এখন সময়:সকাল ১১:৪৬- আজ: রবিবার-১০ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৭শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

এখন সময়:সকাল ১১:৪৬- আজ: রবিবার
১০ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৭শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

ইতিহাসের আয়নায় মুজিবনগর সরকার

হোসাইন আনোয়ার

১ মার্চ সোমবার ১৯৭১ ঢাকা স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা চলছে। প্রায় ত্রিশ হাজার দর্শক খেলা দেখতে উপস্থিত। ৩ মার্চ ১৯৭১, ঢাকায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসবে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পঁয়ত্রিশজন সংসদ সদস্য ঢাকায় এলেন ভুট্টোর পিপলস পার্টির মাত্র ৮৩ জন সদস্য ঢাকায় আসলেন না। হঠাৎ ১লা মার্চ সংসদ অধিবেশন অনিদিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হলো। সাথে সাথেই গর্জে ওঠে বাংলার জনগণ। ঢাকা স্টেডিয়ামের খেলা ভেঙে গেল। তাঁবুতে আগুন ধরিয়ে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে এলো। সমবেত হলো হোটেল পূর্বানীর সামনে। বিকেল চারটায় শেখ মুজিরের সাংবাদিক সম্মেলন।

শেখ মুজিব তা শেষ করে বেরিয়ে জনতার উদ্দেশে বলেন, এটি চক্রান্ত ছাড়া কিছূই নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মতামত উপেক্ষা করে সংখ্যালঘিষ্ঠ দলের প্রতিটি দাবি মেনে নেওয়া হচ্ছে। এটা গণতন্ত্র নয়। এটা স্বৈরতন্ত্র। তিনি আরো বললেন, আগামী ৭ মার্চের মধ্যে যদি বর্তমান পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে যা ঘটবে তার জন্য তিনি দায়ী থাকবেন না।

বস্তুত ৭ মার্চের ভাষণেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া ছিল। শেখ মুজিব বলেই দিলেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।” স্বাধীনতার ঘোষণা কিন্তু ৭ মার্চই দেয়া হয়েছিল এবং তিনি এতে বলেছিলেন, আমি যদি হুকুম দেবার না পারি, তোমরা …।

১ মার্চ আরোও দুটো ঘটনা ঘটেছিল। বাংলাদেশের, গভর্নর ভাইস অ্যাডমিরাল আহসান এর স্থলে সামরিক প্রশাসক লে. জে. সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে সামরিক প্রশাসনের দ্বায়িত্ব দেওয়া হলো। সকল খবর এবং ছবি সংবাদপত্রে না ছাপানো সামরিক আদেশ দেয়া হয় এবং গণআন্দোলনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

১৬ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত চললো আলোচনার নামে নাটক। জেনারেল ফজল মুকম খান তার রচিত ‘PAKISTAN Crisis in Leadership” গ্রন্থে বলেন, ২৩ মার্চ দুপুরে প্রেসিডেন্ট—ইয়াহিয়া টিক্কা খানের বাসভব ফ্লাগ—স্টাফ হাউসে এলেন এবং জরুরি অপারেশনের জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দেন। স্থির হলো ২৬ মার্চ রাত ১টায় অপারেশন শুরু হবে। ২৪ মার্চ সিনিয়র অফিসারদের বিভিন্ন সেনানিবাসে পাঠানো হলো কমান্ডারদের আদেশ (operational order)  পৌঁছে  দেয়ার জন্য। এভাবেই গণআন্দোলনের মৃত্যু ঘটানো হয়। এবং জনগণকে একটি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়া নির্দেশ দেয়া হয়।

২৬ মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস। একমাত্র ঢাকা সেনানিবাস ছাড়া সেদিন কোথাও পাকিস্তানি পতাকা উত্তোলন হতে দেখা যায়নি। ই পি আর দের সেক্টর হেড কোয়ার্টারে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন প্রসঙ্গে “দৈনিক পাকিস্তান” বাংলাদেশের পতাকা যশোরের ই পি আর দপ্তরে উড়ছে শিরোনামে লিখলো— “যশোর, ২৩ মার্চ এখানে ভোলা ট্যাংক রোডস্থ পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস এর হেডকোয়ার্টারে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ই পি আর জোয়ানরা জয় বাংলা গান গেয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে এবং পতাকাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।”

২৬ মার্চ ঘটনার বাস্তবতায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নির্ধারিত বেতার ভাষণ ও বাতিল করা হয়। ২২ মার্চের সংবাদপত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার প্রতিকৃতি বাংলাদেশের সকল সংবাদ পত্রে ছাপা হয়। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২৩ মার্চ ভোর থেকেই ঘরে ঘরে এই পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানায়। এই দিন (২৩ মার্চ ১৯৭১) প্রতিটি ঘরের শীর্ষে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। অফিস, আদালত কোর্ট—কাচারি, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ ঢাকার সকল দূতাবাস সর্বত্রই এই পতাকা উড়তে দেখা যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৩২নং ধানমন্ডির বাসভবনে অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ দিন জয়বাংলা বাহিনী, সকাল ৯ টা ২০ মিনিটে রৌদ্রকরোজ্জল পল্টন ময়দানে কুচকাওয়াজের মাধ্যমে এ পতাকা উত্তোলন করে। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ.স.ম আবদুর রব, এ আবদুল কুদ্দুস মাখন এতে অভিবাদন গ্রহণ করেন। এ সময় হাজার হাজার দর্শক বিপুল করতালিতে ফেটে পাড়েন। মাইকে তখন বাজছিল- “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি”।

২৫ মার্চ বিকেলে শেখ মুজিব গোপন সূত্রে খবর পেলেন ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করেছেন এবং সেনাবাহিনী আক্রমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। শেখ মুজিব শত অনুরোধ সত্ত্বেও আত্মগোপন’এ যেতে অস্বীকার করলেন। এবং তাঁর নবীন—প্রবীণ সকল সহকর্মীদের ঢাকা ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দিলেন। এবং চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরীর কাছে নিম্নবর্ণিত বার্তা পাঠান।

TO THE PEOPLE OF BANGLADESH AND ALL OF THE WORLD
Pakistan armed forces suddenly attacked the EPR base at Peelkhana and Police line at Rajarbagh 00hrs 26.03.71 killing lots of People. Still, battle is going on with EPR & Police forces in the streets of Dacca. People are fighting gallantly with the enemy forces for the cause of freedom of Bangladesh. May Allah bless you and help you in your struggle for freedom, Jay Bangla. Sd/ Sk Mojibur Rahman.

২৬ মার্চ সকালের মধ্যেই শেখ মুজিবের এই বার্তা হ্যান্ডবিল আকারে ছাপিয়ে বিলি করার ব্যবস্থা করে আওয়ামী—লীগ নেতৃবৃন্দ। ২৬ মার্চ ১.৩৩ মিনিটে পাক বাহিনীর হাতে বন্দি হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই ঘোষনা দেন।
চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরীর অনুমতি নিয়ে চট্টগ্রাম বহিঃনোঙ্গরে অবস্থানরত বিদেশি জাহাজের মাধ্যকে বহিঃর্বিশ্বে এই বার্তা পাঠানোর জন্য বলা হল। সে অনুযায়ী সকান আনুমানিক ৬.৩০ মিনিট/৭ টার দিকে (২৬ মার্চ ঘোষণার বাণীটি নির্ভুলভাবে প্রেরণ করা হয়। বহিঃ নোঙ্গরে অবস্থানরত ইন্ডিয়ান জাহাজ এম.ভি. ভি.ভি. গিরি ও বিদেশি জাহাজ ডুপ্লেক্স চ্যানেলে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার প্রচার হয় ইন্ডিয়ান জাহাজ এম.ভি.ভি.ভি. গিরী সকাল ৮ টার দিকে কনফার্ম করছেন জাহাজের ক্যাপ্টেন টপ আর্জেন্ট মেসেজ হিসেবে কলকাতা কোস্টার আরজেন্ট কোটার স্টেশনের (ডি, ডাবলিউ সি) মাধ্যমে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দ্রিরা গান্ধীর কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয় এই ঘোষণাটি। এভাবেই সমগ্র বিশ্বে বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণাটি প্রচারিত হয়। এরই মধ্যে ভয়েস অব আমেরিকা রাত ১০ টার বাংলা সংবাদে প্রচার করে। শেখ মুজিবুর এই রহমান একটি গুপ্তস্থান থকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এটি প্রচারিত হয়।

আরও একটি সূত্র যেতে জানা যায় গ্রেফাতার হবার পূর্ব মুহূর্তে ঢাকার বলধা গার্ডেনে রক্ষিত একটি গোপন ট্রান্সমিটার থেকেও বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বিগ্রেডিয়ার সিদ্দিক সালিক তাঁর “উইটনেস টু সারেন্ডার” গ্রন্থে উল্লেখ করেন— যখন প্রথম গুলিটি বর্ষিত হলো, ঠিক সেই মুহুর্তে পাকিস্তান রেডিওর সরকারি তরঙ্গের (ওয়েভ লেন্থ) এর কাছাকাছি একটি তরঙ্গ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষীর্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। এই কণ্ঠের বাণী শুনে মনে হলো তা আগেই রেকর্ড করে রাখা হয়েছিল। এতে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা করলেন।

মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন এ সম্পর্কে লিখলেন, খবরটি কিভাবে কোথা থেকে এলো, তা ভেবে কেউ বসে থাকলো না সারা পূর্ব পাকিস্তান ও বিশ্ব মিডিয়ায় তা ছড়িয়ে পড়ে।

অন্যদিকে ২৭ মার্চ দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় “ট্র্যাজেডি ইন পাকিস্তান” নামক সম্পাদকীয় মন্তব্যে বলা হয় যে, যেকোন মূল্যে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখার ব্যাপারে ইয়াহিয়া খানের একগুঁয়ে মনোভাব শেখ মুজিবকে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার ঘোষণা করতে বাধ্য করে। বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে অখণ্ড পাকিস্তানের চিন্তাধারা অযৌক্তিক বলে আবার প্রামানিত হয়েছে। (“ট্র্যাজেডি ইন পাকিস্তান” দি গার্ডিয়ান) ২৭ মার্চ ১৯৭১।

একটি তথ্য এখানে উল্লেখ করতেই হয়। ২৬ মার্চ দুপুর ১২.৩০ মিনিটে কালুরঘাটস্থ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রথম পাঠ করেন আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান। অনুষ্ঠানটির স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র ৩০ মিনিট।

২৭ মার্চ ৭১ গঠিত সদ্য স্বাধীন বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে পুনরায় সন্ধ্যা ৭.৩০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন মেজর জিয়াউর রহমান। মেজর জিয়াউর রহমানের সেদিনের ঐতিহাসিক (ঘোষণাটি তাঁর স্ব—কন্ঠে পাঠকৃত কিছু অংশ নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ “The Government of the Sovereign State…”Of Bangladesh On behalf of our National Great leader, the Supreme Commander of Bangladesh, Sheikh Mujibur Rahman, we hereby proclaim the Independence of Bangladesh and the Government headed by Sheikh Mujibur Rahman has already been formed„……….
Joy Bangla.

(সূত্র: একাত্তরের রণাঙ্গন, শামসুল হুদা চৌধুরী, পৃষ্ঠা ৩১—৩২)

এর আগে ২মার্চ/১৯৭১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ ছাত্র—জনতার উপস্থিতিতে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলা ছাত্র—পরিষদের নেতা আ স ম আবদুর রব। উপস্থিত ছিলেন শাজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন, এবং নূরে আলম সিদ্দিকী। এঁরা সকলেই এই অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দান করেন।

৩ মার্চ ইতিহাসের আর একটি অবিস্মরণীয় এবং যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। এই দিন পল্টন ময়দানে এক বিশাল জনসমুদ্রে ভাষণ দিতে গিয়ে শেখ মুজিব অহিংস এবং অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। তাঁর উপস্থিতিতেই এদিন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য সভায় স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়, এটি পাঠ করেন স্বাধীন বাংলা ছাত্র—সংগ্রাম পরিষদের নেতা শাজাহান সিরাজ। নতুন রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা এবং স্বাধীনতার যুদ্ধ পরিচালনার জন্য রূপরেখা এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা এই ইশতেহারে ঘোষণা করা হয়।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই তারা ২৭ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা শহরে আত্ম—গোপন করে থাকার পর ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ফরিদপুর, ও কুষ্টিয়ার দিকে যাত্রা করেন এবং ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় ঘুরে নানা জনপদ ঘুরে ঝিনাইদহে এসে উপস্থিত হন। তাঁরা পরে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মাহবুব উদ্দিনসহ একটি জিপে চড়ে চুয়াডাঙা আসেন। ঐদিন বিকেলে তাজউদ্দিন ও ব্যারিস্টার ইসলাম মহাকুমা প্রশাসক তৌফিক—ই—এলাহী চৌধুরী ও মাহবুব উদ্দিনকে সংঙ্গে নিয়ে সীমান্তের দিকে অগ্রসর হন। জিপ রাখা হল বেতনাপুর সীমান্তের বিওপির কাছে। বাংলাদেশের সীমানার মধ্যের জিপটি রাখা হলো। তৌফিক এলাহী ও মাহবুব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গেলেন।

ওই দিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে খবর ছিল, আওয়ামী—লীগের প্রথম সারির নেতাদের কেউ মেহেরপুর সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছেন। এটি জেনে সে সময়কার ভারতীয় তীমান্তরক্ষী বাহিনীর পূর্বাঞ্চনীয় কমান্ডের তৎকালীন আইজি গোলক মজুমদার নদীয়া জেলার টুঙ্গী সীমান্ত চৌকিতে চলে যায়। সন্ধ্যার সময় কর্নেল চক্রবর্তীর মাধ্যমে তিনি তৌফিক এলাহী ও মাহবুবউদ্দিনের সাক্ষাৎ পান। এদের মাধ্যমেই ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী— সবকিছু অবগত হন।

ওদিকে বিওপি’র কাছে একটি কালভার্টের দুই পাশে বসে রইলেন তাজউদ্দীন ও আমীর উল ইসলাম। পরনে ময়লা গেঞ্জি ও লুঙ্গি। মনে হচ্ছে কোনো সাধারণ কৃষক। কাজের শেষে একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন। একটু পরেই কালভার্টের ঝোপের ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ কানে এলো। ভারতীয় সৈন্যরা এসে অভিবাদন জানালেন তাদের দুজনকে “স্যার ইউ আর ইনভাইটেড টু আওয়ার ক্যাম্প” গার্ড অব অনার দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে তারা তাঁদের নিয়ে চলে গেলেন ইস্টার্ন কমান্ডের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আইজি গোলক মজুমদারের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য।

গোলক মজুমদারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তারা সরাসরি দমদম এয়ারপোর্টে হাজির হলেন। সেখানে তাঁদের সঙ্গী হলেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রধান কে.এফ রোস্তমজী। তার পর সবাই মিলে গেলেন আসাম হাউসে। সেখানেই সেদিন রাতে এসে হাজির হলেন পশ্চিম বঙ্গের পুলিশ চিফ এবং বিভিন্ন দপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকতাগণ। তাদের সঙ্গে বৈঠক করলেন তাজউদ্দিন ও ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম। বৈঠক শেষ করে তাজউদ্দিন ৩০ মার্চ সকালে সারাদিন কলকাতা শহর ঘুরে বেড়ালেন একটি বাড়ির খেঁাজ। পরে খেঁাজে পেলেন থিয়েটার রোডের একটি বাড়ি। ৮ নম্বর বাড়ি। এই বাড়িটির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস। (পরের দিন তাঁরা দমদম এয়ারপোর্টে থেকে ভারতীয় আর্মির একটি কার্গো বিমানে চড়ে দিল্লিতে পেঁাছান।

৩ এপ্রিল তাজউদ্দীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রথমেই ইন্দিরা গান্ধী জানতে চাইলেন, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়েছে কিনা? তাজউদ্দিন এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োগ করেন। তিনি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানান, ২৬ মার্চ/১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। তিনি নিজেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করে জানান, শেখ মুজিব স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং অন্যান সহকর্মীরা তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দিন ভারত সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন জানালে, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলদেশ সরকারকে সব ধরনের সাহায্য ও সহযোগিত দানের আশ্বাস দিলেন।

তাজউদ্দিন একটি ডাকোটা বিমানে করে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপটেন মনসুর আলী ও আব্দুল মান্নানসহ ১১ এপ্রিল আগরতলা পেঁৗছন। খন্দকার মোশতাক ও কর্নেল ওসমানী এই সময় আগরতলায় অবস্থান করছিলেন। খন্দকার মোশতাক ৩০ মার্চ পর্যন্ত ঢাকায় “হক নার্সিং হোমে” চিকিৎসাধীন ছিলেন। এপ্রিলের প্রথম দিকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তিনি আগরতলা পেঁৗছেন এবং ওমরাহ পালনের জন্য মক্কা গমনের অভিপ্রায় ব্যাক্ত করেন। পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য প্রদানের সম্মতি এবং তাঁকে মন্ত্রিসভায় নিতে তাজউদ্দিনের আগ্রহের কথা জানতে পেরে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রী হওয়া ইচ্ছন প্রকাশ করেন।

সকলেই বুঝতে পারছিলেন যুদ্ধ অনিবার্য। তাই অতিদ্রুত একটি সরকার গঠন করা প্রয়োজন। দিল্লিতে উপস্থিত অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান এবং আমীর—উল ইসলাম যৌথভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজ উদ্দিনের প্রথম বক্তৃতার খসড়া তৈরি করেন। তাজউদ্দীন নিজে খসড়া বক্তৃতার নোটে বিভিন্ন তথ্য ও বক্তব্য সংযুক্ত করেন। দিল্লিতেই বক্তব্যটি টেপে ধারণ করা হয়। টেপটি গোলক মজুমদারের কাছে পেঁৗছে দেন ব্যারিস্টার আমীর—উল ইসলাম। শিলিগুড়ির একটি অনিয়মিত বেতার কেন্দ্র থেকে এটি প্রচার করার উদ্দেশ্যে।

সেদিন ছিল ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় প্রথম বিশ্বের মানুষ অজ্ঞাত একটি বেতার কেন্দ্র থেকে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের ভাষণ শোনেন। সেদিনের এ ভাষণ “আকাশবাণী’র নিয়মিত কেন্দ্রগুলোতে প্রচার হয়।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীনকে মনোনীত করে গঠিত মন্ত্রিসভার সকলেই চিন্তা করলেন। একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সরকারকে শপথ গ্রহন করানো হবে। তবে এই অনুষ্ঠানটি হবে বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে। কেউ যাতে হামলা করতে না পারে, সেজন্য কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়।

১৭ এপ্রিল/১৯৭১ সাংবাদিকদের শুধু জানানো হলো বাংলাদেশের কোনো এক জায়গায় তাদের নিয়ে যাওয়া হবে যথাসময়ে। সে অনুযায়ী “কলকাতা প্রেস ক্লাব” থেকে সাংবাদিকদের নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা বৈদ্যনাথতলায় গিয়ে পৌছালেন সকাল ১১টায়। মুহূর্তেই সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে আলোচিত হয়ে উঠলো বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্ত জেলা কুষ্টিয়ার মেহেরপুর মহাকুমার, অখ্যাত এই গ্রাম। বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে স্থানীয় জনগণ থেকে শুরু করে সকল বিদেশি সাংবাদিক ও প্রচার মাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে নির্বাচিত সকল সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে চিপ হুইপ হিসেবে ইউসুফ আলীকে দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা হয়, আনুষ্ঠানিকভাবে।

আশে পাশের গ্রামের লোকদের কাছ থেকে কয়েকখানা টেবিল— চেয়ার এনে খোলা মাঠের একপাশে গাছতলায় একটি মঞ্চ তৈরি করা হলো। শামসুল হুদা চৌধুরী এ প্রসঙ্গে লিখেছেন; ওই দিন বেলা ১১.১০ মিনিট সময়ে কুষ্টিয়ার বৈদ্যনাথতলায় আয়োজিত ঐ সভামঞ্চের পশ্চিম দিক থেকে এলেন নেতৃবৃন্দ। উপস্থিত জনতা মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে নেতৃবৃন্দকে স্বাগত জানালেন। সদ্য গঠিত সশস্ত্রবাহিনীর একটি দল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিবাদন জানালেন। এর পর নেতৃবৃন্দ একে একে এসে তাঁদের নির্ধারিত আসনে বসলেন। প্রথমে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তারপর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, তারপর মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহম্মেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, জনাব কামরুজ্জামান এবং প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী। স্বেচ্ছাসেবকগণ ফুল দিয়ে তাঁদের অভিবাদন জানালেন। বৈদ্যনাথতলার আয়োজিত এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন জাতীয় পরিষদ সদস্য আবদুল মান্নান। পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করা হলো।

নতুন রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক সে ঘাষণা পাঠ করলেন আওয়ামী—লীগের চিফ হুইপ ইউসুফ আলী। নব গঠিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের দেশের নাম হলো “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” এর রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, উপ—রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী— তাজউদ্দীন আহমদ। পুলিশ সুপার মাহবুবউদ্দিনের নেতৃত্বে এক দল ই পি আর সৈন্য নবগঠিত মন্ত্রিসভা ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে সামরিক অভিবাদন জানালো। চারটি ছেলে প্রাণভরে গাইলো “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” এরপর দাঁড়ালেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। তিনি একে একে পরিচয় করিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং তার সহকর্মীদের। তিনি নতুন রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে কর্নেল আতাউল গনী ওসমানী এবং সেনাবাহিথীর চিফ অফ স্টাফ পদে লেঃ কর্নেল আবদুর রবের নাম ঘোষণা করলেন। মেহেরপুরের নতুন নাম করা হলো “মুজিবনগর”। সেই থেকেই মুক্তি যুদ্ধ চলাকালীন সরকার, মুজিবনগর সরকার হিসেবে তার পরিচিতি পেলো।

বাংলাদেশকে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করা হল যুদ্ধ করার জন্য। যারা দায়িত্ব পেলেন তাঁরা হলেন,
১। ১ নং সেক্টর মেজর খালেদ মোশারফ
২। ২ নং সেক্টর মেজর এ টি এম হায়দার
৩। ৩ নং সেক্টর মেজর শফিউল্লাহ
৪। ৪ নং সেক্টর মেজর সি আর দত্ত
৫। ৫ নং সেক্টর মেজর মীর শওকত আলী
৬। ৬ নং সেক্টর উইং কমান্ডার বাশার
৭। ৭ নং সেক্টর মেজর কাজী নুরুজ্জামান
৮। ৮ নং সেক্টর মেজর আবু ওসমান চৌধুরী
৯। ৯ নং সেক্টর মেজর এম এ জলিল
১০। ১০ নং সেক্টর মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিংপ্রাপ্ত নৌ—কমান্ডার যখন যে সেক্টরে যে কাজ করছে তখন সেই কমান্ডারের নির্দেশ মোতাবেক কাজ করবে।
১১। ১১ নং সেক্টর মেজর আবু তাহের

এছাড়া ও ব্রিগেড আকারে ৩ টি ফোর্স গঠন করা হয়।
১। জেড ফোর্সÑ লে. কর্নেল জিয়াউর রহমান
২। এস ফোর্সÑ লে. কে এম শফিউল্লাহ
৩। কে ফোর্সÑ লে. কে খালেদ মোশারফ

সূত্রঃ
১। উইটনেস টু— সারেন্ডার— মেজর সিদ্দিক সালিক (পাকিস্তান)
২। স্বাধীনতা সংগ্রামে আওয়ামী লীগের ভূমিকা — মেজর রফিকুল ইসলাম।
৩। তাজউদ্দীন নিঃসঙ্গ এক মুক্তিনায়ক— ইমতিয়াজ শামীম
৪। আমি বিজয় দেখেছি — এম. আর. আকতার মুকুল।

 

 

হোসাইন আনোয়ার, কবি, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, চট্টগ্রাম

 

বাঙালির বর্ষবরণ—কবিতায়-গানে

সুমন বনিক দিনপঞ্জিকায় প্রতিটি মাসের পাতা জুড়ে ৩০/৩১ টি সংখ্যা থাকে। সংখ্যাগুলো একএকটি তারিখ বা দিনের নির্দেশনা দিয়ে থাকে। আমরা সেই তারিখমতো আমাদের কর্মপরিকল্পনা সাজাই

আন্দরকিল্লা সাহিত্য পত্রিকাকে সম্মাননা দিলেন লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদ

গত ১১ এপ্রিল ২০২৬ লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদ—এর ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সাহিত্য সম্মেলনে আন্দরকিল্লা সাহিত্য পত্রিকাকে সম্মাননা প্রদান করেন। আন্দরকিল্লা সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল আবসার এই সম্মাননা

লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদের ২৭ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : গত ১১ এপ্রিল লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদের ২৭ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে সাহিত্য সম্মেলন ২০২৬ উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। সাহিত্য সংসদের

সুখ কিনতে কত লাগবে

সাফিয়া নুর মোকাররমা “সুখ কিনতে কত লাগবে?”—প্রশ্নটি শুনতে সরল, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে মানুষের গভীরতম আর্তি| আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা প্রায়ই ভাবি, সুখ যেন