এখন সময়:রাত ১:১৮- আজ: বৃহস্পতিবার-১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

এখন সময়:রাত ১:১৮- আজ: বৃহস্পতিবার
১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

ময়না বাড়ি

মোহাম্মদ শামছুজ্জামান

 

টিলার ওপাশ বেশ জঙ্গল; মুথোঘাস, শনের ঝোপঝাড়, ডুমুরগাছ, বেতের ঝাড়ের সাথে বেমানান বনবিভাগের পোঁতা মেঘছোঁয়া আকাশমনি ও সটান ইউক্লিপটার্স, ডালে ক্ষতচিহ্নের কালোদাগ নিয়ে কিছু কুঁজো হয়েও দাঁড়িয়ে আছে। বুনোফুল আর কাঠালচাঁপার গন্ধে বনভূমি মৌ-মৌ করে। আর একটু উত্তরে এগুলেই সাতছড়ি গহীন বনপথে শাল, সেগুন, আগর, গর্জন, চাপালিশ, বাঁশঝাড় জড়াজড়িতে ছায়া বিছিয়ে আছে। হাঁটাপথে অনতিদূরে দক্ষিণে টিলার আনত পিঠের ভীমরাজ ছড়ার বাঁকালেজের শেষে চারঘর গৃহস্থ পরিবার নিয়ে শিয়ালডাঙা গ্রামের শুরু।

এটাকে কী গ্রাম বলা যায়! বলা যায় পাড়া। তবে কয়েকযুগের বাসিন্দারা গ্রাম বলে ঢেঁকুর তোলে, আর গ্রামের নামে মসজিদের সরকারী বরাদ্দ আসলে সবাই বর্তে যায়।

 

এতে নিজেদের মাটিকে ধার্মিক গোছের নাম রাখতে তারা তৎপর হয়। কিছুদিন দেনদরবার করলেও মৌজা রেকর্ডে সেই শিয়ালডাঙা, হয়তো এককালে বনের পাতিশিয়াল আড্ডা জমাতো! শেষ জরিপেও মাতব্বররা আটকাতে পারেনি, নতুন জুতসই আখের গোছানো সওয়াবের নাম বসানোর কী কম চেষ্টাই ছিলনা! পরিবারগুলোয় সচ্ছলতার বর ঢেলেছে মিডলইস্ট; খেয়েপরে শরিয়তের পথধরে চলাচলতির সাথে বেশ আয়েশে দিন কাটে। প্রত্যেক পরিবারে মিডলইস্টে কাজ করা লোকের অভাব নেই। তবুও পাতি শিয়ালের স্মৃতিলেজ মুড়তে মাত্র কয়েকঘর মাথা একহতে পারেনি; কারোর ছেলে অথবা ভাই হয় দুবাই, না-হয় কাতার, না-হয় দাম্মাম, না-হয় রিয়াদে কর্মরত। সেইসব মিডেলইস্টের স্থাননামে একমতে একটা নাম বেছে নেয়ার ব্যর্থতায় শিয়ালডাঙা আবালবৃদ্ধবনিতার ঠোঁট কেঁপে বেরিয়ে আসা সেই ‘শেলডাঙা’তেই স্থির থাকে।

 

আশপাশের জমিজিরাত ঘরগৃহস্থলি এখন আর চারঘরে নেই, পরিবারে শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে সাতছড়ির বুনোবেতের মতো ঝাঁপিয়ে অনেক ছোট ঘরবাড়িতে ভরে গেছে। আগের গৃহস্থবাড়ির বিশিষ্টতা আর নেই, সেই কবে ঘানি ছেড়ে কলুর গন্ধ মুছে গেছে, ঘরামি ছেড়ে রাজমিস্ত্রি অথবা পাইকদার থেকে পাইকার বনে গেছে! এসবে কারো মাথা নেই, গরজও নেই। আবার কারো নুন আনতে পান্তা ফুরায়। এমন ছন্নছাড়া জীবনে গতি আসে মিডলইস্টের হু-ি আসলে, চুনারুঘাট বাজারে যাতায়াত বেড়ে যায়। কিন্তু তারমাঝেই ময়নাবাড়ি ঢিমেতালে চলে, একমাত্র তুতিয়ার মিস্ত্রির কোন জোয়ান ছেলে বিদেশ নেই। এমনকি দেশের ভেতরেও কোন অর্থবহ রোজগার কাজে যুক্ত নেই। গরুগাড়ির বর্ষাকালে পাঁকেপড়া যেমন, উদ্ধারে জোয়ান ছেলেরা অকর্মার ঢেঁকি। কিন্তু তাদের ঘরে মিথু আছে, তাদের উঠোনকে বিশেষত্ব দিয়েছে, চৌহদ্দির সবাই একনামে চেনে ময়না বাড়ি, সকাল-সন্ধ্যা কথার ফোয়ারা ছোটে। সকালের নাস্তা হজম হতে না-হতে, রোদের তেজ বলক দিয়ে উঠলে সীমানার কৃষ্ণচূড়ার ছায়া বৃত্তাকারে গাঢ় হয়, বারান্দায় পাড়ার ছোটবড় অনেকমুখ ঘিরে থাকে। মিথুর গলার খাদে সপ্রতিভ অস্পষ্ট শব্দ যেন বিষ্ময় জাগানিয়া; নাম কি, বসউ, বউউ, চোক যাই- সবাই শোনার অপেক্ষায় থাকে।

 

কিন্তু আজ সকাল গড়ালে রোদের তেজের সাথে চারদিকে চাউর হলো, বাড়ির উপরে উড়ন্ত শকুনের সাথে কিছু হারানোর নিঃস্ববোধ উথলে উঠে, আমাদের মিথু নেই! মিথু নেই!! সাথে মিতাও নেই! শূন্য খাঁচা, খোলা দরজা! কেউ মিতার কথা তুলে না, হয়তো মানুষের মান-অভিমান স্বাভাবিক, রোগশোক হাসিকান্নার মতো স্বাভাবিকতায় গা-সওয়া! এই আছে, এই নেই! বেঁচে থাকলে ফিরে আসবে। কিন্তু মিথু সবার মনে দাগকেটে কোথায় উড়ে গেল!

 

‘ও খালিকের মা, তোমরা রান্নাবান্না হোইচে নি! তোমার বউডা তো অসুক্কা, যেই রান্ধে সেই’যে কই গেল!’ বেলা গড়িয়ে পড়লে পড়শি বাদলের মা খোঁজ নেয়। এককান থেকে দু’কান হয়ে পাড়ায় কড়ইগাছের ফুলের মতো চারপাশ ছড়িয়েছে সেই সকাল থেকে, যখন খালিকের মা চারদিকে মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে, ‘পোলা হলি চিন্তার ছিল না, এতো মাইয়া, বিয়া দেবানে ক্যামনে!’

 

বাদলের মা বারান্দায় হোগলার বিছানা টেনে নেয়, ‘ভাবি, এযুগের মাইয়াপোলা আমরার মতোন না, আগে বাপে যা বলচে তাই শুনচি, মুকে কোন কতা নাই’। বর্ষীয়ান দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।

 

‘ওর ফুপুই তো কালনাগিনী, আগে সুমিরে খাইচে, একন আবার বউলাজামাই নিয়ে আইচে!’

 

রাগে খালিকের মা গজগজ করতে থাকেন, ‘কনচে দেহি, মাইয়াগুলান য্যানে বানে ভাইসা আইচে!’ মিতার নাম ধরে তিনি অঝোরে কাঁদতে থাকেন। আর ঘনঘন গলায় জমাশ্লেষ্মা ঘরের

 

সেঁচে পড়তে থাকে। হঠাৎ কাঠঠোকরা স্বভাবজাত চিল্লাতে চিল্লাতে উত্তরের বনভূমি পানে টিনের চালের উপরে উড়ে যায়। বাদলের মা সেদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে কোন ভালো সংবাদের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, সংস্কারের প্রত্যাশায় বলেন, ‘আল্লা-মাবুদ মিতারে আইন্যা দেও, আল্লা তুমি সব পারো।’

 

কিন্তু কাঠঠোকরা কোথায় যেন হারিয়ে গেল! অনেকদূরে বোধহয়! মিতার পছন্দের বাগানে! বাগান না, একেবারে গভীর জঙ্গল, সাতছড়ির পাঁজরের ভেতর। একসময় মিতার ভালো সময় কাটতো, বাগানে বসে কতকিছু ভাবতো, ধ্যানজ্ঞান সাধনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো মাচ্ছালত। আঠাইলাকে ভয় করতো না, তার সামনে পড়তে হবে, আর মন্ত্র তো আছেই! উঁচুতে লাফদেয়ার ক্ষিপ্রতায় তাকে পোলাপান সমীহ করে, ‘মিতা তুই তো বেটার লাহান!’ আর কুস্তির জোরাজুরিতে তেরচৌদ্দ সমবয়সী ছেলেরা কাত হয়ে যায়।

 

মাচ্ছালতকে তার যতো ভয়, তিনহাত লম্বা মাঝারি হলুদমাখা গায়ে সেগুন, গর্জন, ডুমুর অথবা জামরুল গাছের পাতায় পাতায় মিশে থাকে। যে গাছে মাচ্ছালত, কারো বাপের সাধ্যি নেই গাছেওঠা, সেখানে নিচের আঠাইলা তো কিছুনা। মাচ্ছালতের (সাপ) গন্ধ যেন গাছের নিচে থেকে আঠাইলা (জাতসাপ) শুকতে পারে, আর উপরে উঠেনা। মিতা মাচ্ছালতের জন্য মানত দেয়, দোয়া করে, মাদ্রাসায় যে-কয়টা দোয়া শিখেছে সবগুলো জঙ্গলে ঢুকে পড়ে নেয়, সাথে সাথে নিজের নবজাগরণ বুকে ফুঁ-দেয়। পাড়ার নূরীর কাছে তালিম নেয়া বিপদে উদ্ধার পাওয়া মন্ত্রও সে চোখবুজে আওড়ায়, ‘রক্কা কাটম, রক্কা কাটম, বীর কাটম ডালে, আগে যায় হোসেন হাসান বীর খ্যাত্র পালে…।’ আর যেকোন বাগানে ঢুকেই প্রথমেই আঠাইলা তাড়ানোর মন্ত্র আওড়ে নেয়, ‘চলে যেতে ঘুঙ্গুর বাজে, নূপুর বাজে পায়। পথ ছেড়ে দে বাসুকী মা, তোর গরু গোঁসাই যায়।’ বছরখানেক আগে মিতা এসব দোয়া-মন্ত্র পড়েই যেন মাচ্ছালতের হিসহিস ফণাতোলা ঝড়ো বাতাসের ভীতির মাঝেই একচোখা হয়ে সেগুনের খোড়ল থেকে মিথুকে তুলে নেয়।

 

তার এ দোয়া-মন্ত্র মাচ্ছালতের মঙ্গলে, না নিজের বিপদে রক্ষার দেহবন্দিতে, সে নিজেও জানেনা। দোয়া পড়ার সময় ডুমুরের পাতায় ঢেকে থাকা হলুদ মাচ্ছালত চোখের সামনে ভেসে ওঠে, আর ভাসে ময়নার খোড়ল। পাতালতে সাপ মাচ্ছালত না থাকলে সে মিথুকে পেত না; মাচ্ছালত ময়নাপাখির বাসার পাহারাদার, আঠাইলাদের আক্রমন ঠেকায়। যে গাছে মাচ্ছালত থাকে সেই গাছের কোটরে ময়না ডিম পাড়ে এবং নিশ্চিন্তে ডিম ফুটায়। আবার সেইগাছে মৌমাছিও বাসা বাঁধে।

 

পড়ন্ত বেলা। গাছের নিচে বসে মিতা মিথুকে দেখতে থাকে, সকালে এককাপড়ে বেরোনোর সময় মিথুকে ডানোর বড়টিনে ভরে নেয়। ডুমুরের ডালে বসে মিথু এদিক-ওদিক চায়, কিন্তু উড়ে যায় না। মিথু ভাল উড়তে শেখেনি, মিতার বুকে দীর্ঘশ্বাস ওঠে। রোদ নেই বললে চলে, হেমন্তের শেষ। বাইরে একটু ঠা-া থাকলেও জঙ্গলের ঝিমধরা বাতাসে ঘুঘু, শালিক, টিয়ারা অবিশ্রান্ত ডেকে যায়। ঝোপের মাঝে সেই কিচিরমিচির ঘোরে বসে মিতা বিগত ক’দিনের বাড়ির চালচিত্র ভাবতে থাকে।

 

প্রায় আটমাস হলো চুনারুঘাটের পথে পাইকপাড়া গ্রামে বোবা ছেলের সাথে বড়বোন যুথীর বিয়ে হয়েছে। সবকিছু বোঝে, তবে কথা বলতে পারে না। খুব রাগী, একটুতেই বিগড়ে যায় এবং যুথীর ওপর চড়াও হয়। বাপের একমাত্র সৎবোন এসে বড়ভাইকে উদ্ধার করতে পয়গাম নিয়ে আসে। মিতার বাপের অবস্থা সঙ্গীন, বড়ভায়ের পিছনে ফৌজদারি মামলায় টাকাপয়সা ঢেলে জমিজমা শেষ। মিতারা জানে মিথ্যা মামলা, সাতছড়ি বনের কাঠকাটায় চেয়ারম্যানের ভাগ না দেয়াতে ফাঁসায়ে দিয়েছে। তবে বাইরের দুনিয়াতে তা নিয়ে কানাঘুষা আছে। বিবাহিত অগ্রজ দু’বোন অনেক বড়, যুথী আর মিতা যেন বড়বোনদের ছায়াতলে অনাদরে লতিয়েওঠা অপাংক্তেয় গাছগাছালি; জন্মের পর থেকে ভারহীন শরতের মেঘের মতো বিক্ষিপ্ত উড়েচলা। বড়ভাইদের শাসনে যুথী পোষ মানলেও, অনাদরে বেড়ে উঠাতে মিতা ছেড়েদেয়া এঁড়ে বাছুরের মতো সদাচঞ্চল ও শিহরিত, চারদিকের শস্যশ্যামল প্রান্তর মাঠঘাট, বনবাদাড়, জঙ্গলের গুপ্তরহস্য ভেদ করার কৌশল হাতের মুঠোয়। আশপাশে পাতলা লোকালয়, সাতছড়ি বনের লজ্জাবতী বানর, মুখপোড়া হনুমান, পাতিশিয়াল, বনবিড়াল, কাঠঠোকরা, হলদেপাখি, ধলাকেশর, ময়নাদের সাথে ওঠাবসা। বনের পাশে আদিবাসী পল্লীতে তিপরাদের সাথেও তার ভাব। তিপরাদের কিছু মেয়ের ঢাকায় যাতায়াত, মেসে থাকে, দু-তিনমাস পরপর বাড়ি আসে।

 

হিমাদি গতকাল তাকে আশ্বাস দিয়েছে, ঢাকার মেসে নিয়ে রান্নার কাজ দেবে। তারপর ম্যানেজার ম্যাডামকে বলেকয়ে মেয়েদের পার্লারের কাজে নেবে। সকাল ফুটলেই ভোরের বাসে চুনারুঘাট হয়ে সোজা ঢাকা। আজ রাতে ওদের ঘরে থাকবে। আর বাড়ি যাবে না মিতা, গেলেই বড়ভাই ভীষণ মারধর করবে। ফুপুর আনা বয়ষ্ক পাত্রের দ্বিতীয় স্ত্রী হতে রাজি না

 

হওয়ায় গতপরশু ভাই মেরে কপাল ফাটিয়েছে, মিতা রক্তের বন্যায় ভেসেছে। ভুরুর ওপর স্যাভলন ক্রিম লাগানো ব্যান্ডেজ আজ আসার পথে খুলেছে।

মিতা সেদিন ফুপুর মুখের ওপর বলেছিলো, ‘আমি বিয়া বইতাম না, পড়তে চাই’।

ফুপু খ্যাক্কর দিয়ে উঠেছিলো, ‘কী তোর বিদ্যা, বিদ্যোওলা গিরি দেকাস, তুই বংশ উদ্ধার করে দিবি!’ তারপর জোর দিয়ে বলেছিলো, ‘মজিদ ব্যাপারীর কিই বয়েস হইচে, নূরের মা অসুইক্কা, কাজের লোক দেকতে তো ঘরে এটটা মানুষ লাগে। জমিজমা যা আচে পাঁচপুরুষি খাইতে পারে। বড়ভাইয়ের কপাল ভালা এমন এককান জামাই পাইবো।’

ফুপু চলে গেলে মিতা মার দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, ‘মা আমারে যুথী বানাইও না।’

 

ভাই ক্ষিপ্ত হয়ে যায়, ‘হারামজাদি, ছোট মুকে এত্তোবড়ো কতা কছ!’

মা ঠেকানোর আগেই মিতাকে তুলে মাটিতে ফেলে দেয়। সেখানে শুকাতে রাখা খড়ির কোণায় কপাল লেগে প্রচুর রক্ত ঝরে।

হিমাদের বাসায় দুপুরে খেয়ে মিথুকে নিজের ভাত খাইয়ে সেই-যে জঙ্গলের গভীরে ডুমুর তলায় বসেছে। কতোক্ষণ যে গেছে! এরমাঝে ভেবেছে অনেক; মায়ের কথা, খরগোশ ধরার ফাঁদের কথা, মুরগির বাচ্চাদের কথা। ভোরে বেরোনোর ক্ষণে গোয়ালে শ্যামল গাভির করুণ চাহনি, ধারালো জিবে মিতার বাহু চেটে বিদায় জানানোর অনুভূতি আছন্ন করে। সবশেষে মিথুর কথা ভাবতে থাকে, মিথুকে সাথে আনা ঠিক হয়নি! বাসায় রেখে আসলে কে খাওয়াবে, কে গোসল করাবে! কে ডিমভাজা, ভিজাছোলা, মাছভাজা, আর চিপস খাওয়াবে! মাঝে মাঝে ধরে আনা ঝিঝি পোকা, ফড়িং সামনের বাটিতে কে তুলে দেবে! গতরাতেই ভেবে রেখেছিলো, মিথুকে তুলে নেয়ার সময় মা ময়নার বুক খালি হয়েছিলো, মা ময়না হয়তো অভিশাপ দিয়েছিলো; বুড়োর সাথে নিকে সামলাও এখন! এই মারপিট সহ্য করো! তাই প্রায়শ্চিত্ত করতে মিথুকে জঙ্গলে রেখে ঢাকায় চলে যাবে। কেউ তাকে খুঁজে পাবে না। অসময়ে মিতার বুকে শ্রাবণের ধারা নামে।

 

সে ডুমুরের ডালে মিথুকে খোঁজে, কিন্তু আশপাশে কোথাও নেই, পাশে মেহেগনির ডালে লক্ষ দেয়। কাঠঠোকরা খটাখট শব্দ তুলে অস্তিত্ব জানান দেয়। ঐ দূরে আকাশটা ফাঁকা নীলা, কিছু সাদামেঘ বকের পাখনা ছুঁয়েছে, আর অনেক উপরে শকুনের পাল ঘুরে ঘুরে উড়ে চলে। মিথু গেল কোথায়! কিছুক্ষণ আগেও সুরমাচোখের কমলাঠোঁটা মিথু ডুমুরের ডালে বসে নিচে তাকিয়ে ছিল। হলুদ পায়ের একটু উপরে কালোডানার পাখায় সাদা চুনের আঁচড়, চোখের উপরে ঘাড়ে হলুদরঙে লেপ্টে আছে যেন মেয়েদের মাথার ওড়না। মিতা চঞ্চল হয়, চোখের পানি মোছে, পাশদিয়ে কে যেন ছুটে গেল! সন্ধ্যার আর বাকী নেই। এই বনের আরো গভীরে বুনো দাঁতালো শুয়োর আছে, উল্লুকও নাকি ঘোরেফেরে! মিতা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। দোয়াদরুদ পড়ে উঠে দাঁড়ায়, বনের পশ্চিমে টিলার ওপাশে টিপারা পাড়া। কিন্তু মিথুর কোন খোঁজ নেই! যদি একবার শেষবারের মতো দেখা হতো! কত কথা পড়ে আছে! কত কথা শেখাতে বাকী! তার সুরমাটানা চোখের গভীরে তাকিয়ে শেষবারের মতো যদি বলতে পারতো, ভালো থাকিস মিথু, আমারে ভুলিস নে! তুই ময়না বাড়ির পরাণ যে!

 

কিন্তু মিথুকে কোথাও দেখা গেল না। চারদিকে খস্ খস্, বড়গাছের ডালে ডালে ঘর্ষণ লেগে কট্ কট্ শব্দে বনভূমি তোলপাড় করে, মিতা সেদিকে তাকায়, তেমন অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েনা! তাহলে কী! সেই সব! মিতার হাতের লোম ডুমুরের রোয়ার মতো খাড়া হয়ে যায়। মিতা অনুচ্চ স্বরে আওড়াতে থাকে, ‘ভূত মোর পুত, শাকচুনি মোর ঝি, রামলক্কন মাতায় আচে, করবি মোরে কী? ভূত মোর পুত, শাকচুনি…..’।

 

মিতা আস্তে আস্তে বনভূমির ডালপালার ভেতর দিয়ে টিপরা পাড়ায় এগিয়ে চলে। সকালের অনিশ্চিত যাত্রা, সামনের অজানা ভবিষ্যৎ সবকিছু পিছনে পড়ে থাকে, জমা স্মৃতির আনন্দ-উচ্ছ্বাস, দুঃখকষ্টের ঢেউগুলো পাশের গাছের চলার সাথে হাঁটতে থাকে। এই বনভূমি এই জঙ্গল সবচেয়ে আপনজন, তাদেরকে সব বলা যায়, সবকিছু জমারাখা যায়। একসময় অনেক সাধনায় দোয়াদরুদের বিনিময়ে মাচ্ছালতকে ফাঁকি দিয়ে ময়নার খোড়লে মিথুকে পাওয়া। বিগত বছরজুড়ে মিথুময় আনন্দের জীবন। মিথুকে ছেড়ে আজ চলে যেতে হলো; তার গালে মিথুর ঠোঁটঘষা, গোসল শেষে পিঠে বসে গা’ঝাড়ার সোহাগ আরকী পাওয়া যাবে! মায়ের বকুনি, ভাবীর উপহাস পায়ে ঠেলে আজ ময়না বাড়ির মিথুকে বিদায় দিয়ে মিতা কোথায় যাবে! মিতার ভেতর আবার জঙ্গল মোচড় দেয়, ঝাপটানো ভীমরাজের মতো বনজঙ্গল ভেদকরে জেগে উঠে, ‘মিথু-উ-উ-উ’!

 

সারা জঙ্গলে প্রতিধ্বনি উঠে, গাছের শাখা-প্রশাখা-পাতা চিরে সেই ডাক আকাশের সাদামেঘে বাঁধা পেয়ে ফিরে আসে। ঝুরঝুর করে আকাশের জমাবাষ্প নেমে সেগুন, মেহেগনি, জামরুল, বাঁশঝাড়, বেতঝোপ ঘিরে ধরে, চারপাশে যেন হালকা সাদা কুয়াশায় ভরে যায়! মিতার চোখে এমন অদ্ভূত সাদারশ্মি কখনো পড়েনি। বাঁশবাগানের কোলঘেঁসে জামরুল গাছের পাতাভরা ডাল হঠাৎ সামনে দাঁড়ালে, মাথা নিচু করে এগুতেই কাঁধে বসা কে যেন আলতো স্বরে বলে, ‘বালা আইচ! আই মিটু!’ জঙ্গলের চারপাশে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, মিটু-মিটু-মিটু….।

 

 

মোহাম্মদ শামছুজ্জামান, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

বাজেটের সংস্কৃতি, সংস্কৃতির বাজেট

আলম খোরশেদ আর কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষিত হবে। আর অমনি শুরু হয়ে যাবে সবখানে বাজেট নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা। প-িতেরা, তথা অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার,

যৌক্তিক দাবি সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৩৫ বছর

দেশে চাকরির বাজার কত প্রকট বা দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কত তা নিরূপণ করতে গবেষণার প্রয়োজন নেই। সরকারি চাকরি বা বিসিএস ক্যাডারে আবেদনকারীর সংখ্যা দেখলেই

সংবর্ধনার জবাবে কবি মিনার মনসুর বঙ্গবন্ধু শব্দটি যখন নিষিদ্ধ ছিল তখনই আমি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করেছি

রুহু রুহেল সময়ের সাহসী উচ্চারণ খুব কম সংখ্যক মানুষই করতে পারেন। প্রতিবাদী মানসিকতা সবার থাকে না; থাকলেও সেখানে  সংখ্যা স্বল্পই। এই স্বল্পসংখ্যক মানুষের মাঝে  সৌম্যদীপ্র