শাহেদ কায়েস
বিশ্বখ্যাত ভারতীয় আলোকচিত্রশিল্পী রঘু রাই আর আমাদের মাঝে নেই। ৮৫ বছর বয়সে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তের পথে। কিন্তু তাঁর কাজ বেঁচে থাকবে আমাদের ইতিহাসে, আমাদের স্মৃতিতে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সেই রক্তাক্ত সময়ে তিনি যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা কেবল একজন আলোকচিত্রীর কাজ নয়; এটি ছিল এক মানবিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল না, বরং এটি ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের অসীম ত্যাগ, যন্ত্রণা এবং বিজয়ের এক অমর কাহিনি। এই যুদ্ধের ভয়াবহতা ও মানবিক বিপর্যয়কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন কিংবদন্তি আলোকচিত্রী রঘু রাই। তাঁর প্রয়াণ কেবল একজন শিল্পীর বিদায় নয়, এটি এক অনন্য সাক্ষীর প্রস্থান—যিনি সময়ের গভীরতম ক্ষতকে নীরবে, কিন্তু নির্মম সততায় ধারণ করেছিলেন তাঁর ক্যামেরার লেন্সে। তাঁর ছবিগুলো যেন আলোর ভেতর লুকিয়ে থাকা অন্ধকারকে উন্মোচন করে, আবার অন্ধকারের মধ্যেও মানবিকতার ক্ষীণ আলোকে দৃশ্যমান করে তোলে।
বাংলাদেশে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম, বেঁচে থাকার এক মরিয়া লড়াই। এই যুদ্ধে যে নিষ্ঠুরতা, নির্যাতন, গণহত্যা ও উদ্বাস্তু জীবনের ট্র্যাজেডি সৃষ্টি হয়েছিল, তা ভাষায় সম্পূর্ণভাবে ধারণ করা কঠিন। কিন্তু রঘু রাই তাঁর আলোকচিত্রে সেই বেদনাকে এমনভাবে বন্দি করেছিলেন, যা শব্দের সীমা অতিক্রম করে গিয়েছে। তাঁর প্রতিটি ছবি যেন একেকটি দলিল—নীরব অথচ প্রবল উচ্চারণ। ইতিহাসের যে মুহূর্তগুলো প্রায়শই হারিয়ে যায় সময়ের ভিড়ে, রঘু রাই সেগুলোকে ধরে রেখেছিলেন অনন্তের জন্য, মানবতার স্মৃতিতে অম্লান করে।
১৯৭১ সালের মার্চে পশ্চিম পাকিস্তান-এর সামরিক জান্তা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র মানুষের ওপর চালায় এক পরিকল্পিত ও নির্মম দমন অভিযান। এর কেন্দ্রে ছিল অপারেশন সার্চলাইট—একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা, যা রাতের অন্ধকারে ধ্বংস করে দেয় শহর, গ্রাম, বিশ্ববিদ্যালয় ও মানুষের স্বপ্ন। ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত জনপদ পর্যন্ত রক্তে ভেসে যায় জীবন ও মানবিকতার ভিত্তি। বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক—কেউই রক্ষা পায়নি এই নিষ্ঠুরতার হাত থেকে। লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয়, আর কোটি মানুষ জীবন বাঁচাতে আশ্রয় নেয় প্রতিবেশী দেশ ভারতে।
এই সময়ে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র প্রায় অদৃশ্য ছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ ছিল সীমিত, তথ্যপ্রবাহ ছিল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। ইচ্ছাকৃতভাবে সত্য আড়াল করে রাখা হচ্ছিল। কিন্তু ইতিহাসের অন্ধকারে সব আলো নিভে যায় না। কিছু সাহসী সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে তুলে ধরেন সেই দমিত সত্যের প্রতিচ্ছবি। রঘু রাই ছিলেন সেই সাহসী কণ্ঠগুলোর একজন—যিনি শব্দে নয়, ছবির ভেতর দিয়ে নির্মাণ করেছিলেন এক অনিবার্য সাক্ষ্য। তাঁর ক্যামেরা হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের নীরব ভাষা, যেখানে প্রতিটি ফ্রেমই ছিল ইতিহাসের বিরুদ্ধে বিস্মৃতির এক দৃঢ় প্রতিবাদ।
