এখন সময়:সকাল ৭:৫৭- আজ: রবিবার-২১শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৬ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:সকাল ৭:৫৭- আজ: রবিবার
২১শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৬ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

চট্টগ্রামী প্রবাদের প্রথম গ্রন্থ : রচয়িতা জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন (দ্বিতীয় কিস্তি)

ড. মহীবুল আজিজ

১১. বাপে আজায় নাই দুলি,

আগে দিয়ে দুই ঠেঙ তুলি।

A similar expression to  “বাপে আজায় নাই, & c.’ (Prov. No. 4)

“A man, whose forefather never traveled in a palanquin, puts his legs in before he takes his seat.” instead of getting in backwards, (as a gentleman should).

 

১২. বুড়া গরু চোরা ধান

যে বেচে তে সেয়ান।

“He, who sells off his old cattle and he who disposes of paddy which in Chaff, is shrewd.”

 

১৩. হিজ্ ন র্পাতে ঠেঙ টানন্।

‘Stretching out the leg before the bed is spread.’ Counting chickens before they are hatched

 

 

১৪. মরা মাছ ভাঙ্গা ডুলা।

‘A broken basket for dead fish.’ Used in self-deprecation to avert the anger of a superior.

 

১৫. নাই মামী তুন কানী মামীও ভালা।

‘An one-eyed aunt is better than no aunt.’ Half a loaf is better than no bread. There is an exactly

similar Assamese proverb (see Capt. Garton’s Prov. No. 164) Another form is  ন থাকন্তুন্ মাগন ভালা।

“Begging is better than wanting.” একো নহোয়াইতকৈ কনা মোমাইও ভাল। চধমব: ৫৩

 

১৬. ঘরের ভাত খাই পরের মইষ চড়ান।

of a fool who “eats at home and tends other’s cattle” (free of charge) satirizes disinterestedness.

১৭. মাঝি ভাত্ খাইলে, গাঙ্গে জোয়ার হয়।

‘If the majhi has finished his dinner, the tide has turned.’ i. e, when the master is ready, the boat must start. Satirises inconsiderateness, especially on the part of superiors.

 

১৮. হাঁডিত্ ন জানে বামন ডিঙ্গরা,

পঁথরে কয় হেডা টেয়রা।

‘The Brahman’s slave can’t walk and he says the road is rough.’ Another version is  নাচ্তে ন জানলে উঠান বেকা। “He who can’t dance, says the yard is uneven.” A bad workman complains of his tools.

 

১৯. পোন্দত্ নাই তেনা,

মিডা দি’ মেশ্রী পানা।

‘The man without a loin clothis surfeiting himself with sweets.” Deprecates luxury in the poor. There is an Assamese proverb similar to this (see Capt. Gurdon’s Proverb No. 101)

“ঘরত নাই কনটো, বর সভালৈ মনটো।” He has not a grain of rice in his house, but he wishes to go to a big feast. [p. 36]

 

২০. হলইদ্ পোন্দে দি’ রান্ধনী কঅলান।

“Feigning to be a cook by besmearing turmeric on the loin cloth.” False pretentions.

 

২১. আদর্রে কলা,

বাকল্ও ভালা।

“Of a plantain, cheerfully given, even the skin is delightful.” Cf. the “not grudging or of necessity” of the English church service.

 

২২. চুমুট্টা দিলে ভামুট্টা খায়।

A blow for a pinch i. e, “a blow for a blow”. “tit for tat.”

 

২৩.  বুড়া গরু বিয়ান্ও শেষ।

“And old cow and past bearing.” Used contemptuously of those who have lost their power to harm.

 

২৪. মর্রা উর্প খার্ড়া ঘা।

‘a sword stroke on a corpse.’ Supererogation. “To slay the slain.”

 

২৫. শালেগ্রার্মে শোয়া বৈঠা সমান।

‘Sitting or lying down is all the same to a Salegram (which is round).’ (“Hobson’s choice”)

 

২৬. সাত্ পুত্ তের নাতি

তারত্ করে কুর্শ্যা খেতি।

‘If you have 7 sons and 13 grandsons, then you can grow sugarcane.’ i. e, do not begin a great undertaking without due preparation.

 

২৭. দেখিতে না পারে যারে

হাটিতে ভেঙ্গায় তারে।

‘The man I hate can’t walk straight.’ i. e, prejudice. “I do not like you, Doctor Fell.’

 

২৮. লেজ নাই কুত্তার বাঘা নাম।

‘The tailless dog is called baghaya, the tiger.’ The ass in a lion’s skin. Cf. the Hindi “Lengra billi ghar men shikar.’

 

২৯. মুত্তে ছাগল ন র্ধলে দুঁড়াইও লাগ ন পায়।

‘Catch a goat when it’s making water.’ Make hay while the sun shines.

 

৩০. ফকির মারি ভার্ই কাড়ি লওন্।

‘Robbing a fakir of his basket.’ – Implies the extremity of meanness.

 

৩১. দর্শে লাঠি একের বোঝা।

‘Ten men’s staves make one man’s load.’ Used quaintly enough to exemplify. “Small profits, quick returns.’

 

৩২. লেন্ডির্য়া কুযুক্তি র্সা।

‘He who is poor and envious thinks only of fraud.’

 

৩৩. বার্ঘে ভয় জিঁয়ত্,

আর্ন্ধা হয় হিঁয়ত্।

“Night is sure to fall just where there is fear of tigers.” i. e, “Just my luck.’

 

৩৪. মাছের নামে গাছে হা করে।

‘If you talk of fish even the trees gape.” i. e, All like good things. An epicure’s saying.

 

৩৫. যে মির্ক্কা ঝড় হে’ মির্ক্কা জোর্মি।

‘He turns his umbrella the way the rain comes.’ i. e, a flatterer, a timeserver. “Jomir” or “Jomra” the wood of split bamboos and leaves worn over the head and back by peasants in bad weather.

 

[প্রসঙ্গত: আজ থেকে একশ ত্রিশ বছর আগে ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্ট জে ডি এন্ডার্সন চট্টগ্রামে চাকরি ও বসবাসের সূত্রে চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রবাদ বিষয়ে যে-গবেষণাকর্মটি সম্পাদন করেন সেটি আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি অভূতপূর্ব উপলক্ষ ছিল যদিও তাঁর আগে পাশ্চাত্যে বিশেষ করে ইউরোপে তেমন গবেষণার চল আরও খানিকটা আগেই শুরু হয়। ইতঃপূর্বে আলোচনায় ফন হ্যাক্সথাউসেন, গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়, রেভারেন্ড এন্ডল এবং জেমস লং-এর কথা আমরা জানতে পেরেছি। যে-প্রবাদগুলো এন্ডার্সনের গ্রন্থে স্থান পেয়েছে সেগুলো বহুসংখ্যক সংগৃহীত প্রবাদ থেকে সুনির্বাচিত। কাজেই তখনকার জন্য এগুলো ছিল প্রতিনিধিত্বমূলক। এখনকার প্রচলিত প্রবাদের সঙ্গে তুলনা করলে বলা যাবে সময়ের দীর্ঘ বহমানতা পেরিয়ে এসব প্রবাদ আজও টিকে আছে কিনা, নাকি সেগুলোর কোনো-কোনোটি মহাকালের মহাফেজখানায় চিরকালের জন্য সংরক্ষিত হয়ে গেছে। এন্ডার্সনের প্রবাদের একেবারে প্রথমটার (দুধ দেওন্যা গাইয়ে লাথি দেয়নও ভালা।) কথাই যদি ধরি সেটি আজও চট্টগ্রামে টিকে রয়েছে বহাল তবিয়তে। লোকজীবনে দুধের চাহিদা, খাঁটি দুধের উৎস গাভীর প্রয়োজন যতদিন থাকবে হয়তো প্রবাদটিও আসবে ঘুরেফিরে। এসব প্রবাদের অল্প কিংবা অধিক শব্দে সংগঠিত বাক্য দেখতে যত ক্ষীণকায় মনে হোক না কেন এসবের স্বল্পায়তনে ধরা আছে বহুকালের বহুজীবনের বহু অভ্যাসের পরম্পরা।

জে ডি এন্ডার্সন তাঁর চট্টগ্রামী প্রবাদবিষয়ক গবেষণায় নিজেই তুলনামূলক বিদ্যার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন যেজন্য এর আবেদন ও গুরুত্ব অনেকখানি বেড়ে গেছে। বাংলার প্রতিবেশী অঞ্চলে কিংবা ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গায় প্রচলিত সমভাবাপন্ন প্রবাদের উল্লেখ ও বিশ্লেষণ থেকে লোকাচার বা সামাজিক প্রবণতার নানা দিক সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। ধরা যাক ১৫-সংখ্যক প্রবাদটির (নাই মামী তুন কানী মামীও ভালা।) কথা। এটি একটি বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় প্রবাদ। এতে বাংলা তথা ভারতবর্ষের পারিবারিক সামাজিক জীবনের আন্তঃসম্পর্কের একটা চমৎকার চিত্র মেলে। মামী বা মামা’র স্ত্রীরা যে আমাদের পরিবারে-সমাজে  স্নেহ-বাৎসল্য ও মায়ামমতার ধারক সেই সত্যই প্রবাদটিতে উদ্ভাসিত। একই ধরনের প্রবাদ বাংলার প্রতিবেশী আসাম অঞ্চলেও প্রচলিত ছিল এবং আছে এখনও। এখানে প্রসঙ্গত বলা যায়, বাংলা অঞ্চলে প্রবাদটি হয়তোবা আসামবাহিত হয়ে এসেছিল। এমন অনুমানের কারণ, অহমী জাতিসত্তা বাঙালি জাতিসত্তার চাইতে প্রাচীন। ১৮-সংখ্যক প্রবাদটিতে বাংলা কিংবা ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে সুদূর ইউরোপিয় প্রেক্ষাপট প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। প্রবাদটি লক্ষ করা যাক- “হাঁডিত ন জানে বামন ডিঙ্গরা,/ পঁথরে কয় হেডা টেয়রা।” এটারই অন্যতর অভিব্যক্তি হিসেবে এন্ডার্সন আরেকটি প্রবাদকে নির্দেশ করেছেন- “নাচ্তে ন জানলে উঠান বেকা।” ঠিক এ-প্রবাদটির সমান্তরাল অর্থবহ প্রবাদ তিনি দেখিয়েছেন যেটির সরাসরি ইংরেজি ভাষায় প্রচলিত গাঠনিকতা পাওয়া যাচ্ছে- “এ ব্যাড ওয়ার্কম্যান কমপ্লেইন্স অব হিজ টুলস্।” দু’টোর মধ্যে তুলনা করলে দেখা যাবে বাংলা অঞ্চলের প্রবাদটিতে রয়েছে মৃত্তিকাসংলগ্নতা এবং ইংরেজি প্রবাদটিতে রয়েছে শিল্প ও বিজ্ঞানপ্রাসঙ্গিক চেতনা। বস্তুত ১৬৬২ সালে ইংল্যান্ডে রয়্যাল সোসাইটি গঠিত হলে সেখানে ভবিষ্যতের যন্ত্রনির্ভর কলকারখানা কথা বিজ্ঞানের সংশ্লিষ্টতা প্রত্যক্ষ হয়ে পড়ে যা শিল্পবিপ্লবের পরিণতিতে বাস্তব রূপ পায়। কাজেই এ ধরনের প্রবাদ হয়তো পরস্পর-প্রভাবিত না হয়ে স্ব-স্ব ক্ষেত্র থেকে উদ্ভূত হয়েছে কিন্তু অভিব্যক্তিতে সেগুলো হয়ে গেছে সাদৃশ্যমূলক। এ থেকেও আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের চিন্তা, মানস ও দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে ধারণা পেতে পারি। এসব প্রবাদে একদিকে ছিল তাৎক্ষণিক ও উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রয়োজন মেটানোর দায়, আবার একইসঙ্গে প্রবাদগুলোতে লোকমানসের সৃজনশীল চিন্তনপ্রক্রিয়ার প্রতিফলনের দিকও অনস্বীকার্য। সেটা কেবল বাংলা অঞ্চলের জন্য নয় প্রযোজ্য হতে পারে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষেত্রেই। দৃষ্টান্তস্বরূপ ২৮-সংখ্যক প্রবাদটির কথা বলা যেতে পারে। চট্টগ্রামী ভাষায় এর রূপ- “লেজ নাই কুত্তার বাঘা নাম।” ঢাকা এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় এটির একটি রূপ পাওয়া যায় “ছাল নাই কুত্তার বাঘা নাম” বাক্যে। এটি এখনও প্রচলিত রয়েছে। আর ঢাকা ছাড়িয়ে প্রবাদটি ছড়িয়েছে উত্তরবঙ্গের দিকেও। শুধু তাই নয় ১৮৬১ সালে ঢাকা থেকে সেই সময়কার বিখ্যাত প্রহসন রচয়িতা হরিহর নন্দী রচিত বেশ কয়েকটি প্রহসনের মধ্যে একটির শিরোনাম ছিল ‘ছাল নাই কুত্তার বাঘা নাম’। মাইকেল মধুসূদন দত্তের একই সমকালে এবং প্রায় একই সময়ে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রহসনগুলো। গবেষক গোলাম মুরশিদ তাঁর নাট্যগবেষণায় হরিহর নন্দীর নাট্যকর্মের উল্লেখ করেছেন। এ-বিষয়ে আমার নিজেরও গবেষণাকর্ম রয়েছে। বিশেষ করে আমি ইংল্যান্ডের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে তাঁর ছ’টি প্রহসনের সন্ধান পাই। আমার প্রবন্ধটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের গবেষণা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। লক্ষ করতে হয়, হরিহর নন্দীর শিরোনামটিকে গ্রহণ করলে প্রবাদটির আংকিক বয়স দাঁড়ায় ১৬৩ বছর। কিন্তু এটির জনপ্রিয়তাকে প্রহসনরচয়িতা শিরোনাম হিসেবে নিয়েছিলেন- কথাটাকে বিবেচনা করলে প্রবাদটির লোকভাষিক বিদ্যমানতা আরও বেড়ে যায়। হয়তো আরও অন্তত পঞ্চাশ বছর আগে থেকেই এটি বাংলা অঞ্চলে প্রচলিত ছিল এবং এটি যেহেতু ভারতবর্ষের পূর্ব প্রান্তে আসবার আগে বাংলার মধ্য ও উত্তর দিকে প্রচলিত ছিল সেক্ষেত্রে বলা যাবে চট্টগ্রামী এ-প্রবাদ ভ্রাম্যমানতার পরিণামে লোকমুখের পারস্পরিক সঞ্চরণে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গেছে। কিন্তু এন্ডার্সনের গ্রন্থে প্রবাদটির হিন্দি রূপ থেকে বলতে পারা যায়, এটির মূল উৎস বাংলা ছাড়িয়ে একেবারে মধ্য বা উত্তর ভারত। প্রবাদটির এন্ডার্সন প্রদত্ত হিন্দি রূপ- “ল্যাংড়া বিল্লি ঘর মে শিকার।” এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো, দু’টি প্রবাদ পাশাপাশি রাখলে দেখা যাবে এগুলোর সাদৃশ্য যতটা না ভাবে ততটা বাক্যে বা তুলনাসৃষ্টির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত উপাদানে নয়। অর্থাৎ এতে লোকমানসের সৃজনবৈচিত্র্যেরও সন্ধান মেলে।

চট্টগ্রামী প্রবাদগ্রন্থের রচয়িতা জে ডি এন্ডার্সনের গ্রন্থটি কাজেই তুলনামূলক বিদ্যা ও বিশ্লেষণের বিচারেও গুরুত্বপূর্ণ। একই প্রবাদের আঞ্চলিক-স্থানীয় এবং সেই প্রেক্ষাপট ছাড়িয়ে সুদূর ইংল্যান্ড তথা ইউরোপের রূপটি লক্ষ করলে আমরা এক বিচিত্র জীবনরসের স্পর্শ লাভ করি। এন্ডার্সন কেবল লোকমারফত প্রবাদগুলো সংগ্রহ করেই থেমে থাকেন নি। তিনি এগুলোর নিবিড় পাঠ ও গবেষণা করেছেন এবং তুলনামূলক বিশ্লেষণ পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়ে ভবিষ্যতের গবেষকের জন্য নতুনতর গবেষণার ক্ষেত্র সৃষ্টি করে রেখে গেছেন। এ-প্রসঙ্গে ২৭-সংখ্যক চট্টগ্রামী প্রবাদটির দিকে তাকানো যাকÑ “দেখিতে না পারে যারে/ হাটিতে ভেঙ্গায় তারে।” এটির একটি জনপ্রিয় প্রচলন বহুদিন ধরে রয়েছে যেটির প্রয়োগ উনিশ শতকের অনেক সাহিত্যকর্মে লক্ষ করা গেছে। প্রবাদটি এমন- “যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা”। এখানে লক্ষ করতে হবে প্রবাদটির মধ্যে ব্যবহৃত ‘নারি’ (‘না পারি’) শব্দটি মধ্যযুগের গীতিকবিতা তথা বৈষ্ণব পদাবলী কিংবা তারও আগে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে ব্যবহৃত হয়েছিল। কাজেই অনুমান করা যায় এটির প্রচলনও অনেক প্রাচীন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় ‘নারি’ (না পারি) শব্দটির বহুল ব্যবহার লক্ষ করা যাবে। প্রবাদটির প্রত্যক্ষ ইংরেজি অনুবাদ করেছেন এন্ডার্সন- “দ্য ম্যান আই হেট ক্যান্ট ওয়াক স্ট্রেইট”। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ইংরেজি ভাষাতেই এটির উদ্ভবকাল সপ্তদশ শতাব্দী। ইংরেজি প্রবাদটিকে বিশ্লেষণ করলে দেখবো সেটির রয়েছে রোমান ভাষার রূপ। হয়তো রোমানের পূর্বে সেটির ছিল একটি গ্রেকো-রোমান রূপও। দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রামী জনমানুষের ভাষিকতার বিশ্লেষণ থেকে আমরা চলে যাচ্ছি এক ভূগোল থেকে দূরতর অন্য ভূগোলে। সপ্তদশ শতাব্দীতে উদ্ভূত প্রবাদটির বাক্যগত রূপটি লক্ষ করি-’I do not like you, Doctor Fell.’এটির প্রবর্তক ইংরেজ কবি টম ব্রাউন যিনি ১৬৮০ সালে প্রথম এটি তাঁর স্বরচিত বাক্যে ব্যবহার করেন। পরে এটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে তা শিশুতোষ ছড়ায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে। আরও পরে সেটি পরিণত হয় প্রবাদবাক্যে।

চট্টগ্রামী এ-প্রবাদের প্রাচীনতর রূপটির সঙ্গে সম্পর্কিত কাহিনিটি স্মরণীয়। পরবর্তীকালে কবিখ্যাতি অর্জন করা টম ব্রাউন ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ক্রাইস্ট চার্চ কলেজের সঙ্গে সংযুক্ত।  কলেজের সেসময়কার ডিন জন ফেল (১৬২৫-১৬৮৬) তাঁর কৃতকর্মে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে কলেজ থেকে বহিষ্কারাদেশ দেন। তবে তাঁকে তিনি একটি সুযোগ দেন। একটা বিশেষ পরীক্ষা-পর্বে উত্তীর্ণ হলে তবেই তিনি আবার ছাত্র হিসেবে ফিরতে পারবেন কলেজে। ডিন জন ফেল তাঁকে লাতিন কবি মার্টিয়াল (ইংরেজি উচ্চারণে মার্শাল, তাঁর লাতিন নাম ছিল মার্কাস ভ্যালেরিয়াস মার্টিলিয়াস)-এর একটি সুভাষণ অনুবাদ করতে দেন যেটির জন্য সময় দেওয়া হয় ত্রিশ সেকেন্ড। স্পেনে জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত রোমান কবি মার্টিয়াল সর্বমোট ১৫৬১টি সুভাষণ রচনা করেছিলেন যেগুলো তাঁর ১২টি গ্রন্থে বিন্যস্ত ছিল। তুমুল জনপ্রিয় এ-কবি তাঁর সমকালীন বহু ঘটনা, ব্যক্তি, বিষয় নিয়ে কল্পনাপ্রবণ, সমালোচনামূলক এবং ব্যঙ্গাত্মক সুভাষণ রচনা করেছিলেন যেগুলো কালের প্রবাহে দীর্ঘদিন টিকে ছিল। এসব প্রবাদের অনেকগুলোই ইংরেজিতে ছড়িয়ে পড়ে। টম ব্রাউনকে পরীক্ষার্থে দেওয়া লাতিন ভাষার সুভাষণটি লক্ষ করা যাক-“নন আমো তে, সাবিদি, নেক পোসাম/ ডিকেরে কোয়ারে।/ হোক ট্যান্টাম পোসাম ডিকেরে: নন/ আমো তে।” ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যেই টম ব্রাউন লাতিন সুভাষণটির অনুবাদ করেন- “আই ডু নট লাইক দী, ডক্টর ফেল,/ দ্য রিজন হোয়াই – আই ক্যন্ নট টেল;/ বাট দিস আই নো, এ্যান্ড নো ফুল/ ওয়েল,/ আই ডু নট লাইক দী, ডক্টর ফেল।” টম ব্রাউন লাতিন সুভাষণে উল্লেখকৃত ব্যক্তিকে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিপক্ষ ডিন জনে প্রতিস্থাপিত করে আসলে সাহসিকতার পরিচয়ই দিয়েছিলেন। ব্রাউন ফিরে পেয়েছিলেন তাঁর ছাত্রত্ব। তবে টম ব্রাউন কবিখ্যাতি পেলেও অক্সফোর্ড থেকে বিনা ডিগ্রিতে ছাত্রত্ব শেষ করেছিলেন। এটাই পরে ১৮০২ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এক বিতর্কে জনৈক সংসদ সদস্যের যুক্তিতে ব্যবহৃত হয় এবং ১৮০৯ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ এনসাইক্লোপিডিয়াতে বলা হয়, এটি ১৮৭৭ সালে ঔপন্যাসিক স্যামুয়েল রিচার্ডসনের একটি উপন্যাসে ব্যবহৃত হয়। ১৯২৭ সালে কবি রবার্ট গ্রেভস্ সম্পাদিত একটি ‘নার্সাারি রাইমস্’ গ্রন্থে এটি গৃহীত হয় এবং ১৯৩৫ সালে ‘দ্য অক্সফোর্ড ডিকশনারি অব প্রোভার্বস্’-এ প্রকাশিত হলে লাতিন প্রবাদটির চূড়ান্ত ইংরেজি-অবস্থান নিশ্চিত হয়। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, বিভিন্ন ভাষায় রচিত বহু সুভাষণ জনপ্রিয় হয়ে বহু ব্যবহারে জীর্ণ না হয়ে বরং পরিণত হয় প্রবাদ-প্রবচনে। এগুলোর নিবিড় পাঠ ও বিশ্লেষণ থেকে নতুনতর জ্ঞানের সন্ধান সম্ভবপর।

জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সনের চট্টগ্রামী প্রবাদবিষয়ক গ্রন্থটিও আমাদের সামনে তেমন পাঠ ও বিশ্লেষণের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে।]

(ক্রমশ)

 

ড. মহীবুল আজিজ, কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

প্রাচীন বাংলার নাগরিক জীবনে শিল্প ও সৌকর্য

ড. আবু নোমান এখন প্রাচীন বাংলার যে স্থাপত্যগুলো পাওয়া সম্ভব সেগুলোকে প্রত্মতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ বললেও বলা যেতে পারে। স্থাপনা সমাজের সভ্যতার একটি অন্যতম নিদর্শন বা উপাদান।

বৈষম্যমূলক কোটা প্রথায় মেধাবীরা বঞ্চিত হবে (সম্পাদকীয়- জুলাই ২০২৪)

সরকারী চাকরীতে কোটা প্রথা কোন ভালো বা গ্রহণযোগ্য প্রথা হতে পারেনা। এতে প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হয়। প্রশাসনে মেধাবীর চেয়ে অমেধাবীর আধিক্য বেশী বলে রাষ্ট্রীয় কাজে

আহমদ ছফা বনাম হুমায়ূন আহমেদ

মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ তখন আহমদ ছফার পিছন পিছন ঘুরতেন। লেখক হুমায়ূন আহমেদ-কে প্রতিষ্ঠার পিছনে যে আহমদ ছফার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, সে কথা