এখন সময়:রাত ২:১৩- আজ: শুক্রবার-২০শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৬ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-বসন্তকাল

এখন সময়:রাত ২:১৩- আজ: শুক্রবার
২০শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৬ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-বসন্তকাল

প্রথা ভেঙে বেরিয়ে এসো নারী  

গৌতম কুমার রায়

বিংশ শতাব্দী বিদায় হওয়ার পরে এসেছে একবিংশ শতাব্দী। বিজ্ঞান এগিয়েছে। সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়েছে পুরুষ। কিন্তু নারী ! শুধু পিছিয়েছে নারী। কেন এই পিছিয়ে যাওয়া ? কারণ নারীদেরকে সভ্যতার শুরু থেকে পুরুষের তুলনায় বেশি কাপড় জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সে যুগের ইতালি পর্যটক ম্যানরিক বলেছেন বাংলাদেশে ছেলেরা শরীর ঢাকে ৭-৮ বিগৎ লম্বা কাপড়ে। অথচ মেয়েরা তা ঢাকে ১৮-২০ বিগৎ কাপড়ে। এখানেই পুরুষ এবং নারীদের অধিকারে ফারাক। যুগ যুগ সময় ধরে। নারীরা তখন ছিল কখনও কোন ধর্মের কারণে অগ্রমুখী, আবার কখনও কোন ধর্মের কারণে পশ্চাৎমুখী। কখনও সামাজিক কারণে ভোগের। কখনও পারিবারিক কারণে বিলাসের। কখনও সন্তান জন্ম দেওয়ার ফ্যাক্টরি হিসেবে। তবে মৌলবাদের থাবা পড়েছে নারীদেরকে লক্ষ্য করে যুগের আদি থেকেই। এখনও সে চিন্তা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারে নি সমাজ। পরিবার থেকে সমাজ সুযোগ পেলেই পর্দাতে ফিরিয়ে নিতে চায় নারীদেরকে। পর্দা শব্দটা এসেছে ফার্সি ভাষা থেকে। যেটার অর্থ যবনিকা বা অবগুন্ঠন। কিন্তু আমাদের কাছে পর্দা শব্দের অর্থ আসবে যেন এক সামাজিক রীতি হিসেবে। এখন নারীরা শিক্ষায় আছে। কিন্তু তাদের পূর্ব সতীর্থরা কখনই সেখানে যেতে পারেন নি। পর্দায় আছে, শিক্ষায় ছিল না। এ অবস্থা থেকে নারীরা যখন বঞ্চিত হয়েছে। তখন তারা পিছিয়েছে অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা এমন কি পারিবারিক অবস্থা থেকে, কিন্তু পুরুষেরা এগিয়েছে এমন সব জীবন চলকের মূল উপাদান বেয়ে। এভাবে নারীকে কৌশল খাটিয়ে দাবিয়ে রেখে পুরুষদের অধিকারকে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। আবার এভাবেই নারীদের যৌনতা ও প্রজননের সতীত্বের ওপরে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ তৈরী করা হয়েছে দিনে দিনে।

এ দেশে আঠারো শতকের আগে-পরে নারীরা যুদ্ধে, বিদ্রোহে, দেশ শাসনে যুক্ত ছিলেন। নাটোরের রাণি ভবানী। তিনি দক্ষ শাসক ছিলেন। নবাব সিরাজদৌলার খালা ঘসেটি বেগম একজন শিক্ষিত, প্রত্যয়ী, প্রতিভাময়ী নারী ছিলেন। যে জন্য স্বামী  মারা গেলে তিনি জাহাঙ্গীরনগর সুরার দেওয়ান নিযুক্ত হয়েছিলেন। রংপুরের জমিদার জয়দুর্গা চৌধুরানী, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, প্যারি সুন্দরি, দেবী চৌধুরানী। যারা তেজস্বিনী বীর হয়েছিলেন জমিদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এই উপমহাদেশে ধর্মীয় কারণে একই নারীরা ছিলেন ভিন্ন ভিন্ন অধিকারভোগী। হিন্দু, মুসলিম, সাঁওতাল, মুণ্ডা, বৌদ্ধ,খৃস্টান এমন আরো অনেক। এদের এক একজন নারীর জীবন চলক এক এক রকমের। ১৮২০ খ্রি: বৃটিশ নাগরিক ডেভিড হেয়ারসহ স্থানীয় কয়েকজন হিতৈষী মিলে মেয়েদের জন্য একটি স্কুল তৈরি করলেন। এছাড়া জে.ই.ডি বেথুন তার নামে যে বেথূন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা ছিল এ অঞ্চলের প্রথম নারী শিক্ষার মাইলফলক। ভারত হিতৈষী রাজা রামমোহন রায় তাঁর ব্রাম্মসমাজ নারী শিক্ষায় অনেক আগেই কাজ করেছে। এরপর মুসলিম নারীদের শিক্ষায় এগিয়ে আসেন ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতসহ আরো অনেকে। এখন নারী শিক্ষা এখন সরকারের অগ্রাধিকার একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়। যে জন্য বিচারে, শৃঙ্খলায়,চিকিৎসায়,উড়ালে,রাজনীতিতে সন্মুখে এসেছে নারী। আমাদের রাজনীতিতে ১৯৪৭ সালের আগে যেমন নারীরা সক্রিয় ছিলেন। আবার ১৯৪৭ সালের পরেও তারা নিজেদেরকে রাজপথে সক্রিয় রেখেছেন। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানিদের কাছে আমাদের নারীরা ভোগের ও বিলাসের থাকলেও তারা আমাদের কাছে ছিলেন মহান ত্যাগের এবং গর্বের।নারীদের মূল্যবান ত্যাগ আমাদের জন্য এনে দিয়েছে একটি পতাকা এবং একটি মানচিত্র। আমাদের দেশে নারীরা অর্থনীতির একটি সক্রিয় চলক। তাদের রেমিটেন্স এবং বস্ত্র শিল্পের যে শ্রম এমনকি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মুখ্য চলক কৃষিতে মোট শ্রমের ৫৮ শতকরা শ্রম বিলিয়ে আসছে এখন।

এতসবের পরেও আমাদের দেশে সাধারণ নারীরা কখনও কখনও প্রতিক্রিয়াশীলদের শক্তি ও গেঁড়োয় আবদ্ধ। যে কারণে শ্রমে নারীদের ঘামের কোন মূল্য না থাকলেও ধর্মান্ধবাদীরা এই নারীদের শুধু শরীরকে পছন্দ করে। এখনও প্রথার মধ্যে থাকতে এরা নারীদেরকে ভয় ও লোভ দেখায়। নানা ফতোয়ায় নারীদেরকে দাবিয়ে রাখতে চায়। তাদের দৃষ্টিতে নারী যেন তাঁর শরীর নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের পরাজিত যোদ্ধা। এখন অনেক নারী ধারাবাহিক ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সমাজে কেন নারী একজন পীড়িত মানুষ ? কেন তাঁর শরীরে দগদগে ঘা সৃষ্টি করা হয়। সকালের সংবাদে যেখানে সেখানে ধর্ষিতা নারীদের লাশ পাওয়ার খবর আসে। যেন নারীদের বর্বরতার প্রতিবাদও একটা অপরাধ। তাঁরা নির্যাতিতা হয়ে তাদের ঠিকানা মেলে হাসপাতালে। আইনের বলিতে তাদের প্রমাণ করতে হয় তাঁরা নির্যাতিতা। তাদেরকে ক্যামেরাবন্দি করে সকলের সামনে উপস্থাপন যেন আরেক বিড়ম্বনা। এভাবে তাদের ভাগ্যে জড়ো হয় দয়া আর দাক্ষিণ্য। সাধারণ নারীরা আজও পারিবারিক সহিংসতায় বিক্ষত। তারা পরিবারেই বৈষম্যের শিকার। তারা ইভটিজিং, যৌন হয়রানির শিকার। সন্তানের দায়ভার একক যেমন নারীদের, আবার অভাবের দায়ে পরিবারে যেন এই নারীরাই কেবল অভিযুক্ত। তারা শ্রম দিয়ে আয় করেন, তবে ব্যয় করার ক্ষমতা রাখেন না। এই নারীরা এখনও রান্না করে তবে ভালোটুকু নিজে খেতে পারে না। তবে সময় এসেছে, পেছনে চলার এই প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। দেশের রপ্তানি আয় করে বৈদেশিক মুদ্রা এবং রেমিটেন্স আয় যদি এই সাধারণ নারীরা করতে পারে, তবে তাদেরকে জীবনের মূল ধারায় এগিয়ে আনতেই হবে। বিজ্ঞানের গতিতে এই নারীদেরকে চলকের গতিতে ফিরিয়ে দিতে হবে। প্রতিটা পরিবারে নারীরা সৃষ্টিশীল অলঙ্কার হিসেবে তাঁর পরিবারকে গড়ে চলেছেন। যে জন্য বিশেষ করে বাঙালি নারী হচ্ছে জগজজননী, তাঁরা শক্তিরূপী প্রেরণা। নারী আমাদের জন্য এক জীবন প্রতিভূ রূপে। প্রক্রৃুতিতে নারী সংগ্রামের লালিমা, সংস্কৃতির লালিমা এমনকি সে জীবন যুদ্ধেরও লালিমা। সে জন্য বলতেই হয়, হে নারী প্রথা ভাঙ। ভয়কে জয় কর। বেরিয়ে এসো আলোর কাছে । তোমরা কেন পুরুষের হ্যানিট্রাপের পণ্য হবে। কেননা দিন শেষে একজন নারী সে যে আমারই মা, আমারই ভগ্নি, আমারই অর্ধাঙ্গিনী, আমারই মেয়ে। মনু সংহিতা ৯ অধ্যায়ের শ্লোক ১৬ তে বলা হয়েছে,

“স্বভাবং জ্ঞাতা স্বাং প্রজাপতিমিসর্গভাম্

পরমং যত্নমাতিষ্ঠেৎ পুরুষো রক্ষাং প্রতি।”

অর্থাৎ বিধাতা স্ত্রীলোকদের সৃষ্টিকালেই এদের এই স্বভাব সৃষ্টি করেছেন এ কথা বিশেষ ভাবে অবগত হয়েই, বলা হয়েছে, এদের রক্ষার জন্য পুরুষের পরম যত্ন অবলম্বন করা উচিৎ।

সবশেষে বলতেই হয়, আমাদের নারীরা অপূর্ব ও সর্বাংসহা এবং স্বার্থশূন্য। তাঁরা নিত্য ক্ষমাশীল ও জননী। তাঁরা আদর্শ মাতৃত্ব। তাঁরা পশ্চাতের যে কোনো দেশের নারীদের চেয়ে সহনশীল ও পবিত্র। তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্বাচ্ছন্দ্য জীবনটুকু উপভোগ করতে দিতে পুরুষের সংবেদনশীল মনোভাব দেখানো মানবিক এক কর্তব্য বটে।

 

গৌতম কুমার রায়, গবেষক, উদ্ভাবক ও পরিবেশ বিঞ্জানী

কুষ্টিয়া

বিশ্ব নারী দিবসের পুনর্পাঠ : বহুমাত্রিক নারীর নতুন ভাষ্য

শাহেদ কায়েস   নারীর ইতিহাস কোনো একরৈখিক অগ্রযাত্রা নয়—তা বহু পথে বয়ে চলা নদীর মতো, যেখানে সংগ্রাম, প্রেম, প্রতিরোধ, রাজনীতি, শ্রম, মাতৃত্ব, শিল্প, দর্শন ও

আন্দরকিল্লার ইফতার অনুষ্ঠানে সুধীজনদের অভিমত বাঙালি জাতিসত্তা ও মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনার চিহ্নটিই অনির্বাণ অস্তিত্বের প্রতীক

আন্দরকিল্লা ডেক্স : শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজভাবনামূলক কাগজ ‘আন্দরকিল্লা’র ইফতার আয়োজনে সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল আবসার তাঁর স্বাগত বক্তব্যে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, আন্দরকিল্লা কোনো বলয়বদ্ধ সীমানায়

প্রথা ভেঙে বেরিয়ে এসো নারী  

গৌতম কুমার রায় বিংশ শতাব্দী বিদায় হওয়ার পরে এসেছে একবিংশ শতাব্দী। বিজ্ঞান এগিয়েছে। সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়েছে পুরুষ। কিন্তু নারী ! শুধু পিছিয়েছে নারী। কেন

আদিবাসী নারী

কুমার প্রীতীশ বল   ‘হৈ হৈ হৈ জুমত  যেবং. জুমে যেইনে গচ্ছা সুদা তুলিবং. গচ্ছা সুদা তুলি নেই টেঙ্গা কামেবং।’ চাকমা এই গানটির বাংলা অনুবাদ

মহাশ্বেতা দেবী: দর্শন, সাহিত্য ও সমাজচেতনার প্রতিফলন

রওশন রুবী   মহাশ্বেতা দেবী উপমহাদেশের একজন শক্তিমান ও প্রখ্যাত লেখক। তাঁর শতবর্ষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাহিত্য শব্দের সীমা অতিক্রম করে মানবতার গভীর নৈতিক শক্তিতে