বাংলায়ন : কুমার প্রীতীশ বল
(বানু মুশতাক: দক্ষিণ ভারতের কর্নাটক রাজ্যের একজন লেখক, মানবাধিকারকর্মী এবং আইনজীবী। তিনি ছয়টি ছোটগল্প সংকলন, একটি উপন্যাস, একটি প্রবন্ধ সংকলন এবং একটি কবিতা সংকলনের লেখক। তিনি কন্নড় ভাষায় লেখেন। বানু মুশতাক কর্নাটক সাহিত্য একাডেমি এবং দানা চিন্তামণি আত্তিমব্বে পুরষ্কারসহ নানান পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর আগে উর্দু, হিন্দি, তামিল এবং মালায়ালাম ভাষায় তাঁর লেখা অনূদিত হয়েছে। ‘হার্ট ল্যাম্প’ তাঁর ছোটগল্পের ইংরেজিতে অনূদিত প্রথম গ্রন্থ। এটি বুকার আন্তর্জাতিক পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছে। দীপা ভাস্তি : দক্ষিণ ভারতের একজন লেখক এবং অনুবাদক। তাঁর কলাম, প্রবন্ধ এবং সাংস্কৃতিক সমালোচনা ভারত এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর অনূদিত কন্নড় সাহিত্যের মধ্যে রয়েছে কোটা শিবরাম করণথের একটি উপন্যাস এবং কোডাগিনা গৌরাম্মার একটি ছোটগল্প সংকলন। ইংরেজিতে তাঁর অনূদিত বানু মুশতাকের গল্প ভারতের সম্মানজনক পুরষ্কার ‘পেন ট্রান্সলেটস পুরষ্কার’-এ ভূষিত হয়েছে। দীপা ভাস্তি’র ইংরেজিতে অনূদিত বানু মুশতাকের গল্পসংকলন ‘হার্ট ল্যাম্প’ ২০২৫ সালের বুকার আন্তর্জাতিক পুরষ্কার লাভ করে।)
মসজিদ থেকে ভোরের আজানের ধ্বনি যখন ভেসে আসছিল, ঠিক তখনই মুতাওয়াল্লি উসমান সাহেব বিছানায় উঠে বসলেন। তাঁর স্ত্রী আরিফা তাঁর পাশে নেই দেখে তিনি বেরিয়ে বসার ঘরে ঢুকলেন। দেখলেন, স্ত্রী এবং তাদের ছেলে আনসার কার্পেটে গভীর ঘুমে
আচ্ছন্ন। একটু দেখেই বুঝে গেলেন, তিন বছরের বাচ্চাটির শ্বাস-প্রশ্বাসে কিছুটা সমস্যা আছে। তিনি বুঝতে পারলেন কি হচ্ছে, ছেলের কপালে ভেজা কাপড়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দুধের বাটি, কাপ, চামচ, পানির জগ এবং গরম পানির বোতল যখন দেখলেন। আরিফা নিশ্চয়ই সারা রাত জেগে ছিল। এখন ঘুমিয়ে পড়েছে। স্পষ্টতই ক্লান্ত, ঘরের ভেতরেও… তিনি অপরাধবোধে ভুগছিলেন। তিনি ভাবছিলেন, আরিফার উপর কম্বল জড়িয়ে দেওয়া উচিত কিনা; কিন্তু তারপরে তিনি জামিলার স্বামীর কথা মনে করলেন। তাঁর ভ্রু কুঁচকে গেল এবং আরিফাকে জাগিয়ে তুলতে চাইলেন।
আরিফা তার ক্লান্ত ঘুম থেকে তৎক্ষণাৎ জাগল না। তাতে তাঁর রাগ হলো। একটি ছোট গান যা একজন ফকির গাইতেন তার মনে পড়ে গেল:
তুমি কেন এভাবে শুকর ডাকো?
মনে শুকর, ঘরে শুকর
শরীরে শুকর… গানটি অদৃশ্য হয়ে গেল। অধৈর্য হয়ে, সে এদিক-ওদিক ঘুরপাক খাচ্ছিল। হঠাৎ কি মনে হলো আরিফার পায়ে লাথি মারল। সে ঘুম থেকে উঠে সোজা হয়ে বসল।
শুকরের মাংস হারাম। একইভাবে রাগ। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা বিশ্বাস করে, তারা শুকর দেখলেই অপবিত্র হয়ে যায়। গানটি তাদের মন, শরীর এবং ঘরে যে রাগ ভেসে বেড়ায় তাকে শুকরের সঙ্গে তুলনা করে; মুতাওয়াল্লিও এটি বেশ কয়েকবার গেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সকালে, তার অযৌক্তিক রাগের মুখে।
‘কেন তুমি ভেতরে ঘুমাতে পার না?’ সে কর্কশ স্বরে জিজ্ঞাসা করল। তার উত্তরের অপেক্ষা না করেই বেরিয়ে গেল।
মসজিদটি তাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে। সে দ্রুুত হেঁটে গেল, লম্বা-লম্বা পা ফেলে ভোরের কুয়াশার পর্দা ভেদ করে। যদিও তার শরীর মসজিদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তার মন বারবার ঘরে ফিরে যাচ্ছিল, বিশেষ করে গত রাতে কী ঘটেছিল সেদিকে।
তার সবচেয়ে প্রিয় ছোট বোন, যে বোনকে সে মাধ্যমিক স্কুল শেষ করার আগে পর্যন্ত স্নেহের সঙ্গে লালন-পালন করেছিলেন, যে বোনকে সে পাঁচ বছর আগে বিয়ে দেওয়ার সময়ে আঠারোটি সিল্কের শাড়ি, সোনার গয়না এবং তার স্বামীর জন্য একটি মোটরবাইক দিয়েছিলেন; সেই বোন এসে পারিবারিক সম্পত্তির অংশ চেয়েছিল। তার জন্য তৈরি বিরিয়ানি আর পায়েস তেতো করে দিয়েছিল। আহা! এটা কেমন আচরণ ছিল? তার শরীর আবার রাগে জ্বলে উঠল।
তার উপর সে তর্কও শুরু করে দিয়েছিল! ‘ভাই, এটা সেই অংশ যার উপর আল্লাহ এবং নবীর শরিয়ত অনুসারে আমার অধিকার আছে; তুমি কঠোর পরিশ্রম করে নিজের জন্য উপার্জিত সম্পত্তির অংশ আমি তোমার কাছে চাইছি না’।
সে কী সম্পত্তি অর্জন করেছিল? সে কি কেবল তার বাবার জমানো সম্পত্তি পরিচালনা করত না?
‘আমাদের বাবার সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ আমার।’
ওহ! সে আসার আগে সবকিছু হিসাব করে ফেলেছিল। সে বলতে চেয়েছিল, ‘তোমার এক-ষষ্ঠাংশ অংশ নাও।’ তাকে একটু তিরস্কার করো। কিন্তু সে তার শরীর দখল করে অস্থিরভাবে লাফালাফি করা শুকরটিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। তার ছয় ফুট লম্বা স্বামীও পাশের চেয়ারে বসে ছিল একজন দেহরক্ষীর মতো।
‘মহল্লার সমস্যার জন্য তুমি এত সিদ্ধান্ত নাও। তোমার আমাকে ফোন করে বলা উচিত ছিল, এই নাও, তোমার ভাগ নাও। আমার পরিস্থিতি ভুলে যাও: সাকিনা আপার ব্যাপারটা ধরো। তার স্বামী নেই, কাজ করার মতো বয়সের সন্তানও নেই। সে তার দুই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে কীভাবে দেবে?’
মুতাওয়াল্লি সাহেব মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলেন। জামিলা এত কথা বলছিল, এটা কত আশ্চর্যজনক ছিল। কেন সে চুপ করে রইল? আমের বাগান, নারকেল বাগান, ক্ষেত, রেশম পোকা পালনের জায়গা এবং শহরের জমকালো বাড়ির ছবি তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। এর মধ্যে কোনটি সে তার চার বোনের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে?
জামিলা ব্যাঙের মতো ডাকতে থাকল। ‘বড় ভাইয়া, তুমি আমাকে একটা ভালো পরিবারে বিয়ে দিয়েছ, আমি বলছি না যে তুমি তা করনি। কিন্তু দয়া করে ভাবো। আব্বা মারা যাওয়ার দশ বছর হয়ে গেছে। তুমি যদি তখন আমার ভাগ আমাকে দিতে, তাহলে এখন পর্যন্ত আমি আমার বিয়েতে তুমি যা খরচ করেছ তার দশগুণ বেশি টাকা আয় করতাম। আমি এখন আর ওই সব টাকা চাইছি না। কিন্তু…’
মুতাওয়াল্লি সাহেবের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। আরিফা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্নভাবে এসব শুনছিল। তার মনে হয়েছিল, জামিলার কথা, তার কণ্ঠস্বর এবং তার যুক্তি সবই দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু তার দাবি ন্যায্য ছিল, তাই না? কে এটা অস্বীকার করতে পারে? যে বাড়ি থেকে মুতাওয়াল্লি প্রতি মাসে চার হাজার টাকা ভাড়া পেত, আর কফির দাম, দুটোই কি তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অংশ থেকে আসেনি? আরিফা জিজ্ঞাসা না করেই তার অংশ পেয়েছিল। তার বাবা-মা তাকে এবং মুতাওয়াল্লিকে তাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তাদের ভালোভাবে খাওয়ালেন, তাকে একটি নতুন শাড়ি এবং ব্লাউজ উপহার দিয়েছিলেন, তাদের হস্তান্তরিত সম্পত্তির নিবন্ধিত কাগজপত্র হস্তান্তর করেছিলেন এবং ভালোবাসার সঙ্গে তাদের বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন। জামিলাকে এখনই এর জন্য লড়াই করতে হচ্ছে।
মুতাওয়াল্লি সাহেব একটা কথাও বললেন না। তিনি বিড়বিড় করে উঠে দাঁড়ালেন এবং জামিলার দিকে একবার তাকালেন। বড় ভাইকে এভাবে দেখে সে একটু ভয় পেল। কিন্তু জমিলা তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে একটু সাহস সঞ্চয় করল। যেন মুখস্থ করেই শিখেছে, এমন তাড়াহুড়ো করে তার সিদ্ধান্ত জানাল: ‘যদি তুমি আমাকে আমার আইনি অংশ না দাও, তাহলে আমাকে আদালতের মাধ্যমে তা আদায় করতে হবে।’ নির্বাক মুতাওয়াল্লি সাহেব দ্রুত তার শোবার ঘরে চলে গেলেন। আরিফা, তার রাগান্বিত পদক্ষেপে ভীত হয়ে দ্রুত পাশ থেকে সরে গেল। হাল ছেড়ে দিল।
মুতাওয়াল্লি সাহেব মূর্তির মতো বসে রইলেন। এমনকি তার টুপিটিও মাথা থেকে সরালেন না। তার কপালে ঘামের বিন্দু তৈরি হলো। আরিফা এসে ফ্যানটি চালিয়ে দিল।
ঘটনার সমস্ত বিবরণ তার মনে ভেসে উঠল। শীতকাল ছিল বলে মসজিদের পিছনের বাথরুমে গরম পানি ছিল। অভ্যাসবশত সে অজু করল। নামাজও শেষ করল। যদিও সে তার শরীর পরিষ্কার করেছিল, তবুও তার মনে যন্ত্রণা রয়ে গেল। একদিকে জামিলার সাহস তাকে পীড়া দিচ্ছিল, অন্যদিকে সম্পত্তি লুট করার যন্ত্রণা। তাঁর প্রধান চিন্তা ছিল কীভাবে জামিলাকে শাস্তি দেবেন এবং পুরো সম্পত্তি নিজের জন্য রাখবেন। মসজিদটি ছিল বিশাল, এর নামাজের জায়গাটাও বিস্তৃত। ফজরের নামাজের জন্য আসা লোকের সংখ্যা তার আঙুলে গুনে গুনে করা যেত; তাদের মধ্যে তাঁর ঘনিষ্ঠদের কেউ ছিলেন না। তাই তিনি বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।
কিন্তু তিনি এখনই বাড়ি যেতে চাইছিলেন না। তিনি খুব ধীরে-সুস্থে হেঁটেও শহরের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছে গেলেন, তখন মদিনা হোটেল খুলেছে। তিনি হোটেলে ঢুকে এক কাপ চা খেলেন, তারপরও স্বস্তি বোধ করলেন না। খুব উৎসাহহীনভাবে হোটেল থেকে বেরিয়ে তিনি শহরের কেন্দ্রস্থলে এসে দাঁড়ালেন, যেখানে একজন পুলিশ দাঁড়ায়। সে বাঁশি বাজালো না এবং ট্র্যাফিক নির্দেশ করল না। সে চারদিকে তাকাল, কোনো দিকে যাবে তা ঠিক করতে পারল না, তার আচরণ ছিল বড্ড করুণ। তারপর অসম্ভব ঘটনাটি ঘটে গেল।
ধাপ! সে একটা শব্দ শুনতে পেল। কিছু বোঝার আগেই বিদ্যুতের তার থেকে একটা কাক পড়ে গেল। গাছের শুকনো পাতার মতো রাস্তায় পড়ে রইল। মুতাওয়াল্লি সাহেব কয়েক গজ দূর থেকে এটা দেখলেন এবং চলে যেতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় কোথা থেকে আরেকটি কাক বেরিয়ে এলো, কা কা কা করে ডাকতে লাগল। শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। কাকগুলো যেন জাদুর মতো জড়ো হতে লাগল। তার মনে হলো, এরমধ্যে কিছু কাক কান্না করছে। কিছু হিংস্র, রাগান্বিত। কিছু অলস, যেন তারা বাধ্যবাধকতা থেকে কাঁপছে। অন্যগুলো অভিশাপের মতো গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল; আবার কিছু স্বাধীনতা উদযাপনের তূরী বাজানোর মতো, কিছু খুশির ডাকের মতো। তিনি নানারকম অনুভূতি অনুভব করতে শুরু করলেন এবং পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কাকগুলো তার মাথার চারপাশে ঘুরতে লাগল যেন তারা আঘাত করবে। তিনি বিভ্রান্ত হয়ে এক পা এগিয়ে গেলেন। তাঁর চোখের কোণে, অটল কাকটি। আরে! দুর্ভেদ্য কালো রঙের মধ্যে কি এত রংধনুর রঙ ছিল?
যখন তিনি বাড়ি ফিরে আসেন, তখনও তাঁর মন খারাপ ছিল। তাঁর শোবার ঘরে যান, তখন মুতাওয়াল্লি সাহেবের ঘুম পাচ্ছিল। আরিফা ঘরের কাজে ব্যস্ত ছিল, তার অসুস্থ সন্তানের দেখাশোনা করার পাশাপাশি তার অন্য সন্তানের জন্য সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার, স্কুল ব্যাগ, জুতা, মোজা প্রস্তুত করতে এবং জামিলা ও তার স্বামীর জন্য বিশেষ খাবার তৈরি করতে ব্যস্ত ছিল। সে চায়নি যে বাড়ির মেয়েটি অভিশাপ দিয়ে বাড়ি থেকে মনে দুঃখ নিয়ে বেরিয়ে যাক। তার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল: ‘হাখদার তারসি তো আঙ্গার কা নুহ বারসি’…যদি অধিকার আছে সে যদি অসন্তুষ্ট হয়, তাহলে আগুনের বৃষ্টি নামবে।
আগের রাতে সে মুতাওয়াল্লি সাহেবকে ধীরে-ধীরে ফিসফিসি করে বলেছিল: ‘ওহে, ঘরের কোনো মেয়েকে কষ্ট দিও না। কোরানে স্পষ্টভাবে লেখা আছে, ‘একজন মেয়ের তার অংশের অধিকার আছে, তাই না? তোমার চার বোনকে ডেকে আন। তাদের যা দেওয়া উচিত তা দিয়ে তুমি পরিষ্কার হয়ে যাও। আমাদের যা আছে তাতে আল্লাহ আমাদের সমৃদ্ধি দান করবেন।’ আরিফা সাধারণত তাকে পরামর্শ দিত না। যদিও সে ভেতরে ভেতরে ভীত ছিল, তবুও সে এই বিষয়ে কথা বলল। মুতাওয়াল্লি সাহেব কত শত সিদ্ধান্ত একাই নেয়। তিনি তাকে কী না কী বলল সে ইতিমধ্যেই ভুলে গেল? বোরখা পরা তুচ্ছ এক মহিলার কথা কেন সে সহ্য করবে? ‘তুমি চুপ কর। তোমার কাজ কর’ বলে তিনি চুপ করে ঘুমিয়ে পড়লেন। তারপর নাক ডাকতে থাকলেন।
আরিফা অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে চাপাতি বানাচ্ছিল। ‘হে খোদা, ওকে একটু বুদ্ধি দাও’, মনে মনে সে কেঁদে উঠল। সে আনসারের কপালে একটা কাপড় চাপিয়ে দিল। যদিও সে যান্ত্রিকভাবে ময়দা মাখিয়ে চাপাটি প্যানের উপর উল্টে দিচ্ছিল, তবুও সে অনুভব করল, আনসার কষ্ট পাচ্ছে এবং দৌড়ে সেই ঘরে চলে গেল, যেখানে সে তাকে শুইয়েছিল।
ঠিক তখনই সে মহিলাটিকে দেখতে পেল। যদিও সে বোরকা পরেছিল এবং মুখ ঢেকে রেখেছিল। আরিফা তৎক্ষণাৎ তাকে চিনতে পারল। বোরকার ছিদ্র দিয়ে একটি নোংরা শাড়ি উঁকি দিচ্ছিল যা একসময় কালো ছিল এবং এখন পরতে পরতে ফ্যাকাশে বাদামি হয়ে গেছে। ফাটা গোড়ালি, বর্ণহীন ত্বক। হাওয়াই চ্যাপলগুলো সেফটিপিন দিয়ে সেলাই করা ছিল। আরিফা মহিলার অবস্থা স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিল এবং তারজন্য বিব্রত বোধ করছিল। মহিলাটিও ভেতরে আসেনি। কিন্তু মুতাওয়াল্লি সাহেবকে দেখতে আসা পুরুষদের সঙ্গে বারান্দায় রয়ে গেল। তাকে এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরিফার ভেতর থেকে একটা কথা অস্ফুট-স্বরে বেরিয়ে আসল। সে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে বারান্দা থেকে বসার ঘরটি আলাদা করে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘সাকিনা আপা, আমি তোমার সঙ্গে আছি। ওখানে কেন দাঁড়িয়ে আছ? ভেতরে আসো।’
আরিফা ঘোমটার আড়াল থেকে মহিলার মুখের ভাব দেখতে পেল না, সে শুনতে পেয়েছে কিনা। তবে, তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটি প্রায় নিষ্ঠুরভাবে উত্তর দিল, ‘ঠিক আছে, মামি, তুমি তোমার কাজ কর। মামা যদি আসে, তাহলে আমরা তার সঙ্গে কথা বলে চলে যাব।’
সাকিনা ছিলেন তার বড় বোন, একজন আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মহিলা। বিধবা হওয়ার পর, তিনি তার তিন সন্তানকে লালন-পালন এবং পরিবার পরিচালনার জন্য দর্জির কাজ শুরু করেন। তিনি তার মাতৃগৃহ থেকে এক ফোঁটা পানিও চাননি। তিনি মাঝে মাঝে উৎসবের সময় এসে তার বড় ভাইয়ের আশীর্বাদ নিয়ে যেতেন। সেদিন তিনিও অপরিচিতের মতো অন্যদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। আরিফা ভেবেছিল, জামিলার মতো সম্পত্তির ভাগ চাইতে সেও যদি আসত, কিন্তু সে তাড়াতাড়ি চিন্তা চেপে রেখে আবার সাকিনাকে ভেতরে ডাকল। স্বামী বেরিয়ে আসার আগে সাকিনাকে অন্তত বসার ঘরে বসানোর তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল।
তার শরীর ভারী লাগছিল, কিন্তু মুতাওয়াল্লি সাহেবের ঘুম ভালোই হয়েছে। আরিফাকে বারান্দায় থাকা লোকজনের দিকে উঁকি দিতে দেখে তিনি হতবাক হয়ে গেলেন, যা তিনি আগে কখনও করেননি। বাইরের ইঙ্গিত করে অজান্তেই তার কণ্ঠস্বর তীব্রভাবে বেড়ে গেল, ‘আরিফা…ফা…ফা?’
অবাক হয়ে আরিফা পর্দা নামিয়ে নিঃশব্দে বলল, ‘সাকিনা আপা বাইরের লোকদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে, যেন বাইরের লোক। আমি তাকে ভেতরে আসতে বলছি।’
‘কি?’ বলে যখন মুতাওয়াল্লি সাহেব বেরিয়ে এসে সাকিনা এবং তার ছেলেকে দেখতে পেলেন, তখন তাঁর মুখ রক্তে ভেসে উঠল।
সাকিনা হাতের তালুতে হাত রেখে অদ্ভুত সুরে অনুরোধ জানালো: ‘ভাইসাব, দয়া করে আমার মতো একজন নিঃস্ব বিধবাকে সাহায্য করুন। আল্লাহ আপনাকে এবং আপনার পরিবারের সুখ ও সমৃদ্ধি দান করুন। আমার ছেলে বিএ প্রথম বর্ষে পড়ছে। তার একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অ্যাটেনডারের চাকরির জন্য ইন্টারভিউ আছে। আমি শুনেছি, আপনি সেখানকার কমিটির সদস্য। আমার ছেলের নাম সৈয়দ আবরার। দয়া করে তাকে এই চাকরিটির ব্যবস্থা করে দিন। তার আবেদনপত্রটি দেখুন। যদি আমার ছেলে এই চাকরি পায়, তাহলে সে আমাদের পরিবারের ভরণপোষণের স্তম্ভ হবে, যদিও সে আমার মতো একজন দুর্ভাগা মহিলার ঘরে জন্মগ্রহণ করেছে। প্রত্যেককেই যদি আপনি একটু বলেন, তাহলে সে অবশ্যই চাকরিটা পাবে। আপনি দরিদ্র মানুষের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেন। আপনাকে আমার প্রতি দয়া করতে হবে।’ মুতাওয়াল্লি সাহেব কিছু বলার আগেই সে তাকে চাকরির আবেদনপত্রটি দিয়ে দিল, তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করে তাড়াতাড়ি চলে গেল।
মুতাওয়াল্লি সাহেবের মনে কাকগুলো চিৎকার করতে লাগলো। তার মুখ আরও লাল হয়ে উঠলো। ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যেও তার কপালে ঘামের বিন্দু জমাট বাঁধল। সে একটা মোটা গদিওয়ালা চেয়ারে বসল। পর্দার আড়ালে আরিফার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল।
দরজার কাছে একজন যুবতী দাঁড়িয়ে ছিল, একটি শিশু তার বুকে শক্ত করে চেপে ধরেছিল। তার মাথায় কাপড় ঠিক করে সে তার থেকে একটু দূরে সরে এসে বলল, ‘ভাইয়া, এই বাচ্চার বাবার একটা গরুর গাড়ি ছিল। পনেরো দিন আগে তার একটা অপারেশন হয়েছিল। আমি গাড়ি আর গরু দুটোই বিক্রি করে দিয়েছিলাম ওর অপারেশন করানোর জন্য। এখন ওর আরেকটা জরুরি অপারেশন দরকার মনে হচ্ছে! ডাক্তার এটাই বলেছেন। আমার কাছে এখন আর কিছু নেই। আপনি…আপনি…’ তার গলা আটকে গেল এবং চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। সে থমকে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল।
মুতাওয়াল্লি সাহেব তাকে হাসপাতালের নাম, ডাক্তার এবং অন্যান্য বিবরণ জিজ্ঞাসা করলেন। বললেন, তিনি তার স্বামীর অপারেশনের ব্যবস্থা করবেন এবং তাকে বিদায় জানালেন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, যুবতী হৃদয়ের গভীর থেকে তাঁকে আশীর্বাদ করে চলে গেল।
একজন স্কুলছাত্র তার নোটবুকটি তার সামনে বাড়িয়ে দিল। উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা তার সুন্দর হস্তাক্ষরে মুতাওয়াল্লি সাহেবকে সেই দিন বিকেল তিনটায় স্কুল উন্নয়ন কমিটির সভায় উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করেছেন। তিনি নোটে স্বাক্ষর করে ছেলেটিকে বিদায় জানালেন। তাদের সমস্যা শোনার জন্য লোকদের দিকে ফিরে যেতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ঝড়ের মতো দাউদ এসে পড়ল।
দাউদ হলেন তার ডান হাত। তিনি অনিচ্ছাকৃত শ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই তার কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন। তাদের চিন্তাভাবনা একই রকম, তা তাদের বন্ধুত্বের প্রমাণ। তিনি মুতাওয়াল্লি সাহেবের মেজাজ নির্ণয়ে তার মুখের উত্থান-পতন, ভ্রুর নড়াচড়ার অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ, কাঁপুনি, নাকের রেখা এবং মুখের পাশের রেখা বুঝার বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি তার কথা, আচরণ, কোমরের বাঁক সেই অনুযায়ী সাজিয়ে নিতেন। তার মধ্যে ধূর্ততা এবং আত্মসম্মানের অভাবও ছিল। তাহলে… তিনি ফজরের নামাজে যোগ দেননি। রক্তাক্ত যুদ্ধ এখন? ভাবছেন, তিনি কোথায় সময় নষ্ট করছেন… যদিও তিনি দাঁত কিড়মিড় করছেন, মুতাওয়াল্লি শান্ত থাকার ভান করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কোথায় গিয়েছিলেন দাউদ সাহেব? আপনাকে কোথাও দেখা যায়নি।’
দাউদ তার প্রশ্ন এবং তার ভঙ্গি উভয়ই বুঝতে পেরেছিল। মনে মনে হেসে সে উত্তর দিল, ‘আসসালামু আলাইকুম, মুতাওয়াল্লি সাহেব।’ নকল ভদ্রতা দেখিয়ে বসে পড়ল।
মুতাওয়াল্লি কেবল মসজিদ কমিটির সভাপতিই না, রাজনীতিতেও জড়িত। তিনি এই ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে ছিলেন যে, তিনি যে প্রার্থীকেই সমর্থন করবেন, সব মুসলিমকে তাকে ভোট দেওয়ানোর ক্ষমতা তাঁর আছে। অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী নির্বাচনী প্রার্থী তাঁকে বিশ্বাস করতেন এবং প্রায়শই দেখা করতে আসতেন। এ কারণেই সকালে অনেকেই তাঁর বাড়িতে ভিড় জমাতেন। এমনকি সাকিনা তাঁর বড় ভাই হিসাবে নয়, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর সাহায্য চেয়েছিল। তিনি বহিরাগতের মতো আচরণ করেছিলেন এবং তাঁকেও কষ্ট দিয়েছিলেন। তিনি বারান্দায় থাকা লোকজনের দিকে তাকালেন।
অনেক লোক তখনও তার সঙ্গে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু দাউদের সঙ্গে তার জরুরি কাজ ছিল। সে আবার বেঞ্চে থাকা অস্থির লোকদের দিকে তাকাল এবং উঠে দাঁড়াতে সরে গেল। বৃদ্ধ সাবজান হোঁচট খেয়ে এগিয়ে গেল, তার কুয়াশাচ্ছন্ন ছানি এবং সাদা ভ্রু দিয়ে দেখার চেষ্টা করল। ‘সাব, সাব… আমার ছোট মেয়ের বিয়ে আগামী সপ্তাহে। আমার কাছে কোনো টাকা নেই। তোমাকে কিছু সহায়তা করতে হবে। একবার তাকে বিয়ে দিতে পারলে আমি শান্তিতে চোখ বন্ধ করতে পারব। মাই-বাপ! তুমি আমার বাবার মতো… আমার মতো একজন বৃদ্ধের প্রতি তোমার করুণা করা উচিত,’ সে বলতে বলতে মুতাওয়াল্লি সাহেবের পায়ে পড়তে যাচ্ছিল।
আহা! তোমার এত সন্তান হয়েছে। তোমার ছোট মেয়ে, তুমি বল? ষাট বছর বয়সেও কি তোমার অবিবাহিত মেয়ে আছে? অবশেষে, তুমিও এক লাইনে পড়ে যাচ্ছ। মুতাওয়াল্লির মনের এক কোণে একটা শয়তানি বুদ্ধি আসল। তিনি একটা বিরাট খোলা জায়গার কল্পনা করলেন, যার মাঝখানে একটা ভাঙা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। যতবার তিনি সেই এক টুকরো জমির পাশ দিয়ে যেতেন, ততবারই তিনি কল্পনা করতেন, সেখানে একটা শপিং কমপ্লেক্স তৈরি করা হবে।
‘আমার কাছ থেকে এখন তোমার কী দরকার, সাবজান চাচা?’ তিনি কোনো দয়া না দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
‘বেশি কিছু না…’ বিড়বিড় করে বলল। তারপর সাবজান এক সেকেন্ডের জন্য থেমে বলল, ‘আল্লাহর আশীর্বাদ তোমার ওপর বর্ষিত হোক…আমি…আমি …এই বিয়ের জন্য আমার কমপক্ষে চল্লিশ হাজার রূপী দরকার।’
মুতাওয়াল্লি সাহেব হতবাক হওয়ার ভান করলেন।
‘চল্লিশ হাজার রুপী…কী বল…কোথা থেকে আসবে এতো রূপী?’
মনে হলো তিনি গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। দাউদ মৃদু কাশি দিল।
‘বড় ভাই…একটা বিষয়…ভাবলাম আপনার নজরে আনব…যদি আপনার কিছু অবসর সময় থাকে…না, যখন কেউ এটা নিয়ে ভাবে, পৃথিবী কী অবস্থায় পৌঁছেছে…আইন, নীতি, ধর্ম, এগুলোর কি আর কিছু বাকি আছে?’
‘হুম, কী হলো দাউদ?’
‘আপনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না? সত্যি?’
কারো কাছ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে দাউদ বলল, ‘ইসলাম ধ্বংস হচ্ছে, বড়ভাই…মুসলিদের জন্য আর কোনো সম্মান অবশিষ্ট নেই…’
তার ভূমিকা ছিল দীর্ঘ।
‘তুমি কি বলতে চাচ্ছ?’ মুতাওয়াল্লি সাহেব একটু বিরক্তি প্রকাশ করে জিজ্ঞেস করলেন।
‘বড়ভাই, আপনি জানেন সেই ওমর, যে ঘোড়ার নাল বানায়? তার দ্বিতীয় মেয়ের বিয়ে নেলামঙ্গলায় একজনের সঙ্গে হয়েছে। তাই না? কিন্তু ছেলেটি অন্য মেয়েকে বিয়ে করেছে, মনে আছে? যাই হোক, প্রথম মেয়ের বড়ভাই…’
‘সে কে?’ মুতাওয়াল্লি সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠলেন। সম্পর্কের জাল ছিঁড়ে ফেলার ধৈর্য তার ছিল না।
‘তার নাম নিসার, একজন চিত্রশিল্পী। সে বলেছিল যে সে মসজিদ রঙ করবে এবং দুইশ টাকা পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, মনে আছে, গত রমজানে?’
‘আহ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, বুঝেছি।’
এখন মুতাওয়াল্লি সাহেবের সবকিছু মনে পড়ে গেল। তার মনে পড়ল, মসজিদের টাকা খেয়ে ফেলার জন্য চিত্রকরকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়েছিল।
‘সে পুকুরে পড়ে মারা গেল। দেড় মাস আগে তারা একটি মৃতদেহ পেয়েছিল, দেখেছ। পুলিশ তা বের করে এনেছে।’
‘হুম। এরপর কী হলো?’
‘কী হওয়ার কথা ছিল। সবকিছু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেল। পুলিশ নিসারের মৃতদেহ নিয়ে হিন্দু কবরস্থানে দাফন করল।’
দাউদ ধীরে ধীরে খবরটি বলল। এটি ছিল গুলিবিদ্ধ হওয়ার মতো। এটা কি সত্যিই হতে পারে? কেউ কি কখনও এরকম কিছু শুনেছে? এক সেকেন্ডের জন্য মুতাওয়াল্লি সাহেবের মনে হয়েছিল যেন তার হৃদয়স্পন্দন বন্ধ হয়ে গেছে। তার কপালে বলিরেখা তৈরি হয়েছিল। তিনি ঘামতে শুরু করেছিলেন। সবাই ভুলে গিয়েছিল যে তারা কী জন্য এসেছিল, এমনকি সাবজানও। যদিও এটি তার হৃদয়ের গভীরে বিরক্ত উৎপাদন করছিল, তিনি তার মেয়ের বিয়ের কথা উল্লেখ করেননি। খবরটি সবাইকে কাঁপিয়ে তুলেছিল।
‘এই ভেবে যে, একটি মুসলিম মৃতদেহ, কাফন ছাড়া, গোসল ছাড়া, এমনকি জানাজা ছাড়ায়, কবরস্থানের পরিবর্তে একটি শ্মশানে অসম্মানজনকভাবে দাফন করা যেতে পারে! মুতাওয়াল্লি সাহেব কিছু একটা ভেবেছিলেন। ‘কিন্তু, দাউদ, নিসারের খৎনা করা হয়নি?’
দাউদের কাছে এই কৌশলী প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না।
‘ছি…ছি…এটা করা হতো না? কিন্তু পুলিশ কেন এত কিছু ভাববে? তারা নিশ্চয়ই দাফন শেষ করতে এবং পুরো ব্যাপারটা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চেয়েছিল, এইটুকুই।’
আরও প্রশ্ন ছিল। কৌতূহল জাগিয়ে তুলেছিল। ‘তারা কীভাবে জানল যে এটি নিসারের মৃতদেহ?’
‘তার নিখোঁজ হওয়ার অনেক দিন পর, তার স্ত্রী পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করতে যায়। পুলিশ তাকে অজ্ঞাত লাশের গায়ে পাওয়া পোশাকগুলো দেখায় এবং সে সেগুলো চিনতে পারে। তারপর তারা তাকে লাশের ছবি দেখায়। এটি ফুলে গিয়েছিল, কিন্তু এটি নিসারের ছিল’।
‘অথবা…’
‘অথবা পুলিশ অবশ্যই ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করেছে। যেন তারা জানে না! যদি তারা এই মসজিদে এসে বলত যে আমাদের, একজনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে, তাহলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে এটি এখানে এনে যথাযথভাবে দাফন করতাম।’
দাউদ বলল, একটু সন্দেহজনকভাবে: ‘আমি যতদূর জানি, সেই ঝামেলা সৃষ্টিকারী শঙ্করই পুলিশকে জানিয়েছিল । নিশ্চিত করেছিল যে তারা লাশটি হিন্দু কবরস্থানে দাফন করেছে।’
সেখানে সবাই হতাশ হয়ে পড়েছিল। ‘ভাই! কী একটা ভয়াবহ অবস্থা। যখন একজন মানুষ মারা যায়, তখন হাজার হাজার মানুষ লাশ কাঁধে করে কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে। আর তখন এই বেচারা কাফন এবং ভালোভাবে দাফনও পায়নি।’
বছরে দুবার রমজান ও বকরি ঈদের নামাজের সময় ছাড়া, নিসার কখনও মসজিদে যেত না। সে শত শত লোকের সঙ্গে প্রতারণা করে তাদের ঘর রঙ করার জন্য টাকা নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যেত। সে টাকায় মদ্যপান করত এবং মাতলামি করত। সে একসময় জামাতের টাকা খেয়ে ফেলে মসজিদ রঙ করার কথা বলে। এখন তাকে যথাযথভাবে দাফন করা সেসব লোকদের জন্য সবচেয়ে পবিত্র কর্তব্য বলে মনে হচ্ছিল, যাদের সঙ্গে সে প্রতারণা করেছিল। তার মৃতদেহ শহীদের মর্যাদা পেতে শুরু করে। সর্বোপরি, নিসারের মৃতদেহের জন্য যথাযথভাবে দাফন নিশ্চিত করার কাজটি মুতাওয়াল্লির অনেক সমস্যার সমাধান বলে মনে হয়েছিল। সে যন্ত্রণার ভান করল। বিলাপ করতে লাগল। ‘কি করা যেতে পারে?’ তিনি বললেন, ‘মানুষকে তাদের পাপের জন্য কষ্ট পেতে হবে।’ দাউদসহ সেখানে জড়ো হওয়া সমস্ত লোক, যা ঘটেছিল তা নিয়ে ভাবছিল এবং বিরক্ত বোধ করছিল।
‘তোওবা, তোওবা’। সাবজান তার গালে থাপ্পড় মারলেন। ‘মৃত্যু সবার জন্যই অনিবার্য। কিন্তু কারোরই যেন এমন ভয়াবহ মৃত্যু না হয়। মহনবীর(সঃ) প্রশংসা না করা হয়, সালাম না করা হয়। আগামীকাল কেউ আমাদের মৃতদেহও যেখানে খুশি, যেভাবে ইচ্ছা সেখানে দাফন করবে। তারা হয়ত আমাদের মৃতদেহগুলো ইচ্ছামতো ফেলে দেবে।’
দাউদও তার দুটি কথা যোগ করার সুযোগও হাতছাড়া করল না। ‘মুতাওয়াল্লি সাহেব, যে কোনোভাবেই হোক – আপনি আমাদের নির্দেশনা দেওয়ার জন্য আছেন, এজন্যই আমরা এখনও মানুষ আছি – একদিন তারা কুরআন, সেই মহিলা, শাহবানু’র মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু নিয়ে আদালতে যায়, তারা এটিকে বড় করে তুলেছিল এবং বারবার আমাদের অপমান করেছিল। এখন তারা মুসলিম মৃতদেহ নিয়ে হিন্দু কবরস্থানে দাফন করে। আমাদের জন্য এর চেয়ে বড় অবিচার আর কী আছে?’
দাউদ এটাকে একটা গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখতে শুরু করল। সবাই অস্থির ছিল, এমনকি মুতাওয়াল্লিও। তিনি তাঁর দাড়ি টেনে ধরে, মাঝে মাঝে নাকে আঙুল ঢুকিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে রইলেন। হঠাৎ তিনি সতর্ক হয়ে লোকগুলোর দিকে তাকালেন। মুখটা যেন ভীষণ দুঃখের, তিনি চোখ খুলে একটা চিৎকার করে কাশি দিলেন, গলা পরিষ্কার করলেন।
বিষয়টি এত জটিল ছিল যে আরিফাও এসে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে গেল, তার বাচ্চাদের স্কুলের জন্য প্রস্তুত না করে, একটু দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার পরও। জামিলা ফিসফিসিয়ে আরিফার সঙ্গে কথা বলল। কী ঘটেছে তা শুনল এবং পর্দার আড়ালে তার ভাবির সঙ্গে যোগ দিল। তাদের নারী হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছিল।
ইয়া আল্লাহ! সে যেই হোক না কেন, বেচারা যেন শান্তিতে থাকে। একজন মুসলিম মৃতদেহের প্রাপ্য সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান তাকে দেওয়া হোক এবং সে যেন কবরস্থানে তিন গজ জায়গা পায়।
জামিলার স্বামীও খবরটি জানতে পেরে অন্যদের সঙ্গে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। সবাই উদ্বিগ্ন, উত্তেজিত। ইসলাম রক্ষার জন্য পবিত্র যুদ্ধে লড়াই করার জন্য উৎসাহ বেড়ে গেল। অবশেষে, মুতাওয়াল্লি বলতে শুরু করলেন। ‘এখন আমাদের নিসারের দেহাবশেষ সেখান থেকে উদ্ধার করে এখানে সমাহিত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। যেকোনো বাধা, যেকোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, বুঝতে পারছো?
‘দাউদ, আমাদের যুব কমিটিকেও এ বিষয়ে অবহিত করো। তারা পৌঁছানোর পর, আমরা একসঙ্গে জেলা কমিশনার, পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারি। চল আজই এটি নিয়ে কাজ শুরু করি’, তিনি দ্রুত বললেন। তিনি আরও বললেন, ‘তাদের বল অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা না করতে। জামাতে এখনই কোনও টাকা নেই। তাদের বল, যে আমি নিজেই যা খরচ হবে তা দেব।’ তিনি জানতেন যে, ব্যয় করা অর্থের ফলে তিনি যে জনপ্রিয়তা এবং সমর্থন পাবেন তার তুলনায় কিছুই নয়।
মুতাওয়াল্লি হিসেবে তাঁর মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এই ধরনের কথা বলা। টাকাটা কোথায় যাবে, তাঁর অভিজ্ঞতা অনুসারে, মানুষ এই ধরনের কাজের জন্য অর্থ দান করতে নিজেদের উপর চাপ সৃষ্টি করত। তিনি এটিকে যুব কমিটিকে আরও কাছে আনার একটি দুর্দান্ত সুযোগ হিসেবেও দেখেছিলেন, কারণ তারা আগে তার বিরুদ্ধে অনেক ধরনের অভিযোগ করেছিল এবং নিজেদের তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল।
সবকিছুই তার প্রত্যাশা মতোই ঘটেছিল। সে তার বিষন্নতা থেকে বেরিয়ে আসার আগেই, জামিলার স্বামী তার পকেট থেকে আড়াইশো টাকা বের করে মুতাওয়াল্লির সামনের টেবিলে রেখে দিয়েছিল। ‘ভাইয়া, আপনি যদি এটা আপনার কাজে ব্যবহার করতেন, তাহলে আমিও এই ভালো কাজের সুফল পাবো। আল্লাহ আপনার মতো লোকদের আরও শক্তি, সুস্বাস্থ্য এবং অর্থ দান করুন।’ সে অন্তর থেকে কথাগুলো বলল। তার মনে হলো, সামনে যখন এই মহান কাজ, তখন তার স্ত্রীর কাছ থেকে সম্পত্তির অংশ চাওয়া ঠিক নয়। পর্দার আড়াল থেকে তার স্বামীর অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে জামিলা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
সে তার বড় ভাইয়ের কাছে সম্পত্তির অংশ চেয়েছিল কারণ তার স্বামী তাকে জোর করে তা করতে বাধ্য করেছিল, সে নিজে তা চায়নি বলে নয়। যেমন কথায় আছে, ‘যদি আঘাতের খুঁটিটি হাতছাড়া হয়, তাহলে আরও হাজার বছর জীবন।’ সে খুশি হয়েছিল যে তারা বিষয়টি ছেড়ে দিতে পারে, অন্তত আপাতত। আরিফা তার স্বামীর জন্য খুব গর্বিত বোধ করছিল। খাবার ছাড়ায় তাকে এই হিমালয়সম কাজটি সম্পন্ন করতে হতে পারে এই ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়ে, সে ফুলের মতো হালকা পরোটা বানাতে ছুটে গেল। মুতাওয়াল্লি তার বোন এবং তার স্বামীর আচরণ লক্ষ্য করলেন এবং নিজের প্রতি নিজেই মুগ্ধ হলেন। যদিও তিনি তা প্রকাশ করলেন না এবং বরং গম্ভীরভাবে ভেতরে চলে গেলেন, যেন গভীর চিন্তায় মগ্ন।
বেশ কয়েকজন যুবককে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রথমে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেন, এটা তাঁর জন্য গর্বের বিষয় ছিল। জেলা প্রশাসকও ছিলেন তরুণ, একজন বাঙালি ব্রাহ্মণ এবং জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। জেলার মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের অগোছালো কোন্দল এবং মাঝে মাঝে যে আবেগঘন উত্তেজনা দেখা দিত, তার সঙ্গে তিনি পরিচিত ছিলেন। তিনি মুতাওয়াল্লির দেওয়া চিঠিটি পড়ে পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছিলেন। যদিও তিনি ভেতরে ভেতরে হাসছিলেন, তবুও তিনি গম্ভীর, ব্যক্তিত্ব নিয়ে বসে ছিলেন। তিনি মুতাওয়াল্লির আবেগপ্রবণ কথাগুলো শুনলেন এবং উর্দুতে তাকে প্রশ্ন করার জন্য চারপাশ তাকিয়ে দেখলেন।
‘আর নতুন কী, মুতাওয়াল্লি সাহেব? আপনার এলাকার জন্য নতুন টিউবওয়েল খনন, স্কুল ভবন মেরামত বা অন্য কোনও কাজের জন্য আপনি কখনও আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেননি’।
মুতাওয়াল্লি তাকে কথার মাঝখানে থামিয়ে দিলেন। ‘আমি সব কিছুর একটি তালিকা তৈরি করব এবং পরের বার আবার আসব, প্রভু আপাতত যদি আপনি কেবল একটি আদেশ জারি করতে পারেন, তাহলেই যথেষ্ট।’
‘কিন্তু তবুও, মুতাওয়াল্লি সাহেব, মাটি সর্বত্র একই রকম, তাই না? মাটির মধ্যে পার্থক্য কী?’ তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞাসা করলেন।
মুতাওয়াল্লির কাছে তার জন্য বেশ কিছু অপ্রাসঙ্গিক উত্তর ছিল। আর বেশিক্ষণ না টেনে, জেলা প্রশাসক সহকারি কমিশনারকে ডেকে একটি আদেশ জারি করতে বললেন। পনেরো দিন কেটে গেল। মুতাওয়াল্লি সাহেব ক্লান্ত হননি, এমনকি যখন তাকে এক অফিসার থেকে অন্য অফিসারে, এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে যেতে হয়েছিল। তিনি তার সঙ্গে আসা লোকদের জন্য মাঝে মাঝে কফি এবং জলখাবার কিনতেও দ্বিধা করেননি।
কুখ্যাত শঙ্করের কাছ থেকে খুব বেশি প্রতিরোধ না পেয়ে তিনি হতাশ হয়েছিলেন, কিন্তু আবারও পুলিশ এবং কর্মকর্তারা প্রচুর বিলম্ব করেছিলেন।
মুলতাওয়াল্লি সারাদিন বিভিন্ন অফিসে ঘুরে বেড়াতেন। এরপর গভীর রাত পর্যন্ত আলোচনা চলতে থাকত, হয় মসজিদের সামনের উঠানে অথবা মদিনা হোটেলের বড় হলঘরে, অথবা তার বাড়ির বারান্দায়। তিনি তার কঠোর পরিশ্রমের বর্ণনা দিতেন। তিনি পরিকল্পনা করতেন কোন অফিসারদের ক্ষমতা কীভাবে এবং কোথায় কমানো যায়। তিনি বিভিন্ন মহলে ইসলামের উপর যে অনেক বিপদ আসতে পারে তা বর্ণনা করতেন এবং তরুণদের কাছে প্রচার করতেন কিভাবে এই সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে সমাধান করা যেতে পারে। তিনি বুঝতে পারেননি যে এভাবে পনেরো দিন কত দ্রুত কেটে যাবে। পুরো জামাত নিসারের দেহ এবং মুতাওয়াল্লি সাহেবের প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আলোচনা করছিল না। বেশ কয়েকজন মহিলা পূর্ণ পর্দা করে নামাজ আদায় করছিলেন, নিসারের মৃতদেহ যাতে মুসলিম কবরস্থানে দাফন করার সৌভাগ্য লাভ করে এবং তার আত্মা যেন চিরস্থায়ী শান্তি পায় তার জন্য আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করছিলেন।
এই মহৎ কাজের জন্যও প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল। অবশেষে নিসারের মৃতদেহ কবর থেকে তোলা হয়েছিল। মুতাওয়াল্লি এবং তার অনুসারীরা তাদের সঙ্গে আনা একেবারে নতুন, সুগন্ধিযুক্ত কাফনে পচা দেহটি ঢেকে রেখেছিলেন। যেহেতু দেহটি ধর্মীয়ভাবে গোসলের জন্য খুব পচা ছিল, তাই তার উপর পবিত্র পানি ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দুর্গন্ধে তাদের মুখ ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু কেউ তা তাদের মুখে দেখাল না। পুলিশ তাদের রুমাল দিয়ে তাদের নাক ঢেকেছিল। অবশেষে, নিসারের জানাজা শুরু হয়েছিল মুতাওয়াল্লি এবং তার সঙ্গীদের উদ্যোগে। তারা প্রচুর পরিমাণে সুগন্ধি ঢেলেছিল এবং পচা মাংসের গন্ধ ঢাকতে জুঁইয়ের মালায় তৈরি চাদর দিয়ে লাশের উপরের দিকটা ঢেকে দিয়েছিল। জুঁইয়ের কোনও কুঁড়িই ফুটেনি। ‘হর ফুল কে কিসমত মে কাহান নাজ-এ-আরস, চাঁদ ফুল তো খিলতে হ্যায় মজারোঁ কে লিয়ে’: সব ফুলেরই কনে সাজানোর সৌভাগ্য হয় না; কিছু ফুল কেবল সমাধির জন্য ফোটে।
মিছিলটি বেশ দূরে যেতে হয়েছিল, প্রচুর লোক জড়ো হয়েছিল। কফিনটি কারও কাঁধে এক বা দুই মিনিটের বেশি ছিল না, হাত বদল হতে থাকে। মিছিলটি শহর পেরিয়ে কবরস্থানের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, যা সেখানেই ছিল, ঠিক কোণার কাছাকাছি। সম্ভবত আরও দশ ধাপ যেতে হবে। ঠিক তখনই একজন লোক হোঁচট খেয়ে অদ্ভুত, অশ্লীল ভঙ্গিতে অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করতে করতে এগিয়ে গেল, যা পুরো পরিস্থিতির গম্ভীরতা এবং দুঃখকে ভেঙে ফেলার জন্য যথেষ্ট ছিল। লোকটিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে, কফিনের সামনে কাঁধ দেওয়া মুতাওয়াল্লি হতবাক হয়ে গেল। সে মারাত্মক ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মিছিলের আরও কয়েকজন একইভাবে প্রতিক্রিয়া জানাল। কেউ এক পাও এগিয়ে গেল না। সবার গলা শুকিয়ে গেল। লোকটি জোরে আরও কিছু অভিশাপ বর্ষণ করল, একটি ছোট গলিতে থরথর করে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল।
সুস্থ হওয়ার আগে মুতাওয়াল্লিকে দেখতে হলো। সে পুলিশ সদস্যদের দিকে তাকালো, যারা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে তা নিশ্চিত করার জন্য মিছিলের সঙ্গে ছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেল। মিছিল থামতে দেখে একজন পুলিশ এগিয়ে এসে মাতালকে লাঠি দিয়ে হুমকি দিল। মুতাওয়াল্লি ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে গেল। জামাতও তার পিছু পিছু এলো। মুতাওয়াল্লি সাহেবের পা কাঁপতে লাগল। কেউ একজন এসে কফিনের মাথার কাছে তার সঙ্গে স্থান পরিবর্তন করল। মুতাওয়াল্লি সাহেব তার রুমাল বের করে মুখ থেকে ঝরে পড়া ঘাম মুছে ফেললেন। তিনি দাউদের দিকে তাকালেন, সে মাথা নিচু করে নিচের দিকে তাকাল। অনেক লোক নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করছিল। কেউ কথা বলছিল না; বরং তারা সবাই লম্বা-লম্বা পা ফেলে কবরস্থানে পৌঁছে গেল।
পুলিশ বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল এবং মৃতদেহটি যথাযথভাবে মুসলিম কবরস্থানে দাফন করা হয়েছিল। মুতাওয়াল্লির মাথার স্নায়ু ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তারা যে মৃতদেহটি দাফন করেছিল তা কার?
তার কোনো সন্দেহ ছিল না যে মাতাল ব্যক্তিটি চিত্রশিল্পী নিসার। সে দাউদ এবং চিত্রশিল্পীর স্ত্রীর উপর এতটাই রেগে গিয়েছিল যে তাদের কেটে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু তার একমাত্র সান্ত্বনা ছিল: যদিও জামাতের অনেক লোক নিসারকে চিনতে পেরেছিল, তাদের কেউই পুলিশকে জানায়নি। তারা সবাই তার সম্মান রক্ষা করেছিল। ক্ষণিকের স্বস্তি অদৃশ্য হয়ে গেল। হাজার হাজার কাক কা কা কা বলে চিৎকার করে তার মগজ টেনে খেতে শুরু করল। এটা কি হিন্দুর লাশ? এটা কি মুসলমানের লাশ? লাশটি এতটাই পচা ছিল যে শনাক্ত করা যাচ্ছিল না। এখানে কি পচে যাবে, ওখানে কি পচে যাবে?
মানুষ তাড়াহুড়ো করে কবরটি ভরে দিচ্ছিল। সম্পূর্ণ ঢেকে দেওয়ার অপেক্ষা না করে, তিনি দ্রুত বাড়ি ফিরে গেলেন। কাক ছাড়া তিনি একা ছিলেন, তাকে আঘাত করছিল এবং হত্যা করার চেষ্টা করছিল।
অত্যন্ত ক্লান্ত, তিনি ঘরের ড্রয়িং রুমে বসে রইলেন। কয়েক মিনিট পরেও আরিফাকে দেখতে না পেয়ে, উদ্বিগ্নভাবে ডাকলেন। “আরিফাফাফাফাফা! আমাকে এক প্লাস পানি দাও।’
তার মেয়েকে বেরিয়ে আসতে দেখে সে জিজ্ঞাসা করল। ‘তুমি আজ স্কুলে যাওনি কেন?’
আম্মা বাড়িতে নেই, তাই যাইনি? তাই আমি বাড়িতেই থেকে গেছি’।
‘বাড়িতে নেই? কোথায় গেল সে?’
মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে তার চোখ লাল হয়ে যাওয়া চোখের পাপড়িগুলো তুলে উত্তর দিল, ‘আনসার খুব অসুস্থ, তাই না? আব্বা, আম্মা তাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে’।
হ্যাঁ? তুমি কি বললে? কে অসুস্থ? কবে থেকে? কোন রোগ?
প্রশ্ন উঠতেই মেয়েটির চোখ থেকে একের পর এক প্রবল অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
আনসারের গত পনেরো-বিশ দিন ধরে প্রচন্ড জ্বর ছিল, তাই না? ডাক্তার বলছিলেন, এটা ম¯িস্তষ্কের কোনো রোগ। মেনিনজাইটিস নামক কোনো রোগ মনে হচ্ছে’। সে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁদতে শুরু করল।
মুতাওয়াল্লি সাহেবের হাত থেকে পানির গ্লাসটি পিছলে পড়ে গেল।
ধীরে ধীরে, তার গাড়িতে আবার কণ্ঠস্বর শোনা গেল। ভাই, সম্পত্তিতে আমার অংশ। ভাই, দয়া করে এই দরিদ্র বিধবাকে সাহায্য করো, মাই-বাপ, আমার মেয়ের বিয়ের জন্য আমাকে একটা ঋণ দাও। হাখদার তারসে তো অঙ্গার কা নুহ বরসে… এই বৃষ্টি… কাক, কালো, ধূসর… তাদের ভেতরে রঙধনু।
কুমার প্রীতীশ বল : প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক




