এখন সময়:রাত ৮:১৬- আজ: রবিবার-১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ৮:১৬- আজ: রবিবার
১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

দুপুর রঙের বৃষ্টি (পর্ব-১৮)

রাজকুমার শেখ

 

ঘটনাটা ঘটে ছিল গত কয়েক দিন আগে। নাদিরা খুব সেজে ছিল। তার টানা টানা চোখে সুরমা দেওয়া।  টিকালো নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সবেমাত্র আসর জমে উঠেছে। এমন সময় নানহা এলো। হঠাৎ এসে নাদিরার নগ্ন ফরসা হাত চেপে ধরে। তখন ও সুর ভাঁজ ছিল ঠুমরীর।

মোর পিয়া,  আয়ে না আয়ে—।

নাদিরা গান থামিয়ে বলে, নানহা সাব,  ছড়ো হাত।

কেন রূপ পরি? আমি আজ তোমাকে হীরে জহরতে ঢেকে দেব। চলো আমার সঙ্গে।

নাদিরা খিলখিল করে হেসে ওঠে।  গোটা নাচ মহলে ছড়িয়ে যায় সে হাসি।

অত সহজ নয় নানহা সাব। আমি বাইজী হতে পারি। তাই বলে আমি নিজেকে বেচি না।

দৃঢ় কন্ঠ শোনায় নাদিরার। নানহা জিদ ছাড়ে না।

চুপ করো। দেখা আছে আমার। টাকা পয়সার কাছে কতজনকে নত হতে দেখলাম। আর তুমি! ধুস্!

সব কিছু টাকা দিয়ে খরিদ করা যায়না নানহা সাব। এখানে এসেছেন, গান শুনুন। অন্য কিছু নয়।

তুমি যাবে না?

কেন যাবো আমার মহল ছেড়ে?

মহল! সব ভেঙে চুরমার করে দেব। আমি নানহা।

পারলে করুন দেখি।

 

নাদিরা উঠে দাঁড়ায়। নাদিরার সুন্দর মুখটাতে যেন রক্ত ছলকে পড়বে।

আরে তুমি তো খেপে গেছো। বসো। আমি তোমাকে অনেক কিছু দিতে চাই। যা তোমার একজীবন চলে যাবে স্বচ্ছন্দে। কেউ কি এমন বোকামি করে? ভেবে দেখো নাগরী। আমি  আজ এর উত্তর চাই।

গোটা মহল কেমন থমথম করছে। তবলা বাদক আমির হোসেন বলেন, নানহা সাব, এ তো   ঠিক নয় সাব।

তুমি চুপ করো।

নানহা ধমক দেয়। নাদিরা ফুঁসে ওঠে।

আমার মহলে এসেছেন গান শুনতে। গান শুনুন। এ সব চলবে না।

নাদিরার গলাতে ঝাঁজ।  নানহা শোনে না। মাদিরাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য হুকুম দেয় ওর লোকজনকে।

কেউ বাধা দিলে তাকে খতম করবো। নাদিরার মুখ বেঁধে তোলে টাঙাতে। সবাই চুপ। মহল থমথম করছে। সবাই ছুটে এসেছে।  নাদিরার কিছু করার নেই। সে এখন বন্দি। নানহা চলে গেলেন। সবাই চুপচাপ।  কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। হালের পয়সা হওয়া নানহা দিন তারা দেখছে। দিনকাল বদলে যাচ্ছে।  নাদিরার পর এ মহল বন্ধ হয়ে যাবে। এ সব চল আর নেই।  নবাবের পতনের পর সব বদলে যেতে থাকে। মানুষ মাথা উঁচু করে আর দাঁড়াতে পারেনি। ধ্বংস হয়েছে সব। এখন আর নাচ মহল নেই। সারেঙ্গির শব্দ শোনা যায় না। ভৈরবী রাগ আর শোনা যায় না। নানহাদের মতো মানুষেরা সুন্দর এর কদর করেনি কখনো। ভোগ করেছে নাদিরার মতো সুন্দরীদের। নাদিরাকে নিয়ে চলে গেল। বাগান বাড়ি কেমন থমথমে ভাব। এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। এমন সময় আসগর আলি টাঙা ছুটিয়ে আসে। বাইরে সব দাঁড়িয়ে। আসগর আলি বেশ অবাক হয়। তারপর ও নামে টাঙা থেকে। আমির হোসেন এগিয়ে যায় আসগর আলির কাছে।

আলি, নাদিরা বেটিকে তুলে নেয়ে গেছে নানহা সাব। কি হবে এখন?

কখন ঘটলো এ সব?

আসগর আলি জিগেস করে।

এই তো একটু আগে।

আপনারা বাধা দিলেন না?

নানহার লোকজন ছিল সঙ্গে।

ওঃ!

আসগর আলি আবার টাঙাতে গিয়ে বসে। নাদিরাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু তাকে কোথায় নিয়ে গেল? ও বেশ চিন্তায় পড়ে যায়। নানহার বদনাম আছে এ শহরে। নিজেকে নবাব মনে করে। কিন্তু নবাব তো এমন কিসিমের মানুষ ছিলেন না! এ যে কলঙ্ক। শহরটার বদনাম করে দিল। আসগর আলি ছুটে চলে। ওর রাগ বেড়ে যায়। কিন্তু তাকে খুঁজে বের করবে কি করে? নানহার অনেক বাড়ি। তাকে কোন জায়গায় আটকে রেখেছে কে জানে। ওকে চিন্তিত দেখালো। নানহার সঙ্গে ও একা পেরে উঠবে না। তাকে উপায় একটা বের করতেই  হবে। আসগর আলি কাঠগোলার দিকে ও টাঙা নিয়ে ছুটে চলে। ওখানে নানহার একটা গোপন আস্তনা আছে।

ও যখন পোঁছালো তখন দেখছে কয়েকজন পাহারা দিচ্ছে। আসগর আলি দূরে টাঙাটা দাঁড় করাই। তারপর ও আম বাগানে ঢুকে পড়ে। ও গিয়ে দেখে কেউ নেই। আসগর আলি হতাশ হয়। তাহলে নাদিরাকে কোথায় নিয়ে গেল? ও ভাবতে থাকে। না তাকে আজই কিছু একটা করতে হবে। ও আবার টাঙা নিয়ে ছুটতে থাকে। যেন গোটা শহর ও পিষে ফেলবে।

নানহা ওকে খোসবাগোর কাছে একটি বাড়িতে আনে। নাদিরাকে খুব সুন্দর একটি ঘরে রাখে। দামী আসবাবপত্র। মহল থেকে কোনো অংশে কম না। ওকে দেখভালের জন্য দুটি মেয়ে রাখা হয়েছে। বেশ রাত হয়েছে। কিন্তু নাদিরার চোখে ঘুম নেই। রাতের খাবার ও মুখে করেনি। হঠাৎ আসগর আলির

 

কথা মনে পড়ে। মানুষটি তাকে পাগলের মতো খুঁজে বেড়াবে। এখানকার খোজ ও পাবে না। নাদিরাকে কে মুক্ত করবে? ওর মাথা ধরে আসে। ও আর ভাবতে পারছে না। এখান থেকে ও পালাতেও পারবে না। নানহা ঠিক ওকে খুঁজে বের করবে।

ও ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়ে। দূরে কোথায় একটা পাখি ডাকছিল। তার ডাকে ওর ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু তাকে এখানে  আটকে রেখেছে। তার পাত্তা নেই। নানহা কি চায় ওর সঙ্গে?  কিন্তু তাকে তো ও কোনো দিনই পাবে না। সে পোষা বুলবুলি নয়। নানহার সামনে সে করতে চায়। তার বাগান বাড়িতে কতজন আছে। তাকে ঘিরে বেঁচে আঢ়ে সব। তাদের কি হবে? নাদিরা একা ঘরে ছটফট করতে থাকে। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ। পালাবার কোনো রাস্তা নেই।  এক রাতে ও যেন কেমন হয়ে গেছে। চোখের কোণে কালি। ঘরের দেয়ালে বড়ো আয়না টাঙানো। দামি খাট। মেঝে দামি কার্পেট। মানুষটি নিজেকে নবাব মনে করে। কিন্তু তার কাজ এত খারাপ! নাদিরা পেলে তাকে ও জিগ্যেস করবে, কেন তাকে এ ভাবে আটকে রাখা হয়েছে? তার জীবন তার মতো। সে কারোর দাসি বাদি নয়। তার গান শুনতে অনেক সমঝদার আসেন তার কোঠিতে। কিন্তু নানহার মতো শয়তান সে দেখেনি। নাদিরার চোখ জ্বালা করছে। ভীষণ পিপাসা পেয়েছে। কিন্তু কেই আসছে না কেন?

এমন সময় হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ। নাদিরা চমকে যায়। দেখছে দরজা খুলে নানহা ঢুকছে। পিছনে সেই মেয়ে দুটো। হাতে বড়ো থালাতে খাবার সাজানো। ফল। শরবত। নানহা এসেই বলেন, আদাব নাদি। ঘুম হল?

নানহা গিয়ে বসেন সোফায়। মুখে হাসি। আজ নবাব বেশে। নবাবী ঢঙে কথা বলছেন। নাদিরা উঠে দাঁড়ায়। ওঁর সামনে এসে বলে, কি চাইছেন আমার সঙ্গে?

আরে আগে নাস্তা করো। তারপর আমরা কথা বলি।

না! আমার কোনো কথা নেই। আমি এখান থেকে যেতে চাই।

যাবে যাবে নাদি। আমি কি খুব খারাপ মানুষ?  তোমাকে আমি।

খবরদার। আমি চলে যেতে চাই।

যাবে নাদি। আমি নিজে গিয়ে রেখে আসবো। তোমার লোকজনের কোনো অসুবিধা হবে না। সব কিছু ব্যবস্থা করে দেব।

আমি চাইনা কোনো কিছু।

নাদিরা কেমন ঘেমে ওঠে।  মুখ চোখ কেমন থমথম করছে। সুন্দরী নাদিরাকে চেনা যাচ্ছে না। এক রাতে সে যেন পুড়ে গেছে। যে মহলে তার হুকুম চলে। আজ সে যেন পরাধীন। না সে আর নিতে পারছে না নানহাকে সে ছাড়বে না। কিন্তু তার যে কিছু করার নেই। সে অসহায়। আসগর আলির কথা মাথায় আসে। কিন্তু সে এক সরল মানুষ।

নাদি, তোমার কিছু হবে না। আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি না চাইলে কিছু হবে না। জোর করবো না। নানহা শক্ত মনের মানুষ হতে পারে। তাই বলে সে কোনো নারীর ক্ষতি আজও করিনি। তুমি এখানে এসে কি তোমার কিছু খারাপ হয়েছে? তোমার গানের কদর করি। আমি একটু ভালো বাসার কাঙাল নাদি! তুমি চাইলে আমি রেখে আসবো। তোমার কুঠি, তোমার রূপ, তোমার গান তোমাকে মোবারক। আমি আর আসবো না তোমার কুঠিতে। আমার হুকুম কেউ অমান্য করতে পারে না। আমি আজ তোমার কাছে হেরে গেলাম। আজ থেকে এ শহর জানবে নানহা শেষ হয়ে গেছে।

এবার থামেন নানহা। গলা ধরে এসেছে। কথা বলতে পারছেন না। খোসবাগে আজ একটিও গোলাপ ফোটেনি। লুৎফার কবরের পাশে পড়ে থাকা শুকনো ফুলগুলো বুঝি বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে গেল। চারপাশ খাঁ খাঁ করছে। জানালা দিয়ে আসা বাতাসে নাদিরার রেশমঘন চুলগুলো এলোমেলো করে দিল। নাদিরা অবাক হয়ে নানহার দিকে তাকিয়ে। মানুষটি যা চায় তা সে অনেক আগেই সে মন সঁপে দিয়েছে।  সে মন আর ফেরানো যাবে না।

নানহা আবার বলেন, নাদি, একটু বসবে না? তুমি না খেলে কেমন লাগে না।

খুব বিষণœতার সঙ্গে বলেন কথাটা। নাদিরা এত সব মানুষকে সে সামলে রাখে। আর নানহাকে সে রাখতে পারবে না? নাদিরা বসে। তারপর ও নরম করে বলে, নানহা সাব, জোর করে নারীর মন পাওয়া যায় না। আসবেন আগের মতো কোঠিতে। সেলাম থাকবে আপনার জন্য। আপনার জন্য কুঠি সব সময় খোলা।

চলো নাদি, তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি। ভালো থেকো তুমি।

গলা ধরে আসে। আর কথা বলতে পারেন না। খোলা জানালা দিয়ে শীতল বাতাস আসছে একটু একটু করে। দূরে পিঁউ কাহা ডাকছে। মুক্ত পরিবেশ। এখানে এলে মনটা আপনা থেকে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু নাদিরার মন খারাপ।  এক রাতে সে যেন ঝলসে গেছে মনের আগুনে। তার জীবনে এই প্রথম কেউ তাকে এমন কষ্ট দিল। তার রূপের গুণে। তার মনের কথা শুনবার অনেকেই আছেন। কিন্তু নানহা সাব একটু অন্য রকমের। আজ তাকে চিনলো নতুন করে ও।

 

নাদিরা বেরিয়ে আসে ঘর থেকে।  নানহাও এসে দাঁড়ায় ওর পিছনে।

তুমি একা যেতে পারবে না। আমার লোক তোমাকে রেখে আসবে।

না থাক। আমি চলে যাবো।

তাই হয় নাকি।

তিনি হঠাৎ একজনকো ডাকেন নাম ধরে।

মিরাজ, যাও নাদিকে দিয়ে এসো।

হুজুরের হুকুম।

গেটের বাইরে আসতেই দেখছে আসগর আলি দাঁড়িয়ে। নাদিরা অবাক হয়। মানুষটির চোখ মুখে রাত জাগরণের চিহ্ন। মানুষটিকে দেখে নাদিরার খুব মায়া হয়। পর চোখে আপনা থেকে জল চলে আসে। নাদিরা এগিয়ে গিয়ে ধরা গলায় বলে, আসগর, তুমি এখানে?

আমি সারারাত তোমাকে গোটা শহরে পাগলের মতো খুঁজছি। এখানে এসেছি ভোরে। নৌকা মাঝিকে অনুরোধ করি পার করে দেবার জন্য।

চলো আমরা ফিরে যাই।

নাদিরা বলে কথাটা।

ওরা এগিয়ে চলে আম বাগানের রাস্তা ধরে। পিঁউ কাহাটা আবার ডাকছে।

 

রাজকুমার শেখ, কথাসাহিত্যিক, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ

চট্টগ্রামী প্রবাদের প্রথম গ্রন্থ : রচয়িতা জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন

মহীবুল আজিজ জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন (১৮৫২-১৯২০), সংক্ষেপে জে ডি এন্ডার্সন আজ থেকে একশ’ সাতাশ বছর আগে চট্টগ্রামী প্রবাদের সর্বপ্রাথমিক গ্রন্থটি রচনা-সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিলেন। চট্টগ্রামী

দেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই (সম্পাদকীয়- জুন ২০২৪ সংখ্যা)

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্প্রতি আমাদের দেশসহ উপমহাদেশে যে তাপদাহ শুরু হয়েছে তা থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই