শোয়েব নাঈম
চন্দন দা’ (ডা. চন্দন দাশ) অভূতপূর্ব মানসিক অনুরণনে আমার মধ্যে বহু বছর আগেই বসন্তের এক রেশ রেখে গেছেন। তাঁর বসন্তের এই রেশ ছিল এমন – চৈত্রের বিবর্ণতার কার্নিশে বসন্তের রঙিন ফুল ফোটানো, নানাবিধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনে। আমার বোধে চন্দন দা’র উচ্চজাত সেই বসন্তের আবিষ্টতা ছিল বড় প্রভাবী, যেন উদাসী হাওয়ার পথে পথে মুকুলগুলি ঝরে। চন্দন দা’র মধ্যে আরেকটি বিষয় দেখেছিলাম- অভিজাত এক সৌজন্যবোধ, তাঁর হাসিমুখ। আর তাঁর চন্দন নামের অর্থ হচ্ছে- একটি গাছের নামের মতো, যে কেবলি সুগন্ধির প্রলেপ তোলে। চট্টগ্রাম শহরে স্মৃতির ছাপে সেই বসন্তের রেশ আজ গভীরতর শোকের মালা গাঁথে। গত ২৯ মে ২০২৬ তারিখে, বিপন্ন এই সকাল সাড়ে দশটায় অনন্তের বোঝাপড়া করে চন্দন দা’ এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছন চিরতরে, চট্টগ্রাম শহরকে শোকে দাহ করে।
শোকের আচ্ছন্নে তাঁকে নিয়ে এবার কিছু কথা বলি। ডা. চন্দন দাশ ছিলেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের এক নিবেদিতপ্রাণ অগ্রসারী ব্যক্তিত্ব। একইসঙ্গে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চট্টগ্রাম জেলার এবং কেন্দ্রের বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে থেকে তিনি ছিলেন একজন প্রভাবশালী ও কর্মনিষ্ঠ সংগঠক। তিনি কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ (সিপিবি) চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সক্রিয় সদস্য হিসেবে আজীবন যুক্ত ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতি ও গণমানুষের পক্ষে সংগ্রামের সঙ্গে। চিরনিজস্বতায় আলোকিত করে গেছেন ডিসি হিলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদকে। দীর্ঘদিন ধরে ‘সাংস্কৃতিক জোট’ চট্টগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংগঠক হিসেবে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ধারাকে শক্তিশালী করেছেন। এছাড়া গণজাগরণ মঞ্চে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ও ভূমিকা ইতিহাসের যুগধ্বনিকে নতুনভাবে উচ্চারিত হয়েছিল। চন্দন দা’ এখন শোকের অনুতাপে, সীমাহীন শূন্যতার মাঝে ভাসমান এক নীহারিকা।
১৯৮৭ সালের নভেম্বর মাস থেকে আমি তখন ‘স্বরশ্রুতি’ আবৃত্তি সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। সাংগঠনিকভাবে তখন চট্টগ্রামে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, চন্দন দা’র চিন্তার পরিধিতে এই ‘সাংস্কৃতিক জোট’ আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিরোধের অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতো ‘স্বরশ্রুতি’। এক অমায়িক ইচ্ছায় ১৯৮৯ সালে চন্দন দা’ আমাকে ‘জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ’ চট্টগ্রামের কমিটিতে সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিলেন। এভাবে তিনি আমার মতন আরও অনেককেই সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে এই পরিষদে সংযুক্ত করেছিলেন। এই যে ‘জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ’-এ এভাবে বহুজনকে অন্তর্ভুক্তিকরণ ছিল- চন্দন দা’র সাংগঠনিক দক্ষতার এক পরিণাম স্তর মাত্র। চন্দন দা’র জীবন এবং সময়কে অনুধাবন করলে চট্টগ্রামের প্রগতিশীলতার এক উজ্জ্বল ধারাকে অনুভব করা যায়। এরপর চন্দন দা’ ১৯৮৯ সালে তৎকালীন আমাদের মতন বিভিন্নজন তরুণদের নিয়ে গেলেন- বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ‘বিজয়মেলা পরিষদ’ চট্টগ্রামের সাংগঠনিক কার্যক্রমে। যেখানে প্রতিফলিত হয়েছিল- মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, প্রতিরোধ এবং তারুণ্যের উত্তাল প্রত্যয়। এভাবে চন্দন দা’ সংস্কৃতির প্রান্তরে মুক্তির অভিলাষী হয়ে সাংগঠনিক অনেক ছায়াচিত্র তৈরি করে গেছেন। আজ তাঁর এই দেহচ্যুত বেদনা এখন এই কথা বলে- সমাজমুক্তির জন্য উতলা হয়ে তিনি রচনা করে গেছেন আত্মজীবনপ্রাণ।
চন্দন দা, আপনার অন্তর্ধান হাহাকারের যে শ্রদ্ধা তুলেছে, তা হচ্ছে- আপনি অনন্তকাল এই ভূখন্ডে আশার সিন্ধু হয়ে বেঁচে থাকবেন। হে আদর্শের সহযাত্রী, আপনাকে আনত অবিনাশী সালাম।
শোয়েব নাঈম : সাহিত্যকর্মী, চট্টগ্রাম




