এখন সময়:রাত ১০:৩৭- আজ: রবিবার-১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ১০:৩৭- আজ: রবিবার
১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

আমির খসরু : ভারতের তোতা পাখি 

বাবুল সিদ্দিক

আসল নাম আবুল হাসান ইয়ামিন-উদ্দিন খসরু। একজন সুফি কবি। তিনি ফার্সি ও উর্দু ভাষাতেই লিখেছিলেন। তিনি ছিলেন নিজামুদ্দিন আওলিয়ার আধ্যাত্মিক শিষ্য। তিনি কেবল কবি ছিলেন না, ছিলেন এক অনন্য গায়ক। তিনি প্রাচীনতম জ্ঞাত মুদ্রিত অভিধান (খালীক-ই-বারী) লিখেছিলেন। তাকে “কাওয়ালির জনক” বলে গন্য করা হয়। তিনিই প্রথম ভারত বষে “গজল” গানের প্রথা চালু করেন। ভারত,পাকিস্তানে তা আজও চালু আছে। তিনি ফার্সি, আরবি এবং তুর্কি উপাদান অন্তরভুক্ত করে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। আমির খসরুকে ভারতবর্ষের তোতা পাখি বা ভারতের কন্ঠস্বর এবং উর্দু সাহিত্যের জনক বলা হয়।

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন : তিনি ভারতের বর্তমান উত্তর প্রদেশের পাতিয়ালয় ১২৫৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল আমির সাইফ-উদ-দিন-মাহমুদ। তুর্কি বংশোদভূত হলেও তার পিতা পারস্যের খোরাসান অঞ্চলে বসবাস করতেন। যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে তিনি পারস্য ছেড়ে ভারতবর্ষে চলে আসেন এবং তৎকালীন ভারতের শাসক তুর্কি সুলতান ইলতুৎমিশের (১২১১-১২৩৬ খ্রি:) আমলে সরদার হিসাবে নিযুক্তি লাভ করেন। পরে তিনি এক রাজপুত কন্যা বিবাহ করেন। ইনিই আমির খসরুর মা।

 

১২৬৪ খ্রিস্টাব্দে আমির খসরুর পিতার মৃত্যু হয়। পিতার মৃত্যুর পর তিনি তার মায়ের সাথে মাতুলালয়ে চলে আসেন এবং সেখানে বিদ্যা অর্জন করতে থাকেন। আট বৎসর বয়সে তিনি প্রথম কবিতা লিখেন।

নানা ঘটনার পর ১২৬৫ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি বংশোদভূত গিয়াসউদ্দিন বলবান দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। এর কিছু কাল পরেই খসরু এই সুলতানের পৃষ্টপোষকতা লাভ করেন। অল্প বয়সে কবিতা রচনা করে তিনি শিক্ষিত সমাজ এবং রাজ দরবারে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১২৭১ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘তুহফাতুস সিয়র’ রচনা করেন। ১২৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি বলবানের ভ্রাতুস্পুত্র মালিক চজ্জুর সাথে সভাকবির পদে আধিষ্টিত হন। ১২৭৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি বলবানের পুত্র বঘরা খাঁর সাথে কবিতা রচনায় বিশেষ মনযোগী হয়ে ওঠেন। ১২৭৮ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গদেশের শাসন কর্তা তুঘ্রল খাঁর বিরুদ্ধে গিয়াসউদ্দিন বলবান অভিযান পরিচালনা করেন। যুদ্ধে তুঘ্রল খাঁ নিহত হলে বলবান তার পুত্র বঘরা খাঁ কে বঙ্গদেশের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। ১২৭৯ খ্রিস্টাব্দে খসরু রচনা করেন ‘বাস্তল হায়াত’ নামক দ্বিতীয় কাব্য গ্রন্থ। ঐ বছরই  বঘরা খাঁর অনুরোধে তিনি বঙ্গদেশে  ভ্রমণ করেন এবং তৎকালীন বাংলার রাজধানী লক্ষণাবতীতে কিছুদিন ছিলেন।

১২৮৬ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গলরা মুলতান আক্রমণ করে। সুলতান বলবান তার পুত্র মোহাম্মদকে এই আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য সেখানে পাঠান। এই যুদ্ধে মোহাম্মদের সাথে খসরুও যান ও যুদ্ধে  অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধে মোহাম্মদ নিহত হন এবং আমির খসরু মোঙ্গলদের হাতে বন্দি হন। ১২৮৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি বন্দি দশা থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। বলবান তাকে আগের মতই সমাদর করে সভাকবি হিসাবে দরবারে স্থান দেন।

পুত্রশোকে বলবান ১২৮৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে সুলতান বলবান তার দ্বিতীয় পুত্র বঘরা খাঁ কে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। কিন্তু বঘরা খাঁ মূলত শিল্প সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন। শিল্পানুরাগী বঘরা খাঁ সিংহাসন গ্রহনে অসম্মতি জানালে, সুলতান বলবান মোহাম্মদের পুত্র কাইখসরুকে সিংহাসনের  উত্তরাধিকার  করেন। কিন্তু বলবানের মৃত্যু হলে দরবারের আমির ওমরাওরা কাইখসরুকে বাদ দিয়ে বাঘরা খাঁর পুত্র কায়কোবাদকে সিংহাসনে বসান। কিন্তু রাজ্য পরিচালনায় কায়কোবাদ ছিলেন আযোগ্য। সেই সুযোগে খালজি বংশীয়রা সিংহাসন দখলের যড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন। নানা রকমের দ্বন্দ্ব সংঘাতের ভেতর দিয়ে শেষ পর্যন্ত ১২৯০ খ্রিস্টাব্দে কায়কোবদকে হত্যা করে জালালউদ্দিন খালজি সিংহাসন দখল করেন।

ইতোপূর্বে ১২৮৮ খ্রিস্টাব্দে খসরু রচনা করেন ‘কিরানুস-স’ দাইন’ নামক কাব্যগ্রন্থ। সিংহাসন দখলের পর জালালউদ্দিন রাজ দরবারের পুরানো অনেক কর্মচারীদের ছাঁটাই করলেও আমির খসরু স্বপদে থেকে যান এবং দিল্লির দরবারকে কাব্য ও সঙ্গীতেমূখর করে রাখেন। জালালউদ্দিন খালজি তার কাব্য ও সঙ্গীতে তাকে ‘আমারত’ উপাধিতে সম্মানিত করেন। তখন থেকেই তিনি ‘আমারত খসরু বা ‘আমির খসরু’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। ১২৯০ খ্রিস্টাব্দে তিনি রচনা করেন ‘মিফাতাহুল ফুতুহ’ কাব্যগ্রন্থ। আর ১২৯৪ খ্রিস্টাব্দে রচনা করেন ‘ঘিরাতুল-কামাল’ নামক কাব্যগ্রন্থ। ১২৯৮ খ্রিস্টাব্দে তার মা ও ভাই মারা যান। এই মৃত্যু আমির খসরুকে ভীষণভাবে মানসিকভাবে আঘাত করে।

১২৯৬ সালে পিতৃতুল্য বৃদ্ধ চাচা জালালউদ্দন খালজি কে নির্মমভাবে হত্যা করে আলাউদ্দিন খালজি দিল্লীর সিংহাসন দখল করেন। এ সময়ও আমির খসরু সসম্মানে দরবারে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১২৯৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘খামস্- এ- নিজামি’ কাব্য শেষ করেন। ১৩১০ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন ‘খাজাইন-উল-ফুতুই’ নামক কাব্য। ১৩১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘দুভান- রান- খিজির খান’ লেখা শেষ করেন। ১৩০০ খৃস্টাব্দের দিকে তিনি পারস্যের তবলা নামক যন্ত্রটি সংস্কার করে ভারতীয় তবলা যন্ত্রের উদ্ভব করেন।

