এখন সময়:বিকাল ৩:২৫- আজ: শুক্রবার-১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

এখন সময়:বিকাল ৩:২৫- আজ: শুক্রবার
১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

আঙ্গিক বিবেচনায় মিথের চরিত্র

নাজমুল হুদা

প্রকৃতিতে ঘটা ঘটনায় কল্পিত গল্পের ব্যাখ্যার কারণে মিথকে বলা হয় আদিম মানুষের বিজ্ঞান। ধারণার মধ্যে মিথের জন্ম বিশ্বাসের মধ্যে মিথের বসবাস। মানুষের জীবনের প্রতি পরতে পরতে মিথের বিচরণ। মিথের রাজত্ব দৈনন্দিন জীবনের নানা অনুষঙ্গে। যুক্তির বিবরণ ও রেফারেন্স দিয়ে যে সকল বিষয় ব্যাখ্যা করা যায় না বা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে যেটির ব্যাখ্যা করা দুরূহ, বা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে যার ব্যাখ্যা সম্ভব হয়ে ওঠে না এমন সব বিষয়ে ধারণার ওপর নির্ভর করাটাই রীতি ছিলো আদিম মানুষের। ধীরে ধীরে বিশ্বাসই হয়ে ওঠে কার্যকারণ ব্যাখ্যার প্রধান বিজ্ঞান। কল্পনার রঙ দিয়ে কাহিনির নকশিকাঁথা বুনে নিতো আপন মনে যাতে করে কার্যকারণ না জানা মানুষ আপাতভাবে কোনো একটি ব্যাখ্যায় সন্তুষ্টি নির্মাণ করতে পারে। কার্যকারণ সম্পর্কে অজ্ঞ বা প্রাকৃতিক শক্তিকে ভয়-পাওয়া আদিম মানুষ প্রকৃতির শক্তিকে ব্যাখ্যা করতো দৈবশক্তিরূপে যার পেছনে কল্পনা করতো অসম্ভব ক্ষমতাসম্পন্ন অন্য কোনো অতিমানব শক্তিকে। অলৌকিক, প্রাকৃতিক শক্তির পেছনে প্রচণ্ড ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো একটি বা একগুচ্ছ আত্মার উপস্থিতি আবিষ্কার করতো বা কল্পনা করতো। আর এভাবে আবিষ্কার করে ফেললো, অথবা বলা ভালো, তৈরি করলো কল্পিত দেবশক্তি বা কল্পিত দেবতা বা দেবী। এভাবে আদিম মানুষ আবিষ্কার করলো বা ধারণা থেকে বেছে নিলো একটি চরিত্রসর্বনাম যার নাম দেবতা। এভাবে প্রকৃতির সকল শক্তির পেছনে ব্যাখ্যাযোগ্য ও বয়ানযোগ্য শক্তিটি হয়ে উঠলো দেবতা। অবশ্য বিজ্ঞান কালক্রমে বহু দেবতার অস্তিত্ব ও ক্ষমতা অন্তঃসারশূন্য ও অসত্য করে তুললেও মানুষ এখনো ভালোবাসে পুরোনো ধারণা ও কল্পনা মনের ভেতরে লালন করতে— এতে এক ধরনের অনির্বচনীয় আনন্দ ও অপরিমেয় সুখ পাওয়া যায়।

অলৌকিক শক্তির গল্পের নায়ক হলেন দেবতা যে অবয়বে মানুষের মতো কিন্তু মানুষের ক্ষমতার অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন। দেবতা একটি ফ্যাক্ট।  মানুষ দেবতার চেহারা বা রূপ চিত্রায়ন করেছে নিজের অবয়বে।  মিথিয় ক্ষমতার পেছনের লোকটি যে সে তা মুখচোরা স্বভাবের মানুষ সেটা গোপন করে। তার অবয়বের মানুষটিই আসলে দেবতা। আসলে সে তার নিজের ভেতর একটি দেবচরিত্র লালন করে যা কিনা চেহারায় অবিকল তারই মতো। এভাবে সে গোপনে ও অতি সন্তর্পণে প্রায় সকল ক্ষেত্রে বেছে নিলো নিজেকে শক্তি প্রকাশের চরিত্র হিসেবে। নিজেকে ছাড়াও মানুষ নানা ধরণের চরিত্র ও চরিত্র-প্রকাশক প্রতীক ও চিহ্ন, গাছপালা, জীবজন্তু, প্রাণী, বস্তু (আরোপিত বা বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন), ঘটনা, অ্যাকশন বা কার্যকলাপ, এমনকি স্থান, এমনকি সময়, ক্ষণ বা বিশেষ উপলক্ষকে মানবীয় গুণ আরোপ করে বেছে নিলো চরিত্ররূপে কালে কালে, যুগে যুগে, দেশে দেশে। নানা সংস্কৃতিতে এর দেখা মেলে।

চর্যাপদগুলোকে প্রধান রূপক হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে রমণী এবং মানবদেহ। রূপকল্পগুলোকে জীবিত রাখার জন্য অনিবার্যভাবে এসেছে লোকজ জীবনচিত্র।  বলাই বাহুল্য, কবি-লেখক-পালাকার-গল্পকারদের মধ্যে পুরুষ আধিক্যের কারণে নারীদেহ প্রধানতম আলোচিত ও বর্ণিত বিষয়। এতে প্রকৃত রক্তমাংসের নারীদেহের থেকে কল্পনার, দেবলোকের, রসালাপের প্রধানতম চরিত্র হয়ে উঠেছে নারীদেহ। কাম-বাসনা-সৌন্দর্য-মাতৃত্ব কিংবা ধ্বংস প্রকাশে কখনো সে আফ্রোদিতি, কখনো ভেনাস, কখনো বেহুলা, হেলেন কিংবা পালাগানের রহিমের রূপবান। এই চরিত্রের রূপায়নে নারী হয়ে উঠেছে কখনো ট্র্যাজেডির প্রধান পাত্র/পাত্রীতে, বিচ্ছেদের অনুষঙ্গে, মিলনের আকাঙ্ক্ষায় বা সুখের অংশিদারে। কবিতায় গল্পে, কল্পে, রচনায় ও ভাবনায়, আলোচনায় ও কামনা, শ্রদ্ধায় ও অবমাননায় নারী হয়েছে বাস্তবের থেকে ভিন্ন এক রূপকে। নারীর যাপিত জীবনের অংশও পরিণত হয়েছে পর্যবেক্ষণের বিষয়ে। নারীর বিভিন্ন অবস্থার প্রকাশ হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকে হাসি ও মমতা পবিত্রতার, ঋতু অপবিত্রতার প্রতীকে। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে ঋতুমতী হলে নারীকে অপবিত্র ও অস্পর্শ গণ্য করা হয়। গ্রামীণ সমাজে দেখা যায়, যাদের মাটির ঘর রয়েছে, এ সময় মেয়েরা গোবর ও আলা (আঠাল) মাটি দিয়ে ঘরের ভেতরে-বাইরে লেপে পবিত্র ও দেবাগমনোপযোগী করে তোলা হয়।

মিথের দেখা পাওয়া যায় বয়োবৃদ্ধ মানুষ এবং কল্পনাপ্রবণ সমাজে যা সংক্রামিত করে কিশোর কিশোরীসহ সকল শ্রেণির শ্রোতাদের। এখনো বাংলার আনাচে কানাচে শোনা যায় পুরোনো পুকুর ও দিঘি ঘিরে কিংবদন্তি কোনো এক কালে পুকুরের মাঝখানে নৌকাভর্তি সোনার অথবা পিতলের থালাবাসনভর্তি নৌকা আবির্ভূত হতো কোনো এক নির্জন নিশুতিতে,  আর হতদরিদ্র কোনো পিতা সেগুলি ব্যবহার করে মেয়ের বিয়ের বরযাত্রী আপ্যায়ন করতো। ধীরে ধীরে মানুষ পাপাচার শিখেছে। বিয়ের জন্যে ধার নেয়া থালাবাসন সেই পুকুরে বা দিঘিতে ফেরত না দেয়ায় পরে আর কখনো সে থালাবাসনের নৌকা দেখা যায় নি। পেতলের থালাবাসন আদতে কখনো এভাবে আসতো কিনা তা কেউ দেখেছে বলে শোনা যায় নি সকলেই তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে শুনেছে। কিংবদন্তি চলে আসছে পুরুষানুক্রমে। প্রাচীন দিঘিতে বা পুকুরে অশুভ আত্মার বসবাস বলে স্থানীয় মানুষের কল্পনা। সেখানে সাধারণতঃ কোনো মানুষ গোসল করতে নামলে মৃত্যু ঘটে, অথবা ডুবে যায়। মিথ ধারণ করেছে চরিত্র হিসেবে এ সকল পুকুর আর দিঘি।

তালগাছ, বেলগাছ, তেঁতুল গাছ, শেওড়াগাছ, মান্দার বা শিমুল গাছ ঘিরে প্রচলিত রয়েছে সংখ্যাহীন মিথ। এতে নাকি অশুভ আত্মা, ভূতপ্রেতের বসবাস। দিনদুপুরে, নির্জনতায় লোকজন সযত্নে সেসব গাছ এড়িয়ে চলেন। মিথের চরিত্র হিসেবে শক্তিশালী গাছটির নাম হলো বটগাছ বা পাকুড় গাছ প্রাচীন হলে তো কথাই নেই। যতো বয়সী গাছ, ততো শক্তিশালী মিথ সে বট বা পাকুড় গাছকে ঘিরে। মানুষের বিশ্বাস, এতে রয়েছে অদৃশ্য কারো বাস। অন্ধকারে এবং নির্জন মুহূর্তে বট পাকুড় গাছ ভীতি উৎপাদনের অন্য নাম। পূর্ণিমায়, ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে, অথবা নির্জন দুপুরে নিঃসঙ্গ পথিক এ গাছের দিকে তাকাতে ভয় পায়। এর আকৃতি দেখে অজানা কল্পনায় কুঁকরে যেতে থাকে। কেউ কেউ আতঙ্কিতবোধ ও অসহায় বোধ করে। এ বট পাকুড় গাছের ডালে কল্পনাপ্রবণ মন দেখে, উঁচু মগডাল থেকে ঝুলছে সাদা কাপড়, কিংবা অস্বাভাবিক দীর্ঘকায় কোনো ঊর্বশীর জোড়া পা। কিংবা ঠোঁটে রহস্যময় হাসি কখনো শব্দহীন, কখনো খিলখিল। মেরুদণ্ড শীতল করা কোনো কথা শোনে কেউ কেউ সে ঊর্বশীর কিন্নর কণ্ঠে। শিরদাঁড়া হিম করা এমন মিথ ঘিরে রয়েছে এ সকল গাছ ঘিরে। মেয়েরা ঘোমটা ছাড়া এমন গাছের নিচ দিয়ে চলাচল করে না, লোকজন একা একা ভরদুপুর ও সন্ধ্যাবেলা এড়িয়ে চলে এমন গাছ। কেউ এ সকল গাছের পাতা ছিঁড়তে চায় না ভয়ে। মহীরুহ হয়ে ওঠা বট বা পাকুড় গাছ যে সব সময় ভয়ের কারণ তা নয়। আশ্রয়দাতা ও চিহ্ন হিসেবে এ ধরনের গাছ ঘিরে গড়ে ওঠে গ্রাম, বা পাড়া। কোথাও বা বসে হাটবাজার এ গাছকে ঘিরে। পবিত্রতার অনুসন্ধানও চলে শাখা বিস্তারি এ বট পাকুড় গাছ ঘিরে। এখনো বাংলার বহু জায়গায় দেখা যায়, এর ছায়ায় গড়ে উঠেছে মাজার, আখড়া, বা আশ্রম। কোথাও বা পূজাঅর্চনা করা হয় এ ধরণের গাছকে। গ্রামবাংলায় কোনো কোনো স্থানে বটগাছ ঘিরে মেলা বসে বার্ষিক পবিত্র আত্মা বা বৃক্ষছায়ায় অবস্থানকারী কোনো পির বা সাধুর স্মৃতি স্মরণের বা শ্রদ্ধা প্রকাশের অংশ হিসেবে। ইউরোপে আর্যদের ধর্মীয় ইতিহাসে বৃক্ষপূজা বেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

এখনো বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে কাকের কা-কা বা টিকটিকির টিকটিক ডাককে অশুভ লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়। একইভাবে, শিয়ালের হুক্কাহুয়া, কুকুরের করুণ স্বরের আর্তনাদ, পেঁচার ডাক বা যাত্রালগ্নে পেছন থেকে মানুষের ডাক দেয়াটাকেও অশুভ লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর পেছনে রয়েছে কোনো না কোনো বিপর্যয়ের গল্প যা চলে আসছে শতাব্দির পর শতাব্দি।

পুরুষ চড়ুই পাখি, পায়রা, মোরগ, গন্ধগোকুল, টটটেং (গিরগিটি) ইত্যাদির মাংস খেতে বাংলার বহু পুরুষ আকর্ষণবোধ করে। আর এর পেছনে রয়েছে ক্লান্তিহীন ও একটানা যৌনক্রিয়ার মিথ। যৌনশক্তিবর্ধক বিবেচনা করে বহু পুরুষ এ সকল পাখি বা প্রাণীর মাংস খোঁজে। যৌনকর্মে দীর্ঘ সময় লিপ্ত হবার বাসনা প্রায় সকল পুরুষেরই। জীবনের এ গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় মিথ খূব শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। আবার এর বিপরীত মিথও দেখা যায়। এ সকল বিষয় বিজ্ঞান সমর্থন করুক বা না করুক, গভীরতম বিশ্বাস নিয়ে মানুষ পালন করে যাচ্ছে এ ধরণের চর্চার। মিথের চরিত্র হিসেবে সংখ্যাতত্ত্বও পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা। যেমনটা মনে করা হয়, একটি শালিক দেখা বিচ্ছেদ বা অশুভ লক্ষণ কিন্তু জোড়া শালিক দেখাটা সৌভাগ্যের। প্রেমে মিলনের বা বিয়ের প্রতীক হিসেবে দেখা হয় জোড়া শালিক দেখাটা।

মিথের চরিত্র হিসেবে বস্তুর রয়েছে উল্লেখ্যযোগ্য স্থান। দাঁতভাঙা চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ালে চুল পড়ে যায়। বোতাম ছেড়া জামা বা ছেঁড়া গেঞ্জি পরলে দারিদ্র্য ভর করে, ভাঙা আয়নায় মুখ দেখলে বারো বছর দুঃখ ভোগ করতে হয় গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য বিভিন্ন বস্তুর রয়েছে এমন নানাবিধ মিথিয় কাহিনিগুণ। প্রাচীনকালের মানুষের কাছে বিস্ময়ের আরেক নাম ছিলো রাতের আকাশ। নানা ধরনের নক্ষত্র ও নক্ষত্রপুঞ্জ দেখে তারা যেমন বিস্মিত হতো, তেমনি সেগুলির নকশার সাথে জীবিত সত্তার মিল খুঁজতো। আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে মানুষ নানা পুরান কাহিনি জন্ম দেয়।  সেইসব কল্পিত সকল বিষয়ের প্রমাণ বিজ্ঞান করুক-না-করুক, যুগ-যুগান্তর ধরে চলে আসছে এমন বিশ্বাসের চল প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পরম্পরায়। পূর্বপুরুষের কাছ থেকে চলে আসা এ সকল সংস্কার বহু সংস্কৃতির ও শ্রেণির মানুষ বেদবাক্যের মতো মানে। কারণ এর পেছনে রয়েছে এক বা একাধিক গল্প।

মানুষের কার্যকলাপ বা অ্যাকশনও মিথের লালন করে। আঙুলে গিঁট ফোটানো, ঘাড়ের মটকা ফোটানো, বাঁকা হয়ে দাঁড়ানো এ সবের রয়েছে মিথিয় বিধিনিষেধ। কারো হিক্কা উঠলে, মনে করা হয়, কোথাও কেউ বা কোনো আত্মীয় মনে করছে। হঠাৎ বাতাস বয়ে গেলে মনে অশুভ আত্মার উপস্থিতি আন্দাজ করা, টিকটিকির টিকটিক ডাক শুনলে ‘ঠিক-ঠিক, মনে করা, যাত্রার প্রাক্কালে বা পথে হোঁচট খেলে বিপদের সম্ভাবনা, নির্জন পথে বিড়াল দেখে অশুভ তৎপরতার ছায়া দেখা ইত্যকার আচরণ বা অ্যাকশনকে ভবিষ্যতের পরিণামবাহী মনে করা হয়। এগুলি বহুল চর্চিত সাংস্কৃতিক মিথের অংশ হয়ে উঠেছে। মানুষ এর উপর ভিত্তি করে কাজকর্ম শুরু বা স্থগিত বা বন্ধ করে দেয়। সময় বা কালও মিথীয় চর্চার চরিত্র ধারণ করে। শনি-মঙ্গলবারে সাধারণতঃ শুভ কাজ বন্ধ, যাত্রাও নিষেধ। শুক্রবার বা রবিবার পবিত্র বলে গণ্য ধর্মীয় রীতিচর্চা ও আচারের কারণে। সকালকে বিবেচনা করা হয় শুভক্ষণ রূপে কিন্তু সন্ধ্যাকে বিবেচনা করা হয় অশুভ ক্ষণ রূপে। সন্ধ্যায় বা রাতে কাপড় ধোয়া, ঘরদোর ঝাঁট দেয়া, আয়না দেখা, গান করা নিষেধ। এ সময় দেবতাগণ বসতবাড়িতে বা বাড়ির আশেপাশে অবস্থান করেন। তাই তারা এ সকল কাজ পছন্দ করবেন না বলেই প্রৌঢ়দের বিশ্বাস। এ সময়ে কুমারী মেয়েরা সাজগোজ করলে এবং শিশুদের ঘরের বাইরে নিলে অশুভ শক্তির নজর লাগবে বলে বিশ্বাস করা হয়। শুভ কাজের জন্য নক্ষত্র, তিথি বা ক্ষণ হিসাব করে ‘শুভক্ষণ’ নির্ধারণ করা হয়। স্বামীদের দুর্ভাগ্যের জন্য বিবাহিত নারীদের নিষিদ্ধ বিবেচিত বা অশুভ সময়ের ‘খামখেয়ালিপূর্ণ’ কাজকে দায়ী করা হয়। মিথের ফ্রয়েডিয় ব্যাখ্যার অতুলনীয় এক দৃষ্টান্ত ‘ইডিপাস মিথ’। যৌনকামনার বদলে শাসক-শোষিতের পারস্পরিক মনোভাবকেই মিথের কেন্দ্রীয় বিষয় মনে করা হয়।  এইভাবে মিথ বেঁচে থাকে বিভিন্ন চরিত্রের ভেতর। কখনো সময়, কখনো বস্তু, কখনো আচরণ, কখনো বা প্রকৃতিকে চরিত্র হিসেবে নিয়ে তার ভেতর রচনা করে মুখরোচক বা সুখশ্রাব্য কোনো গল্প। আর মিথ স্রোতধারার মতো বেঁচে থাকে সংস্কৃতির প্রবহমান নদীতে।

ক্ষেত্র বিশেষে বিশেষ জায়গা লাভ করে বিশ্বাসের পুণ্যভূমি হিসেবে। অন্ধকার রাত্রিতে গাছপালা ঘেরা গ্রামীণ মেঠোপথ, নির্জন দুপুরের রাস্তা, গোরস্থান, শ্মশান, বিস্তীর্ণ পাথার, বিশাল মাঠ, প্রাচীন স্থাপনা, পোড়োবাড়ি, আত্মহত্যার বা  হত্যাকাণ্ডের স্থান, তিন নদীর মোহনা বা চার রাস্তার মোড়কে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে অসংখ্য মিথের। সেগুলি মানুষের চারপাশে ভয়ের ডালপালা বিস্তার করে প্রভাবিত করে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা। যুক্তিগ্রাহ্য বিবেচনার ধার ধরা ব্যতিরেকেই উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত গল্পনির্ভর প্রচলতা সঙ্গী করেই বসবাস করে আসছে মানুষ অনাদি কাল থেকেই।

ভূত-প্রেত-রাক্ষস-খোক্ষস বা দেবদেবী বা অশুভ আত্মার ধারণা তৈরি হয়েছে নানা গল্পের ও ধারণার থেকে। মিথ বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে স্থানিক বা ধর্মীয় বৈচিত্র্যের মানুষের আচরিত প্রথা বা রীতির মধ্য দিয়ে। তৈরি হয়েছে বহুমাত্রিক মিথ নানা উপায়ে ও আচরণে। রঙের কথাই ধরা যাক। সাদা রঙ নির্দেশ করে শুদ্ধতা, মৈত্রী, প্রেম, পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতা। অন্যদিকে কালো রঙ হয়ে উঠেছে শোক, বিরহ, কষ্ট, বিচ্ছেদ, মৃত্যু, শোকের প্রতি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমনটি বলেছেন, ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ’ । চেতনার প্রকোষ্ঠে মিথ জ্বালে বিশ্বাসের মশাল ভালোর অথবা মন্দের, শুভর অথবা অশুভর।

ধর্মবর্ণিত চরিত্রও হয়ে উঠেছে মিথিয় কিংবদন্তি। মিথের অত্যন্ত শক্তিশালী একটি চরিত্র হলো শয়তান বা ডেভিল। নানা ভাষায় এর রয়েছে নানা নাম কিন্তু কাজের ধরন এক ও অভিন্ন এবং তা হলো মানুষকে কুপথে পরিচালিত করা এবং নৈরাজ্য সৃষ্টি করা। পৃথিবীর প্রায় সকল ধর্মে ও সংস্কৃতিতে এ চরিত্রটির দেখা মেলে। মানুষের শুভ প্রবৃত্তি নষ্টের দায়ভার অদৃশ্য এ চরিত্রটির ওপর চাপানো হয়। যে কোনো খারাপ কাজ, বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য, অশুভ তৎপরতার জন্য সরাসরি দায়ী করা হয় শয়তান বা ডেভিলকে। আদিতে মানুষের স্বর্গপতনের দায় যেমন এর ওপর, তেমনি সমাজে নৈরাজ্য  ও বিশৃঙ্খলার দায় একান্ত এর। এর মাধ্যমে ব্যক্তি সকল অপকর্মের দায় থেকে পরিত্রাণের উপায় খোঁজে দায় এড়ানোর মাধ্যমে। এ প্রক্রিয়ায় তার থাকে না অনুশোচনা বা দুঃখবোধের বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা। বরং থাকে কৃত অপরাধ গোপন করার মধ্য দিয়ে দায়মুক্তি খোঁজার চরম প্রচেষ্টা। ব্যক্তির সুকুমার বৃত্তি ধ্বংসের ও সমাজে শৃঙ্খলাহানির দায় নির্বিবাদে শয়তান নামক মিথীয় চরিত্রের ওপর চাপিয়ে ব্যক্তি নির্দোষ সাজতে চায়। বৈশিষ্ট্যে, বিচরণে, ধারণায় ও ক্রিয়ায় শয়তানের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। পৃথিবীর সকল জাতির দৈনন্দিন জীবনযাপনে কোনো না কোনোভাবে শয়তান উপস্থিত। অশুভ আত্মার বা দৃষ্টি থেকে বাঁচতে নবজাতকের কপালে কালো কালির টিপ পরানোর প্রথা বহুল প্রচলিত। বিভিন্ন ধাতব চুড়ি, রত্নপাথরের আংটি পরিধানের রীতিও লক্ষণীয়। বিয়ের রীতিতেও লুকিয়ে রয়েছে অনেক গল্প। মিথের ভাষ্য ‘আদিম’ জনগোষ্ঠীর অলীক কল্পনা নয়, বরং সযত্নে আগলে রাখা অতীত-স্মৃতি বা ইতিহাস।

মানুষের সমাজে প্রচলিত রয়েছে নানা অশুভর ধারণা ও চরিত্র, কল্যাণবাহী নানা গল্প। জিউস, এথেনা, আফ্রোদিতি, ডালিমকুমার, হারকিউলিস, অসিরিসি, অসুর, একিলিসসহ নানা বৈশিষ্ট্যের প্রাচ্যের ও পাশ্চাত্যের মিথের চরিত্রসমূহ মানুষের ভিন্ন ভিন্ন সত্তার, কামনার ও গল্পেরই মিথিয় রূপায়ন। যৌক্তিকতা বিচারে ঘটনার আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা যা-ই হোক না কেনো, আদি মিথের গল্পগুলোতে ছিলো নিখাদ কল্পনার রঙে রাঙানো চমৎকার গল্পের বুননে নির্মিত গল্প যাতে মিশে ছিলো মানুষের আন্তরিকতা ও যত্ন যা ভাবনার জগৎকে

 

প্রসারিত করে মানুষকে দিয়েছে এগিয়ে যাবার শক্তি। ফলে সভ্যতা ক্রমশ উন্নততর হয়েছে, মানুষের সমাজ সমৃদ্ধতর হয়েছে এবং মানুষ হয়েছে ক্রমশ মহাকাশমুখি।

 

তথ্যসূত্র :

১ Campbell, Joseph, Myths to Live by (1972)

২ ফ্রেজার, জেমস জর্জ, গোল্ডেন বাউ অনু. খালিকুজ্জামান ইলিয়াস (২০২২)

৩ মাহমুদ, শিমুল, মিথ পুরাণের পরিচয় (২০১৬)

৪ ফ্রেজার, জেমস জর্জ, গোল্ডেন বাউ (২০২২) অনু. খালিকুজ্জামান ইলিয়াস

৫ রুননু, মফিজুর রহমান, পুরাণতত্ত্ব ও মানবমন

৬ ফ্রম, এরিক, বিস্মৃত ভাষা

৭ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ, শ্যামলী (১৯৩৬)

৮ ফ্রম, এরিক, বিস্মৃত ভাষা

 

 

নাজমুল হুদা, প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম

বসুমতি পূজা: লোকবিশ্বাসের ঐতিহ্যবাহী প্রথা

অমল বড়ুয়া   ‘বসুমতি’ বলতে মূলত পৃথিবী বা ধরিত্রীকে বোঝানো হয়। এটি বসুন্ধরা, ধরণী বা ভূমি শব্দের সমার্থক শব্দ। বসুমতিকে ‘সর্বংসহা’ বলা হয়। অর্থাৎ মা

শিল্প-সাহিত্য চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত

তানভীর আহমেদ হৃদয় মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত সংগ্রাম, সংঘাত ও পরিবর্তনের ইতিহাস। পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকে মানুষ নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করেছে—কখনো প্রকৃতির বিরুদ্ধে, কখনো অন্য

আঙ্গিক বিবেচনায় মিথের চরিত্র

নাজমুল হুদা প্রকৃতিতে ঘটা ঘটনায় কল্পিত গল্পের ব্যাখ্যার কারণে মিথকে বলা হয় আদিম মানুষের বিজ্ঞান। ধারণার মধ্যে মিথের জন্ম বিশ্বাসের মধ্যে মিথের বসবাস। মানুষের জীবনের