চাও।
তোমার টেবিল-খাট, খোলা জানালা-কপাট; করে বসবাস
কোথাকার সে তঞ্চক ? তারে তুমি মনে মনে কেন ভয় পাও ?
ভয়ের কারণ আছে; সকলের জানা আছে তারা একজোট।
সংখ্যায় যদিও কম, তবুও তারা নির্ভয়ে দলবেঁধে থাকে।
সরল মূর্খের দল পায়নি একতা-বল। মনে লাগে চোট ?
কার জানা নেই ভবে, বিচ্ছিন্ন মানুষগুলো ডোবে দুর্বিপাকে ?
ভালোতে-ভালোতে যদি টানা যায় ভেদ-রেখা, সুবিধার ডালা
আপনি হাতের পরে উঠে আসে সহজেই— ধূর্তের মুঠোয়।
সহজ-সরল লোকে এতকিছু ভাবেই না; এই এক জ্বালা।
এমন সুযোগে তাই অন্যের ক্ষেতে তঞ্চক এসে ধান রোয়।
নিজের জমিতে তুমি অসহায় ভিনদেশি শ্রমিকের মতো,
সারাদিন খেটেখুটে মজুরির সুবিধায় হয়েছ আনত।
১৬/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
১৬.
তুমি তো মালিক সেথা, মজুর হয়েছ কেন নিজের খামারে ?
তাতেও যে দোষ নেই; যদি নিজের ফসল নিজেরই থাকে।
আর কেউ এসে যদি মালিক সাজতে চায়, তখন কি তারে
চোখ তুলে শুধাবে না, সে কোন বলে এ ক্ষেতে অধিকার রাখে ?
কোনোকালে হানাদার মানে না যুক্তির ধার, তার আছে পেশী;
জোটের লোকেরা তারে চিরকাল বারেবারে দিয়ে যায় বল।
গোপনে সেই পাপীরে করেছে কি সহায়তা কোনো প্রতিবেশী ?
ছিল কোনো বিভীষণ ? রাবণ-বধের কাজ করেছে সফল ?
তুমি তো রাবণ নও; পুণ্যবতী কোনো সীতা তোমার এ হাতে
অপহৃত হয় নাই। রাখনি পরের ধন জোর করে কাছে।
অথচ তোমার সব লুটে নিয়ে গেছে কারা একদিন রাতে;
সে খবর জানা নাই! এখন বিরান মাঠ শূন্য পড়ে আছে।
কারে তুমি দোষ দাও ? আফসোসে বল বুঝি সে দোষ ভাগ্যের ?
কিছুটা অন্যের দোষ; করেছ অধিক ক্ষতি নিজেই নিজের।
১৬/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
১৭.
একবার যেই ভুল ঘটে গেছে অগোচরে, তার কী উপায় ?
কেবলই অনুতাপে পুড়ে কি পাবে সে আর সম্বল ফেরৎ ?
অনুতাপে পাপ ক্ষয়; আর যা-যা গেছে চলে, ফিরে পেতে তায়
তোমারে পণ্ডিতদলে এতকাল এত রূপে কী দিয়েছে মত ?
তুমিও জোটাও জোট; ভালো আর ভালো মিলে এক যদি হও,
গলা ছেড়ে যদি তোলো আওয়াজ উচ্চৈঃস্বরে, দেখাও সাহস,
কে আছে রক্ত-চোখের ভয় দেখায় তোমারে ? তুমি পাপী নও।
দল বেঁধে কেড়ে আনো তোমার সম্পদে ভরা সকল কলস।
যদি কেউ মুছে দেয় তোমার পুণ্য-অতীত, তোমার কৃতিত্ব
কেউ হেসে অপমানে ফেলে দেয় ধুলোমাখা পথের উপরে,
নতুন কাগজ ভরে আবার সেসব লেখ। মায়ের সতীত্ব
নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছে, তারেও কিভাবে তুমি দাও ক্ষমা করে ?
একবার যা হারায়, তার সবটা আবার ফেরৎ আসে না।
সম্পদের খেয়া যদি থই-হারা জলে ডোবে, সবটা ভাসে না।
১৬/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
১৮.
তবু আশা থাকে মনে, যতটুকু ফিরে আসে, তাই কম কিসে !
সব হারানোর চেয়ে কিছু যদি ফিরে পায়, সেও তো ভালোই।
হয়তো বা ভুল ছিল; ভুলের মাশুল দিতে বেদনার বিষে
জ্বলেছে তো বহুদিন। এবার না হয় কিছু ফেরৎ পেলই !
ফেরৎ কি অনায়াসে সহজেই হাতে আসে ? বুদ্ধি আর শ্রম
একসাথে যদি কভু মিলেমিশে কাজ করে, কেবল তখন
খানিকটা আশা থাকে। প্রতিজ্ঞা ধরে রাখার নেই যার দম,
শুধু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পায় না ফেরৎ তার সাধের রতন।
কত শত দেখা যায় মুখে শুধু হায় হায়, আসল কাজের
নেই কোনো আয়োজন; অলস অসাড় হয়ে পড়ে থাকে কোণে।
তবু তারে ভালো বলি, জেনেছে যে এতটুক, এ ধন তাদের;
সময় সুযোগ পেলে ফেরতের আশা যার জেগে থাকে মনে।
ক্ষেতের মালিকানায় নিজেদের অধিকার থাকে যার জানা;
সহজে লুটেরা দল সোনার ফসলে তার দেয় না যে হানা।
১৬/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
১৯.
নিজের-পরের ভেদ ভুলে গিয়ে পাপীদলে কত কী যে করে।
পরের শ্রমের ফল জোর করে কেড়ে নিয়ে গোলায় ওঠায়।
গুণীজনে বলে গেছে, পাপী সব সাত-ঘর সাথে নিয়ে মরে;
আগুন নাগালে পেলে পোড়ানোর সবকিছু নীরবে পোড়ায়।
আগুনের অনুতাপ কেউ কি দেখেছে কোথা পোড়ানোর পরে ?
যদি পারে, সব কিছু ছাই করে দিয়ে শেষে নিজেই ফুরায়।
পাপীরাও ঠিক তাই, দুঃখের বালাই নাই তাদের অন্তরে;
সব নষ্ট করে দিয়ে হারায় ইতিহাসের ঘৃণ্য নর্দমায়।
যতদিন টিকে থাকে জ্বালিয়ে সকল কিছু করে ছারখার;
নিভতে নিভতে শিখা বাতাসে ছড়ায় ধোঁয়া, নিভেও নেভে না।
জ্ঞানপাপী দলগুলো তোমার হেদায়েতের ধারে না যে ধার;
মৃত্যুর আগেও তারা জগতের কাউকেই প্রশান্তি দেবে না।
আগুনের ফুলকিও উদাসীনতার ফাঁকে প্রমাদ ঘটায়;
পার তো নিভিয়ে ফেল পাপের ফুলকিগুলো পুণ্যের ছিটায়।
১৬/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
২০.
দু’নয়ন ভরে ছিল সবুজ ঘাসের মতো সতেজ স্বপনে;
হাওয়ায় স্বপ্নগুলো মৃদুমন্দ দুলেছিল— নয়ন-মোহন।
কোথাকার মত্ত হাতি কী সুখ মেটাতে এলো সে স্বপ্ন-কাননে ?
মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে তবেই থামাল তার ক্ষিপ্ত উন্মাদন।
মানুষের স্বপ্নগুলো কারা যেন চিরকাল এইভাবে এসে,
ভেঙে করে চুরমার; নিষ্ঠুর দু’হাত দিয়ে স্বপ্নের গোড়ায়
ধারাল কুঠার নিয়ে সজোরে বসায় কোপ। চলে যায় ভেসে
ছিন্নমূল স্বপ্নগুলো; মহাকাল-স্রোতে তারা সতত হারায়।
তবু আগাছার মতো অবাধ্য অদম্য স্বপ্ন বেঁচে থাকে কিছু;
মানুষে মাড়ায় তারে, ছাগলেও মুড়ে দেয়, তবু টিকে থাকে।
খরায় কিবা বন্যায় কিছুতেই ছাড়ে না সে জীবনের পিছু।
ঝড়ের সম্মুখে বসে আকাশের ক্যানভাসে ফুল-ফল আঁকে।
নদীর ভাঙন হয়ে চোরা-পথে পাপীদল কখন হঠাৎ,
সমূলে স্বপনগুলো রাক্ষসী উদরে তার করে আত্মসাৎ।
১৭/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
২১.
খুব সাবধানে থেক, স্বপ্নজীবী মানুষেরা ! শকুনের চোখ
দিবানিশি খুঁজে মরে; তোমাদের দেহ-মনে স্বপ্নমাখা স্বাদ।
তোমার স্বজাতি ভোগে এইসব শকুনের ছিল এক রোখ;
আবার ভেব না যেন তাদের সেই স্বভাব দিয়ে দিছে বাদ।
এখনও স্বপ্ন-দেখা মানুষের পানে তার লোভাতুর চোখ;
এখনও ক্ষুধা আছে, এখনও রক্ত-লোভ সে জিহ্বায় জাগে।
দেখাবে মুহূর্তে এসে কতটা ধারাল তার ঠোঁট আর নখ,
এখনও পায় যদি একবার তোমারে সে নিজেদের বাগে।
খুব সাবধানে রেখ নিজের স্বপ্নের বীজ; কেউ যদি এসে
অঙ্কুরে বিনষ্ট করে, শেষ হয়ে যাবে সব স্বপ্নের ফসল।
চেয়ে দেখ স্বপ্নচাষী, কিভাবে সাধের ক্ষেত বানে যায় ভেসে !
তবুও সইতে হয় কষ্টের কাঁটায় বিঁধা এতটা ধকল।
তবু সে আঁকড়ে ধরে নিজের ক্ষেতের মাটি, লাঙল চালায়;
তবু সে ঘামের দামে আবারও বীজ বুনে ফসল ফলায়।
১৭/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
২২.
সাবধানে রেখ সব যত দলিল-কাগজ; ধারাল দাঁতের
ইঁদুরের উৎপাত বেড়েছে অনেক বেশি— দিনরাত ঘোরে
সারা ঘর-বাড়ি জুড়ে। কখন যে কেটে ফেলে তোমার স্বপ্নের
সোনার সনদগুলো ! সাবধানে রেখ সব চোখের নজরে।
ইঁদুর সুযোগ পেলে কেটে দেবে দরকারি দলিল-কাগজ;
সুযোগে কাটবে তারা যত্নের ধানের গোলা, বালিশ-কম্বল।
মাঠের ফসল কাটে, কাটে উঠোনের মাঝে গর্ত হররোজ;
সে গর্তের গলিপথে সাপ এসে ঘরে ঢোকে— ভয়াল ছোবল।
সাপে যে ইঁদুর ধরে, তাতে কি আনন্দ আছে ? আছে কোনো বোকা,
ইঁদুর তাড়াতে গিয়ে সাপেরে আহ্বান করে ঘরের ভিতর ?
কে আছে এমন লোক, যারে এত সহজেই দিতে পার ধোঁকা ?
প্রণয়ের ফাঁদে ফেলে বিষধর সাপ যার কেড়েছে অন্তর ?
খুব সাবধানে থেক সরল গৃহস্থ সব, সাবধানে থেক;
যত্নের ফসল আর সোনার সনদগুলো সাবধানে রেখ।
১৭/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
২৩.
মানুষ অদ্ভুত জীব; কেমন হঠাৎ করে মুহূর্তে পাল্টায়।
পরের অধিকারের ধন ফেরৎ চাইলে সে বিরক্ত হয়।
যেন কেউ করুণার পাত্র সেজে তার কাছে রোজ আসে-যায়;
একবারও ভাবে না, সজোরে আঁকড়ে ধরা ধন তার নয়।
পরের সম্পদে সুখ এতই কি বেশি আছে ? সহজে ছাড়ে না ?
অন্য বাড়ির সন্দেশে মজা কি একটু বেশি ? খেতে চায় মন ?
সব যুক্তি শেষ হলে মানুষেরা তখনও বলবে, ‘না রে, না;
আমার হাতের ধন কিছুতেই দেব না, এ আমার এখন।’
পরের সম্পদ যদি নিজের নিকটে থাকে কিছুকাল ধরে,
মনে হয় এ যেন বা আমারই ধন ছিল; এ আমার ভোগে
ব্যয় করে ফেলি যদি, তাতে কেন অযথাই তোমার অন্তরে
ব্যথা পাও ? কোথা হতে ধরেছে তোমারে আজ এই নষ্ট রোগে ?
মানুষ অদ্ভুত জীব ! পরের সম্পদে ভরে বাড়ির উঠোন।
তারপর দিনরাত কুযুক্তির সুতো দিয়ে বাঁধে তার মন।
১৮/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
২৪.
তবুও মানুষ তার নিজের মনের তল পায় নাই খুঁজে;
কী দিয়ে যে মন বাঁধে, সে-খবর জানা নাই কোনো মানুষের।
তাই কি মানুষ তার মন খোঁজে সম্পদের নিচে মাথা গুঁজে ?
তাই কি সে মসজিদে আর মন্দিরে পেয়েছে খবর মনের ?
কে কোথায় খুঁজে পায়, কোথায় যে কে হারায়, বোঝা বড় ভার।
কতজনে ভুল করে পাপ-পথে খুঁজে ফেরে মনের হদিস।
পুণ্য-পথের পথিক যতই টানুক তারে, ফেরে না সে আর;
পাপ-পথে একবার ঢুকে গেলে বারবার টানে ইবলিস।
চতুর পাপীর দল সুকৌশলে ঠেলে দেয় পতনের বাঁকে;
তবু মনে মনে ভাবে, পাপীদল কখনই তার শত্রু নয়।
ভুল পথে এত সুখ ? স্বেচ্ছায় নিজের চোখ বন্ধ করে রাখে ?
সামনে গভীর খাদ; অথচ নেই উদ্বেগ— এ বড় বিস্ময় !
শিখে রাখ মানুষেরা, তোমাদের নিজেদের ভালো আর মন্দ;
শিখে রাখ কোথা আছে পতন আর উত্থান— জীবনের ছন্দ।
১৮/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
২৫.
জীবন সুন্দর বটে; সে কথা জানতে হলে চোখ-কান খোলো।
অন্ধের চোখের পরে পৃথিবীর রঙ-রূপ সব অর্থহীন।
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখ; কতটা গভীর রাত। সকাল কি হলো ?
ভোরের পাখিরা কই ? হাতের মুঠোয় রেখ আলোকিত দিন।
আলোর পরশে সব একে একে জেনে নাও, কোন রঙে ফোটে
কোন ফুল কোন বেলা; আবার কখন তারা ঝরে যায় সব।
রাতেও যে কিছু ফুল নীরবে গন্ধ বিলায়, রাতে ফুটে ওঠে;
রাতের আঁধারে তারা চুপিচুপি জেগে থাকে, করে না গৌরব।
দিনও ফুরিয়ে যাবে দিনের নিয়ম মেনে, খুব স্বাভাবিক।
যখন আঁধার নামে, পশ্চিম দিগন্তে ডোবে আলোর দেবতা,
অন্ধকারে সাবধানে বুঝে-শুনে পথ চলো; ঠিক রেখ দিক।
আবার সকাল হবে, আলোয় ভাসবে সব; আছে নিশ্চয়তা।
কেবল আঁধারে যদি ভুল পথে পা বাড়াও, চলে যাও দূরে;
হয়তো সময়ে তুমি লক্ষ্যে পৌঁছাবে না আর; হাসবে অসুরে।
১৮/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
২৬.
অসুরেরা চিরকাল ঠেলেছে তোমারে নিচে, ফেলে দিছে খাদে;
এখনও বসে নেই, সুযোগের অপেক্ষায় দিন গোনে তারা।
এখনও মনে মনে অবিচল আশা নিয়ে তারা বুক বাঁধে।
এখনও ধরে আছে পাপের ইতিহাসের পুরোনো সে ধারা।
তুমি সে-ইতিহাসের সবটুকু হয়তো বা জানো নাই আজো,
একবার চোখ খুলে অতীতের ধুলো ঝেড়ে ইতিহাস পড়।
তোমারে বাজায় ঢুলি; সব কথা না জেনেই কেন তুমি বাজো ?
কিসের লোভে সে ঢুলি তোমারে বাজাতে চায়, তা তালাশ কর।
পিছনের কলকাঠি গোপনে নাড়ায় কারা ? খুঁজে কি দেখেছ ?
এমন কি আছে কেউ, সাধুবেশে চারপাশে ঘোরাফেরা করে ?
চেন না তাদের তুমি; সরল বিশ্বাসে তাই সহসা ভেবেছ
প্রাণের দোসর ওরা— দেখ নাই বিষদাঁত মুখের ভিতরে।
সুরের জগতে আছে অসুরেরা ওত পেতে; ভিড়ে-ভরা মাঠে।
মুখোশ খুলবে তারা— যখন আঁধার নামে, সূর্য অস্তপাটে।
১৮/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
২৭.
সেই আঁধারেও আহা, মনে হবে সব এক; ভালো আর মন্দ
বোঝা বড় ভার হবে— সে এক কঠিনতর পরীক্ষার রাত।
অচেনা সেই আঁধারে কী জানি কী ভয়ে ধরে; বাড়ে হৃৎস্পন্দ;
চেনা-জানা প্রিয়মুখ, সাবধানে নিজেদের ধরে রেখ হাত।
সে-আঁধারে একা পেলে নেকড়ের পাল এসে ছিঁড়ে নেবে দেহ;
একা মানে অসহায়; একথা জানতে এত দেরি কেন হয় ?
তোমারে প্রলুব্ধ করে দলছাড়া করে দেবে কখন যে কেহ,
যদি না সতর্ক হও। জেনে রেখ নেকড়েরা চতুর নিশ্চয়।
আঁধার পেরিয়ে এলে স্বস্তির নিশ্বাস নিও— উদাসীন হয়ে
নাক ডেকে ঘুমিও না। তোমার গবাদি পশু মাঠে-ঘাটে থাকে;
তারাও যে নেকড়ের নজরে রয়েছে খুব— তাদের নির্ভয়ে
ঘরে তুলে আনা চায়; ওদের কে আছে আর নিরাপদে রাখে ?
একা একা ভালো থাকা, ভালো কথা নয় মোটে। সকলে মিলেই
ভালো থাকা চায় আজ; সেও অসম্ভব নয়— একত্র হলেই।
১৮/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
২৮.
মানুষ কি স্বভাবেই হারামির একশেষ ? পরশ্রীকাতর ?
মহৎ যে আছে কত ? ঘরের খেয়ে বনের মহিষ তাড়ায় !
তবে কি মানুষগুলো দুই ভাগে ভাগ করা ? তবে কি ঈশ্বর
নিজেই নকশা করে ভালো আর মন্দ নিয়ে জগৎ চালায় ?
কার কাছে সে-উত্তর ? কে নিরপেক্ষতা মেনে করবে বিচার ?
এমন ভাবের কথা নিরাময় করে নাই উদরের ক্ষুধা।
এমন ভাবের কথা বান-ভাসি মানুষেরে করেনি সঞ্চার
সান্ত্বনার অনুভূতি; গৃহহীন নিরাশ্রয় করেছে বসুধা।
নিজেরে ঈশ্বরে সঁপে বসে থাকার সুযোগ কোথাও তো নেই।
ভাগ্য এসে হাতে ধরে কাউকে তোলে না টেনে; নিজের গরজে
দাঁড়ানোর উপায়টা খুঁজে নেয় সকলেই। সে-নীতি মেনেই
পেতে পার মাঠ-ভরা প্রশান্তির অবারিত ফসল সহজে।
মানুষেরা দুই ভাগ— একদল অন্ধকারে টেনে নিয়ে যায়;
আলোর পূজারি দলে সে-আঁধারে আলো ঢেলে তোমারে বাঁচায়।
১৮/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
২৯.
মানুষের পরে যদি অবিশ্বাস এসে যায়, সে বড় দুর্ভাগ্য !
অথচ বিশ্বাস করে পদে পদে ঠকে গেছে স্বজাতি মানুষ।
মানুষেরে অবিশ্বাস মহাপাপ, এই কথা বলেছে যে প্রাজ্ঞ,
সে মহামানব আজ জানি না কোথায় আছে— হুঁশ কি বেহুঁশ।
তবু তাঁর সেই কথা প্রাণপণে বুকে চেপে আগলায়ে রাখি,
মানুষ তো আমারই নিজের জ্ঞাতি হয়েই চিরকাল রবে।
তবু যত ভয় আছে মানুষের দুই হাতে, আকাশের পাখি
বলেছে আমারে সব; দিনের শেষে সন্ধ্যায় ভীত-কলরবে।
যে-মানুষের দু’হাত ভয়ের বর্শা চালায় স্বজনের বুকে,
যে-মানুষ কেড়ে নেয় ভাইয়ের বাড়ি-ঘর, আপন ঠিকানা,
এ অবিশ্বাস-দুর্যোগে তারেও বিশ্বাস করি বল কোন সুখে ?
অবিশ্বাস-মহামারি মানুষের ঘরে ঘরে দিয়ে যায় হানা।
দুর্জনের ভয়ে ভয়ে চিনিনি আপন-পর, ছেড়েছি সকল;
সেই ফাঁকে চলে যায় আমার স্বজন সব— জীবন বিফল।
১৮/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৩০.
আমি কি ছাড়তে চাই আমার আপন-জনে ? পাপীরাই এসে
সন্দেহের দেয়াল তুলে দেয় স্বজনের হৃদয়ের মাঝে।
স্বজনও ভুল পথে বহুবার হেঁটে গেছে; বহুবার হেসে
ছুড়েছে সুচালো তির— সে-ব্যথা বুকের তলে এখনও বাজে।
স্বজন স্বার্থের মোহে ছিঁড়ে ফেলে রক্ত-ঋণ, নাড়ির বন্ধন;
পথে পথে কাঁটা ফেলে কত যাত্রা পণ্ড করে, গোপন আঘাতে
পুত্র পিতারে করেছে ছিন্ন-মস্তক নির্দয়ে— দেখেছি এমন;
ভাইয়ের ভিটা-মাটি দখলে নিতে মিলেছে দুর্জনের সাথে।
আমি তো চাই আমার সবটা উজাড় করে স্বজনের পাশে
বসে থাকি প্রতিদিন— আপন মুখের দিকে অপলক আঁখি।
দ্বিধা-সন্দেহের পাপ নীরবে-নিভৃতে এসে সে-সম্পর্ক নাশে;
ডালের আড়ালে বসে শিস দেয় কোনো এক সুচুতুর পাখি।
তবু কোনো একদিন কাঁধে-কাঁধে মিলে সব স্বজনে-স্বজনে;
অবিশ্বাস ঝেড়ে-মুছে ফেলে দেব, সেই আশা জেগে থাকে মনে।
১৮/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৩১.
সিন্ধুরও তল আছে; মনের পাই না কেন ? মনের কল্লোল
কেন এত তড়পায় ? যে-মনে পুণ্যের বাস, সে একই মনে
পাপেরও বসবাস ! এ বড় বিচিত্র লাগে— মনের কুশল
জানা কি সত্যিই ভার ? সে-প্রশ্ন মনেই বসে আছে সঙ্গোপনে।
মানুষ কি স্বভাবেই পাপের পূজারি হয়ে পৃথিবীতে আসে ?
পাপ কাজে মন তার উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে নিজের অজান্তে ?
কেবল ধর্মের বেড়া, সমাজের লোকভয়, শাসনের ত্রাসে
হেঁটেছে পুণ্যের পথে; আনন্দ-উচ্ছ্বাসে পুণ্য পারেনি টানতে।
এমন যুক্তির বলে পুরোনো পাপীরা যদি কেউ উচ্চস্বরে
চোখে চোখ রেখে বলে, যা করেছে সবই ঠিক; ভুল কিছু নয়—
পুণ্যবানেরা তখন বলবে কী সহসা সে প্রশ্নের উত্তরে ?
এমন প্রশ্ন কি কেউ কখনও করে নাই ? এ বড় বিস্ময়।
জেনে রেখ সকলেই, যারা সব জেনে-বুঝে ধরে আছে ভান,
মানুষের আত্মা ফেলে আজ হয়েছে স্বেচ্ছায় তারা শয়তান।
১৯/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৩২.
এখন ঘুমের মাঝে প্রতিদিন স্বপ্ন দেখি; মনে হয় কোনো
গভীর বনের ধারে আমি বসে আছি একা। যেন সেই বনে
হুক্কাহুয়া কলস্বরে সব চতুর শেয়াল ডেকে বলে, ‘শোনো,
এ বনে সিংহের দিন শেষ হবে অচিরেই, আছে কি তা মনে ?’
স্বপ্নের ভিতরে আমি আরও যেন দেখেছি, মগডালে বসে
সব কাঠবিড়ালিরা হাতিদের ডেকে ডেকে বলে, ‘তোরা কারা ?
এই বন ছেড়ে দিয়ে সব সুদূরে সরে যা। তা নইলে কষে
মারব এমনভাবে— হয়তো মরেই যাবি; কিংবা জ্ঞানহারা।’
সেই স্বপ্নের ভিতরে আমি খুন হই হেসে; এ কোন তামাশা ?
নাকি আসলেই বনে হাতি ও সিংহের পিছে ঘোরে কোনো ফেউ ?
এমন ঔদ্ধত্য ওরা কোথা পেল সেই বনে ? কারা দেয় আশা ?
জানি না সে বন-মাঝে কিসের বিদ্রোহ বাজে; জানে আর কেউ।
কাঠবিড়ালিরা চায় শেয়ালের সাথে মিলে বনের দখল;
সরল বোকার দল দেখেনি অতীত ঘেঁটে শেয়ালের ছল।
১৯/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৩৩.
আমি কি একাই শুধু এমন স্বপ্নের মাঝে রাত করি পার ?
আর কেউ কি দেখে না বনের স্নিগ্ধ হৃদয়ে ঝড়ের আভাস ?
আকাশে কি কালো মেঘ ? ঢেউগুলো তীরে এসে খায় কি আছাড়?
দেখাবে উগ্র নাচন ভান ধরে পড়ে থাকা প্রশান্ত বাতাস।
এমন স্বপন আমি কেন দেখি প্রতিদিন ? কিসের ইঙ্গিত ?
বন কি আসলে বন, নাকি অন্য কোনোকিছু— বুঝতে পারি না।
হেমন্তের ফসলের দিন বুঝি শেষ হলো ? নামবে কি শীত ?
কুড়াবে শুকনো পাতা আগুনের ওম পেতে পাতা-কুড়ানিরা।
কুয়াশায় ঢেকে যাবে সকল পথের দিশা; দিবসে আঁধার।
সে কুয়াশায় গা ঢেকে আনবাড়ি যাবে কেউ; চতুর, অধরা।
গোপনে অন্য বাড়ির কূট-চালে ভেঙে দেবে তোমার সংসার।
শেয়ালের চতুরতা কাঠবিড়ালির চোখে পড়বে না ধরা।
রোজ রাতে স্বপ্ন দেখি; জেগে উঠে মানে খুঁজি— রোজ উঠি ভোরে।
কেউ কি আমারে কিছু স্বপ্নের মাঝে বোঝাতে চায় ঠারেঠোরে ?
১৯/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৩৪.
হতাশ-হতাশ লাগে, মাঝে মাঝে মনে হয় সব মানেহীন।
জগৎ দুর্বোধ্য লাগে; মনে হয় ঘটছে যা, কেন তা ঘটছে ?
যা ছিল প্রচণ্ড রূপে, মুহূর্তে হঠাৎ করে হয়েছে বিলীন।
মৃতপ্রায় পড়ে-থাকা সব যেন জেগে উঠে পলকে ছুটছে।
মনে হয় সব যেন নিয়তির কোনো খেলা, খেলার পুতুল
নিজেরা জানে না কিছু; শিশুমন কখন যে টেনে নেবে তারে।
মানুষেরা কি পুতুল ? কেন মনের ভিতরে আকাঙ্ক্ষা প্রতুল,
যদি বা তার নিজের বাসনার কোনো দাম না থাকে সংসারে ?
বাসনা-মত্ত মানুষ হিতাহিত জ্ঞান ফেলে ছুটছে কেবল;
কী যে চায়, কেন চায়— নিজেই কি জানে তার সবটুকু মানে ?
এসব ভাবার তার হয়তো সময় নেই; ক্ষেতের দখল
নিতে হলে ছোটা চায় আরও জোরে, সে শুধু এতটুকু জানে।
সকলেই দিগি¦দিকে কেবলই ছুটে চলে— দৌড় আর দৌড়;
ইচ্ছের ঘোড়ায় চড়ে মন যাবে বহুদূরে; দু’নয়নে ঘোর।
১৯/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৩৫.
মানুষের কত লাগে ? কতটা পেলেই তবে সে ক্ষান্ত হবে ?
আরও চায়, আরও— এমন চাওয়া সে তো পাপের লক্ষণ।
এত-এত সম্পদের পাহাড় মাথায় করে কতকাল রবে ?
জমানো পাহাড় হতে একটা জীবনে করে কতটা ভক্ষণ ?
একটা জীবনে তারা কত মানুষের বুক খালি করে দেয়;
একটা জীবনে তারা কত বুকের গভীরে তীক্ষ্ণ তির হানে।
বিনিময়ে যতটুকু পাপের ফসল তারা ঘরে তুলে নেয়,
সে ফসল একদিন গলার কাঁটার মতো দুঃখ ডেকে আনে।
সুখ পেতে মানুষেরা পরের ভাতের থালা শূন্য করে ফেলে;
সুখ পেতে মানুষেরা পরের খাবারে বিষ গোপনে মাখায়।
সুখ কি জুয়ার মতো ? চিরকাল মানুষের আত্মা নিয়ে খেলে ?
অথবা নেশার মতো— পাপ-পুণ্যের হিসাব থাকে না মাথায়।
তবু কিছু মানুষেরা সুখের সন্ধান করে অন্য এক পথে;
সে পথে যন্ত্রণা আছে, তবু তারা নির্দ্বিধায় চড়ে পুণ্য-রথে।
১৯/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৩৬.
অমসৃণ পুণ্য-পথে কায়ক্লেশে চলে ধীরে পুণ্যের সে রথ;
পাপের পথিক-দলে চিরকাল কোলাহলে আনন্দে উচ্ছল।
জগতে যন্ত্রণা আছে, আছে বেদনার ভার; তবু যারা সৎ,
দুর্গম পুণ্যের পথ হাসি-মুখে পাড়ি দেয়, বুকে থাকে বল।
যন্ত্রণা অসহ্য লাগে, তবু গভীর আবেগে ধীর পায়ে চলে;
জানে তারা পুণ্য-পথে পদে পদে বাধা আছে। অসতর্ক হলে
সহজে ফসকাবে পা; পাপীর দলেরা এসে নতুন কৌশলে
আচমকা কোন ফাঁকে ঠেলে ফেলে দেবে কোনো সুগভীর জলে।
সাঁতার জানে না যারা, পাপের সাগর হতে ফিরবে কী করে ?
সাঁতারও কি সহজ, অথই সাগর-জলে ? উদাসীনতার
সামান্য সুযোগ নেই— পুণ্যের পথিক সবে হাতে হাত ধরে
সাবধানে পা ফেলায়; সাবধানে চলে তারা কাতারে কাতার।
পিপাসা মিটাতে পাপী পাপের গরল—মাখা জল করে পান;
যন্ত্রণার পথে পথে অমৃত সন্ধান করে সব পুণ্যবান।
১৯/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৩৭.
মাঝে মাঝে মনে হয়, এই পাপ আর পুণ্য, এ কেবল খেলা;
জগতে লড়াই করে কেবল টিকে থাকাই সবশেষ কথা।
সময়ের দায় মেনে ফুরায়ে আসবে যবে জীবনের বেলা,
ভালো-মন্দ চুকে যাবে; হিসেবের খাতা-জুড়ে শুধু নিরবতা।
টুপ করে ঝরে যাব কোনো এক আগামীর অনিশ্চিত ক্ষণে,
ভালোবেসে কেউ কেউ দাঁড়াবে দেহের পাশে, চেয়ে রবে মুখে;
কেউ কেউ চুপিচুপি খুলবে নিন্দার ঝুড়ি, গোপন কূজনে
অভিশাপ দেবে তারা, আমার কারণে যারা জ্বলেছিল দুখে।
মাঝে মাঝে মনে হয়, মরণের পরে আর কোনো কিছু নেই;
পৃথিবী স্বর্গ-নরক, পৃথিবীই সবকিছু— এই পারে সব।
অন্যলোক নিয়ে যারা ভাবছে অনেক কিছু— হারিয়েছে খেই;
অলীক বিশ্বাসে তারা জগতের সবখানে মিছে করে রব।
মাঝে মাঝে ভাবি বসে, কোথা হতে পাই আমি এ ভাবের কথা ?
আমিই যে ঠিক পথে, আছে কি তার অন্যূন কোনো নিশ্চয়তা ?
১৯/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৩৮.
এমন ভাবনাগুলো জেগে কি উঠছে শুধু পাপীর হৃদয়ে ?
আমি কি পাপের পথে বাড়িয়ে দিয়েছি আজ দুই পা আমার ?
কে আছে উত্তর দেবে যুক্তির নিয়ম মেনে একান্ত নির্ভয়ে ?
যুক্তির আড়ালে বসে মুক্তির পথ কি তবে করে হাহাকার ?
তবে কি যুক্তির ধার ধারবে না কেউ আর ? পাপ-পুণ্য-চিন্তা
ধর্মের বিশ্বাস ফেলে আইনের ফাঁক গলে বাইরে বেরোবে ?
অধর্মের পথে পথে নাচবে সবাই মিলে তা-ধিন ধিন-তা;
পাপীরা সুযোগ পেলে তোমার সবটা নিয়ে দেয়াল পেরোবে।
কে বলেছে ধর্মচিন্তা যুক্তির পথে হাঁটে না ? তুমি কার কাছে
জানতে চেয়েছ সব ? সে জন জানে না বলে মুহূর্তে ভেবেছ,
প্রগাঢ় বিশ্বাসে ভরা ধর্মের আকাশ জুড়ে শুধু শূন্য আছে।
কেবল যুক্তির পথে জগতের কতটুকু জানতে পেরেছ ?
মানুষের আত্মা-জুড়ে যতটুকু বিশুদ্ধতা এখনও আছে;
কৃতজ্ঞ হৃদয়ে তারা আমরণ ঋণী রবে ধর্মেরই কাছে।
২০/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৩৯.
ভুল হয়ে যাচ্ছে সব, যাচ্ছে সব ভেঙেচুরে, উলট-পালট;
আমার চেনা জগৎ এখন তো নেই আর, সবই অদেখা।
মাঝপথে একা একা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবি কোথায় হালট,
কোন দিকে গেলে পাব ক্ষেতের সন্ধান আমি ? ফসলের দেখা ?
চেনা-চেনা মুখগুলো কেমন অচেনা লাগে, ভুল করে ফেলি;
মনে হয় কোনোদিন দেখি নাই তারে আমি, সে যেন নতুন।
বারবার মনে মনে অতীতের স্মৃতি-ঘেরা সব পাতা মেলি;
তবু মেলে না সে মুখ— মনে মনে কতবার হয়ে যাই খুন।
খুন হয়ে যাওয়াটা এখন কি স্বাভাবিক ? আগেকার দিনে
ডাক দিলে নির্দ্বিধায় দিনরাত ভুলে গিয়ে আসতো সবাই।
এখন উত্তরে যদি কেউ ডাকে আর্তস্বরে, সকলে দক্ষিণে
চুপিচুপি সরে পড়ে— জগতে কোথাও যেন আর কেউ নাই।
ভুল হয়ে যাচ্ছে সব; পর হয়ে যাচ্ছে আজ আমার মানুষ;
হয়তো এখন আমি ভীষণ পুরোনো লোক— দারুণ বেহুঁশ।
২১/০৭/২০২৫, ফরিদপুর
৪০.
দ্বিধা নিয়ে মাঝপথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখি চারিধার;
একদিন দেখেছি যা, কোথায় হারাল সব চোখের পলকে ?
যাদুর মতোন যেন গিয়েছে অদৃশ্যলোকে— বিস্ময় অপার।
যেন এতকাল ধরে কেবলই কল্পনায় দেখেছি দু’চোখে।
কেবলই ভুল হয়— একদিন যে আমার ভিটে-মাটি সব
দুই হাতে কেড়ে নিছে, তারে আজ আপনের মতো লাগে।
আজ সে আমার পাশে স্বজনের মতো এসে করে কলরব।
আজ সে দেখায় প্রেম, যেন খুঁজেছে আমারে তীব্র অনুরাগে।
আমি কি ভুলেছি সব? আমার স্মৃতি এতই হয়েছে মলিন ?
পুরোনো সে ব্যথাগুলো বুকের গভীর তলে জেগে থাকে রোজ।
মুখে হাসি ধরে রাখি; বুকে যত ক্ষত তুমি করেছ সেদিন,
এখনও সারে নাই— আমি ছাড়া আর কেউ জানে না সে খোঁজ।
আজ আবার যখন ডাকে আগের মতোই প্রেমে-অনুরাগে,
আবার নতুন করে তারে দেখে এ অন্তরে ভয় এসে জাগে।
২১/০৭/২০২৫, ফরিদপুর




