এখন সময়:ভোর ৫:৪৫- আজ: বৃহস্পতিবার-১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

এখন সময়:ভোর ৫:৪৫- আজ: বৃহস্পতিবার
১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

রবীন্দ্র-মানসে পূর্ববঙ্গের বাউল প্রভাব

মোহাম্মদ শেখ সাদী

 

রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) বাঙালির সৃজনে-মননে এক পরিপূর্ণ জীবনবৃক্ষ। এই বৃক্ষ প্রতিনিয়ত সঞ্জীবনী প্রেরণা জোগায় বাঙালি মানসে। জীবনবোধের বহুমাত্রিক ব্যাপ্তি তাঁকে এমন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে যে, তাঁর চেয়ে পরিপূর্ণ জীবনবোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব বাঙালি সমাজে বিরল। রবীন্দ্রনাথ আমাদের বেঁচে থাকার মন্ত্র শেখান, নিয়ত শাণিত করেন আমাদের নান্দনিক শিল্পবোধকে। তাঁকে নিয়ে বিদগ্ধজনে পরস্পর তর্ক চলে। কখনো কখনো তাঁর অসঙ্গতি এবং সীমাবদ্ধতাকেও সামনে এনে তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়! যুক্তি এবং তর্কের বাণে জর্জরিত হন রবীন্দ্রনাথ। তবু তাঁকে উপেক্ষা যায় না কিছুতেই। প্রয়াণের ৮০ বছর পরও রবীন্দ্রনাথকে এড়ানো যাচ্ছে না কিছুতেই। বাঙালি জীবনে রবীন্দ্রনাথ প্রতিদিনের সূর্য। পরিবারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, চায়ের টেবিলে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এমনকি আড্ডায়, প্রতিদিনই রবীন্দ্রনাথ কোথাও না কোথাও এসে ভর করেন। নতুন করে রাঙিয়ে যান পুনর্বার। রবীন্দ্রনাথের এই আধিপত্যের কারণ তাঁর সৃজন-মননের সামূহিক দীপ্তি; সোজা কথায় তাঁর লেখনিশক্তির অপ্রতিরোধ্য জোর। জীবন-জগতের বিচিত্র অনুভব, দার্শনিক বীক্ষা, সাহিত্যের যেকোনো আঙ্গিকে বিচরণ, জীবন-সঙ্কটে, সমাজ-রাষ্ট্রের বিবিধ জটিলাবর্তে রবীন্দ্রনাথ এক আশ্চর্য বাতিঘর, সঙ্কট থেকে উত্তরণের এক চিরন্তন ‘আলোকশিখা’। তাই রবীন্দ্রনাথ কেবল শিক্ষিত বাঙালিরই

 

স্বপ্নের মানসপ্রতিমা নন। তিনি জনের, গণের, ব্যক্তির, সমষ্টির। তিনি সকল বাঙালির। পূর্ববঙ্গে বসবাসের পূর্ব পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের ধর্মচিন্তা, রাজনৈতিক দর্শন, সমাজ-রাষ্ট্রভাবনা, জাতীয়তাবোধ প্রভৃতির এক শুষ্ক, প্রাণহীন রূপ পরিদৃষ্ট হয়। যেটি পূর্ববঙ্গে বসবাস ও বিচরণের ফলে আমূল বদলে যায়। নিজেকে বৃহত্তর মানবের সাথে যুক্ত করার পূর্ণ সুযোগ ঘটে এখানেই। ফলে পূর্ববঙ্গে বসবাসের সুবাদে তাঁর জীবন-দর্শনে এবং সাহিত্যাদর্শে পরিবর্তন-বিবর্তন কিংবা রূপান্তর খুবই যৌক্তিক এবং প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গকে দেখেছেন অসীম কৌতূহল ও সহমর্মিতা দিয়ে। কলকাতা নগর থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পূর্ববঙ্গের পল্লীসমাজ, মানুষ, প্রকৃতি তাঁকে কৌতূহলী করে তুলেছিল। যতদিন তিনি এখানে ছিলেন, ততদিন তিনি এখানকার সবকিছুকে সম্পূর্ণরূপে জানতে চেয়েছেন। জমিদারির কাজে যখন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন পালকিতে করে, কখনো নদী-নালা-বিলের ওপর দিয়ে গ্রামীণ প্রকৃতি ও জনজীবনের বিচিত্র দৃশ্যাবলী কবির চিত্তে নবতর অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতার পালক যুক্ত করেছে। এছাড়া পল্লী সমাজে বসবাসরত সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ সম্পর্কেও তিনি প্রত্যক্ষ ধারণা লাভ করেন এখানে এসেই। ফলে ১৮৯০ সালের পূর্ববর্তী সময়ে রবীন্দ্র-মানস এবং ১৮৯০ সালের পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্র-চেতনায় বিস্তর ফারাক পরিলক্ষিত হয়। এই সময়ে রবীন্দ্র-চেতনায় যে বৈপ্লবিক রূপান্তর সাধিত হয় —তা মূলত পূর্ববঙ্গের প্রকৃতি, সমাজ ও মৃত্তিকাসংলগ্ন মানুষের সাথে প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপনের সুযোগে। পূর্ববঙ্গে জমিদারি করতে এসে রবীন্দ্রনাথের শিল্পবোধে, চৈতন্যে সর্বোপরি তাঁর মেজাজ-মনন-দর্শনে যে রূপান্তর ঘটেছিল —তাই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যের নানা শাখাকে পরিপুষ্ট করে। পূর্ববঙ্গের সঙ্গে প্রত্যক্ষ এই সংযোগই রবীন্দ্র সহিত্যে মূলত সরসপ্রাণতার সঞ্চার করে। কলকাতা-বাসজীবনে রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতায় পূর্ববঙ্গের প্রকৃতির স্নিগ্ধ-কোমল-শোভাস্পর্শ, সাধারণ মানুষের সাথে মেলা-মেশা, বাউল ভাব-সাধনা প্রভৃতির সান্নিধ্যে যাবার মতো কার্যকরী উপাদান ছিল না। রবীন্দ্র-মানসের এই বিবর্তনটিকে চিহ্নায়ক ধরে তাঁর সাহিত্যকর্মে মূলত পূর্ববঙ্গের বাউল প্রভাবেরই বিশ্লেষণের প্রয়াস রয়েছে এই প্রবন্ধে। আর ‘পূর্ববঙ্গ’ বলতে বর্তমান বাংলাদেশকেই বোঝানো হয়েছে। কেননা ৪৭’ পূর্ববর্তী অবিভক্ত পূর্ববঙ্গই-‘পূর্ববাংলা’ এবং আজকের স্বাধীন সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’। রবীন্দ্রনাথ যেহেতু ৪৭’-পূর্ববর্তী পূর্ববঙ্গের কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর এবং রাজশাহীর পতিসর প্রভৃতি অঞ্চলে জমিদারি করেছেন এবং তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু সাহিত্যও যেহেতু উল্লিখিত কালপর্বে রচিত, সেহেতু আমরা রবীন্দ্র সাহিত্যে এই অঞ্চলের প্রভাব ও প্রতিফলনকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করি। বিশেষ করে রবীন্দ্রচেতনার অখণ্ড পরিচয় পেতে হলে রবীন্দ্রমানসের এই বাঁক-বদলের পর্যায়টিকে অব্যর্থরূপে শনাক্ত করতে হবে। আর তা না হলে রবীন্দ্রনাথ যুগে যুগেই ভুল বিচারের সম্মুখীন হবেন। কেননা পূর্ববঙ্গের সঙ্গে কবির এই যোগাযোগ রবীন্দ্র ভাবাদর্শে বিশেষ করে তাঁর প্রকৃতি বা নিসর্গভাবনায়, ধর্ম-চিন্তায়, সমাজ ও রাষ্ট্র-চিন্তায়, মানবতাবোধে, আন্তর্জাতিকতাবোধে এমনকি সাহিত্যের সর্বাঙ্গীন আদর্শে গভীর এবং তাৎপর্যবাহী রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হয়। পূর্ববঙ্গ-প্রভাবিত রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি-কর্মের যুগকে অনেকে ‘সোনার তরী-পর্ব’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই পর্বে শুধু কবিতা নয়, ছোটগল্প, পত্রসাহিত্য, প্রবন্ধ, সংগীত, নাটক প্রভৃতি ধারাও প্রাণোচ্ছ্বল হয়ে ওঠে। সোনার তরী-পর্বের এই পরিবর্তন আমাদের মনে বিস্ময়েরও উদ্রেক করে। পূর্ববঙ্গে আসার পূর্বে রবীন্দ্রনাথের ধর্ম-চিন্তাও ছিল একটি বিশেষ বিশ্বাসের ছাঁচে আবদ্ধ। পূর্ববঙ্গের লোকায়ত সংস্কৃতি ও লোকসমাজে তিনি সহজিয়া ভাব-দর্শনের সহজ সুরটি খুঁজে পান। শাস্ত্রীয় ধর্মাচারের বাইরে এখানে যে উদার মানবিক জীবনধারা প্রবহমান ছিল মূলত সেসব গুণাবলীই কবিকে মুগ্ধ করে। তাঁর কাব্যে, ছোটগল্পে, চিঠিপত্রে, নাটকে এই সহজ-সুন্দর সুরটি নানা স্থানে চিত্রিত হয়েছে। বাউল-দর্শনের ভাবভক্তি ও অধ্যাত্মবাদী মিস্টিক ভাবনা রবি ঠাকুরকে আশ্চর্যজনকভাবে প্রভাবিত করেছিল। শাস্ত্রীয় অনুশাসনের বাইরে গিয়ে মন্ত্রবর্জিত, সহজ ভক্তির নিগঢ়ে যারা ঈশ্বরকে পেতে চান —তারা রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করেছিল। সেই সহজিয়া বাউল সাধকদের তিনি ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছিলেন শিলাইদহে বাসকালে।  রবীন্দ্রমানসে বাউলের প্রভাব এত সুগভীর যে, তাঁর ভেতরেও একজন বাউল তৈরি হয়ে গিয়েছিল—এমনটি বক্তব্য নিশ্চয়ই অতিরঞ্জন নয়। কেননা তার প্রমাণ রবীন্দ্র-সাহিত্যের নানা স্থানে রয়েছে। বাউলের মিস্টিক ভাবনাই কবিকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে, তাঁদের বস্তুগত সাধনা নয়। The Religion of Man এবং ‘মানুষের ধর্ম’ প্রবন্ধে বাউলদের সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে। গীতাঞ্জলি পর্বের কবিতায়ও বাউল-প্রভাব লক্ষণীয়। ১৩২২ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় লালনের ২০টি গান প্রকাশ করেন এবং বাউল গান সংগ্রহ ও প্রকাশ সম্পর্কে উৎসাহিত করেন। বলা যায়, রবীন্দ্রনাথই প্রথম বাউলদের সম্পর্কে গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং শিক্ষিত মহলের দৃষ্টি আকর্ষণে সচেষ্ট হন। তবে বাউল-দর্শনকে রবীন্দ্রনাথ নিজের মতো করে গ্রহণ করেছেন, বাউলতত্ত্ব হিসেবে নয়। বাউলতত্ত্বের বস্তুবাদী সাধনা বাদ দিয়ে তিনি এর আধ্যাত্মবাদী প্রবণতাটুকুকে গ্রহণ করেছিলেন। বাউলের ‘মনের মানুষের’ অনুসন্ধান-অনুসন্ধিৎসাই পরবর্তীকালে তাঁর সৃষ্ট কবিতা-গানে-নাটকে উপন্যাসে বিচিত্র তাৎপর্যে চিত্রিত হয়েছে। তাঁর ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর’ মূলত বাউলদের দেহভাণ্ডে ‘অধর মানুষ’, ‘অটল পুরুষ’, কিংবা ‘মনের মানুষের’ অনুসন্ধানেরই সমার্থক কিংবা মিস্টিক। বাউলসুরের প্রতিও তাঁর অনুরাগ জন্মেছিল। বাংলাদেশের ‘জাতীয় সংগীত’— ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটির সুর কুষ্টিয়ার বাউল গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাবো তারে/ আমার মনের মানুষ যে রে’ গানটির প্রত্যক্ষ সুরের প্রভাবেই সৃষ্ট। তাঁর বাউল ভাবাদর্শের গানগুলোতে পূর্ববঙ্গের বাউলদের প্রভাবই প্রকট। যদিও কবি বাউলদের আরেক উর্বরভূমি বীরভূমেও বসবাস করেছিলেন। বাউল প্রভাবজাত রবীন্দ্রসংগীতে যে পূর্ববঙ্গের, বিশেষ করে কুষ্টিয়া অঞ্চলের বাউলদের প্রভাব পড়েছে —তা সন্দেহাতীতভাবেই প্রমাণিত। লালনের ‘বাড়ির পাশে আরশিনগর/ সেথায় এক পড়শী বসত করে’ গানটির প্রতিধ্বনি শুনতে পাই রবি ঠাকুরের ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে/ দেখতে আমি পাইনি তোমায়’ গানটিতে। বাউলের ‘মনের মানুষের’ তত্ত্বই রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক-মিস্টিক ভাবনাকে অধিক তীব্র করেছে। সুকুমার সেনের মতে, ‘এই প্রভাবে রবীন্দ্রনাথের ধর্মচিন্তা শাস্ত্রের ভূমি ছেড়ে প্রাণের আকাশে উধাও হলো।’১ শাস্ত্রীয় ও লৌকিক ধর্মের মধ্যকার যে দ্বন্দ¦ কবির মনে দানা বেঁধে ছিল, বাউল ও অন্যান্য সহজিয়া ধর্ম-দর্শন সেক্ষেত্রে তাঁকে মুক্তি দিয়েছিল। শাস্ত্রীয় ধর্মের তাৎপর্যহীনতা ক্রমশ তাঁর চৈতন্যে নবতর উদার মানবিক ধর্মীয় চেতনার জন্ম দিয়েছিল —যেখানে মানবতা আর মানবপ্রেমই মুখ্য হয়ে উঠলো। ‘বিসর্জন’ নাটকেও আমরা সেই প্রথাগত শাস্ত্রীয় ধর্মের অসাড়তার বিপরীতে মানবধর্মের বিজয়ের গৌরব প্রত্যক্ষ করি। ১৮৯২ সালে রবীন্দ্রনাথ বাউল সুরে প্রথম দু’টি গান রচনা করেন —‘ওগো তোমরা সবাই ভালো’, ‘খ্যাপা তুই আছিস’। পরবর্তীকালে তাঁর আরও অনেক গানে বাউল সুরের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘ওরে তোরা নাই বা বললি কথা’, ‘ঘরে মুখ মলিন দেখে’, ‘ছিছি চোখের জলে’, ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক’, ‘যে তোরে পাগল বলে’, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’, ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি’ ‘ তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে’, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’ প্রভৃতি গানে বাউল সুরের প্রভাব লক্ষণীয়। বাউলের ‘মনের মানুষের’ অন্বেষণও সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছে কোনো কোনো গানে। যেমন —‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে/তাই হেরি তাই সকল খানে।’ কিংবা ‘সে যে মনের মানুষ/ কেন তোরে বসিয়ে রাখিস নয়নদ্বারে?-প্রভৃতি গানে সরাসরি বাউলের অন্তরাত্মার আকুতি এবং ‘মনের মানুষের’ অন্বেষাই উচ্চকিত হয়েছে। বাউল-প্রভাব রবীন্দ্রমানসে এত তীব্র হয়ে উঠেছিল যে, তিনি একজন ধনঞ্জয় বাউলকেই সৃষ্টি করে ফেললেন অবশেষে। ‘গোরা’ উপন্যাসের শুরুতেই লালনের গানের প্রয়োগ আমরা লক্ষ করি। নিজেকে এক সময় ‘রবীন্দ্র বাউল’ বলতেও পছন্দ করতেন তিনি। অনেক গবেষক মনে করেন, বরীন্দ্রনাথ আলখাল্লাও পরিধান করা শুরু করেছিলেন পূর্ববঙ্গের বাউল-ফকিরি ঘরানার প্রভাবে। রবীন্দ্রমানসে বাউল প্রভাবের সুদূরপ্রসারী কার্যকরী বিশ্বমানবিক ঐকবোধের প্রেরণা সম্পর্কে বিনয় ঘোষ বলেন :

বিশ্বমানবিক ঐক্যের বাণী সেই ধারা থেকেই তাঁর অন্তরে ধ্বনিত হয়ে উঠেছে। বাউলের একতারায় বেজে উঠেছে বিশ্বজনমনের এক অশ্রুতপূর্ব ঐকতান, এবং তারপর বিশ্বকবি তাঁর নিজের বাণীর সহস্র তারে সেই ঐকতানের নব নব রূপ রচনা করেছেন। ……রবীন্দ্রচিন্তার বিশ্বমুখী অভিযানে বাংলার এই বাউলচিন্তা সকলের অগোচরে নিভৃতে নাবিকের কাজ করেছে।২

পূর্ববঙ্গের বৃহত্তর পল্লি সমাজ-সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে এসেই তিনি স্বদেশকে পূর্ণাঙ্গরূপে অনুভব করলেন। তাঁর ভাষায়: ‘দেশে জন্মালেই দেশ আপন হয় না, যতক্ষণ দেশকে না জানি, …ততক্ষণ দেশ আপনার নয়।’৩ রবীন্দ্রনাথের এই উক্তিটি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কেননা স্বদেশকে জানতে হলে তার অতীত-ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে হয়। আত্মানুসন্ধানের এই প্রবণতা মানুষের মধ্যে সহজাতভাবে বিদ্যমান থাকলেও তাকে নস্টালজিয়া-আক্রান্ত হলে চলে না; বরং তাকে হতে হয় আত্ম-পরিচয় সন্ধানের প্রচেষ্টায় নির্মোহ। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই লোকশক্তি তথা লোকসাহিত্যের আন্তরপ্রেরণার উৎসকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তাঁকেই আমরা প্রাতিষ্ঠানিক লোকসাহিত্য চর্চার দীক্ষাগুরু হিসেবে পাই। যদিও তাঁর আগে কেউ কেউ উদ্দেশ্যহীনভাবে এক্ষেত্রে চেষ্টা করেছেন। বঙ্গদেশে মূলত রবীন্দ্রনাথই লোকসাহিত্য চর্চার দিকে সুধীজনদের দৃষ্টি ফেরান। তাঁর পরে ব্যক্তি পর্যায়ে অনেকেই এবং কিছু প্রতিষ্ঠানও যথেষ্ট সচেষ্ট হয়েছিল; বিশেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে।  বাহবা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে নয়, প্রাণের টানেই রবীন্দ্রনাথ লোকসাহিত্য চর্চায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন দূর-দৃষ্টিসম্পন্ন প্রাজ্ঞজন। তিনি টের পেয়েছিলেন পল্লী তথা গ্রামে ও আধুনিকতার হাওয়া লাগছে, বাঁক নিচ্ছে পরিবর্তনের গতিপথ।  তাঁর ‘গ্রাম্য সাহিত্য’ প্রবন্ধে এ বিষয়ে তিনি বলেন :

কেবল সম্প্রতি অতি অল্পদিন হইল ‘আধুনিককাল’ দূরদেশাগত নবীন জামাতার মতো নূতন চাল-চলন  লইয়া পল্লীর অন্তঃপুরেও প্রবেশ করিয়াছে। গ্রামের মধ্যেও পরিবর্তনের হাত পড়িয়াছে।৪

বিশেষভাবে লক্ষণীয়, রবীন্দ্রনাথের লোকসাহিত্য চিন্তার কেন্দ্রে ছিল পল্লী বা গ্রাম। পল্লীর সাধারণ জনগোষ্ঠী। তাই অতি স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় রবীন্দ্রনাথের পরিশীলিত নাগরিক রুচিবোধের রসে স্নাত হয়ে তাঁর সাহিত্যেও বিশাল অংশজুড়ে পল্লী-প্রতিবেশ ও লোকজ জীবনাবহের পরিচয় পাওয়া যায়। এছাড়া পল্লীর জীবন-মান উন্নয়নেও তিনি ব্রতী হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বাউলিয়ানায় কিংবা লোকায়ত জীবন ও দর্শনের গভীরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করার কার্য-কারণ সূত্র হিসেবে কতিপয় বিবেচনা আমাদের সামনে চলে আসে। রবীন্দ্রনাথ পুঁজিবাদের উত্থান ও বিস্তারে সম্ভবত কিছুটা ভীত ও স্তম্ভিত হয়েছিলেন। একমাত্র পুঁজিতন্ত্রীদের কাছে সাহিত্যের আবেদন ফুরিয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় মানুষ নিছক উৎপাদনের যন্ত্র। পুঁজিবাদী সংস্কৃতিতে ব্যক্তির অর্জিত মূল্যবোধ, হৃদয়ধর্ম সব অসার। কিন্তু মানুষ তো পশু নয়। তাঁর জীবনের যে ঐরমযবৎ ঋধপঁষঃু গুলো আছে তা বিকশিত না হতে পারলে, জীবনের সারৎসার কী? নাগরিক জীবনের নাগপাশে বন্দি হয়ে লোকায়ত জীবনের মুক্ত পরিসর ভুলতে বসেছে মানুষ। বস্তুত, বিশ্বায়নের প্রভাবে আমাদের মতো কেবল ভোক্তা রাষ্ট্রগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে আধিপত্যবাদী আমদানিকৃত সকল প্রক্রিয়া সামাজিক অসংহতি, অস্থিরতা, আত্ম-বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে  কৃত্রিম এক অন্তঃসারশূন্য, মোহনীয়ও মরীচিকাময় বিপুল বলয় তৈরি করে চলেছে। রবীন্দ্রনাথ ‘পল্লীসেবা’য় সভ্যতা-বিনাশের কারণ হিসেবে মানবসম্বন্ধের বিকৃতি ও ব্যাঘাতকেই নির্দি¦ধায় চিহ্নিত করেছিলেন। সমকালীন সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের লোকসাহিত্য চর্চার মৌল-প্রবণতাটি তাই তাঁর কালের চেয়ে প্রাসঙ্গিক। কারণ, শেকড়হীন বৃক্ষ বেশিকাল বাঁচে না। মূলের মাধ্যমেই সে পরিপুষ্টি লাভ করে। তাই শেকড়চ্যূত মানুষ মূলত আত্মপরিচয়হীন। পৃথিবীতে যারা জ্ঞান-গরিমায় উন্নত জাতি হিসেবে পরিগণিত, তারা প্রত্যেকেই আপন জাতিসত্তার ঐতিহ্যকে লালন করে। রবীন্দ্রনাথ বহু আগেই আমাদের সে পথে আহ্বান করলেও; সেদিকে কার্যকরীভাবে অগ্রসর না হয়ে আমরা আত্মবিনাশী হয়ে উঠছি। একটি জাতিসত্তার ভিত্তিমূলের পরিচয়বাহী রূপে রয়েছে তার শেকড়, লোকসংস্কৃতি। এ বিষয়ে তাঁর অভিমত :

গাছের শিকড়টা যেমন মাটির সঙ্গে জড়িত এবং তাহার অগ্রভাগ আকাশের দিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে, তেমনি সর্বত্রই সাহিত্যের নিম্ন অংশ স্বদেশের মাটির মধ্যেই অনেক পরিমাণে জড়িত হইয়া ঢাকা থাকে; তাহা বিশেষরূপে সংকীর্ণরূপে দেশীয়, স্থানীয়। … সাহিত্যের যে অংশ সার্বভৌমিক তাহা এই প্রাদেশিক নিম্নস্তরের থাকটার উপরে দাঁড়াইয়া আছে। এইরূপ নিম্নসাহিত্য এবং উচ্চ সাহিত্যের মধ্যে বরাবর ভিতরকার একটি যোগ  আছে। যে অংশ আকাশের দিকে আছে তাহার ফুল-ফল ডালপালার সঙ্গে মাটির নীচেকার শিকড়গুলোর তুলনা হয়না; তবু তত্ত্ববিদ্দের কাছে তাহাদের সাদৃশ্য ও সম্বন্ধ কিছুতেই ঘুচিবার নহে।৫

