এখন সময়:বিকাল ৪:১১- আজ: শুক্রবার-১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

এখন সময়:বিকাল ৪:১১- আজ: শুক্রবার
১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

বসুমতি পূজা: লোকবিশ্বাসের ঐতিহ্যবাহী প্রথা

অমল বড়ুয়া

 

‘বসুমতি’ বলতে মূলত পৃথিবী বা ধরিত্রীকে বোঝানো হয়। এটি বসুন্ধরা, ধরণী বা ভূমি শব্দের সমার্থক শব্দ। বসুমতিকে ‘সর্বংসহা’ বলা হয়। অর্থাৎ মা বসুমতির বুকে এত পাপ কর্ম, অন্যায়-অনাচার, এত পাপী-তাপীদের পদভারেও তিনি নিশ্চুপ নিশ্চলভাবে সব কিছুর ভার বহন করছেন, সহ্য করছেন মানুষিক অত্যাচার, নিপীড়ন। তারপরও শস্য, ফল, জল দিয়ে জীবগণকে লালন পালন করছেন। এই জন্যই ভূমিদেবীকে ‘মা’ বলা হয়। তিনি ভূবতী, ভূবনী, ভূবনেশ্বরী, অবনী, পৃথিবী, বারাহী, ধরিত্রী, ধাত্রী, ধরণী, বসুধা, বসুন্ধরা, বৈষ্ণবী, কাশ্যপি, উরভি, ইরা, বসুমতি, হেমা ইত্যাদি বিভিন্ন নামে পরিচিত। আবার বসুমতি শব্দটি একটি নারীবাচক নাম। বসুমতি নামটি গভীরতা, প্রজ্ঞা এবং বিশালতার মতো গুণাবলীর প্রতীক। পৃথিবীকে মাতৃরূপে পূজা শুধু যে ভারতবর্ষে আছে তা নয়, বিশ্বের অনেক প্রাচীন সভ্যতা যেগুলো এখন আর নেই সেখানেও ভূমির অধিপতি হিসাবে দেবীরূপ কল্পনা করা হয়েছে। নেপালে বসুমতি বা ভূমিপূজা ব্যাপক হারে পালিত হয়। ইন্দোনেশিয়ায় বিশেষ করে বালিতে ‘আগামা পূজা’র অংশ হিসেবে বসুমতি বা ভূমিপূজা বা ভূমির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। পাশ্চাত্যে ভূমিপূজার সরাসরি অনুরূপ প্রথা না থাকলেও, নির্মাণ শুরুর আগে ‘গ্রাউন্ডব্রেকিং’ নামক একটি অনুষ্ঠান করা হয়, যা অনেকটা একই ধরনের উদ্দেশ্য বহন করে।

 

শ্রীমদ্ভাগবতে ভূমিদেবী ও রাজা পৃথুর একটি উপাখ্যান আছে। ভূমিদেবী একদা সমস্ত শস্য নিজের মধ্যে সংবরণ করলে রাজা পৃথু ক্রুদ্ধ হয়ে ভূদেবীর অন্বেষণে বের হন। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে,- পৃথিবীর অন্য নাম বসুমতি। কথিত আছে, বসুমতি সুবর্ণ অগ্নির তেজে উৎপন্ন হয়। পৃথিবী এই বসু (সুবর্ণ বা ধন) ধারণ করে আছেন বলে তাঁর নাম হয় বসুমতি। মিথিলার রাজা জনক ভূমিকর্ষণ উৎসবের সময় মাটি থেকে সীতাদেবীকে লাভ করেন বলে উল্লিখিত হয়েছে। সেখানে দেবী সীতা বসুন্ধরাকন্যা ‘বৈদেহী’ নামে প্রসিদ্ধা। জৈন উপাখ্যান মতে, একদা বসুমতি নামে এক রাজকুমারী ছিলেন। তিনি ছিলেন চম্পার রাজা দধিবাহন ও রাণী ধারিণীর কন্যা। তিনি অত্যন্ত সুন্দরী এক রাজকুমারী ছিলেন। একদিন চম্পার রাজা এবং নিকটবর্তী কৌশাম্বী রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে রাজা পরাজিত হয়ে রাজ্য হারা হন এবং বসুমতি দুর্বিষহ জীবনের সম্মূখীন হন। পরবর্তীতে যিনি শষ্য আর ফসলের প্রতিভূ হিসেবে আবির্ভূত হন।

 

মা বসুমতি পূজা পৃথিবীর উর্বরতা, নারীশক্তি এবং কৃষিভিত্তিক জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিবেদিত একটি ধর্মীয় উৎসব। বসুমতি দেবীর পূজা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, যা একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য বহন করে। বসুমতি দেবী হলেন মাটির বা মৃত্তিকা দেবী। তার সন্তুষ্টি লাভ করতে পারলে ফসল ভালো হয়। উৎসবে মাতৃভূমির ঋতুচক্র এবং কৃষির ছন্দের উপর জোর দেওয়া হয়, যা ভালো ফসল উৎপাদনে সাহায্য করে। বসুমতি স্নান বা ‘পৃথিবীর স্নান’ এই পূজার একটি গুরুত¦পূর্ণ অংশ। পূজা’ শব্দটির অর্থ ‘পুষ্পকর্ম’। পুষ্প, তুলসীপত্র, বিল্বপত্র, চন্দন প্রভৃতি পূজার উপকরণ। এসব দিয়ে দেব-দেবীর পূজা করা বা শ্রদ্ধা জানানো হয়। বৈদিক যুগে উপাসনা ছিল যজ্ঞভিত্তিক। কিন্তু পৌরাণিক যুগে ঈশ্বরের বিভিন্ন শক্তি ও গুণের সাকার রূপ হিসেবে দেব-দেবীর পূজার প্রচলন ঘটে। বর্তমানে প্রতিমা, চিত্র, ঘট, প্রভৃতি আধারে পূজা করার রীতিই সমধিক প্রচলিত। প্রতিমা মানে ‘সাদৃশ্য’। হিন্দু ধর্মে তাই প্রতিমা বলা হয়। দেবতারা চেতনসত্তা। সকল দেবতাই পাপনাশক ও মঙ্গলকারক। মন্ত্র, শ্লোক, স্তব ও স্ত্রোত্রে যে দেবতার যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তাকেই প্রতিমার আকারে প্রত্যক্ষ রূপ দিয়ে পূজা করা হয়।

 

চট্টগ্রামের গ্রামীণ সংস্কৃতিতে বসুমতি পূজাকে বসুমতি লোট বলা হয়। যা হলো শক্তির আরাধনা, প্রকৃতির পবিত্রতা, আর মাতৃস্বরূপা ধরিত্রী দেবীর বন্দনার এক অনন্য উপলক্ষ। পৌষ সংক্রান্তিতে ভূমিতে চালের গুঁড়ো দিয়ে নানা কিছু এঁকে পিঠে, গুড়, ধান, দুর্বা, সিঁদুর, ফুল দিয়ে পূজা করা হয়। বসুমতি পূজার জন্য মাটি ও ধান প্রধান উপকরণ, যা উর্বরতা ও শস্যের প্রতীক। দেবীর প্রতি ভক্তি প্রদর্শনের জন্য এবং পূজার সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ফুল ও ফল ব্যবহৃত হয়। বসুমতি বা ভূমি পূজার মৌলিক উপকরণের মধ্যে রয়েছে মাটি, ধান, দুর্বা, চন্দন, হলুদ, ফুল, ফল, চাল, ধূপ, দীপ, পান, সুপারি, মিষ্টি, ঘট, কলস। এছাড়াও, পূজার জন্য পরিষ্কার পোশাক ও উপকরণ অপরিহার্য। বসুমতিকে নিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘কনিকা’ (১৯৪৮) কাব্যগ্রন্থে ‘ভিক্ষা ও উপার্জন’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখেন।

 

‘বসুমতি, কেন তুমি এতই কৃপণা-

কত খোঁড়াখুঁড়ি করি পাই শস্যকণা।

দিতে যদি হয় দে মা, প্রসন্ন সহাস-

কেন এ মাথার ঘাম পায়েতে বহাস।

বিনা চাষে শস্য দিলে কী তাহাতে ক্ষতি।’

শুনিয়া ঈষৎ হাসি কন বসুমতি,

‘আমার গৌরব তাহে সামান্যই বাড়ে,

তোমার গৌরব তাহে নিতান্তই ছাড়ে।’

 

বসুমতি বা ভূমিদেবীর একটি রূপে চারটি হাতির পৃষ্ঠে উপবিষ্টা ও চতুর্ভুজা রূপে কল্পনা করা হয়। তিনি চার হাতে দাড়িম্ব ফল, জলপাত্র, ভেষজ ওষুধ পাত্র ও শাকসবজি ধারণ করে আছেন। অপর একটি মূর্তিতে নীল পদ্ম ও অভয়মুদ্রায় দিব্যকান্তি শোভাময় দেদীপ্যমান হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ভূদেবীকে কোনো পুরাণে মা লক্ষ্মীর একটি রূপ বলে অভিহিত করা হয়েছে। পুরাণ মতে, ভগবান শ্রীহরি বরাহ অবতার নিয়ে হিরণ্যক্ষ নামক এক দানবকে বধ করে স্বীয় দন্তে বসুমতি দেবীকে উদ্ধার করে এনেছিলেন। মার্কণ্ড পুরাণ মতে, মধুকৈটভ নামক দুই অসুরের মেদ থেকে ভূদেবীর সৃষ্টি বলে উল্লিখিত হয়েছে। পুরাণ মতে ভগবান বরাহ সবার প্রথমে দেবী বসুমতিকে পূজা করেছিলেন। তারপর প্রজাপতি ব্রহ্মা, মুনিগণ, মনু ও মনুষ্যগণ দেবী বসুমতির পূজা করেন। পুজার শুরুতে উপযুক্ত মন্ত্র উচ্চারণ করে পূজা শুরু করেন। মা বসুমতির স্তব হলো-

 

জয় জয়ে জলাধারে জলশীলে জয়প্রদে।

যজ্ঞশুকর জায়ে চ জয়ং দেহি জয়াবহে।

মঙ্গলে মঙ্গলাধারে মাঙ্গল্যে মঙ্গলপ্রদে।।

মঙ্গলার্থং মঙ্গলেশে মঙ্গলং দেহি মে ভবে।।

সর্ব্বাধারে চ সর্ব্বজ্ঞে সর্ব্বশক্তিসমন্বিতে।…

 

‘হে জয়শীলে; তুমি জীবের আধারস্বরূপা, জয়প্রদানকারিণী, যজ্ঞবরাহপত্নী; তুমি নিরন্তর জয় বহন করো; আমাকে জয় প্রদান করো। হে মঙ্গলপ্রদে! তুমি নিখিল মঙ্গলের আধারভূতা, মঙ্গলই তোমার একান্ত কাম্য, তুমি মঙ্গলের অংশরূপিণী, জগতে তুমি আমাকে মঙ্গল প্রদান করো। তুমিই একমাত্র সকল বস্তুর আধারস্বরূপা, তুমি সকলের বীজস্বরূপা ও সমস্তশক্তিযুক্তা…’

 

ভারতীয় সংস্কৃতিতে মাটি ও ভূমির গৌরব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যপরম্পরা পৃথিবীকে দেবী এবং ঈশ্বর হিসেবে পূজা করার রীতি-নীতিকে অনুসরণ করে আসছে। বসুমতি বা ভূমি পূজা এমন একটি পদ্ধতি যেখানে ভূমির প্রাকৃতিক শক্তিকে আদর্শ করা হয়। ভুমি বা বসুমতির পূজায় বসুমতির প্রণাম হলো-

 

ওঁ সমুদ্রে মেখলে দেবি! পর্ব্বতস্তনমণ্ডলে।

বিষ্ণুপত্নী নমস্তভ্যভাং পাদস্পর্শং ক্ষমস্ব মে।।

 

‘দেবী; সমুদ্র তোমার আঁচলস্বরূপ, পর্বত তোমার স্তনমণ্ডল স্বরূপ। হে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পত্নী বসুধারাদেবী, তোমাকে প্রণাম জানাই। তোমার ওপর চরণ রেখে হাঁটাচলার জন্য আমাদের অপরাধসকল ক্ষমা করো।’

 

দক্ষিণ ভারতের একমাত্র মহিলা আলভার সাধু অন্ডালকে ভূমি দেবীর অবতার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পূর্ব ভারতের ওড়িশায় ‘রজনী’ উৎসব ভূদেবীকে উৎসর্গ করা তিন দিনের একটি উৎসব। এই উৎসবে রজনের সময়, ভূদেবীকে মাতৃত্ব, নারীত্ব এবং উর্বরতার প্রতীক হিসেবে সম্মান করা হয়। এই উৎসব বর্ষার সূচনা এবং নতুন ফসলের আগমনকে চিহ্নিত করে। ‘রজনী’ প্রধানত মহিলা এবং অল্পবয়সী মেয়েদের দ্বারা উদযাপন করা হয়। তারা নতুন পোশাক এবং সুন্দর অলঙ্কার পরিধান করে আত্ম-যত্নে লিপ্ত হয়। তাদের পায়ে লাল রঙ (আলতা) লাগানো এবং ফুল দিয়ে চুল সাজানো অপরিহার্য আচার। তাদের প্রিয় খাবার এবং পোড়া পিঠা নামে একটি বিশেষ ওড়িয়া সুস্বাদু খাবার এই উপলক্ষে বিশেষভাবে প্রস্তুত একটি বেকড ভাতের পিঠা খাওয়ানো হয়। ভূদেবীর মূর্ত প্রতীক হিসেবে বিবেচিত নারী ও মেয়েদের জন্য ফুল দিয়ে সাজানো দোলনা স্থাপন করা হয়। উৎসবের সময় তাদের মাটি স্পর্শ করার অনুমতি নেই। এই উৎসবটি ওড়িশা এবং তার বাইরে কৃষি, নারী এবং পরিবেশের প্রতি পারস্পরিক নিভর্রতা এবং শ্রদ্ধার প্রতীক।

বসুমতি পূজা ঐতিহ্যগত, প্রকৃতিগত, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ লোকপ্রথা। বিশ্বাস করা হয় যে, বসুমতি পূজা ভূমিকে রক্ষা করে, উন্নত করে এবং যে কোনও আচারের সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়ায়; শান্তি, সমৃদ্ধি  ও সুখ আনে। বসুমতি পূজা করলে জমি শুদ্ধ হয় এবং এর থেকে নেতিবাচক শক্তি দূর হয়। তাছাড়া, বসুমতি পূজা একটি পবিত্র ও শক্তিশালী উপলক্ষ যা আমাদেরকে ভূমির গৌরব বোঝার এবং সম্মান করার সুযোগ করে দেয়। এটি আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কুপ্রভাব থেকে বাঁচতে ভূমি ও প্রকৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

অমল বড়ুয়া, কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

বসুমতি পূজা: লোকবিশ্বাসের ঐতিহ্যবাহী প্রথা

অমল বড়ুয়া   ‘বসুমতি’ বলতে মূলত পৃথিবী বা ধরিত্রীকে বোঝানো হয়। এটি বসুন্ধরা, ধরণী বা ভূমি শব্দের সমার্থক শব্দ। বসুমতিকে ‘সর্বংসহা’ বলা হয়। অর্থাৎ মা

শিল্প-সাহিত্য চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত

তানভীর আহমেদ হৃদয় মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত সংগ্রাম, সংঘাত ও পরিবর্তনের ইতিহাস। পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকে মানুষ নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করেছে—কখনো প্রকৃতির বিরুদ্ধে, কখনো অন্য

আঙ্গিক বিবেচনায় মিথের চরিত্র

নাজমুল হুদা প্রকৃতিতে ঘটা ঘটনায় কল্পিত গল্পের ব্যাখ্যার কারণে মিথকে বলা হয় আদিম মানুষের বিজ্ঞান। ধারণার মধ্যে মিথের জন্ম বিশ্বাসের মধ্যে মিথের বসবাস। মানুষের জীবনের