এখন সময়:রাত ৪:২৯- আজ: বৃহস্পতিবার-১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

এখন সময়:রাত ৪:২৯- আজ: বৃহস্পতিবার
১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-শীতকাল

ফকির লালন: জন্মপরিচয় ও জাতধর্ম

আবদুল্লাহ আল-আমিন

আমি বেশ বুঝতে পারি মানুষের জানার কৌতূহল কখনও ফুরোয় না, ফুরাতে চায় না। সেই কৌতূহল আর অজানাকে জানার সূত্র ধরে ধরে আমি কেবলই তত্ত্ব তালাস করে বেড়াই, কেবলই জেনে-বুঝে বেড়াই। কখনও নির্জনে, কখনও-বা স্বজনে। কখনও আখড়া-আশ্রমে, কখনও মেলা-পার্বণে। নইলে এত বছর পর আবার কেন লালনকে নিয়ে লিখতে হবে? আর পাঁচজন গবেষক-পণ্ডিত কিংবা লোসংস্কৃতিবিদদের মতো দোলপূর্ণিমায় বা কার্তিকের তিরোধান দিবসে ছেঁউড়িয়ায় কিংবা নদীয়ার আসাননগরে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের লালনোৎসবে গিয়ে সাহিত্যের পণ্ডিতদের দু একটি জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শুনলেই তো জানা- বোঝা হয়ে যায়! অথবা ভক্তিমান সাধুগুরু-ভক্তদের মতো আখড়ায় গিয়ে প্রণাম নিবেদন কিংবা সাধুসঙ্গ করলেই তো সব পাট চুকে যায়! আমিও তো প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের সুরে সুর মিলিয়ে বলতে পারতাম, লালন ফকির উচ্চস্তরের সুফি সাধক ছিলেন এবং পবিত্র কোরানের ভাষায় অনুপ্রাণিত হয়ে সাধারণ মানুষের কথা বলেছেন। আমিও তো মেহেরপুরের কাজীপুর গ্রামের ফকির দবিরউদ্দিন শাহের মতো বিশ্বাস করতে পারতাম যে, ‘লালন একজন আল্লাহর অলি ছিলেন।’১ কুষ্টিয়ার ফকির মন্টু শাহের মতো আমিও মনে করতে পারতাম, ‘সিরাজ সাঁই বলে কোনো লোক ছিলেন না।’ সিরাজ আসলে লালনের কাল্পনিক গুরু। কারণ লালন নিজেই কলিযুগের অবতার।  কোনো কোনো ভাবশিষ্য বলেছেন, ‘লালন স্বয়ং মহাভাবসমুদ্র, এ কারণেই তিনি জগত গুরু, ত্রাতা ও দাতা। তাঁকে বাংলা ভাষায় কবিবেশে নবি বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না। প্রকৃত বিচারে ফকির লালন মাতৃযোনিসম্ভূত সাধারণ মানব সন্তান নন, তাঁকে অযোনিসম্ভূত বলে সিদ্ধ সাধকগণ উল্লেখ করেছেন।.. শাব্দিক ব্যাখ্যা দিয়ে লালনকে বোঝানোর সাধ্য নেই এ নরাধমের।

 

তাঁর এককণা শ্রীচরণধূলির যোগ্যও আমি নই। তিনি দয়াল, এই ভরসায় বাঞ্ছা করি তার মহানাম কীর্তনের। বিশ্বাস করি, জগতবাসীর আত্মমুক্তির শেষ উপায় বা সর্বোত্তম পš’া এটিই।’২  কিন্তু সব মত খারিজ করে দিয়ে গ্রাম-জনপথে ঘুরে বেড়ানো তার্কিক কুদ্দুস ফকির কিংবা বাদল শাহ বলেছেন, লালন একজন সাধারণ মানুষ, কেবলই মানুষ।৩ সত্যি বলতে কি, অবিভক্ত বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে লালন এক মহারহস্যময় চরিত্রের নাম। তাঁকে ঘিরে তর্ক-বিতর্ক আছে, ধোঁয়াশা আছে; আছে দারুণ বর্ণাঢ্যতা। আছে লাঠালাঠি, আছে ভয়ঙ্কর কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি। এক সময় দু বাংলার বিশাল ভক্তিমান জনগোষ্ঠী লালনকে দেবতা জ্ঞানে পুজো করত। মান্য করত শ্রীচৈতন্যদেবের নতুন অবতার হিসেবে। কেউ আবার তাঁকে অলি মনে করে তাঁর নামে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করতেন। কিন্তু দেশভাগ, সমাজ-রাজনীতির ভাঙাগড়া এবং পরিবর্তনের আপতিক মোচড়ে মানুষের ধ্যান-ধারণা অন্য রকম হয়ে  গেছে, তারপরও  লালনকে নিয়ে জনমনে ও বুদ্ধিজীবী মহলে ঔৎসুক্য কমেনি। বরং তাঁকে ঘিরে প্রতিদিন জন্ম  হচ্ছে ধোঁয়াশা, নতুন নতুন তর্ক। লালনকে নিয়ে চাপান-উতর, তর্ক-প্রতর্ক, অনিঃশেষ কৌতূহল প্রমাণ করে, লালনের জীবনকাহিনির মধ্যে বেশ কিছু নাটকীয়তা আছে। তাঁর গানের ভেতরে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা মানব মনের চিরন্তন জিজ্ঞাসা উসকিয়ে দেয়, সেই সঙ্গে জীবনসত্যের কাছাকাছি যেতে সাহায্য করে। তা-না হলে তাঁকে নিয়ে এত কৌতূহল, এত তর্ক-বিতর্ক থাকবে কেন? কেন বাঙালি জাতিসত্তার উজ্জীবনে তাঁকে সামনের সারিতে নিয়ে আসা হবে? বিবিসি কর্তৃক প্রণীত সেরা বাঙালির তালিকা প্রকাশের পর, হাল আমলের নাগরিক বুদ্ধিজীবীরাও তাঁকে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তবুদ্ধির সমাজ গড়ার সংগ্রামে সারথি ও প্রতীক হিসেবে মান্য করছেন। সেই দিক থেকে লালন এখন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও সংস্কৃতিসেবীদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন। ঢুকে পড়েছেন সদর রাস্তা থেকে সটান অন্দর-মহলে। অথচ লালন তাঁর জীবনের কোনো পর্বেই মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদের সঙ্গে মেশেননি। তাদের পক্ষে কথা বলার দায়ও অনুভব করেননি। তাঁর অবস্থান ছিল নিম্নবর্গীয় হিন্দু-মুসলমান ও নিম্নবর্গীয় প্রান্তিক মানুষের পক্ষে। তিনি সারাজীবন প্রথাগত ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি, আচারসর্বস্বতা, কুসংস্কার, ধর্মন্ধতা প্রতিরোধ করতে চেয়েছেন। কিন্তু আমাদের শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও সুশীল সংস্কৃতিসেবীরা সেটা ভাল করে বুঝে উঠতেই পারেননি। ফলে তাদের ভুল ব্যাখ্যার কারণে ফকির লালন হয়ে উঠেছেন কেবলই চারণ কবি, বাউল সম্রাট কিংবা মরমি সাধক। সাহিত্যের পণ্ডিতরা মনে করছেন, লালন সাহিত্যের সামগ্রী। আর তরিকতি-ফকির ও ক্ষয়িষ্ণু ধর্মব্যবসায়ীদের কাছে তিনি ভেঙে ভেঙে খাওয়ার সম্পত্তি।

এখানে একটি উদাহরণ নতুন করে না উল্লেখ করে পারছি না- রামকৃষ্ণদেবের উদাহরণ। স্কুল-কলেজে তিনি পড়েননি, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বহরও তাঁর ছিল না। তারপরও তিনি গদাধর থেকে রামকৃষ্ণদেব হয়ে উঠেছিলেন, এক পর্যায়ে তার ধর্মভাবনা বিবেকানন্দের মাধ্যমে পশ্চিমা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তিনি গ্রামে জন্মেছিলেন, কিন্তু পরিপুষ্ট হন কলকাতার শহুরে এলিটদের নিবিড় পৃষ্ঠপোষকতায়। রানী রাসমণির বদান্যতা, কেশবচন্দ্র সেন, বিদ্যাসাগরের মতো মানুষের সাহচর্য এবং গিরিশ ঘোষ-বিবেকানন্দের মতো শিষ্যদের নিঃশর্ত আনুগত্য, ভগিনী নিবেদিতার মতো মানুষের প্রচার পেলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও একজন মানুষ রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব হতে পারেন। কিন্তু এক দুর্গম ও প্রত্যন্ত গ্রাম-জনপদের বিত্ত-বৈভবহীন পরিবারে জন্ম নেওয়া এবং অকুলীন পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা এক গেঁয়ো-নিরক্ষর বাউল কেমন করে ফকির লালন সাঁই হয়ে উঠলেন, তা এক বিস্ময়কর রহস্য। তাঁকে নিয়ে যারা গবেষণা বা লেখালেখি করেছেন বা করছেন, তাঁরা সেই রহস্যের জট খুলতে পারেননি আজও। কিন্তু সময় এসেছে সেই রহস্যের জট উন্মোচন করে আসল-লালনকে প্রতিষ্ঠার।

লালনের ধর্ম-পরিচয়ের অস্পষ্টতা তাঁর নিরাসক্ত জীবনকাহিনি রচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। যারা এবং যাদের পূর্বপুরুষরা এককালে লালনকে ‘ব্রাত্য, মন্ত্রহীন, বেশরা-ফকির’ বলে প্রত্যাখান করেছিলেন, তাদের উত্তরসূরিরাই এখন তাঁকে বাঙালি জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মান্য করে তাঁর শ্রীচরণ তলে ধূপধুনো দিচ্ছেন। যে-অন্নদাশঙ্কর রায় কুষ্টিয়া মহকুমার প্রশাসক থাকাকালীন লালন-আখড়ায় যাওয়ার তাগিদ অনুভব করেননি একদিনের জন্যও, তিনিই আবার লালনকে নিয়ে রচনা করেন এক মহামূল্যবান আকরগ্রন্থ। তাঁর অকুলীন ও মহিমাহীন সমাধিপ্রাঙ্গণে বানানো হচ্ছে লালন কমেপ্লেক্স, গবেষণা কেন্দ্র, লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্র আরও কত কী! আসছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপিং কান্ট্রিজ রিসার্চ সেন্টারের রিসার্চরা কিংবা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের মতো বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্য-তাত্ত্বিকরা। নানা কারণে বেশির ভাগ লেখক নির্মোহভাবে তাঁর জীবনকাহিনি লেখার পরিবর্তে, তাঁর মাহাত্ম্যকীর্তন রচনা করছেন। আবার কেউ কেউ তাঁর লোকায়ত-মানবিক দিকটা ঢেকে দিয়ে তাঁকে মুসলিম সুফি সাধক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু লালন কিংবা তার ভক্তরা কি নিজেদের সুফি তরিকার মানুষ হিসেবে দাবি করেছেন? তিনি কি জাতধর্ম মানতেন?  হিতকরী পত্রিকা থেকে জানা যায় যে,

‘মৃত্যুকালে কোনো সম্প্রদায়ী মতানুসারে তাঁহার অন্তিমকার্য্য সম্পন্ন হওয়া তাঁহার অভিপ্রায় ও উপদেশ ছিল না। তজ্জন্য মোল্লা বা পুরোহিত কিছুই লাগে নাই। গঙ্গাজল, হরে-নামও দরকার হয় নাই।..

 

তাঁহারই উপদেশ অনুসারে আখড়ার মধ্যে একটি ঘরের ভিতর তাঁহার সমাধি হইয়াছে। শ্রাদ্ধাদি কিছুই হইবে না।’ ৪  লালন নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন তাদের মধ্যে বসন্তকুমার পাল ও মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন অগ্রগণ্য। বসন্তকুমার পালকৃত লালন-জীবনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, মতিলাল দাশের মতো লালন-গবেষকরাও তাঁর মতামতকে গুরুত্ব সহকারে মেনে নিয়েছেন। গবেষক বসন্তকুমারের পৈতৃক নিবাস ধর্মপাড়া, লালনের জন্মভিটা ভাঁড়ারা গ্রামের পার্শ্বেই অব¯ি’ত। সেই সূত্রে লালনকে জানা-বোঝা এবং ক্ষেত্রানুসন্ধান বসন্তকুমারের পক্ষে যতটা  সহজসাধ্য ও স্বাভাবিক ছিল, ততটা অন্যদের পক্ষে ছিল না। অন্যদিকে, মনসুরউদ্দিন ছিলেন নিষ্ঠাবান সংগ্রাহক। তিনি ছিলেন হারামণির সংকলক ও শেকড় সন্ধানী লোকগবেষক। সাড়ে তিন দশক ধরে শত শত লালনগীতি গভীর অভিনিবেশসহকারে সংগ্রহ করে হারামণির পাতায় লিপিবদ্ধ করেছেন। বসন্তকুমার যেভাবে লালনের জীবনকাহিনী বর্ণনা করেছেন, তাতে গবেষক মনসুরউদ্দিনের সমর্থন ছিল। দু জনের ভাষ্য সংক্ষেপ করে বলা যায়:

লালন ফকির অবিভক্ত নদীয়া জেলার কুষ্টিয়ার অন্তর্গত কুমারখালিসংলগ্ন গড়াই তীরের ভাঁড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম কায়¯’ পরিবারে, পদবি কর (মতান্তরে রায়)। বাবার নাম মাধব ও মাতা পদ্মাবতী। বাবা-মার একমাত্র সন্তান লালন শৈশবে বাবাকে হারান এবং সেই কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তিনি পাননি। চাপড়ার ভৌমিকরা তার মাতুলবংশ। ছোটবেলা থেকে লালন গানবাজনার পরিমণ্ডল বিশেষত কীর্তন ও কবিগান ভালোবাসতেন। ধর্মভাবও ছিল স্বভাবগত। অল্প বয়সে পিতৃহীনতার কারণে তিনি সংসারে জড়িয়ে পড়েন এবং বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে বিরোধের কারণে স্ত্রী ও মাকে নিয়ে পার্শ্ববর্তী দাসপাড়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। বারুণী তিথি উপলক্ষে সঙ্গী-সাথিদের নিয়ে বহরমপুরে গঙ্গাস্নানে যান এবং ফেরার পথে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। অচেতন লালনকে তাঁর সঙ্গীরা জলে ভাসিয়ে দিয়ে গ্রামে ফিরে রটিয়ে দেয়, লালন মারা গেছেন। তার মা ও স্ত্রী এবং গ্রামবাসী– এই মিথ্যে রটনা বিশ্বাস করে নেয়। মিথ্যে হলেও গ্রামবাসী এটিকে সত্য বলে মেনে নিয়েছিল তৎক্ষণাৎ। কারণ আঠারো শতকে অবিভক্ত বাংলার গ্রামদেশে বারবার কলেরা-বসন্ত মহামারিরূপে হানা দিয়েছে, তাতে গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়েছে। প্লেগ-গুটি বসন্ত-কলেরার প্রকোপেও ভারতবর্ষের লাখ লাখ মানুষ মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছে।

লালনের জীবনকাহিনি বাঁকবদল ঘটে বা নতুনভাবে নির্মিত হয় কুমারখালির নিকটবর্তী কালীগঙ্গার তীরে, যেখানে তিনি অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। এক স্নেহশীলা মুসলমান নারীর নিবিড় পরিচর্যা ও মমতায় সুস্থ’ হয়ে ওঠেন, লাভ করেন এক নতুন-জীবন। কিন্তু গুটিবসন্ত তার শরীর ও মনের ওপর যে-দগদগে ক্ষত এঁকে দেয়, তা সারাজীবনেও তিনি মোচন করতে পারেননি। সুস্থ হয়ে লালন বাড়ি ফিরলেন বটে, কিন্তু শাস্ত্র, ধর্ম ও সমাজের বিধান অনুসারে তিনি সেখানে আশ্রয় পেলেন না। কেন-না যার নামে শ্রাদ্ধকার্য সম্পন্ন হয়েছে এবং যিনি যবন-মুসলমানের গৃহে অন্ন গ্রহণ করেছেন, হিন্দুশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী, তাঁর জাত চলে গেছে; তিনি হয়ে গেছেন অস্পৃশ্য। হিন্দু সমাজ তাঁকে গ্রহণ করতে পারে না। সমাজ ও পরিবারের এহেন নিষ্ঠুর আচরণে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত লালন চিরদিনের জন্য গৃহত্যাগ করলেন। ক্ষত-বিক্ষত হয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন দরবেশ সিরাজ সাঁইয়ের কাছে। সিরাজ সাঁই তাঁকে বায়াত করেন এক নতুন লোকায়ত মানবধর্মে। এই ধর্মের কোনো শাস্ত্র কেতাব নেই, কোনো মহাপুরুষ নেই। সাম্প্রদায়িক মত ও প্রথাগত ধর্ম পরিত্যাগ করে সিরাজের প্রেরণা ও কারিগর সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় কুষ্টিয়ার নিকটবর্তী ছেঁউড়িয়া গ্রামে তিনি একটি আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। এক পর্যায়ে, তাঁর মরমি গান, মানবিক-আচরণ ও ভাব-ভাবুকতায় মুগ্ধ হয়ে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে দলে দলে মানুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। তাঁর এ শিষ্যরা অধিকাংশই ছিলেন গরিব মুসলমান ও নিম্নবর্ণের হিন্দু। অভিজাত শ্রেণি তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেনি। একজন মারফতি সাধক এবং নীলকর-সামন্তবাদ-শোষক-জমিদারবিরোধী প্রতিবাদী ব্যক্তি হিসেবে তার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে অবিভক্ত বঙ্গদেশের পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলে। গড়ে ওঠে বিশাল শিষ্যমণ্ডলী।

অনুমান ও লোকশ্রুতি-নির্ভর এমন লালন-জীবনকাহিনি সর্বাংশে সত্য এমন কথা বলার ইচ্ছে আমার নেই। লালনকে বোঝার জন্য তাঁর জীবনকাহিনি যে খুব জরুরি তা-ও নয়। তিনি যে জাতপাত, ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি, সাম্প্রদায়িকতাকে খারিজ করে দেওয়া, মানবধর্মে আস্থাশীল সাহসদীপ্ত ব্যক্তি ছিলেন– সেটাই জরুরি। কিন্তু অজ্ঞ-অন্ধ কিংবা ধান্ধাবাজ মানুষ লালনের জাতিত্ব নিয়েই টানাটানি করে চলেছেন। একের পর এক নির্মাণ করে চলেছেন নানান কেচ্ছা-কাহিনি। ‘লালনের গঙ্গাস্নানের অভিযান মুখে মুখে পালটে যায় কখনও নবদ্বীপ অভিমুখে, কখনও বা শ্রীক্ষেত্রে এবং এমনকি রাজশাহীর খেতুরির দিকে।.. বসন্তরোগাক্রান্ত লালন পরিত্যক্ত হন সঙ্গীসাথিদের দ্বারা, এমনকি কখনও নিজের বাবা-মা দ্বারা। অভিযানের সময়ে তাঁর বয়স নিয়েও নানা কাহিনি নানা বয়ান। মুমূর্ষু লালনের উদ্ধারকর্তা কারও মতে একজন মুসলমান নারী, কারও মতে মুসলমান ফকির।’৫ লালনের জীবনকাহিনির ওপর একটি সূক্ষ্ম আবরণ বা প্রলেপ আছে, সেই সাথে রয়েছে নানা বিতর্ক ও মতান্তর। কিন্তু এসব কাহিনির মধ্যে কোনো মিথ্যাচার বা বিভ্রান্তি নেই। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে একদল নতুন গবেষক এবং কিছু সাধুগুরু মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। লালনের হিন্দু-পরিচয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তারা  বলতে চাইছেন যে, লালন জন্মসূত্রে মুসলমান। ১৯৬৩ সালে গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী এম এ হাইয়ের নকশা অনুসারে লালনের

 

 

সমাধিসৌধ নির্মাণ করা হয়। এটি দেখলে  দিল্লির নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মকবরার কথা মনে পড়ে যায়। এভাবেই পাকিস্তানি শাসনামলে  লালনের ইসলামিকরণ শুরু হয়। লালন যে মুসলমান, এ কথা প্রথম  বলেছিলেন মুহম্মদ আবু তালিব। তিনি তাঁর ‘লালন পরিচিতি’ (১৯৬৮) গ্রন্থে’ লিখেছেন:  ‘বর্তমান লেখকই সর্বপ্রথমে.. লালনকে যশোহর জেলার হরিশপুর নিবাসী এবং জন্মগতভাবে মুসলমান দাবি করেন। ১৩৬০ সালের (আগস্ট ১৯৫৩ ঈসায়ী) ভাদ্র সংখ্যা মাহে নাও পত্রিকায় তিনি সমস্ত প্রচলিত ধারণার প্রতিবাদ করে বলেন–আনুমানিক ১১৭৩ (১৭৭৬ ইংরেজি) সালে যশোহর জেলার হরিনাথকুঞ্জ থানার অন্তর্গত হরিশপুর গ্রামের এক খোনকার পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন লালন শাহ।’৬ পাঞ্জু শাহের পুত্র খোন্দকার রফিউদ্দিনও তাঁর ‘ভাবসংগীত’ গ্রন্থে’ লালন ফকিরকে মুসলমান হিসেবে দাবি করেছেন।৭ সত্যিই কি তিনি মুসলমান ছিলেন? আবার  খোন্দকার গোত্রভুক্ত? তাহলে তো তিনি খান্দান মুসলমান ছিলেন?  কিন্তু অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের মতো গবেষকরা প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে ও যথাযথভাবে ক্ষেত্রসমীক্ষা চালিয়ে বলছেন অন্য কথা। তিনি ভারতী পত্রিকায় লিখেছেন:

“লালনের মত অতি উদার ও সরল ছিল। তিনি জাতিভেদ মানিতেন না, হিন্দু-মুসলমানকে সমভাবে দেখিতেন ও শিষ্যদিগের মধ্যে হিন্দু মুসলমান সকল জাতিকেই গ্রহণ করিতেন। লালন হিন্দু নাম, শাহ উপাধি মুসলমানজাতীয়– সুতরাং অনেকেই তাঁহাকে জাতির কথা জিজ্ঞাসা করিত। তিনি উত্তর না দিয়া স্বপ্রণীত নিম্নলিখিত গানটি শুনাইতেন—

সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে

লালন বলে, জাতির কীরূপ দেখলাম না এ নজরে।”

সম্ভবত ইচ্ছে করেই লালন তাঁর জাতি-ধর্ম পরিচয়টা গোপন রেখেছিলেন। এর পিছনে হয়তো কিছু কারণ  থাকতে পারে। প্রথমত, তিনি হয়তো সবার মাঝে নিজের একটি গ্রহণযোগ্য ও সর্বজনগ্রাহ্য ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি চাইতেন ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সব নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষ যেন তাঁর সম্প্রদায়ভুক্ত হয়। এসব ভেবেই নিজেকে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করতে চাননি, এমনকি  বাউল সাধক কিংবা সুফি-সাধক হিসেবেও নিজেকে উপস্থাপন করতে চাননি। তিনি এমন সব ধর্মীয় আচরণ করতেন যাতে করে সর্বধর্মের মানুষ তাঁকে নিজেদের লোক মনে করে গৌরব অনুভব করত। হিতকরী পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের বর্ণনা থেকে জানা যায়:

“ লালন কোনো সাম্প্রদায়িক ধর্মাবলম্বী ছিলেন না, অথচ সকল ধর্মের লোকই তাঁহাকে আপনজন বলিয়া জানিত। মুসলমানদিগের সহিত তাঁহার আচার-ব্যবহারের মিল থাকায় অনেকে তাঁহাকে মুসলমান মনে করিত। বৈষ্ণবধর্মের মত পোষণ করিত দেখিয়া হিন্দুরা ইঁহাকে বৈষ্ণব ঠাওরাইত।”

আসলে, লালন ছিলেন উদার ও নির্ভীক চিত্তের ব্যক্তি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও ছিলেন অগ্রসরচিন্তার মানুষ। ছিলেন শোষিত-বঞ্চিত ও প্রত্যাখ্যাত মানুষ, তাই শোষণ, পীড়ন, অসাম্য ও সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটিয়ে একটি বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। জন্মসূত্রে তিনি  মুসলমান হতে পারেন, আবার হিন্দুও হতে পারেন। তাঁর জন্ম খান্দান-খোন্দকার বংশে কিংবা কায়স্থ সম্প্রদায়ভুক্ত উচ্চবর্ণে হলেও হতে পারে। কিন্তু যাপন করতেন নিম্নবর্গের বেশরা বা অবৈদিক জীবন। এক গাঢ় অভিমান ও ব্যথা নিয়ে প্রথাগত ও প্রতিষ্ঠিত ধর্মের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। ত্যাগ করেছিলেন সমাজ-সংস্কার, অভিজাত সমাজের মেকি আচার-আচরণ ও কায়-কারবার। ক্ষত-বিক্ষত হয়ে বেছে নিয়েছিলেন গভীর নির্জন পথ। লোকালয় ছেড়ে বাসিন্দা হন ভিন্ন এক জগতের। গ্রহণ করেন নিগূঢ় লোকায়ত ধর্ম যার অপর নাম হিউম্যানিজম। কৌশলগত কারণে অথবা ক্ষুব্ধ অভিমানে জন্ম, ধর্ম, বংশ ও পারিবারিক পরিচয় উহ্য রেখেছিলেন। জনারণ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে খুঁজতে চেয়েছিলেন এক নিঃসীম একাকিত্ব। ডুব দিতে চেয়েছিলেন মনের অতলে। খুঁজতে চেয়েছিলেন অরূপ-রতন। কিন্তু কালের বৈরী প্রতিক্রিয়া, বিশেষত শোষণ, পীড়ন, জাতের নামে বাড়াবাড়ি, জমিদার-নীলকর সাহেবদের নির্মম অত্যাচার এই আত্মনিমগ্ন সাধককে রূপসাগরে ডুব দিয়ে নিমগ্ন থাকতে দেয়নি। বরং একতারা ফেলে আখড়া থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হন প্রতিক্রিয়াশীলতার দূর্দৈব তাণ্ডব রুখতে। অন্যায়-অবিচার, অসাম্য, ভেদবুদ্ধি, শক্তিমানদের তাণ্ডব রুখতে গিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন ‘মানুষ সত্যের উপাসক’। নির্দ্বিধ হয়েই ঘোষণা করা যায়, তিনি ছিলেন মানবধর্মের মহিমায় উদ্ভাসিত এক বলিষ্ঠ লোকনায়ক। তিনি মরমি সাধক হতে পারেন। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে লোকনায়ক বলতে যা বোঝায়, তিনি ছিলেন তা-ই। তিনি কোনো বিশেষ ধর্মসম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর ব্রান্ড হতে চাননি। তাই সারাজীবন সব ধরনের দেখনদারি ঝকমারি থেকে নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলেন মিম হরফের মতো। অথচ বিশ্বায়নের মোড়ল ও ধর্মব্যবসায়ীরা তাঁকে নিয়ে এক কুশলী খেলায় মেতে উঠেছেন। একদল বুদ্ধিজীবী তাঁকে মুসলমান বানানোর প্রচেষ্টায় সচেষ্ট হয়েছেন, আর একদল তাঁকে নিয়ে রাজনীতি করার বদ মতলব আঁটছেন। বলব, দু পক্ষই ভ্রান্ত পথের মতলববাজ। তিনি আসলে, সবার সঙ্গে থাকতে চেয়েও সবার থেকে আলাদা থাকতে চেয়েছিলেন। লালন ও তার আরাধ্য দেবতা যেমন এক সঙ্গে থেকেও রয়ে গিয়েছিলেন লক্ষ যোজন দূরে, তেমনই তিনিও আমাদের যোগে-ধ্যানের কাছে থেকেও থাকতে চেয়েছিলেন দূরে, বহুদূরে।

 

তথ্যসূত্র:

 

১ আজাদ রহমান : লালন মত লালন পথ। ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১০, পৃষ্ঠা: ৩০

২ আবদেল মাননান : লালন দর্শন, ঢাকা, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃ:১৮

৩ আজাদ রহমান: প্রাগুক্ত, পৃ: ৫৩

৪ উদ্ধৃত: সুধীর চক্রবর্তী: ব্রাত্য লোকায়ত লালন। রচনা সমগ্র। প্রথম প্রকাশ কলকাতা বইমেলা ২০১০। পৃ: ৩০২

৫ সুধীর চক্রবর্তী: ব্রাত্য লোকায়ত লালন, রচনা সংগ্রহ। কলকাতা, ২০১০। পৃষ্ঠা: ৩১০

৬ আবু তালিব: লালন পরিচিতি। ঢাকা, ১৯৬৮। পৃ: ১-২

৭  খোন্দকার রিয়াজুল হক সম্পাদিত ‘লালন-সাহিত্য ও দর্শন: ‘সুফিবাদ ও লালন-গীতি’। ঢাকা ১৯৭৬। পৃ: ১০১

 

 

 

আবদুল্লাহ আল-আমিন: ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ [অধ্যাপক], মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, মেহেরপুর

বাঙালির ভাষার অধিকার হরণ- রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক মৃত্যু

হোসাইন আনোয়ার আজ থেকে ৭৯ বছর আগের কথা। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ভারতবর্ষের সর্বশেষ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যটেন তার রোয়েদাদ ঘোষণা করেন, এই ঘোষণার পর

‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’ জননী রঞ্জিতা বড়ুয়াকে নিবেদিত সন্তান সত্যজিৎ বড়ুয়ার ‘সুরাঞ্জলি’

মা সুগৃহিনী শ্রমতী রঞ্জিতা বড়ুয়ার ৮৩ তম জন্মদিনকে উপলক্ষ করে ৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে গানে গানে সুরের

আন্দরকিল্লা’য় সুকুমার স্মরণ সন্ধ্যা

বিপুল বড়ুয়া   সুকুমার বড়ুয়া আমাদের ছড়াসাহিত্যের একজন প্রবাদপ্রতীম পুরুষ। নানা আঙ্গিক, বিষয়বস্তু, ধরণ-ধারণে, বৈচিত্রে অনুধ্যানে তিনি অসংখ্য ছড়া লিখে আমাদের ছড়া অঙ্গনে বহুমাত্রিকভাবে খ্যাত

জলে জঙ্গলে (পর্ব তিন)

মাসুদ আনোয়ার একে একে মুসল্লিরা বেরিয়ে আসছে মসজিদ থেকে। আমি দাঁড়িয়ে আছি স্থানুর মতো। প্রত্যেক মুসল্লির মুখের দিকে তীক্ষ্ম নজর বুলাচ্ছি। কাপ্তাই বড় মসজিদের ইমাম