আকলিমা আক্তার
বিশ্ব নারী দিবস এলে আমরা প্রায়ই এক ধরনের স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি—মনে হয়, অন্তত একটি দিন নারীর কথা বলা হলো। অথচ প্রশ্ন থেকেই যায়—এই বলা কি আদৌ শোনা হয়ে ওঠে? নাকি প্রতিবছর ৮ই মার্চ আমরা নারীর জীবনকে কয়েক ঘণ্টার আলোয় এনে আবার আগের অন্ধকারেই ফিরিয়ে দিই?
আজ নারী দিবস আর কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি আমাদের সামাজিক বিবেকের সামনে দাঁড় করানো এক নীরব, কিন্তু অস্বস্তিকর প্রশ্নচিহ্ন।
সমকালীন বাংলাদেশের নারী বাস্তবতা এক দ্বিমুখী অবস্থানে দাঁড়িয়ে। একদিকে নারী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে, প্রশাসন, অর্থনীতি, শিল্প ও সংস্কৃতিতে দৃশ্যমান ও সক্রিয়। অন্যদিকে, সেই একই সমাজে নারী এখনো নিরাপত্তাহীন—ঘরে, রাস্তায়, কর্মক্ষেত্রে, এমনকি ভার্চুয়াল পরিসরেও। এই বৈপরীত্য একসাথে আমাদের অর্জনের গল্প যেমন বলে, তেমনি আমাদের গভীর ব্যর্থতার দলিলও হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা নারীর অগ্রগতির গল্প বলতে ভালোবাসি। কিন্তু সেই গল্পের ভেতরে ঢুকে তাকালে দেখা যায়—এই অগ্রগতির পেছনে লুকিয়ে আছে দ্বিগুণ শ্রম, নীরব সহনশীলতা এবং অসংখ্য আপস। একজন নারী যখন ‘সফল’ হন, তখন তাকে প্রমাণ করতে হয় সে শুধু দক্ষ কর্মী নয়, বরং একই সঙ্গে ভালো মেয়ে, ভালো স্ত্রী, ভালো মা। পুরুষের সাফল্যের ক্ষেত্রে যেখানে দক্ষতাই যথেষ্ট, নারীর ক্ষেত্রে সেখানে চরিত্রও বিচারাধীন থাকে।
সবচেয়ে জটিল বাস্তবতা হলো—নারীর ওপর সহিংসতা আজ আর কেবল শারীরিক সীমায় আবদ্ধ নয়। এটি মানসিক, সামাজিক এবং কাঠামোগত। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব স্তরেই এমন নিয়ম, ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান, যা নারীর স্বাধীনতাকে শর্তসাপেক্ষ করে তোলে। নারীকে এখনো শেখানো হয় কীভাবে নিরাপদ থাকতে হবে; খুব কমই শেখানো হয় সমাজকে কীভাবে নিরাপদ করা যায়।
বিশ্ব নারী দিবসের বক্তৃতায় আমরা প্রায়ই বলি—“নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কি নিজের ইচ্ছায় এগোচ্ছে, নাকি কেবল টিকে থাকার প্রয়োজনে? নারীর শিক্ষা, চাকরি বা আত্মনির্ভরতা যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায় রূপ না নেয়, তাহলে তা ক্ষমতায়ন নয়—বরং দায়িত্বের নতুন বোঝা মাত্র।
শিল্প ও সংস্কৃতির পরিসরেও নারীকে প্রায়শই প্রতীকে রূপান্তর করা হয়—মা, মাটি, শক্তি, সহনশীলতা। এই প্রতীকায়ন প্রথম দৃষ্টিতে সম্মানজনক মনে হলেও, অনেক সময় তা নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার পথ রুদ্ধ করে দেয়। নারী কেবল সহনশীল নয়, সে প্রশ্নকারী; কেবল ত্যাগী নয়, সে প্রতিবাদী; কেবল অনুপ্রেরণা নয়, সে একজন পূর্ণ নাগরিক।
এই বাস্তবতায় নারী দিবস হওয়া উচিত উদযাপনের পাশাপাশি আত্মসমালোচনার দিন। আমরা কী ধরনের সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে নারীকে বারবার ‘বিশেষ দিন’ দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিতে হয় তার অধিকার? সমতা যদি স্বাভাবিক হতো, তবে আলাদা করে দিবসের প্রয়োজন পড়ত কি?
নারীর অধিকার কোনো বিশেষ সুবিধা নয়—এটি মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা। নিরাপদ জীবন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার—এই মৌলিক দাবিগুলোকে উৎসবের ভাষায় ঢেকে দিলে বাস্তবতা বদলায় না।
বিশ্ব নারী দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—নারীর মুক্তি কোনো একক লড়াই নয়। এটি একটি সামষ্টিক সামাজিক রূপান্তরের প্রশ্ন। এখানে নারী-পুরুষ বিভাজনের চেয়ে জরুরি ন্যায়, মানবিকতা ও দায়িত্বের অবস্থান।
যেদিন নারী দিবস আর প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে থাকবে না, সেদিনই হয়তো আমরা সত্যিকারের সমতার সমাজের কাছাকাছি পৌঁছাব। তার আগে পর্যন্ত এই দিন আমাদের প্রশ্ন করার সাহস দিক—উদযাপনের পাশাপাশি বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর সাহস।
আকলিমা আক্তার, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা

