যে দেশে মানুষ অন্ধ
আসাদ মান্নান
না, আর হলো না দেখা সোনালী যুগের ওই নদী —
যে নদী পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে যায়
ফসলের মাঠে আর চুল খোলা বধূটির খাটে|
না, আর হলো না ফেরা সুফি রবীন্দ্রনাথের গানে —
যে গানে ধানের শীষে সুর তুলে দক্ষিণা হাওয়া
ঘরে ঘরে জনে জনে বিলি করে নবান্নের ঘ্রাণ|
না, আর হলো না গান বসন্তের সবুজ জোছনার;
যে জোছনার আলো মাখা অন্ধকারে নীরবে দাঁড়িয়ে
‘ও আমার দেশের মাটি! তোমার পরে ঠেকাই মাথা ‘
প্রাণ খুলে গলা ছেড়ে এই প্রিয় গান গাইতে গাইতে
আবার নতুন আলো চোখে জ্বেলে কবরখানার
ভুতুড়ে গ্রামীণ পথে বাড়ি ফিরে মায়ের আঁচলে
পরম নিশ্চিন্তে শুয়ে নিরাপদে একদিন ঠিকই
পৌঁছে যাবো নাম গোত্র বর্ণহীন শান্তির বাড়িতে|
না, আর তোমার জন্য লিখতে গিয়ে প্রেমের কবিতা
আমি কি বোকার মতো প্রশ্ন লিখে এমন ভাষায় —
যে দেশে মানুষ অন্ধ সেই দেশে সূর্য কেন ওঠে,
মানুষ কিসের টানে ঘর ছেড়ে বেশ্যালয়ে ছোটে,
অন্ধ কেন অন্ধকারে লাঠি হাতে বৃন্দাবনে যায় ?
জেলে গিয়ে লিখতে যাবো আমার না লেখা সেই অসমাপ্ত
আত্মকথা খোলা চিঠি কয়েদির ¯^প্নের বচন!
আমার হলো না আর পথে নেমে তোমাকে পাওয়া,
যে তুমি রক্তের দেশ তক্ত দোষে নিরুদ্দেশে হাওয়া
==============================
ডেয়ারিং
জিললুর রহমান
টিএসসি বা শাহবাগে তারুণ্যের জমেছে রাগটা
গড়িয়ে গড়িয়ে চলে পিচ-ঢালা নির্মোহ পথটা
গড়াতে গড়াতে ছোটে লুলা ভিখারির গাড়ির বেয়ারিং
রাজপথ কিন্তু ডেয়ারিং
লাফাতে লাফাতে যায় লাল বল নীল বল স¤^ল ক¤^ল
যুবতীরা অথবা যুবক যারা বহুদূর হেঁটে হৃতবল
কোথাও সরব চলে সহিংস লিঞ্চিং
যুথবদ্ধ কিন্তু ডেয়ারিং
বিকেলের মায়ারোদে ব্যালকনি ফ্যালফ্যাল
এসময়ে ক্রিং ক্রিং বেজে ওঠে ডোর বেল
চিঠি আসে পোস্টাপিস থেকে বেয়ারিং
পত্রদাতা কিন্তু ডেয়ারিং
টাকশাল টাকা ছাপে টাকা বাড়ে ক্ষমতার যেরকম সখ
কেবল ছাপে না কেউ নুন তেল গোবাছুর মুরগি শাবক
চারদিকে মূল্য মুদ্রা সবই বেশ স্ফীত ইদানীং
অর্থ কিন্তু ডেয়ারিং
বিপদের ছায়াটাকে যতই রাখি না ঢেকে
মায়াবতী জেনে যায় আকাশ ঢেকেছে মেঘে
মমতা ছড়িয়ে তুমি কাছে টানো বড় বেশি কেয়ারিং
তোমরা কিন্তু ডেয়ারিং
ঘরে ঘরে তেলাপোকা, মানব সন্তান বাড়ে
খেয়ে বা না খেয়ে এই রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে
আধশোয়া বিছানায় ‘গডস অব স্মল থিংস’ ওয়েটিং ওয়েটিং
প্রভুগণ কিন্তু ডেয়ারিং
মহাস্থানগড় থেকে উয়ারি বটেশ্বরের ভিটে
প্রজন্ম ছুটেছে শেরে বাংলা নগরের দিকে
অপলক চেয়ে থাকি তোমার কানের ছোট ইয়াররিং
তুমিও ভীষণ ডেয়ারিং
==============================
আদিম ব্যাধের গান
সালিম সাবরিন
শহরের এই বিষণ্ন ফুটপাতে আর খুঁজো না আমাকে!
আমি তো সেখানে নেই, যেখানে ট্রাম- বাস আর ইটের পাঁজর|
আমি তো রয়ে গেছি সেই মহুয়ার বনে,
যেখানে ˆজষ্ঠ্যের দুপুরে রক্তমাখা পলাশ ঝরে পড়ে-
ঠিক যেন এক আহত হরিণের নাভি কস্তুরি|
শুনে রাখো,আমি সেই আদিম ব্যাধ-
হাতে আমার ধনুক নাই ঠিকই, কিন্তু তূণে ভরা বিষণ&নতা আছে|
আমি যখন হাঁটি, পিচগলা রাস্তা ফেটে ঘাস বেরোয়,
আমি যখন কথা বলি,তোমাদের ড্রয়িংরুমে ঝর্ণা নামে|
তোমরা আমাকে ভদ্রলোক সাজিয়ে ড্রয়িংরুমে বসিয়েছো-
অথচ আমার বুকের খাঁচায় এখনো একটি বুনোবাঘ গর্জন করে|
ফিরে যাবো,ঠিকই ফিরে যাবো সেই ছায়ায়,
যেখানে অন্ধকার ধুয়েমুছে শ্বেতচন্দন হয়ে যায়|
আমার কোনো দেশ নেই, কোনো ঘর নেই –
আছে কেবল এক আদিম তৃষ্ণা –
যা নেভাতে গেলে আগুনের কাছেই হাত পাততে হয়|
তোমরা যাকে সভ্যতা বলো,আমি তাকে বলি খাঁচা,
আর তোমরা যাকে পাগল বলো-
সে আসলে একলা বনের নির্জনতায় শিস দিচ্ছে|
আমি যাচ্ছি- আমার পেছনে পড়ে থাকল-
তোমাদের এই হিংসাযুে&দ্ধর ঝকঝকে শ্মশান|
==============================
বৃষ্টিবিজড়িত
মাসুদ মুস্তাফিজ
বৃষ্টির নন্দনতত্ত্বের পাঠ শেষে ফিরে আসি ঘরে
পকেট ভর্তিমেঘ রোদে পোড়ে ভাষাশাস্ত্রের আবেগের ঘাম
ˆচতালি হৃদপিন্ডে ঢুকে বৃষ্টি ফোটাচ্ছে মাঠে-রাস্তায়
বৃষ্টি পড়ুয়া কিশোরি বারান্দায় দাঁড়িয়ে একা
হালকাবৃষ্টি ভারিবৃষ্টি একসাথে
গল্প করে
পথে নাগরিক মন
পাখিদের বাণিজ্যিক সহপাঠ আজন্ম উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে
কিশোরির রোদের জামা আকাশ ভিজেয়ে দেয় বর্ষাবায়ু
ও কিশোরি!
তুমি কী আমাকে ডেকেছিলে নিরানন্দ কালোমেঘে—ছায়াস্কেচে…
==============================
অনন্ত মকর
কামরুজ্জামান গোপন
আমাদের গল্পগুলো দশকের ঘোড়ায় চড়ে
পৃথিবীর প্রত্নপ্রহর ঘুমে ঘটনারা জন্মন্ধ জীবাশ্ব হয়
বাউলের দোপাটি হৃদয় সন্ধ্যার প্রজাপতি পালে
নদীর একতারা বুকে ভেসে যায় ভাটিয়ালি বেদনায়
মাটির দীঘল গর্ভে বাতাসের হাহাকার—
ছয়টি নক্ষত্র ছেঁড়া খুন ও রক্তের ক্যানভাসে
ফোটে ওঠে আমাদের যুগল সত্তা
সবুজ পদ্মার পলল সাঁতরিয়ে মরমিয়া ময়ূর পেখমে
অরণ্য আঁধার আধারে ভরে ওঠে জোনাকির চম্পক চারুপাঠ
দুজনার বুকের বাথানে নিমগ্ন নিথর নিশীথ চরাচর
কালের অনিরুপিত আয়ুর আসনে অনন্ত মকর—
==============================
দ্বিতল তল
আযাদ কালাম
১.
পেছন ফিরে তাকিয়েছি বলে মনে পড়ে না, তবু
প্রকাণ্ড পেছন পেছনে হেঁটে আসতে দেখে ঘূর্ণি
খেলেছিলো বাতাস
২.
নেবেড়া বাতাসে ভাতারের ভেরেণ্ডাভাজা বিছানো
গণরোষ নিদুমপাটাশ খিড়কির ফাঁসালে ঢেমনিতালে
বাখান চলে
==============================
নাদানিগান
ফরিদুল আজাদ মিলন
আমার যাকে তুমি বলে চেনা তেমন প্রিয়তমা এক নিদান
হৃদপিণ্ড বুকের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে ভেজায় উপলিন্দসোর
ঘোড়া চাই তার যুদ্ধ হয়ে ফেরা টগবগ টগবগ তাঁতমাকু
তরলকানাঘরে রাত কাটাই আঁধারের প্রত্নগলিঘিঞ্জি ঘুরে
অবধি রোদগঞ্জ না এলে পর্যন্ত হা-বাতাস গেলা বারান্দায়
জাতিবাদ জিজ্ঞাসা তুলে তুই শালা গতকালে ছিলে মোথা
বানিয়ে বেশ্যাবাড়ি ভানে গেরোস্থালী ধানের সুগন্ধপাতান
পৌরদালাল ছি!-ল্যাম্পে দীপায় ঢপানি আলোর গোরবাতি
তলে মরা কাাঁথার জ্বলন বিপ্লব দিওয়ানা প্রতারণা গাঁঞ্জামারি
চিলিমের হুঁশে খুঁজা কাঙালরতির রজবাসরি ধোয়াবাথান
==============================
ইতিহাস
আসিফ নূর
পবিত্র ইতিহাস বিকৃত করে বিক্রিত বিবেক,
পদ-পদবি-অর্থ-সম্পদের লালাঝরা মোহে ওরা
নানারঙা মিথ্যাবাদ লেখে; বিজয়ী রাজার আজ্ঞায়|
ইতিহাস পালটে গেলে বদলে যায় নামফলক,
সড়কে-সেতুতে-ভবনে-তোরণে-বন্দরে-চত্বরে হঠাৎ
একযোগে লাগে এই বদহাওয়ার কালো ঝাপটা;
ধুলায় গড়াগড়ি খায় চেতনার মহান স্মারক|
সবকিছুর নিয়মে পাঠ্যপুস্তকও কলুষিত হলে
স্কুলপড়ুয়া সন্তানের নাছোড় প্রশ্নের উত্তরে
লজ্জায় নুয়ে পড়ে দেশপ্রেমিক পিতার মুখ|
==============================
নারী
শামীম নওরোজ
ভোরের জানালায় ঝুলে থাকা নরম আলো
সে আলো চোখে এসে পড়ে, চোখ ধাঁধিয়ে যায়
প্রশ্নের মতো গভীর
উত্তরের মতো ˆধর্যশীল
অপেক্ষার সৌন্দর্য
হাঁটার শব্দে ইতিহাস জেগে ওঠে
নীরবতায় জন্ম নেয় ভবিষ্যৎ
মাটির ঘ্রাণ
আগুনের ফুল
পাল্টে পাল্টে যায়
চোখে নদীর মোহনা
বৃষ্টি হয়
সবুজ হয়ে ওঠে দুকূলের মাঠ
শক্তির কোমল বিস্ময়
মা
মেয়ে
বউ…
=====================
ঈশ্বরের দূত
সুজন আরিফ
ক্লান্তির ধুলোয় ছেয়ে গেছে আশার জমিন
¯^প্নিল চোখে কেবল আলোহীন ব্যথার মোচড়
তবুও দুখী নক্ষত্রের ন্যায়
রোজ রোজ জেগে থাকি মধুময় স্মৃতির আসরে
এই ভূখণ্ডে দুঃসহ অপেক্ষারাই কবিতা হয়
আর নির্জীব শব্দরা দল পাকায় যেনো ঈশ্বরের দূত|
==============================
নারীর মর্যাদা
আজাদ ইব্রাহিম
নারীকে আমরা সম্মান করি এই বাক্যটি উচ্চারণের আগে
একবার থামা প্রয়োজন, কারণ প্রশ্নটি সহজ নয়|
সম্মান কি করতালিতে, নাকি সিদ্ধান্তের টেবিলে?
পোস্টারে, নাকি নিরাপত্তার নিশ্চয়তায়?
ভাষণে,নাকি ভাষার গভীরে লুকিয়ে থাকা দৃষ্টিভঙ্গিতে?
নারী কোনো অলংকার নয়,
সে সমাজের ˆনতিক মানদণ্ড|
তার জীবনের প্রতিটি স্তরেই রাষ্ট্র, পরিবার ও সংস্কৃতি
নিজেদের প্রকৃত মুখ উন্মোচন করে|
ইতিহাসে নারী ছিল শ্রমে, কিন্তু কৃতিত্বে নয়|
ছিল ত্যাগে, কিন্তু সিদ্ধান্তে নয়|
তার নীরবতাকে বলা হয়েছে শালীনতা,
আর প্রশ্ন করাকেঅসহনশীলতা|
নারী জানে ভালোবাসা কখন দায়িত্ব,
আর দায়িত্ব কখন অন্যায়|
সে জানে, চুপ থাকা সবসময় মহত্ত্ব নয়,
কখনো কখনো চুপ থাকাই অপরাধ|
নারীকে মানুষ হিসেবে মানা কোনো মহান দান নয়,
এটি ন্যূনতম ন্যায়বোধ|
আর যে সমাজ এই ন্যূনতমতাতেও ব্যর্থ,
তার সভ্যতা, উন্নয়ন ও মূল্যবোধ
সবই প্রশ্নবিদ্ধ|
==============================
ব্যক্তিগত ধুলো
পার্বতী রায়
মুঠো ভরে কুড়িয়ে নিয়েছি ব্যক্তিগত ধুলো
ভাষালীন রুমাল …
আর কোনো কথা হবে না
আমি নিভে গেলে জ্বলে উঠবে কবিতা
¯^প্নে রোজ এমনটাই দেখি
পাখি হারিয়ে গেলে পাখি আর ফিরে আসে না
উপদ্রুত সময়ের ওপর বৃষ্টির লেখা
প্রেমের কবিতা কবিতা হয় না !
মৃতেরা চোখ মেলে
সরকার অরুণ কুমার
ভোরের আগেই জেগে ওঠে শুকতারাটি
মাথায় থোকা থোকা ফুল নিয়ে
সারারাত অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে ফুল চারটি
চলছে রহস্যকাহিনি——
বিকেলের বনপথে নতমুখ ছায়ামোহিনী
রাতে যখন তখন জেগে ওঠে রক্তপিপাসায়!
চেনা রাতগুলো ভোর হয় চন্দনার তীরে
আহা, ভুলপথে কারা গিয়ে মরে
ধ্বংসস্তূপের ভেতর আর কতকাল?
¯^প্ন আঙিনায় মৌটুসী
দীর্ঘ ক্ষত নিয় ক্ষয়কালে মৃতেরা চোখ মেলে|
==============================
গাছবন্ধু
মহ:মহসিন হাবিব
কুঠারের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত শরীর,
বিষধোঁয়ায় ওষ্ঠাগত প্রাণ,
গলা টিপে ধরে প্রতিটি বীজের ঠোঁট…
তবুও
রাজার চোখের ছানি সারাতে
ভেষজ চিকিৎসা|
মেজাজ হারানো রাণীর
ছাদ বাগানই ভরসা!
কাস্তের ধারালো দাঁত
ভাগ বসায় ফসলের গোড়ায়…
জনতার ভোট আনন্দ
লুকিয়ে থাকে
গাছবন্ধুর সাথে
প্রতিটি লিপিবদ্ধ সবুজে নীরব সরব কান্নায়|
ফ্রেমবন্দি
বন্দি জীবনে নেই কোনো মুক্তি
যুক্তির অবতারণা নেই
ধুলোপড়া পথে
কেটে যায় পূর্বপুরুষের সংসার…
সময় এলে
যুদ্ধ যুদ্ধ সাজে ধোঁয়ার গন্ধ…
তারপর…
ফিরে আয়না ঘরে
এক দর্শনীয় শ্রোতা হয়ে!
বন্দিদশায় বন্ধু পেলে মন্দ হয়না
ঘনিষ্টতায়
মন মোটেই সায় দেয়না…
শুধু সত্যের তাসবীহ গুনে যায় শুকনো রজনীগন্ধা!
কন্টকবৃক্ষ
এম এ ওয়াজেদ
মানুষের জীবন ঠিক যেনো ঘৃণ্য ক্লাইমেট ক্যানারি
আশাভঙ্গের পাটাতনে বসে আছে প্রেয়সী শুকতারা
থরে থরে জমে আছে মাকাল আবর্জনা নগ্ন আনাড়ি
বালিয়াড়ি অন্ধকারে ডুবে প্রেম-ডিওডেনাম সুখহারা
সন্ধ্যার ধুলোময়লায় বেড়েছে শুধু গোধুলির বদহজম
প্রতারিত অফস্পিনে ভেঙেছে অচৈতন্যের মিডস্ট্যাম্প
পারেনা ঘোচাতে ইতিহাসের অপবাদ ক্ষুধার্ত হরিজন
মুক্তির আলোরা নিভে গেছে সভ্যতাই অন্তরিত ক্যাম্প
ইনস্যুয়িং ইয়র্কারে ভেঙে পড়ে রক্তিমাভ করিডর
সভ্যতার ভূখণ্ডে পড়ে থাকে শীর্ণ আতঙ্কিত মৃতদেহ
ধমনির জ্যোতির্বলয় অপ্রসন্ন আসেনা আলোর ভোর
দুর্যোগের শোকমিছিলে হেঁটে যায় অবসন্ন মৃত-স্নেহ
শহরে দস্যুর আনাগোনা লুট করে লাঙলের ফাল
নৈরাজ্যের কার্পাস তুলায় ভর করে নগ্ন শুঁয়োপোকা
মুক্তির সম্ভাবনার প্রহর গুনছে অভিমানী মহাকাল
প্রবল ছলনার ধাতুনির্মিত ফ্রেমে লজ্জাহীন ধোঁকা
সেই কবে ভেঙে গেছে ভারসাম্যের সাহসী কুরিয়ার
জন্মের ক্যানভাসে আঁকা হয় শ্রুতিহীন মানব-অক্ষ
থিসিস পেপার আত্মসাৎ করে চ্যাটজিপিস্ট প্রফেসর
বিনয়ের শিশিরবিন্দু কেড়ে নিয়েছে প্রক্টর কন্টকবৃক্ষ
==============================
অহংবোধ
মাহমুদ নজির
এই কথা সেই কথা নয়
এই কথা তোমার আমার,
এই কথা একান্তই নিজের|
রোজ রোজ শত কথার ভিড়ে
কত কথা বলতে চেয়ে আটকে যায়
জমে থাকে, থেমে থাকে ঘোরে|
ভাবুক মন বলতে চায়
শোনাতে চায় তবু প্রিয় সত্য-
ভিতর বাহির জুড়ে তোলপাড় করে
সাতসমুদ্রের ঢেউ!
ধূর্তবাজ, অশুদ্ধ, লুটতরাজ
গিজগিজ মানুষের দলাদলি
ঠেলাঠেলি দেখে চমকে যাই,
বলি বলি করে আর না হয় বলা|
এই কথা সেই কথা নয়
এই কথা একান্তই নিজের,
তোমার আমার ভালোলাগা-
ভালোবাসার অহংবোধ|
==============================
সব কেনা যায়
রওশন মতিন
মদমত্ত প্রেমের আগ্রাসনে উন্মাদ সন্ত্রাসে
উপড়ে ফেলি ভালবাসার সরল হৃদপিণ্ড,
অলি-গলি চষে চষে পোড়া খাওয়া জীবন
এখন হয়ে গেছে আগুন -পাখি ফিনিক্স|
প্রকৃতির রক্তেও উন্মাদনা -বিপথগামীতার
বর্ষা উঁচিয়ে নিষ্পলক,
উদ্ধত ছোবল হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে কালসাপ|
অন্ধকারের পৃথিবী রাত্রির সীমান্তে লজ্জায় মুখ ঢাকে,
কোন& বেদ মন্ত্র তোমরা শোনাবে আমাকে,
আমরা সবাই ঈশ্বরকে নিয়ে জুয়া খেলছি,
আমি বলি,বেশ্যারাও অনেক ভালো আছে-
বেদ মন্ত্রের উচ্চারণে
তাদেরও কিছু নিয়ম-আইন আছে শব্দ ও শরীরে,
অথচ আমাদের ভদ্র মুখোশের আড়ালে
রক্ত,অস্থি, মজ্জায় মিশে আছে ব্যভিচারী লুতের কওম,
উঁচুতলা-নীচুতলা, সবখানে জীবনের সংরাগে শুধু টাকা বিনিময়,
যেখানে ঈশ্বর,শরীর,প্রেম -ভালোবাসা-সব কেনাবেচা হয়|
==============================
নিষ্পাপের আর্তনাদ
বিপুল চন্দ্র রায়
বিশ্বের এই আঙিনায় আজ বারুদের কটু ঘ্রাণ|
বিবেক কি তবে নির্বাসিত ওই মরু-দিগন্তের ওপারে?
গভীর রাতের কান্নায় আজ কাঁপছে ধরার বুক,
অঝোর ধারায় সজল নয়ন, ম্লান সে চন্দ্রমুখ|
অগ্নিগর্ভ ধরণীর বুকে আজ এ কীসের হাহাকার শুনি?
পৈশাচিক ওই উল্লাসে আজ ঝরছে নিষ্পাপ প্রাণখানি|
বিশ্বের ওই দর্পণে আজ এ কোন বীভৎস ছায়া?
মনুষ্যত্ব কি মরীচিকা তবে? ফুরিয়েছে সব মায়া?
ওরে পাষণ্ড! ওরে নররূপী দানব শোন তবে আজ,
থামাতে হবে এই দানবীয় তাণ্ডব এখনই আজ,
নইলে মহাকাল দেবে ধিক্কার, ঘৃণা জমা রবে যুগান্তরে|
জাগাও মানবতা, ফিরিয়ে আনো মুখের অমলিন হাসি,
মানুষ হও! নইলে তুমি এই সৃষ্টির নিকৃষ্টতম পাপি|
মনুষ্যত্বের পুনর্জাগরণ ঘটুক এই মহাবিশ্বে আজ,
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বন্ধ হোক হানাহানি রক্তপাত|
উন্মোচিত হোক নব দিগন্ত, শুদ্ধ হোক এ ধরণী,
জীবনের নিরাপত্তায় সচল হোক আগামীর তরণী|
==============================
তালগাছ
হোসাইন আহমেদ
এই আমি যখন হার্টের প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়ে
হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছিলাম-
ঠিক তখনই মুখোশ পরা ইম্পেরিয়ালিস্টরা
ঢুকে পড়ে আমার হৃদপিণ্ডে|
আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে
নারীকে বেশ্যা, পুরুষকে দালাল এবং ধনীকে ডাকাত
বানানোর প্রকল্প নিয়ে|
আমাদের সকল পথ আজ অবরুদ্ধ
অস্তিত্ব ক্রুব্ধ, ¯^প্ন দেখা নিষিদ্ধ|
আমাদের দেহ হচ্ছে-
একটি কমফোর্টেবল উইক লিংক অব ইম্পেরিয়েলিজম|
যুদ্ধ কিংবা বাণিজ্যে “তালগাছ” ওদের চাই-ই-চাই|
==============================
যে কথা রেখেছি গোপনে
শারমিন নাহার ঝর্ণা
যে কথা রেখেছি গোপনে
হৃদয়ের মণিকোঠায় খু&ব যতনে,
শুনতে কি চাও কোন পরন্ত বিকেলে?
কথাটি মনের গভীরে আঁকে প্রশান্তির পেইন্টিং
হৃদয় দেয়াল জুড়ে পাই অসীম তৃপ্তি,
একবার এই চোখের দিকে তাকিয়ে দেখ!
চোখের রেটিনাতে তোমারই মুখচ্ছবি,
চোখের সহজ ভাষা কি বুঝতে পারো না?
মনের অব্যক্ত কথা বিশ্লেষণ করব কিভাবে
তোমাকে দেখলেই হৃদয়ের স্পন্দন বেড়ে যায়|
এই হৃদয়ে পুষে রাখা মায়ার গ্রোত
তোমার দিকেই কেন ছুটে যায়?
এই অসীম মায়ার গ্রোত অনাদিকালের|
সেই মায়ার গ্রোতেই ভাসিয়ে দিলাম
হৃদয়ে পুষে রাখা গোপন কথাটি,
ভালোবাসি খুব বেশি……
হৃদয়ের কোণে এই কথাটি সারাক্ষণ বাজে|
==============================
অচেনা দুজন
রিশাত আমিন
আমি আঁধার আর তুমি আলো
অথবা তুমি আঁধার আমি আলো
পরষ্পর খোঁজে পেতাম চিনতাম|
এখন আমাদের ভেতরে বাহিরে
পুরোটাই অদ্ভুত এক অন্ধকার
চিনতে পারি না কেউ আর|
দুজনের চোখে একই আলো আঁধার
সৌন্দর্য ডুবে যেন আলো আঁধারের মাঝে
তুমিও দেখো না আমি দেখি না|
এ ভাবেই হাঁটছি হাজার বছর
দুজনার দুটি মন পৌঁছায়নি হৃদয়
দুয়ারের ¯^প্নের চৌকাঠে|
মাঝে মাঝে মনে হয়
এ যেন অচেনা অপরিচিত দুটি মন|
আলো আঁধারের দোলা চলে
তুমি আলো আমি আঁধার
আমি আলো তুমি আঁধার|
==============================
কৃষ্ণপক্ষ
আরিফুল ইসলাম শান্ত
সূর্যের দিন পেরিয়ে এলাম কৃষ্ণপক্ষে
বটবৃক্ষ বয়সী হৃদয়
তখনও চেনেনি পোড়া-গন্ধী দহন|
কফিনের দেহ যায় বন্দিশালায়
জীবিত মমি চমকায়
পুরোনো শরীর রক্ষিত পিরামিড-শহরে|
ধীরে ধীরে বাড়ছে লাশের বাগান
ক্ষয়িষ্ণু শহর ডুবে যাবে একদিন
বিভৎস মমিগুলো মিছিল নিয়ে ছুটবে দিগি¦দিক
বৈচিত্র্যময় শুভ্র পরিরা সুর-তরঙ্গে নাচবে
একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে|
ক্লান্তির ঘামে স্নান শেষে প্রতিমারা বের হবে
হীরের নরোম জল ছিঁটাতে
ফোঁটা ফোঁটা জলে ভরে যাবে প্রান্তর,
যেখানে সাঁতরাবে ধবধবে সাদা রাজহাঁস|
অমানিশার আঁধারে শুনেছি খুনির নৃত্যধ্বনি
ঘামের ¯^চ্ছ জলে ক্ষয়ে গেছে রং
ঠিক যেন আমি— ধূসর নিষ্প্রভ|
শহরের প্রবেশদ্বারে পাহারা দেয় চর্মকারিগর
তাই গোপন সিন্দুকে বন্ধক রেখেছি ঠোঁট
অন্তরালে কিছুই নেই, আছে শব্দহীন আর্তনাদ|
==============================
দিগন্ত
মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল
অপার নীল আকাশ
সাদা মেঘগুলো নীলিমায় মিলিয়ে যায়
পূর্ণিমার চাঁদ নেমে আসে সমুদ্রে স্নান করতে
এদের মধ্যে কি যেন নিবিড় আলাপন
দূর দিগন্ত চেয়ে দেখে আর লাজুক হাসে
জোয়ার-ভাটার শাশ্বত রূপ প্রকৃতিকে প্রাণসঞ্চার করে
সমুদ্রকে ধারণ করা জমিনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়
মানুষের মনে রঙ, পরিবেশে পরিবর্তন এবং কত কিৃ
কিন্তু আকাশ ও জমিনের মাঝে রয়েছে বিশাল পার্থক্য
তবুও তারা দিগন্তে মিশে যায়
প্রকৃতির এই এক অপরূপ সৌন্দর্য ও মুগ্ধতা
তবে কি, আকাশ ও জমিন কখনো দিগন্তে মিলিত হয়?
হয়তো তাই মনে হয়
অবশ্য না, এটি মানুষের ভুল ধারণা
তারপরও, মানুষ এমন একটি ভুল বিশ্বাসকে ধারণ করে
ছুটে বেরায় দিগন্তের পিছনে|
==============================
মেঘ তাড়ানো রোদ
লিটন কুমার চৌধুরী
মেঘ তাড়ানো বন্ধু আমার রৌদ্র কথা শোনো,
কেমন করে তাড়িয়ে ফেরো নিজের আপন বোনও|
দলবেধে মেঘ ছুটে চলে বিঘ্ন বাধা ঠেলে,
তাকে তুমি একা তাড়াও সময় সুযোগ পেলে|
রুক্ষতাকে করে শীতল শিশিরকণা মেঘ,
তাই তো তোমায় দেখলে তাদের যায় বেড়ে উদ্বেগ|
শিশির সে তো পালিয়ে ছোটে সুর্য ওঠার আগে,
শিউলি বকুল ফুলের সুবাস পায় যে কুসুমবাগে|
গ্রীষ্মে তোমার প্রখরতায় ফাটে ফসল মাঠ,
শীতে চুকে যায় সে তোমার এত গরম হাট|
তখন আসো বন্ধু তুমি
শীত তাড়িয়ে বাচাঁও ভূমি
শীতের দিনে গরীব দুখির কষ্টে কাটে ভোর ,
তাদের জন্য একটু এসে খোল মনের দোর|
শীত- গ্রীষ্মে সকল সময় ছড়াও তোমার মায়া
তুমি যেন প্রকৃতির দান প্রকৃতির ও ছায়া|
পতিতা নয় নারী মা বোন প্রিয়ারই রূপ আবর্তন
শাহনাজ পারভীন মিতা
পতিতা কথাটা বলতে পারা
খুবই সহজ একজন পুরুষের,
কখনো কি ভাবে, কাকে বলছে সে
মা বোন বা প্রিয়া, আপন ¯^জনই তো সে |
গোয়ালন্দের যে পতিতালয়
কত অসংখ্য মা বোন প্রিয়ার চোখের জল
মিশে, ভেসে যায় প্রমত্ত পদ্মায় |
কে দেয় তাকে সে ঠিকানা!
কেউ কি ¯ে^চ্ছায় পতিতালয়ে যায়!
একজন পুরুষের বিশ্বাসঘাতকতা
ধীরে ধীরে সমাজের বুকে
একজন মা একজন প্রিয়া বা বোন
পতিতা নামে নিজেকে সাজায়|
উন্মুক্ত রাস্তায় পেটের ক্ষুধায় যে মেয়েটি
সংসদ ভবনের কোণায় দাঁড়ায়,
সেখানে দামি চকচকে গাড়ীতে
কে তুমি পুরুষ ,লোভের পসরা সাজাও!
মুখ লুকিয়ে রাতের আঁধারে হাত বাড়াও|
অথচ এই সংসদেই নারীর অধিকার ক্ষমতায়ন
নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা তর্ক বিতর্ক চলে,
একমুঠো খাদ্য লজ্জা নিবারণের একটুকরো বস্ত্র
আর বাসস্থান সে তো খোলা আসমান তার|
যেখানে সে শিয়াল কুকুরের মতই বাঁচে
দিনশেষে পতিতা বলেই সমাজের মাঝে|
নয় পতিতা, ধর্ম বর্ণের বিভেদ বিসর্জন
নারী মা বোন প্রিয়ারই রূপ আবর্তন|




