হোসাইন আনোয়ার
আজ থেকে ৭৯ বছর আগের কথা। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ভারতবর্ষের সর্বশেষ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যটেন তার রোয়েদাদ ঘোষণা করেন, এই ঘোষণার পর পরই পাকিস্তানের নানাবিধ সমস্যার মধ্যে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটিও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়ায়। আলোচনা এতটাই উত্তেজনাময় হয়ে ওঠে যে, শতকরা ৫৬ জন লোকের মুখের ভাষাকে অস্বীকার করে ১৯৪৭ সালে জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দির অনুকরণে উর্দু’কে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সপক্ষে অভিমত প্রকাশ করেন। তার এই অভিমতের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানগতভাবে কোনো প্রতিবাদ তখন কেউ তোলেনি। যিনি এর প্রতিবাদ করতেন তাঁকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ১৯৪১ সালে মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁর একমাত্র অপরাধ ছিল ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে ঐতিহাসিক ‘লাহোর প্রস্তাব’ উত্থাপন করা।
এই লাহোর প্রস্তাবকেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ষড়যন্ত্র করে ‘পাকিস্তান’ প্রস্তাবে পরিণত করেন। লাহোর প্রস্তাবের উপস্থাপক শের-এ- বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের সঙ্গে মোহাম্মদ আলী জিন্নার দ্বন্দ্ব এখান থেকে শুরু। কায়েমী স্বার্থের প্রতি শের-এ-বাংলার আপোসহীন মনোভাবের
কারণে জিন্নার সঙ্গে শুরু হয় সংঘাত। তিনি সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হওয়ার পরও তাঁকে অন্যায়ভাবে মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। জিন্নার নির্দেশ অমান্য করে শের-এ-বাংলা ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স কাউন্সিল’-এ যোগদান করেছিলেন, এটাই ছিল শের-এ- বাংলার বিরুদ্ধে জিন্নার সবচাইতে বড় অভিযোগ। এটা ছিল তার প্রকাশ্য অভিযোগ। ভেতরে ভেতরে কাজ করছিল তীব্র ঈর্ষা। নেতৃত্বের ঈর্ষা। বাঙালি ফজলুল হক নেতা হয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানের, তাকে থামাতে হবে। তাকে থামাও। অতএব যা হবার তাই হয়েছে।
আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়ার রাষ্ট্রভাষা উর্দু’র প্রস্তাব মোহাম্মদ আলী জিন্নার ষড়যন্ত্রেরই একটি অংশ ছিল। তা না হলে দাক্ষিণাত্যের নিজাম শাসিত হায়দ্রাবাদের অন্তর্গত সেকান্দ্রারাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবের প্রধান অতিথি ড. জিয়াউদ্দিন আহমদের পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে কথা বলার কথা নয়। অথচ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পেছনে গ্রহণযোগ্য কোনো কারণ ছিল না।
উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার ড. জিয়ার এ প্রস্তাব বাঙালি লেখকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই প্রস্তাব আলোচিত হওয়ার মুহূর্তেই কোলকাতা থেকেই এর তীব্র প্রতিবাদ করেন জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্। পাকিস্তান সৃষ্টির ১৭ দিন আগে ১৯৪৭ সালের ২৯ জুলাই ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি লিখলেন-
“কংগ্রেসের নির্দিষ্ট হিন্দীর অনুকরণে ‘উর্দু’ পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে গণ্য হইলে তাহা শুধু পশ্চাদগমনই হইবে। ইংরেজি ভাষার বিরুদ্ধে একমাত্র যুক্তি এই যে, ইহা পাকিস্তান ডোমিনিয়নের কোনো প্রদেশের অধিবাসীরই মাতৃভাষা নয়। উর্দুর বিপক্ষেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। পাকিস্তান ডোমিনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের মাতৃভাষা বিভিন্ন যেমন- পশতু, বেলুচি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি এবং বাংলা। কিন্তু উর্দু পাকিস্তানের কোনো অঞ্চলেরই মাতৃভাষারূপে চালু নয়। যদি বিদেশি ভাষা বলিয়া ইংরেজি ভাষা পরিত্যক্ত হয়, তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ না করার পক্ষে কোনো যুক্তি নাই। যদি বাংলা ভাষার অতিরিক্ত কোনো দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করিতে হয়, তবে উর্দু ভাষার দাবি বিবেচনা করা কর্তব্য।”
প্রবন্ধটির শেষে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ লিখলেন-
“বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দিভাষা গ্রহণ করা হইলে, ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে। ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয়ে শিক্ষার বাহন রূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষার সপক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন, আমি একজন শিক্ষাবিদ রূপে উহার তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছি। ইহা কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ও নীতি বিরোধীই নয়, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতিবিগর্হিতও বটে।”
এই প্রবন্ধটির পর ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ১৭ পৌষ ১৩৫৪ ‘তকবীর’ পত্রিকায় পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষায় ভাষা ‘সমস্যা’ নামে আরও একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধটিতেও তিনি বাংলা, “আরবি, উর্দু এবং ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তানি নীতি কি হওয়া উচিত সে বিষয়ে আলোচনা করেন। বাংলা সম্পর্কে তিনি লিখলেন-‘হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রত্যেক বাঙালির জন্য প্রাথমিক শিক্ষণীয় ভাষা অবশ্যই বাংলা হইবে। ইহা জ্যামিতিক স্বীকৃত বিষয়ের ন্যায় স্বতঃসিদ্ধ। উন্মাদ ব্যতীত কেহই ইহার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করিতে পারে না। এই বাংলাই হইবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।”
ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে তিনি নিম্নোক্ত অভিমত প্রকাশ করেন, ‘আমরা পাকিস্তান রাষ্ট্রকে একটি আধুনিক প্রগতিশীল রাষ্ট্ররূপে দেখিতে চাই। তজ্জন্য ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, ইতালীয়ান বা রুশ ভাষাগুলির মধ্যে যে কোনো একটি ভাষা আমাদের উচ্চ শিক্ষার জন্য পঠিতব্য ভাষারূপে গ্রহণ করিতে হইবে। এই সকলের মধ্যে অবশ্যই আমরা ইংরেজিকেই বাছিয়া লইব। ইহার কারণে, দুইটি- ১. ইংরেজি আমাদের উচ্চ শিক্ষিতের নিকট সুপরিচিত। ২. ইংরেজি পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক প্রচিলত আন্তর্জাতিক ভাষা।
এখানেই শেষ নয়, পাকিস্তান অর্জিত হওয়ার পর ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ একই বিষয়ে ১৯৪৭ সালের ২১ ডিসেম্বর ‘দৈনিক আজাদ’ এ আরও একটি প্রবন্ধ লেখেন। তিনি লিখেছেন- ‘যাহারা বাংলা ভাষাকে ছাড়িয়া বাংলার স্কুল কলেজে শিক্ষার মাধ্যম রূপে অথবা বাংলাদেশের আইন আদালতে ব্যবহার্য ভাষারূপে ‘উর্দুর’ পক্ষে ওকালতি করিতেছে, আমি তাহাদিগকে কাণ্ডজ্ঞানহীন পণ্ডিতমুর্খ ভিন্ন আর কিছুই মনে করিতে পারিনা।’
শুধু ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহই নন, দৈনিক ইত্তেহাদের সাহিত্যের পাতায় ১৯৪৭ সালের ২২ ও ২৯ জুন সংখ্যায় মোহাম্মদ আবদুল হক ‘বাংলাভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ শীর্ষক দুটি প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধ দুটিতে
লেখক বাঙালির ভাষাগত স্বাতন্ত্রের সপক্ষে জোরালো বক্তব্য উত্থাপন করেন।
এই প্রবন্ধ প্রকাশের মাত্র দুদিন আগে অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ২৭ জুন ‘সাপ্তাহিক মিল্লাত’ পত্রিকার উপসম্পাদকীয়তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করলে তার পরিণাম কি হতে পারে সে সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।
উপসম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘একটা দেশকে পুরোপুরি দাসত্বে রূপান্তরিত করার জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের যত রকম অস্ত্র আছে, তার মধ্যে সবচাইতে ঘৃণ্য ও মারাত্মক অস্ত্র হইতেছে, সেই দেশের মাতৃভাষার পরিবর্তে একটি বিদেশি ভাষাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে বরণ করানো। এর চাইতে বড় দাসত্ব আর কিছু থাকিতে পারে না। পূর্ব পাকিস্তানবাসীকে এই ঘৃণ্য দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধিতে যদি কেউ বাসনা করে, তাহা হইলে তাহার সেই উদ্ভট বাসনা বাঙালির প্রবল জনমতের ঝড়ের তোড়ে তৃণখণ্ডের মতো ভাসিয়া যাইবে।’
৩০ জুন ১৯৪৭। দৈনিক আজাদ পত্রিকার উপসম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে লেখা হয়, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হইবে তা এখন স্থির করার সময় এসেছে। যে ভাষাকেই আমরা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করি তার আগে আমাদের বিশেষভাবে ভেবে দেখতে হবে, কোন ভাষায় পাকিস্তানের সব চেয়ে বেশি লোক কথা বলে, পাকিস্তানের সব থেকে শ্রেষ্ঠ ভাষা কোনটি, কোন ভাষায় সব থেকে শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে এবং কোন ভাষা ভাব প্রকাশের পক্ষে সব থেকে বেশি উপযোগী। যে দিক থেকেই বিবেচনা করা যাক না কেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা’র দাবি সব চাইতে বেশি।
ঢাকার নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ‘কৃষ্টি’ নামক একটি সংকলনের ১৩৫৪ সালের কার্তিক সংখ্যায় ড. মুহাম্মদ এনামুল হক লিখলেন, ‘যদি উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হয়, তা হলে পূর্ব পাকিস্তানের ‘রাষ্ট্রীয়’ সর্বনাশ ঘটবে। উর্দু বহিয়া আনিবে পাকিস্তানের মরণ। রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক মৃত্যু।’
১৩৫৪ সালের অগ্রহায়ণ সংখ্যায় ‘মাসিক সওগাত’ এ প্রকাশিত ‘রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে কাজী মোতাহার হোসেন লিখলেন, ‘বর্তমানে যদি গায়ের জোরে উর্দুকে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের উপর রাষ্ট্রভাষা রূপে চালাইবার চেষ্টা করা হয়, তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হইবে।’
কবি ফররুখ আহমদ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর এই সমর্থনের পেছনে বাঙালি জাতীয়তাবোধ বলে কিছু ছিল না। তিনি যতটা ছিলেন বাঙালি তার চেয়ে অনেক বেশি ছিলেন পাকিস্তানি। পাকিস্তানিদের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি শুধু সচেতনই ছিলেন না, তা বাস্তবায়নের জন্য তিনি ছিলেন সচেষ্ট। বলাবাহুল্য, ইসলামী সংস্কৃতি বিকাশের স্বার্থেই তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার প্রস্তাব সমর্থন করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্যেই এই সত্য ধরা পড়ে। মাসিক ‘সওগাত’ এর ১৩৫৪ এর আশ্বিন সংখ্যায় ‘পাকিস্তান: রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাভাষার পরিবর্তে অন্যভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করলে এই দেশে ইসলামী সংস্কৃতিকে হত্যা করা হবে।
এই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্র ও অধ্যাপকের উদ্যোগে নিজেদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় “তমদ্দুন মজলিশ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংস্থা গঠিত হয়। এই সংস্থা থেকে ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি পুস্তিকায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ‘বাংলা না উর্দু’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে কাজী মোতাহের হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ এবং প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের জন্য জোরালো ভাষায় বক্তব্য পেশ করেন এবং প্রয়োজনবোধে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান। উক্ত পুস্তিকায় প্রবন্ধগুলোতে নানা যুক্তিদ্বারা প্রমাণ করা হয় যে, “বাংলাভাষা” পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার উপযুক্ত। (পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু না বাংলা পূ. ৩-৪), পরবর্তীকালে যদিও এই তমদ্দুন মজলিশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে দূরে সরে গিয়েছিল, তবুও ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে এর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
এই সংগ্রাম পরিষদের কর্মীরা প্রথমে প্রথমে ফজলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে এক তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ফজলুর রহমান ওই সময় কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রী। মন্ত্রী কর্মীদের সঙ্গে অসম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করেন।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হলে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও গণপরিষদের ভাষা হিসেবে গ্রহণের জন্য প্রস্তাব করেন গণপরিষদ সদস্য বাবু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তাঁর এই প্রস্তাবের সমর্থনে দেশ কয়েকজন সদস্য বক্তৃতাও করেন। এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে পরিষদে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পর্যন্ত এই ন্যায়সঙ্গত প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে এই প্রস্তাবে হিন্দু প্রাধান্যের সূত্র অনুসন্ধান করেন বেশ কয়েকজন গ্ণপরিষদ সদস্য।
ওই অধিবেশনে পূর্ব বাংলার খাদ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দুর সপক্ষে একটি উদ্ভট রায় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীরই এই মনোভাব যে, একমাত্র উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে। (নওবেলাল, ৪ মার্চ ১৯৪৮)। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ অনুষ্ঠিত গণপরিষদে খাজা নাজিমুদ্দিনের এই
বক্তৃতার ফলে পূর্ব বাংলায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এই সময় দৈনিক আজাদ ২৭ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় ‘বাংলাভাষা ও পাকিস্তান’ শীর্ষক এক সম্পাদকীয় প্রকাশ করে।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে দৈনিক আজাদ সব সময়ই সাহসী ভূমিকা পালন করে যদিও ১৯৩৭ সালে কোলকাতায় জন্ম নেয়া এই পত্রিকার মালিক মাওলানা আকরম খাঁ সক্রিয়ভাবে মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। চল্লিশ দশকে অবিভক্ত বাংলা এবং পঞ্চাশ দশকে পূর্ব বাংলায় দৈনিক আজাদ ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী পত্রিকা। মাওলানা আকরম খাঁ এবং তাঁর দৈনিক আজাদ বরাবরই মুসলিম লীগের দক্ষিণপন্থী উপদলের সমর্থকের ভূমিকা পালন করতেন। যদিও মাওলানা আকরম খাঁ ছিলেন পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগের সভাপতি কিন্তু দৈনিক আজাদের সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন ছিলেন ভাষা আন্দোলনের সমর্থক। ৫২’র ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণ হলে সন্ধ্যায় আজাদ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হলো। ব্যানার হেডিং হলো, ‘ছাত্রদের তাজা খুনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত’। নুরুল আমীন সরকার তাৎক্ষণিকভাবে এই সংখ্যাটি বে-আইনী ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে আজাদের সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরের দিন দৈনিক আজাদ-এ তাঁর পদত্যাগের সংবাদ ফলাও করে ছাপা হয়।
হোসাইন আনোয়ার, কবি, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক




