অমল বড়ুয়া
লোকসাহিত্যের একটি অন্যতম বিষয় হল ধাঁধা। প্রাচীনকাল থেকেই ধাঁধা সাধারণ জনমানুষের শিক্ষার একটি অন্যতম উপায়। আদিম সমাজে মানুষ যখন প্রকৃতির বিভিন্ন রহস্য ও ঘটনা সহজে বুঝতে পারত না, তখন তারা রূপক ও প্রতীকের মাধ্যমে নানা প্রশ্ন বা অনুসন্ধিৎসু জিজ্ঞাসার গোড়াপত্তন করেছিল। এই মৌখিক জিজ্ঞাসা থেকেই ধাঁধার জন্ম। ব্লুমফিল্ডের মতে, সহজ সরল আদিম সমাজে ধাঁধার জন্ম হয়েছে এবং সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তা জটিল হয়ে চলেছে।’ ধাঁধা হলো তাই- যা বাক্যে, একটি মাত্র ভাব বা বিষয়কে রূপকের দ্বারা প্রশ্নের আকারে প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ যে বাক্যের মধ্যে একটি মাত্র ভাব রূপকের সাহায্যে জিজ্ঞাসাকারে প্রকাশ করা হয় তাকেই আমরা ধাঁধা বলতে পারি। ধাঁধা জনসাধারণের নিজ অভিজ্ঞতাকে প্রশ্ন আকারে লিপিবদ্ধ করে। এলোমেলো বা ছড়ানো বস্তুর ভাবনাকে সুসংবদ্ধ বাক্যের যে সংক্ষিপ্ত রূপ বা আকার ভাষায় প্রকাশ পায় তাই-ই ধাঁধা। ধাঁধার মূল বিষয় হল ‘উত্তর’। ধাঁধার মধ্যরূপে প্রশ্নকর্তা গুছিয়ে যা একত্রিত করেন উত্তরদাতাকে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। ধাঁধার প্রশ্ন এবং উত্তর উভয়েই একত্রিত হয়ে ধাঁধার পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণ করে। ধাঁধা হলো এমন একটি চতুর প্রশ্ন বা সমস্যা, যা রূপক বা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে উপস্থাপনের মাধ্যমে মানুষের বুদ্ধিমত্তা, মেধা ও জ্ঞান পরীক্ষা করে। এটি লোকসাহিত্যের একটি অত্যন্ত প্রাচীন শাখা, যা মানুষের মনে কৌতূহল ও চিন্তার খোরাক জোগায়। গদ্য বা পদ্য উভয়রূপেই এটি প্রকাশিত হতে পারে। তাছাড়া ধাঁধা সাধারণ জনসাধারণের মনে জীবন ও জগৎকে জানার কৌতুহল জাগিয়ে তুলে। ধাঁধা শুধু ধন্ধ লাগায় না, দ্বন্দ্বেরও সৃষ্টি করে।
সংস্কৃত ‘দ্বন্দ্ব’ শব্দ থেকে ‘ধাঁধা’ শব্দের উৎপত্তি। অর্থাৎ সংস্কৃত ‘দ্বন্দ্ব’ শব্দজাত ‘ধন্ধ’ থেকে ধাঁধা শব্দের উৎপত্তি (দ্বন্দ্ব>ধন্দ>ধন্ধ>ধাঁধা)। ‘বঙ্গীয় শব্দকোষে’ হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ধাঁধা শব্দের অর্থ করেছেন কৌতুককর কূট প্রশ্ন বা হেয়াঁলি অর্থে। রাজশেখর বসু তাঁর ‘চলন্তিকায়’ ধাঁধা শব্দকে ‘দ্বন্দ্ব’ শব্দজাত ‘কৌতূহলজনক দুরূহ প্রশ্ন’ বলে উল্লেখ করেছেন। আর ধাঁধার ইংরেজি ‘ৎরফফষব’, যা অ্যাংলো স্যাকসন শব্দ ‘জবধফরহ’ থেকে উৎপন্ন। বাংলায় ধাঁধাকে হেঁয়ালিও বলা হয়। মনে করা হয় যে হেঁয়ালির উৎপত্তি সংস্কৃত প্রহেলিকা থেকে হয়েছে। ভারত-বাংলায় অঞ্চলভেদে ধাঁধা ভিন্ন ভিন্ন নামে প্রচলিত; যেমন- বিহারে- ‘বাহা’; গুজরাটে ‘উত্থানো’; ভূপালে- ‘ভুলভুলাইয়া’: চট্টগ্রামে-‘দস্তান’; ময়মনসিংহ-এ ‘ঠল্লক’; সিলেটে- ‘দিঠান’; কুমিল্লায়-‘শিলুক’ ইত্যাদি। ধাঁধার বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ধাঁধা রূপকাশ্রিত। ধাঁধা প্রশ্ন-উত্তরমূলক; এক পক্ষ প্রশ্ন করে অপরপক্ষ উত্তর দেয়। ধাঁধা বুদ্ধিদীপ্ত। ধাঁধা মূলত ঐতিহ্যমূলক; সেজন্য ধাঁধার একটি সর্বজনবিদিত ও সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর থাকে। ধাঁধার মধ্যে লোকশিক্ষামূলক ভাবনা বিদ্যমান থাকে।
লোকসাহিত্যে ধাঁধা সেই প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। তাছাড়া নানান ধর্মগ্রন্থেও ধাঁধার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। যেমন- ঋগে¦দ, ভারতীয় পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত। বিশ্বের প্রাচীনতম লিখিত ধাঁধার নিদর্শন পাওয়া যায় সংস্কৃত ঋগে¦দে। ঋগে¦দের প্রথম মণ্ডলের ১৬৪ নম্বর সূক্তে ব্রহ্ম ও জগতকে নিয়ে বেশ কিছু গূঢ় প্রহেলিকা বা ধাঁধার সন্ধান মেলে। বাইবেলেও ধাঁধা দেখা যায়, যা খুবই দীর্ঘ। কিন্তু বর্তমান যুগে প্রচলিত ধাঁধাগুলি সংক্ষিপ্ত। আমেরিকান লোকবিজ্ঞানী টেলর প্রমাণ করেছেন যে হিব্রু ধর্মগ্রন্থে চীনাভাষায় এবং অষ্ট্রেলিয়া ও আমেরিকার অধিবাসীদের মধ্যে ধাঁধার প্রচুর নমুনা রয়েছে। প্রাচীন গ্রিসে ধাঁধার প্রচলন ছিল প্রবল। আর সবচেয়ে প্রাচীন ধাঁধার সন্ধানও পাওয়া যায় গ্রিসে। গ্রিক পুরাণের ‘স্ফিংক্সের ধাঁধা’ (জরফফষব ড়ভ ঃযব ঝঢ়যরহী) বিশ্বসাহিত্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ও আদিম ধাঁধার নজির হিসেবে গণ্য হয়। এছাড়া মহাকবি হোমারের সময়কালেও রাজসভায় বুদ্ধির পরীক্ষা হিসেবে ধাঁধার ব্যবহার হতো। খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতাব্দীতে গ্রিক মহাকবি হোমার রাজসভায় ‘জোঁক’ সম্বন্ধীয় একটি ধাঁধার উত্তর দিতে না পারায় লজ্জিত ও জীবনে বিতৃষ্ণ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মধ্যযুগে বিভিন্ন দেশের রাজসভায় পন্ডিত ও কবিরা নিজেদের বুদ্ধিমত্তা প্রমাণের জন্য কূট প্রশ্ন বা হেঁয়ালি ব্যবহার করতেন। ফার্সি সাহিত্যেও ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’সহ নানা কাব্যে এর পরিচয় মেলে। এ সময় এটি রাজকীয় ও মার্জিত বুদ্ধিবৃত্তিক বিনোদনে রূপ নেয়। অভিজাত পর্যায় থেকে ছড়িয়ে পড়ে ধাঁধা গ্রামীণ বাংলার উঠোন, শীতের রাতের আসর কিংবা বিয়ের আসরে লৌকিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে। মুখে মুখে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে এটি স্থানান্তরিত হয়েছে। বাংলায় একে ‘হেঁয়ালি’ বা ‘প্রহেলিকা’ নামেও ডাকা হয়। বিংশ শতাব্দীতে এসে সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনে বুদ্ধির খোরাক জোগাতে ক্রসবোর্ড, সুডোকু, শব্দজট ইত্যাদি আধুনিক ধাঁধার প্রচলন হয়। বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও আইকিউ টেস্টের বইয়েও ধাঁধার আধুনিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপ দেখতে পাওয়া যায়।
ধাঁধা যে রূপ রসের সামগ্রী সেরূপ জ্ঞানের ও বিষয়। চমক বা তাক লাগানোর প্রয়াসে কখন ও কখন ও ধাঁধা রচিত হয়। তাছাড়া এর মধ্য দিয়ে উপস্থিত বুদ্ধি পরীক্ষা করা হয়। সৌন্দর্যবোধ, প্রখল বুদ্ধিদীপ্তি, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ শক্তি, চিন্তার উৎকর্ষতা, মননশীলতা, কৌতুক সৃষ্টি, স্মৃতি চর্চা, প্রতীক ব্যবহারের প্রবণতা, নির্মল আনন্দ দান ও রসবোধ প্রভূতি ধারায় বিদ্যমান। ধাঁধার মধ্যে এক আক্রমণাত্মক ভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া কোনো কোনো ধাধায় যে রূপ পুরস্কারের আভাস পাওয়া যায় রস রূপ কোনো কোনো ধাঁধায় দুর্বোধ্য শব্দ ও ব্যবহৃত হয়। ধাঁধা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত- ১. লৌকিক- লৌকিক ধাঁধায় বিষয়বস্তুকে সহজ কথায় সংক্ষিপ্ত রূপে প্রকাশ করা হয়। লৌকিক ধাঁধাকে আবার কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়- ১. নরনারী ও দেব দেবী বিষয়ক- (ক) মানুষ ও তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, (খ) ইতিহাস প্রসিদ্ধ পুরুষ ও নারী, (গ) পৌরাণিক চরিত্র, (ঘ) দেবদেবী। নরনারী সম্পর্কিত একটি ধাঁধায় মানুষের শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্যের অবস্থাকে প্রশ্নের আকারে তুলে ধরা হয়েছে-
‘সকালে কে চারি পায়ে হাঁটে?
দ্বিপ্রহরে দুই পায়ে হাঁটে?
সন্ধ্যায় তিন পায়ে হাঁটে?’
আবার মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করেও রচিত হয় ধাঁধা। যেমন চোখ নিয়ে রয়েছে বেশ কিছু ধাঁধা-
একটুখানি পুকুর, পানি টলমল করে।
রাজার ছেলের সাধ্য নেই, জাল ফেলতে পারে।
এক বৃক্ষে ফুটেছে এক জোড়া ফুল।
হীরা মানিক নয়, তার সমতুল।
শুধু চোখ নয়, চোখের পাতা নিয়েও আছে ধাঁধা-
এপার ঝাটি ওপার ঝাটি,
ঝাটিতে করে পিটা পিটি।
কাহিনি বা আখ্যানমুলক ধাঁধা হলো-
‘মা একটিপে মন বাছছে দিদি একে দুই করছে
বাবা আকাশের তারা বোঝাচ্ছে
আমি মরা খেয়ে এসেছি গিয়ে জ্যান্ত খাবো।’
২. প্রকৃতি বিষয়ক- (ক) উদ্ভিদ ও লতাপাতা সংক্রান্ত, (খ) আকাশ গ্রহ নক্ষত্র ও প্রকৃতি। প্রকৃতি নিয়ে অসংখ্য ধাঁধা রচিত হয়েছেছ, যেমন- ডাব বা নারিকেল নিয়ে রচিত একটি ধাঁধা হলো-
‘মাঠে ঘাটে জল নেই, গাছের মাথায় জল’।
কিংবা পাকা লঙ্কা নিয়ে রচিত ধাঁধা হলো-
‘একটুখানি গাছে, রাঙা বৌটি নাচে।’
প্রকৃতির বুকে বৃক্ষরোপনকে উদ্দেশ্য করে রচিত হয় ধাঁধা-
জীবিত থাকলে কবর দেয়,
মরে গেলে খুঁড়ে নেয়- এ কে?
ধাঁধার মধ্যে প্রায়শ প্রকৃতি ও তার গাছপালাকে অনুষঙ্গ হয়ে উঠতে দেখা যায়। তালগাছ নিয়ে রচিত অন্য একটি ধাঁধা হলো-
একটি গাছের বাঁট নাই, তবু দুগ্ধ হয় প্রচুর।
দোহনকালে থাকে নাকো, তার নিকটে বাছুর।
আবার কলাগাছ ও কাঁঠাল নিয়েও রয়েছে ধাঁধা-
‘এক গাছে তিন তরকারী,
আজব কথা বলি হাড়ি।’
‘এক গাছে বহু ফল, গায়ে কাঁটা কাঁটা।
পাকলে ছাড়াও যদি হাতে লাগে আঠা।’
৩. গার্হস্থ্য জীবন বিষয়ক- (ক) আত্মীয় সম্পর্কীয় ও অনাত্মীয় অথচ কাছের মানুষ, (খ) খাদ্যবস্তু, (গ) দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত জিনিসপত্র, (ঘ) আচার আচরণ অভ্যাস, (ঙ) আচার অনুষ্ঠান ক্রিয়াকর্ম। গার্হস্থ্য বিষয়ক অসংখ্য ধাঁধা রচিত হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত দ্রব্যসামগ্রীর মধ্যে মশারি অন্যতম। মশারি নিয়ে রচিত একটি ধাঁধা হলো-
‘ঘরের মধ্যে ঘর,
তার মধ্যে পরমেশ্বর।’
যাপিতজীবনের রোগ-বালাই-এর উপরও রচিত হয়েছে ধাঁধা। যেমন সর্দি নিয়ে এই ধাঁধাটা খুবই রহস্যাবৃত
‘এক বাড়ির দুই দরজা দিয়া জল গড়িয়ে পড়ে-
হাওয়া ছাড়া আর হাওয়া নেয়ার পরে।’
গার্হস্থ্য জীবনের আনুষাঙ্গিক ব্যবহার্য উপকরণ যেমন ছাতা, চশমা, ঘড়ি, গামছা ইত্যাদিও ধাঁধার বিষয় হয়ে উঠেছ।
‘এক ঘরে এক থাম,
বল কি তার নাম।’
‘ঠেলা দিলে খুলে যায়
ভেতরে গেলে আরাম পাই।’
‘এ কোন ব্যাটা শয়তান,
থাকে বসে ধরে কান?’
‘দুই হাত আছে তার, আরো আছে মুখ
পা ছাড়াও জিনিসটার মনে বড় সুখ।
বলো তো জিনিসটা কী?’
তোমাকে শুকিয়ে নিজে সে ভিজে
উত্তরটা বলো দেখি চেষ্টা করে নিজে?’
মানুষের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে পানির গুরুত্ব অপরিসীম। আর এই পানি ও বরফও অনুষঙ্গ হয়েছে ধাঁধার-
‘এতো ভালো বিছানা,
কেউ যেন বসে না।’
‘তিন অক্ষরে নাম যার, যাতে তৈরি তাতেই ভেসে;
শেষের অক্ষর বাদ দিলে সোজা বিয়ের পিঁড়িতে বসে।’
৪. পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ বিষয়ক, ৫. বাদ্যযন্ত্র বিষয়ক, ৬. আখ্যান বা কাহিনিমূলক, ৭. গাণিতিক বা সংখ্যামূলক ৮. বিবিধ বিষয়ক। পশুপাখি কীটপতঙ্গ সংক্রান্ত অসংখ্য ধাঁধা প্রচলিত। সারমেয় ধাঁধার বিষয় হয়ে উঠেছে। ধাঁধাটি হলো-
‘ছাই ভিন্ন শোয় না,
লাথি ভিন্ন ওঠে না।’
এই ধাঁধাটি মানুষের স্বভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে ব্যবহৃত হয়। কিংবা জোনাকি নিয়ে রচিত একটি ধাঁধা হলো-
‘জঙ্গল দিয়া উড়িয়া চলে
পিছ দিয়া আগুন জ্বলে।’
ধাঁধায় কৃষিভিত্তিক সমাজবাস্তবতার উপস্থিতি বেশ লক্ষণীয়। এই যেমন চাষের বলদ নিয়ে রচিত হয়েছে ধাঁধা-
‘একটি হলে কাজ হবে না, দুটি কিন্তু চাই।
দুটি পেলে, হবে চাষী ভাই।’
বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র নিয়ে নানারকম ধাঁধা রচিত হয়েছে। বাউল গানে ব্যবহৃত হয় একতারা। একটি ধাঁধায় একতারা সম্পর্কে বলা হয়েছে-
‘চার অক্ষরে হয় এক সাধারণ বাদ্যযন্ত্র
প্রথম দুই অক্ষরে সংখ্যা, শেষ দুয়ে নক্ষত্র।’
অক্ষর নিয়ে রয়েছে আরও কিছু ধাঁধা-
‘একটি অক্ষর শিক্ষকে আছে, পন্ডিতে নেই।
কাননে আছে, বাগানে নেই।’
২. সাহিত্যাশ্রয়ী- লৌকিক ধাঁধায় যে বিষয়টিকে সহজ কথায় সংক্ষিপ্ত রূপে প্রকাশ করা হয় সাহিত্যিক ধাঁধায় তারই বিচিত্র রূপ অলংকারের সাথে ব্যক্ত করা হয়। বৈদিক কাল থেকে সাহিত্যিক ধাঁধার ব্যাবহার চলে আসছ। চর্যাপদ, চণ্ডী মঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, শিব মঙ্গলকাব্য, নাথসাহিত্যে গুপিচন্দ্রের গানে, গর্খো বিজয়ে, বাউলগানে, কবিগানে, বহু সাহিত্যিক ধাঁধার সন্ধান পাওয়া যায়। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদে অনেক অনেক হেঁয়ালি বা প্রচ্ছন্ন প্রশ্নের দেখা পাওয়া যায়। যেমন-
‘দুহি দুহি পীঢ়া ধরন ন জাই
রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাই
দিবসহি বহুড়ী কাউহি ডর ভাই
রাতি ভইলে কামরু জাই।’
ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরামের ‘চণ্ডিমঙ্গল’ অথবা ঘনরামের ‘ধর্মমঙ্গল’ গ্রন্থে উন্নত ধরনের সাহিত্যিক ধাঁধার বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। আরব দেশের হাজী খলিফা কর্তৃক লিখিত চর্তুদশ শতকের পাণ্ডুলিপি থেকে জানা যায় যে আরবেও উৎকৃষ্ট ধাঁধা তৈরি হয়েছিল। বসরা অঞ্চলের আল-হারিরী তাঁর ধাঁধার জন্য সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছিলেন। এছাড়াও আরব্য উপন্যাস, ইহুদিদের গ্রন্থ, বাইবেল, পারস্য সাহিত্যে ফেরদৌসীর ‘জাল’ ও আরব্য সাহিত্যের বাদশাহ সোলায়মান ও রানি বিলকিসের ধাঁধা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংস্কৃত সাহিত্যে বিশেষ করে বেতাল পঞ্চবিংশতি গ্রন্থে, আরব্য উপন্যাসে, প্রাকৃত সাহিত্যে সুদীর্ঘ কাহিনির আকারেও ধাঁধা সাহিত্য পাওয়া যায়। বাংলা সমাজে বিবাহবাসর থেকে শুরু করে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে, গ্রাম্য মজলিসে আমোদ প্রমোদের উপকরণ হিসেবে ও ধাঁধার প্রচলন বহুল। ধাঁধা সর্বসাধারণের কাছে সমানভাবে আনন্দের বিষয় ও কৌতূহল জনক। যেমন-
‘বন থেকে বেরুল টিয়ে
সোনার টোপর মাথায় দিয়ে।’
আলোচ্য ধাঁধায় একদিকে যেমন সৌন্দর্যবোধ বা রসবোধ ফুটে উঠেছে অন্যদিকে তেমনি উপস্থিত বুদ্ধি বা স্মৃতিচর্চার পরিচয় পাওয়া যায়। ধাঁধা যেমন শিশু জীবনের পরম সম্পদ তেমনি বয়স্ক মানুষেরও পরম সম্পদ। ধাঁধার বিষয় অনুষঙ্গে রয়েছে দারুণ বৈচিত্র্য। মানুষের যাপিতজীবনের নানান অনুষঙ্গ ধাঁধার রহস্যের ইন্দ্রজালে রাঙময় হয়ে ওঠে অনায়াসে। এই যেমন মানুষের ছায়া নিয়ে রয়েছে বেশ কিছু ধাঁধা
‘একলা তারে যায় না দেখা, সঙ্গী গেলে বাঁচে।
আধার দেখে ভয়ে পালায়, আলোয় ফিরে আসে।’
‘সবাই তোমাকে ছেড়ে গেলেও সে যাবে না ছেড়ে
চেষ্টা করে বলো দেখি, উত্তর কে পারে?’
বাংলার বৃহত্তর সমাজজীবনে ধাঁধার ব্যবহার দেখা যায়। ধাঁধার প্রধান গুণ সংক্ষিপ্ততা। ধাঁধার আবেদন মূলত বুদ্ধিগ্রাহ্য। ধাঁধা জ্ঞানেরও বিষয়, আবার রসেরও সামগ্রী। এর মধ্য দিয়ে উত্তরদাতার উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। গদ্য ও পদ্য উভয় ভাষাতেই ধাঁধা রচিত হতে পারে। ধাঁধা জনসাধারণের মনে জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে জানার কৌতূহল সৃষ্টি করে। ধাঁধার মধ্যে প্রখর বুদ্ধিবৃত্তি, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণশক্তি, মননশীলতা, কৌতুক, স্মৃতিচর্চা, রূপক-প্রতীক ব্যবহারের প্রবণতা, নির্মল আনন্দদান, সৌন্দর্যবোধ ও রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। ধাঁধা সবার কাছেই সমান কৌতূহলজনক ও আনন্দের বিষয়। ধাঁধার মৌল আবেদন অতীতে যা ছিল ভবিষ্যতে ও তা থাকবে যা মানব জীবনের এক কৌতূহলজনক ও শিক্ষার বিষয়।
অমল বড়ুয়া : প্রাবন্ধিক ও গবেষক, চট্টগ্রাম