রঘু রাই-এর ক্যামেরা কখনোই নিছক একটি যান্ত্রিক চোখ ছিল না; এটি ছিল তাঁর নৈতিক অবস্থানের সম্প্রসারণ—একটি সচেতন দৃষ্টি, যা সত্যকে বেছে নিত, মিথ্যার আড়াল ভেঙে দিত। আলোকচিত্রের ভাষায় তিনি কেবল দৃশ্য ধারণ করেননি, বরং ইতিহাসের অন্তর্গত বেদনা, ক্ষত এবং প্রতিরোধকে তুলে ধরেছেন এক গভীর মানবিক সংবেদনশীলতায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ক্যামেরা হয়ে উঠেছিল এক ধরনের নীরব সাক্ষ্য, যেখানে প্রতিটি ফ্রেমে লুকিয়ে ছিল প্রতিবাদ, শোক এবং মানবতার আর্তনাদ।
শরণার্থী শিবিরের ভিড়, যুদ্ধবিধ্বস্ত গ্রামের ধ্বংসস্তূপ, আহত মানুষের নিঃশব্দ যন্ত্রণা—এই সবকিছুর মাঝেই তিনি খুঁজে নিয়েছেন এমন কিছু মুহূর্ত, যা ভাষার চেয়েও শক্তিশালী। তাঁর ছবিতে আমরা দেখি—এক মায়ের কোলে নিশ্চুপ হয়ে থাকা শিশুর নিথর দেহ, নদীর তীরে সারি সারি লাশ, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ানো মানুষের অন্তহীন মিছিল। চোখে ভয়ের ছায়া, কিন্তু সেই ভয়ের ভেতরেও জেগে থাকা এক অদম্য বেঁচে থাকার ইচ্ছা। এই ছবিগুলো কেবল সংবাদচিত্র ছিল না; এগুলো ছিল মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দৃশ্যমান দলিল—যেখানে প্রতিটি আলো-ছায়া নীরবে উচ্চারণ করেছে এক অমোঘ সত্য: নীরবতাও কখনো কখনো সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ। রঘু রাই-এর তোলা আলোকচিত্রগুলো শুধু নান্দনিক সৃষ্টিই ছিল না; এগুলো ছিল ইতিহাসের নির্মম সত্যের
দৃশ্যমান ভাষ্য, যা আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে। তাঁর ছবির ফ্রেমে বন্দি হয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়—যেখানে একদিকে ধ্বংস, মৃত্যু ও নির্যাতন, অন্যদিকে বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও প্রতিরোধের অদম্য ইচ্ছা।
যখন রাষ্ট্রযন্ত্র তথ্যকে নিয়ন্ত্রণ করছিল, যখন কূটনৈতিক নীরবতা অনেক সত্যকে আড়াল করে রাখছিল, তখন রঘু রাইয়ের ক্যামেরা হয়ে উঠেছিল এক বিকল্প ভাষা—একটি দৃশ্যমান সত্য, যা অস্বীকার করা যায় না। তাঁর ছবির মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষ করে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর চালানো নিষ্ঠুরতা, শরণার্থী স্রোতের অসহায়তা, এবং এক জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এই ছবিগুলো আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এটি কোনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট নয়, বরং এক সুস্পষ্ট মানবিক বিপর্যয় ও গণহত্যা। এই উপলব্ধি বিশ্বজুড়ে সহানুভূতি, সমর্থন ও নৈতিক চাপ তৈরি করে, যা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
রঘু রাই যখন ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে তাঁর ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ করেন, তখন তিনি শুধু ছবি তুলছিলেন না, তিনি স্পর্শ করছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে সংবেদনশীল এক বাস্তবতাকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাতে সীমান্ত পেরিয়ে আসা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন সেখানে থেমে ছিল এক অনিশ্চিত অপেক্ষায়—না ফেরা, না পৌঁছানোর এক অন্তহীন মাঝপথে। ভারতের সেই উদ্বাস্তু শিবিরগুলো হয়ে উঠেছিল এক অস্থায়ী পৃথিবী, যেখানে প্রতিটি মুখে লেখা ছিল বেঁচে থাকার ক্লান্ত ইতিহাস।
এই ছবিগুলোতে যুদ্ধের সরাসরি বিস্ফোরণ নেই, নেই গুলির শব্দ; কিন্তু তার চেয়েও গভীর এক প্রতিধ্বনি আছে—ক্ষুধার দীর্ঘ ছায়া, ক্লান্ত শরীরের নীরবতা, চোখে জমে থাকা অজানা ভবিষ্যতের আতঙ্ক। একটি শিশু মাটিতে বসে শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে—এই দৃশ্যটি আর কেবল একটি শিশুর নয়; এটি একটি জাতির ক্ষত, একটি সময়ের আর্তনাদ। একজন মায়ের ক্লান্ত কোলে ঘুমিয়ে থাকা সন্তান, অথবা অনিশ্চিত পথের দিকে তাকিয়ে থাকা বৃদ্ধের দৃষ্টি—এসব মুহূর্তকে রঘু রাই রূপ দিয়েছেন সামষ্টিক বেদনার প্রতীকে। এই আলোকচিত্রগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যুদ্ধ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; তার সবচেয়ে গভীর ক্ষত তৈরি হয় মানুষের ভেতরে, নির্বাসনের দীর্ঘ নীরবতায়।
তাঁর আলোকচিত্রের অন্যতম গভীর বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর সুস্পষ্ট নৈতিক অবস্থান। তিনি কখনোই শোষণ, নির্যাতন বা মানবিক বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে নিছক নিষ্ক্রিয় পর্যবেক্ষক হয়ে থাকেননি; বরং তিনি নিজেকে দেখেছেন একজন দায়বদ্ধ সাক্ষী হিসেবে—যার কাজ শুধু দেখা নয়, দেখা জিনিসকে সম্মানের সঙ্গে ধারণ করা। তাঁর ক্যামেরা মানুষের দুঃখকে পণ্য বানায়নি; বরং সেই দুঃখকে দিয়েছে মর্যাদা, দিয়েছে এক ধরনের নীরব স্বীকৃতি। সেই সময় তাঁর তোলা ছবিগুলোতে আমরা যন্ত্রণা দেখি, কিন্তু তা কখনোই চাঞ্চল্যকর বা শোষণমূলক নয়। তিনি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন সেই দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে কষ্টকে কেবল দৃশ্যমান উত্তেজনার উপকরণে পরিণত করা হয়। বরং তাঁর ফ্রেমগুলোতে আছে গভীর সংবেদনশীলতা—একটি মানবিক দৃষ্টি, যা মানুষের ভঙ্গুরতাকে যেমন তুলে ধরে, তেমনি তার অন্তর্গত শক্তিকেও স্পর্শ করে। এই কারণেই রঘু রাইয়ের শিল্প আলাদা হয়ে ওঠে। তাঁর ছবিগুলো দর্শককে শুধু তথ্য দেয় না, বরং একটি নৈতিক অভিজ্ঞতার ভেতর নিয়ে যায়। দর্শক সেখানে কেবল দর্শক হয়ে থাকে না—সে হয়ে ওঠে অংশগ্রহণকারী, অনুভবকারী। এই অনুভবই তাঁর শিল্পকে সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে এক স্থায়ী মানবিক দলিলে রূপ দেয়।
বাংলাদেশের মানুষের কাছে রঘু রাই কেবল একজন বিদেশি আলোকচিত্রী নন, তিনি এক গভীর মানবিক বন্ধুত্বের নাম। তাঁর পরিচয় পাসপোর্ট বা জাতীয়তার সীমায় আবদ্ধ নয়—বরং তিনি যুক্ত হয়েছেন মানুষের বেদনা, সংগ্রাম ও আশার সঙ্গে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি, কিন্তু তাঁর ক্যামেরা হয়ে উঠেছিল এক অনন্য শক্তিশালী অস্ত্র—যা মিথ্যার আবরণ ভেদ করে সত্যকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে। যখন অনেকেই নীরব ছিল, যখন রাষ্ট্র ও কূটনীতি দ্বিধাগ্রস্ত, তখন রঘু রাই তাঁর ছবির মাধ্যমে উচ্চারণ করেছেন এক অবিচল সত্য। তাঁর প্রতিটি ফ্রেম যেন বলেছে—মানবিকতা কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা মানে না। শরণার্থী, আহত মানুষ, বিধ্বস্ত জীবনের যে চিত্র তিনি ধারণ করেছেন, তা কেবল একটি দেশের ইতিহাস নয়, তা সমগ্র মানবজাতির অভিজ্ঞতার অংশ। একজন শিল্পী কীভাবে একটি জাতির সংগ্রামের অংশ হয়ে উঠতে পারেন—রঘু রাই তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর কাজ আমাদের এই বার্তা দেয় যে, সহমর্মিতা ও সংহতি কোনো রাষ্ট্রের সীমানায় থেমে থাকে না; বরং তা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের হৃদয় থেকে মানুষের হৃদয়ে। এই কারণেই তিনি কেবল একজন শিল্পী নন—তিনি একাত্তরের এক নীরব যোদ্ধা, এক অকৃত্রিম বন্ধু।
আজ, একাত্তরের ইতিহাস নিয়ে যখন আমরা আলোচনা করি, তখন শুধু লিখিত দলিল বা স্মৃতিচারণ নয়—আলোকচিত্রও একটি অপরিহার্য ঐতিহাসিক উৎস হিসেবে সামনে আসে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি গভীর মানবিক বিপর্যয়কে বোঝার ক্ষেত্রে ছবি আমাদের এমন এক অভিজ্ঞতার ভেতর নিয়ে যায়, যা শব্দের সীমাকে অতিক্রম করে। এই প্রেক্ষাপটে রঘু রাইয়ের তোলা ছবিগুলো শুধু শিল্পকর্ম নয়, এগুলো সময়ের অমোঘ দলিল। এই ছবিগুলোতে ধরা আছে ইতিহাসের স্পন্দন—শরণার্থীর ক্লান্ত মুখ, ধ্বংসস্তূপের নীরবতা, মানুষের চোখে ভেসে ওঠা আতঙ্ক ও প্রতিরোধ। ফলে এগুলো কেবল আবেগ জাগায় না; বরং আমাদের সামনে তুলে ধরে নির্ভুল প্রমাণ, যা অস্বীকার করা যায় না। ইতিহাস কখনো কখনো বিতর্কিত হয়, কখনো বিকৃত করার চেষ্টা হয়; কিন্তু এই ছবিগুলো সেই সব প্রচেষ্টার বিপরীতে নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান নেয়। একটি আলোকচিত্র কখনো কখনো একটি পুরো সময়কে ধারণ করতে পারে। রঘু রাইয়ের কাজ সেই অর্থে এক জীবন্ত আর্কাইভ—যেখানে প্রতিটি ফ্রেমই সত্যের একেকটি স্তম্ভ। তাই একাত্তরের ইতিহাস বুঝতে গেলে, এই ছবিগুলোকে শুধু দেখা নয়, পড়া এবং উপলব্ধি করাও জরুরি।
রঘু রাইয়ের আলোকচিত্র আমাদের এক গভীর ও অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—শিল্প কি কেবল নান্দনিক আনন্দের জন্য, নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক ধরনের সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাঁর কাজের দিকে তাকালে আমরা দেখি, শিল্প কখনো কখনো নিছক সৌন্দর্যের চর্চা নয়; এটি হয়ে উঠতে পারে প্রতিরোধের এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী ভাষা। যখন চারপাশে বন্দুকের শব্দ, ধ্বংসের আর্তনাদ এবং মানুষের অসহায় চিৎকার প্রতিধ্বনিত হয়, তখনও ক্যামেরা থেমে থাকে না। বরং সেই নীরব যন্ত্রটি হয়ে ওঠে এক সচেতন সাক্ষী—যা কোনো পক্ষ নেয় না, কিন্তু সত্যকে আড়াল করতেও দেয় না। রঘু রাইয়ের ছবিগুলো সেই নীরবতার ভেতরেই উচ্চারণ করেছে প্রতিবাদ—একটি দৃশ্যমান সত্য, যা শব্দের চেয়েও গভীরভাবে মানুষের চেতনায় প্রবেশ করে। এই ছবিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্মৃতি শুধু অতীতের নয়; এটি বর্তমানেরও অংশ, ভবিষ্যতেরও সতর্কবার্তা। শিল্প তাই কেবল সৌন্দর্যের নয়—এটি স্মৃতির ধারক, এবং প্রয়োজনে প্রতিরোধের অস্ত্র। রঘু রাই সেই সত্যকেই তাঁর ক্যামেরার মাধ্যমে অমোঘভাবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।
রঘু রাই তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা বিষয়কে ধারণ করেছেন—রাজনীতি, সংস্কৃতি, পরিবেশ, সাধারণ মানুষের জীবনযাপন। তাঁর ক্যামেরা কখনো শহরের ভিড়, কখনো প্রকৃতির নিঃশ্বাস, কখনো মানুষের অন্তর্গত গল্পকে সামনে এনেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর শিল্পযাত্রায় এক বিশেষ, গভীর ও মানবিক অধ্যায় হিসেবে আলাদা হয়ে দাঁড়ায়। এই অধ্যায়ে আমরা দেখি—একজন শিল্পী কীভাবে ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির সীমানা অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবিক সত্যের অংশ হয়ে ওঠেন। তিনি কেবল একজন পর্যবেক্ষক নন; তিনি হয়ে ওঠেন এক নৈতিক সাক্ষী, যিনি মানুষের যন্ত্রণা, প্রতিরোধ এবং আশার গল্পকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেন। তাঁর ছবিগুলোতে ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো—একটি মুখের ক্লান্তি, একটি চোখের আতঙ্ক, একটি হাতের অনিশ্চয়তা—ধীরে ধীরে রূপ নেয় সামষ্টিক অভিজ্ঞতায়, এক জাতির ইতিহাসে। রঘু রাইয়ের এই যাত্রা আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে—শিল্পীর কাজ শুধু নিজস্ব অভিব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এক গভীর প্রক্রিয়া। যখন সেই সংযোগ মানবতার বৃহত্তর সত্যকে স্পর্শ করে, তখন ব্যক্তিগত শিল্প হয়ে ওঠে সামষ্টিক ইতিহাসের অংশ।
রঘু রাইয়ের কাজ শুধু অতীতের স্মৃতি বহন করে না, এটি ভবিষ্যতের জন্য এক গভীর নৈতিক পাঠও নির্মাণ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ধারণ করা আলোকচিত্রগুলো আজও আমাদের সামনে এক গভীর শিক্ষা তুলে ধরে—সত্য কখনো সহজ নয়, কিন্তু তাকে তুলে ধরার দায় এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। তাঁর আলোকচিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন শিল্পীর কাজ কেবল দেখানো নয়; বরং কীভাবে দেখানো হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের ডিজিটাল যুগে, যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য ছবি তোলা ও ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সেখানে সত্যকে আলাদা করে চেনা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। তথ্যের ভিড়ে অনেক সময় বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়, কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে রঘু রাইয়ের কাজ আমাদের এক ধরনের নৈতিক দিশা দেয়—যেখানে ছবি শুধু দৃশ্য নয়, বরং দায়িত্বের বহিঃপ্রকাশ। তিনি আমাদের
বুঝিয়ে দেন—সত্যের মুখোমুখি হওয়ার জন্য সাহস অপরিহার্য। মানুষের কষ্টকে কখনো শোষণের উপাদান বানানো যায় না, বরং সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরতে হয়। শিল্প তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানবতার পাশে দাঁড়ায়। এই শিক্ষাই তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার—যা আগামী প্রজন্মকে আরও সংবেদনশীল, দায়বদ্ধ এবং সত্যনিষ্ঠ হতে অনুপ্রাণিত করবে।
শাহেদ কায়েস, কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক, নারায়ণগঞ্জ




