এখন সময়:রাত ৯:০৫- আজ: রবিবার-১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ৯:০৫- আজ: রবিবার
১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

বংশগৌরব

আশরাফ উদ্দীন আহমদ :

বরাবরই সে-ই কথাটা বলে আসছে মোতালেব শেখ। কিন্তু কোনোভাবেই কান দিচ্ছে না রোমজান খন্দকার। গাঁও-গেরামের ছেলে-ছোকরাদের একটু আধটু ভেবে চিন্তে চললে পয়সার অভাব অন্ততঃ হয় না। টাকা কড়ি তো আকাশে বাতাসে শিমুল তুলোর মতো উড়ে বেড়ায়… কথা হচ্ছে শুধু ওই একটু কষ্ট করে ধরতে পারলেই হলো… কিন্তু অবশ্য ধরাটাও চাট্টিখানি ব্যাপার নয়—  তবে এই একটু চেষ্টা সদিচ্ছা আর ওই পরিশ্রম করলে এটা কোনো বিষয়ও নয়…

প্রথমে কথাটা তুলেছিলো রোমজানই। দু দুবার বর্ডারে তার তাবৎ মালামাল হাতছাড়া হয়।

প্রথমে পঞ্চাশ/পঞ্চান্ন হাজার টাকার জিরা-ইলাচ-লবঙ্গ আলুবোখরা-কিসমিস  বহেড়া-হড়তকী আর পাতা বিড়ি একরাত্রে নৌকা পারাপার হতে গিয়ে বিজিবি’র টর্চের আলোয় ধরা পড়ে লাপাত্তা হয়। নদী সাঁতড়ে পালিয়ে আসে নজু-কালা কার্তিক, পেছনের নৌকায় ছিলো রোমজান, আর সে কারণে বড় রকমের বাঁচা বেঁচে যায়। নৌকার মাঝি হারান বাধ্য হয়ে পেছন দিকে বাইতে থাকে বৈঠা। অবশ্য অমাবশ্যার জমাট কালো অন্ধকার রাত্রি ছিলো বলে বিজিবি’র  ভয়াল দৃষ্টি এড়াতে পেরেছিলো সেদিন। তাছাড়া জোয়ানরা মালামাল হাতে পেলে খুশিতে আটখানা, তাদের আনন্দ আর মনোযোগ তো তখন সবটুকু ওই পণ্যের দিকে। কে আর যায় অন্ধকারের  ভেতর।

দ্বিতীয়বারের ঘটনা ঘটে তার ঠিক আট মাসের মাথায়। প্রথমবার ফতুর হয়ে ঘরে বসে ছিলো মাস তিনেক, অতোগুলো টাকার শোক তো আর রাতারাতি ভোলা যায় না। হাত-পা গুটিয়ে শামুকের মতো বসে থাকার মতো অবস্থা আর কি!

 

এমন সময় আউচপাড়া ইউনিয়ন প্রধান জৈবুর খান এগিয়ে আসে তার কাছে। ব্যবসা-বাণিজ্য না করে ঘরে বসে থাকলে হবে কিছু কি…

কথাটা বেশ যুক্তিসঙ্গত। মাস তিনেক ধরে সে ঘরে বসে। এর মধ্যে সংসার যে কিভাব্ েচলছে, তারও এতোটুকু খোঁজ-খবর নেয়নি সে। ছুফিয়া কানের দুল জোড়া আর মাজার রূপার বিছা বন্ধক দেয় কাদেরিয়া মোল্লার বউয়ের কাছে। কিন্তু সুদে টাকা নিয়ে সোনা-রূপার গয়না দিয়েও যখন বোঝে এই দুলজোড়া বা বিছা কোনোদিন সে ঘরে আর তুলতে পারবে না, তার মাস খানিক পরে তখন সেগুলো বিক্রি করে দিয়ে সুদসহ আসল টাকা বুঝিয়ে দেয় এবং বাদ-বাকি এসে সংসারে ঢালে। দুল আর বিছার জন্য মনের মধ্যে কেমন একটু খটকা লাগে, বিশেষ করে অতো মানানসই কানের দুলটার জন্য গভীর একটা কষ্ট বোধ করে সে। ওমন সুন্দর দুল কোনোদিন আর কানে উঠবে না ওর, তাও বেশ বোঝে ভালো। অথচ সংসারের জন্য এটা করা ছাড়া আর কোনো সঠিক পথ নেই খোলা তার সামনে। শক্ত করে বুক বাঁধে। নিজেকে শাসন করে নিজেই। জৈবুর খানের কথা শুনে সম্বিত ফিরে পায় যেন রোমজান। কথাটা এতোটুকু ভুল তো বলেনি। আবার তাকে শক্ত হয়ে উঠে বসতে হবে। ছুফিয়ার কানের দিকে তাকিয়ে চঞ্চল চোখ পাথর স্থির হয়ে যায়। দুলটা কোথায় রাখলো আবার। এতোদিন তার স্মরণেই ছিলো না যে ছুফিয়ার কানে একটা সোনার দুল ছিলো, তা এখন নেই। বুকটা শুকিয়ে যায়। দুলটা কতোটুকু হবে কে জানে!

বিয়ের সময় ছুফিয়ার বাপে যৌতুক হিসেবে দশ হাজার টাকা জামাইকে দেয় আর ছুফিয়ার গলায় রূপার  মালা, মাজায় বিছা এবং কানের দুল , হাতে একহাছি চুড়ি পলার ওপর সোনার নিকেল করা। খাঁটি বলতে ওই  সোনার দুল জোড়া, ছুফিয়ার মায়ের শেষ স্মৃতি বলেই রোমজান এতোদিন ভাবেইনি ওটাকে নিয়ে তেমন একটা। রূপার মালা আর চুড়িগুলো বিক্রি হয়ে গেছে সে ই কবে। আর মাজার বিছাখানা রেখেছিলো বাক্সের কাপড়ের মধ্যে, নিজের মেয়ে হলে সে পড়বে আর মায়ের স্মৃতিচিহৃ দেখে আনন্দ পাবে। দশ হাজার টাকা দিয়ে সে জমিটুকু কিনেছিলো, তাও এখন নদীগর্ভে বিলীন। বাধ্য হয়ে রক্ষণশীল গেরস্থবাড়ির ছেলে রোমজানকে বেছে নিতে হয় দু’নম্বর ব্যবসা, জীবন জীবিকার তাগিদে। আগে অবশ্য মহাজনের সঙ্গেই থাকতো, পেটে ভাতে আর সপ্তাহ শেষে হাত খরচা হিসেবে দু’ একশত টাকা ফেলে দিতো। আর ওই টাকায় ছুফিয়া চলতো। তাছাড়া  হাঁস-মুরগী আর বাড়ির আশেপাশে দু’ চারটে ফল ফলালিগাছ বা শাকশবজি থেকে যা আসে, তা দিয়েই ছুফিয়া আর রোমজানের দিনগুজরান।

গাঁঢ়ল যেমন একটুতেই আনন্দে গদগদ, তেমনি ছিলো ওই রোমজান। যারপর নাই ভূস্বামীর আর্শিবাদে গোঁয়ার গোবিন্দ এক মানুষ যেন দিগি¦দিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কিন্তু একদিন সেই মানুষটাই আচমকা অগ্নিমূর্তি ধারণ করে অর্থাৎ মহাজনের সঙ্গে জোর কাজিয়া বাঁধে রোমজানের। এবং তারপর সেখান থেকে চিরকালের মতো চলে আসে। জমানো কিছু টাকা দিয়েই ব্যবসাটা চাঙ্গা করে। প্রথম-প্রথম ব্যবসাটা বেশ চুটিয়ে চলে তার। এই একটা লাইন। যেখানে লাফ মেরে মেরে বড়লোক হওয়া যায়, তবে একেবারে পথের ভিখারী হতেও সময় লাগে না। ছুফিয়ার কানের দুলটা যখন আর পেলো না তখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে জৈবুর খান। লোকটাকে যতোটা খারাপ মানুষ ভেবেছিলো এতোকাল, আসলে ততটা নয় বোঝে সেদিনই প্রথম। মুখের কথাতেই পঞ্চাশ/পঞ্চান্ন হাজার টাকা বের করে দেয় রোমজানের হাতে। রোমজানের মন আনন্দে তখন টগবগে ঘোড়া। পারে তো আকাশ থেকে লাফ দিয়ে মনের আনন্দ প্রকাশ করে ঝাঁপিয়ে।

মুহূর্তে কুড়ি/বাইশ হাজার টাকা হারানোর শোক ভুলে যায়। নিজের ভুলের জন্য নিজেকেই ভৎর্সনা করে সে। অপরের টাকাকে নিজের টাকাই মনে হয় তার। ছুফিয়ার ওপর যেটুকু রাগ-ক্ষোভ জমেছিলো অকস্মাৎ যেন বা তা গলে একেবারে ঝর্ণা হয়ে ঝরে যায়। পঞ্চাশ/পঞ্চান্ন হাজার টাকা নিয়ে পুরো উদ্দ্যমে আবার সীমান্তপারের ব্যবসা শুরু হয়। রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে তামাম লোকসান সে সুদে আসলে পুষিয়ে নেবে। ছুফিয়ার কানের দুল মাজার বিছা সংসার খরচে চলে গেছে, সেগুলো আবার গড়িয়ে দেবে একদিন। আর গলার মালা হাতের চুড়িও হবে তার। ব্যবসা একটু সুবিধার হলে এসব কোনো ব্যাপার নয় তার কাছে।

হাটখোলার দিকে ভালো তাঁতের শাড়ি আজকাল তৈরী হচ্ছে, দাম একটু বেশি হলেও রোমজান মনে মনে আশা করে একটু হালকা  সবুজ ডুরে পাড়ের তাঁতের শাড়ি কিনে আনবে। ছুফিয়াকে যা মানাবে, নোতুন বউয়ের মতো মনে হবে তখন। অনেক সাধ-আহলাদ। অনেক স্বপ্ন মনের চিলে কোঠায় বাসা বাঁধতে থাকে। বাসা বাঁধতে থাকে লক্ষ-কোটি বাবুই পাখি তার বুকের ঠিক কাছাকাছি। কিন্তু তামাম স্বপ্ন আশা ভালোবাসা এক নিমেষে খানখান হয়ে ভেঙে যায়। সবে মাত্র কোনোক্রমে একটু গুছিয়ে নিয়েছিলো রোমজান, জৈবুর খানের টাকাটা শোধ

 

 

হয়েছে আর চাঁদনী বাজারের কৃষ্ণকান্ত স্যাঁকরার দোকানে ছুফিয়ার জন্য একগাছি সোনার চুড়ির অর্ডার দেওয়া হয়েছে, আর বাড়ির দক্ষিণ পাশটায় ডোবা ভাগারটা মাটি দিয়ে ভরাট করে একটা দোঁচালা মাটির ঘর তুলবার ইচ্ছে চলছিলো। ঠিক এমনই সময় রোমজান দ্বিতীয়বারের মতো মালামালসহ হাতেনাতে ধরা পড়লো বিজিবির  অফিসার মেজর বারীর হাতে। এবার পাক্কা পয়ত্রিশ হাজার টাকার ভারতীয় শাড়ি-ফেনসিডিল আর গরমমশলা নিয়ে। সঙ্গি-সাথীদের আরো অনেকের, নৌকাসহ সব্বার মালামাল সঙ্গে-সঙ্গে সীজ হয়ে যায়। মৈজুদ্দি-রাখালনাথ-মজলে-নওফেল রোমজান মহেন্দ্রলাল দীর্ঘ নয় মাস হাজতবাস করে ছাড়া পায়। বাড়ি ফিরে রোমজান ডানা ভাঙা কবুতরের মতো ঠুঁকো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকে। নয় মাস জেল খাটার চেয়ে বেশি শোক মালগুলো হারিয়ে। মুখ ভর্তি দাঁড়ি, চোখ দুটো সে আর আগের মতো নেই তার। গালের চোয়াল কেমন বসে গেছে খাঁদে। চোখ ভর্তি পিঁচুটি আর মুখে লালায় ভরা। সাত গাঁয়ের মানুষজন দেখতে আসে তাকে। যেন বা সে একটা আজব প্রাণী, চিড়িয়াখানায় নতুন আনা হয়েছে, সবার চোখে মুখে দারুণ কৌতুহল।

ছুফিয়ার শরীরখানা সেই আগের মতোই আছে। যেন বা একটু বেশি রকম চেকনাই ছড়াচ্ছে, ঘরের দাওয়ার নীচে খেঁজুরের পাটির ওপর হাঁস-মুরগীগুলো হেগে মুতে একাকার করে দিয়েছে কখন। রোমজান দাওয়ায় বসে তাকিয়ে দেখে সবই। ওর চোখ দুটো ভারী ম্লান দেখায়। শীত গরম শহরে তেমন বোঝা যায় না। আর হাজতে ওসব কোনো অনুভবই হয় না কারো।  দুপুরটা পার হয়ে যায় চোখের পলকে। বিকেলের গোলাপি রোদটা খেলা করে তাল গাছের মাথা বরাবর। এভাবে আরো কয়েকদিন কেটে যায়।

শীতের সকালে রোদ পোহাচ্ছে কয়েকটা চড়ুঁই-শালিক। মাটির দেওয়ালের মাথায় একটা কাক কা-কা-কা স্বরে ডেকে যাচ্ছে একটু থেকে-থেকে। ছুফিয়া পালিতে করে মুড়ি আর এক খাবলা খেঁজুরের গুড় দিয়ে গেছে ওর সামনে কিছুক্ষণ আগে। রোদ এখন দাওয়ার ওপর গড়াগড়ি দিচ্ছে। রোমজান নির্বিকার তাকিয়ে। আকাশ যেন একটা ঝরঝরে নীল-শাদায় রাঙা সামিয়ানা। কতোগুলো পাখি উড়ে যায় আকাশের নীচ দিয়ে। নদীর ওপারে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটা গ্রাম এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে। পাখিদের বাসা মনে হয় বা ওদিকে কোথাও। নদীর পানি স্থির  আর কাকচক্ষু। রোমজান জানে না কি করবে এবার সে। পরিশ্রমের টাকা  পিপঁড়ে খায় আর রোমজানের পরিশ্রমের রক্তবীজ পানিতে চুঁষে খায়। এ লাইনের অংক বড় বিদঘুঁটে অথবা কঠিন রোমজান বেশ বুঝে গেছে। আরো কয়েকটা দিন চলে যায়। নতুন ঘর-গেরস্থালীর কেনা জিনিস-পত্রগুলো বিক্রি হয়ে যায় সংসার চালাতে গিয়ে।

আচম্বি স্মরণ হয় মোতালেব শেখের কথা। লোকটা ভালোই একটা পথের দিশা দিয়েছিলো তাকে। পথে-ঘাটে দেখা হলেই কুশল বিনিময় হতো এবং একটু হেসে বলতো, রোমজান রে, ও কাজ ভালো না, ভালো পথে সুখ অনেক…

মোতালেব শেখের কথা শুনে রোমজান হাসে। মানুষটার জন্য বড় মায়া হয় তার। বেলডাঙার দিকে মোতালেব শেখের বাড়ি ছিলো একদিন।  সে-ই যে বাষট্টির দাঙ্গায় বাড়ি-ঘর ফেলে-ঠেলে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে আসে পাকিস্তান। আর ফিরে যায়নি। কোথায় বা যাবে, অতোদিনে কিছু কি আর অবশিষ্ট আছে! আরশোলার মতো জীবন চলছে কোনোভাবে। ওপারে কে যে আছে, তাও কোনোদিন কাউকে বলেনি। মানুষজনও আর ও কথা তুলতে চায় না। দুটো ছেলে ছিলো বেচারির, বিজিবি নাকি বিএসএফ এর গুলীতে প্রাণ দিয়েছে বলে গ্রামের মানুষ জানে।

তারপর ও কাজটাকে আর ভালো কাজ মনে করে না মোতালেব শেখ। সারাদিন মহিশালবাড়ীর সোবাহান হাজীর চালের আড়তে কাজ করে, ভালো কয়েল বা পালাদার বলে সোবাহান হাজী একটু বেশি ভালোবাসে ওকে। মোতালেব শেখের ওই একটাই কথা, রোমজান রে, ও কাজ ভালো না ব্যাঁটা, ভালো পথে সুখ অনেক…

রোমজান তো জানে কাজটা মোটেও ভালো না। বর্ডারের এই দু’ নম্বর কাজ কোনো কালেই একজন মানুষকে শান্তি দেয় না। হাতে প্রাণ আর নিজের পরিশ্রমের সমস্ত টাকাকে তুচ্ছ করে এই কাজটা করতে কার বা আর ভালো লাগে। অনেকটা জোয়ারীদের মতো এই পেশা। লাগলো তো রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ, নয়তো একেবারে চিৎপাতান হয়ে পড়বি তো পড় গু’ য়ের গাড্ডায়। কিন্তু এছাড়া বা উপায় কি আছে। তার ওপর সাতগাঁয়ের লোকে জানে রোমজান খন্দকার আবার বড় বংশের ছেলে। ছোট কাজ করা কি তার দ্বারাই সম্ভব। নাকি ছোটকাজ করা তার সাজে। ওর বাপ রহমত খন্দকার একজন ডাকাবুকো মানুষ ছিলো, সাতগাঁয়ের মানুষ তার কথায় উঠতো-বসতো। বড় বংশের মানুষ বলে সাধারণ মানুষগুলো ওকে কত্ োমান্যি-গন্য করতো তখন।

বাড়ির গাছের প্রথম কলা-পেঁপে জাম-নারকোল-জামরুল বেল কাঁঠাল সবেদা আতা প্রভৃতি ফল-ফলালি, পুকুরের বড় মাছটা বলো, ধান গম বা আলু পিঁয়াজ কুমড়ো যা হোক না কেনো, আগে রহমত খন্দকারের বাড়ির রোয়াকে আসতো, মানুষজনের সে কি শ্রদ্ধা-ভক্তি ভালোবাসা। সে সব দিনের কথা দেশ-গ্রামের মানুষ ভুলে গেছে ঠিকই, কিন্তু রোমজানের স্মৃতিপটে আজো তা জ¦লজ¦ল করছে জলছবির মতো। একটু চোখ বন্ধ করলেই আকছার সে সব দিনগুলো কেমন বুঁনো গৃধিনীর মতো ছুটে আসে রোমজান খন্দকারের চোখের অসীম দ্রাঘিমায়। আজ সব ফ্যাঁকাসে আর ম্যাঁড়ম্যাঁড়ে লাগে চারদিক। মানুষজনের মন থেকে সমস্ত প্রেম ভক্তি শ্রদ্ধা ঝরে-ঝরে নিরস হয়ে গেছে লোকালয়। বড় বেশি স্বার্থপর আর গৃহত্যাগী আজকালকার মানুষ।

রহমত খন্দকারের ওই তো একমাত্র ছেলে, ওর দিকে কেউ তাকানোর ফুরসত পায় না। দিন দুনিয়া কি ভাবে এমন করে উল্টে-পাল্টে গেলো রাতারাতি, ভাবতেই পারে না। কোথাকার মানুষজন কোথায় সব হারিয়ে গেলো, এখন মানুষ আর আগের মতো নেই। কেমন সব খাঁপছাড়া চকচকে তালোয়ার। শেম্পু দিয়ে চুল ফুলিয়ে নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। অথচ আগে তো এমনটি চিন্তা করা যেতো না। বাপের সময়ের মানুষজনও আর কেউ তেমন একটা নেই। বাপ বেঁচে থাকা অবধি মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোমজান বছরান্তে একবার নয়তো দু’বার ফসল উঠলেই ধান-চাল গম নিয়ে আসতো, বর্গা চাষীরাও নিরাশ করতো না কখনো। বাপটা মরে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে দেনেওয়ালাদের হাতও অকস্মাৎ বুঁজে গেলো রাতারাতি। এখন চিনতেও পারে না অনেকে। দূর থেকে দেখলেই লম্বা সালাম ঠুঁকে সরে যায়। যেন সরে গেলেই আপদ থেকে বেঁচে যাওয়া। বংশপরম্পরায় তাদের যে এই ভাবে মানুষের দান-দক্ষিণার বদৌলতে বেঁচে থাকা, তা যেন নিমেষে ভুলে যায়। বন্টনপ্রথা উঠে বদ-নসীব নিয়ে এখন শুধু প্রচ্ছদ হয়ে থাকা। কেউ কেউ আবার কড়া ভাষায় দু’চার খানা কথা শুনিয়ে দেয়।

নিরুত্তর রোমজান খন্দকার, অনিমেষ চোখে তাকিয়ে থাকে শুধু। আকাশ-পাতাল কতো কিছু ভাবতে থাকে। মোতালেব শেখ পুরানো মানুষ এলাকার। রহমত খন্দকারকে দেখেছে একটা সময়, আর তাই তার ছেলে রোমজান খন্দকারকে কতোভাবে বোঝায় এ’ পেশায় না আসার জন্য। ওমন কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। কিন্তু রোমজান পোড় খাওয়া মানুষ। জীবনের মানে বোঝে অন্যরকমভাবে। ওর দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। আর তাই তো ওমন নীতি কথায় তেমন একটা কান দিতেও চায় না। একটু এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে হয়তো। আবার কখনো-সখনো নেহাৎ-ই পাগল মনে হয় মানুষটাকে। ভূতের মতো গতর খাটিয়ে খায়, প্রতিবাদ করার মতো কোনো ভাষা নেই, নিজে যে একটা রক্ত-মাংসের পরিপূর্ণ মানুষ, তাই বা জানে কি না কে জানে! রোমজান কতোদিন মানুষটার পেছন দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ^াস ফেলেছে শুধুই।

সন্ধ্যার মুখোমুখি সময়ে সোবাহান হাজীর আড়ত থেকে ফেরার পথে রোমজানের সঙ্গে একেবারে সামনাসামনি দেখা হয়ে যায় মোতালেব শেখের। বিষন্ন মুখটা একবার দেখে মোতালেব শেখ বিমর্ষ কন্ঠে বলে, সুখ নেই বাবা সুখ নেই, ও কাজে শান্তি বলো আর সুখ বলো কিছুই নেই… সবই কেমন ফ্যাঁকাসে ধোঁয়া।

রোমজান বোবা জানোয়ারের মতো নিস্পলক তাকিয়ে থাকে। চোখ দুটো লাল টকটক করছে। যেন বা সদ্য ফোটা জবাফুল। একটু সময় থির থেকে তারপর আবার মোতালেব শেখ গলার স্বরটা আরো খানিকটা খাঁদে নামিয়ে বললো, তুমি বাবা তো জেলে গেলে আর এদিকে  সংসার কেমনে চলে, আর আমিও তো ওই তেমন একজন গরীব মানুষ, কিভাবে সাহায্য করি…

রোমজান কি বলবে এখন মানুষটাকে। মানুষটার কথাই ঠিক। সুখ-শান্তি কিছু নেই এ’ লাইনে। হ্যাঁ একটু হয়তো বা আছে, কিন্তু সবই তো অল্পসময়ের জন্য। স্থায়ী নয়। ঠুনকো কাঁচের চুড়ির মতো ক্ষণিকের। ভাঙা পুলটা দুজনে পার হয়ে আসে। শীতের মায়াবী আকাশ থেকে চুঁয়ে-চুঁয়ে নাকি ঝিরঝিরিয়ে নেমে আসে হিম শীতল ঠান্ডা কুয়াশা। কুয়াশার বিশাল সামিয়ানায় আচ্ছাদিত হবে সমগ্র গ্রাম-দেশ। গাছের পাতারা কেমন জড়সড় হয়ে নিজেদের অস্তিত্বকে ঢেকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় নিমগ্ন।

মোতালেব শেখ আবার বলে, বাপ গো, তোমার বাপটা বড় ভালো ছিলো গো! ওমন মানুষ আজকাল আর দেখা যায় না।

রোমজান সমস্ত কথা শুনে যায় মাথা নীচু করে। মাথা তুলে আকাশ দেখার সমস্ত শক্তি গ্রাস করে নিয়েছে কেউ যেন মুহূর্তে। কন্ঠনলী বদ্ধ হয়ে যায় রোমজানের। বাপের বয়সী একজন মানুষ, যে বরাবরই তাকে সন্তানের মতো ভালোবাসে, সেই মানুষটা তাকে আজ আবার সান্ত¡না দিচ্ছে। কি কথা বলবে এখন সে।

মোতালেব শেখ আবার বলে, তা কোথায় যাচ্ছো বাপ?

রোমজান খন্দকার মোলায়েম স্বরে বলে ওঠে, চাচা কি করবো ভেবে পাচ্ছি না কিছুই, সংসার তো চালাতে হবে…

মোতালেব শেখ দূরে কিছু একটা অবলোকন করার আপ্রাণ চেষ্টা করে। গাছে-গাছে বাদূড়ের উৎপাত। কলাগাছের কাঁদিতে বাদুড়ের দল বসেছে বলে একটা শব্দ হচ্ছে।

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে-সঙ্গে নিকষ কালো অন্ধকার সমগ্র পৃথিবীকে জাপটে ধরেছে। আজ আবার নাকি অমাবস্যা। আর তাই কেমন একটা অন্ধকার চারদিকে ঢেকে দিয়েছে এর মধ্যে। দু’ চারজন মানুষ যাওয়া-আসা করছে শুধু।

রোমজান বিমর্ষ কন্ঠে বললো, বাপ তো লেখাপড়া শেখায়নি বা  কোনো হাতের কাজেও লাগিয়ে দেয়নি যে জীবন আমার সুন্দর পথে চলবে।

মোতালেব শেখ বলে, যেটুকু লেখাপড়া শিখেছো তাও বা কম কিসের, তুমি বরং বাপ একটা কাজ করো…

রোমজান খন্দকার সঙ্গে-সঙ্গে জানালো, কি কাজ বলেন চাচা, আমি করবো।

একটু ভেবে কি একটা চিন্তা করে মোতালেব শেখ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকে। ভালো মানুষের ছেলে রোমজান আজ কতোটা অসহায়, কতোটা ভেঙে পড়েছে। নিজের কাছে ভারী খটকা লাগে।

-সরকার এখন বেকার যুবকদের জন্য অনেক প্রশিক্ষণ দিয়ে বিনা সুদে টাকা ঋণ দিচ্ছে, তুমি রাজি হলে সোবাহান হাজী সাহেব অর্থাৎ আড়তদারকে বলে একটা ব্যবস্থা করে দেই।

রোমজান স্তব্ধ হয়ে যায়। খবরটা জানে সে অনেক আগে থেকেই, গ্রামের আর যারা এরকম প্রশিক্ষণ পেয়েছে এবং বিনা সুদে টাকা ঋণ নিয়েছে, তারা বেশ ভালোই আছে। কিন্তু এ’ পেশা তাকে দিয়ে হবে না। তাছাড়া বুনিয়াদি বংশের ছেলে বলে এ’ কাজ সে কোনোদিন করবে না বলেই জানিয়েছে…  অথচ মোতালেব শেখের সামনে এখন ভেদা বিড়াল। যেন বা ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানে না। মুহূর্তে যেন এক অন্য মানুষে পরিণত হয়। টাকা-পয়সা গেছে বলে কি দেশ গ্রামের মানুষ তাকে ছোটলোক ভেবেছে। নিজের মনের মধ্যে রাগটাকে চুপিসারে ঢেকে রাখে সে। মোতালেব শেখ যে এমন ধরণের কাজের হদিশ দেবে, কখনো সে ভাবেনি এমন। মনে-মনে ভাবে, শেষে কি না খন্দকার বাড়ির ছেলে মুরগীওয়ালা! দেশগ্রামের মানুষজন হাত উঁচিয়ে কটাক্ষ করে বলবে, ওই যায় রহমত খন্দকারের ছেলে রোমজান খন্দকার মুরগীওয়ালা…

মাথার ভেতর কেমন একটা জট পাঁকিয়ে যায় তার। সোবাহান হাজীর আড়তের পালাদার মোতালেব শেখের কাছে এর চেয়ে আর বেশি কিছু আশা করাও উচিৎ নয়। যেমন মানুষ তেমনই তার বুদ্ধি। বুদ্ধির তারিফ করতে হয় বটে। রোমজানের দূর্বলতা বা দারিদ্রতাকে নিয়ে কেউ উপহাস করুক সহৃ করা যায়, কারণ সে ভাগারে পড়া শুয়োর এখন। এ’ কথা তো রাস্ট্র হয়ে গেছে চারদিকে। ওর পায়ের তলে মাটি নেই। পিঠ দেওয়ালে ঠেঁসে গেছে। কিন্তু তাই বলে খন্দকার বংশের শেকড় ধরে হেঁচকা টান দেবে এমন কি সহ্য করা সম্ভব! ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের কি এমন কাজ করেছে  রহমত খন্দকার অথবা তার পিতা নেয়ামক খন্দকার অথবা তার পিতা মোদ্দাসের খন্দকার অথবা তার পিতা আজিজুর খন্দকার… এমন ভাবে সে দশ/বারো পূর্বপুরুষের নাম অর্নগল বলতে পারে। তাদের উত্তরাধিকার সে রোমজান খন্দকার। কথিত আছে,তাদের এক পূর্বপুরুষ আহমদ ফরমান খন্দকারের নাম শুনলে বাঘে-হরিণে একঘাটে পানি খেতো। সে-ই আহমদ ফরমান খন্দকার সাহেব মোঘল স¤্রাট বাবরের বিশ^স্থ এবং আস্থাভাজন ছিলেন, মোঘল দরবারের রাজকার্যে খুব বড় পদে কাজ করতেন। এমনো শোনা যায়, আহমদ ফরমান খন্দকারের মেয়ের মেয়ে অর্থাৎ নাতনীর সঙ্গে মোঘল বংশের কোনো এক যুবরাজের শাদী মোবারক হয়। কথাগুলো বংশ পরম্পরা সবাই গল্প করেছে বলেই রোমজান খন্দকার জানে। সত্য-মিথ্যা বা আরোপিত কতোটুকু তা কখনো খতিয়ে দেখেনি। দাদা-বাবার কাছ থেকে যেমন সে শুনেছে তেমনি সেও বউ সন্তানদের কাছে গল্প করে। তো সে-ই খন্দকার বংশের বদনাম কক্ষনো সহৃ করবে না। পেটে পাথর বেঁধে উপুর হয়ে শুয়ে থাকতে হয় তবুও থাকবে, কিন্তু পূর্বপুরুষদের কোনোভাবে ছোট করবে না।

মোতালেব শেখের কথা শুনে তাবৎ শরীরের রক্ত হিম হয়ে আসে তার। তারপর আর অপেক্ষা করেনি। গুঁই সাপের মতো আস্তে-আস্তে সরে যায়। শরীরে একটু একটু ঠান্ডা হাওয়া লাগে। চারদিকের পরিবেশ কেমন হিম-শীতল হচ্ছে বাতাসের মৃদু-মন্দা ধাক্কায়। হাঁটতে-হাঁটতে বাড়িমুখো হয়। কানের ভেতর ভোঁ-ভোঁ করতে থাকে। রাত্রের জমাট অন্ধকার  তাকে ইচ্ছে করে যেন ফেলে দিতে চাইছে, তবুও সে সচল-অনড়।

নিজের মনে নিজেই গজরাতে থাকে রোমজান খন্দকার কয়েকদিন আরো। সময়-সময় বুঁনো জানোয়ারের মতো হতে ইচ্ছে হয়েছে তার। খন্দকার বংশের ছেলে কি না মুরগীওয়ালা। আরেকদিন ভোরের দিকে বাঁশঝাড়ের কাছাকাছি মুখোমুখি দেখা হয়ে যায় মোতালেব শেখের সঙ্গে। একটু হাসি চড়িয়ে রোমজানের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, তাহলে কি মনস্থির করলে?

চ্যাঁলা কাঠের মতো শক্তভাবে নিজেকে আত্মসংবরণ করে। তারপর মুখ ফসকে বলে ওঠে, না চাচা আমার দ্বারা মুরগীর ব্যবসা হবে না।

মোতালেব শেখ বোঝানোর শত যুক্তি হাজির করলো। শেষে লাউয়ের বিচির মতো ঝকঝকে দাঁত বের করে বলে, নিজের পরিশ্রমের হালাল পয়সা রোজগার যে কি আনন্দের বাবা…

রোমজান খন্দকারের এবার সম্মানে যেন লাগে একটু বেশি রকমের। কন্ঠ চড়িয়ে দাঁত খিটমিটিয়ে বললো, আমি খন্দকার বংশের ছেলে, শেষে কি না মুরগীওয়ালা…

মোতালেব এবার তার ওমন সরাসরি কথাতে বোঝে, কি বলতে চায় রোমজান। সূর্যের আলো তখনো কাঁশবনের মাথায় ঝলমলিয়ে ওঠেনি পুরোপুরি। কলাগাছের কচি পাতারা কেমন শিরশির করে নড়ে-চড়ে গায়ে গা ঠেকিয়ে কথা বলছে কানে-কানে। দূরের মাঠে কৃষক লাঙল-জোয়াল নিয়ে দিনের কাজ শুরু করে দিয়েছে এর মধ্যে।  আকাশ এখন ঝরঝরে পরিস্কার। পাখিদের বাগান যেন, ওই পাখির ঝাঁকের দিকে তাকিয়ে মোতালেব শেখ বিগলিত হাসি ছড়িয়ে নরোম হালকা হাওয়ার আমেজে দুলে ওঠে।

খানিকক্ষণ আড়ভাবে তাকিয়ে বলে, কিন্তু এছাড়া কি করবে বলো, মানুষকে তো কোনো একটা অবলম্বন ধরে বেঁচে থাকতে হয়।

Ñতাই বলে এমন কাজ কি আমার…

Ñজীবন-সংসার নামের ঘোড়াকে চালানোর কৌশল ঠিক রাখতে মানুষ কতোই না ধান্ধায় নিজেকে… তুমিই চিন্তা করো…

রোমজান খন্দকারের মুখে আর কোনো কথা নেই। সমস্ত কথা হারিয়ে গেছে তার। দিশেহারা এক পথিক সে। সামনে শুধুই অন্ধকার, বড় বিদঘুঁটে হাসি কানে ভেসে আসছে প্রতিনিয়ত। এর থেকে বাঁচার উপায় নেই।

মৌনতা উপলব্ধি করে মোতালেব শেখ এবার সত্যিই-সত্যিই রেগেই যায়। পরিশ্রমের প্রতি তোমাদের এতো অনীহা কেনো, মানুষ পরিশ্রম করলে তার সম্মান ছোট হয় না বুঝলে, বরং বেড়ে যায়। শরীর ঘামিয়ে রোজগার…

রোমজান মুহূর্তে ব্যাঙ্গ করে জানালো, তা তো বারবণিতারাও করে, ওদের ইজ্জত বাড়ে না কেনো?

মোতালেব শেখের মাথার ভেতর কে যেন আচমকা লোহার রড মারে এমন বোধ হয়। শরীরের শিরা-উপশিরায় আগুনের দাবানল জ¦লে ওঠে। নিজেকে আর সামলে রাখতে পারে না।

-নিজেকে কি মনে করো তুমি বলো তো!

রোমজান খন্দকার এবার লাগামছাড়া রেশের ঘোড়া। মুখ খুলে যায় অকস্মাৎ।

Ñকি ভাবে ভাবলেন আমি খন্দকার বংশের ছেলে হয়ে কি না… পথে-ঘাটে ওই সমস্ত মানুষগুলো হাত উচিঁয়ে আরেকজনকে দেখিয়ে বলবে ওই যাই শামুকের বংশধর…

মোতালেব শেখের মাথার চাদি মুহূর্তে সত্যি-সত্যিই একেবারে গরম হয়ে যায়। রাগে গজগজ করে বলে ওঠে, পরিশ্রম করে খেলে সম্মান যায় আর দুই নম্বর অবৈধ চোরা পথে টাকা রোজগার করলে খুব ইজ্জত বাড়ে…

রোমজান মাথা নীচু রাখে, কি বলবে ভেবে পায় না এখন সে। মোতালেব তখনো অগ্নিমূর্তি ধারণ করে আছে। খন্দকার বংশের ছেলেদের হালাল উপায়ে কাজ করে হালাল পয়সা রোজগারে যতো দোষ, আর চুরি করে বিজিবি বা বিএসএফ এর হাতে ধরা পরে জেলে থাকলে সাতগুষ্টি উদ্ধার হয়ে যায় বুঝি। রোমজান বোঝে এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয় না। আর তাই তড়িঘড়ি পাশ কাটিয়ে সরে পড়ার চেষ্টা করে। মোতালেব শেখ অনেকক্ষণ পরে নিজেকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনে। মনে-মনে একবার ভাবে অতোখানি কঠিন ভাবে কথাগুলো বলা উচিৎ হয়নি। নিজেকে খানিক অপরাধী মনে হলো তার। কিন্তু না বললে তো ওর জ্ঞানও যে আর হবে না। মুহূর্তে মনে হলো ভালোই করেছে সত্য কথা বলে।

ঝলমলে রোদের অর্নিবাণ সময়গুলো কেমন যেন লাগে এখন। দূরের নীলাকাশ ভারী মন কেড়ে নেয় রোমজানের। মনে-মনে ভাবে  জৈবুর খানের সঙ্গে আজই আবার দেখা করতে হবে। কথা দিয়েছে টাকা পয়সার প্রয়োজন হলে সদর দরোজা সব সময় উন্মুক্ত তার জন্য। জীবনের দর্শন যায় থাক না কেনো, রোমজান খন্দকার কোনোদিন পারবে না আর দশজন সাধারণ মানুসের মতো কলুর বলদ হয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিশ্রম করতে, তাও আবার হাঁস-মুরগী গরু-ছাগল পালন বা বিক্রির মতো বেশ শক্তপোক্ত কাজ। নিজেকে নিজেই হাজার প্রশ্ন করে কিন্তু উত্তর ঝাঁপসা আর ধোঁয়াটে হয়ে যায় ওর সামনে। প্রস্তুত হয় আবার আগামীকালের জন্য। ভোরের প্রথম সূর্যের মতো একটু যেন আয়েশ করে বসে পা’ দুটো ছড়িয়ে। বর্ডারে এবার থেকে একটু বেশি রকম সর্তক থাকবে। জীবনটাই তো এমন, কখনো লাভের ওপর লাভ, তখন শুধু স্বপ্নের সোনালি সামিয়ানা, অন্যরকম পৃথিবী কিংবা লোকসান অথবা পুঁজি-পাট্টা নিকেশ, তেঁতুলতলার পীর বাবা হয়ে যাও রাতারাতি। আরো কতো কিছু ওমনভাবে ভাবতে-ভাবতে বুক ভরে শ^াস টেনে নেয় রোমজান খন্দকার।

একসময় কাঁশবনের মতো শুভ্র শাদা দাঁত বের করে হাসতে থাকে। অমাবষ্যার মিসমিসে কালো ঘোর অন্ধকার অবলোকন করে। এমন অন্ধকারের মধ্যে কচ্ছপের মতো শরীর নিয়ে গুটিগুটি পায়ে আকাশের কাছাকাছি যাওয়া বেশ সহজ অনুমান করতে থাকে। যোগাযোগের সেতুটা পরিচ্ছন্ন আর সাবলীল হয় চোখের সামনে। বুকের মধ্যে অনেক সাহস আর শক্তি অনুভূত হয় তার। সমস্ত জড়তা সমস্ত সীমানা ছিঁড়ে দলে-মুচড়ে সে পৌঁছে যায় অন্ধকারের মুখোমুখি। অন্ধকার বুক উচিঁয়ে কাছে টানে। আনন্দ-উল্লাসে আত্মহারা রোমজান খন্ধকার নিজের মধ্যে নিজেই এক রাজাধিরাজ। চারপাশে তার প্রজা, বড্ড আহলাদে দিন গুজরানো। সময়ের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে সে ছুটে যাচ্ছে পৃথিবীর মানুষ থেকে অন্য গ্রহের মানুষের লোকালয়ে। সত্যিই সে সুখি, জীবনের প্রতি অংশে লেপ্টে আছে সুখ নামের ভিন্ন এক পদার্থ। সে পদার্থের মধ্যে সে এক রোমজান খন্দকার।

সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষ হেঁটে যায়  স্বতন্ত্র গতি ধরে। পৃথিবীর পিচ্ছিল পথে এতো-এতো বিড়ম্বনা ওর কখনো জানা ছিলো না, আর তাই জীবনের প্রতি ধাঁপে এমন যন্ত্রণা এমন অপমান।

রাত্রের আকাশে জমাট অন্ধকার ছড়িয়ে যায়। ওই অন্ধকার সাঁতরে সে পৌঁছে যাবে আপন গন্তব্যে। আচম্বি শক্ত হাতের স্পর্শে চমকে ওঠে রোমজান। শরীরের তাবৎ অনুভূতি-শক্তি ভোঁতা বা পঙ্গু হয়ে যায় মুহূর্তে। হৃৎপিন্ডের মধ্যে দুরমুশ পেটাই কে বা যেন। একসময় সম্বিত হারিয়ে ফেলে, দীর্ঘক্ষণ পরে জ্ঞান ফিরে আসে। চোখ খুলে রোমজান আবার নির্বাক হয়ে যায়। বোবা চোখ শুধু স্থির, কাউকে খোঁজে কি না আন্দাজ করাও যায় না। চারধারে খয়েরি চড়–ঁই রঙের ইউনিফরমের বিজিবি’র জোয়ানরা দাঁড়িয়ে। গতরাত্রের অন্ধকার কেটে ভোরের রূপালি রৌদ্র ঝলমল করছে চারদিকে। গাছে-গাছে হরেক পাখি কিচির-মিচির করে পরিবেশ মুখর করে তুলছে। রোমজান খন্দকার জানে না ভোরের পাখিরা প্রতিদিনের সকালকে আরো রমণীয় আরো লাস্যময়ী করে তোলে। বাতাসে মিষ্টি একটা সুঘ্রাণ, এমন সতেজ সকাল এলোমেলো করে নদীর প্রাণ। সীমান্তপারের মানুষগুলো সিদ্ধির বড়া খেয়ে ঘুমের কোলে। রাঙা ঠোঁটে সূর্য হাসে পূর্বাকাশে।

 

 

আশরাফ উদ্দীন আহমদ, গল্পকার

চট্টগ্রামী প্রবাদের প্রথম গ্রন্থ : রচয়িতা জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন

মহীবুল আজিজ জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন (১৮৫২-১৯২০), সংক্ষেপে জে ডি এন্ডার্সন আজ থেকে একশ’ সাতাশ বছর আগে চট্টগ্রামী প্রবাদের সর্বপ্রাথমিক গ্রন্থটি রচনা-সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিলেন। চট্টগ্রামী

দেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই (সম্পাদকীয়- জুন ২০২৪ সংখ্যা)

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্প্রতি আমাদের দেশসহ উপমহাদেশে যে তাপদাহ শুরু হয়েছে তা থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই