মুহম্মদ নুরুল আবসার
সিদ্দিক আহমেদ| কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক| তিনি পেশাগত জীবনে শিক্ষকতা করেছেন, সাংবাদিকতাও করেছেন|
প্রথম যৌবনে মার্কসবাদে দীক্ষিত সিদ্দিক আহমেদ আমৃত্যু তা ধারণ করেছেন| তিনি পেশাগত জীবনে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও সৎ ছিলেন| সকলের কাছে তিনি রুচিশীল, নান্দনিক ও পরিপাটি মানুষ| প্রাঞ্জল এই মানুষ সবসময় শোষিতের আন্দোলনের কথা বলেন| তাঁর জীবন ও কর্মের মধ্যে এর ছাপ রেখে যেতো সদা সচেষ্ট ছিলেন|
প্রগতির ধারক সিদ্দিক আহমেদ শিক্ষক রূপেই গ্রামে চিরপরিচিত| সাংবাদিক সিদ্দিক আহমেদ গ্রামে ‘সিদ্দিক মাস্টার’| গ্রামে তিনি শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে একবার জড়িয়ে ছিলেন| আপন মানুষ হয়ে যান গাঁয়ের মানুষের কাছে| তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় রাউজানের নোয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে| ১৭ বছর বয়সে তিনি সিটি কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় ১৯৬২ সালে সাড়া জাগানো শিক্ষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন| ঐ বছর ১৭ সেপ্টে¤^র শহরের নন্দনকানন এলাকায় পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও উপস্থিত বুদ্ধির জোরেই গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হন|
তিনি কমিউনিস্ট পার্টির পরোক্ষ পরিচালিত রাউজান ইউনাইটেড ক্লাবের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হন| ১৯৬৪ সালে সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন| তখন তিনি যামিনী তালুকদার, বিনয় সেন ও ধীরেন ঘোষসহ অনেক বাম রাজনীতিকদের সান্নিধ্য লাভ করেন| ঐ সময়ে তিনি গোপাল হালদারের ‘আর একদিন’ পড়ে প্রভাবিত হয়ে বাম রাজনীতির গভীরে মনোনিবেশ করেন|
১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন দক্ষিণ রাউজান শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন| এ সময় কমরেড অমর সেন ও কমরেড আবদুস সাত্তারকে রাজনৈতিক গুরু হিসেবে গ্রহণ করে বাম রাজনীতির পাঠ নিতে থাকেন| ঐ বছর এক চাকরিতে যোগ দেওয়ার ঠিক চারদিন পর চাকরি বাদ দিয়ে জেলা কৃষক সম্মেলনে যোগ দেন|
১৯৬৮ সালে বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় চলে যান| সেখানে প্রগতিশীল রাজনীতিক ও লেখক সত্যেন সেন-এর সান্নিধ্য লাভ করেন| তাঁকে শিক্ষাগুরু মেনে পাঠ নিতে থাকেন| সতেন সেন তখন সিদ্দিক আহমেদসহ খেলাঘর সংগঠক জিয়াউদ্দিন আহমদ ও শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেনকে দীর্ঘ দেড় বছর মার্কসবাদের পাঠ দেন| সিদ্দিক আহমেদকে সম্পাদক করে এ সময় খেলাঘর ইউনিট গড়ে ওঠে|
১৯৭০ সালে খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন| একই বছরে তিনি শিক্ষক ও করণিক হিসেবে ঢাকার খিলগাঁও স্কুলে যোগদান দেন| ঠিক ওই সময় বজলুর রহমানকে সম্পাদক (সম্পাদক ˆদনিক সংবাদ) ও মতিউর রহমানকে (সম্পাদক প্রথম আলো) ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক করে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতা’ প্রকাশিত হয়| তখন ‘একাতা’র প্রুফ সংশোধন, বিপণনকারী ও সংবাদ লেখকের দায়িত্ব পান সিদ্দিক আহমেদ| ‘একতা’য় দায়িত্বরত অবস্থায় সিদ্দিক আহমেদ ˆদনিক সংবাদ, ˆদনিক পাকিস্তান, পরে ˆদনিক বাংলা ও ˆদনিক পূর্বদেশ-এ নিয়মিত লিখতেন| এরপর সখ্যতা গড়ে ওঠে বিখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক রণেশ দাশগুপ্তের সঙ্গে|
১৯৭১ সালে রণেশ দাশগুপ্ত আশ্রয়হীন হয়ে পড়লে ২৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত সিদ্দিক আহমেদের ঢাকার বাসায় আশ্রয় নেন| ৩ এপ্রিল রণেশ দাশগুপ্ত ভারতের উদ্দেশে আর ১২ জুলাই সিদ্দিক আহমেদ চট্টগ্রাম চলে আসেন|
১৯৭১ সালে রাউজানের নিজ বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের গোপন সংগঠকের কাজ করতে থাকেন| যুদ্ধকালীন অসহায় মানুষের আশ্রয় দান, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা দেশত্যাগে সাহায্য করতে থাকেন| যুদ্ধের মধ্যেই গশ্চি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেন| এই চাকরি তিনি ১৯৭৯ সালের মার্চ পর্যন্ত করেন| কিন্ডারগার্টেন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন| ‘গশ্চি শিশুবাগ’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি তাঁর প্রতিষ্ঠায় আজো শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে|
১৯৯১ সালে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ˆদনিক আজাদী পত্রিকায় যোগ দেন| ˆদনিক আজাদী’র ‘খোলা জানলা’য় বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তিনি পাঁচ শতাধিক প্রবন্ধ, নিবন্ধ রচনা করেন| ২০১৪ সালে তিনি এই পত্রিকায় সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন|
তার স্ত্রী মাহমুদা খানম এবং তাদের সংসারে এক মেয়ে তাহমিনা সিদ্দিকী বর্তমানে ¯^ামীর সাথে নিউজিল্যান্ড প্রবাসী এবং তিন ছেলে তানিম আহমেদ সিদ্দিকী বুলবুল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমান সিদ্দিকী সাইফ বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের সহকারী অ্যার্টনি জেনারেল ও তানভির সিদ্দিকী টিপু একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে কেমিস্ট হিসেবে কর্মরত আছেন|
অসম্ভব বইপ্রিয় সিদ্দিক আহমেদ ঘুরে বেড়িয়েছেন বই থেকে বইয়ে, পাঠাগার থেকে পাঠাগারে| নিবিড় পাঠ তাঁকে সমৃদ্ধ করে তোলে| যেখানেই গেছেন বই সংগ্রহ এবং মগ্নপাঠ ছাড়া অন্য কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই| বইয়ের দোকানগুলোত বইপড়ুয়া হিসেবে অনায়াসে পরিচিত ছিলেন|
সিদ্দিক আহমেদের প্রথম লেখা কবিতা ১৯৬৬ সালে জনতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়| তাঁর লেখালেখিতে অনুপ্রেরণা জোগান তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক অমর সেন|
তাঁর লেখালেখি পাঠ-মনষ্কতার ছাপ রেখে যায়| এর অনন্য নজির তাঁর লেখা পাঠে| তিনি নিয়মিত কলাম লিখেন, তাঁর কলামগুলোর শিরোনাম—‘দৈর্ঘ্যপ্রস্থ’, ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, ‘প্রিয়া-প্রতিক্রিয়া’, ‘খোলা জানালা’ এবং ‘দক্ষিণের বারান্দা’| তিনি কবিতা, প্রবন্ধ ও কলাম লিখেছেন নিয়মিত| বহু লেখা অগ্রন্থিত রয়েছে| তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা নয়টি— ‘জল ও তৃষ্ণা’ (কাব্যগ্রন্থ), ‘আপেলে কামড়ের দাগ’ (অনুবাদ কবিতা), ‘কিছু মানব ফুল’ (বিখ্যাতদের জীবনী), ‘পিকাসো (চিত্রকলা), ‘কবিতার রাজনীতি (প্রবন্ধ), ‘খোলা জানালায় গোপন সুন্দরবন (প্রবন্ধ), ‘পৃষ্ঠা ও পাতা’ (প্রবন্ধ), ‘প্রভৃতি’ (প্রবন্ধ), ‘ছিটেফোঁটা’ (প্রবন্ধ)| লেখালেখির জন্য তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন| ২০১৪ সালে তাঁকে নিয়ে মাসিক আন্দরকিল্লা সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল আবসার-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘সিদ্দিক আহমেদ সম্মাননা স্মারক’| গ্রন্থটি আবির প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়| ৩৩৬ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটিতে ৮৬ জন বিশিষ্ট লেখকের লেখা রয়েছে| এছাড়া সিদ্দিক আহমেদের উল্লেখযোগ্য কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও আলোকচিত্র সংযোজন করা হয়েছিল| তাঁর জীবিত অবস্থায় এ সম্মাননা গ্রন্থটি তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়|
তাঁর মৃত্যুর পর ২০১৯ সালে মুহম্মদ নুরুল আবসার সম্পাদিত সিদ্দিক আহমেদ স্মারকগ্রন্থ (জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে) প্রকাশিত হয়| স্মারকগ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয় প্রফেসর ড. অনুপম সেনকে| ৪৮০ পৃষ্ঠার এই স্মারকগ্রন্থটি সুধী মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে| এটি তাঁর জীবনের এনসাইক্লোপেডিয়া হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে|
তাঁর জন্ম ১৯৪৬ সালের ৩১ জুলাই চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গশ্চি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত কৃষক পরিবারে| পিতা-খলিলুর রহমান মাতব্বর ও মাতা-গুলচেহের| তাঁর পিতা—বাংলার ঐতিহ্যবাহী গাজীর গানের একজন গায়েন ছিলেন|
২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল ঢাকার বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন| তাঁর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দেন এবং মহান জাতীয় সংসদে শোকপ্রস্তাব গৃহিত হয়|
মুহম্মদ নুরুল আবসার : সম্পাদক, আন্দরকিল্লা