১৩১৬ খ্রিস্টাব্দে আলাউদ্দিন খালজির মৃত্যুর পর নানা সংঘাতের পর ১৩২০ খ্রিস্টাব্দে গিয়াসউদ্দিন তুগলক দিল্লির সিংহাসন অধিকার করেন। এ সময় আমির খসরু দিল্লীর দরবারে সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। এ সময় তিনি মাসিক এক হাজার টাকা সন্মানী পেতেন রাজ দরবার থেকে। সঙ্গীত ও কাব্যে তাঁকে গুরু হিসেবে মান্য করা হত। ১৩২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি  ‘তুগলকনামা ‘ রচনায় হাত দেন।

১৩২৩ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গদেশে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য গিয়াসউদ্দিন তুগলক বঙ্গদেশে আসেন। এ সময় তাঁর সাথে ছিলেন আমির খসরু। ১৩২৪ খ্রিস্টাব্দে তার সুফি গুরু

 

নিজামউদ্দিন আউলিয়া মৃত্যুবরণ করেন। এ সংবাদ শোনার পর আমির খসরু অত্যন্ত শোকাহত হয়ে পরেন। এরপর তিনি বঙ্গদেশে ত্যাগ করে দিল্লি চলে আসেন। অনেকে মনে করেন, গুরুর মৃত্যু শোকেই তিনি ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

আমির খসরু কাব্য রচনা করে হিন্দি ও ফার্সি ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন আর সঙ্গীত সাধনায় তিনি পারস্যের সঙ্গীতের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ভারতীয় সঙ্গীতে ভিন্ন মাত্রা দান করেন।তিনি ভারতীয় রাগ সঙ্গীতকে ১২টি মুকামে ভাগ করেন। তিনি কাওয়াল,তিলানা,তিরবট,খেয়ালের গায়ন রীতি পরিবর্তন করেন। কথিত আছে সাজগিরি,উশাশাক,জিলফা সারপরদা,সাহান,ঈমন,মুনম,নিগর প্রভৃতি রাগ তিনি তৈরী করেন। সেতার ও তবলা বাদ্যযন্ত্র আমির খসরু আবিস্কার করেন বলে অনেকে মনে করেন।

উর্দু ভাষা সৃষ্টিতেএ আমির খসরুর বিরাট অবদান রয়েছে। দিল্লির সুলতান সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগের জন্য তাকে একটি সহজ ভাষা তৈরি করতে বলেন। ফার্সি, আরবি, তুর্কির ও সংস্কৃতি ভাষার সাথে খারিবলি ভাষা মিশিয়ে তিনি তৈরী করেন উর্দু ভাষা। ফার্সি, আরবি, তুর্কির সাথে উর্দু ভাষাতেও তিনি প্রচুর লিখতেন।

 

##  আমির খসরু তবলা ও সেতার আবিষ্কার করেন।

শোনা যায়, তিনি ভারতীয় বীণা থেকে সেতার

তৈরীতে অনুপ্রাণিত হন।

##  আমির খসরু ভারতীয় ও ইরানি সুরের সংমিশ্রণে

কাওয়ালি গানের সূচনা করেন। তাকে কাওয়ালির

জনক বলা হয়।

##  তিনি বেশ কিছু শাস্ত্রীয় রাগের প্রবর্তক।

 

 

বাবুল সিদ্দিক, প্রাবন্ধিক, নিউ ইয়র্ক প্রবাসী

চট্টগ্রামী প্রবাদের প্রথম গ্রন্থ : রচয়িতা জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন

মহীবুল আজিজ জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন (১৮৫২-১৯২০), সংক্ষেপে জে ডি এন্ডার্সন আজ থেকে একশ’ সাতাশ বছর আগে চট্টগ্রামী প্রবাদের সর্বপ্রাথমিক গ্রন্থটি রচনা-সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিলেন। চট্টগ্রামী

দেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই (সম্পাদকীয়- জুন ২০২৪ সংখ্যা)

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্প্রতি আমাদের দেশসহ উপমহাদেশে যে তাপদাহ শুরু হয়েছে তা থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই