ওমর কায়সার
ঝুরঝুরাইয়া ঝুরঝুরাইয়া
ন-অ আইস্য ঝড়
মা-রে বনবাস দিই
ফুত যক ঘর
ছড়াটি আমার মায়ের মুখে শোনা। কতবার যে শুনেছি তার ইয়ত্তা নেই। শুধু এই ছড়া নয় আমার শৈশব থেকে মায়ের মৃত্যুর দুয়েকদিন আগেও তার মুখে ছড়া শুনেছি। ছড়াগুলোর প্রায় প্রতিটিতে একটা করে গল্প থাকত। বলত তার বেশির ভাগের একটা গল্প থাকত। আমাকে কাছে পেলে গল্প শুরু করত । প্রথমে পদ্য বলত। তারপর সেই ছন্দোবদ্ধ লাইনগুলো কোন্ প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে তার একটি ব্যাখ্যা দিত। সেই ব্যাখ্যাটাই গল্প। ছড়াটি পৃথিবীর যে কোনো ভাষার চিরায়ত লোকছড়ার সমতুল্য। মায়ের মুখ থেকে শোনা অনেক গল্পে আর ছড়ার মধ্যে এই ছড়াটি তুলে ধরছি। চোখ ভেজানো এই গল্পটি এক নারীর, এক দুখিনি মায়ের। গল্পের ছড়াটি আবার পড়ি।
ঝুরঝুরাইয়া ঝুরঝুরাইয়া
ন-অ আইস্য ঝড়
মা-রে বনবাস দিই
ফুত যক ঘর
(ঝুরঝুর ঝুরঝুর করে
এসো না তুমি ঝড়
মাকে বনবাস দিয়ে
ছেলে যাক ঘর)
মায়ের কেন আকুতি ঝড়ের প্রতি। গল্পটা শোনা যাক।
জয়তুন বিধবা। একটি মাত্র ছেলে। ছেলেকে বড় কষ্টে লালন করেছে। লেখাপড়া শিখিয়েছে। বিয়ে করেছে। ছেলের সংসার হয়েছে। এ বড় সুখের খবর। কিন্তু দিন দিন ছেলের ব্যস্ততা যত বাড়ছে ততই মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। দূরত্বটা ক্রমশ বাড়ছে। আগের মতো ছেলে তার মায়ের কাছে আসে না। ছেলের বউ কৌশলে শাশুড়িকে তার ছেলের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। কাছে ঘেষার সুযোগ দেয় না। একদিন ছেলে বাজার থেকে বড় মাছ নিয়ে আসে। দেখে মা খুব খুশি। মাছের মুড়োটা খেতে বড় সাধ হয়। ছেলের বউয়ের কাছে গিয়ে বলে— ও বউ, কতদিন মাছের মাথা খাইনি। আজ মাছের মাথাটা খেতে দিস।
বউ বলল— ওমা! এ কেমন কথা? মাছের মাথা খাবেন, তাতে অসুবিধা কি? আপনি খাবেন না তো কে খাবে? সবাই যখন খেতে বসব তখন আপনি শুধু একটু মনে করিয়ে দেবেন।
জয়তুন বলল— না না, ছেলের সামনে বলতে পারব না। লজ্জা লাগে।
শাশুড়ির লজ্জার কথা শুনে বউ হাসল। তারপর বলল— নিজের ছেলেকে লজ্জা পান, অথচ আমি পরের মেয়ে, আমাকে লজ্জা পেলেন না? আচ্ছা ঠিক আছে, মাছের কথা বলতে হবে না, আপনি শুধু খাওয়ার সময় বলবেন- ওই। ওই বললেই বুঝব আপনি মাছের মুড়োর কথা জানাচ্ছেন।
রাতে সবাই খেতে বসেছে। জয়তুন বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ও বউ, ওই । মনে আছে?
ছেলে তা শুনল। বউয়ের কাছে জানতে চায়- আমার মা কী বলে?
বউ ছেলের কানে কানে বলল, মা লজ্জায় বলতে পারছেন না, তাই আমাকে বলতে বলেছেন। তার নাকি একা একা আর ভালো লাগে না। একটি বিয়ে করতে চান।
এ কথা শুনে ছেলে অবাক হয়ে বলল, কী, এত বড় কথা! মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রচণ্ড ঘৃণায় ছেলে বলে উঠল, তোমার এতটুকু লজ্জা করল না মা? এ কথা তুমি বলতে পারলে? এই বয়সে। আমি আর তোমাকে এই ঘরে রাখব না। তোমার মতো মাকে বনবাসে দেওয়া উচিত।
তারপর দিন ছেলে মায়ের চোখ বেঁধে জোর করে নিয়ে গেল বনের মধ্যে।বনে মাকে রেখে আসার সময় আকাশে মেঘ দেখা দিল। বাতাস বইতে শুরু করলে। বৃষ্টি নামবে, ঝড় আসবে— এরকম একটা পরিস্থিতি। মায়ের বড় চিন্তা হলো। মনে মনে বলল— এই ঝড় জলের মধ্যে ছেলে আমার ঘরে যাবে কী করে? তাই ঝড়ের কাছে মায়ের আবেদন। হে ঝড়। তুমি এখন ঝুর ঝুর করে নেমে এসো না। আমার ছেলেটি তার মাকে বনবাস দিয়ে আগে ঘরে ফিরে যাক। তারপর না হয় এসো।
এরকম কত হৃদয় নিংড়ানো দুঃখের গল্প মায়ের কাছ থেকে শুনেছি। হাসির গল্পও কম নয়। কিন্তু সেইসব গল্প ছড়ার মধ্যে নিখুঁতভাবে সমাজের বাস্তবতাটা উঠে আসত। বিশেষ করে পুরুষশাসিত সমাজ নারীদের বঞ্চনার কথা বিবৃত হতো।
একটি হঁলা (এক ধরনের চাঁটগাইয়া গীত) শোনাত মা। এটি এক নববধূর আহাজারি। মা বাবা তাকে বিয়ে দিয়েছে নদীর ওপারে। বহুদিন তার মা বাপের সঙ্গে যোগাযোগ নাই।
দইরগার কুলত কড়ই গাছছো
বাতাস আইলে গুজুরে
মায়ে বাপে বিয়ে দিল দইজ্জার পুককুলে
আইসতো চাইলে আইত নঅ পারি
যাইতো চাইলে যাইন নঅ ফারি
লাওয়া বাপে বিয়া দিল দুইজ্জার পুককুলে
ঘাটর আগাত ডালিম গাছছো
লটকি পড়ের আগা
কন পুড়লি দেহাই দিলি
মুই পুড়লির ঘাডা।
( দরিয়ার কুলে হাওয়া এলে শিরিষ গাছটা কেঁদে ওঠে। মা বাবা আমাকে বিয়ে দিল দরিয়ার পূর্ব তীরে। আসতে যদি চায় কেউ আসতে পারে না। যেতে যদি চাই, যেতে পারি না। আমার সৎ বাবা আমাকে বিয়ে দিল দরিয়ার পূর্ব কূলে। ঘাটের কাছে ডালিমের গাছটি কেমন নুইয়ে পড়েছে। কোন্ পোড়া কপালী আমার মতো পোড়া কপালীর বাড়ি দেখিয়ে দিয়েছিল। )
আরেকটি ভাগ্যবিড়ম্বিত পিতৃমাতৃহীন এক মেয়ের গল্প শুনেছি মায়ের কাছে। গল্পে কিছুটা জাদুবাস্তবতার আভাস আছে। শিশুকালে মেয়েটি বাবার কাছে বায়না ধরেছে — আকাশের চাঁদটি তার চাই। কন্যাস্নেহে অন্ধ বাবা মেয়ের আবদার রক্ষা করতে গিয়ে মই বেয়ে চাঁদ ধরতে গিয়ে মারা যায়। স্বামীর মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে মেয়েটির মাও মারা যায় কদিন পর। মেয়েটি মানুষ হতে থাকে ছয় ভাইয়ের সংসারে। ভাইয়েরা বাণিজ্যের জন্য দেশের বাইরে গেলে তাদের বউরা একদিন এক জেলের কাছে সামান্য মাছের বিনিময়ে ননদকে বিক্রি করে দেয়। জেলের ঘরে বসে বসে তখন মেয়েটি এভাবে নিজের নিয়তির কথা বলে।
বাপ মরিছে চান পরানে
মা মরিচে শোকে
ছয় বউজে বেচি খাইল
বাডা মাছর লোভে।
ছয় বউজের আসঝাস
বইনেরে দিল বনবাস
(চাঁদ আনতে গিয়ে বাবা মরেছে। মা মরেছে শোকে। ছয় ভাবি আমাকে বিক্রি করে দিল বাটা মাছের লোভে। ছয় ভাবীর নির্যাতনে বোন আজ নির্বাসিত দিন কাটাচ্ছে।)
নিজে নারী বলেই হয়তো তার মুখ দিয়ে নারীর বেদনার কথাগুলো এমন সাহিত্যের রূপ ধরে বের হতো। ২০২২ সালে করোনায় তিনদিন হাসপাতালে ছিলেন। চতুর্থ দিন ছিল ২২ শে শ্রাবণ। সেদিনই মা চলে যায়। বাবা মারা গিয়েছিল ২০০১ সালে। ২১ বছর বাবার নানা স্মৃতি বুকে নিয়ে সংসারের আমাদের ভিড়ের মধ্যে নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছে। আমার দাদিও দীর্ঘ ৩৪ বছর এরকম দিন কাটিয়েছে। দাদাকে আমি দেখিনি। আমার জন্মের বছর দাদা মারা গেছেন। তারপর আমার বয়স যখন ৩৪ তখন দাদির জীবনাবসান ঘটে। এরকম নিঃসঙ্গ অনেক নারীকে আমার দেখতে হয়েছে এ জীবনে। সংসারে দেখেছি স্ত্রী মারা যাওয়ার পর স্বামীরা বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করে। কিন্তু বেশির ভাগ নারীকে দেখেছি মৃত স্বামীর স্মৃতিকে ঘিরে রয়ে যায়। তারপর উত্তরসূরিদের সংসারের ভিড়ে হারিয়ে যায়। আরেকজন মায়ের কথা মনে পড়ছে এখন। আমার বন্ধুর মা। তার নাম আকতার। আমার সঙ্গে পড়ত। তার বাবা ছিল না। আমার সঙ্গে ঘুরত। আমি ছিলাম শান্ত। ও ছিল অশান্ত। আমি ছিলাম খেলায় দুধভাত, ও ছিল সামনে সারির সৈনিক। ওর ডাংগুলির বাট কতজনকে আঘাত করেছে তার ইয়ত্তা নেই। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত গ্রাম থেকে আমি শহরে চলে যাই। আমার শহরে যাওয়াটা সে মেনে নেয়নি। যখন বেড়াতে আসতাম, তখন সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত, অচেনা কোনো মানুষের মতো আচরণ করতো।
একবার ঈদে কোথাও আকতারকে না দেখে তার ঘরে গিয়েছিলাম। দেখি সে বিছানায় শুয়ে। ওর মা আমাকে জড়িয়ে ধরে অঝোর নয়নে কাঁদল। তারপর শোনাল তার বিছানায় শুয়ে থাকার পটভূমি। নতুন নতুন সাইকেল চালানো শিখেছে সে। ভাড়া করা সাইকেল নিয়ে দিনরাত চষে বেড়াচ্ছে গ্রামের রাস্তাঘাট। দুঃসাহসী ছেলে। কিছুই পরোয়া করে না। কাউকে মানে না। বাবা হারা এক ছেলে হলে নাকি এরকমই হয়। ওরা বেশি বারণ মানে না। আকতারও এরকম। ওর কোনও ভাই নেই। একটা বোন আছে। কাঁচারাস্তার গণ্ডি পেরিয়ে সাইকেল চালাতে সে গিয়েছিল গ্রাম পেরিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে। সাইকেলসহ তাকে চাপা দিয়েছে একটি ট্রাক। পাকা রাস্তায় সাইকেল চালানোর মজা বুঝতে গিয়ে মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলেছে। ওর মা বিলাপ করে করে বলল, আঁর ফোয়ার মাজা ভাঙি গেইয়েগুই।আত্তে তো টেয়া পইসা নাই, তোর বাপর টেয়া দি চিকিৎসা গড়ির। (আমার ছেলের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। আমার তো টাকা পয়সা নেই, তোমার বাবাই চিকিৎসা চালাচ্ছে।) আমি অবাক হলাম। আমি আমার বন্ধুর শয্যায় গিয়ে পাশে বসলাম। তার মুখখানি সাদা, শুকনো। আমাকে বলল, সবাই ঈদের দিনে কত মজা করছে, নতুন কাপড় পরে ঘুরছে, টাকা তুলছে। অথচ আমি বিছানায় গুঁইসাপের মতো গড়াচ্ছি। কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাওয়ার কারণে আমাকে না দেখে মাঠ, পুকুর ঘাট এবং তার বুকটা যে খালি খালি লাগে তার এক আশ্চর্য বয়ান তিনি দিলেন। আমি অনড়, স্থবিরের মতো বসে থাকলাম বন্ধু আকতারের পাশে। সে উঠে বসতে পারে না, হাতদুটো নড়াচড়া করতে পারে। দুটো হাত দিয়ে আমাকে ধরে বলল, ভালো হয়ে গেলে তোকে আমি সাইকেল চালানো শেখাবো। দুই চোখের কোণা দিয়ে পানি ঝরছে, সেগুলো গড়িয়ে পড়ছে তার কানের ওপর। এ কথা শুনে তার মা রেগে গিয়ে বলল, ওরে আর ফঅল পোয়ারে….. আইজু সাইকল সপ্পনত দেহত দে… ( ওরে আমার পাগল ছেলে, এখনও সাইকেলের স্বপ্ন দেখছিস) । পরের বছর ঈদে গিয়ে আকতারকে আর ওই অবস্থায় দেখতে হয়নি। কারণ সে ঈদ আসার আগেই পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। এরপর থেকে প্রতিবার আমার জীবনে ঈদ আসে এক শোকাতুর মায়ের আহাজারির ভেতর দিয়ে।
আকতারদের ঘরে পাশে আরেক চাচির ঘর। ওদের ঘর থেকে বের হয়ে আমি যাই তাদের ঘরে। তাঁর দুই ছেলে। এক ছেলে আমার শ্রেণিসঙ্গী। আমাকে দেখেই চাচি বললেন, পড়ালেখার উন্নতির জন্য তোর বাবা তোকে শহরে নিয়ে গেছে। আমারটাকে কে দেখবে? সে পড়লেও কেউ দেখার নাই, না পড়লেও দেখার নাই, সে খেল কী খেল না, মরল কী বাঁচল সেটাও তো কারও দেখার নেই। আমার সেই শ্রেণিসঙ্গীটির নাম জুনু। জুনুর বাবা একটি ইটভাটায় চাকরি করত। ১৯৭১ সালে একদিন কাজের সময় সেখানে কয়েকজন পাকিস্তানি সৈন্য আসে। তারা জুনুর বাবাকে বলল, গাছ থেকে ডাব পেড়ে খাওয়াতে। নারকেল গাছে চড়ার অভ্যাস তাঁর ছিল না। তিনি বয়স্ক মানুষ। তারপরও মিলিটারিদের ভয়ে বহু কষ্টে গাছে উঠে ডাব পাড়লেন। সেগুলো কেটে দশ বারোজন পাকি সৈন্যকে খাওয়ালেন, ওরা খেয়ে বেশ তৃপ্ত হয়ে জুনুর বাবাকে বলল, তুমি এবার বাড়ি চলে যাও। জুনুর বাবা বলল, আমার তো এখানে কাজ আছে। ওরা বলল, না তুমি এখনি বাড়ি যাবে। কথা না বাড়িয়ে তিনি হাঁটতে লাগলেন। পেছন থেকে তার বাড়ি যাওয়া দেখতে দেখতে পাকি সৈন্যরা গুলি করে তাকে ঝাঝরা করে দিল। একাত্তরের শহীদ জায়া আমার এই চাচিটি ভুলতে পারতেন না তার স্বামীর কথা। তিনি উৎসবের দিনে ঘরের দাওয়ায় বসে বিলাপ ধরতে থাকেন।
জুনুদের ঘরের পাশে আমার এক ছোট দাদির ঘর। আমার বাবাদের চাচি। খুব ছোটবেলায় এই দাদা মারা গেছেন। এই দাদার দুই ছেলে। ইসমাইল চাচা আর জাফর চাচা। ইসমাইল চাচার দুই ছেলে এক মেয়ে। এক দিনের ঘটনা, আমি তখনো শহরে যাইনি। অনেক রাতে কুপি জ্বালিয়ে আমাদের ঘরের সামনে কে যেন এল। তাড়াহুড়ো করে মায়েরা ঘর থেকে বের হয়ে ছোট দাদির ঘরে গেল। কিছুক্ষণ পর ওখান থেকে রাত্রির নির্জনতা ভাঙা চিৎকার, কান্নাকাটি ভেসে এল। ইসমাইল চাচাকে কারা যেন তাবিজ করে বান মেরেছে। বুকে তার প্রচণ্ড ব্যথা। ঘামতে ঘামতে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। এসব ঘটনা ঘটার সময় আমার মনে তেমন কোনও দাগ কাটেনি। কিন্তু একটু বড় হয়ে আমি যখন শহর থেকে বাড়িতে আসি, তখন বাড়ির মানুষগুলোকে, পরিবারগুলোকে একটু দূর থেকে দেখার অবকাশ পাই। আমি স্পর্শ করতে পারি তাদের ভেতরের কান্নাগুলোকে। একই ছাদের নিচে দুই প্রজন্মের দুই বিধবা মহিলার হাহাকার আমাকে কেমন যেন করে ফেলত। এই ঘটনার বেশ কবছর পর ইসমাইল চাচার একটা মেয়ের সম্মন্ধ আসে। বিয়ে দেওয়া হয়। স্বামী বয়স্ক। অসুস্থ। কিন্তু সংসারের খরচ কমাতে সেই অল্প বয়েসী মেয়েটিকে তার সঙ্গেই বিয়ে দেওয়া হয়। তিন বছর পর স্বামী মারা গেলে মেয়েটি বিধবা হয়ে ঘরে ফিরে আসে। একই ছাদের নিচে তিন প্রজন্মের তিনজন বিধবা মেয়ের বসবাস আমি দেখেছি। আমি তখন ভাবতাম আমাদের গ্রামটা কত বড়, সেই গ্রামের একটি বাড়িতে, কিছু জায়গা জুড়ে নারীদের এত দুঃখ, না জানি পুরো গ্রামের কত কষ্ট, আর যদি পুরো দেশটার কথা বলি তখন ব্যাপারটা ভাবা আমার সেই বয়সে কঠিন ছিল।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাকে যতই দেখছি ততই অবাক হতাম। দুঃখের সঙ্গে থাকতে থাকতে তারা কত অভ্যস্ত। কিন্তু আশ্চর্য জীবনী শক্তি ছিল আমার মায়ের। করোনার দিনগুলোতে যখন ঘরে বসে অফিস করতাম। তখন মায়ের কাছাকাছি থাকতাম। ঘরের কার্যালয়ে আমাকে প্রায় বিরতিহীন দৃষ্টি সীমার মধ্যে আগলে রাখত একটি অবুঝ শিশু। আমি কী করি তা বুঝতে চায়, আমি কী বলি তা শুনতে চায়, আমার ভাবনার নৈকট্য পেতে চায়। সেই শিশুটি ছিল কৌতূহলী মা। মাটি চৌচির করা বৈশাখের তীব্র তাপদাহ। একটু আগে বিদ্যুৎ চলে গেছে। আমি উদ্বেগের মধ্যে আছি। কখন বিদ্যুৎ আসবে। এর মধ্যে ল্যাপটপের ব্যাকুআপ পাব কিনা। যে প্রতিবেদনটি নিয়ে কাজ করছি সেটা শেষ করতে পারব তো? এসব জিজ্ঞাসা আমি মুখে উচ্চারণ করিনি। তবে দুশ্চিন্তাগুলো অজান্তে কপালের ভাঁজে আঁকা হয়ে গেছে। সেটা দেখেই মা জেনে ফেলে। ছেলের উদ্বেগ দেখে মায়ের হাঁসফাঁস বাড়ে। মা বলে, ‘অ পুত, ধইরয নঅ হারাইছ। বেয়াগ্গুন ঠিক অই যাইবু। (বাবারে ধৈর্য্য হারাসনে। সব ঠিক হয়ে যাবে।)’ অগত্যা আমি দুর্ভাবনাকে গিলে ফেলি। মুখের হাসিকে প্রসারিত করি। কেননা আমি জানি ৮৭ বছরের ডায়াবেটিক আর হাইপারটেনশনের রোগীটি আমাকে ধৈর্য্য ধরতে বললেও ছেলের ন্যূনতম কষ্টে সে অধৈর্য্য হয়ে পড়বে। অসুস্থ হয়ে পড়বে। মাকে বলি, ‘মা রোজা রাখছ, তুমি ক্লান্ত, একটু শুয়ে থাকো।’ মা সামনের ছোট খাটটাতে আমার মুখোমুখি হয়ে বসে থাকে।
বিদ্যুৎ আসেনি। আমার ক্ষীণপ্রাণ ল্যাপটপটি শেষবিন্দু আলো জ্বালিয়ে নিভে গেল। এখন কিছুই করার নেই। আমি তাই বয়স্কা শিশুটির পাশে বসি। তখন তার মনের পুলকটা দলপ্রহরের মতো ভেসে ওঠে মুখে।কত কথা শোনায় আমাকে। আমাকে তার শিশুকালে নিয়ে যায়। ৪৭ এ দেশভাগের আগে। আসামের কোনো এক পাহাড়ের পাদদেশে। ওখানেই তার বাবার কাজ। কোম্পানির কাজ।
— কোন্ কোম্পানি মা?
— ইয়ানতো আঁই নঅ জানি। কুম্পানির আবার নাম অয় না?
(কোম্পানির নাম তো জানি না। কোম্পানির আবার নাম হয় নাকি? )
মা বলে— আঁর বাপ, তোর ডইক্কা লিখতু। আরা দিন হাগজ-হলম ঘাইটত। (আমার বাবা তোর মতো লিখত। সারা দিন কাগজকলম নিয়ে থাকত।)
আমি নাকি নানার স্বভাব পেয়েছি।
আমি বলি — তোমার বাবাতো সাংবাদিক ছিল না। তাহলে আমার মতো হলো কী করে?
আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে মায়ের বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। নিজে নিজে চোখ মোছে। দৃষ্টি তার ঝাপসা হয়ে আসে। সে জানায় — সারা দিন অফিসের পর আমার নানা পাড়ায় আসর বসাতো। গানের আসর। সে গানের সুর ছিল মন পাগল করা। পাড়া প্রতিবেশীরা নাকি আমার নানার গান শুনে বলত — বাপের বেটা তোর জন্মই সার্থক।
গানের আসরগুলোতে ম্ওা কি থাকত? স্ওে কি শুনত নানার গ্ওায়া গান? আমি জানতে চাই।
— থাইকতাম তো। আঁত্তে বেশি বেশি ভালা লাইগতু। তই মাঝে মাঝে আঁরে ইতারা পাডাই দিত।
(থাকতাম তো। আমার খুউব ভালো লাগত। তো আবার মাঝে মাঝে আমাকে পাঠিয়ে দিত ঘরে।)
মা জানায়, আমার নানা গান বানাতো, গাইতো, সেই গান শুনে মাতোয়ারা হতো শ্রোতারা।
মায়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হতো। নইলে মন খারাপ করত। আর তাতে যদি সাড়া দিয়ে হ্যাঁ, হু না করি তাতে তার অভিমান হতো। আর যদি পাল্টা কোনো কিছু জানতে চাই তখন মহাখুশি। নানার গানের এইসব গল্প বহুবার শোনা। গানগুল্ওো প্রায় মুখস্থ। তারপরও মাকে বলি তার বাবার একটা গান গাইতে। বয়সের কারণে কণ্ঠ বসে গেছে, সুর হারিয়ে ফেলেছে। তবু সেই হারানো সুরে মা গান ধরে।
শ্যাম বন্ধুয়ার ভাবেতে
শ্যাম বন্ধুয়ার ভাবেতে
পারলাম নারে ও সজনি কূল রাখিতে।
আমি বলি — ওমা, এটা তো তোমার বাবার গান না। এটাতো সবাই জানে।
মা বলে — কী জানি।হন্ গান তোর নানা বানাইয়ি কেনে হইয়ুম। (কোন্ গানটা তোর নানা বানাল তা কেমন করে বলব )
তারপর কিছুক্ষণ স্মৃতি হাতড়ে আবার শুরু করে আমার মা।
মনচোরারে টার নফাইলাম
হত্তে ঘাটত সাম্পান ভিড়াইলি
যাইতে য্ইাতে ঢেউয়ের বুকত
কেনে আবার মুখখান ফিরাইলি।
(মনচোরা গো টের পেলাম না
কখন ঘাটে সাম্পান ভিড়াইলি
যাইতে যাইতে ঢেউয়ের বুকে
কেন রে আবার মুখটা ফিরাইলি )
বার বার অবাক হয়ে শুনি মায়ের মুখে তার বাবার গান। মাকে জড়িয়ে ধরি। এই তীব্র গরমে বুকের ভেতর একটা শান্ত নির্জন নদী বয়ে চলে গেল। আমি যেন স্নান সেরে শীতল হলাম।
আমার ফোন আসে। ঢাকা থেকে সহকর্মীর ফোন। তাঁর সঙ্গে দিনের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলি। চট্টগ্রামের করোনা পরিস্থিতি এখন কোন পর্যায়ে তা অবহিত করি তাঁকে। আর এইসব কথা গভীর মনযোগ দিয়ে মা শোনে। আমার ফোনালাপ শেষে মা জানতে চায় — ওটা কার ফোন ছিল?
অমুক ভাই? তমুক ভাই? ম্ওা এঁদেরকে ভাই বলে কেন সম্বোধন করত? আমার কাছে এই মানুষগুলোর গুরুত্বটা কতো মা নিজে নিজেই তার শক্তির জোরে বুঝেছে। কীভাবে বুঝেছে আমি জানি না।
আমার সব বন্ধুর নাম, অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে তার ধারণা আছে। প্রায় সময় তাদের খোঁজ খবর নেবে। মায়ের কৌতুহলের শেষ নেই। আমার তাই তাঁর কৌতূহল নিয়ে আগ্রহ নেই। আমি অপেক্ষা করি বিদ্যুৎ কখন আসবে। এক সময় বিদ্যুৎ আসে। আমি কাজে ঢুকে পড়ি। মাকে এমন ভাব দেখাই যেন আমার কাজের খুব ঝামেলা ু কিছুতেই সামলে উঠতে পারছি না। মা চুপ হয়ে যায়। আমার দিকে তাকাতে তাকাতে একসময় তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। নিজে নিজে শুয়ে পড়ে।
আমি ঘুমন্ত মায়ের সামনে বসে কাজ করি। কিন্তু স্বস্তি নেই। কবে শেষ হবে এই দুঃসহ মহামারির কাল। কবে সারা বিশ্ব মুক্তি পাবে। এক সময় একটা দিন ছুটির জন্য কেমন অস্থির হয়ে যেতাম। আজ কতদিন ছুটির মতো ঘরে বসে দিন কাটাচ্ছি। অথচ এই ছুটিটাই যেন বুকের ওপর পাথরের মতো চেপে বসেছে।
আমার মা বলত, অ পুত, উধা ভাডা নয়, জোয়ারও আছে, অঁস্য নয়, পূর্ণিমাও আইয়ি। বাতাসত আগুন ছোডের, মেডি কাঁদের তিয়াসে। অ্যান সমত কান দিয়িরে উনিবি আসমান গুজরার। আসমান গুজরার।
(ও বাচা, শুধু ভাটা নয়, জোয়ারও আছে, অমাবস্যা নয়, পূর্ণিমাও আসে। যখন বাতাসে আগুন ছোটে, মাটি কাঁদে তৃষ্ণায়। তখন কান পেতে শুনতে পাবি আকাশ গর্জন করছে।)
ওমর কায়সার, কবি, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক
চট্টগ্রাম

