এখন সময়:ভোর ৫:৫০- আজ: বৃহস্পতিবার-১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

এখন সময়:ভোর ৫:৫০- আজ: বৃহস্পতিবার
১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

ভণ্ড আলেম : উসমান সেম্বেন

অনুবাদ: জ্যোতির্ময় নন্দী

 

[উসমান সেম্বেন (১৯২৩-২০০৭) একজন সেনেগালী চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা এবং লেখক। ফরাসি কায়দায়

তাঁকে সেম্বেন উসমানও বলা হয়ে থাকে, এবং ‘উপনিবেশিক প্রভাব’ অস্বীকার করার অন্যতম উপায় হিসেবে নিজের নাম এভাবে লেখাটাই বেশি

পছন্দ করতেন। সেম্বেন আজীবন গণমানুষের রাজনীতিতে আস্থা রেখেছেন। শ্রমিক সংগঠন করা হোক বা শিল্পসৃষ্টি, সব কাজেই তিনি

রাজনৈতিক লড়াই করে গেছেন। শিল্পকেও তিনি রাজনৈতিক হাতিয়ার বলেই মনে করতেন। শুরুতে শুধু লেখালেখি করলেও, গণমানুষের

কাছে আরো বেশি করে পৌঁছানোর তাগিদ থেকেই তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে এসেছিলেন। সেম্বেনের লেখার আর সিনেমার মূল মাধ্যম ছিল ফরাসি

ভাষা। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটা বই হল: ল্যো দোক্যার নোয়া (কালো ডকশ্রমিক, ১৯৫৬), ও পেই, মঁ ব্যো পেপল! (ও দেশ, আমার সুন্দর

জনগণ!, ১৯৫৭), লে বু দ্যো বোয়া দ্যো দিয়ু (ঈশ্বরের কাঠের টুকরোগুলো, ১৯৬০), ভোলতাইচ (১৯৬০), লা’হার্মাতঁ (১৯৬৪), ল্যোা মঁ’দা প্রিসিদে দ্যো ভেই-সিওজানে (ভেই-সিওজানের পূর্ববর্তী আদেশটি, ১৯৬৬), জালা (১৯৭৩), ল্যো দের্নিয়ে দ্যে ল্যো’মপিয়ে, লা’হার্মাতঁ (সর্বশেষ সাম্রাজ্য, লা’হার্মাত, ১৯৮১), নীওয়াম (২০০৪) প্রভৃতি সেম্বেনের প্রকাশিত গোটা দশেক বইয়ের মধ্যে সাতটি পরবর্তী সময়ে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। বিশেষ করে লে বু দ্যো বোয়া দ্যো দিয়ু ও জালা’র সাহিত্যমান বিচারে সেম্বেনকে আফ্রিকার উত্তরোপনিবেশিক সাহিত্যে নেতৃস্থানীয় বলে বিবেচনা করা হয়। অনেকে তাঁকে আফ্রিকার সেরা কথাসাহিত্যিক বলেও মনে করেন। প্রায়শই তাঁকে ‘আফ্রিকীয় চলচ্চিত্রের জনক’ বলেও উল্লেখ করা হয়ে থাকে। তাঁর বানানো চলচ্চিত্রগুলো হল: বোরম সারে (১৯৬৩), নিয়ায়ে (১৯৬৪), লা নোয়ার দ্য… (১৯৬৬), মঁদাবি (১৯৬৮), জালা (১৯৭৪) প্রভৃতি। ২০০৪-এ নির্মিত তাঁর সর্বশেষ ছবি ‘মুলাদে’ একই বছরে কান্ চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়। এখানে ১৯৬২ সালে লেখা সেম্বেনের ‘ল্যো ফো প্রফেৎ’ গল্পটি বাংলায় তর্জমা করে দেয়া হল।]

 

মাহমুদ ফালের গায়ের রঙ ছিল তামাটে, নাকটা ছিল বাজপাখির ঠোঁটের মতো তীক্ষ্ম, চলন ছিল দ্রুত — যদিও সেটা তার চোখের শ্যেনদৃষ্টির মতো অত প্রখর নয়। সেনেগালি মুসলিমদের একটা বংশে জন্মেছিল সে, যারা বিশ্বস্তভাবে মেনে চলতো তাদের পূর্বপুরুষদের এই নীতিবাক্যটা, ‘যা আমার, আমিই তার মালিক; কিন্তু যা তোমার, তার ভাগ নিতে কেউ আমাকে ঠেকাতে পারবে ন।’ কোনো কাজকর্ম করত না সে। আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে, কাজের চাপে নিজেকে মেরে ফেলাটা তার পছন্দসই ছিল না। ছেলেপুলেরা খচরামো করে তাকে জিজ্ঞেস করত, ‘মাহমুদ, তুমি যেখান থেকে এসেছ ওখানে বেড়াল

 

নেই কেন?” সে জবাব দিত, ‘আমি ঠিক জানি না।’

এটা হল তার এ বক্তব্যটা বলা এড়িয়ে যাওয়া যে, আসলে বেড়ালরাও তার মতোই কাজকর্ম কিছু না করেই খেতে চায়, আর এজন্যেই সেনেগালের ওপরদিককার অঞ্চলে তাদের টিকিটিরও দেখা পাওয়া যায় না। কারণ সেখানকার মাটি রুখাশুখা, স্থানীয় বাসিন্দারা রাত নামলে কোনো জায়গায় তাঁবু ফেলে, ভোরে আবার তাঁবু উঠিয়ে অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু এমন যাযাবরদের ওপর নির্ভর করে একটা নিষ্কর্মা প্রাণী তো বাঁচতে পারে না। কথায় বলে, ভালোবাসতে হলে নিজের মতোকেই বাসো। কিন্তু স্বভাবে একে অপরের মতো হলেও মাহমুদ আর বেড়াল পারতপক্ষে পরস্পরের মুখদর্শন করত না। অবশ্য তার এলাকায় ক্বচিৎ-কদাচিত কোনো বেড়ালের দেখা পেলেও, সেটা এক করুণ দৃশ্যই হত বটে।

 

কিছুই না করে করে মাহমুদ ফাল্ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এদিকে তার পকেটও ছিল বিলকুল ফাঁকা। তাই সে একদিন সিদ্ধান্ত নিল, পশ্চিমে বেলালদের দেশের দিকে রওনা হবে। আবলুশ-কালো ওই লোকগুলোকে নিজেদের তুলনায় নিচু জাতের বলে মনে করত সে। তার মতে, এরা শুধু হারেমের পাহারাদার হওয়ারই যোগ্য, তবে তার আগে এদেরকে খোজা করে দিতে হবে যাতে ছেলেপুলের বাবা কে তা নিয়ে শেষে ঝামেলা না বাঁধে।

 

সেনেগালে পৌঁছার পর সে তার নাম পাল্টে ফেলল। এখানে এসে সে নতুন নাম নিল আইদ্রা, আর এ নাম সেখানকার সব দরজা তার সামনে খুলে দিল। তার উঁচু জাতের কারণে সর্বত্র তাকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা হতে লাগল। মরিতানিয়ায় সে কোরান পাঠ শিখেছিল। সেনেগালিরা কোরানকে খুব শ্রদ্ধা করে। কাজেই পবিত্র এই ধর্মগ্রন্থের জ্ঞান থাকাটা তার জন্যে খুব লাভজনক হয়ে দাঁড়াল। বিভিন্ন জায়গায় নামাজে ইমামতি করত সে, যথানিয়মে হাঁটু গেড়ে সেজদা দিয়ে। স্থানীয়রা এসব দেখে একেবারে অভিভূত হয়ে যেত। মহান আইদ্রার একজন বংশধরকে নিজেদের ইমাম হিসেবে পাওয়াটাকে তারা তাদের বিরাট সৌভাগ্য বলে মনে করত।

 

এসব প্রশংসায় নিজের প্রতিপক্ষ বেড়ালের মতোই পিঠ বাঁকিয়ে ফুলে উঠত মাহমুদ ফাল্। প্রকৃতি তার কণ্ঠে সুর দিয়েছিল, আর তাই সে তাকে ঘিরে জমায়েত সবাইকে কোরান তেলাওয়াত করে আনন্দ দিতে পারত। তেলাওয়াতের সময় সর্বোচ্চ চেষ্টা করত, সুরাগুলোর প্রতিটি প্রস্বরকে উঁচুতে তুলে প্রলম্বিত ও তরঙ্গিত করে তারপর নিচে নামিয়ে আনার। পাঁচ ওয়ক্ত নামাজের মাঝখানের সময়গুলোতে সে একটা ভেড়ার চামড়ার ওপর বসে তসবিহ্ টিপতো।

 

খাওয়ার সময় হলে সে চাপ দিত, তাকে যেন অন্য সবার থেকে আলাদাভাবে খেতে দেয়া হয়। খাবারের জন্যে তার ধন্যবাদ জানানোর একমাত্র কায়দাটা ছিল শিশু বা বয়স্ক সবার ওপর প্রচুর পরিমাণে থুতু ছেটানো। তারা ওই থুতু তাদের মুখে মাখতে মাখতে বলত, ‘আমিন, আমিন!’ অনেকে অবাক হয়ে ভাবত, মাহমুদ এসব ব্যাপারে একান্তে তার বিবেককে বা আল্লাহকে কী জবাব দেয়।

এখানে ওখানে ঘোরাঘুরি করতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর সে এলাকার প্রতিটি বাড়ির উঠোনে উঠোনে যেত। ‘প্রত্যেক মেহমানের বাটিতে কিছু দাও’, এই ঐতিহ্যবাহী নীতি মেন্ইে সবাই তাকে অভ্যর্থনা জানাত।  এই মেহমান প্রথম প্রথম ওদের দেয়া সব খাবারই গ্রহণ করত। কিন্তু যতই দিন যেতে লাগল, ক্রমশ খুঁতখুঁতে হয়ে উঠল সে। সে বলত, কুসকুস১ খেলে তার ঘুম হয় না। ওদের দেয়া নানা খাবার খেয়ে বদহজম হওয়ার অভিযোগও করত সে।

 

আপ্যায়নকারী গেরস্থরা বেহেশতের পথে থাকার একান্ত কামনা নিয়ে নানা সুখাদ্য রান্না করে তার সূক্ষ্ম রুচির রসনাকে তৃপ্ত করার চেষ্টা করত। তবে এটা নিশ্চিত করার জন্যে সে কখনো কখনো সোজা ওদের রান্নাঘরে ঢুকে গিয়ে নিজের পছন্দসই খাবারের ফরমায়েশ দিতেও কিছুমাত্র ইতস্তত করত না। এটা ছিল তার ভাইবেরাদরির দিক।

 

 

ভালো খাওয়া দাওয়া করার পাশাপাশি মাহমুদ ফাল্ খুচরো মুদ্রাও জমাচ্ছিল, যদিও সে কখনোই ওগুলোকে তার মেহনতের তুলনায় যথেষ্ট বলে মনে করত না। পাঁচ ওয়ক্ত নামাজের ওপর শ্রদ্ধাভক্তি এই কালা আদমিগুলোর একেবারেই ছিল না। আরো একটা ব্যাপার ছিল — বেড়াল পোষার জন্য তারা এত নাছোড় ছিল কেন? কোনো বাড়িতে বেড়াল দেখামাত্র তার রোম খাড়া হয়ে যেত, ঠিক কোনো হুলো বেড়ালের মতো। সে তখন মুখ ভেংচিয়ে বেড়ালটাকে তাড়া করত। মাঝে মাঝে সে বেড়াল পোষার অসারতা নিয়ে নসিহতও করত।

 

এসব ছোটখাটো বিরক্তির কথা বাদ দিলে, একজন ধর্মপ্রচারক হিসেবে তার খ্যাতি গত কয়েকমাস ধরে বেড়ে চলেছে বলেই মাহমুদ ফালের মনে হত। তাকে দেখলেই এখানকার আলেম-ওলামাদের, তালেবালিমদের, মারাবুদের২ আর মুফাসসিরদের সবার মুখে এক কথা: ‘সওমা র্না, সওমা র্না (আমার মুর৩, আমার মুর)।’ মাহমুদ গোপনে ভাবত, ওরা বদ্ধপাগল। ‘সওমা নার! আমার মুর। “আমার” কেন? কে কখন শুনেছে এসব কালা আদমি কোনো মুরকে কিনে নিয়েছে? ওটা একটা উল্টোপাল্টা ধরনের কথা।’

 

সে আরো বেশি বেশি করে কাগজের টুকরোয় কালাম লিখে দিতে লাগল, যাতে লোকজন সেগুলো সাথে নিয়ে এখানে ওখানে যেতে পারে। এ ছাড়া নিজের জন্মপরিচয় আর আসল মতলব সে আরো অনেক বেশি কঠোরভাবে চেষ্টা চালাতে লাগল। নিজের মানমর্যাদা আরো বাড়ানোর জন্যে এমনকি এতদূর পর্যন্ত ঘোষণা করে দিল যে, তার শরীরকে ফিনাহরি দিয়ানান থেকে — দোজখ থেকে — বের করে দেয়া হয়েছিল। আর তারা তার বাকি গুলগপ্পোগুলোর মতো এটাকেও দিব্যি গিলে ফেলল।

 

এভাবে কয়েক মাস যাওয়ার পর মাহমুদ দেখতে পেল, তার সঞ্চয়ের পরিমাণ অটলভাবে বেড়েই চলেছে। একদিন সকালে সে কাউকে কিছু না বলে ওখান থেকে কোথায় চলে গেল, ঠিক যেরকম অপ্রত্যাশিতভাবে সে একদিন সন্ধ্যায় ওখানে এসে পৌঁছেছিল। বয়োবৃদ্ধরা তাদের প্রজ্ঞার আলোয় বলল, ‘সূর্যাস্ত যদি কোনো আগন্তুককে নিয়ে আসে, সূর্যোদয়ে তার খোঁজ কোরো না।’

 

একটা থলেতে নিজের সঞ্চিত টাকাপয়সা আর জিনিসপত্রগুলো নিয়ে, মাহমুদ ফাল্ পা চালিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল তার প্রিয় অ্যাটলাস পর্বতমালার দিকে। সে হাঁটতে থাকল দিন-রাত, শুধু খুব ক্লান্ত হয়ে পড়লে মাঝে মাঝে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিত। সারাক্ষণ সে ভেবে চলেছিল, কিভাবে সে তার সঞ্চিত পুঁজি কাজে লাগাবে আর যেকোনো সন্দেহজনক মোকাবেলা এড়িয়ে যেতে পারবে। এ লক্ষ্য মাথায় রেখে সে ঘুরপথে উত্তরের তিয়েদেস রাজ্যের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেল। সে-রাজ্যে বিধর্মী পুতুল পূজারীদের বাস, যদিও মাহমুদের সেটা জানা ছিল না। এগিয়ে যেতে যেতে সে নিজেকে অভিনন্দন দিচ্ছিল: ‘শয়তানকে ধন্যবাদ, আমাকে অন্যের মালকড়ি হাতিয়ে নেয়ার কৌশল শিখিয়ে দেয়ার জন্যে।’

 

গরমকাল তখন তুঙ্গে। সূর্যের রশ্মির ছুড়ে দেয়া আগুনের শিখার মতো জ্বলিয়ে দিচ্ছিল অবশিষ্ট দু-চারগোছা ঘাসকে; বাতাস সেগুলোকে ছিঁড়ে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল বহুদূরের সাগর সৈকতের দিকে। বাতাসের শিস মাঝে মাঝে কাটিয়ে দিচ্ছিল ওখানকার নিস্তব্ধতার অসহ্য একঘেয়েমি। অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া মাটি থেকে একটা ভাপ উঠছিল আকাশের দিকে। এখানে সেখানে পড়ে ছিল নানা প্রাণীর কঙ্কাল, যেগুলো পচনের বিভিন্ন পর্যায়ে সাফসুতরো হয়ে ক্রমে ধবধবে সাদা হয়ে উঠেছিল, আর হাওয়া ওগুলোকে ধীরে ধীরে মাটির নিচে চাপা দিচ্ছিল। মাথার ওপর দিয়ে পাখিরা উড়ে যেতে যেতে এমনভাবে ডাকছিল, যেন ওরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে নালিশ জানাচ্ছে। পরিবেশটা ছিল প্রশান্তি আর অস্বস্তির এক সংমিশ্রণ।

 

মাহমুদ যতদূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিল, একেবারে একা একটা গাছ ছাড়া জীবন্ত আর কিছুই তার চোখে পড়ল না। অদ্ভুত একটা গাছ। এই তীব্র খরার মধ্যে তার প্রচুর পত্রপল্লবের কারণেই ওটাকে অদ্ভুত মনে হচ্ছিল। এই দোজখে টিকে থাকা একমাত্র প্রাণ। একটা তেঁতুল গাছ।

 

তখন প্রায় নামাজের সময় হয়ে এসেছিল। প্রচণ্ড গরমে আর দীর্ঘ পথযাত্রার ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন মাহমুদ গাছটার ছায়ায় বসে পড়ল। সে ভাবছিল, এখানে গাছটার ছায়ায় সে একটু ঘুমিয়ে নেয়ার আগে নামাজটা পড়ে নেবে, নাকি ঘুমানোর পরে। সে এ ব্যাপারে মনস্থির করতে পারছিল না। শেষপর্যন্ত আগে ঘুমিয়ে নেয়াটাই মনস্থ করে সে তেঁতুল গাছটার তলায় শুয়ে পড়ল। কিন্তু ওটা কী? হঠাৎ সে উঠে বসল আর খুব জোরে চিৎকার করে উঠল, যদিও ওখানে সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। ‘এই! এই! হ্যাঁ হ্যাঁ, ওপরে তোমাকে বলছি, নিচে নেমে এস!’

 

তার কথাগুলো চারপাশে প্রতিধ্বনিত হল। তিনবার সে চিৎকার করে ডাকল, কিন্তু কোনো জবাব এল না। তারপর সে উঠে দাঁড়াল, ছুটে গেল ডানে আর বাঁয়ে, অস্তায়মান সূর্যের দিকে আর পূর্বদিকে। কিন্তু সে নিজে ছাড়া আর কেউই ছিল না। শুধু সে আর গাছটাই। তার ভেতর থেকে কে যেন দ্বিগুণ সন্দেহজনকভাবে তাকে তাগিদ দিলো তার সম্পদগুলো লুকিয়ে ফেলার জন্যে। গাছটার তলায় সে তার বাহুর সমদৈর্ঘ্য পর্যন্ত গভীর করে একটা গর্ত খুঁড়ল, আর তারপর গেল চারপাশে একবার নজর বোলাতে। কিন্তু কিছুই তার চোখে পড়ল না। তারপর আবার ফিরে এসে সে গর্তটা আরো খুঁড়ে আগের চেয়ে দ্বিগুণ

 

গভীর করে নিল, তারপর আবার গেল চারপাশে চোখ বোলাতে। এবারও সে কিছু দেখতে পেল না। তেঁতুল গাছটার ঘন ডালপালা, পাতাপল্লবের মধ্যে দিয়ে ভালো করে দেখার জন্যে সে চোখের ওপর হাতের ছাউনি দিয়ে রোদ সামলে তাকাল। না, কেউ সেখানে লুকিয়ে নেই। তারপর সে আবার তার গর্তের কাছে ফিরে গিয়ে আরো ভালো করে খুঁড়ল ওটাকে।  খোঁড়া শেষ হয়ে যাওয়ার পর সে গর্তটার পাশে বসে তার দিরহামগুলো গুণল। চারপাশের নিস্তব্ধতার মধ্যে মুদ্রাগুলোর টুংটাং শব্দ তার খুব ভালো লাগল। সন্তুষ্ট এবং আশ্বস্ত হয়ে সে সব দিরহাম ওই গর্তে মাটিচাপা দিয়ে তার ওপর শুয়ে পড়ল টানটান হয়ে। কিন্তু তারপর তার মনে পড়ল, তার কাছে সর্বশক্তিমানের যে-পাওনা তা সে এখনও শোধ করে নি। তাই সে তাঁর উদ্দেশ্যে বলল: ‘আমি এজন্যে তোমার কাছে ঋণী…।’

 

এসব কাজ সারার পর মাহমুদের চোখে ঘুম নামতে দেরি হল না। ঘুমের সাথে এল মধুর স্বপ্ন। সেই স্বপ্নে মরুভূমির মধ্যে দিয়ে ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছিল সে। তার চোখ যতদূর যাচ্ছিল, সে শুধু দেখতে পাচ্ছিল মাঝে মাঝে বালিয়াড়ির ঢাল নিয়ে বিস্তৃত বালুর মহাসাগর। নীরব সমুদ্রে জাহাজের মতো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল উটগুলো, তাদের লম্বা লম্বা ঘাড়ের ওপর নোয়ানো মাথাগুলো নিয়ে। ইস্পাতের চেয়েও শক্ত বালুকণাগুলো তার পোশাক ফুঁড়ে হুল ফোটাচ্ছিল তার গায়ের চামড়ায়। তারপরই তার স্বপ্ন পাল্টে গেল একধরনের বাস্তবতায়। মাহমুদ ফাল্ দেখতে পেল, একজন রোগা, অর্ধনগ্ন কালো মানুষ তাকে উঠিয়ে নিয়ে, গর্তের ওপর থেকে সরিয়ে রেখে, তার পুঁতে রাখা মুদ্রাগুলো হস্তগত করল, আর তারপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কামিয়ে দিতে লাগল তার মাথাটা। শেষপর্যন্ত চোখ থেকে ঘুম তাড়িয়ে উঠে বসল মাহমুদ। এখনও চোখে জড়িয়ে থাকা ঘুম নিয়ে হাই তুলল আর তারপর ধন্যবাদ জানাল আল্লাহকে।

 

একজন ইমানদার মুসলমান হিসেবে মাহমুদ ফজরের নামাজটা পড়ে নেয়ার কথা ভাবল। (পানি পাওয়া না গেলে, বালু দিয়ে ওজু করার বিধান আছে।) যত অশুচি জিনিস সে ছুঁয়েছে, সেগুলো সব ধুয়ে পাকসাফ করার জন্যে সে তার হাতে আর বাজু কয়েক মুঠো বালু দিয়ে রগড়ে নিল, তারপর কিছু বালু ছড়িয়ে দিল মুখে আর মাথায়। এই ধর্মীয় কৃত্যটা সারতে গিয়ে সে একটা ধাক্কা খেল — নিজের মাথায় কোনো চুলের অস্তিত্ব তার হাতে ঠেকল না। সে তাড়াতাড়ি তার দুটো হাতই তুলে সারা মাথায় বোলাল। না, তার কোনো চুল নেই — তার সারা মাথা জুড়ে এখন টাক। ধীরে ধীরে, খুব সাবধানে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জোর চেষ্টা করতে করতে মাহমুদ তার হাত দুটো চিবুক বেয়ে নামিয়ে আনল। ওখানে কোনো দাড়িও ছিল না। আতঙ্কে চোখ বিস্ফারিত করে বুঝে ওঠার চেষ্টা করতে লাগল, তার সাথে এসব কি ঘটছে। তার মনে হল, সে কাদের যেন কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে। সত্যিই তাই, তার নিজের ভেতর থেকে স্বরগুলো উঠে আসছিল।

 

‘খোদা তোমার চুল-দাড়ি কামিয়ে দিয়েছেন,’ একটা স্বর বলল।

 

‘এটা তুমি কী বললে? খোদা কারো চুল-দাড়ি কামান না,’ বলল আরেকটা স্বর।

 

কথাগুলো শুনতে শুনতে মাহমুদ উত্তেজিত হয়ে উঠল। এর পরের মন্তব্যটার জবাবে একটা হাসির আওয়াজ শোনা গেল।

 

‘আল্লাহ্র ওপর বিশ্বাস রাখ। তার রহমতই সবকিছু!’

 

‘হা, হা! তুমি আমাকে হাসালে। তুমি যখন ওই বেচারা ভেড়াগুলোর লোম ছাঁটছিলে, তখন ওটা কার নামে করতে?’

 

মাহমুদ ফাল্ প্রাণপণে চেষ্টা করছিল, ভেতরের এই কণ্ঠস্বর দুটোকে থামিয়ে দিতে, কিন্তু কিছুতেই তা পারল না। হাত দিয়ে কান চাপা দিল সে, কিন্তু তারপরও সে তাদের কথা শুনতে পাচ্ছিল।

 

‘নামাজ পড়ে নাও!’ একটা স্বর আদেশ দিল। ‘তুমি ইতিমধ্যে দুটো নামাজ কাজা করেছ।’

 

‘প্রথমে তোমার টাকাগুলো খুঁজে দেখ,’ অন্য স্বরটা পরামর্শ দিল। ‘টাকা ছাড়া, তুমি কোনো ইজ্জত পাবে না। কোনো উট কিনতে পারবে না। তোমার খাওয়ার জন্যে কিছু থাকবে না। তোমার টাকাগুলোর ব্যাপারে আগে নিশ্চিত হও। পেট ভরা থাকলে আল্লাহ্র ইবাদত করাও সহজ হয়।’

 

মাহমুদ শেষ নির্দেশটা মেনে নিল। সে চারপাশের মাটি আর বালু এমন প্রবলভাবে আঁচড়ে আঁচড়ে সরাতে লাগল যে, সেটা কোনো স্বাভাবিক মানুষের কাজ বলে মনে হচ্ছিল না। কোণঠাসা হয়ে পড়লে ছাগলও কামড়ায়, আর এ মুহূর্তে মাহমুদকে কেউ তার সম্পদ খুঁজতে বাধা দিলে সেও তাকে কামড়ে দিত। মাথা নুইয়ে ঘামতে ঘামতে তার জিভ বেরিয়ে পড়েছিল। সে-সময়ে কেউ তাকে দেখলে একটা দানবাকৃতির

কাঁকড়া বলেই মনে করত। সে তার পা দিয়ে ঠেলে গর্তটার ভেতর থেকে আলগা মাটি সরিয়ে দিতে লাগল। তার গায়ে জড়ানো বুবুটি৪ ফাঁসের মতো তার গলায় চেপে বসছিল। তাই হ্যাঁচকা টানে বুবুটি নিচে নামিয়ে নিজের গলাটা মুক্ত করে নিল সে। তারপর আবার নতুন উদ্যমে সে গর্তটার মাটি খুঁড়তে শুরু করল। শেষপর্যন্ত গর্তটার  তলা পর্যন্ত বালু সরিয়ে ফেললে সে, আর প্রচণ্ড হতাশ হয়ে দেখল, ওখানে শুধু তার চকচকে কালো চুলগুলো রাখা আছে।

 

চুলগুলো গর্ত থেকে উঠিয়ে নিয়ে সে বিভ্রান্তের মতো তাকিয়ে রইল ওগুলোর দিকে, তারপর আবার তাকালো খালি গর্তটার দিকে। চোখ তুলে তেঁতুল গাছটার দিকে তাকিয়ে সে আল্লাহকে সাক্ষী মানল: ‘বিলাহি-ওয়াহালি, এটা আমি নই।’

 

এক হাতে চুল ধরে আর আরেক হাত চিবুকে বোলাতে বোলাতে তার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল। ‘বিলাহি-ওয়াহালি, আমি মাহমুদ ফাল্ নই!’ ফোঁপাতে ফোঁপাতে আবার বলল সে।

 

তারপর সে যত জোরে পারে চিৎকার করে বলল, ‘আমার দোস্ত, আমার পুরোনো দোস্ত মাহমুদ ফাল্, তুমি এসে আমাকে এ অনিশ্চয়তা থেকে উদ্ধার কর।’

 

প্রতিধ্বনি তার চিৎকারকে ঝেঁটিয়ে, গড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ছুঁড়ে দিল সমতলভূমির দিকে, রাংঝালাই করা লোহার চালের ওপর পাথরের টুকরোর মতো। শব্দটা দূরে মিলিয়ে যাওয়ার পর সে ধীরে ধীরে বিড়বিড় করে বলল, ‘আমার পুরোনো দোস্ত মাহমুদ ফাল্, আমার সাথে এসব চালাকি কোরো না। আমি তো তোমাকে অনেকদিন থেকে চিনি…’

 

সে তার দৃষ্টিসীমার বাইরের কোনো বিন্দুতে মনকে কেন্দ্রীভূত করে, কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করতে লাগল খুব একাগ্রভাবে। কিন্তু কিছুই শুনতে পেল না সে। তার সামনে ছড়িয়ে ছিল শুধু এক বিশাল শূন্যতা। তারপর আবার ফের শোনা গেল তাকে বিদ্রূপ করতে থাকা সেই স্বর দুটো।

 

‘তুমি নামাজ পড়বে না?’ প্রথম স্বরটা বলল।

 

কী করছে সেটা ঠিকমতো না বুঝেই সে মক্কার দিকে মুখ করে তার দু হাত ওঠাল তার আল্লাহ্র ঘরের দিকে। ‘আল্লাহু আকবর!’

 

কিন্তু তার চোখ বার বার চলে যেতে লাগল সেই জায়গাটার দিকে, যেখানে সে তার সম্পদগুলো লুকিয়েছিল।

 

‘তোমার সবকিছু লুট হয়ে গেলেও তুমি আল্লাহ্র এবাদত করতে পারবে?’ একটা স্বর জিজ্ঞেস করল।

 

‘খোদাকে জিজ্ঞেস কর, তোমার টাকাপয়সা কে চুরি করেছে?’ বলল অরেকটা স্বর

 

কী করবে বুঝতে না পেরে মাহমুদ সেখানে দাঁড়িয়ে রইল, মোনাজাতের ভঙ্গিতে দুহাত তুলে। তারপর তার মনে পড়ে গেল, তার দেখা স্বপ্নটার কথা। ‘আমি তখন ঘুমিয়ে ছিলাম না,’ সে ভাবল।

চোরটাকে সে দেখেছে; তার চুল-দাড়ি যে কামিয়ে ফেলা হচ্ছে সেটাও সে বুঝতে পেরেছিল। আর রহমানুর রহিম তাতে কোনো বাধা দেন নি, রহমানুর রহিম সেটা হতে দিয়েছেন।’

 

‘না, আমি আর কোনোদিন নামাজ পড়ব না,’ মৃদু স্বরে বলল সে, আল্লাহ্ তার কথাগুলো শুনতে পাবেন না একথা ভেবে।

 

চোরের পায়ের ছাপ দেখতে পাবে আশা করে তিনবার পাক খেল সে তেঁতুল গাছটার চারপাশে, কিন্তু কিচ্ছু দেখতে পেল না। ওপরে আকাশে একটা পরিযায়ী পাখি গান গাইতে শুরু করেছিল। মাহমুদ ফাল্ চিৎকার করে গালাগাল দিল তাকে। তারপর হঠাৎ তার মনে হল, সে বড় একা।

 

‘মুররা যেমন বলে,” বিড়বিড় করে বলল সে, ‘এই গোলামের বাচ্চারা সবাই চোর!’

 

রাগে সে অন্ধ হয়ে গেল, আর পাগলের মতো ছুটতে লাগল মরুভূমির মধ্যে দিয়ে। তার ছেঁড়াখোঁড়া বুবু বাতাসে পতপত করে উড়ছিল। এইমাত্র সে বুঝতে পারল যে, চোর হতে হলে আল্লাহ্য় বিশ্বাস রাখার কোনো দরকার নেই।

 

১কুসকুস হল ভাপানো সুজিদানা দিয়ে তৈরি একটা উত্তর অফ্রিকীয় খাবার, যেটার ওপর প্রায়শ একটা স্ট্যু ছড়িয়ে পরিবেশন করা হয়। মহাদেশটির অন্যান্য অঞ্চলেও একই কায়দায় ভাপে সেদ্ধ বাজরা, জোয়ার, বালগার ও অন্যান্য খাদ্যশস্য দিয়ে কুসকুস বানানো ও পরিবেশন করা হয়। পশ্চিম আফ্রিকার মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মরিতানিয়া প্রভৃতি দেশে কুসকুস প্রধান খাদ্য হিসেবে বিবেচিত।

 

২মারাবুরা হল মূলত উত্তর আফ্রিকার একটা মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্য, যারা রিবাত বা সুরক্ষিত দরগাহে থেকে ধর্মীয় সাধনার পাশাপাশি সামরিক দায়িত্বও পালন করে থাকে।

 

৩অষ্টম শতাব্দীতে স্পেনবিজয়ী আরবীয় মুসলমানদের ‘মুর’ বলা হয়ে থাকে।

 

৪বুবু বা ম্বুবু হল পশ্চিম অফ্রিকার এবং উত্তর আফ্রিকীয় কিছু অঞ্চলেরও স্থানীয় অধিবাসীদের একধরনের আলখাল্লা জাতীয় পোশাক

 

 

জ্যোতির্ময় নন্দী, কবি, অনুবাদক

বাঙালির ভাষার অধিকার হরণ- রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক মৃত্যু

হোসাইন আনোয়ার আজ থেকে ৭৯ বছর আগের কথা। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ভারতবর্ষের সর্বশেষ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যটেন তার রোয়েদাদ ঘোষণা করেন, এই ঘোষণার পর

‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’ জননী রঞ্জিতা বড়ুয়াকে নিবেদিত সন্তান সত্যজিৎ বড়ুয়ার ‘সুরাঞ্জলি’

মা সুগৃহিনী শ্রমতী রঞ্জিতা বড়ুয়ার ৮৩ তম জন্মদিনকে উপলক্ষ করে ৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে গানে গানে সুরের

আন্দরকিল্লা’য় সুকুমার স্মরণ সন্ধ্যা

বিপুল বড়ুয়া   সুকুমার বড়ুয়া আমাদের ছড়াসাহিত্যের একজন প্রবাদপ্রতীম পুরুষ। নানা আঙ্গিক, বিষয়বস্তু, ধরণ-ধারণে, বৈচিত্রে অনুধ্যানে তিনি অসংখ্য ছড়া লিখে আমাদের ছড়া অঙ্গনে বহুমাত্রিকভাবে খ্যাত

জলে জঙ্গলে (পর্ব তিন)

মাসুদ আনোয়ার একে একে মুসল্লিরা বেরিয়ে আসছে মসজিদ থেকে। আমি দাঁড়িয়ে আছি স্থানুর মতো। প্রত্যেক মুসল্লির মুখের দিকে তীক্ষ্ম নজর বুলাচ্ছি। কাপ্তাই বড় মসজিদের ইমাম