উল্লিখিত মন্তব্যে একথা স্পষ্টত বোধগম্য হয় যে, নাগরিক সাহিত্যের ভিত্তিভূমিও ঐ লোকসাহিত্যেরই গভীরে। পরিতাপের কারণ এই যে, সেই ভিত্তিভূমির প্রতি অযত্ন-অবহেলা এবং তার গুরুত্ব সম্পর্কে উদাসীনতাই আমাদের ক্ষীয়মাণ জীবন ও আত্মবিনাশী চেতনার মূলে ক্রিয়াশীল। রবীন্দ্রনাথ প্রকৃত প্রাণের সন্ধান পান বাউল ভাবসাধনার মর্মমূলে। পল্লির নিরক্ষর, অশিক্ষিত সাধারণ মানুষের মুখে মুখে বাউল গান, লোকছড়া, পুঁথি, রূপকথা প্রভৃতি শুনে তিনি এতটাই অভিভূত হন যে— ‘সোনারতরী’ যুগে এসেই তিনি পাশ্চাত্য বিকারের প্রভাব থেকে স্বদেশের ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদ প্রথম অনুভব করেন এবং লোকসাহিত্য বিষয়ক আলোচনা করে তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি ফেরানোর প্রচেষ্টা চালান। ‘ছিন্নপত্রে’(১৯১২) এই আক্ষেপের প্রতিধ্বনি শোনা :

বাংলার যদি কতকগুলো ভালো

ভালো রূপকথা জানতুম এবং সরস ছন্দে

সুন্দর করে ছেলেবেলাকার ঘোর স্মৃতি

দিয়ে সরস করে লিখতে পারতুম ..।৬

রবীন্দ্রনাথ অন্তঃকরণেই লোকসাহিত্যের গুরুত্ব অনুভব করেছিলেন। তাই স্বদেশী আন্দোলনের যুগে যখন Back to village আন্দোলন হয়েছিল তারপরই ১৩১৪ বঙ্গাব্দে লোকসাহিত্য নামক গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। পূর্ববঙ্গের বাউল গান বিশেষ করে লালনের গানের বাণী ও সুর, তত্ত্ব-দর্শন তাঁকে রূপান্তরিত করতে সমর্থ হয়েছিল। লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখা হয় না সরাসরি। রবীন্দ্রসহোদর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে লালন সাঁইয়ের সাক্ষাৎ হয়েছিল।  লালনের যে স্কেচটি আদি— সেটি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আঁকা। শিলাইদহে বসবাস কালে জনৈক লালন-শিষ্যের নিকট থেকে লালনের গানের খাতা নিয়ে তিনি তাঁর কর্মচারী দিয়ে লালনের গানের কপি তৈরি করেছিলেন। তিনি লালন সাঁইয়ের ২৯৮টি গান সংগ্রহ করেছিলেন। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং সংগ্রাহকের ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন কয়েক বছর। ইংল্যান্ডের হিবার্ট বক্তৃতায়ও লালন, হাসন প্রমুখ মহাজনের গানের মর্মবাণী নিয়ে অলোচনা করেছেন তিনি। লালন তো তাঁকে সর্বাধিক প্রভাবিত করেছিল সন্দেহ নেই। এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, রবীন্দ্রনাথের কল্যাণেই সুধী মহলে লালন-চর্চা গৌরবের সঙ্গে যাত্রা শুরু করে।

 

বাংলার আরেক মরমি সাধক হাসন রাজার গানও কবিকে প্রভাবিত করেছে; নিয়োজিত করেছে তাঁর গানের অনুসরণে কবিতা সৃজনে। ১৯০৭ সালে রবীন্দ্রনাথ সিলেট ভ্রমণকালে হাসন রাজার ‘হাসন উদাস’ বইটি প্রথম হাতে পান। হাসনের একটি গান কবির চৈতন্যে গভীরভাবে কড়া নাড়ে। হাসনের ‘মম আঁখি হইতে পয়দা আসমান জমিন/ শরীরে করিল পয়দা শক্ত নরম’ গানে তিনি খুঁজে পান ব্যক্তিস্বরূপের সহিত সম্বন্বসূত্রেই বিশ্ব সত্য। রবীন্দ্রনাথ ‘শ্যামলী’ কাব্যগ্রন্থের “আমি” কবিতাটি ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ/ চুনি উঠল রাঙা হয়ে’— যে হাসন রাজার গানের দর্শনেরই প্রতিফলন তা অকপটে ১৯২৫ সালে ভারতীয় দর্শন কংগ্রেসের অধিবেশনে The Philosophy of Our People শীর্ষক অভিভাষণেও তিনি স্বীকার করেছেন এবং এই গানের দার্শনিকতা ও গভীর ভাব-মাহাত্ম্যের উল্লেখ করেন। তিনি কেবল লালনের গানের দার্শনিকতাকেই চিহ্নিত করেননি, বরং বাংলার লোকায়ত সাধনার ধারার মধ্যেই যে এমন গভীরতর দর্শন ও ভাব-সম্পদ নিবিড়ভাবে মিশে আছে— তার ইঙ্গিত দেন।

 

প্রসঙ্গক্রমে ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ’র অগ্রজ সংগীতজ্ঞ ফকির আফতাব উদ্দীন খাঁ’র একটি স্মৃতিচারণা আমাদের মনে পড়বে। তিনি একবার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথকে গান শুনিয়েছিলেন। তাও আবার বাংলার আরেক শক্তিমান লোকসাধক মহর্ষি মনোমোহন দত্তের গান। মনোমোহন রচিত গানের ধারাকে ‘মলয়া সংগীত’ও বলা হয়। আফতাব উদ্দীন খাঁ ‘মন মাঝে যেন কার ডাক শোনা যায়/ কে যেন আমারে অতি সাধ করে/ হাত দুখানা ধরে টেনে নিতে চায়।’ গান শেষে রবীন্দ্রনাথ আফতাব উদ্দীন খাঁকে এই গানের রচয়িতা মনোমোহন দত্তকে একদিন ঠাকুরবাড়িতে নিয়ে যেতে বলেন এবং সবিস্ময়ে মন্তব্য করেন: ‘কবিরা কল্পনা করেন, আর সাধকেরা চোখে দেখেন।’ ৭

 

তবে লালনের গানই যে সেই সমৃদ্ধ ভাব ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করছে— রবীন্দ্রনাথই প্রথম দেশে-বিদেশে তা তুলে ধরেন। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ ও সমাজ ভাবনা,উন্নয়ন-ভাবনা ও কর্ম,সভ্যতার সংকট-চিন্তা ও সামাজিক দায়বোধ তথা সামগ্রিক অগ্রযাত্রার চিন্তায় তাঁর লোকায়ত দৃষ্টিভঙ্গি ক্রিয়াশীল থেকেছে।জমিদারি পরিচালনার সময়ে তাঁর নেয়া বহু পদক্ষেপ গ্রাম-উন্নয়নের সাক্ষর বহন করে। লালনের উদারচেতা দর্শন রবীন্দ্রনাথকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। লালনকে তিনিই প্রথম সর্বজনের কাছে গুরত্বসহকারে তুলে ধরেন। তাই বহির্বিশ্বেও লালন ও বাংলার লোকায়ত সাধনা এখন মানবতাবাদী ও জীবনবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। বাংলার লোকজসংস্কৃতির ধারা নিরবচ্ছিন্নরূপে প্রবহমান। একটি দেশের প্রায় সিংহভাগ জনগোষ্ঠী সেই সংস্কৃতির ধারক। ফলে লোকজসংস্কৃতি ও সাধনা কালের স্রোতে নিরবধি বয়ে চলে। এর সুর ও স্বর নাগরিক রুচি-মন হতে ভিন্নতর। বাংলার লোকায়ত সাধনাকে অনেকেই মানবপন্থী বলে নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন। এই পন্থা সম্পূর্ণ মৌলিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক। আর মৌলিক বলেই উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের বরপুত্র রাজা রামমোহন রায়(১৭৭২-১৮৩৩), আর আত্মজ্ঞানী লালন (১৭৭৪-১৮৯০) স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। প্রথমজন পাশ্চাত্য প্রভাবপুষ্ট হয়ে ঋদ্ধ হয়েছেন, দ্বিতীয়জন বাংলার চিরায়ত লোকায়ত ভাব-ধারারই (সমকালীন) নবরূপান্তর মাত্র; যার উৎস স্বদেশের আপন সত্তায়। রেনেসাঁসে ‘মানুষ’ বা ‘মানবমহিমা’ প্রাধান্য পেল। লালনেও ‘মানুষ রতন’ হলো মূল সুর। একজন নগর জীবনে থেকে নাগরিক জীবন ও সমাজে নবজাগরণের জোয়ার আনলেন, অন্যজন স্বদেশের মৃত্তিকালগ্ন মানুষের মধ্যে থেকেই গাইলেন সমধর্মী, সাদৃশ্যপূর্ণ উদার মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার গান। রবীন্দ্রনাথ সেই ‘লোক’ (ঋড়ষশ) এর জীবন-মান উন্নয়নের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হয়েছিলেন— আত্মোপলব্ধির এমন আন্তরপ্রেরণা থেকে। যা বাউল মতাদর্শের গভীর দার্শনিক বোধ-বুদ্ধি প্রসূত। রবীন্দ্রনাথের মতো এমন পরিপূর্ণ ও বিদগ্ধ রুচির একজন চিন্তকের এমন প্রচেষ্টা ও প্রবণতাকে নতুন করে ভাবনায় এনে, অপসৃয়মান জাতীয় ঐতিহ্য ও সংহতি পুনঃস্থাপনের সময় এখনই। পৃথিবীর কোনো জাতিই তার অতীত-ঐতিহ্য ও নিজস্বতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে বা অস্বীকার করে আধুনিকতার মুকুট পরেনি। নগর-সংস্কৃতি ও লোকসংস্কৃতি আপাত বিরোধী মনে হলেও একটি অন্যটির পরিপূরক। এক্ষেত্রে সকলের শুভবোধ এবং ইতিবাচক মানসিকতাই বিবেচ্য। আধুনিক সভ্যতার গতিপ্রকৃতিকে অনুধাবন করে, সমস্যা ও সংকটের কেন্দ্রটিকে চিহ্নিত করতে হবে, কেননা সময়ের সাথে সভ্যতার সংকটও ঘণীভূত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী সংকটের প্রকৃতিও আমূল বদলে যাচ্ছে। চেনা পরিবেশ অচেনা-অপরিচিতিকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এগুচ্ছে। নৈরাশ্য, হতাশা, আত্মিক-সংকট, মানসিক বিকার ও যান্ত্রিকতা আধুনিক মানুষকে অতল গহ্বরের চোরাবালিতে নিক্ষেপ করছে  প্রতিনিয়ত। রবীন্দ্রনাথের লোকভাবনা একালের স্বভাব-নিয়মে উদ্ভূত সংকট থেকে পরিত্রাণের অন্যতম উপায় হতে পারে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রকে জাতীয় ইতিহাস—ঐতিহ্যের উৎসমূলে দৃষ্টি ফেরাতে হবে। সে উৎসমূল, আমাদের উদার মানবিকতা, প্রেম, স্নেহ-সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি এবং তা থেকে জাত লোকসাহিত্য। সমকালীন সংকট, জাতীয় বহুবিধ সমস্যা, সর্বোপরি বিপন্ন মানবাত্মার মুক্তির জন্য বাউল-দর্শনের উদার-মানবিক-অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভাবভাষ্য এবং লোকসংস্কৃতির মৌল প্রেরণা এবং রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র ভাবনা এক্ষেত্রে পাথেয় হতে পারে।

 

সূত্র নির্দেশ

১. সুকুমার সেন, পরিজন-পরিবেশে রবীন্দ্র-বিকাশ, কলকাতা : কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় , ১৯৬২।

২. বিনয় ঘোষ, ‘রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার লোক সংস্কৃতি’, রবীন্দ্রায়ন, (সম্পাদক : পুলিনবিহারী সেন), ২য় খণ্ড, কলিকাতা : বাক্-সাহিত্য, ১৯৬১।

৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘গ্রাম্য সাহিত্য’, লোকসাহিত্য, কলকাতা : বিশ্বভারতী, ১৩১৪।

৪. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘পল্লীপ্রকৃতি’, রবীন্দ্রনাথ, (সম্পাদক: পুলিবিহারী সেন), কলকাতা: বিশ্বভারতী, ১৯৬২।

৫. বিনয় ঘোষ, ‘রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার লোক সংস্কৃতি’, রবীন্দ্রায়ন, (সম্পাদক : পুলিনবিহারী সেন), ২য় খণ্ড, কলিকাতা : বাক্-সাহিত্য, ১৯৬১।

৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ছিন্নপত্র , কলকাতা : বিশ্বভারতী, ১৯৭০।

৭. মোহাম্মদ শেখ সাদী, লোকসাধক মনোমোহন দত্ত ও মলয়া সংগীত, ঢাকা: নন্দিতা প্রকাশ, ২০১৩

 

 

মোহাম্মদ শেখ সাদী, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

বাঙালির ভাষার অধিকার হরণ- রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক মৃত্যু

হোসাইন আনোয়ার আজ থেকে ৭৯ বছর আগের কথা। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ভারতবর্ষের সর্বশেষ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যটেন তার রোয়েদাদ ঘোষণা করেন, এই ঘোষণার পর

‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’ জননী রঞ্জিতা বড়ুয়াকে নিবেদিত সন্তান সত্যজিৎ বড়ুয়ার ‘সুরাঞ্জলি’

মা সুগৃহিনী শ্রমতী রঞ্জিতা বড়ুয়ার ৮৩ তম জন্মদিনকে উপলক্ষ করে ৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে গানে গানে সুরের

আন্দরকিল্লা’য় সুকুমার স্মরণ সন্ধ্যা

বিপুল বড়ুয়া   সুকুমার বড়ুয়া আমাদের ছড়াসাহিত্যের একজন প্রবাদপ্রতীম পুরুষ। নানা আঙ্গিক, বিষয়বস্তু, ধরণ-ধারণে, বৈচিত্রে অনুধ্যানে তিনি অসংখ্য ছড়া লিখে আমাদের ছড়া অঙ্গনে বহুমাত্রিকভাবে খ্যাত

জলে জঙ্গলে (পর্ব তিন)

মাসুদ আনোয়ার একে একে মুসল্লিরা বেরিয়ে আসছে মসজিদ থেকে। আমি দাঁড়িয়ে আছি স্থানুর মতো। প্রত্যেক মুসল্লির মুখের দিকে তীক্ষ্ম নজর বুলাচ্ছি। কাপ্তাই বড় মসজিদের ইমাম