এখন সময়:রাত ২:১০- আজ: শুক্রবার-২০শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৬ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-বসন্তকাল

এখন সময়:রাত ২:১০- আজ: শুক্রবার
২০শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৬ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-বসন্তকাল

আদিবাসী নারী

কুমার প্রীতীশ বল

 

‘হৈ হৈ হৈ জুমত  যেবং.

জুমে যেইনে গচ্ছা সুদা তুলিবং.

গচ্ছা সুদা তুলি নেই টেঙ্গা কামেবং।’

চাকমা এই গানটির বাংলা অনুবাদ হলো –

‘চলো চলো জুমে যাই

জুমে গিয়ে তিল, সুতা তুলি

তিল, সুতা বিক্রি করে টাকা আয় করি।’

 

হতে পারে এটি কোনো এক আদিবাসী পাহাড়ি কন্যার উচ্ছসিত আহবান। সেই আহবানে সাড়া দিয়ে আদিবাসী নারীরা এখন আর জুমে য্য়া না। তাদের কাছে জুম ক্ষেত এখন আর তেমন নিরাপদ নয়। শুধু জুম ক্ষেত নয়, তাদের মাচাং ঘর, পাহাড়, অরণ্য কোথাও নিরাপদ নয়। সারাদিন কাজ শেষে নিরাপদে পাড়ায় ফেরার নিশ্চয়তাও নেই। পদে পদে বিপদ তাদের তাড়া করছে। এই বিপদের মধ্যে থেকে কি আর স্বপ্ন দেখা যায়? নাকি স্বপ্নভঙ্গের বেদনা প্রকাশ করা যায়? আমার দুঃখিনী বাংলার সহস্র আদিবাসী স্বজনের করুণ মুখের কথা ভাবতে গেলে অনিবার্যভাবেই মহাশ্বেতা দেবীর নাম আমার মানসপটে ভেসে ওঠে। তাই বাংলা একাডেমি মঞ্চে ১ ফ্রেব্রুয়ারি’০৯ বিরল সম্মানে ভূষিত হওয়ার খবরে বুক ভরে যায়। আমি ফিরে যাই তাঁর লেখার মধ্যে। মহাশ্বেতা দেবী গঙ্গা যমুনা ডুলং চাকা প্রবন্ধে লিখেছেন–‘গঙ্গা যমুনার সঙ্গে ডুলং, নোংসাই, চাকা এসব নদীকে মেলাবার কাজ তো শুরুই হয়নি এখনো। কবে হবে তা জানি না। শুধু এটা জানি যে পরিনামে মূলস্রোতকে, সমগ্র দেশকে ভীষণ দাম দিতে হবে এই উপেক্ষার। আর কাদের উপেক্ষার? যারা সত্যিই তো অনেক, অনেক সভ্য আমাদের চেয়ে। মেয়ের বাপ পণ দেয় না, সতীদাহ বা পণের কারণে বধু হত্যা জানে না, কন্যা সন্তানকে হত্যা করে না, বিধবা বিবাহ স্বীকৃত, উপযুক্ত কারণ থাকলে বিবাহ বিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহ স্বীকৃত; এমন উন্নত সামাজিক প্রথা যাদের, তাদের উপেক্ষা করলাম। তারা যে সভ্য, উন্নত, শ্রদ্ধেয়, মূলস্রোত সেটা জানার চেষ্টাই করল না। এর দাম আমাদের দিয়ে যেতে হচ্ছে, হবে। কোনোদিন ভারতের সত্যি ইতিহাস লেখা হবে। সে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। যদি আমারা এখনও না বুঝি।’ শুধু ভারতের নয়। এই বাংলাদেশেরও সত্যি ইতিহাস একদিন লেখা হবে। সেই ইতিহাসে আরও অনেক কিছুর সঙ্গে লেখা হবে,  কেন আদিবাসী নারীর মুখে এখন আর হাসি ফুটে না। কী হবে উত্তর, কে দেবে উত্তর, জানি না। তবে অনাগত আগামীর ঐতিহাসিকের জন্যে রেখে যেতে চাই, কিছু  বেদনাহত ঘটনাবলির করুণ কাহিনি।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আদিবাসী নারীরা এ জনপদে বঞ্চিত, নির্যাতিত হয়, ভিন্নভাবে  উচ্চারিত হলে বলতে হয় বেদনাহত ঘটনাবলির করুণ কাহিনি নির্মিত হয় চারভাবে:-

১. আদিবাসী হওয়ার কারণে;

২. আদিবাসী নারীরা দক্ষ শ্রমজীবী হওয়ার কারণে;

৩. মূলধারার ধর্মীয় প্রভাবের কারণে;

৪.  নারী হওয়ার কারণে।

 

১. আদিবাসী হওয়ার কারণে

আদিবাসী সমাজে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কারণে নারীর সম্পদের ওপর বিশেষ কর্তৃত্ব বিদ্যমান। তাই আদিবাসী পরিবারে পরিবার প্রধানের ভূমিকায় নারীকে দেখা যায়। তাই অনেক ক্ষেত্রে  বিয়ের পর মেয়ে ছেলের বাড়ি যাওয়ার পরিবর্তে ছেলেই মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করে। শুধু তা নয় সন্তানেরা পিতার পদবির পরিবর্তে মায়ের পদবি গ্রহণ করে। এমন ঘটনা গারো জাতিসত্তার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এসব কিছু মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিগণিত হয়। এই বৈশিষ্ট্যসমূহ আমাদের জন্য অর্জন উপযোগী যোগ্যতা কিংবা বিশেষ শিক্ষণীয় দিক এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই বললে চলে। কিন্তু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এই ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যসমূহ আদিবাসী নারীর জন্য এখন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। উত্তরাধিকারের  সংজ্ঞা আদিবাসী সমাজে ভিন্ন হওয়ার কারণে বৃহত্তর সমাজের ভূমিদস্যুদের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে আদিবাসী নারীর ওপর। এক্ষেত্রে  সে যত না বেশি নারী হওয়ার কারণে, তার চেয়ে বেশি সম্পদের অংশীদার হওয়ার কারণে নিগৃহীত হয়। ঐ সকল ভূমিদস্যুরা সম্পত্তির লোভে আদিবাসী নারীদের জোরপূর্বক বিয়ে করে এবং সম্পত্তির মালিকানা দাবি করে। এমন ঘটনার জের ধরে আদিবাসী নারীর রক্তে টাঙ্গাইলের মধুপুরের মাটি লাল হয়। টাঙ্গাইলের মধুপুর থানার পাহাড়ি এলাকা মাগান্তি নগর গ্রামের আদিবাসী নারী গিদিতা রেমা ভূমিদস্যু হবিবুর রহমানের হাত থেকে ছোট বোনকে রক্ষা করতে গিয়ে ২০০১ সালের ২০ মার্চ দুপুরে নৃশংসভাবে খুন হন। এমন উদাহরণ খুঁজলে আরও পাওয়া যাবে।

মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কারণে আদিবাসী নারীর সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেও সচরাচর বিক্রির অধিকার থাকে না। সে শুধু ভোগদখল এবং রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে। তারপরও দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের কারণে আদিবাসী সমাজের নিয়ম অনুসারে তিনটি ন্যায্য কারণ দেখিয়ে একজন আদিবাসী নারী তার ভোগদখলকৃত জমি বিক্রি করতে পারে। কারণ তিনটি হলো: পিতার সৎকারে অর্থের দরকার হলে, গুরুতর অসুস্থ হলে চিকিৎসার প্রয়োজনে অর্থের দরকার হলে এবং কন্যাদায়গ্রস্ত মায়ের অর্থের দরকার হলে। তিনটি কারণের কোনোটি না কোনোটি যে কারো ঘরেই বর্তমান। ফলে সম্পত্তি বিক্রিটা অনিবার্য হয়ে ওঠে। আর তখনই সমস্যার উদ্ভব হয়। এ সময় উলে¬খিত কারণে আদিবাসী নারীরা ভূমিদস্যুদের কাছে অর্থের প্রয়োজনে ছুটে যায়। ভূমিদস্যুরা সুযোগ বুঝে আদিবাসী নারীর দুর্বল সময়ের সুযোগে প্রয়োজনীয় টাকা তুলে দিয়ে সাদা ষ্ট্যাম্পে টিপ অথবা স্বাক্ষর নিয়ে রাখে।

তারপর প্রয়োজন মতো টাকার অঙ্ক বসিয়ে এক  সম্পদের  দখল নিয়ে নেয়। আবার কখনও কখনও এক বিঘা বিক্রি করে লিখিয়ে নেয় এক একর। অথচ আদিবাসী নারী জানে না একর বিঘার চাইতে কমপক্ষে তিনগুণ বড়। নিরক্ষরতা তার জন্য তখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।

জমি নিয়ে আদিবাসী নারীর দুঃখের শেষ নেই। এসকল ঘটনা বিবেচনায় নিলে আদিবাসী নারীরা এই জনপদে বৃহত্তর জনগোষ্ঠির নারীদের তুলনায় অধিক মাত্রায় বঞ্চনার শিকার হয় এবং এমন ঘটনা ঘটে তারা একমাত্র আদিবাসী নারী হওয়ার কারণেই।

২. আদিবাসী নারীরা দক্ষ শ্রমজীবী হওয়ার কারণে

আদিবাসী নারীরা মাতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর কারণে পরিবারের প্রধান শুধু নয়, শ্রমের বিবেচনায়ও তারা পুরুষের চাইতে অগ্রগামী। কিন্তু মজুরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সে প্রান্তিক। প্রান্তিক পর্যায়ে তার এই অবস্থান স্ব-আরোপিত কিংবা ঈশ্বর প্রদত্তও নয়। আদিবাসী নারীকে নিজের প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করার জন্যই স্বার্থান্বেষীমহল এই ভেদরেখা তৈরি করে রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন আদিবাসী নারী একজন পুরুষের চেয়ে বেশি পরিমাণে জমি রোপা বপন করে এবং অনেক বেশি সুন্দরভাবেই সে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুসম্পন্ন করে থাকে। কিন্তু  বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর টাউট-দালাল শ্রেণীর বদ লোকসকল আদিবাসী নারীকে  শ্রমের ন্যায্য পাওনা থেকে বারে বারে বঞ্চিত করে। গবেষণায় জানা যায়-‘বৃহত্তর উত্তরবঙ্গে….বাঙালি ক্ষেতমজুর যেখানে ২৫ টাকা পান, সেখানে আদিবাসী ক্ষেতমজুর পান ১৫ থেকে ২০টাকা। আদিবাসী ক্ষেতমজুর নারীর অবস্থা আরও খারাপ, একজন পুরুষ ক্ষেতমজুরের সমান কাজ করেও এরা মজুরি পান ৫ থেকে ৭ টাকা কম, টাকার বদলে যদি ধান  দেয়া হয় তাহলে বঞ্চনা আরও বেড়ে যায়, চুক্তিভিত্তিক কাজে একজন আদিবাসী পুরুষ এক মন ধান পেলে মেয়েরা পান আধ মণ ধান।’ এতটুকু টাকা বা ধানও যথাসময়ে দেয় না। মজুরি চাইলে গালাগালি করে। পাঁচদিন কাজ করলে এক দিনের টাকা দেয়। এরকমও শোনা যায়, বেশি টাকার লোভ দেখিয়ে কাজে নিয়োজিত করে পরে কোনো ছলচাতুরিতে দোষ ধরে কম টাকা দিয়ে বিদায় করে। এছাড়া বেশি কিছু বললে খারাপ কথা বলে। কু-প্রস্তাব দেয়। কখনও কখনও বলে ‘কাল থেকে কাজে আসবি না’। এতো গেল গ্রামীণ জনপদের কথা। শহরাঞ্চলে, এমনকী খোদ রাজধানীতে বিউটি পার্লারগুলোতে আদিবাসী নারী বিশেষ করে গারো নারীরা বিউটিশিয়ানের চাকরি করে। এখানে তাদের খুব সমাদর কাজের জন্য। কিন্তু পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে একই নির্মমতা লক্ষণীয়। গারো মেয়েদের বিউটি পার্লারগুলোতে নির্যাতিত ও শোষিত হওয়ার কাহিনি হরহামেশাই পত্রিকায় ছাপা হয়। এখানে তারা নিমর্ম অর্থনৈতিক শোষণ আর শারীরিক নির্যাতনের হয়েও বসবাস করছে শুধু পেটের তাগিদেই।

কেউ কেউ বাসা বাড়িতে আয়া বা বুয়ার কাজও করে। তাদের ক্ষেত্রেও উল্লে¬খিত বঞ্চনার সংবাদ ভিন্ন আশার বাণী শোনা যায় নি আজ অবধি। তাছাড়া এসব কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় আদিবাসী নারীরা যৌন নির্যাতনেরও শিকার হয়। এসব খবর বেশি মানুষের কাছে জানান দেয় না বা যায় না সামাজিক সম্মানের ভয়ে। ঢাকায় গৃহপরিচারিকার কাজ করতে এসে সতেরো বছরের গারো মেয়ের ধর্ষিতা হওয়ার খবরে আদিবাসী লেখক সঞ্জীব দ্রং লেখেন,‘ বুঝিবা তখনই ধর্ষিতা হয় আমার শুভ্র সুন্দর আদিবাসী গ্রাম,আমার গারো পাহাড় আর সবুজ সবুজ অরণ্য। লাঞ্চিতা হয় সোমেশ্বরী নিতাই তারেং পাহাড়ি নদী।’

 

৩. মূলধারার ধর্মীয় প্রভাবের কারণে

মূলধারার মানুষেরা ধর্মীয় প্রভাব খাটিয়েও আদিবাসী নারীদের নির্যাতন করে। এখানে বিভিন্ন বই-পুস্তকে প্রকাশিত কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করলেই উল্লে¬খিত বক্তব্যের সত্যতা মিলবে। ‘নওগাঁর মহাদেবপুর থানার বড় মহেশপুর-চেরাগপুর এলাকার ৬জন মেয়েকে মুসলমানেরা ভয় দেখিয়ে নিয়ে যায় এবং ফূর্তি করে। পরে ২জন মেয়েকে পাওয়া যায়, কিন্তু ৪ জন মেয়েই  সম্ভবত পাচার  হয়ে যায়।’ বলা হতে থাকে, মূলধারার মানুষ নামের পশুগুলো ধর্মীয় প্রভাব খাটিয়ে আদিবাসী নারীদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে নিজেদের বিকৃত ক্ষুধা নিবৃত্ত করে। যা কিনা অধিকাংশ সময় নিজ ধর্মের নারীর ওপর চালানো সম্ভব হয় না। জয়পুর হাট জেলার পাঁচবিবি থানার গিনিতা মহিপুর গ্রামের একরামুল হক বিহারীর ছেলে এহসানুল শামীমের এমই বিকৃতির শিকার হয়। নাচোলের এক আদিবাসী যুবকের স্ত্রীকে ধর্ষণ করে পাশের গ্রামের এস্তাব আলী গ্রাম্য সালিশে ৯হাজার টাকা জরিমানা দেয়। কিন্তু এস্তাব আলী ঐ আদিবাসী যুবকের কাছে ৩০হাজার টাকা পাওনা আছে বলে জানালে সে সপরিবারে আত্মহত্যা করে।

এ ব্যাপারে পর্যবেক্ষকদের মতামত হলো,  মাত্র ৩০% আদিবাসী নারী সালিসের ন্যায় বিচার পায়। তাছাড়া বেশির ভাগ নির্যাতিতা এ ব্যাপারে মুখ খুলে না বলেই বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতেই কেঁদে মরে। আদিবাসী সমাজে ধর্ষণ শব্দটাই নেই। কারণ ওখানে কোনো ধর্ষক নেই। পাহাড়ে জঙ্গলে আদিবাসী তরুণ-তরুণী হাত ধরা ধরি করে চলাফেরা করে, গান গায়্, নৃত্য করে। কিন্তু কেউ কাউকে অপমান করে না। এমনকী পতিতাবৃত্তিও নেই। এজন্য পতিতা শব্দটিও তাদের কাছে অপরিচিত। তারপরও তাদের নারীরা নিরাপদ থাকছে না। আদিবাসী নারীর কথা বলতে গেলে আদিবাসীদের আপনজন, বহু আনন্দ বেদনার সঙ্গী কল্পনা চাকমাকে ভুলি কী করে? কল্পনা চাকমা আদিবাসী তরুণ-তরুণীর কাছে একটি সংগ্রামের প্রেরণা, পাহাড়ের জুম্মজনগোষ্ঠীর রুদ্ধকণ্ঠ। তাই আজও জুম্মজনগোষ্ঠী ১৬ জুন তারিখ আসলে তাদের প্রিয় স্বজন কল্পনা চাকমার কথা ভেবে  ভেবে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে। আবার ফুঁসে উঠতেও চায়। কল্পনা চাকমা নিজের অর্থনৈতিক অসচ্ছলতাকে অবজ্ঞা করে পার্বত্য জনপদের আদিবাসী লোককুলের বিশেষ করে জুম্ম নারীদের দুঃখ, কষ্টগুলোকে প্রধান করে দেখতেন।এক্ষেত্রেও মূলধারার ধর্মীয় প্রভাবের কারণে কল্পনা চাকমার নিখোঁজ হওয়ার এক যুগ পরেও কোনো কুলকিনারা পাওয়া গেল না।

৪. নারী হওয়ার কারণে

আদিবাসী সমাজ মাতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর ভেতর দিয়ে এগিয়ে চললেও পিতৃতান্ত্রিক আদিবাসী গৃহস্থলি আদিবাসী নারীকে  আরও বেশি নির্যাতন আর বঞ্চনার দিকে এগিয়ে দেয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে এ ধারা কম হলেও সমতল ভূমির আদিবাসীদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক গৃহস্থালিতে নারীর প্রাধান্য লক্ষ্যণীয়। আদিবাসী গবেষক অধ্যাপক  মেসবাহ কামাল, ঈশানী চক্রবর্তী এবং জোবাইদা নাসরীন রংপুর এবং দিনাজপুরে এক গবেষণা জরিপে দেখেছেন,‘সাঁওতাল এবং রাজবংশীদের মধ্যে ৮৯% পুরুষ প্রধান গৃহস্থালি এবং ১১% হলো নারী প্রধান। মাহালীদের মধ্যে নারী প্রধান গৃহস্থালি নেই। ডোমদের মধ্যে ৮১% পুরুষ প্রধান আর নারী প্রধান গৃহস্থালি হলো ১৯% এবং কোচদের মধ্যে ৭১ % পুরুষ প্রধান আর ২৯% নারী প্রধান গৃহস্থালি।

গৃহস্থালি প্রথায় নারী কিংবা পুরুষ প্রধান হলেও  নারীর শ্রমের বোঝা লাঘব হওয়ার মতো কোনো উপায় নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামে দেখেছি, সমতল ভূমিতে দেখেছি, আদিবাসী নারীরা সন্তানকে পিঠের মধ্যে বেঁধে পাহাড়ে কাজে যেতে কিংবা ধান ক্ষেতে রোপা গুজতে। এমন সহজিয়া দৃশ্য যে কোনো আলোকচিত্রীর আকর্ষণীয় সাবজেক্ট হলেও আদিবাসী নারীর চরমতর শারীরিক শ্রমের অনিঃশেষ প্রকাশ।

 

শেষ কথা

জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং লিঙ্গীয় অবস্থান থেকে বহুজাতিক রাষ্ট্র হওয়ার পরও রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের অবহেলার কারণে  প্রান্তিক অবস্থানে থাকার প্রেক্ষিতে আদিবাসী নারীকে বারে বারে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ধর্ষণ শব্দের অর্থ না জেনেও ধর্ষিতা হতে হয়। আদিবাসী সমাজে নারীকে যথেষ্ট সম্মান ও মর্যাদার আসন প্রদান করা হয়েছে। সাঁওতাল সমাজে নারীকে রক্ষাকর্ত্রীরূপে সম্মানিত করা হয়। বিয়ের সময় কন্যার ভাইয়ের জন্য বরপক্ষকে গরু দিতে হয় কন্যাপণ হিসেবে।

ইতিহাসের অপর পৃষ্ঠায় এই আদিবাসী নারীর আলোকোজ্জ্বল ভূমিকা যুগে যুগে স্মরণীয় বরণীয় হয়ে আছে। নিপীড়ন আর নির্যাতনের কথা বলতে বলতে সে সকল উরাধিকারের দিকেও আমাদের তাকাতে হবে শক্তি সঞ্চয়ের প্রত্যয়ে। তেভাগা আন্দোলনে সাঁওতাল নারীর বজ্রকঠোর আওয়াজ ছিল-‘জান দেব তবু ধান দেব না’। সেদিনের সেসব কথা মনে করলে প্রতিবাদের আগুন আপন করোটিতেও জ্বলে উঠবে নিশ্চিত। ভানুবিলের কৃষক বিদ্রোহে মনিপুরী নারীর অবদান এবং  বীরসা মুণ্ডার নেতৃত্বে উলগুলানে মুণ্ডা নারীর বীর গাঁথা আমাদের একাত্তরের বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়। অবশ্য ৭১ এর মুক্তি সংগ্রামেও আদিবাসী নারীদের অবদান অসীম। যদিওবা আমাদের জাত্যাভিমানী ইতিহাসে এসব কথা ঠিকঠাক মতো লিপিবদ্ধ আজও না হলেও একদিন নিশ্চয় হবে। এসব কথা না বলতে না বলতে এখন ওরাও ভুলে যাচ্ছে। আর তাই পাহাড়ে, অরণ্যে জমি চাষের আয়োজনের ফাঁকে ফাঁকে যুবক-যুবতীর অভিসার এখন আর দেখা যায় না, যা কিনা জুম্মজনগোষ্ঠীর জুম সংস্কৃতির অনিবার্য অংশ। তারপরও অরণ্য পাহাড় আদিবাসী নারীদের হাতছানি দেয়। সঞ্জীব দ্রংএর মতো আমারও প্রত্যাশা, আদিবাসী নারী আদিবাসী গ্রামেই বেঁচে থাকুক। মানুষের মতো করেই আদিবাসী হয়েই বেঁচে থাকুক: বেঁেচ থাকার সংগ্রাম করুক। এই সংগ্রামে হোক অতীতের উলগুনানের বীরেরা পথপ্রদর্শক। পাবর্ত্য চট্টগ্রামের জুম্ম নারীরা আবার স্বপ্ন দেখুক। কোনো আদিবাসী নারী কণ্ঠে আর কোনোদিন ধ্বনিত না হোক- খরভব রং হড়ঃ ড়ঁৎং.  শুরু করেছিলাম চাকমা নারীর গীত দিয়ে। শেষও করতে চাই চাকমা নারীর কবিতা দিয়ে। কবিতা চাকমার একটি কাব্যগ্রন্থ ‘জ্বলি ন উধিম কিত্তেই’ (রুখে দাঁড়াবো না কেন) প্রকাশক নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা, প্রকাশকাল ১৯৯২ সাল। কবিতা চাকমা লিখেছেন –

 

জ্বলি ন উধিম কিত্তেই

যিয়ান পরানে কয় সিয়েন গরিবে

বযত্তান বানেবে বিরাণভূমি

ঝারাণ বানেবে মরুভূমি

গাভুর বেলরে সাজ

সরয মিলেরে ভাচ

জ্বলি ন উধিম কিত্তেই

য়িান পরানে কয় সিয়ান গরিবে

জন্মভূমিত মানুচ বন্দী

মিলেরে কিন্যে দাসী বান্দী, পহররে কানা

সৃষ্টিররে রানা।

 

চাকমা কবিতাটির বাংলা অনুবাদ হলো-

রুখে দাঁড়াবো না কেন

যা ইচ্ছে তাই করবে

বসত বিরানভূমি

নিবিড় অরণ্য মরুভূমি সকালকে সন্ধ্যা

ফলবতীকে বন্ধ্যা

রুখে দাঁড়াবো না কেন

যা ইচ্ছে তাই করবে

জন্মভূমে পরবাসী

নারীকে ক্রিতদাসী

দৃষ্টিকে অন্ধ

সৃষ্টিকে বন্ধ।

 

তথ্যসূত্র

১. মেসবাহ কামাল, ঈশানী চক্রবর্তী, জোবাইদা নাসরীন : নিজভূমে পরবাসী উত্তরবঙ্গের আদিবাসীর প্রান্তিকতা ডিসকোর্স

২. সঞ্জীব দ্রং : বাংলাদেশের বিপন্ন আদিবাসী।

 

কুমার প্রীতীশ বল : নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক

চট্টগ্রাম

বিশ্ব নারী দিবসের পুনর্পাঠ : বহুমাত্রিক নারীর নতুন ভাষ্য

শাহেদ কায়েস   নারীর ইতিহাস কোনো একরৈখিক অগ্রযাত্রা নয়—তা বহু পথে বয়ে চলা নদীর মতো, যেখানে সংগ্রাম, প্রেম, প্রতিরোধ, রাজনীতি, শ্রম, মাতৃত্ব, শিল্প, দর্শন ও

আন্দরকিল্লার ইফতার অনুষ্ঠানে সুধীজনদের অভিমত বাঙালি জাতিসত্তা ও মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনার চিহ্নটিই অনির্বাণ অস্তিত্বের প্রতীক

আন্দরকিল্লা ডেক্স : শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজভাবনামূলক কাগজ ‘আন্দরকিল্লা’র ইফতার আয়োজনে সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল আবসার তাঁর স্বাগত বক্তব্যে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, আন্দরকিল্লা কোনো বলয়বদ্ধ সীমানায়

প্রথা ভেঙে বেরিয়ে এসো নারী  

গৌতম কুমার রায় বিংশ শতাব্দী বিদায় হওয়ার পরে এসেছে একবিংশ শতাব্দী। বিজ্ঞান এগিয়েছে। সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়েছে পুরুষ। কিন্তু নারী ! শুধু পিছিয়েছে নারী। কেন

আদিবাসী নারী

কুমার প্রীতীশ বল   ‘হৈ হৈ হৈ জুমত  যেবং. জুমে যেইনে গচ্ছা সুদা তুলিবং. গচ্ছা সুদা তুলি নেই টেঙ্গা কামেবং।’ চাকমা এই গানটির বাংলা অনুবাদ

মহাশ্বেতা দেবী: দর্শন, সাহিত্য ও সমাজচেতনার প্রতিফলন

রওশন রুবী   মহাশ্বেতা দেবী উপমহাদেশের একজন শক্তিমান ও প্রখ্যাত লেখক। তাঁর শতবর্ষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাহিত্য শব্দের সীমা অতিক্রম করে মানবতার গভীর নৈতিক শক্তিতে