বিশ্ব নারীদিবস কোনো একটি দিনের শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ৮ মার্চ বিস্তৃত করে নারীর বহুমাত্রিক চেতনার এক অবিরাম অনুশীলন, এক দীর্ঘ সামাজিক-ঐতিহাসিক জাগরণের ধারাবাহিকতা। সেই বোধকে কেন্দ্র করেই মাসিক ‘আন্দরকিল্লা’ এর মার্চ ২০২৬ সংখ্যাটি এক বিশেষ পরিকল্পনায় প্রকাশিত হযেছে। এই সংখ্যার সূচিপত্র পরিকল্পিত হয়েছে সেই বহুমাত্রিক চেতনাকে বিবেচনায় রেখে। আলোচনার গভীরতা ও বিশ্লেষণাত্মক গদ্যের পরিসর থেকে তুলে ধরা হয়েছে নারীর সামাজিক অবস্থান, সৃজনশীল চর্চা, নাগরিক ভূমিকা, রাজনৈতিক উপস্থিতি এবং মানসিক জগতের গভীর অন্তঃস্রোত। প্রতিটি লেখা কেবল সাধারণ বিবরণ নয়, প্রতিটি লেখায় আছে অনুধ্যান, বিশ্লেষণ ও বৌদ্ধিক অনুসন্ধানের সুসংহত বিন্যাস। তাই লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মননশীলতা সম্মিলিতভাবে এই সংখ্যাকে একটি যুক্তিনিষ্ঠ ও চিন্তাশীল কাগজে পরিণত করেছে।
এই সংখ্যার প্রচ্ছদও সৃজিত হয়েছে একই ভাবনার এক শিল্পিত রূপায়ণে। এখানে এক তীব্র প্রতীকী প্রতিকূলতা দৃশ্যমান হয়েছে—আলোর ফোয়ারা ও অন্ধকারের অবরোধ। আলোর এই ফোয়ারার ধারা হচ্ছে নারীর সত্তা, সম্ভাবনা, সৃজনশক্তি ও সহজাত যোগ্যতার রূপক। আর যে গাঢ় অন্ধকার এখানে প্রতিফলিত হয়েছে তা নারীর আলোর প্রবাহকে রুদ্ধ করে রেখেছে। এই অন্ধকার সমকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো, ধর্মীয় অন্ধগোঁড়ামি, ক্ষমতার কুপ্রবণতা এবং নারীর প্রতি বহুমাত্রিক সহিংসতার এক সঙ্ঘবদ্ধ আবরণ। যে আলোকস্রোত পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনের অন্তঃস্থলে স্বাভাবিক ও জীবনদায়ী ধারার মতো প্রবাহিত হওয়ার কথা ছিল, সেই স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহই বারবার অবরুদ্ধ হয়েছে অন্ধকারের আচরণে। সমগ্র পৃষ্ঠাজুড়ে প্রচ্ছদের যে শিল্পভাষা তা নিছক নান্দনিক কেনো আয়োজন নয়, এই আলোর স্রোত এবং অন্ধকারের প্রতিফলন হচ্ছে এক সামাজিক উচ্চারণ। এখানে আলোর ফোয়ারা কেবল সম্ভাবনার প্রতীক নয়, বরং প্রতিরোধেরও ভাষা। অন্ধকার অবরোধের বিপরীতে ফোয়ারার এক অবিনাশী প্রসারিত ঘোষণা। নারীদিবস এই সংখ্যা হচ্ছে— সেই অন্ধকার থেকে আলোর ফোয়ারার অভিযানে বের হয়ে আসার উৎকেন্দ্রিক চেতনা।
মার্চ মাস আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক আকাশছোঁয়া চেতনার মাস, লাল-সবুজ পতাকার বাংলাদেশের আত্মমুক্তির অগ্নিঝরা সময়। পরাধীনতার দীর্ঘ অন্ধকার পেরিয়ে স্বাধীনতার আলোকবর্তিকার দিকে জাতির প্রথম দৃঢ় পদক্ষেপের দিন ২৬ মার্চ— আমাদের স্বাধীনতা দিবস। এই দিনটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘোষণার তারিখ নয়, এই দিবস একটি জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, প্রতিরোধ এবং আত্মত্যাগে নির্মিত মহাকাব্যিক সূচনার দিন। এই সংখ্যার মাধ্যমে ‘আন্দরকিল্লা’ অগ্নিঝরা মার্চকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে। একই সঙ্গে এ বছর মার্চের পরিসরে উপস্থিত হয়েছে ঈদুল ফিতরের আনন্দময় অবগাহন। দীর্ঘ রোজার আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি ও মানবিক সহমর্মিতার সাধনার পর ঈদ নিয়ে আসে সমবায়ী আনন্দের এক উজ্জ্বল মুহূর্ত। তাই এই সংখ্যার ভাবনার ভেতরেও স্বাধীনতার মুক্তিচেতনা, আত্মমর্যাদা এবং ঈদুল ফিতরের অনন্যতা এক গভীর সামাজিক প্রেক্ষাপটে অনুরণিত হয়েছে।

